চিটাগাং ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা ২০১৬: না পারতে বলা কিছু তিক্ত কথা

আজ ডিউটি ছিলো আর্টস ফ্যাকাল্টির একটা রুমে। ৮৩ জনের মধ্যে ৭৮ জনই হাজির। শিক্ষক আমরা চারজন। বরাবেরর মতোই ‘জিরো-টলারেন্স নীতি’ অনুসরণ করে ডিউটি করছি।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১০ মিনিট আগে একজন কর্মচারী একটা চিরকুট নিয়ে হাতে দিলো। ‘স্যার’ নাকি পাঠিয়েছেন। প্রশ্নের কারেকশান। দেখেন কারবার! পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১০ মিনিট আগে প্রশ্নের কারেকশান! যারা ইতোমধ্যে ভুল বুঝে ভুল উত্তরের বৃত্ত ভরাট করে ফেলেছে তাদের ক্ষতিটা কীভাবে পূরণ করা হবে?

জানি না, চবির সমাজবিজ্ঞান অনুষদ করবে কিনা। শুনলাম, এ রকম ক্ষেত্রে নাকি যারাই এ ধরনের ভুল প্রশ্ন টাচ করেছে, যে উত্তরই দিক না কেন, সবগুলো অপশনকে সঠিক ধরে নম্বর দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু, তাতে করে একটা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যারা আসলে উত্তরটা পারতো না তারা একটা এক্সট্রা বেনিফিট পেয়ে যাচ্ছে না? এবং, প্রশ্নে ভুল না হলে যারা এটি এমনিতেই পারতো, এ ধরনের এভারেজ মার্কিংয়ে তারা কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হলো না? ভর্তি পরীক্ষায় এক নম্বরের ব্যবধান কমপক্ষে কয়েক শ’তে গিয়ে ঠেকে।

যা হোক, আমার বিভাগেরই এক সহকর্মী পাশের রুমে ডিউটি করছিলেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে আমি উনার রুমে গিয়ে দেখি, দুজন ইনভিজিলেটর বসে আছেন আর দুজন ইনভিজিলেটর একপাশ হতে OMR শীটগুলো কালেকশান করছেন। আর অন্যপাশে স্টুডেন্টরা ‘মনের সুখে’ বৃত্ত ভরাট করছে। আমি ওদের ধমক দিয়ে দ্রুত ৮-১০টা ওএমআর নিয়ে উনাদের দিলাম।

এবার চারজন পরিদর্শকই ওএমআর গোনা শুরুছেন। ওদিকে, এক শিক্ষক পেছনের কয়েক বেঞ্চের ওএমআর নেনই নাই। বুঝতেই পারছেন, ওইসব ‘ভাগ্যবান-ভাগ্যবতী’ স্টুডেন্টরা পরস্পরের সাথে শলাপরামর্শ করে না পারা প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর জেনে নিয়ে ঝটপট বৃত্ত ভরাট করছে। তা দেখে আমি কুইকলি সেদিকে গিয়ে আরো ১০-১২টা ওএমআর কালেকশান করে উনাদেরকে টেবিলে নিয়ে দিলাম। এরপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে ওই রুম হতে বের হয়ে সোজা হাঁটা দিলাম। সাথে উক্ত সহকর্মী।

আমার এ ধরনের ‘আগ্রাসী আচরণে’ বিব্রত সেই কলিগ সহপরিদর্শকদের উপর খুবই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এ রকম বাজে ডিউটি আমার জীবনে দেই নাই। যে দুজন সিনিয়র টিচার ডিউটিতে ছিলেন, তারা সারক্ষণই নিজেরা কথাবার্তা বলেছেন। হাসাহাসি করেছেন। সারা রুম, পুরো এক ঘণ্টা, একটুও না বসে, হেঁটে হেঁটে আমি পরিদর্শন করেছি।’

একটা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এ রকম অসম পরিদর্শন ব্যবস্থা যে কত বড় অন্যায়, জুলুম, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমার রুমে ডিউটি দেয়া এক সহকর্মী প্রসঙ্গত বললেন, ‘স্যার, আমি ভিডিও করে রেখেছি। রীতিমতো ‌৭১’র রিফিউজি ক্যাম্পের মতো অবস্থা। টিচাররা বাসের জন্য যাত্রী ছাউনির যে পাকা বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করে, সেখানে এক স্টুডেন্টের বাবা তার মেয়েকে ফ্যাকাল্টি বিল্ডিং পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে আছেন। সারারাত জার্নি করে উত্তরবঙ্গ হতে এসেছেন। পরীক্ষার পরপরই আবার ঢাকা ছুটবেন।’

পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পরিবারের একজন হিসাবে নিজের এই অনৈতিক অবস্থানের জন্য, নিরুপায় অভিভাবকদেরকে এভাবে কষ্ট দেয়ার জন্য, এ ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ ভর্তি প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ততার জন্য অতীব লজ্জাবোধ করছি।

মাঝে মাঝে ভাবি, এই ধরনের ডিউটিকে রিগ্রেট করি। একবেলা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য নাইবা পেলাম একুশ শ’ টাকা! আবার ভাবি, আমার মতো পরিচিত ও পুরনো শিক্ষকের এহেন আচরণে কর্তাব্যক্তিরা অফেন্ডেড ফিল করতে পারেন। তাছাড়া, তাতে করে অন্তত আরো একটা কক্ষে নিম্নমানের পরিদর্শনের ‘সুযোগ’ তৈরি হবে। “… যতক্ষণ এ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে সরাব এ পৃথিবীর জঞ্জাল, তারপর…”

বাংলাদেশে বসে আন্তর্জাতিক পরীক্ষাগুলোতে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করছে। উত্তীর্ণ হচ্ছে। নিজ জেলা শহরের কেন্দ্রে বিসিএস ও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আমাদের ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করছে। তাহলে, নিজ নিজ এলাকায় বসে ঢাবি, চবি, জাবি, রাবির ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে সমস্যা কী?

একটা সমন্বিত উচ্চতর শিক্ষার ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠান আজ জাতীয় দাবি। ঠুনকো অহমিকা পরিহার করে জাতীয় ও মানবিক দায়বোধ নিয়ে ব্যাপারটা বিবেচনা করলে পরীক্ষায় মান বজায় রাখাসহ আনুষাঙ্গিক টেকনিক্যালিটিসমূহ সামাল দেয়া নিছক সদিচ্ছা ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপার।

ফেসবুকে প্রদ্ত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Mohammad Isha: ধন্যবাদ সাহসিকতার সাথে সত্য কথাগুলো তুলে ধরার জন্য।

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, ঈসা ভাই, সত্য, সাহসিকতা, নৈতিকতা ও এসবের কারণে ঝুঁকিগ্রস্ত থাকা – এতো আমার পুরনো পরিচয়। যেভাবে আপনারা গত তিন দশক থেকে দেখেছেন। দোয়া করবেন।

যাদের পক্ষে জীবন বাজি রেখেছিলাম, এত বড় প্রবলেমের বিষয়ে উনারা কই? সব কি রাজনীতি? এর বাইরে ইসলাম নাই?

Arif Moinuddin: স্যার, সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা আজ সময়ের দাবী /// কিন্তু শুনার মানুষ নেই//

Mohammad Mozammel Hoque: কেন, এই যে আপনি শুনছেন। এভাবে বলতে বলতে এক সময়ে পদ্ধতির আমুল সংস্কার হবে। নিশ্চিত। যত বেশি বলা হবে, তত তাড়াতাড়ি এটি ঘটবে। এক সময়ে তো আরো সমস্যা ছিলো।

Salim Uddin: Excellent report on our higher education system. Thank you sir for your professionalism and dutifully mentality.

Mohammad Mozammel Hoque: আমি ব্যক্তিজীবনে ইমানুয়েল কান্ট প্রস্তাবিত সার্বজনীন নৈতিকতার ধারণাকে অনুসরণ করি।

Abdul Alim Masud: স্যার, আমার একটা পরামর্শ ছিল। তা হচ্ছে, প্রতিটি প্রশ্ন পত্রে কিছু ভুল উত্তর সম্পর্কিত প্রশ্ন রাখা যে সবের উত্তর হবে ১ লাইনের এবং OMR এর নীচের অংশে কিছু জায়গা রাখা যেখানে শিক্ষার্থী চাইলে সন্দেহজনক প্রশ্নের উত্তর লিখে দিতে পারবে।

Mohammad Mozammel Hoque: প্রশ্ন যদি মেশিন এক্জামিনেশন না করে ম্যানুয়েলে করতে দেয়া হয়, তা সবচেয়ে ভালো। কিন্তু সেজন্য দরকার উচ্চ নৈতিক মানের শিক্ষক। না হলে, ভেতরে যা-ই লেখুক, নানা কারণে শিক্ষক মহোদয় ভৌতিক নম্বর দিয়ে বসবেন। যা চ্যালেঞ্জ করা যায় না। অতীতে তা হয়েছে। চাকুরীতে জয়েন করার পরে আমরা ডিন অফিসে বসে গোল হয়ে খাতা কাটতাম। সেখানকার অনেক ‘মজার-মজার’ গল্প আছে…!!

Mohammad Alamgir Kabir Nayan: আমরা কমবেশি ব্যাপারটা সবাই বুঝি যে, কর্মক্ষেত্রে আসলে সিনিয়র-জুনিয়র কোন বিষয় নয়। আসল কথা হল দায়িত্ববোধ। যারা সিনিয়র-জুনিয়র বিভেদের ধোঁয়া তুলে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে চলেন তারা যে চরম দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দেন একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার দৃষ্টিতে এর একটাই কারণ, আর সেটা হচ্ছে জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি। জবাবদিহিতা না থাকলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কেন, এমনকি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের একজন চাপরাশিও স্বেচ্ছাচারী হতে বাধ্য। এই অবস্থা চলতে থাকলে সমস্যা আরও বাড়বে বৈ কমবে না।

Mohammad Mozammel Hoque: তুমি সেই নয়ন যে আমাদের পিকিউলিয়ার পরীক্ষা পদ্ধতি ও স্বীয় উদাসীনতার কারণে ক্লাসের সবচেয়ে ভালো স্টুডেন্ট হওয়া সত্বেও অত্যন্ত সাধারণ মানের রেজাল্ট নিয়ে বের হয়েছো। ধনবাদ, সুন্দর মন্তব্য করার জন্য। যোগাযোগ রেখো।

Tariq Shojib: শুকরিয়া, কিন্তু এই লেখা প্রকাশ হবার পরে না জানি কোন ঝামেলা হয়,,

Mohammad Mozammel Hoque: হু, আমিও কিছুটা শংকার মধ্যে আছি। বর্তমান চবি প্রশাসন তুলনামূলকভাবে বেশি সৎ ও আন্তরিক। বিশেষ করে ভিসি ও প্রোভিসি মহোদয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ভালো। অর্থাৎ একজন সিনসিয়ার শিক্ষক হিসাবে উনারা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ভালো জানেন। আশংকাটা হলো উনাদের দলের অতিউৎসাহী স্টলওয়ার্টদের পক্ষ হতে। যারা আমার দুই যুগ আগের রাজনৈতিক ভূমিকাকে এখনো ভুলতে পারেন নাই। আমাকে এখনো সেই দৃষ্টিতেই দেখেন।

যাহোক, বিষয়টা এমন, আমি মনে করি, এটি দলীয় বিষয় নয়। এটি আমার-আপনার-সকলের সমস্যা। আগে তো চবিতে এসে ফরম নিতে হতো। আবার এসে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে ফরম জমা দিতে হতো। এখন তো সব অনলাইনে। এভাবে আশা করি শীঘ্রই বাদবাকী ভোগান্তিগুলোরও অবসান হবে।

Tariq Shojib: নিশ্চয় হবে, আপনার জন্য দোআ রইলো…

শিশির মাহমুদ: স্যার, যদি কিছু মনে না করেন একটা ছোট প্রশ্ন করি! ভর্তি পরীক্ষা ফী বাবদ প্রাপ্ত টাকাটা প্রশাসন কি কাজে লাগায়? আপনারা নিশ্চয় কোন উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে এ পর্যায়ে আসেননি। মেধা ও যোগ্যতা আপনাদের এখানে নিয়ে এসেছে নিশ্চয়! তাহলে কেন একজন দিনমজুর, মুঠে, কৃষকের কষ্টের টাকার মূল্য বুঝেন না! নামমাত্র একটা ফী নিলেই কি হয় না?

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, অনেকেই অতিকষ্টে ভর্তি পরীক্ষার টাকাটা জোগাড় করেন। জানি। পড়ালেখার এত খরচ হলে আমিও হয়তো এ পর্যন্ত পড়তে পারতাম না। আপনার কনসার্নের জন্য ধন্যবাদ ও সুলিখিত মন্তব্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

Sultana Salma: jazakAllah khair sir. ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষ্যে, students & parents-দের যে পরিমাণ কষ্টের সম্মুখীন হতে হয় তা বলাই বাহুল্য!সারা রাত বাসে,ট্রেনে জার্নি করে, সকালে পরীক্ষা দেয়া যে কত কঠিন, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বোঝে না! অথচ নিজ নিজ এলাকায় পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থাকলে, এই কোমলমতি শিক্ষার্থী দের হয়রানি অনেকটাই কমে যেত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমূহ সামান্য গর্ব টাকে পাশে রেখে, একতা ও সমঝোতার সাথে এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে খুব বেশী কি ক্ষতি হত?

সাইফুদ্দীন সাহেদ: আপনারা হাজার চেষ্টা করেও পরীক্ষায়য় দূর্নীতি বন্ধ করতে পারবেন না। কারণ পাবলিক পরীক্ষাগুলো পুরোপুরিই হয় দেখাদেখির মাধ্যমে। পাবলিক পরীক্ষার সিস্টেম ঠিক না হলে ভর্তি পরীক্ষায় হাজার চেষ্টা করেও দূর্নীতি বন্ধ হবে না। আর এদেশের বেশিরভাগ ছাত্রের আত্মমর্যাদাবোধ নেই, অন্যের থেকে দেখা যে চুরি করা তারা এটিও মানে না।

Syed Md Sabbir Hossain: আপনি জীবনে কোন পরীক্ষায় কারো থেকে হেল্প নেন নাই???সবকিছু মুখে বলা অত্যন্ত সহজ, বাট কাজে পরিণত করা অতীব কঠিন!!

সাইফুদ্দীন সাহেদ: আমি নিলে অবশ্যই কমেন্টটা করতাম না!!!

Azad Ali: মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার মত সারা দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্রে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠান করার দাবী করছি বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ ও সরকারের কাছে ।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *