পজিশন নয়, কন্ট্রিবিউশন; সুখী দেখানো নয়, সুখী হওয়া

পারিবারিক জীবন সম্পর্কিত পজিটিভ নিউজ এন্ড পিকচার্স হরহামেশা প্রচার করার ব্যাপারে আমার কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে। অতীত সাংগঠনিক জীবনে যেসব পরিবারকে আদর্শ মনে করেছি, পরবর্তীতে নানাভাবে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে দেখেছি, যেভাবে তাদের পারিবারিক সুখ, সাফল্য এবং উৎকর্ষতার কথা দায়িত্বশীলগণ সময়ে সময়ে আমাদেরকে বলতেন সেগুলো আসলে অনেকটুকুই ফেইক, প্রজেক্টেড এন্ড আনরিয়েল।

বিভিন্নজনকে ব্যক্তিগতভাবে কাছ থেকে দেখেছি, যখন তাদের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছে তখন নানাভাবে তারা পাড়াপড়শি, আত্মীয়-স্বজন ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে নিজেদের মধ্যকার সুসম্পর্কের ফেইক প্রজেকশন এবং ফেইসবুকে সুখী সুখী ছবি পোস্ট করার মাধ্যমে আত্মপ্রবঞ্চনায় ব্যস্ত।

এ প্রসঙ্গে আর একটি কথা বলতে চাই। বাস্তব সামাজিক জীবন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের পেশাগত জীবনের হরেক রকম উৎকর্ষতার প্রচারণা দেখলে আমি খুব হতাশা বোধ করি। কারণটা হলো এই আয়াত:

“তোমরা জেনে রেখো, ক্রীড়া-কৌতুক, সাজসজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও জনের প্রাচুর্য ব্যতীত পার্থিব জীবন আর কিছু নয়, যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও, এরপর তা খড়কুটা হয়ে যায়।” (সূরা হাদীদ: ২০)

বিশেষ করে যারা সেলিব্রেটি হয়ে উঠছেন তাদের জন্য এটি বিশেষ সতর্কবাণী। হুমায়ূন আহমেদ বই-নাটক বেচার জন্য হোক বা আর যে কারণেই হোক না কেন, নিজের পারিবারিক জীবনকে যেভাবে গণমানুষের কাছে প্রজেকশন করেছেন, তা পরবর্তীতে উনার জন্য মোটেও সুখকর হয়নি। এটি শিক্ষণীয়।

তাই, সুখ-শান্তি বজায় রাখার জন্য নিজের একান্ত পারিবারিক বিষয়গুলোকে যথাসম্ভব নিজেদের মধ্যে কনফাইন্ড রাখুন। নিজেদের একান্ত অনুভূতি ও সময়গুলোকে পাবলিক করবেন না। এতে করে আপনার অনুভূতিগুলো গভীরতা পাবে। বেঁচে থাকবে। সতেজ হবে। জীবনের গভীরতর একান্ত অনুভূতিগুলো এতটাই নাজুক যে যখনই আপনি এগুলোর প্রকাশ ঘটাবেন তখনই সেগুলোর গভীরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

নিজের উজ্জ্বল পেশাগত জীবনের সাফল্যগাঁথা বলে বেড়ানো যেন নিজেকে বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকার মতো বাণিজ্যিক ভাবমূর্তিতে হাজির করা। নিজেকে আমি কখনো ওভাবে ভাবতে পারি না। আল্লাহ মাফ করুক।

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Mohammed Shah Alam: আমরা আমাদের বিগত কীর্তিমান পুরুষদের এমনভাবে হাজির করি, স্মরণ করি যে, তাদের মানবিকতা বা ‘মনুষ্য’ বৈশিষ্ট্যগুলো মুছে ফেলি, ভুলে যাই। ফলে তাদের গল্প আমাদের গৌরব দেয় শুধু, কিন্তু তারা আমাদের অনুকরণযোগ্য থাকে না। কারণ আমরা ‘মানুষ’।

M Mashiur Rahman Salim: Thanks for the writing, some people in social media are suffering from Narcissus syndrome.

Mohammad Mozammel Hoque: প্রকৃতিগত কারণে মেয়েরা ব্যক্তিগতভাবে নার্সিসিস্ট হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত জীবনে আমিও বোধকরি খানিকটা নার্সিসিস্ট। কিন্তু সামাজিক জীবনে তথা পাবলিক লাইফে নার্সিসিজম নিতান্তই অশোভন ও অনাকাঙ্ক্ষিত এবং ব্যক্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর। এর পরিবর্তে সামাজিক জীবনে বা পাবলিক লাইফে আমি সেলফ-ব্র্যান্ডিং নীতিতে বিশ্বাসী। বুঝতেই পারছেন, বাহ্যত কাছাকাছি মনে হলেও নার্সিসিজম এবং সেলফ-ব্র্যান্ডিং, দুটো স্বতন্ত্র বিষয়। প্রথমটি নিছকই অহংকারবশত আত্মপ্রচার। দ্বিতীয়টি হলো নিজের নীতিগত বা আদর্শগত অবস্থানকে সোশ্যাল লাইফে ক্লেইম করা।

Md Nayem Uddin: ধন্যবাদ। আপনার উপদেশগুলো পালন করবো। আজীবন। কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা অবিরাম।

Mohammad Mozammel Hoque: উপদেশ নয়, বলতে পারেন আত্মসমালোচনা।

Jahid Razan: Meanwhile in planet earth: Shoppers are buying clothes just for the Instagram pic, and then returning them

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *