সার্বভৌমত্ব প্রসংগে ফরহাদ মজহার ও আমাদের চিন্তার সংকট

ফরহাদ মজহার। আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন ব্যক্তি। মতাদর্শগত দিক থেকে বিরোধী পক্ষের হলেও কর্মপ্রচেষ্টার দিক থেকে যিনি আমার কাছে একজন অনুকরণীয় ব্যক্তি। উনার মতো এতদিন অ্যাক্টিভ থাকবো কিনা, আদৌ বাঁচবো কিনা, সন্দেহ। এই বয়সেও যেভাবে এমনকি বিপরীত আদর্শের লোকদেরকেও তিনি নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছেন, এটা বিস্ময়কর। এমেইজিং! দ্যাটস হোহাই, আই স্যালুট হিম।

২৩ অক্টোবর, ২০১৮ তারিখে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেছেন,

“আধুনিকতার দোষে দুষ্ট কওমি তরুণদের একাংশের কারনে দেওবন্দী শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যে বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। … দ্বীনি শিক্ষা ইসলামের দৃষ্টিতে একমাত্র আল্লাহ তালার সন্তুষ্টি ছাড়া আর কারো স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়।

যে আধুনিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা সনদ গ্রহণ করবে, সেই রাষ্ট্র আল্লাহকে নয়, নিজেকেই সার্বভৌম গণ্য করে।

যে সার্বভৌম শক্তির সনদ নিয়ে কওমি মাদ্রাসার তরুণরা ‘স্বীকৃত’ হবে সেটা আল্লার সন্তুষ্টি বিধান নয়, বরং আল্লার বিকল্প আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি।”

৮ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে ‘ইসলাম প্রশ্ন ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি’ শীর্ষক এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেছেন,

“কোরান হাদিস সারাজীবন পড়লেও পর্যালোচনার ক্ষমতা বা বোঝাবুঝির চর্চা যদি বিকশিত না হয় – অর্থাৎ দার্শনিক বিচারে অক্ষমতা থেকে যায়, তাহলে এই ধরনের দুর্দশা ঘটতেই থাকবে। … আমার আগ্রহ দর্শন বা ভাব চর্চায়।

আধুনিক রাষ্ট্রের ‘সার্বভৌমত্ব’ সংক্রান্ত দাবি মওলানা (ভাসানী) অস্বীকার করেন, কারন তা আল্লার সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।”

এরপর ২৪ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে শিরোনামবিহীন আর একটা ফেইসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলছেন,

“গণতান্ত্রিক হোক কিম্বা অগণতান্ত্রিক, তথাকথিত আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার ধারণা মূলত খ্রিস্টিয় ধর্মতাত্ত্বিক অনুমান ও চিন্তার ওপর দাঁড়ানো।

ইসলাম কোন ব্যাক্তি বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না। খ্রিস্টিয় রাষ্ট্রের গায়ে ইসলামি জোব্বা পরিয়ে যারা ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়, কিম্বা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা চর্চার হাতিয়ার হতে চায় তারা মূলত আল্লার সার্বভৌমত্বের বিপরীতে ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার পক্ষে দাঁড়ায়।”

কী বুঝলেন? গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে উনার এই অভিমত খেয়াল রেখে এবার আমরা দেখি ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র’ বইয়ে ইতোপূর্বে তিনি কী বলেছিলেন। ‘গণতন্ত্রের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের মৌলিক সংঘাতটা কোথায়?’ শীর্ষক আর্টিকেলে তিনি বলেছেন,

“গণতন্ত্র’ বলতে এই যে ধারণা, এই ধারণার ভিত্তিতে কোন্ মুখে আমরা জামায়াতে ইসলামীর মত প্রকাশের অধিকার ও রাজনীতি করার অধিকারের বিরোধিতা করি?… গণতন্ত্রের এই সংজ্ঞার ভিত্তিতে জামায়াত যদি আল্লার শাসন কায়েম করতে চায় আর কাফেরদের জবাই করতে চায়, তাহলে কোন্ যুক্তিতে জামায়াতের এই পরিকল্পনার আমরা বিরোধিতা করি?

গণতন্ত্রের এই প্রাণধর্মের দিক থেকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের রাজনীতিকে একবার বিচার করলেই আমরা দেখব যে, মৌলিক সংঘাতটা এখানে গণতন্ত্রের প্রাণধর্মের সঙ্গেই। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির মনে করে না জনগণ সার্বভৌম। তারা বলে আল্লাহ হচ্ছেন সার্বভৌম।

গণতন্ত্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কটা বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ধর্মের ‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়। এই সৃষ্টিজগতের শর্ত হচ্ছেন আল্লাহ, বা আমাদের অস্তিত্বের শর্ত হচ্ছেন তিনি, এই অর্থে আল্লাহ অবশ্যই সার্বভৌম। কারণ দুনিয়া মানুষ সৃষ্টি করে নি, এর সৃষ্টিকর্তাও তিনি। এবং আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই। কিন্তু আমাদের তিনি সৃষ্টি করেছেন ইচ্ছা ও বিবেক সম্পন্ন করে। এই ইচ্ছা বা বিবেককে ব্যবহার করার সার্বভৌম ক্ষমতাটাও তিনি আমাদেরকে দান করেছেন।

ইসলাম যখন বলে ‘আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথা নোয়াবে না’, তখন একথাটার পার্থিব তাৎপর্য দাঁড়ায় এই যে, ব্যক্তির ওপর অন্য কারো খবরদারি বা একনায়কী শাসন ইসলাম বরদাশত করে না।”

একই বইয়ে ‘জামায়াত রাজনীতির অগণতান্ত্রিকতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি আরো বলেছেন,

“যদি ব্যক্তি হিশাবে আমার ইচ্ছা ও বিবেকের কোনো সার্বভৌমত্ব না থাকে তবে আমি প্রতি মুহূর্তে প্রতি পলে প্রতি দণ্ডে যা করছি তা আল্লারই ইচ্ছা। পাপপূণ্য সবকিছুই। যদি তাই হয় তাহলে আল্লার ইচ্ছার কারণে কৃত পাপের জন্য মানুষকে কেন দোজখে যেতে হবে? এই ছোট্ট যুক্তিটা বুঝতে পারলেই জামায়াতের সমস্যাটা ধরা পড়বে।

মানুষের ইচ্ছা ও বিবেক যে-অর্থে সার্বভৌম, ইসলাম আল্লাহকে সে-অর্থে সার্বভৌম মনে করে না। ব্যক্তি মানুষের সার্বভৌমত্বকে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের সঙ্গে এক করে ফেলা হচ্ছে এক ধরনের শেরেকি – একটি জঘন্য অনৈসলামিক কাজ। এই শেরেকির দোষে জামায়াত অপরাধী।

মানুষের ইচ্ছা ও বিবেকের সার্বভৌমত্ব যেহেতু ইসলাম অবশ্যই স্বীকার করে অতএব মানুষের করে অতএব মানুষের তৈরি সংবিধান, আইন ও প্রশাসনিক কানুনও ইসলামের কাছে সাদরে গ্রহণযোগ্য, যদি তা ন্যায় বিচার, মানুষের কল্যাণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আল্লার কাছ থেকে যে জ্ঞানের শিখা নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে এসেছে মানুষের তৈরি সংবিধান, আইন ও শাসন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তারই ক্রম বিকাশ ঘটে। মানুষের ইচ্ছা ও বিবেকের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিপ্রকাশের মধ্য দিয়ে মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে যেতে থাকে। জামায়াতে ইসলামী আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও ব্যক্তি মানুষের সার্বভৌমত্বকে এক করে ফেলে এ কারণে যে তারা ইসলামের একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়।”

শেষ পর্যন্ত কী বুঝলেন?

সমকালীন বাংলাদেশে বৃদ্ধিবৃত্তির হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা শ্রদ্ধেয় ‘ফরহাদ ভাই’-এর এ রকম পল্টিমারা কথাবার্তা নিয়ে আমরা কদিন আগে এক খোলামেলা আলাপের ব্যবস্থা করেছিলাম। আড়াই ঘণ্টার এই আলোচনা পুরোটা শোনার পরে এ সংক্রান্ত বিষয়ে যে কারো ভুল ধারণা নিরসন হওয়ার কথা। ‘ঈমানদারদের’ কথা অবশ্য ভিন্ন। উল্লেখ্য, মূল আলোচনায় উদ্ধৃতিসমূহ আরো বিস্তারিতভাবে পঠিত হয়েছে।

ইউটিউবে আমার ‘সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন’ চ্যানেলে এটি আপ করা আছে। ডাটা আর সময় থাকলে দেখেন। বিফলে মূল্য ফেরত …!

১ম পর্ব

২য় পর্ব

দুই পর্ব একসাথে

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *