চাই, আলেমরা হোন জ্ঞানী সম্প্রদায়; বন্ধ হোক হেদায়েত বিতরণের নামে অর্থ উপার্জনের সব উৎকট মওকা

[ওয়াজ মাহফিলের নামে বাড়াবাড়ি নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার দিতে গিয়ে এ ব্যাপারে আমার নিম্নোক্ত মতামত তুলে ধরেছি।]

আমরা জানি, ধর্মীয় যাজকদের কাজ হলো পরমসত্তা ও ব্যক্তিসত্তার মাঝে মধ্যস্থতা করা। সব ধর্মের মধ্যেই তাই যাজকতন্ত্রের অবস্থান শক্তিশালী। ইসলাম ‘ধর্ম’ অনুসারে আল্লাহর সাথে বান্দার, বিশেষ করে ইবাদতের সম্পর্ক ওয়ান-টু-ওয়ান ও ইমিডিয়েট। সরাসরি। সূরা বাকারার ১৮৬ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “(হে নবী) আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞাসা করে (তখন বলো) আমি নিশ্চিতভাবেই তাদের অতি নিকটে। যে কোনো আহ্বানকারীর আহ্বানে আমি (অতি সত্বর) সাড়া দেই।” উসিলা হচ্ছে সৎকর্ম। সুপারিশ মাত্রই আল্লাহ তায়ালার পূর্বানুমতি সাপেক্ষ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখানকার তথাকথিত আলেম সমাজ জ্ঞানের দিক থেকে বিশেষজ্ঞ হিসাবে গড়ে উঠে নাই। উনাদের দৃশ্যমান ভূমিকা যাজকের (priest)। ব্যতিক্রম বাদে পাদ্রী, পুরোহিত, ভান্তে, রাব্বি ও যাজকের মতো আলেমরাও বাংগালী মুসলিম সমাজে এক ধরনের কায়েমী স্বার্থগোষ্ঠী হিসাবে নিজেদের ভাবমূর্তি ও অবস্থান তৈরি করেছে। অথচ, এবাদত ও দাওয়াতে দ্বীন কারো রুটি-রুজির উপায় হতে পারে না।

ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হিসাবে ভূমিকা পালনের ব্যবস্থা তথা যাজকতন্ত্র এবং কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসাবে গড়ে উঠা ও ভূমিকা পালনের ব্যবস্থা তথা থিংকট্যাঙ্ক বা এক্সপারটাইজ সিস্টেম – এ দুটির প্রথমটিকে ইসলাম বাতিল করেছে এবং দ্বিতীয়টির উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। দিনে দিনে ওয়াজ মাহফিলের ভয়াবহ অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ওয়াজ মাহফিল হোক। কিন্তু শব্দদূষণ বন্ধ হোক। জোর করে হেদায়াত বিতরণের এই দস্যুপনার বিরুদ্ধে আসুন সোচ্চার হই।

এ প্রসঙ্গে আর একটা কথা বলা জরুরি মনে করছি। তাফসিরুল কোরআন ও ওয়াজ মাহফিলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক আছে, আমরা জানি। এর অন্যতম হলো, ওয়াজ ও তাফসির মাহফিলের মতো ধর্মীয় সমাবেশগুলোর কারণে সামাজিক মূল্যবোধের ধ্বস ঠেকানো ও নৈতিক শৃংখলা রক্ষা করা সম্ভবপর হচ্ছে। কলেজ-ইউনিভার্সিটিগুলোতে যে হারে কথায় কথায় কনসার্টের নামে রং মারামারি ও নর্তন-কুর্দনসহ পাগলামোপূর্ণ গণহিস্টিরিয়ার চর্চা হয় তা এতদিনে ক্যানসারের মতো দেশের আনাচে কানাচে অবাধে ছড়িয়ে পড়তো, যদি ওয়াজ মাহফিলের এই ‘সামাজিক চাপ’ তথা কাউন্টার-থ্রেটটা না থাকতো।

ধর্মীয় সেনসিটিভিটির কারণে পুজা মণ্ডপ ছাড়িয়ে মানুষের কান ঝালাপালা করা বিরক্তিকর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বলা যাবে না, বৃহত্তর ইসলামপ্রিয় জনগোষ্ঠী নাখোশ হওয়ার ভয়ে যখন তখন যেখানে সেখানে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত মাইক লাগিয়ে ওয়াজ ও তাফসির মাহফিল আয়োজনের বিরুদ্ধে বলা যাবে না, রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার কারণে গলা ফাটানো, কান ফুটানো ধুম-ধারাক্কাভাবে জাতীয় দিবস উদযাপনের বিরুদ্ধে বলা যাবে না, প্রগতিশীলতা ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকায় যত্রতত্র অবাধভাবে আয়োজিত দেশীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধবিরোধী তথাকথিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে বলা যাবে না– এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির অবনতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা ভাবতেই গা শিউরে উঠে।

তাই কে কী মনে করছে তার তোয়াক্কা না করেই জোর গলায় দাবি তুলতে হবে, মাইকের ব্যবহার সমাবেশস্থলের বাইরে আসতে পারবে না। আইন-শৃংখলার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে এটি সভ‍্যতা, ভব্যতা ও কাণ্ডজ্ঞানের ব্যাপার। বাংগালীদের সিভিক সেন্স বা সামাজিক নৈতিকতার জ্ঞান অতি দুর্বল।

A Muslim is meant to speak the truth though it is bitter or unwanted. সত্য বলার ক্ষেত্রে তাই আমাদের অকপট ও উচ্চকণ্ঠ হওয়া উচিত। আদর্শই যেটাই হোক, আদর্শ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো সমাজে মানুষের মধ্যে মৌলিক মানবীয় গুণাবলীর গড়পরতা উন্নয়ন। বুদ্ধিজীবীদের জনসম্পৃক্ততা থাকা ভালো। এরমানে এই নয়, তারা সবসময় লোকপ্রিয়তার পিছনে ছুটবেন। কিংবা, মানুষ ভুল বুঝবে, বা ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ আসবে বলে সাদাকে সাদা না বলে অফহোয়াইট বলবেন, কালোকে কালো না বলে গাঢ় ধূসর বলবেন। এমন একটা দায়বোধ বা অনুভূতি থেকে লেখাটা শেয়ার করছি।

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *