গণতন্ত্র নাকি জিহাদ?

সাম্প্রতিক মিশর পরিস্থিতিসহ দেশ-বিদেশের নানা ঘটনা, ঘাত-প্রতিঘাতের প্রেক্ষিতে আমার মতো অনেক ইসলামপন্থীর মনে প্রশ্ন জাগতে পারে – ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথ হিসাবে কোনটি সঠিক? গণতন্ত্র নাকি জিহাদ? অনেকে গণতন্ত্রের চরম বিরোধী। আবার অনেকেই সরকার পরিবর্তনের অপরিহার্য পন্থা হিসাবে (ইসলাম কায়েমের জন্যও) গণতান্ত্রিক পন্থার একনিষ্ঠ সমর্থক।

মিশরে কী হচ্ছে, তুরস্কে কী হয়েছে, তিউনিশায়র পরিস্থিতি কী, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কী, বাংলাদেশে কী হচ্ছে – এসব বিষয়ে আশা করি কোনো আলোচনার প্রয়োজন নাই। পৃথিবীর সর্বত্র ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে যতসব ষড়যন্ত্র চলছে, ধরে নিচ্ছি সচেতন পাঠকমহল এসব সম্পর্কে অবগত আছেন। সর্বত্রই ইসলাম প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাজনৈতিক ইসলামের পক্ষশক্তি চরম অরাজক, বিশৃংখল ও সংশয়পূর্ণ পরিস্থিতির মোকাবিলা করে যাচ্ছে।

জিহাদের মর্যাদাসূচক সব নস বা দলীলের ভিত্তিতে যথার্থই বলা যায়, সেক্যুলার অথরিটির অধীনে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে (টেকসইভাবে) ইসলাম প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব নয়। জিহাদই হচ্ছে দ্বীন কায়েমের সুন্নাহভিত্তিক পদ্ধতি। অন্যদিকে যেভাবে বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেছে, এখন এই বৈশ্বিক-গ্রামে ক্ষমতা অর্জনের একমাত্র স্বীকৃত পন্থা হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এর ধরন যাই হোক না কেন, এর বাহিরে বোমা মেরে, হামলা করে ইসলাম বা কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা অবাস্তব ও দিবাস্বপ্নের মতোই অর্থহীন। যেখানে যেখানে দ্বীন কায়েমের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেখানে সেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের কারণেই এই শক্তি অর্জন ও আশাবাদ সৃষ্টি সম্ভবপর হয়েছে। অতএব, গণতন্ত্রই (এর সমর্থকদের মতে) বর্তমান সময়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার একমাত্র (?) পদ্ধতি। আসুন, আমরা অতি সংক্ষেপে এই দুই বিরোধপূর্ণ অবস্থানকে মূল্যায়ন করি।

প্রথমেই আমরা জিহাদ-পক্ষের বিরোধিতা করবো। ‘বর্তমান সময়ে দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি গণতন্ত্র নাকি জিহাদ’ ধরনের আলোচনার সময় সার্বক্ষণিকভাবে আমরা মূল্যায়ন করবো রাসূল মুহাম্মদ (সা) নির্ধারিত সুন্নাহকে। রাসূল (সা) মক্কায় জিহাদের অনুমতি দেননি অথবা পাননি। এটি জানা কথা। কিন্তু কেন? সোজা কথায় এর উত্তর হচ্ছে, জিহাদ করতে হলে পার্শ্ববর্তী কোনো না কোনো ভূখণ্ডে ইসলামের সমর্থনে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কায়েম থাকা চাই, যাকে এখন আমরা ইসলামী রাষ্ট্র বলছি। স্বীকৃত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো গ্রুপবিশেষ বা মুসলিম জনসমষ্টি শরয়ী অর্থে জিহাদ করতে পারে না। রাসূল (সা) মাদানী জিন্দেগীতে কিছু গুপ্ত হত্যা করানো সত্ত্বেও জিহাদের অন্যতম মূল শর্ত হলো জিহাদ ঘোষণাকারী কর্তৃপক্ষকে একটা স্বীকৃত রাজনৈতিক (রাষ্ট্র) শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এর অনুপস্থিতিতে অবশ্য যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত থাকবে। তা হবে জিহাদতুল্য, জিহাদ নয়। জিহাদ ঘোষণা ও পরিচালনার জন্য এই (রাষ্ট্রীয়) কর্তৃপক্ষ পাওয়ার বা কায়েম করার পদ্ধতি কী? এ প্রশ্নের উত্তরে গণতন্ত্র ছাড়া আর কিছু পাবেন না। দাওয়াতী কাজ স্বয়ং একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নয় কি?

এবার আসুন, গণতন্ত্রপন্থার সমর্থকদের দুর্বলতাগুলো আমরা এক নজরে দেখি – গণতন্ত্রবাদীদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, তাঁরা এ কথা বেমালুম চেপে যান, অথবা পারতপক্ষে স্বীকার করেন না যে, ‘তথাকথিত মদীনা রাষ্ট্রের’ গোড়াপত্তন হয় সংখ্যায় অতি ক্ষুদ্র ইসলামপন্থীদের হাতে। মদীনা সনদ স্বাক্ষরকালে তৎকালীন ইয়াসরিবে মুসলিম সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক দশমাংশেরও কম ছিলো। কীভাবে এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতা (রাসূল মুহাম্মদ (সা)) স্বীয় মতাদর্শের অনুকূলে একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে পেরেছিলেন, যাকে আমরা মদীনা রাষ্ট্র বলছি? এখানে আমাদের প্রচলিত অর্থের গণতন্ত্র স্পষ্টতই অচল নয়কি? রাসূলুল্লাহ (সা) হতে শুরু করে খলিফাতুল মুসলেমিনগণ পরিচালিত সামরিক অভিযানসমূহের মাধ্যমে যে সকল জনপদে ইসলাম কায়েম করা হয়েছিল তার সাথে আধুনিক গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক আছে কি? গণতন্ত্র ও জিহাদ – এ দুটোর কোনোটাই যদি সুন্নাহর সমার্থক না হয়, তাহলে আমরা কোন পন্থা অনুসরণ করবো?

এ প্রশ্নের আমি কোনো উত্তর দেবো না। লেখাটি পড়া শেষে পাঠক নিজেই নিজ পন্থা নির্ধারণ করবেন। এ বিষয়ে আমরা কেবল খানিকটা সম্পূরক আলোকপাত করতে চাই। আমাদের মতে, ‘গণতন্ত্র নাকি জিহাদ’ টাইপের প্রশ্নগুলোই অবান্তর। রাসূল (সা) জীবনের অধিকাংশ সময় চরমভাবে নির্যাতিত হওয়া সত্ত্বেও জিহাদ করেননি। কেন? কারণ, জনমত, ব্যক্তি ও মতামত গঠন তথা চিন্তার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে একটা শক্তিকেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস গড়ে উঠার জন্য তিনি অপেক্ষা করেছেন। তৎকালীন গোত্রতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অধিকাংশ প্রভাবশালীর সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য অপেক্ষা করেছেন। ইয়াসরিবে এক ধরনের প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের প্রচলন করে একটা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কায়েম করেছেন। ওহীর অপরিহার্যতার বিষয়গুলো ছাড়া বাদবাকি সব বিষয়ে জনমতকে অনুসরণ করেছেন। খলিফাগণ যেসব সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছেন তাও জনগণ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে নিয়েছেন যা বর্তমানে বিভিন্ন দেশে প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমে দেখা যায়।

এই আলোচনার কারণে কারো মনে হতে পারে, প্রকারন্তরে আমরা গণতন্ত্রকেই সমর্থন করছি। এটি ভুল। ইসলাম গণতন্ত্র দিয়ে হয় না। গণতান্ত্রিক পন্থায় ইসলামী বিপ্লব – সোনার পাথরবাটির মতোই স্ববিরোধী অবাস্তব বিষয়। জিহাদ মানে যেমন সম্ভাব্য যে কোনো পন্থায় সংঘর্ষ ও হামলার নাম নয়, তেমনি জনগণের সার্বভৌমত্বভিত্তিক কোনো মতবাদ, তা যতই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, ইসলামী বা ইসলামসম্মত হতে পারে না। ইসলামের মধ্যে গণতন্ত্রের সমর্থন আছে। তাই বলে ইসলাম মানে (পাশ্চাত্য অর্থে) গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়। ইসলাম কায়েম করতে হবে সুন্নাহ অনুমোদিত পন্থায় যাতে গণতন্ত্রের স্পষ্ট সাযুজ্যতা পরিলক্ষিত হয়। এই গণতন্ত্রকে জনমত বা জনসমর্থন অর্থে বুঝতে হবে। দুই-তৃতীয়াংশ জনসমর্থন বলতে আমরা যা বুঝে থাকি। এ ধরনের গণতান্ত্রিকতার সমর্থনে অনেক নস বা কোরআন-হাদীসের দলীল বিদ্যমান।

জিহাদ বা শক্তিপ্রয়োগ হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য অপরিহার্য শর্ত। যেখানে যুক্তি ও নৈতিকতায় কাজ হয় না, সেখানে শক্তিই সর্বোত্তম যুক্তি ও নৈতিকতার শ্রেষ্ঠ দাবি নয়কি?

উপরের আলোচনা হলো, ইসলাম যারা কায়েম করতে চান তাঁরা গণতন্ত্র ও জিহাদ সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে কোন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবেন সে বিষয়ে। আপনারা যারা দ্বীন ইসলাম কায়েম করতে চান, তাঁদের সব সময় স্মরণ ও বিবেচনায় রাখতে হবে, যে জমিনে আপনারা ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে চান সেটির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, এর সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গঠনকাঠামো ও বিদ্যমান বাস্তবতাকে। হক কায়েম করত গেলে তাগুতী শক্তি বিরোধিতা করবে, বাধা দিবে। এটি সত্যি। তাই বলে অবুঝের মতো অনর্থক গন্ডগোল লাগিয়ে, পার্শ্ব ইস্যুতে জড়িয়ে ও অনাবশ্যক বিতর্ক সৃষ্টি করে নিজেকে হকের পথের মুজাহিদ ভাবলে বা দাবি করলে ভুল হবে।

রাসূল (সা) তৎকালীন ইয়াসরিবের সমাজ ব্যবস্থাকে ইন্টিগ্রেটেড করে যেভাবে সফল হয়েছিলেন আমাদেরকে সেটি সক্রিয় বিবেচনায় নিতে হবে। মূসার (আ) মুজিযাভিত্তিক ব্যবস্থার চেয়ে ইউসুফের (আ) সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি এখন অধিক বাস্তবধর্মী নয়কি? তাত্ত্বিকভাবে বর্তমানে সুলাইমাইনের (আ) মডেলও কার্যকরী হতে পারে (?), যদিও তা সুদূর পরাহত। বর্তমান বাংলাদেশে শেখ রেহানা বা জয়, কিম্বা তারেক জিয়া যদি ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়ে এর রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণ করেন তাহলে, হয়তোবা, কিছু একটা হবে। স্থায়ী কর্মপন্থা বা পলিসি হিসাবে এ ধরনের দাওয়াহর উপর নির্ভর করার সুযোগ নাই। অবশ্য সর্বাবস্থায় ব্যক্তিগত দাওয়াহ অব্যাহত রাখতে হবে।

আমরা ইসলামপন্থীরা ইসলাম কায়েমের জন্য গণতন্ত্র নাকি জিহাদ বিষয়ে বিতর্ক করি। কখনো কখনো এসব আলোচনা বা বিতর্ক এক ধরনের শ্রেণীগত বিভ্রান্তিতে (category mistake) রূপ নেয়। ইসলাম যেভাবে প্রচার করতে হবে ইসলাম প্রতিষ্ঠাও সেভাবে হবে। ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম প্রচারে জোর করা বা বাধ্যবাধকতার অবকাশ থাকে না। আর সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় জোর করা বা শক্তিপ্রয়োগের সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা থাকে। যদিও তা প্রচার বা দাওয়াতী কাজের যথাসম্ভব পূর্ণতার পরবর্তী ধাপেই কেবলমাত্র বাস্তবায়নযোগ্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরের আলোচনার এক পর্যায়ে আমরা ‘তথাকথিত মদীনা রাষ্ট্র’ বলেছি। এতে অনেকে আহত হবেন। আমিও হয়েছিলাম। এখন আমরা আধুনিক রাষ্ট্র বলতে যা বুঝি তা তৎকালীন মদীনাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় ছিল না। এক ধরনের এপলোজেটিক ট্রেন্ডের প্রভাবে আধুনিক ইউরোপে বিকাশলাভকারী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিভিন্ন অনুষঙ্গের সাথে আমরা মদীনাকেন্দ্রিক হুকমাতের বৈশিষ্ট্যাবলী মিলিয়ে ‘প্রমাণ’ করার চেষ্টা করি যে মদীনা মডেল ছিলো আমাদের এই সময়ে প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুরূপ একটা ‘রাষ্ট্র’! যেসব বৈশিষ্ট্য মিলে যায় সেসবের কথা আমরা খুব বলি; অথচ যেসব বৈশিষ্ট্য মিলে না, সেসবকে আমরা বেমালুম চেপে যাই।

ইসলামের সাথে সব মত-আদর্শের কিছু না কিছু মিল বা সাদৃশ্য আছে। এতদসত্ত্বেও ইসলাম হলো একটি একক, অনন্য ও স্বতন্ত্র মতাদর্শ! সব ধরনের মত ও আদর্শের সব ভালো দিক ইসলামে আছে। আর সব মন্দ দিকগুলোকে ইসলাম বাতিল করেছে। তাই, ইসলামকে ইসলামী আদর্শ বলাই ভালো। ইসলামকে ধর্ম বলার কোনো সুযোগ নাই। যদিও কতিপয় ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য (ইবাদতের বিষয়গুলো) হলো ইসলামের প্রাণ। যতই আপনি শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি দাবি বা প্রমাণ করেন না কেন, ইসলামকে ধর্ম বলার সাথে সাথে ধর্মের সব খারাপ দিকগুলোর দায়দায়িত্বও ইসলামপন্থীদের কাঁধে চাপবে। তাছাড়া ইসলামের অপরিহার্য রাজনৈতিক দিকগুলোকে কীভাবে এই তথাকথিত ‌‌ধর্মীয় ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যবিধান করবেন? ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ইসলামী শাসনতান্ত্রিকতা বলা যেতে পারে। ইসলামী গণতন্ত্র বা হালাল পুঁজিবাদ জাতীয় হাস্যকর কথাবার্তা নিজেদের মধ্যে না বলাই ভালো।

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *