ইসলামী আন্দোলন বিষয়ক একটি প্রশ্ন

“আসসালামু আলাইকুম। ব্লগে আপনার লেখা পড়ে অনেকদিন ধরে জমে থাকা একটা খটকা প্রশ্নের উত্তর কামনা করছি। বলতে পারেন, এক প্রকার চিন্তার বিনিময়, যা আপনার সব লেখাতেই উত্সাহ দেয়া থাকে।

ধরুন, আজ থেকে ২০ বছর পর বাংলাদেশে একটা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটল। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের একটি পরাশক্তি হয়ে উঠলো, আর আমাদের বর্তমান অধপতিত গণতন্ত্র দিনে দিনে আমাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল করে তুলল যে, ভারতের কাছে আমাদের অর্থনৈতিক প্রাপ্তির বিষয়টাই প্রাধান্য লাভ করলো। ফলে আমাদের বর্তমান ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ অথবা ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ অর্থনৈতিক চাহিদার কাছে হেরে গেল। সার্বিকভাবে জনগণই চাইল, এখন সময় আমাদের ভারতের অংশ হয়ে যাবার! তার নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই সেক্যুলাররা দিয়ে থাকবে। এর আগেই আরো অনেকগুলো বিষয় দৃশমান হয়ে পড়বে। যেমন ভারতে চাকুরি, ব্যবসা এবং অর্থনৈক্ভাবে এত বেশি পরিমাণ লোকজন নির্ভরশীল হয়ে পরবে যে, তাদের সফলতাই আমাদের অধিকাংশ স্বার্থবাদী লোকদেরকে ভারতের প্রতি আমাদের বর্তমান বিদ্বেষকে একেবারে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে বাধ্য করবে, যেমনটা কানাডা আর আমেরিকা।

জাতীয়তাবাদীরা তখন মিন মিন করে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনে থাকবে, যেমনটা ৭১ সালে ডানপন্থীরা ছিল। আর সেক্যুলাররা বৃহত্তর ভাতৃত্বের লোভ দেখিয়ে ভারতের প্রদেশ হবার দিকে নিয়ে যাবে, যেমনটা ৪৭ সালে নিয়েছিল (বলে রাখা ভালো, ৪৭-এর বিভক্তিকে এখন ধর্মে ধর্মে বিভক্তি বলে সেক্যুলাররাই সবচেয়ে বেশি প্রচারণা চালায়, অথচ তারাই ধর্মের নামে পাকিস্তানের সৃষ্টি করেছিল। ৪৭ সালে কলকাতা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কমপক্ষে ৫ হাজার মানুষের জীবন দেয়ায় যেই সোহরাওয়ার্দী উত্সাহ দিয়েছিলেন, পাকিস্তান তৈরি করে উনিই আবার পূর্ব পাকিস্তানের অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলারদের গুরু হয়েছেন! আর পাকিস্তান তৈরিতে বাঙালি জনগণ সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। কারণ, তারা হিন্দু জমিদারদের হাত থেকে রক্ষা পেতে চেয়েছিল, অর্থাৎ শুধুই অর্থনৈতিক কারণ)।

তখন হয়ত জাতীয়তাবাদীরা এখনকার আসামের উলফার মত হবে। আর সেক্যুলাররা ভারতের সেক্যুলারদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আরো অধিক শক্তিশালী হবে। আর ইসলামপন্থীরা? অবশ্যই জাতীয়তাবাদীদের সাথেই থাকবে! বর্তমান ইসলামপন্থীদের মানসিকতায় আমার কাছে তাই মনে হয়। তখন হয়ত ইসলামপন্থীরাই বলবে, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা শুধু ঈমানী দায়িত্ব নয়, বরং অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে! আর এর পক্ষে বড় বড় আলেমরাই বলবেন! যেমনটা হয়েছিল ৭১ সালে।

আর এর ঠিক উল্টা দিকেই থাকবে জনগণ। যেই জনগণ ৪৭ সালে দেশ তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়ে আকাঙ্খা পূরণ না হওয়ায় মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে আলাদা দেশ তৈরি করেছিল নতুন স্বপ্ন নিয়ে, স্বাধীনতার প্রায় ৬০ বছর (ধরে নেয়া!) পরও প্রকৃত স্বাধীনতার সুযোগ না পাওয়া জনগণ যে আবার সেই স্বাধীনতা বিকিয়ে দিতে এগিয়ে আসবে না, সেই নিশ্চয়তা কি আমরা দিতে পারি?

তাহলে সামারি করলে দাড়ায়, ‘রাষ্ট্র’ ও ‘ইসলাম’ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ইসলামপন্থীদের ৩টি অবস্থান। প্রথমত, ৪৭ সালে দ্বৈত অবস্থান। মাওলানা মওদূদী (রহ) প্রথমে ভারত বিভক্তির বিপক্ষে ছিলেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষেই আসলেন না শুধু, বরং সেই উপসংহারে নিয়ে গেলেন, যেই ইসলামের নামে পাকিস্তান হয়েছে সেই রাষ্ট্রকে যে করেই হোক ইসলামী রাষ্ট্রই বানাতে হবে। সেক্যুলাররা তো সেই সুযোগেই সব দোষ ধর্মের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা পরিছন্ন হয়ে গেল! ‘রাষ্ট্র ও ইসলাম’ নিয়ে জামায়াতসহ আরো অনেক ইসলামী দলের ক্রমাগত প্রচারণায় ৭১ সালে একটাই উপসংহারে আসার কথা ছিল এবং যা হয়েছেও। সেটি হলো– ‘রাষ্ট্র = ইসলাম’! আরো সহজ করে বলতে গেলে, ‘পাকিস্তান = ইসলাম’! ৭১ সালে জামায়াতের বিতর্কিত অবস্থানের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকেই এই কারণটা বেমালুম ভুলেই যান যে, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের উপর এই সাইকোলজিক্যাল এফেক্টের পরিণতি। জামায়াতের মতো একটা ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন (আমার মতে তখনকার সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক দল, যার নেতৃত্বে মাওলানা মওদুদীর মতো ব্যক্তি, যিনি কিনা এই উপমহাদেশে ইসলামী আন্দোলনের এক এবং অপ্রতিদ্বন্দী থিওলজিয়ান) যখন এই ধরনের সিদ্ধান্তে আসে যে, ‘পাকিস্তান = ইসলাম’, তখন কর্মীদের উপর বিষয়টার গুরুত্ব কতটা মনস্তাত্বিকভাবে আঘাত করবে, সেইটা যারা ছাত্রসংগঠন করেছেন, তারা খুব সহজেই বুঝতে পারার কথা। শুধু তাই নয়। জামায়াতের সাথে তখন বাকি প্রায় সকল ইসলামী সংগঠন যখন একই তালে এই প্রচারণা চালায় যে, ‘পাকিস্তান = ইসলাম’, তখন আলবদর বা আল শামসের মতো সংগঠনে গিয়ে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের আকীদা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই তো আমার কাছে বৃথা মনে হয়। অথচ এখনকার ইসলামপন্থীরা তাই করে যাচ্ছেন। বিবেচনায় আনছেন না, সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গিটার কথা! যাইহোক, ফলাফল হলো, একাত্তরের পর আমাদের ইতিহাস থেকে এই শিক্ষাই নেয়া নেয়াটা উচিত বলে মনে হয়, ‘রাষ্ট্র ইস নট ইকুয়েল তো ইসলাম’!

এবার আসুন, এখনকার ট্রেন্ড! অনেকের কাছেই শুনি, ‘৭১ সালে জামায়াত দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, কিন্তু এখন সবচেয়ে দেশপ্রেমিক। এতে আমার সন্দেহ করা উচিত নয়! কিন্তু এই দেশপ্রেমের ধারণা থেকেই কি আজ থেকে ২০ বছর পর ইসলামপন্থীরা এই উপসংহারে সহজেই আসবে না, ‘বাংলাদেশ = ইসলাম’। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আবারো অধিকাংশ জনমতের বিপরীতে অস্ত্রধারণ! আবারো একসাথে দেশের সকল ইসলামপন্থী দল একই অবস্থায় পড়বে, যেমনটা ৭১ এর পর পড়েছিল! তাহলে আমি কি এই উপসংহারে পৌছাতে পারি, যেই মাওলানা মওদূদী (রহ) মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে, ইসলামী আন্দোলনের ভিত্তি গড়েছিলেন, সেই আন্দোলনই ক্রমান্বয়ে সময়ের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে স্রেফ ‘জাতীয়তাবাদী’ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে? গত ৭০ বছরেও কি তাহলে তাত্ত্বিকভাবে ‘রাষ্ট্র’, ‘ইসলাম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’ এই তিনটা বিষয়কে আলাদা আলাদাভাবে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা গিয়েছে? ‘মুসলমানদের রাষ্ট্র’ আর ‘রাষ্ট্রে মুসলমান’ এই বিষয় দুটোকে কি কখনই identify করা গিয়েছে? ইসলামপন্থীদের কি তাহলে, ‘রাষ্ট্র কী?’ এই সংজ্ঞাটা আবার নতুন করে ভাবা উচিত? তাত্ত্বিকভাবে আপনার কাছে উত্তরগুলো আশা করছি।

আরো একটা বিষয় আপনাকে জানানো দরকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ইসলামপন্থীদের অবস্থানটাও কি একই ধাচের নয়? পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বাংলাদেশবিরোধী যত প্রচারণা হয়, তার বেশিরভাগ ওয়েবসাইটেই দেখবেন, জামায়াতবিরোধী প্রচারণা। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন বাঙালিই জামায়াত। আমি তো এখনো সরাসরিই বলতে পারি, কোনো কারণে যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে, তাহলে সবার আগে সেনাপক্ষে অবস্থান নিবে ইসলামপন্থী ভাইয়েরা। এইখানেও কি হিউম্যান ভাল্যুর সাথে রাষ্ট্রের সংঘাত হয় না? তখনও কি ইসলামকে হিউম্যান ভাল্যুর সাথে যুদ্ধে নিয়ে আসবেন না ইসলামপন্থীরা?

আপনার কাছ থেকে একটু তাত্ত্বিক উত্তর পেলে খুশি হবো। ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফিজ।”

*****

দেশের বাইরে উচ্চতর গবেষণায় নিয়োজিত এক সহকর্মীর উপর্যুক্ত ইমেইলের উত্তরে আমি লিখেছি –

আপনার লেখাটা পড়ে তাজ্জব বনে গেলাম! মাশাআল্লাহ! আপনার লেখার প্রতিটা বাক্যের সাথে আমি একমত। অতি সংক্ষেপে আমার মন্তব্য:

. ইসলাম = জামায়াতে ইসলাম; কিংবা, ইসলাম = কোনো দেশবিশেষ (বাংলাদেশ, সৌদি বা অন্য কোনো জমহুরিয়াত) – এমনটা আমি মনে করি না।

. স্বয়ং জাতীয়তাবাদকে আমি খারাপ মনে করি না। জাতীয়তাবাদ বলতে যদি সাম্প্রদায়িকতা বোঝানো হয়, তাহলে তা খারাপ। ইসলাম যতটুকু ব্যক্তিগত ততটুকু সামাজিক, যতটুকু আন্তর্জাতিক ততটুকু জাতীয়ভিত্তিক।

. পদ্ধতি হিসাবে গণতন্ত্র যতটুকু ভালো এবং লক্ষ্য তথা অ্যান্ড হিসাবে ততটুকুই (পুরোটাই!) খারাপ; জাতীয়তাবাদও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ততটুকু ভালো এবং খারাপ হতে পারে।

. এ কথাটা অতি বড় সত্য যে, বাস্তবের বড় ভুলগুলোর মূল কারণ তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি। যেমন, জামায়াতে ইসলামীর অতিরিক্ত রাজনৈতিক সম্পৃক্তার বড় কারণ হলো শীর্ষ জামায়াত নেতৃত্বের এই ভুল তত্ত্ব যে, এ দেশের মানুষ ইসলাম চায়, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বই সমস্যা।

. এ দেশের মানুষ ইসলামের সঠিক জ্ঞান রাখে না। এরা মূলত এক অস্পষ্ট ও আধ্যাত্মবাদী ইসলাম পছন্দ জনগণ। এদেরকে আগে ইসলাম না বুঝিয়ে ইসলাম কায়েম করতে যাওয়া/চাওয়া একটা শ্রেণীগত বিভ্রান্তি (category mistake)।

. সবার আগে যারা ইসলাম কায়েম করতে চান তাদের নিজেরা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিক হতে ইসলামকে বুঝতে হবে। শুধুমাত্র আকীদা বা তত্ত্ব বুঝলে/মানলে হবে না। চিরায়ত ও সমকালীন উভয় দিক হতে ইসলামের প্রায়োগিক তত্ত্ব বা পদ্ধতি কী, তাও বুঝতে হবে। মদীনার রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য যারা ইচ্ছুক তাদেরকে শুরু করতে হবে নবুয়তী জিন্দেগীর শুরু থেকে, অতঃপর হিজরত থেকে। ফতেহ মক্কা দিয়ে শুরু করলে হবে না। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ানোর তোড়জোরের দরকার কী?

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *