চট্টগ্রামে মৃত্যু উপলক্ষ্যে ফাতেহার নামে উদযাপিত ভোজন উৎসব রোধের উপায় কী?

আমাদের চট্টগ্রামে কারো মৃত্যু উপলক্ষে চতুর্থ দিনে ফাতেহার নামে ব্যাপকভাবে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি সরাসরি নিষিদ্ধ ব্যাপার। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদীস রয়েছে। সাহাবীগণ এটাকে খুবই খারাপ মনে করতেন। বরং মৃতের বাড়িতে কয়েক দিন পর্যন্ত খাবার পাঠানোই হচ্ছে আত্মীয় ও পাড়া-প্রতিবেশীদের কর্তব্য। এ ব্যাপারে তাঁরা তাগিদ দিতেন।

দেখা যাচ্ছে, জাহেলি জামানাতে তথাকথিত ফাতেহার নামে না হলেও মৃতের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করার রীতি প্রচলিত ছিলো। স্বভাবতই ইসলাম এই কুপ্রথাকে রদ করতে চেয়েছে। এমন যদি হতো, মৃতের বাড়িতে দূর-দুরান্ত হতে লোকজন জড়ো হয়েছে। দুআ-মুনাজাত করছেন। খাবার সময় হয়েছে। তাই সাদামাটা কিছু আয়োজন….। তাহলে না হয়, ব্যাপারটা কিছুটা হলেও মানা যেতো।

চট্টগ্রামে যাদের বাড়ি তারা এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করবেন, এ ধরনের ফাতেহার ভিডিও করে যদি কাউকে দেখানো হয় তাহলে তিনি বা তারা এটি যে কোনো সামাজিক আনন্দ উৎসব-অনুষ্ঠান নয়, তা বুঝতে পারবেন না। ভাবুন তো, কেউ মারা গেলো। তার তিন দিন পরে তিনি আল্লাহর কুদরতে পুনরায় জীবিত কবর হতে উঠে বাড়ির পানে চললেন। মনে করুন, কেউ উনাকে দেখে ফেলার আগেই উনি বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দেখলেন, সেখানে উৎসব-আয়োজন চলছে। মনে করুন, কাউকে উনি কী উপলক্ষ্যে এতো খাওয়া-দাওয়া তা জিজ্ঞাসা করে জানলেন, তিনি মারা যাওয়াতেই এতো কিছু হচ্ছে…! ভাবুন তো, সেই ব্যক্তির কেমন লাগবে! এমনকি এই তথাকথিত ভুয়া অমানবিক ফাতেহার নামে খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠানে শোক সভার মতো করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সদগুণাবলী ও অবদান নিয়ে কোনো আলোচনাও করা হয় না। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের চোখে মুখে শোকের কোনো চিহ্নও থাকে না। সবাই অতিথি সেবায় ব্যস্ত থাকে।

ব্যাপারটা আমার এতটাই খারাপ লাগে, ইচ্ছা করে এই নির্দয়, যুক্তিহীন, অন্ধ ও বর্বর সামাজিক প্রথাগুলোকে কোনোভাবে রদ করি…! কী করবো…? আমার বাবা ইন্তেকাল করার পরে আমি এই তথাকথিত ফাতেহা আয়োজনের প্রতিবাদে তৃতীয় দিনে বাড়ি থেকে চলে আসি। এর প্রতিক্রিয়ায় আমার মা পরে বললেন, তুই প্রতিবাদ করাতে আমি দু’ধরনের খাবারের আয়োজন করাটা ঠেকিয়েছি। অর্থাৎ, গরীবদের জন্য ধারায় (ধারা হলো বাঁশের অমসৃণ অংশ দিয়ে তৈরী ২০ ফিট বাই ১০ ফিট সাইজের ধান শুকানোর পাটির মতো জিনিস) বসা এবং শুধু কলাইয়ের ডাল ও গরুর গোস্ত, আর বড়লোকদের জন্য ডেকোরেশানের টেবিল-চেয়ার আর এক্সট্রা মেন্যু – এই দুই ধরনের ব্যবস্থা না করে সবাইকে ধারা তথা বাঁশের চাঁটাইয়ে খাওয়ানো হয়েছে।

১৯৯০ সালে আব্বার ইন্তেকালের ঊনিশ বছর পরে আম্মা চলে গেলেন। ততদিনে আমি চরম রক্ষণশীল অবস্থান হতে সরে এসে অনেকটাই ‘সামাজিক’। আগে ফ্যামিলির ধার ধারতাম না। এখন পুরো পরিবারের নানা বিষয়ে কোঅর্ডিনেট করি। এ কারণে এবার আম্মার মৃত্যু উপলক্ষে বড় ভাইবোনের উদ্যোগে আয়োজিত জেয়াফতে অনুপস্থিত না থেকে এভাবে অংশগ্রহণ করি– তিন ভাগের একভাগ খাবার এলাকার চরম দরিদ্রদের মাঝে বিতরণের দায়িত্ব গ্রহণ করি। এবং তা সুষ্ঠুভাবে পালন করি। আত্মীয়-স্বজনেরা জানেন, আম্মার জেয়াফতে খাবার শর্ট পড়ে বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়েছিলো। পরে আমার ভাইবোনেরা বুঝেছিলো, পারিবারিক আলাপ-আলোচনায় স্বীকারও করেছিলো যে, এ ধরনের একটা আননেসেসারি আয়োজন করাটাই অনুচিত হয়েছে।

দেখুন, ‘আম্মার জেয়াফত’ – এ কথাটা লিখতে আমার কতো খারাপ লাগছে! অথচ, আমি এমনও দেখেছি, বাবার মৃত্যুর পরে চতুর্থ দিনে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে কার্ড ছাপিয়ে ছেলেমেয়েরা দাওয়াত দিয়ে বেড়াচ্ছে…! এর থেকে মনে হয় উপজাতিরাই ভালো।

আমাদের নতুন পাড়ার বাসা চট্টগ্রাম সেনানিবাস সংলগ্ন। তখন মিলিটারিরাই আমাদের ভাড়া ঘরে বেশি থাকতো। সে সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি বাহিনীর সাথে যুদ্ধ চলছে। এক সৈনিক একটা গল্প বলেছিলো। যুদ্ধে নিহত এক উপজাতির লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য যারা নিয়ে গেছিলো, তিনি তাদের মধ্যে ছিলেন। ওখানে গিয়ে দেখেন, তাদের আগমন উপলক্ষে ব্যাপক উৎসব চলছে। শুধু ছেলেটির মা কফিনের ঢাকনা খুলে তাকিয়ে চোখের পানি ফেললেন। বাদবাকী সবাই আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। তারা জিজ্ঞাসা করে জানলেন, ওরা অর্থাৎ ওই উপজাতির লোকেরা মনে করে,  এ দুনিয়াটা খুবই খারাপ জায়গা। এখান হতে চলে গিয়ে সে কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে। এই আনন্দ-উৎসবে মৃতের আত্মা শান্তি পাবে। খুশি হবে।

দেখা যাচ্ছে, ওই উপজাতির লোকেরা অন্তত এই দিক থেকে চট্টগ্রামের লোকদের থেকে অনেক ভালো। কারণ, তারা যা করে, তা আমি ভুল, অর্থহীন ও অনুচিত মনে করলেও তা তাদের বিশ্বাসের অনুরূপ। অর্থাৎ, তাদের বিশ্বাস ও কাজ কনসিসটেন্ট। আর আমরা ঈসালে সওয়াব হিসাবে যা করি তা কি আমাদের ঈমানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ঈসালে সওয়াবের সুনির্দিষ্ট কায়দা আছে, সুন্নত তরীকা আছে। ডায়াবেটিস আর হার্টের রোগের এই জামানায় হাঁসের মতো গ্রোগ্রাসে গরুর গোস্ত গিলা এবং গিলানোর মধ্যে কী সওয়াব আছে?

টীকা: যারা গ্লোবাল জিহাদের খোঁজ-খবর নিতে যারপরনাই উৎসাহবোধ করেন, কিংবা যারা বাংলাদেশে ইকামতে দ্বীন নিয়ে ফাইটিংয়ে লিপ্ত, আপনারা বলুন, প্লাবনের মতো ভাসিয়ে নেয়া মাজার সংস্কৃতিসহ এই ফাতেহা সংস্কৃতির অপনোদন আপনারা কীভাবে ঘটাবেন? এটি তো কোনো রাজনৈতিক সমস্যা নয়। নিছক সামাজিক ও ধর্মীয় সমস্যা। যুক্তি-বুদ্ধির সমস্যা। কাণ্ডজ্ঞানের সমস্যা। শুদ্ধ দ্বীনী চেতনার জাগৃতি দিয়ে একটা মানবিক সমাজগঠনমূলক প্রচেষ্টা দ্বারাই এসব অমানবিক সামাজিক কুপ্রথা বন্ধ হতে পারে।

এন্টায়ার চট্টগ্রামে কি মননশীল লোকের এতো অভাব? আসুন না, যে যার জায়গা হতে এ ধরনের অর্থহীন উৎসব আয়োজনকে বয়কট করি…! সবাই মিলে পরিবর্তন কর্ম শুরু হয় না। কোনো না কোনো ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র গোষ্ঠীই বড় ধরনের পরিবর্তন তথা বিপ্লবের সূচনা করে। আমি নির্বিবাদী থাকতে চাই। শান্তিপূর্ণ ও সামাজিক হিসাবে পরিচিত হতে চাই। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, তা বোধকরি আর সম্ভব হচ্ছে না। আবার যেন জ্বলে উঠতে চাই শুদ্ধ চেতনার বারুদ হয়ে…!

সোশ্যাল ওয়ার্কে এই সেক্টরের সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নাই। বঙ্গভবনে কারা ক্ষমতায় তার সাথে এসব সামাজিক সমস্যার কোনো সম্পর্ক নাই। ধর্মীয় শুদ্ধতার কথা বলেও এসব থামানো যাবে বলে মনে হয় না। কেননা, ধর্মের নামেই তো এসব ‘চাইর দিইন্না’/’চল্লিশা’ হচ্ছে। ধর্মের আপনি একটা রেফারেন্স বলবেন তো ওদের মাওলানা সাহেব আপনাকে দশটা গালি দিয়ে এসব অপকর্মের পক্ষে চৌদ্দটা বানোয়াট রেফারেন্স হাজির করবেন। মানুষ যেহেতু মূল টেক্সট পড়ে না, তাই তারা ধর্মব্যবসায়ী মওলানাদের বিপক্ষে যাওয়ার রিস্ক নিবে না। কাজের কাজ হচ্ছে, মানুষের মধ্যে মানবিকতা, যুক্তিবোধ ও মননশীলতা গড়ে তোলার চেষ্টা করা।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Abu Zafar: এইটা ধর্মীয় সমস্যা না, আঞ্চলিক বিচ্যূতি মাত্র। যারা এসব অপছন্দ করেন তারা এসব আয়োজন বিনয়ের সাথে বর্জন করলে বছরখানেক পর সব ঠিক হয়ে যাবে।

MD Rofiqul Haider Chowdhury: আরবের মুসলমানেরা এই ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়ম-রীতিটা ভালোই ফলো করে। কোনোদিন তাদেরকে এগুলো করতে দেখিনি! তারা তিনদিন শোক প্রকাশ করে, আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু পাড়া-প্রতিবেশীরা এসে মৃত ব্যক্তির পরিবার ও স্বজনদের সাথে দেখা ও দোআ বিনিময় করে যায়, সুন্দর স্মৃতিচারণ করে, আবার কিছুক্ষন বসে সামাজিক আলাপ-আলোচনাও করে। সেখানে শোক বাড়িতে উপস্থিত লোকদেরকে চা-বিস্কিট ও রাতের-দুপুরের খাবারের আয়োজন মৃত ব্যক্তির পরিবারের আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-পাড়া-প্রতিবেশীরা পালাক্রমে করে থাকে। এরপরে আর কিছুই হয় না।

আরব মুসলমানদের নার্ভও আমাদের চাইতে শক্ত! আমি এমন পিতাকেও দেখেছি ১০ বছরের কচি সন্তান হারিয়ে অনেক কেঁদেছে, দুপুরে মাটি দিয়েছে, রাত্রে দেখি অন্য সবার সাথে প্রায় খোশ মেজাজে আলাপ করছে! শোকের কোনো চিহ্নই নেই! আমাদের মতো মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেনি! তারা প্রকৃতই এগুলোকে আল্লাহর দেওয়া আমানতই মনে করে, এটি সর্বদা তাদের মনে বিরাজমান থাকে। স্বজনের মৃত্যুতে এদেরকে আমাদের মতো ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি। যেমনটি ইসলামের রীতি।

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, এই যে বুক চাপড়িয়ে চাপড়িয়ে সুর মিলিয়ে নানা কথা বলে মহিলারা বিলাপ করে কাঁদে, তাদেরকে এই কাজ হতে বিরত থাকতেই বলা হয়েছে। এবং এ ধরনের কিছুটা কৃত্রিম শোক প্রকাশের সামাজিক অভ্যাস বা রীতির কারণেই মহিলাদেরকে জানাযায় অংশ নিতে নিরুৎসাহিতকরণ অর্থে নিষেধ করা হয়েছে।

Mahbub Un Nabi: হয়তো অনধিকার চর্চা করছি, আপনার ওয়ালে এসে গায়ে পড়ে মন্তব্য করছি। পুরো লেখাটার সংগে একমত শুধু এই অংশটুকু ছাড়া “এর থেকে মনে হয় উপজাতিরাই ভালো।” তারমানে আপনে ধরেই নিচ্ছেন উপজাতিয়দের চেয়ে আপনি আমি সুপিরিওর। তারা ইনফিরিওর হওয়া স্বত্ত্বেও এই একটি ক্ষেত্রে তারা ভাল

Mohammad Mozammel Hoque: উপজাতি বা অন্য যে কেউই মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করলে তাদের এ ধরনের আচরণকে আমি অমানবিক বলবো। এটি জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি বা মতামত। যে ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী মৃত্যুতে উল্লাস করে তাদের আচরণকে আমি সমর্থন করি না। তবে, তারা আমাদের চিটাইঙ্গাদের চেয়ে ভালো। কারণ, তারা যা বিশ্বাস করে, বলে, তা-ই তারা করে। অর্থাৎ তাদের দিক থেকে বিবেচনা করলে তাদের আচরণ কনসিসটেন্ট, যদিও সেটি wrong। তাদের তুলনায় ঈসালে সওয়াবের নামে চট্টগ্রামে যা করা হয় তা একই সাথে wrong and inconsistent, i.e., contradictory

Allahr Banda Abdullah: Brother Mahbub un Nabi, I hope you will not mind. amra musolman, upojatira musolman noi, mane amader Islam/Islami adorsho janar kotha, ei hisebe uni bolchhen amader to tader cheye valo kaj korari kotha. I think that’s what he meant and I understood. Am I close, Brother Mohammad Mozammel Hoque?

Mahbub Un Nabi: Aren’t all of us creation of his almighty Allah, then how we declare some as better than other?

Mohammad Mozammel Hoque: No doubt, we all are all equal as the children of Adam (as.). Yet some of us do follow wrong ideas on life and death.

So, aren’t the followers of the better ideas and right concepts better than those derailed ones?

If it is claimed that there is no ultimate good and bad, there is nothing absolutely right and wrong, then, from Islamic point of view, such kind of talks is not acceptable. Islam has very definite proclamations about life and death, about the highest standard of good and evil.

That’s all from me on your comment. Really, I enjoyed your well thought comment. Thanks a lot, indeed.

ফেরারী মনটা আমার: সুন্দর লিখেছেন স্যার। যখন থেকে আমি এটি জানতে পেরেছি এটা একটি বিদআত তখন থেকে এটিকে পরিহার করার চেষ্টা করেছি। আমার পরিবার আত্নীয়দের এটা সম্পর্কে বুঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু তারা আমার কথাকে মূল্যায়ন করেনি তাই আমি ব্যক্তিগত ভাবে আমার গোষ্টীতে যেসব আয়োজন হয় আমি সেগুলোতে উপস্থিত না থেকে নিরব প্রতিবাদ করি। ইনশা আল্লাহ আমার জেনারেশনকে এসব থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবো।

Mohin Uddin: শোকদিবস তিনদিন পালন করে, ৪র্থ দিনে মেজবান বা ফাতেহা করে গরীব-মিচকিনদের বা হাজার হাজার মানুষদের খাওয়ানো হয়। এতে দোষের বা গুনার কি আছে!!

Mohammad Mozammel Hoque: ‘গরীব-মিচকিনদের’ খাওয়ানো না হয় বুঝলাম, ‘হাজার হাজার মানুষদের খাওয়ানোর’ নিয়ত কি? এটি কি একটা অর্থহীন কাজ নয়? এবং তা ঠিক চতুর্থ দিবসেই কেন?

আর সওয়াবের নিয়তে খাওয়ানো ছাড়া ঈসালে সওয়াবের আরো তো কত পন্থা হতে পারে। তা হয় না কেন?

চট্টগ্রামের কথা দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারবো। বলেন তো দেখি, না খেতে পেরে উপোষ থেকেছেন এমন কোনো পরিবারের কথা কি আপনার জানা আছে? হতে পারে কেউ কেউ সব সময়ে মাছ-মাংস দিয়ে খেতে পায় না। তাহলে এমন দরিদ্রদেরকে খাবার দাবার কিনে বা বিতরণ করে দিলেই তো হলো। জানেনই তো, গরীবের এক বেলায় অপরের ঘরে দাওয়াতে যা খায় তা তাদের ঘরে পৌঁছিয়ে দিলে একই খাবার দিয়ে তারা অন্তত দুবেলা খেতে পারে।

পরিবারের কেউ মারা যাবার পরে সামাজিক চাপে যারা ঋণ করে জেয়াফত-ফাতেহা করতে বাধ্য হয়, তাদের কথা কী বলবেন?

Mohin Uddin: জ্বি স্যার, আপনার সাথে একমত। কিন্তু প্রায় প্রবাসী মানুষ, তেমন উচ্চমানের মানবিক শিক্ষিতও না। তাই তারা না বুঝে উত্তম পন্থায় দান না করে এই সব করে।

বি.দ্র.: ফাতেহার নাম দিয়ে যদি ভাল মানের ভোজন হয়… মন্দ তো নয়।

Mohammad Mozammel Hoque: অর্থহীন কাজ করা কোনো ক্রমেই ন্যায়সংগত নয়। ভোজন করতে চান, করাতে চান, সমস্যা কি! করেন, করান। কিন্তু এই তথাকথিত ফাতেহাটি কি জিনিস? কারো মৃত্যুর পরে পরিবারের পক্ষ হতে চতুর্থ দিনে মেজবানের আয়োজন করার দলীল কি?

দলীল বাদ দেন, আপনার কাণ্ডজ্ঞানে কী বলে? যাদের ঘরে মাত্র তিনদিন আগে কেউ মারা গেছে তাদের ঘরে বিনা কারণে দাওয়াত খেতে যাওয়াটা তো আমার রূচিতে ভীষণ বাঁধে।

আর যদি এটি করা হয় উক্ত ব্যক্তির মৃত্যু উপলক্ষে তাহলে তো এটি নিতান্তই অমানবিক আচরণ। যেন, তিনি এতই খারাপ লোক ছিলেন যার মৃত্যুতে পরিবারের পক্ষ হতে উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে…! কী সাংঘাতিক, ভয়াবহ!!!

Shafiul Alam: এ বিষয়টি নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছাটা মাথার ভিতর অনেক দিন থেকে ঘুরছিল। সময় ও সুযোগের অভাবে লেখা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে একেবারে আমার মনের কথাটি উপস্থাপন করার জন্য জনাব মোজাম্মেল হক সাহেবকে অনেক ধন্যবাদ। কারো মৃত্যু উপলক্ষে মেজবানের আয়োজনের ধর্মীয় গুরুত্ব কতটুকু জানি না। কিন্তু এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশী। আয়োজনকারীদের প্রায় সকলে এ ধরনের মেজবানকে অনেক বেশী সওয়াবের কাজ মনে করে। এ ধরনের মেজবান হয়ে উঠে আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবদের সর্বদলীয় মিলন মেলা। এ ধরনের অনুষ্ঠান আবার অনেক পরিবারের প্রেস্টিজ ইস্যু। ধনাট্য পরিবারের কেউ “চার দিন্ন্যা” উপলক্ষে বিরাট মেজমানের আয়োজন না করলে তাকে “কঞ্জুষ”, “কৃপণ”, “মা-বাবার প্রতি দায়িত্বহীন” ইত্যাদি অপবাদ সইতে হয়। এ বিষয়টির যথার্থ ইসলামী ব্যখ্যা ও সমাধান অতি প্রয়োজনীয়।

Saiful Islam Shipu: আমার বাড়ী চাঁদপুরে। আমি দেখেছি, এখানে এধরনের অনুষ্ঠানকে অনেকটা প্রেস্টিজ ইস্যু হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কেউ মারা গেলে তার ছেলে-মেয়েরা যদি এসব অনুষ্ঠান আয়োজন না করে, তাহলে সমাজে তাদের নামে বদনাম হয়। মানুষ বলাবলি করে যে, ওমকের ছেলে-মেয়েদের মনে তাদের বাবা/মার জন্য কোন মায়া-মহব্বত নেই। কারণ তারা এসব অনুষ্ঠান করেনি। শুধু তাই নয়, কে কত বেশি সংখ্যক মানুষ খাওয়ালো এসব নিয়েও আলোচনা হয়। অনেকে তো আবার প্রতিযোগিতা করে। চৌধুরী বাড়ীর অমুকে মারা যাওয়ার পর এক গরু জবাই করে খাওয়ানো হইছে, এখন মোল্লা বাড়ীর কেউ মারা গেলে দুই গরু জবাই করে খাওয়াতে হবে ইত্যাদি।

Nahid Al Noman: তবে সামর্থ্য থাকলে গরীবদেরকে খাওয়ানো কি সমীচীন হবে না?

Mohammad Mozammel Hoque নিশ্চয়ই খাওয়াবেন। কিন্তু শুধুমাত্র খেতে না পারাদেরই তো খাওয়ানোর কথা। এবং এ জন্য চতুর্থ দিনকে নির্দিষ্ট করার তো কোনো গ্রহণযোগ্য মানে নাই। আছে কি?

Nahid Al Noman: Thank you sir… I also believe that it is totally illogical to fix the date like 4th days of one’s death!!!

Abdul Gafur: এ নিয়ে ভিন্নমত আছে। এটা শুধু চট্টগ্রামেই নয়, সারা দেশেই আছে। কেউ ৪ দিনে করে (অধিকাংশই চট্টগ্রামে), আবার চেহলামের নামে ৪০ দিনে করে। সামর্থ্য থাকলে এটা দোষের মনে হয় না। তবে যার আর্থিক সামর্থ্য নেই তার করতে হলে প্রবলেম। অনেক মানুষের মাঝে দুয়েক জন একচুয়্যাল মুমীনও তো খেতে পারে। আমরা কি তা জানি? এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

Mohammad Mozammel Hoque: হাজার লোকের মাঝে দু’একজন মুমিন বান্দাও থাকতে পারে। স্যার, একে তো অনেকেই দুর্বল যুক্তি বলবে। তাছাড়া সেই মুমিনের ডায়াবেটিস আছে কিনা কে জানে। আমার মতো ডায়াবেটিসের খুব কাছাকাছি থাকা লোকদেরকে মেজবান খাওয়ালে সামাজিকতার নামে জোর করে স্বাস্থ্য-ঝুঁকি তৈরীর জন্য আয়োজনকারীদের বরং গুনাহ হবে।

তাছাড়া মুমিন বান্দাদের খাওয়ানোর জন্য মৃত্যুকে উপলক্ষ করা কেন? এটি তো অন্য সময়ে স্বাভাবিকভাবে হতে পারে। এবং আপনার-আমার মতো সামাজিক চরিত্রের লোকেরা এটি সারা বছরই করে থাকেন। আসল বিষয় তো ঈসালে সওয়াব। অথচ, এখানে খাওয়া-দাওয়াটাই মূখ্য।

আমার কথা হলো, মৃতের বাড়িতে খাওয়ার সময় হলে খাওয়াদাওয়া করা যেতে পারে। তবে, সেটি সান্তনাদান করার জন্য আগত মেহমানদের পক্ষ হতে আয়োজন করা হলেই ভালো। বিশেষ করে পাড়া-প্রতিবেশীগণের পক্ষ হতে এই আয়োজন হতে পারে। মৃতের পরিবারের পক্ষ হতে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করার সামাজিক চাপকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।

স্যার, আমার এক চাচতো ভাইয়ের আড়াই বছরের একটা বাচ্চা আমাদের বাড়ির সামনের পুকুরে ডুবে মারা যায়। তখন পরিচিতদের কাউকে কাউকে আমি আশংকা প্রকাশ করে বলেছিলাম, দেখো, এই বাচ্চাটার জন্যও খুব সম্ভবত মেজবান দেয়া হবে। ঠিকই তৃতীয় দিনে বাড়ি হতে ফোন আসলে, “তোমার বউ-বাচ্চাসহ সবাইকে নিয়ে আসবা। আগামীকাল সন্ধ্যায় আমরা মেজবান আয়োজন করেছি। … টাকায় একটা গরু ক্রয় করা হয়েছে।” তখন ভীষণ হতাশ হয়ে এই নোট লিখেছি।

স্যার, আমাদের ধর্মবিশ্বাস মোতাবেক এই শিশুটির তো কোনো গুনাহ নাই। নিষ্পাপ। সে তো সরাসরি বেহেশতে যাবে। এমনকি তার মা-বাবার জন্য সুপারিশ করবে। তাই না? এখানে তো ঈসালে সওয়াবের কোনো প্রসঙ্গ নাই। ব্যাপারটা নিছক সামাজিকতার খাতিরে করা হয়েছে। অথচ এ ধরনের অর্থহীন রসম-রেওয়াজকে উচ্ছেদ করার জন্যই তো ইসলাম-আদর্শ-নীতি-যুক্তি-জ্ঞান-প্রজ্ঞা এসব।

বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশের কলোনিতে থাকেন চবি নিরাপত্তা কর্মী ফয়েজ সাহেব। উনার একটা কিশোরী মেয়ে ৮-১০ বছর আগে আত্মহত্যা করে। ফয়েজ সাহেব আমাকে জানালেন, “স্যার, এই ঘটনা। বাড়িতে (মিরসরাই) তিনটা ডেক পাকিয়েছি। স্যার, দোয়া করবেন।” স্যার, নিছক দোয়াই কি যথেষ্ট নয়? এই গরীব কর্মচারীর কাছ হতে যে সমাজ এ রকম একটা মর্মান্তিক শোকের সময়ে ‘পাকানো ডেক’ আদায় করলো, তাদের অজ্ঞতা ও বর্বরতার দায় কে নিবে?

আমরা, সমাজের জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবীদের কাজ তো সমাজকে ভালো কাজে নেতৃত্ব দেয়া। আমার ধারণায় আমি সে কাজটিই করছি। আপনার মতো সিনিয়র-মোস্ট ও নিরপেক্ষ শিক্ষক আমার লেখা পড়েন দেখে ভীষণ ভালো লাগছে। স্যার, দোয়া করবেন। আপনার সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির জন্যও আমরা দোয়া করছি।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *