ইসলামে ‘শ্বশুরবাড়ি’ ও ‘যৌথ পরিবার’ বিতর্ক প্রসংগে কিছু মন্তব্য (পর্ব-২)

[কেন দ্বিরুক্তি? ফেইসবুকের নিয়ম অনুসারে কোনো পোস্টদাতা যদি তার লেখাটা মুছে দ্যান তাহলে যারা সেটি শেয়ার করেছেন তাদের টাইমলাইন হতেও সেটি অটোমেটিকেলি মুছে যায়। উক্ত শেয়ারিংয়ের সময় যে ফরোয়ার্ডিং লেখা হয়েছিলো তাও স্বভাবতই হাওয়া হয়ে যায়। সিঙ্গেল ফ্যামিলি বনাম এক্সটেনডেড ফ্যামিলি বিতর্ক প্রসংগে লেখা জনৈক ফারহানা লায়লার এই পোস্টটি আমার টাইমলাইনে শেয়ার করতে গিয়ে ভূমিকা হিসাবে যা লিখেছিলাম তা এডিট করতে করতে এক পর্যায়ে বড় হয়ে যায়। মূলত সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নোট হিসাবে লেখাটাকে পোস্ট করলাম।]

আমার পারিবারিক অভিজ্ঞতা

আমার বাবা গরুর গোশত কিনে এনে আমার মাকে দিতেন। আমার মা ছেলে-মেয়েদের জন্য হাড্ডি ইত্যাদি দিয়ে বেশি করে ঝোল দিয়ে রান্না করতেন। খাস গোশতগুলো দিয়ে আলাদা পাতিলে উনার শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য, চট্টগ্রামের ভাষায় ‘লোছা-লোছা’ করে রান্না করতেন। দাদা-দাদীর মারফতে আমরা ভালো তরকারীর ভাগ পেতাম। শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়, সব কিছুতেই ছিলো মুরুব্বীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমি তো মনে করি না যে, আমার আম্মা শ্বশুর-শাশুড়িকে বিশেষ তাজিম করে ভুল করেছেন। শ্বশুরগোষ্ঠীকে দেখভাল করতে গিয়ে উনার সন্তানদেরকে বঞ্চিত করেছেন, উনি কখনো এমনটা মনে করেন নাই। উনার স্বামী-সন্তানেরাও কখনো নিজেদের বঞ্চিত মনে করে নাই।

রেড হারিং ফেলাসি

কিছু কিছু মর্ডানিস্ট-ইসলামিস্ট যৌথ পরিবার না একক পরিবার – এ সংক্রান্তে আলোচনায় “দেবর-ভাবির পর্দা লংঘন” -এর সম্ভাবনা ও মাত্রাকে হাইলাইট করে বা একে ফোকাল পয়েন্ট বানিয়ে যেভাবে কথা বলেন তাকে ইনফর্মাল লজিকে red herring fallacy বলে। অর্থাৎ, মূল বিবেচ্য বিষয়কে পাশ কাটিয়ে প্রাসঙ্গিক কোনো বিষয়কে সামনে এনে তার বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে সেটিকে খণ্ডনের চেষ্টা করা। এবং এর মাধ্যমে মূল দাবী বা যুক্তিটাই খণ্ডিত হয়েছে এমন দাবী করা।

ওল্ডহোম সিস্টেমের ব্যাপারে অনাপত্তি

পিতা-মাতা ও নির্ভরশীল-পোষ্যদের প্রতি দায়িত্বকে অবহেলা করা প্রাকারান্তরে ইসলামের মূল সামাজিক চেতনাকেই ক্ষুন্ন করার শামিল। একক বা আনবিক পরিবার প্রথা হলো স্বামী-স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আলাদাভাবে বসবাস করা। এর অনিবার্য্য অনুষংগ হলো কোনো না কোনো ফর্মের বৃদ্ধাশ্রম ব্যবস্থা (old home system) সমাজে চালু হওয়া। একটি ইসলামী রাষ্ট্রে ওল্ড হোম থাকতে পারে যাদের কেউ নাই সেসব আপণজনহীনদের জন্য। পাশ্চাত্য ব্রৃদ্ধাশ্রম পদ্ধতি ইসলামের সামাজিক চেতনার পরিপন্থী নয় কি?

না পারা কিংবা না করা বনাম দায়িত্বই না থাকা

পিতামাতার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মানে দেখাশোনা করা সন্তান হিসাবে উপযুক্ত পুত্রের দায়িত্ব হলে এবং তা বিয়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অবস্থায় সমভাবে প্রযোজ্য হলে উক্ত পিতামাতার ওপর নির্ভরশীল-পোষ্যদের যথাসম্ভব দেখাশোনা করার দায়িত্ব কার ওপর বর্তায়? পিতামাতার প্রতি ছেলের দায়িত্বকর্তব্য যদি বিয়ের পরও সমভাবে প্রযোজ্য হয় তাহলে ছেলের প্রধান সহযোগী হিসাবে বউয়ের কর্তব্য কী হবে তা কি আলাদাভাবে বলে দেয়ার দরকার আছে? আমার এই কথাকে বুঝতে হলে “যথাসম্ভব দেখাশোনা করার দায়িত্ব” কথাটাকে যথাযথভাবে বুঝতে হবে। না পারা, না করা ও দায়িত্বই না থাকা – এই তিনটি আলাদা আলাদা বিষয়।

পরিবার ব্যবস্থার নিউক্লিয়াস ও সেল সিস্টেম

পেয়াঁজের খোসার মতো ইসলামে পরিবারের গঠনগত ধারণাটি ক্রমসম্প্রসারণশীল ধরনের। পারিবারিক কাঠামোর সবচেয়ে ইনটিমেইটলি রিলেটেড অংশ বা নিউক্লিয়াস হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। এই সম্পর্কে সন্তানাদিও বহিরাগত বা পরর্ব্তী স্তরের। আবার স্বামী-স্ত্রী-সন্তান নিয়ে যে পারিবারিক ইউনিট সেখানে পিতা-মাতা হলে পরবর্তী নিকটতম আত্মীয় বা স্বজন। স্বামী, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, পিতা, মাতা, নিয়ে যে পারিবারিক কাঠামো ভাই-বোনগণ হচ্ছে সেখানে পরবর্তী স্তরের লোক। স্বামী, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, পিতা, মাতা, ভাই, বোন নিয়ে যে বৃহত্তর পারিপারিক বন্ধন সেখানে চাচারা হচ্ছেন পরবর্তী নিকটতম আত্মীয় বা স্বজন। এভাবে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্কের যে পারিবারিক বন্ধন তা একটি সূচনা বিন্দু-তুল্য। ক্রমে ক্রমে তা একটি বৃত্ত হিসাবে ক্রমসম্প্রসারিত হয় একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত। ইসলামে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির বণ্টন নীতি হলো ইসলামে পারিবারিক সীমানা নির্ধারনের গাইডেন্স।

করণীয়-কর্তব্য হলো পরিস্থিতি নির্ভর

এই পারিবারিক কাঠামোর কেন্দ্র হতে পরিধি পর্যন্ত পক্ষসমূহের অর্থাৎ প্রত্যেক সদস্যের দায়-দায়িত্ব স্পেসিফাইড ও এক্সটেনডেড। কোনো ব্যক্তির কোনো বর্তমান সময়ে তার পারিবারিক ইউনিটের গঠন কেমন হবে, তিনি বা তারা কীভাবে বাদবাকী পারিবারিক সদস্যদের সাথে সম্পর্ক রাখবেন, তাদের প্রতি স্বীয় দায়িত্বকে কীভাবে আঞ্জাম দিবেন তা এক কথায় বা কোনো সাদা-কালো মানদণ্ডে বলে দেয়া সম্ভব না। সংশ্লিষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি অনুসারে এক একটি given situation এ ঠিক করতে হবে what is the best possible thing to do। আইনগত বাধ্যবাধকতাই ইসলামে শেষ কথা নয়। হাশরের দিনে বিচার হবে নিয়ত ও নৈতিকতার ভিত্তিতে। সুতরাং কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োগযোগ্য আইনের ওপর নির্ভর করে কোনটা ইসলামী আর কোনটা ইসলামী নয় তা ঠিক করতে যাওয়া নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক।

স্ত্রীর দায়িত্ব কি শুধুমাত্র স্বামীর জন্য নিজের সতিত্ব ও স্বামী গৃহের আসবাব পত্রের হেফাজত করা?

হাদীসে বলা হয়েছে, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্ত্রীর দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণতম অংশের একটি হচ্ছে এক শিয়াপন্থী শ্রদ্ধেয়’র ভাষায় “স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার গৃহের (গৃহের সম্পদ-এর) হেফাযত করা (যাতে তা চুরি বা বিনষ্ট হয়ে না যায়)।” স্বামী যে পরিবারের এতদিন পুত্র হিসাবে সদস্য ছিলো সে পরিবারের নির্ভরশীল লোকজন বিশেষকরে বাবা-মাও দেখছি কোনো স্বাধীনতাপন্থীদের দৃষ্টিতে স্বামীর পরিবারের আসবাবপত্রের সম-মর্যাদার অধিকারী নয় … !!!

একটা ‘ইরানী সিনেমাকে’ কেন অস্কার দেয়া হলো?

পারিবারিক দায়দায়িত্ব সম্পর্কে আমার দেখা সবচেয়ে ভালো সিনেমাগুলোর একটি হলো ২০১২ সালে অস্কার বিজয়ী ইরানী সিনেমা The Separation। ‘স্বাধীনতাপন্থী’দের এটি দেখা উচিত।

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *