মতাদর্শগত দিক থেকে রাজনীতির ছক অনুযায়ী আজকের বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কৌশলের মূল্যায়ন

Scale of Bangladesh Politics

আগের নোটে উল্লেখিত রাজনীতির ছকে যদি আমরা সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিবেচনা করি তাহলে তা এই স্কেলে প্রদর্শিত প্যাটার্ন হিসাবে হাজির হবে। এখানে ইসলামী দলগুলোকে (নেতৃস্থানীয় হওয়ার কারণে জামায়াতে ইসলামীকে দিয়ে এদেরকে বুঝানো হয়েছে) আমি চরম ডান শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করেছি, যাকে ইংরেজীতে ফা-র অথবা র‍্যাডিকেল রাইটিস্ট ফোর্স হিসাবেও বলা যায়। উল্লেখ্য, আদর্শবাদ নিয়ে রাজনীতির ময়দানে হাজির থাকা অন্যান্য ‘খেলোয়াড়দের’ অবস্থানের সাপেক্ষে প্রত্যেকটা দল বা সমআদর্শের দলসমষ্টির অবস্থানকে আমি চিহ্নিত করেছি। অর্থাৎ চরম ডান বলতে চরম বামের বিপরীত অবস্থানকে বুঝাতে চাচ্ছি।

উগ্রবাদী সন্ত্রাসী চরমপন্থীদের বুঝানোর জন্য যে অর্থে ‘চরম’ শব্দটাকে ব্যবহার করা হয় এখানে ‘চরম’ কথাটা সেই অর্থে ব্যবহৃত হয় নাই। এখানে ‘চরম’ কথাটা র‍্যাডিকেল বা অতি রক্ষণশীল অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাত্ত্বিক বাম আদর্শবাদী অবস্থানকেও এই অর্থে ডগমেটিক, র‍্যাডিকেল বা আল্ট্রা কনজারভেটিভ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে যথাক্রমে মধ্যবাম ও মধ্যডান শক্তি হিসাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান একক ও সুস্পষ্ট। সে তুলনায় চরম বাম ও চরম ডান ফোর্সের অবস্থান ততটা একক পর্যায়ের নয়। চরম বাম শক্তির নেতৃস্থানীয় বা প্রতিনিধি হিসাবে কম্যুনিস্ট পার্টিকে ধরা হবে, নাকি বাসদকে, নাকি জাসদকে, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু বাম আদর্শের ১৮০ ডিগ্রী বিপরীত অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামীকে নিঃসন্দেহে far right politics-এর নেতৃস্থানীয় হিসাবে গ্রহণ করা যায়।

জামায়াতের আদর্শ ও রাজনীতি সঠিক বা ভুল মনে করে একে সাপোর্ট বা অপোজ করাটা পাঠকের যার যার ব্যক্তিগত বিবেচনা ব্যাপার। যা এই প্রায়োগিক পর্যালোচনার সাথে প্রাসংগিক নয়। বরং এখানে অতি সংক্ষেপে দেখানোর চেষ্টা করবো, বাংলাদেশে জামায়াত রাজনীতি মোটাদাগে ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। তারা বামপন্থীদের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছে। এর বিপরীতে বামপন্থীরা স্বীয় মতাদর্শ ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে অত্যন্ত সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে। যদিও ‘নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভংগের’ মতো এ কাজ করতে গিয়ে তারা আইডিওলজিক্যালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রসংগত উল্লেখ্য, আদর্শবাদী দল যখন ক্ষমতাপন্থী দলের সাথে নিজের দূরত্বকে ঘুচিয়ে ফেলে, তখন তারা আদর্শিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি অনিবার্য। সেজন্য বিরোধীপক্ষকে দুর্বল করা মানেই নিজস্ব রাজনীতি বিকশিত হওয়া, এমনটা নয়। বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করার সাথে নিজস্ব আদর্শবাদ কিংবা রাজনীতির একটা যোগসূত্র থাকলেও এর একটি অপরটিকে অটোমেটিকেলি জেনারেইট করে না।

তাছাড়া, গণ্য করার মতো একটা বিরোধী পক্ষের উপস্থিতি যে কারো নিজস্ব রাজনীতি, সেলফ ডেভেলপমেন্ট ও নিজের লোকজনকে ঠিক রাখার কাজে অত্যন্ত সহায়ক হিসাবে ভূমিকা পালন করে। একক হিসাবে ময়দানে থেকে সঠিক পথে আগানো দুঃসাধ্য ব্যাপার। যে কোনো সর্বাত্মকবাদী ব্যবস্থাই তাই শেষ পর্যন্ত ভেংগে পড়ে। বাহ্যিকভাবে যত উন্নয়নই করুক না কেন, মানবিক উন্নয়নের মাপকাঠিতে এ ধরনের এককেন্দ্রিক ব্যবস্থামাত্রই ভেংগে পড়তে বাধ্য। যাহোক, এটিও আমার আজকের আলোচ্য বিষয় নয়।

“Islam to Bangladesh to Islam-in-Bangladesh to Jamaat-e-Islami” – এটি এক ধরনের বিবেচনা। আবার, “Jamaat-e-Islami to Bangladesh to Islam” – এটি আরেক ধরনের বিবেচনা।

ইসলামী আদর্শের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে জামায়াতে ইসলামী – পুরো বিষয়টাকে এভাবে দেখলে এটি স্পষ্ট, আওয়ামী লীগের সাথে ‘জানি দুশমন’ হিসাবে লেগে যাওয়াটা জামায়াত রাজনীতির চরম ব্যর্থতা। এবং ‘মৌলবাদী আদর্শ’ অনুসরণকারী জামায়াতের ওপর আওয়ামী লীগের মতো সেন্টার লেফট একটা দলকে দিয়ে নির্মূলকরণ চালিয়ে নেয়ার ব্যাপারটা এ দেশের ‘গণবিচ্ছিন্ন’ বামপন্থীদের কার্যকর রাজনৈতিক কর্মকৌশলের স্বাক্ষর। যুদ্ধাপরাধের বিচারের মতো একটা অতি সংবেদনশীল ইস্যুর মাধ্যমে জামায়াতকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ হতে বিচ্ছিন্ন করতে পারাটা তাদের মৌলিক রাজনৈতিক সফলতা। এই ‘ফাঁদে’ পা দেওয়াটা, বিপরীতভাবে, জামায়াতের অদূরদর্শী রাজনীতির পরিচয় ও বড় ধরনের ব্যর্থতা।

আওয়ামী লীগ বামপন্থী দল নয়। আওয়ামী লীগের মধ্যে বরাবরই বাম ও ডান ধারা সক্রিয় থাকলেও তারা মূলত ক্ষমতার রাজনীতি করে। রাজনৈতিক বালখিল্যতার পরিচয় দিয়ে জামায়াত যখন আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাথে গাঁটছড়া বাধলো, তখন আওয়ামী লীগের তরফ হতে বামপন্থীদের ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার’ ইস্যুটাকে গ্রহণ করার বিকল্প ছিলো না। আওয়ামী লীগের দিক থেকে দেখলে, এটি তাদের ফলপ্রসূ রাজনৈতিক কর্মকৌশল।

জামায়াতের দিক থেকে দেখলে, ‘ইসলামী আদর্শের’ দাবি ছিলো এ দেশের রাজনীতিতে সর্বোচ্চ এক-দশমাংশ পর্যায়ের উপস্থিতি বজায় রেখে পাওয়ার পলিটিক্স করা মধ্য অবস্থানের দলগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। তা না করে তারা নিজেদেরকে দেশের রাজনৈতিক ‘ত্রাণকর্তা’ ভাবতে থাকে। ইসলামপন্থীদের নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার কার্যকর চেষ্টার মাধ্যমে স্বতন্ত্র তৃতীয় ও বিকল্প শক্তি হিসাবে গড়ে না উঠে দ্বিদলীয় রাজনীতিতে ‘ভারসাম্য শক্তি’ হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করে। আগুন নিয়ে খেলতে গিয়ে নিজেই আগুনে পোড়ার মতো এক পর্যায়ে এসে ক্ষমতাপন্থীদের নিজস্ব রাজনৈতিক চালের বলিতে পরিণত হয়। তৃতীয় শক্তি হওয়া আর ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো লাফালাফি করা এক কথা নয়। জামায়াতে ইসলামীর ভুল রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য এ ধরনের অশোভন কিন্তু কার্যকর উদাহরণের বিকল্প দেখছি না।

ক্ষমতার জন্য যারা রাজনীতি করে তারা তো যে কোনোভাবেই হোক ক্ষমতায় যেতে ও থেকে যেতে চাইবে। এর মানে আমি এটি বলছি না, যারা ক্ষমতার রাজনীতি করে তাদের কোনো আদর্শবোধ ও নীতি নৈতিকতা নাই। তারা চরম বাম কিংবা ডানদের তুলনায় বিশেষ কোনো আদর্শকে অতটা সিরিয়াসলি নেয় না; বরং দেশের মানুষের রুচি ও মনমানসিকতাকে অধিক গুরুত্ব দেয়। এদিক ওদিক ম্যানেজ করে কোনোভাবে ক্ষমতায় গিয়ে সুযোগ সুবিধা ভোগ করাই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। ঘোড় সওয়ারী কর্তৃক ঘোড়াকে খাবার দেয়ার মতো করে নিজেদের লোকদের মধ্যে সুযোগ সুবিধা বণ্টন করতে গিয়ে তারা প্রকারান্তরে দেশকেও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়।

শুরুতে যেভাবে বলেছি, জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিতে বাংলাদেশ, বিশ্ব ও ইসলামী আদর্শ – এভাবে দেখলে ভুল করা হবে। আদর্শবাদী দলগুলো আদর্শের কথা বলে পথচলা শুরু করলেও প্রায়শই তারা এক পর্যায়ে নিজেদের দলীয় অবস্থানের প্রিজমেই আদর্শকে ব্যাখ্যা করে ও অন্যান্যদের মূল্যায়ন করে। জামায়াতের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।

নিজেদের ভুল রাজনৈতিক অবস্থান ও গতিপথের পক্ষে তারা অনেক যুক্তি হাজির করতে পারবে। সামগ্রিকভাবে না দেখে ওয়ান-টু-ওয়ান তথা বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সেসব সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের পেছনে হাজির করা যুক্তিকে গ্রহণযোগ্যও মনে হবে। ইটের দেয়াল গাঁথা বলুন কিংবা জাহাজের গতিপথ বলুন, গন্তব্যে পৌঁছতে হলে, সঠিক পথে চলতে হলে, অরিজিনাল ম্যাপ দেখে মেপে মেপে পথ চলতে হয়। তো এই মাপামাপির বিষয়টা ইমিডিয়েট ও আলটিমেট উভয় ধরনেই হতে হয়। পথের শুরু ও পথ চলার লক্ষ্য – উভয় বিন্দুকে স্বল্পতম দূরত্বে, যথাসম্ভব সরল রেখায় আঁকতে হবে। ট্রেডমিলের ওপর দৌড়িয়ে ব্যায়াম করা যায়, কোনো লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না।

বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি ট্রেডমিলের ওপর দৌড়ানো কিংবা তৈলাক্ত বাঁশে আরোহণের মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনীতি কিংবা যা-ই হোক না কেন, যে কোনো ধরনের সামষ্টিক সাংগঠনিক উদ্যোগ গড়ে তোলার জন্য উপাদান, ভিত্তি ও লাইন ঠিক থাকতে হবে। মশল্লা নরম থাকতে থাকতেই গাঁথুনি শেষ করতে হবে। আবার একসাথে পুরো দেয়াল নির্মাণ করা যাবে না। ধাপে ধাপে ইট গাঁথতে হবে। ঠিক মতো শক্ত হওয়ার আগেই পুরোটা গেঁথে দিলে তা ভেংগে পড়বে।

যদি এমন হয়, দেখা যাচ্ছে, ইটের একটা উচু গাঁথুনির পাশে বিচ্ছিন্ন ইটের একটা স্তুপ। একটা গাঁথুনি তৈরির কথা ছিলো যাদের তারা ভেংগে পড়া একটা ইটের একটা স্তুপের উপর দাঁড়িয়ে ভাবছে, আমরা তো মাটি হতে অনেক উপরেই আছি! এ ধরনের অবাস্তব আত্মতুষ্টি নিয়ে কেউ চাইলে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। এ ধরনের লোকজন মিলে বাংলাদেশের মতো ওভার পপুলেটেড একটি দেশে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট তৈরি করে একটা উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসাবেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পারে। কিন্তু তাতে করে দেশ ও জাতি গঠন হবে না। ইসলাম বা কোনো আদর্শবাদও এই পদ্ধতিতে কায়েম হওয়ার নয়।

ইসলামের দিক থেকে বাংলাদেশের সমস্যা কী? বাংলাদেশ উন্নত দেশ নয়, এটি? বাংলাদেশের মানুষ ‘ভালো’ নয়, এটি? বাংলাদেশের মানুষ ‘জামায়াতে ইসলামীর মতো একটা ইসলামী দলকে ভোট দেয় না’, এটি? ‘অতএব তাদেরকে দিয়ে হবে না’ – এমন ধরনের কিছু?

না, বাংলাদেশের সমস্যা এর কোনোটাই নয়। আমার দৃষ্টিতে ইসলামের দিক থেকে বাংলাদেশের মানুষের প্রধান সমস্যা হলো, তারা প্রধানত বর্ণপ্রথা হতে বাঁচার জন্য মুসলমান হলেও ইসলামকে বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে সাংস্কৃতিক চেতনা হিসাবে তথা সামগ্রিক জীবনাদর্শ হিসাবে কখনো বুঝে নাই। এক কথায় বললে, আকীদাগত সমস্যাই বাংলাদেশের মানুষের প্রধান সমস্যা। এ দেশের মানুষের যে আইডেন্টি ক্রাইসিস তার মূলে রয়েছে এই কনসেপ্টচুয়্যাল এম্বিগিউটি বা প্রবলেম।

নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তার দিক থেকে আমরা বাংগালি। রাজনৈতিক জাতীয়তার দিক থেকে আমরা বাংলাদেশী। এই নিরেট সত্য ব্যাপারটা নিয়ে এতো বিতর্ক কেন, তা যদি আমরা বুঝার চেষ্টা করি, তাহলে দেখবো, এই ফলস ডিবেটের মূলে রয়েছে আমাদের আইডেন্টি নিরূপণ বা আরোপের চেষ্টা। যারা বামপন্থাকে বাংলাদেশের মানুষের আইডেন্টিটি হিসাবে দেখতে চান তারা বাংগালিত্বকে হাইলাইট করেন। আবার যারা এ ধরনের আইডেন্টিটির পরিবর্তে এক ধরনের ইসলামী আইডেন্টিটিকে প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা এর বিরোধিতা করেন।

এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিরোধ ও দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে মানুষকে কোরআন ও হাদীস অনুসারে ইসলাম বুঝানোর দায়িত্ব পালনের চেয়ে জামায়াতকে আমরা দেখি ‘পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের’ পক্ষে জান কুরবানী দিয়ে ‘বাংগালি/বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ বিপক্ষে খেয়ে না খেয়ে বিরোধিতা করতে। অথচ, তারা আদতে জাতীয়তাবাদ মাত্রকেই অনৈসলামী মনে করে। কী করুণ স্ববিরোধ!

১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ ইসলামের কোনো ইস্যু নয়। এটি কোনো আদর্শিক ইস্যু নয়, বরং একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের একটা ঐতিহাসিক আঞ্চলিক ইস্যু। বড়জোর বলা যায়, একটা অর্থনৈতিক ইস্যু। অথচ জামায়াত নিজেকে এটাতে ওতপ্রোতভাবে জড়ায়। তাদেরকে কি বন্দুকের মুখে তৎকালীন মালেক মন্ত্রীসভার সদস্য করা হয়েছিলো? যুদ্ধাপরাধ বিচারের অসংগতি ও ফাঁক-ফোকর যা-ই থাক, নিজেদের মধ্যে ৭১ নিয়ে তাদের এত রাখঢাক কেন? কোথায় তাদের নৈতিক মনোবলের সমস্যা?

দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এমন বিরোধী ভূমিকা রাখার পরেও পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের বিস্ময়কর উত্থান ঘটে। একে তারা নিজেদের সাংগঠনিক ও আদর্শগত সাফল্য হিসাবে দাবি করে। তাই যদি হতো তাহলে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে তাবলীগ জামায়াতের এত বড় সাংগঠনিক উত্থান ও আদর্শগত প্রসার কীভাবে সম্ভব হলো? এ বিষয়ে আমার অন্যান্য লেখায় বারে বারে বলেছি, এ দেশে ইসলাম হলো একটা পপুলার ব্র্যান্ড। এর পক্ষে বা বিপক্ষে যারাই অবস্থান নেয় তারাই ব্যাপক পপুলারিটি পায়। এ দেশে সব পীরপন্থীদের উত্থান, তাবলীগের উত্থান, জামায়াতে ইসলামীর উত্থান, এমনকি তাসলিমা নাসরিনের ব্যাপক পরিচিতিও একই সূত্রে গাঁথা।

এই পপুলার ইসলামকে ভায়বল এন্ড কমপিটেন্ট হিসাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব ছিলো জামায়াতে ইসলামীর। তারা তা করে নাই। কখনোই তারা ‘দাওয়াতী মেজাজ’ নিয়ে এ দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে যায় নাই। ১৯৬৯ সালে মাওলানা মওদূদীর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সফর বলুন, আর ১৯৯৪ সালে অধ্যাপক গোলাম আযমের দেশব্যাপী সফর বলুন, সবই ছিলো রাজনৈতিক ইস্যুকে সামনে রেখে। এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব সফর ছিলো সংঘাতমুখর।

অধ্যাপক গোলাম আযমের বক্তব্য ছিলো, এ দেশের মানুষ ইসলাম চায়। নেতৃত্বই সমস্যা। তরুণ চবি শিক্ষক ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসাবে সে সময়ে ‘আল-ফালাহ মিলনায়তনে’ আমি ব্যক্তিগতভাবে উনার উপস্থিতিতেই এ কথার প্রতিবাদ করেছিলাম। আমার কথা ছিলো, “এ দেশের মানুষ ইসলাম চায়, এটি ঠিক। তবে, তারা ইসলামকে ঠিক মতো বুঝে না। ‘ইসলামী আন্দোলনের ধারণা’ তাদের কাছে অপরিচিত। মানুষকে ইসলাম না বুঝিয়ে দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া হলো মাটি প্রস্তুত না করে দালান নির্মাণের চেষ্টা করার মতো পণ্ডশ্রম মাত্র।”

বর্ণপ্রথা হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য সাম্যবাদী ধর্ম হিসাবে ইসলামকে আমাদের পূর্বপুরুষগণ গ্রহণ করেছিলো। এ কথা আগেই বলেছি। এর থেকে ধারণা হতে পারে, আকীদাগত পরিশুদ্ধিই এ দেশে ইসলামের জন্য কাজের প্রধান ক্ষেত্র। ধারণাটা আংশিক সত্য। আংশিক সত্য বললাম এ জন্য, এ ধরনের সমস্যা দেশের বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য অধিকতর সত্য হলেও এ দেশের উঠতি মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ও শহুরে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য ততটা রিলেভেন্ট নয়। তাদের সমস্যা নিছক ইসলাম না বুঝার সমস্যা নয়। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় একজেক্টলি বলা না গেলেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে পাশ্চাত্য বস্তুবাদী ও সমাজতান্ত্রিক নাস্তিক্যবাদী চিন্তাচেতনার বিরাট নেতিবাচক প্রভাব মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। এটি ইসলাম না বুঝার সমস্যা নয়। বরং এটি ইসলাম না মানার সমস্যা। এই মানা, না মানার বিষয়কে রিচুয়েলিস্টিক দৃষ্টিতে দেখলে, আমার কথার সাথে কারো একমত না হওয়াই স্বাভাবিক।

এ দেশের মানুষ এত নামাজ পড়ে, এত বেশি সংখ্যক হজ্জ করে, এতো কোরবানি দেয়। যেন তারা তেমন ঈমানদার। আসলে তা নয়। ইসলামকে জীবনবোধ ও স্বতঃস্ফূর্ত জীবনাদর্শ হিসাবে দেখার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখলে যে কেউ একমত হবেন, এ দেশে ইসলাম নিয়ে মানুষের স্ববিরোধ এবং ইসলাম না বুঝার সাথে সাথে ইসলামকে ইসলামের মতো করে না মানার সমস্যাটাও অতীতের তুলনায় অনেক প্রকট।

এই বিরাট ফাটল মেরামত করার দিকে নজর দেয়ার ফুরসত জামায়াতের নাই। তারা দিনরাত আওয়ামী লীগকে মোকাবিলায় ব্যস্ত। ভুল রাজনৈতিক কৌশলের পরিণতিতে অহেতুক লেগে গিয়ে এখন যুক্তি দিচ্ছে, আমরা নির্যাতিত! মক্কী যুগ পর্যায়ের এ দেশে অপরিণামদর্শী মোকাবিলায় লিপ্ত হয়ে উল্টো নবী-রাসূলদের মোকাবিলা তত্ত্বের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সরলপ্রাণ ও নিরীহ জনশক্তিকে আনুগত্যের নেশায় তারা বুঁদ করে রাখছেন! শিক্ষিত জামায়াত কর্মীরাও ভুল রাজনৈতিক কৌশলের বিষয়ে বলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ ও ‘মোকাবিলা তত্ত্বে’ আশ্রয় নেন।

জামায়াতের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অন্যতম হলো ভুলভাবে উপস্থাপিত মোকাবিলা তত্ত্ব। তারা বলেন, ‘হক ও বাতিলের লড়াই অনিবার্য ও চিরন্তন। এবং জামায়াত এই লড়াইয়েই আছে।’ নিজেদের ভুল রাজনীতিকে লেজিটিমেইট করার জন্যই তারা এমন ধরনের অবাস্তব কথাবার্তা বলে থাকেন। আচ্ছা, বাংলাদেশে এখনো লক্ষ লক্ষ জামায়াত নেতা-কর্মী-সমর্থক সরকারী-বেসরকারী চাকুরি করেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে স্থানীয় মসজিদের ইমামগণ রয়েছেন। তারা যদি আগামীকাল স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে গিয়ে জামায়াতের পক্ষে বর্তমানে অতি সংবেদনশীল অথচ সত্য – এমন কিছু কথা বলেন, তখন কী ঘটতে পারে? অবভিয়াসলি তারা নানা রকমের হয়রানি ও ক্ষতির শিকার হবেন। তাই না? তো, কনফ্লিক্ট থিওরিই যদি সত্য হয়, ইসলামিক্যালি তাদের তো তা-ই করা উচিত। কী বলেন?

হক-বাতিলের দ্বন্দ্বটা মূলত তাত্ত্বিক। বাস্তবে বা ব্যবহারিক জীবনে সবসময় এই তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন না ঘটানোই বরং সুন্নাহর দাবি। রাসুলুল্লাহর (সা), এমনকি, মাদানী জিন্দেগীতেও এর নিদর্শন দেখা যায়। যেমন নানা ধরনের সমঝোতা চুক্তি ইত্যাদি। মদীনা সনদও এ ধরনের একটা প্র্যাকটিক্যাল এপ্রোচ। ইসলামে হেকমত বা কার্যকর কর্মকৌশল গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। কপটতা, ফেতনা বা হঠকারিতাকে নিষেধ করা হয়েছে।

সোজা কথায়, শেষ কথা হিসাবে বললে, আস্তিকতা-নাস্তিকতা সংক্রান্ত ইস্যুগুলো এ দেশের তরুণ মানসের মৌলিক সংকট। মক্কীযুগের সূরাগুলোর আলোকে আল্লাহ আছে কি নাই, আল্লাহ থাকার মানে কী, তাওহীদ বিশ্বাসের ব্যবহারিক তাৎপর্য কী – এখনকার আকীদাগত আলোচনায় এসব বিষয়কে ফোকাস করতে হবে, অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ইল্লা মাশাআল্লাহ, ইনশাআল্লাহ ধরনে হয়-হবে ধরনের রেটরিকের পরিবর্তে পাশ্চাত্য নারীবাদের মোকাবিলায় নারীর মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র ও পদ্ধতি কী হবে তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখিয়ে দেয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতিতে আপনি কী করবেন, কীভাবে করবেন, সংস্কৃতির বিশেষ করে বিনোদন সংস্কৃতির ব্যবহারিক অবয়ব কী হবে, নাগরিক সমস্যাগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করবেন, এসব নিয়ে সিরিয়াসলি এনগেজ না হয়ে প্যানাসিয়া (সর্বরোগ বটিকা) হিসাবে খালি ‘ইসলাম’, ‘ইসলাম’ জপ করলে হবে না।

রাজনীতি দিয়ে সব হয় না। এটি বুঝতে হবে। জামায়াতে ইসলামী অনুসৃত সর্বব্যাপী রাজনৈতিকীকরণ পন্থা যে চরম ভুল, তারা ছাড়া বাদবাকী সবাই এটি বুঝতে পারে। জামায়াতে ইসলামীর লোকজন বিশ্বাস না করলেও এটি সত্য, বামপন্থীদের মধ্যকার উগ্র ধর্মবিদ্বেষীরা ছাড়া দেশের সব রাজনৈতিক পক্ষই চায় জামায়াতের মতো একটা মডারেট ইসলামী ফোর্স ময়দানে হাজির থাকুক।

আরবে তৎকালীন ইয়াসরিবের এ ধরনের পলিটিক্যাল ভ্যাকুয়াম বা হেজিমনিকে আল্লাহর রাসূল (সা) কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। মক্কায় জীবন বিসর্জনের জন্য বসে থাকেন নাই। সিস্টেম ম্যানেজমেন্টের এই সুযোগকে জামায়াত কাজে লাগাতে আগ্রহী নয়। তারা সব কিছুকে স্বীয় সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের বাইনারিতে দেখে। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করা, সুদূরপ্রসারী কর্মকৌশল গ্রহণ, এমনকি টাইম-টু-টাইম নিজেদের কাজকর্মের স্বচ্ছ পর্যালোচনা করার ব্যাপারেও তাদের একান্ত অনীহা। স্ববিরোধী কথার ফুলঝুরি দিয়ে ধর্মবাদিতার এক ধরনের আবেশের মোহে লক্ষ্যহীন মোকাবিলার অর্থহীন ঔদ্ধত্যই জামায়াত রাজনীতি সম্পর্কে শেষ কথা।

(“জামায়াতে ইসলামী: অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন” গ্রন্থের ১ম সংস্করণে সংকলিত সর্বশেষ নিবন্ধ হিসাবে ২০১৬ সালের অক্টোবরে লিখিত।)

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *