ইসলামী আন্দোলন বিষয়ক একটি প্রশ্ন

“আসসালামু আলাইকুম। ব্লগে আপনার লেখা পড়ে অনেকদিন ধরে জমে থাকা একটা খটকা প্রশ্নের উত্তর কামনা করছি। বলতে পারেন, এক প্রকার চিন্তার বিনিময়, যে ব্যাপারে আপনার সব লেখাতেই উত্সাহ দেয়া থাকে।

ধরুন, আজ থেকে ২০ বছর পর বাংলাদেশে একটা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটল। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের একটি পরাশক্তি হয়ে উঠলো। আর আমাদের বর্তমান অধপতিত গণতন্ত্র দিনে দিনে আমাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল করে তুলল যে, ভারতের কাছে আমাদের অর্থনৈতিক প্রাপ্তির বিষয়টাই প্রাধান্য লাভ করলো। ফলে আমাদের বর্তমান ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ অথবা ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ অর্থনৈতিক চাহিদার কাছে হেরে গেল। সার্বিকভাবে জনগণই চাইল, এখন সময় আমাদের ভারতের অংশ হয়ে যাবার! তার নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই সেক্যুলাররা দিয়ে থাকবে। এর আগেই আরো অনেকগুলো বিষয় দৃশমান হয়ে পড়বে। যেমন ভারতে চাকরি, ব্যবসা এবং অর্থনৈক্ভাবে এত বেশি পরিমাণ লোকজন নির্ভরশীল হয়ে পরবে যে, তাদের সফলতাই আমাদের অধিকাংশ স্বার্থবাদী লোকদেরকে ভারতের প্রতি আমাদের বর্তমান বিদ্বেষকে একেবারে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে বাধ্য করবে, যেমনটা কানাডা আর আমেরিকা।

জাতীয়তাবাদীরা তখন মিন মিন করে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনে থাকবে, যেমনটা ৭১ সালে ডানপন্থীরা ছিল। আর সেক্যুলাররা বৃহত্তর ভাতৃত্বের লোভ দেখিয়ে ভারতের প্রদেশ হবার দিকে নিয়ে যাবে, যেমনটা ৪৭ সালে নিয়েছিল (বলে রাখা ভালো, ৪৭-এর বিভক্তিকে এখন ধর্মে ধর্মে বিভক্তি বলে সেক্যুলাররাই সবচেয়ে বেশি প্রচারণা চালায়, অথচ তারাই ধর্মের নামে পাকিস্তানের সৃষ্টি করেছিল। ৪৭ সালে কলকাতা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কমপক্ষে ৫ হাজার মানুষের জীবন দেয়ায় যেই সোহরাওয়ার্দী উত্সাহ দিয়েছিলেন, পাকিস্তান তৈরি করে উনিই আবার পূর্ব পাকিস্তানের অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলারদের গুরু হয়েছেন! আর পাকিস্তান তৈরিতে বাঙালি জনগণ সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। কারণ, তারা হিন্দু জমিদারদের হাত থেকে রক্ষা পেতে চেয়েছিল, অর্থাৎ শুধুই অর্থনৈতিক কারণ)।

তখন হয়ত জাতীয়তাবাদীরা এখনকার আসামের উলফার মত হবে। আর সেক্যুলাররা ভারতের সেক্যুলারদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আরো অধিক শক্তিশালী হবে। আর ইসলামপন্থীরা? অবশ্যই জাতীয়তাবাদীদের সাথেই থাকবে! বর্তমান ইসলামপন্থীদের মানসিকতায় আমার কাছে তাই মনে হয়। তখন হয়ত ইসলামপন্থীরাই বলবে, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা শুধু ঈমানী দায়িত্ব নয়, বরং অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে! আর এর পক্ষে বড় বড় আলেমরাই বলবেন! যেমনটা হয়েছিল ৭১ সালে।

আর এর ঠিক উল্টা দিকেই থাকবে জনগণ। যেই জনগণ ৪৭ সালে দেশ তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়ে আকাঙ্খা পূরণ না হওয়ায় মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে আলাদা দেশ তৈরি করেছিল নতুন স্বপ্ন নিয়ে, স্বাধীনতার প্রায় ৬০ বছর (ধরে নেয়া!) পরও প্রকৃত স্বাধীনতার সুযোগ না পাওয়া জনগণ যে আবার সেই স্বাধীনতা বিকিয়ে দিতে এগিয়ে আসবে না, সেই নিশ্চয়তা কি আমরা দিতে পারি?

তাহলে সামারি করলে দাড়ায়, ‘রাষ্ট্র’ ও ‘ইসলাম’ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ইসলামপন্থীদের তিনটি অবস্থান। প্রথমত, ৪৭ সালে দ্বৈত অবস্থান। মাওলানা মওদূদী (রহ) প্রথমে ভারত বিভক্তির বিপক্ষে ছিলেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষেই আসলেন না শুধু, বরং সেই উপসংহারে নিয়ে গেলেন, যেই ইসলামের নামে পাকিস্তান হয়েছে সেই রাষ্ট্রকে যে করেই হোক ইসলামী রাষ্ট্রই বানাতে হবে। সেক্যুলাররা তো সেই সুযোগেই সব দোষ ধর্মের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা পরিছন্ন হয়ে গেল! ‘রাষ্ট্র ও ইসলাম’ নিয়ে জামায়াতসহ আরো অনেক ইসলামী দলের ক্রমাগত প্রচারণায় ৭১ সালে একটাই উপসংহারে আসার কথা ছিল এবং যা হয়েছেও। সেটি হলো– ‘রাষ্ট্র = ইসলাম’! আরো সহজ করে বলতে গেলে, ‘পাকিস্তান = ইসলাম’! ৭১ সালে জামায়াতের বিতর্কিত অবস্থানের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকেই এই কারণটা বেমালুম ভুলেই যান যে, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের উপর এই সাইকোলজিক্যাল এফেক্টের পরিণতি। জামায়াতের মতো একটা ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন (আমার মতে তখনকার সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক দল, যার নেতৃত্বে মাওলানা মওদূদীর মতো ব্যক্তি, যিনি কিনা এই উপমহাদেশে ইসলামী আন্দোলনের এক এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী থিওলজিয়ান) যখন এই ধরনের সিদ্ধান্তে আসে যে, ‘পাকিস্তান = ইসলাম’, তখন কর্মীদের উপর বিষয়টার গুরুত্ব কতটা মনস্তাত্বিকভাবে আঘাত করবে, সেইটা যারা ছাত্রসংগঠন করেছেন, তারা খুব সহজেই বুঝতে পারার কথা। শুধু তাই নয়। জামায়াতের সাথে তখন বাকি প্রায় সকল ইসলামী সংগঠন যখন একই তালে এই প্রচারণা চালায় যে, ‘পাকিস্তান = ইসলাম’, তখন আলবদর বা আল শামসের মতো সংগঠনে গিয়ে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের আকীদা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই তো আমার কাছে বৃথা মনে হয়। অথচ এখনকার ইসলামপন্থীরা তাই করে যাচ্ছেন। বিবেচনায় আনছেন না, সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গিটার কথা! যাইহোক, ফলাফল হলো, একাত্তরের পর আমাদের ইতিহাস থেকে এই শিক্ষাই নেয়া নেয়াটা উচিত বলে মনে হয়, ‘রাষ্ট্র ইজ নট ইক্যুয়াল টু ইসলাম’!

এবার আসুন, এখনকার ট্রেন্ডের আলোচনায়। অনেকের কাছেই শুনি, ‘৭১ সালে জামায়াত দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, কিন্তু এখন সবচেয়ে দেশপ্রেমিক। এতে আমার সন্দেহ করা উচিত নয়! কিন্তু এই দেশপ্রেমের ধারণা থেকেই কি আজ থেকে ২০ বছর পর ইসলামপন্থীরা এই উপসংহারে সহজেই আসবে না, ‘বাংলাদেশ = ইসলাম’? তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আবারো অধিকাংশ জনমতের বিপরীতে অস্ত্রধারণ! আবারো একসাথে দেশের সকল ইসলামপন্থী দল একই অবস্থায় পড়বে, যেমনটা ৭১ এর পর পড়েছিল! তাহলে আমি কি এই উপসংহারে পৌছাতে পারি, যেই মাওলানা মওদূদী (রহ) মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে, ইসলামী আন্দোলনের ভিত্তি গড়েছিলেন, সেই আন্দোলনই ক্রমান্বয়ে সময়ের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে স্রেফ ‘জাতীয়তাবাদী’ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে? গত ৭০ বছরেও কি তাহলে তাত্ত্বিকভাবে ‘রাষ্ট্র’, ‘ইসলাম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’ এই তিনটা বিষয়কে আলাদা আলাদাভাবে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা গিয়েছে? ‘মুসলমানদের রাষ্ট্র’ আর ‘রাষ্ট্রে মুসলমান’ এই বিষয় দুটোকে কি কখনই আইডেন্টিফাই করা গিয়েছে? ইসলামপন্থীদের কি তাহলে ‘রাষ্ট্র কী?’ এই সংজ্ঞাটা আবার নতুন করে ভাবা উচিত? তাত্ত্বিকভাবে আপনার কাছে উত্তরগুলো আশা করছি।

আরো একটা বিষয় আপনাকে জানানো দরকার। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ইসলামপন্থীদের অবস্থানটাও কি একই ধাচের নয়? পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বাংলাদেশবিরোধী যত প্রচারণা হয়, তার বেশিরভাগ ওয়েবসাইটেই দেখবেন, জামায়াতবিরোধী প্রচারণা। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন বাঙালিই জামায়াত করে। আমি তো এখন সরাসরিই বলতে পারি, কোনো কারণে যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে, তাহলে সবার আগে সেনাপক্ষে অবস্থান নিবে ইসলামপন্থী ভাইয়েরা। এইখানেও কি হিউম্যান ভাল্যুর সাথে রাষ্ট্রের সংঘাত হয় না? তখনও কি ইসলামকে হিউম্যান ভাল্যুর সাথে যুদ্ধে নিয়ে আসবেন না ইসলামপন্থীরা?

আপনার কাছ থেকে একটু তাত্ত্বিক উত্তর পেলে খুশি হবো। ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফিজ।”

*****

দেশের বাইরে উচ্চতর গবেষণায় নিয়োজিত এক সহকর্মীর উপর্যুক্ত ইমেইলের উত্তরে আমি লিখেছি–

আপনার লেখাটা পড়ে তাজ্জব বনে গেলাম! মাশাআল্লাহ! আপনার লেখার প্রতিটা বাক্যের সাথে আমি একমত। অতি সংক্ষেপে আমার মন্তব্য:

. ইসলাম = জামায়াতে ইসলাম; কিংবা, ইসলাম = কোনো দেশবিশেষ (বাংলাদেশ, সৌদি বা অন্য কোনো জমহুরিয়াত) – এমনটা আমি মনে করি না।

. স্বয়ং জাতীয়তাবাদকে আমি খারাপ মনে করি না। জাতীয়তাবাদ বলতে যদি সাম্প্রদায়িকতা বোঝানো হয়, তাহলে তা খারাপ। ইসলাম যতটুকু ব্যক্তিগত ততটুকু সামাজিক, যতটুকু আন্তর্জাতিক ততটুকু জাতীয়ভিত্তিক।

. পদ্ধতি (tool) হিসাবে গণতন্ত্র যতটুকু ভালো এবং লক্ষ্য (end) হিসাবে ততটুকুই (পুরোটাই!) খারাপ; জাতীয়তাবাদও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ততটুকু ভালো এবং খারাপ হতে পারে।

. এ কথাটা অতি বড় সত্য যে, বাস্তবের বড় ভুলগুলোর মূল কারণ তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি। যেমন, জামায়াতে ইসলামীর অতিরিক্ত রাজনৈতিক সম্পৃক্তার বড় কারণ হলো শীর্ষ জামায়াত নেতৃত্বের এই ভুল তত্ত্ব– এ দেশের মানুষ ইসলাম চায়, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বই সমস্যা।

. এ দেশের মানুষ ইসলামের সঠিক জ্ঞান রাখে না। এরা মূলত এক অস্পষ্ট ও আধ্যাত্মবাদী ইসলাম পছন্দ জনগণ। এদেরকে আগে ইসলাম না বুঝিয়ে ইসলাম কায়েম করতে যাওয়া বা চাওয়া একটা শ্রেণীগত বিভ্রান্তি (category mistake)।

. যারা ইসলাম কায়েম করতে চান, সবার আগে তাদের নিজেদেরকে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিক হতে ইসলাম বুঝতে হবে। শুধুমাত্র আকীদা বা তত্ত্ব বুঝলে/মানলে হবে না। চিরায়ত ও সমকালীন উভয় দিক হতে ইসলামের প্রায়োগিক তত্ত্ব বা পদ্ধতি কী, তাও বুঝতে হবে। মদীনার রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য যারা ইচ্ছুক তাদেরকে শুরু করতে হবে নবুয়তী জিন্দেগীর শুরু থেকে, অতঃপর হিজরত থেকে। ফতেহ মক্কা দিয়ে শুরু করলে হবে না। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ানোর তোড়জোরের দরকার কী?

এসবি ব্লগ থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

শামিম: ভালো লেখছেন, তবে এইটুকু বলি মানশূহের এখতিয়ার হলো ইচ্ছা ও চেষ্টা, সম্পাদন করার দায়িত্ব আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার হাতে।

শির্ক নিয়ে পড়ছিলাম। আন্ডারলাইন করা পয়েন্টটা একটু খেয়াল করে দেখবেন, বিস্তারিত জানা থাকলে একটু বলবে প্লিজ।

Major Shirk Includes

  • Shirk ad Du’a– invoking or supplicating to a false deity besides Allah
  • Shirk al-Niyah wa Iraada wal Qasd– having the intention and determination to deliberately worship a deity other than Allah.
  • Shirk at- Taa obeying any created being against the command of Allah.
  • Shirk al-Muhabbah– loving a created being or an object more than Allah

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: শির্ক নিয়ে মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরি। দেখেছি, যারা সব সময়ে শির্ক ফাইন্ড-আউট করার জন্য উদগ্রীব থাকেন তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পিউরিটানিজমে ভোগেন। শির্ক আছে কিনা তা খোঁজার দরকার নাই। শির্ক দেখা গেলে তা বর্জন করতে হবে। আর কিছু কিছু শির্ক যেমন রিয়া বর্জনের চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহর কাছে সব সময়ে পানাহ চাইতে হবে। এ-ই যথেষ্ট।

আমরা যে সেক্যুলার অথরিটির অধীনে চাকরি করি, তা কি (আপনার উদ্ধৃত সংজ্ঞা মোতাবেক) শির্ক? আমি তা মনে করি না। এতেক্বাদী (ধারণাগত) শির্ক না হলে মুশরিক হবে না। বোঝার ভুলের কারণে কারো ধারণাগত শির্ক থাকলে তাকে সহীহ বুঝ দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। সে যদি বুঝে শুনে সঠিক ধারণাকে মানতে অস্বীকার করে, তাহলে তার থেকে দূরে থাকতে হবে।

সৌদি আরবের সেক্যুলার সুন্নাহ চর্চা সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন– পরামর্শ।

শামিম: ধন্যবাদ পরামর্শের জন্য। আমি কিন্তু ঐ রকম কিছু মিন করি নাই। আমি মিন করছি আমার চেষ্টার কথা। আল্লাহ প্রদত্ত আইনের বিরুদ্ধে গেলে আমি চেষ্টা করবো আল্লাহর আইনের জন্য, এটাই না মেনে নেওয়া। সুদভিত্তিক অর্থনীতিতে আমার প্রচেষ্টা ইসলাম বেইজড অর্থনীতি, এটাই না মেনে নেওয়া। আমি যদি আমার দায়িত্বটুকু পালন না করি এবং কিচ্ছু করতে গেলে বাধা বিপত্তি আসবে এই ভেবে সুদ গ্রহণ করি– এটা হলো মেনে নেওয়া। আমার ভিউ হলো এটা। ঐ যে বললাম, আমরা শুধু ইচ্ছা ও চেষ্টা করতে পারি, আমার পুরষ্কার বা শাস্তি এর উপর নির্ভর করে, সম্পাদনের উপর নহে। কারণ, সম্পাদন করার শক্তি আমার নয়।

‘সৌদি আরবের সেক্যুলার সুন্নাহ চর্চা সম্পর্কে’ আমার ধারণা নাই।

আমি আসলে জানতে চাচ্ছি এই জন্য যে তাওহীদ বুঝতে হলে আগে শির্ক জানতে হবে, শির্ক না করলেই তাওহীদ হয়ে গেলো, এই কনসেপ্টে।

যাযাকাল্লাহ খাইরা…!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আকীদা ইত্যাদি নিয়ে খুব আলোচনা, প্রকাশনা ও সতর্কতা; কিন্তু অথরিটি-সংশ্লিষ্ট কথাবার্তা (যেগুলোকে এক কথায় রাজনৈতিক বলা হয় সেগুলো) নিয়ে যথাসম্ভব চুপ মেরে থাকা কিম্বা জায়েযের সর্বনিম্ন অবস্থানে সন্তুষ্ট থাকা– এরই নাম সেক্যুলার সুন্নাহ চর্চা।

রাসূলের (সা) ইবাদত, সুন্নত– এসব নামে বড় বড় বই (আমিও অনেক বিতরণ করেছি এক সময়)। যেগুলোতে ‘ওয়াজতানিবুত ত্বাগুত’ নামের সর্বশ্রেষ্ঠ বর্জনের সুন্নতের কোনো প্রসঙ্গ নাই– এ সবই হচ্ছে সেকুল্যার সুন্নাহ চর্চা।

যে কোনো নেতিবাচক বিষয়ের মতো শির্ককে খোঁজাখুঁজির দরকার নাই। শির্ক হিসাবে যা স্পষ্টত প্রতিভাত হবে তা বর্জন করতে হবে।

সেক্যুলার সুন্নাহ-চর্চাকারীদের একটা অংশ সদাসর্বদা শির্ক-বিদয়াতের পিছনে লেগে থাকেন, তা নিয়ে অযথা তর্ক করেন; আর যে কোনো খেলাফে সুন্নতকেও বিদয়াত দাবি করে বসেন। অথচ তাগুত সম্পর্কে উনারা দৃশ্যত অপারগতার মাসয়ালায় আজীবন সন্তুষ্ট থাকেন!?

চিন্তা, কথা/লেখা ও কাজকর্মে আমাদেরকে ইতিবাচক ও প্রো-অ্যাক্টিভ হতে হবে। আমার জন্য আমি এই মূলনীতিকে অত্যন্ত জরুরি মনে করি।

ধন্যবাদ।

শামিম: জ্বী, ধন্যবাদ।

নোমান সাইফুল্লাহ: আপনাকে অনেক দিন মিস করেছি। প্লিজ আপনি নিয়মিত লিখুন।

 “. এ দেশের মানুষ ইসলামের সঠিক জ্ঞান রাখে না। এরা মূলত এক অস্পষ্ট ও আধ্যাত্মবাদী ইসলাম পছন্দ জনগণ। এদেরকে আগে ইসলাম না বুঝিয়ে ইসলাম কায়েম করতে যাওয়া বা চাওয়া একটা শ্রেণীগত বিভ্রান্তি (category mistake)।

. যারা ইসলাম কায়েম করতে চান, সবার আগে তাদের নিজেদেরকে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিক হতে ইসলাম বুঝতে হবে। শুধুমাত্র আকীদা বা তত্ত্ব বুঝলে/মানলে হবে না। চিরায়ত ও সমকালীন উভয় দিক হতে ইসলামের প্রায়োগিক তত্ত্ব বা পদ্ধতি কী, তাও বুঝতে হবে। মদীনার রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য যারা ইচ্ছুক তাদেরকে শুরু করতে হবে নবুয়তী জিন্দেগীর শুরু থেকে, অতঃপর হিজরত থেকে। ফতেহ মক্কা দিয়ে শুরু করলে হবে না। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ানোর তোড়জোরের দরকার কী?”

অসাধারণ চিন্তা। এখনকার ইসলামী আন্দোলনের এটাই বড় সমস্যা।

আবার এক হয়ে যাওয়ার যে উদাহরণ দেয়া হলো, এটা মনে হয় ঘটার সম্ভাবনা কম। কারণ, এদেশীয় এজেন্টের মাধ্যমে ভারত যদি পরিপূর্ণ অঙ্গ রাজ্যের সুবিধা পায়, তাহলে রিস্ক নেয়ার দরকার কি? ভারতে যে স্বাধীনতা আন্দোলন চলছে তা নিয়ে ভারতের হিমশিম অবস্থা। হয়ত খুব বেশিদিন তার আন্দোলনরত জনগণকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।

আপনাকে ধন্যবাদ। আবার অনুরোধ আপনি নিয়মিত লিখুন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমি বা আমার সংশ্লিষ্ট সহকর্মী কেউ মনে করেন না, বাংলাদেশ সুদূর ভবিষ্যতেও ভারতের অঙ্গরাজ্য হতে চাইবে। জাতীয়তাবাদ নিয়ে ইসলামপন্থীদের বৈপরীত্যমূলক অবস্থান ও ধারণাগত দ্বন্দ্বকে তুলে ধরার জন্য এই চিত্রকল্প দেয়া হয়েছে।

ইসলাম বোঝার জন্য কোরআন-হাদীস ইত্যাদি পড়তে হবে। তবে, শুধুমাত্র এটুকু যথেষ্ট নয় এবং ঝুঁকিপূর্ণও বটে। রাসূলের (সা) বাস্তব জীবন ও সামাজিক বিবর্তনের নিরিখেই সবকিছু বুঝতে হবে।

ধন্যবাদ।

সামাদ: আদ্যোপান্ত পড়ার সময় হলো না। পরে পড়ার ইচ্ছা থাকল। আপনার কথায় যুক্তি খুঁজে পাব আশা করি। আগে নিজেকে ডাক্তার বানিয়ে তবেই অন্যের উপর ডাক্তারি ফলানো উচিৎ। আমার একটা লেখায় লিখেছিলাম:

“নবীর নায়েব হতে হে বস্তা কাঁধে নাও,
পথের কাঁটা না দেখিলে বুড়ির বাড়ি যাও
নিজের পাতে ভাগ বসাতে অন্নহীনে ডাকো,
প্রতিবেশীর সাথে সদা ভালোবাসা রাখো।
বস্ত্রহীনে বস্ত্র যোগাও, তোমার মতো তারও,
হিসাব করে চুকিয়ে দিও, যার কাছে যা ধারো।”

তাদেরই জন্য যারা ইসলাম কায়েম করতে চায়।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মানুষকে উদ্ধার করার মন-মানসিকতা পরিহার করে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের উচিত সামাজিক দায়িত্বসমূহ পালনের মাধ্যমে নাজাতের তরীকা খোঁজা। আমরা মানুষের নাজাতের জন্য কাজ করছি– দায়িত্বশীলদের এ ধরনের মাইন্ডসেট একটা বড় সমস্যা।

ধন্যবাদ।

লাল বৃত্ত: ওহ!! মনে হলো নিজের কথাগুলো নিজেই পড়ছি। আমি বহুদিন থেকেই ভেবে কুল পাচ্ছি না যে একটা শব্দ তার সমশব্দের সাথে তুলনা চলে। ইসলামের সাথে জাতীয়তাবাদের কনফ্লিক্টই যদি লাগে তাহলে তো এ দেশে ইসলাম কায়েমের আন্দোলনই জায়েজ নাই। তাদেরকে উপমহাদেশে কিংবা সমগ্র বিশ্বে খেলাফত কায়েমের জন্য দৌড়াতে হবে। পরিবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় যখন সমগ্র বিশ্বে ভিন্ন একটি সিস্টেম চলছে তখন সেই সিস্টেমকে ব্যবহারই যদি করবেন, তাহলে আবার সেই সিস্টেমের উপকরণগুলো কী করে উপেক্ষা করবেন?

জামায়াত ইসলামের এই সরলীকরণ এবং রাষ্ট্র = ধর্ম এবং = জাতীয়তা বিষয়গুলোকে এক কাতারে নিয়ে আসাটাই তাদের বিভিন্ন সময়ের ভিন্নধর্মী দুর্বলতর অবস্থানের কারণ।

বিষয়গুলো তো এত সরল নয় যতটা সরলভাবে তারা বক্তৃতা ও বিবৃতিতে বলে থাকে।

শামিম: আমরা যত সহজে কথাগুলো বলছি অতটা সহজ কি ছিলো ব্যাপারগুলো? রাষ্ট্র = ধর্ম– এ রকম কোনো স্ট্র্যাটেজি কি ছিলো আসলে? নাকি অন্য কোনো চিন্তা বা যুক্তি তাদের ছিল? আমরা মনে হয় একটু বেশি অনুমানপ্রিয়।

লাল বৃত্ত: হয়তো আমরা বেশি অনুমানপ্রিয়, কিন্তু অবস্থা এমন হয়েছিলো যে এখন সেই অবস্থানটা কোন কারণে ছিলো তাও কেউ ব্যাখ্যা করতে রাজি নন। এবং অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের সাক্ষাৎকারে তো মনে হলো– রাজাকার আল বদর কী, জামায়াত তা চিনেই না।

যে যুক্তি আর যে কথাই অন্তরালে থাকুক না কেন, ২৫ মার্চ রাতের হামলার পর থেকেই তো পূর্ব পাকিস্তান জালিম হয়ে গেলো, তখনো হয়তো মজলুম মুসলমানের পক্ষে সুযোগ সন্ধানী মুশরিকরা থাকায় মুসলিম জালেমদের জুলুমকেই শ্রেয় হিসেব ধরে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে দলীয় এবং রাষ্ট্রীয় সংযোগ অক্ষুণ্ণ রেখেছে, কেননা দল তো তখনো আলাদা হয়নি। যদি পাকিস্তান আন্দোলন হালাল হয়, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষ অবলম্বন করাটাও তাদের জন্য হালাল ছিলো। আর যদি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে খিলাফত কায়েমেরই উদ্দ্যেশ্য থাকতো, তাহলে তো মাদানী সাহেবই সঠিক। পাকিস্তান আন্দোলনটাই হারাম হয়ে যায়। কেননা, জাতীয়তাবাদ যদি ইসলামী হয়, আর তা যদি হয় আমি ছাড়া অন্য সবাই অচ্ছুত আর নিম্ন প্রকৃতির বলে ধারণা করা, তাহলে সেটাতেও ইসলামের সাপোর্ট থাকার কথা নয়। এখানে ঝামেলাটা বেধেছিলো দারুল ইসলাম আর আর দারুল হারব নিয়ে, কিন্তু সেক্যুলারিজমের ধারকেরা ইসলামী স্টেট প্রতিষ্ঠার মুলা মাওলানা মওদূদী আর সমমনা সব উলামাদের সামনে ঝুলিয়ে ধরে নিজেদের উদ্দ্যেশ্য ঠিকই আদায় করে নিয়েছে। হতে পারে ধর্মীয় আইডেন্টিটিতে বিভক্তি হয়েছে, কিন্তু মননে খুব একটা পার্থক্য কোনো শাষকগোষ্ঠীরই ছিলো না।

তাহলে অবশেষে বিষয়টি কি এ রকম দাঁড়ালো– পরিস্থিতির কারণে আজ যেটা হালাল কালই তা হারাম?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কেন জানি, কীভাবে যেন দৃষ্টিভঙ্গি, কথাবার্তা মিলে যায়!?

চাই, অ্যানশিউর করতে, এভরিবডিজ রাইট টু স্পিক। হুইচ ইজ দ্যা কী টু অল সর্টস অফ ইন্টেলেকচ্যুয়ালিটি। এন্ড ইন্টেলেকচ্যুয়ালিটি ইজ অ্যা ভেরি স্পেশাল থিং দ্যাট ইসলাম হ্যাজ।

ভালো থাকুন।

হিন্দোল: পাকিস্তানকে দুই টুকরো করেও ভারতের লাভ হয়নি: লে. জেনারেল জ্যাকব

– আহমদ হাসান ইমরান, ভারত

এ বছরের ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ইস্টার্ন কমান্ডের তদানীন্তন চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল জে. এফ. আর. জ্যাকব বেশ ক’টি পত্রপত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাংবাদিকেরা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ১৯৭১ সালে ভারত পাকস্তানকে ভেঙে দিতে সমর্থ হয়েছে। এর ফলে ভারত কি আরো নিরাপদ হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তরে জেনারেল জ্যাকব বলেন, ‘ভারত পাকিস্তানকে রাষ্ট্র হিসেবে দুই টুকরো করে দিতে সমর্থ হলেও সামরিক দিক থেকে তাতে ভারতের লাভ হয়নি। বরং এর ফলে ভারত সামরিক দিক থেকে আরো বেশি চাপের মুখে পড়েছে।’

‘পাকিস্তানকে ভেঙে দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে আরো বেশি নিরাপদ করে তোলা। কিন্তু তা হয়েছে কি?’- এ প্রশ্নের জবাবে জেনারেল জ্যাকব বলেন, ‘না, সে উদ্দেশ অর্জিত হয়নি। বরং সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আগে দুটো ফ্রন্ট ছিল। একটি ছিল আমাদের পশ্চিমে পশ্চিম পাকিস্তান এবং আমাদের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তান। দুই ফ্রন্টের ব্যবস্থাপনা করতে গিয়ে আমাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করার সামর্থ্য পাকিস্তানের ছিল না। কিন্তু এখন তাদের সব সেনাবাহিনী এবং অস্ত্রশস্ত্র পাকিস্তানে (পশ্চিম পাকিস্তান) কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে তারা আরো সক্ষমভাবে এগুলোর ওপর নজর দিতে পারছে।’

জেনারেল জ্যাকবকে আরো প্রশ্ন করা হয়, ‘আমরা কি ’৭১-এর সামরিক বিজয় থেকে যথাযথ ফায়দা নিতে ব্যর্থ হয়েছি?’

উত্তরে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, কথাটি সঠিক। ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তির সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে আমাদের এক লিখিত চুক্তি করা উচিত ছিল যে, বর্তমান সীমারেখাই জম্বু-কাশ্মিরে অস্ত্রবিরতির সীমারেখা হবে। এ প্রস্তাবে ভুট্টো বলেন, তিনি লিখিতভাবে কিছু দিতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে দেশে ফিরে গেলে তাকে হত্যা করা হবে। পরে ভুট্টো তার মৌখিক বক্তব্য থেকেও সরে আসেন।’

‘ওই সময়ের আপনার সব থেকে উল্লেখযোগ্য স্মৃতি কোনটি?’- এ প্রশ্নের জবাবে জেনারেল জ্যাকব বলেন, ‘আমার মনে পড়ছে, ঢাকায় জেনারেল নিয়াজির সদর দফতরের কথা। যখন আমি তার কাছে আত্মসমর্পণের শর্তাবলি পড়ে শুনালাম, জেনারেল নিয়াজি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার পরেই যা মনে পড়ে তা হলো– রমনা রেসকোর্সে প্রকাশ্যে এবং জনসমক্ষে জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের সময় বাংলাদেশীরা তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। জেনারেল নিয়াজিকে সরিয়ে আনতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।’

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান সম্পর্কে লে. জেনারেল জ্যাকব বলেন, ‘অনেকের বিপরীতে আমি কিন্তু সব সময় এই অবস্থান নিয়েছি যে মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ সালের অভিযানের সময় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা অনবরত পাকিস্তানিদের হয়রান করে গেছে এবং পাকিস্তানিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা ছিল সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে আমরা এক হাজার ৪০০ সেনাসদস্যকে হারিয়েছি। চার হাজার সেনা বাংলাদেশ যুদ্ধে আহত হয়। মুক্তিবাহিনী সাহায্য না করলে আমাদের হতাহতের সংখ্যা আরো বেশি হতো। আমিই প্রথম ব্যক্তি যে নিজের লেখা বইয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকাকে তুলে ধরেছি।’

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ধন্যবাদ। জনাব হিন্দোল। আপনি তো দেখছি চিন্তার জগতে দোলা দিতে সক্ষম! প্রিয়তে নিলাম আপনাকে।

তারাচাঁদ: মোজাম্মেল ভাই, ধরুন আজ থেকে ২০ বছর পরে হঠাৎ একদিন বাংলাদেশে ‘ইসলামাইজেশন অব এডুকেশন’ করে ফেলার সুযোগ আসল। তখন আপনার সাবজেক্ট ‘দর্শন’-এর অবস্থা কী হবে?

বছর পাঁচেক আগের কথা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইসলামিক স্টাডিজের’ কারিকুলাম তৈরি করতে চাইল। ইসলাম বিষয়ে ভুরি ভুরি ডক্টর থাকার পরও কেউ একটা পূর্ণাঙ্গ কারিকুলাম তৈরি করে দিতে পারল না। এটা কি দুঃখের নয়?

এই বছর মাদ্রাসায় অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। আগামী বছর যদি সরকার ঘোষণা দেয়, “এ বছর থেকে মাদ্রাসায় চার বছর ব্যাপী ইসলামী দর্শন কোর্স চালু হবে।” সত্যিই এমনটি হলে অবস্থাটা কী হবে চিন্তা করেছেন? আপনি তো দর্শনের শিক্ষক। আপনাকে যদি শিক্ষামন্ত্রী জিজ্ঞাসা করেন,

# ইসলামাইজেশন অব ফিলোসফির উপর আপনার কয়টা বই আছে?

# ইসলামী দর্শনের উপর চার বছরের অনার্স কোর্স খোলার জন্য একটা কারিকুলাম তৈরি করে দেন তো!

# বাতিল দর্শনের চেয়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে আপনি কয়টা বই লিখেছেন?

ভ্রাতঃ, এগুলো ইসলামী সমাজ গঠনের জন্য অতীব প্রয়োজন (prerequisite)। আপনাদের মতো শিক্ষকরা একটু অগ্রসর চিন্তা না করলে, আর কারা এ কাজ করবে?

ইউসুফ আল কারযাভী বলেছেন, শিক্ষিত ইসলামপন্থীরা তাদের নিজের বিষয়কে ইসলামাইজেশন করার প্রয়োজনীয়তা একেবারে ভুলে গিয়ে, যা তার বিষয় নয় এমন ব্যাপারে মত্ত থাকে। যে তিনটি প্রশ্ন আমি রাখলাম, আপনি কি নিশ্চিত যে, এমন প্রশ্ন আল্লাহ আপনাকে করবেন না? নাকি এর সুফল কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকলেও সদকায়ে জারিয়া হিসাবে গণ্য হবে না।

ইসলামী সমাজ কায়েমের স্বপ্ন দেখি বলে এই প্রশ্ন আমার মনে বারংবার উঁকি দেয়।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ভাই তারাচাঁদ,

() আপনার কথা থেকে মনে হচ্ছে আপনি আর্লি টোয়েন্টিজের কোনো ব্লগার নন। আমি স্বনাম, স্বছবি ও স্বপরিচয় ব্লগিং করি বিধায় আপনি আমাকে স্পেসিফিক্যালি কথা বলতে পারলেন। তাই না? আমার মনে হয় আমাদের সকলেরই সত্যিকারের পরিচয়ে লেখালেখি করা উচিত। আমার স্বপ্নের যে কনসেপ্ট গ্রুপ, সেটি গড়ে তোলার জন্য এটি দরকার।

() ইসলামাইজেশন অব নলেজ বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার নয়। যদিও এ বিষয়ে আমি একটা সাড়া জাগানো সেমিনার আয়োজন করেছিলাম। বছর কয়েক আগে, চবিতে। ইসমাইল ফারুকী ইত্যাদি আমি পড়েছি। বাংলাদেশে ‘সমকালীন মুসলিম দর্শন’ নামের কোর্স আমরাই প্রথম চালু করেছিলাম। প্রথম তিন বছর আমি পড়িয়েছি। সমকালীন জ্ঞানতত্ত্বের দুনিয়াজোড়া নামকরা কয়েকটা টেক্সট শুধুমাত্র চবিতেই পড়ানো হয়। এবং আমিই এসবের একমাত্র শিক্ষক। বিআইআইটি চট্টগ্রামের কার্যকরী সভায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করি। সম্প্রতি প্রতিবেশী প্রফেসর আবদুন নুর স্যারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইসলামাইজেশন অফ নলেজ কায়েম হয়ে যাবার পরে এথিজম এবং এ ধরনের বিষয়াদি পড়ানো হবে কিনা। তিনি নেতিবাচক উত্তর দিলেন। আমি উনার সাথে প্রবলভাবে দ্বিমত প্রকাশ করেছি। মালয়েশিয়ার আইআইইউএমে ইসলামাজেশন অফ নলেজের উপর পিএইচডিরত নেয়ামত উল্লাহ ভাইয়ের সাথে অবশ্য আমি পুরোপুরিভাবে একমত হয়েছি। এ বিষয়ে উনার বক্তব্য আমার কাছে রেকর্ড করা আছে। যেখানে উনি বিষয়টাকে মূলত কারিকুলাম রিফর্ম হিসাবে তুলে ধরেছেন।

() সাধারণ লোকজন তো বটেই, অতি শিক্ষিত ও উচ্চ পর্যায়ের ইসলামী নেতৃবৃন্দও সাধারণ কথাবার্তা ও লেখালেখিতে সরাসরি ইসলামকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের অতি স্পষ্ট মোটিভ নিয়ে অগ্রসর হন। অথচ, তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রচলিত যেসব ধারণা, বিশ্লেষণ, যুক্তিপ্রক্রিয়া– সেসবকে সিস্টেমেটিক্যালি এনালাইজ, সিন্থেসাইজ ও এগজস্ট করার অপরিহার্যতা বোধ করেন না। মাওলানা মওদূদী ইসলামী নৈতিকতার প্রসঙ্গে যা বলেছেন তা অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনি বলেছেন, আপনি জানেন, ইসলামী নৈতিকতা হচ্ছে মৌলিক মানবীয় গুণাবলীর অতিরিক্ত ও উচ্চস্তরের বিষয়।

আমরা সরাসরি গাছের আগায় অবস্থান নিতে চাই, গোড়া ও শেকড় নিয়ে ভাবি না!!! এটি বুদ্ধিবৃত্তি থেকে রাজনীতি– সর্বক্ষেত্রে।

() সে জন্যই আমি সব সময় বলি– আমাদেরকে আগে ইসলাম বুঝতে হবে। যাহা কিছুতে ইসলামের সিল বা নাম আছে তা ইসলামী আর বাদবাকি সব অনৈসলামী– এটি এক ধরনের চিন্তা। আবার, যা কিছু স্পষ্টত ইসলামবিরোধী নয় এমন সব কিছুই ইসলামী– এটি ভিন্ন ধরনের চিন্তাধারা। আমাদেরকে ঠিক করতে হবে, আমরা কোন পথে যাব।

বিস্তারিত মতামত দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।

অনুরণন: তারাচাঁদ ভাই, কাল্পনিক কোনো কিছু নিয়ে কথা বলতে উৎসাহ পাই না, কিন্তু আপনি যেটা বলেছেন সেটা আসলে খুবই বাস্তব একটা সমস্যা আমাদের জন্য। তাই কয়েক লাইন লিখছি।

প্রথম কথা হচ্ছে ‘ইসলামাইজেশন অব নলেজ’ এই তত্ত্ব আদতে কতটুকু গ্রহণযোগ্য? এই তত্ত্ব দেয়ার পর ৩৫ বছর চলে গেছে, কিন্তু এক মালয়েশিয়া প্যাট্রনাইজেশন বন্ধ করে দেয়ার পরে আর কিন্তু সেরকম অগ্রগতি হয়নি। আর ‘ইসলামাইজেশন নাকি ইসলামিক’ এই বিতর্ক খুব সহজে শেষ হবে বলে মনে হয় না।

একমাত্র অর্থনীতি ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে এর প্রায়োগিক গুরুত্ব কিন্তু এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। বর্তমানে ট্রিপল আইটি, আইআইইউএম ছাড়া আর কেউ এটা নিয়ে খুব বেশি কাজ করছে বলে মনে হয় না।

কারিকুলাম সংক্রান্ত বিষয় যতটুকু বুঝি, তাতে ডক্টরদের কাজ কিন্তু কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট না। কারিকুলামের উপর ডক্টরেটরা বরং এটা করবেন, আর স্ব স্ব সাবজেক্টের ডক্টররা তাদেরকে সহয়তা করবেন।

এটা হলো তত্ত্ব কথা। বাস্তবতা তো আরও ভিন্ন। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিলেবাস/কারিকুলাম সবই তৈরি হয় সাধারণত আরেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কপি করে। মাঝে মাঝে কেউ বাইরে থেকে ডিগ্রি করে আসলে সে বিষয়ে একটা কোর্স যোগ করেন, যদি যথেষ্ট প্রভাবশালী বা উদ্যোগী হন। দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সাবজেক্টের সিলেবাস/কারিকুলাম কখনও গবেষণা করে, উপযোগিতা পরীক্ষা করে তৈরি/সংশোধন করা হয়েছে বলে আমার জানা নাই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত জ্ঞান সৃষ্টির জায়গা হলেও সে পর্যায়ে পৌঁছানোর মতো অবস্থা আমাদের এখনও হয়নি। আমরা আপাতত অন্যের অর্জিত জ্ঞান পুনর্বিতরণের পর্যায়েই আছি। এই জায়গায় ইসলামপন্থী/অনৈসলামপন্থী সবাই সমান। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ গবেষণাপোযগী না হলে শিক্ষক বা গবেষকরা কিছু সম্মানজনক ব্যাতিক্রম ছাড়া কিছু করতে পারবেন বলে মনে হয় না।

পুনশ্চ: এত কিছু লেখার পরে যেটা মনে হলো সেটা হচ্ছে– ‘ডিম আগে না মুরগী আগে’!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ইতোপূর্বে দেয়া দর্শন বিষয়ক দুটো পোস্ট পড়া ও মন্তব্য দেয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

১। দর্শন কী? প্রসঙ্গ দর্শন ও ইসলাম

২। ইসলাম ও দর্শন: প্রচলিত ভুল ধারণার সংশোধন

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ইসলামাইজেশান অফ নলেজের বিষয়ে একটা মজার তথ্য: আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের প্রোভিসি প্রফেসর ড. আবু বকর রফিক মালয়েশিয়াতে ছিলেন দীর্ঘদিন। তিনি একটা আর্টিকেল লিখেছেন। শিরোনাম হলো– ‘ইসলামাইজেশন অব ফিকাহ! আমার সংগ্রহে এটি আছে।

ঈগল: বহুদিন পর আপনাকে পেলাম।

‘দেশ = ইসলাম’ এই ধরনের কনসেপ্ট আপনি পছন্দ করছেন না, কিন্তু এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য, আদতেই সেই দেশটি যদি ইসলামী রাষ্ট্র হয়। কিন্তু পাকিস্তান = ইসলাম এটা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

আপনি জনগণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন কিন্তু আমার বিশ্বাস আপনি একমত হবেন যে, সাধারণভাবে মানুষ পাপপ্রিয় হয়। দুনিয়ার রূপ যেদিকে বেশি ঝলকায়, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেইদিকেই যাবে।

সেই অর্থে, আগামী দশ বছরে যদি বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং কোনো যৌক্তিক কারণে এই ইসলামী রাষ্ট্রটি যদি জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, আর এর বিশ বছর পর ভারত অর্থনৈতিক এবং সামরিকভাবে বিশ্বের পরাশক্তি হয় তখন দেশের সিংহভাগ জনগণ ভারতের সঙ্গে একীভূত হবে– এটা মেনে নেওয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ আছে কি? একীভূত হতে বাধাদানকারীরা যদি ৭১-এর রাজাকারের ভূমিকা নেয়, তাতে তো অপরাধ দেখছি না।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমরা যা-ই মনে করি না কেন, ইতিহাসের নির্মম সাক্ষ্য হচ্ছে, মানুষ তথা জনগণ শুধুমাত্র কোনো আদর্শবিশেষের টানে কোনো স্ট্রাকচারকে যথেষ্ট সময় পর্যন্ত সমর্থন দেয় না, যদি সে আদর্শ তাদের বস্তুগত, বৈষয়িক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক দিক থেকে ন্যূনতম সক্ষম না হয়।

শুধুমাত্র আদর্শিক রাষ্ট্র– এটি অবাস্তব। মদীনার রাষ্ট্র ব্যবস্থা, যা রাসূল (স) কায়েম করে গেছেন, তা আদর্শিক দিক থেকে পুরোপুরি আদর্শিক। একই সাথে তা ছিল বিদ্যমান সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বৈষয়িক দিক দিয়ে সক্ষম সমাজ ও রাষ্ট্র।

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

এসবি ব্লগের আর্কাইভ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *