যৌতুকের বিষ ফোঁড়া

“লাখ লাখ অনূঢ়া মেয়ের মাতা ও পিতার চোখে ঘুম নেই আজ, ক’টা মুখ জ্বল-জ্বল করে ভুল সুখে”

হ্যাঁ, যৌতুকের কথাই বলছি। এই যৌতুক প্রথার কারণে কতো বিবাহযোগ্য মেয়ে পিতৃগৃহে অবহেলিত। দুঃখ হলো যারা নারী স্বাধীনতার কথা বলে, তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত নারীরাও বিয়ের খরচের ব্যাপারে ‘আদারওয়াইজ’ ভাবতেই পারে না। এক লাখ টাকা ‘ওয়েডিং ফটোগ্রাফার’কে দেয়া আর দু-চার লাখ টাকা যৌতুকে দেয়ার মধ্যে পার্থক্য দেখি না।

যৌতুকটা বরপক্ষকে দিতে হয়। আর, একদম আননেসেসারি পার্লার বিল হতে শুরু করে কনের ‘নির্দোষ’ দাবী পূরণে যত বাড়তি খরচ তা সবই বহন করতে হয় বেচারা পিতাকে। পিতা হওয়া যেন বড় দায়। উচ্চশিক্ষিত ও চাকুরীজীবী এমন অবিবাহিত নারীদেরও দেখেছি, আসন্ন বিয়ের খরচ মিটানোর জন্য কোনো সঞ্চয় করে না। এমন কি এ নিয়ে চিন্তাও করে না। একটা ছেলে যেভাবে করে। ভাবখানা এমন, জিজ্ঞাসা করলে বলে, “আপনাদের মেয়েকে আপনারা বিয়ে দিবেন না?”

ছেলে সন্তান আর মেয়ে সন্তানের মধ্যে যে বৈষম্য করা হয় তা অনুচিত। কিন্তু আমাদের মতো উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বিত্ত পরিবারে এ ধরনের বৈষম্য করা হয় না। অথচ এমন ঘরের মেয়েরাও বিয়ের খরচের জন্য পিতৃপক্ষের ওপর ছওয়ার হয়ে থাকে। বিয়েতে বাহুল্য খরচ যৌতুককে উৎসাহিত করে। কনে পক্ষের নিজেদের বাহুল্য খরচ বর পক্ষের যৌতুকের দাবীর ক্রিমিনালিটিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে লেজেটিমেইট করে।

২.

শিক্ষিত ছেলেরা যৌতুক আশা করে, সাধারণত বলে না, বা এই লেভেলে তা বলতে হয় না। ইমপ্লাইড। এটি বেশি অসততা। অশিক্ষিতরা গরু-ছাগল কেনা-বেচার মতো দরাদরি করে। এটি অশোভন হলেও শিক্ষিতদের ভণ্ডামীর তুলনায় সততার দিক থেকে অধিকতর সৎ। নৈতিকতার প্রশ্নটা ভিন্ন।

ইনফ্যাক্ট, আমি এখানে নৈতিকতার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনাতে আগ্রহী নই। নৈতিকতা একটা উচ্চ মানের ব্যাপার। মানবিকতা ও কাণ্ডজ্ঞানের তলাটাই ঠিক নাই, উন্নত নৈতিক মানের কথা দিয়ে কী হবে! নৈতিকতা কারো মধ্যেই নাই। প্রত্যেক পক্ষই অসৎ। গার্জিয়ানরা অসৎ। পাত্ররা অসৎ। পাত্রীরা আরো বেশি অসৎ।

মেয়েরা যৌতুকের বিরোধী কিন্তু আননেসেসারি খরচে অতুৎসাহী। আদতে দুইটা একই জিনিস। বেহুদা কনজিউম আমি করলে নির্দোষ, সামর্থ্য আছে বলে করেছি, আর আমার থেকে নিয়ে অন্য কেউ করলে খারাপ – এমন মনে করাটা স্ববিরোধীতা ও আত্ম-প্রতারণা।

আমি বুঝি না, পর্দানশীন পাত্রীরাও কেন পার্লারে গিয়ে ওভাবে মোটা অংকের বিল দিয়ে সাজগোজ করে। আজকে থেকে তের-চৌদ্দ বছর আগে এলএলএম করা এক স্নেহাষ্পদ এসে বললো, ‘মোজাম্মেল ভাই, আমি বুঝি না, ইসলামী ছাত্রী সংস্থা করা মেয়ের বিয়ের সাজের জন্য বারো শ’ টাকা দামের নেইল পালিশ কেন কিনে দিতে হবে’। উজ্জ্বলের পক্ষের লোকদের সাথে পাত্রী পক্ষের লোকেরা শপিং করতে গেছে। সেখানে যা যা পাত্রীপক্ষকে কিনে দিতে হইছে তার মধ্যে বারো শ’ টাকা দামের নেইল পালিশও ছিলো।

৩.

সিএসসিএস-এর অফিস সহকারী রবিউল ইসলাম বিবাহ প্রার্থী। এনইউ থেকে গ্রাজুয়েট। তাকে যৌতুক না নেয়ার জন্য অনেকভাবে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। যৌতুক না নেয়ার কথা বললে সে চুপ করে থাকে। মাসুদ এর একটা ব্যাখ্যা দিলো এভাবে, নিম্নবিত্ত ফ্যামিলির বিনাশ্রমে অর্থ ও সম্পদ অর্জনের একটা বড় সুযোগ হলো পাত্রপক্ষ হিসাবে যৌতুক নেয়া। যৌতুক তো আর বলা লাগে না। ‘এমনিতেই’ দেয়া হয়, এসে যায়।

বাধ্যতামূলক উপহার যৌতুকই বটে। হোক সে বাধ্যবাধকতা সমঝোত চুক্তির মাধ্যমে, কিংবা সামাজিকতার নামে।

যা না দিলে সম্পর্কের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না, অথচ দেয়া হয়, তা-ই উপহার। যা দিতেই হয়, তা উপহার হতে পারে না। বাধ্যতামূলক লেনদেনকে উপহার বলাটা হাস্যকর। বিয়ের ক্ষেত্রে এটি ভদ্রলোকদের করা সমাজস্বীকৃত ডাকাতি, ‘ধর্ষণ সংস্কৃতির’ মতো সামাজিক বিকার। সর্বাত্মক প্রতিরোধই এই রোগের একমাত্র ঔষধ।

খেয়াল করে দেখবেন, যারা যৌতুক নেয়, যৌতুক দাবী করে, তারা সব পুরুষ, এমন নয়। তারা পাত্রপক্ষ। যার মধ্যে পাত্রের মা, বোন, ভাবী, খালা, চাচী, মামী, দাদীর মতো নারীরাও আছে। তাই বিষয়টা নিছক লিঙ্গভিত্তিক না। এই দৃষ্টিতে সমস্যাটা নিছক নারীবিরোধী পুরুষ পক্ষীয় কোনো ব্যাপার না।

৪.

তৎকালীন আরবের সামাজিক নিয়মানুসারে ওহুদ যুদ্ধে শহীদ জনৈক সাহাবীর সব সম্পদ-সম্পত্তি মেয়ের চাচারা দখল করে নেয়। তখন মেয়ের মা এসে রাসুলুল্লাহ (স.) কে এ বিষয়ে অভিযোগ করলেন। তিনি সে সম্পর্কে যা বলেছিলেন তার মধ্যে এটিও ছিলো, “… এখন এই মেয়েকে আমি কীভাবে বিয়ে দিবো? কে এই মেয়েকে বিয়ে করবে?” অর্থাৎ সে সময় পর্যন্ত সামাজিকভাবে যৌতুক দিয়ে মেয়ে বিয়ে দেয়ার (সামাজিক) বাধ্যবাধকতা ছিলো। মোহরানাও ছিলো, যৌতুকও ছিলো। কেউ কেউ হয়তো যৌতুক নিতো না বা দিতো না। এতটুুকু।

ইসলাম এ পর্যায়ে নারীদের সম্পদে উত্তরাধিকার দেয়ার বিধান প্রবর্তন করে। সাথে সাথে যৌতুক নেয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেটি সুনির্দিষ্টভাবে যৌতুকের প্রসংগে না বলে অন্যায্য যে কোনো ধরনের আত্মসাতের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারীর আকারে বলে।

৫.

নারী-পুরুষের পারষ্পরিক সম্মতিভিত্তিক প্রকাশ্য দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা ও সম্পদের লেনদেন কেন হবে? এটি একটা শিশুসুলভ প্রশ্ন। অতীব যৌক্তিক প্রশ্ন। তাই বিষয়টার গোড়ায় গিয়ে কিছু কথা বলা দরকার।

ইসলাম, পুরুষদের অর্থনৈতিক দায়িত্বপালনের কথা বলে। ইসলাম যে ধরনের সমাজ ব্যবস্থার কথা বলে তাতে পুরুষদের উপার্জনের সুযোগও বেশি। এর নৈতিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি পুরুষদের অধিকতর শারীরিক সক্ষমতায় নিহিত। ইসলাম অথচ জেন্ডার নির্বিশেষে মানবিক সমতার কথা বলে। তারজন্য সেফটি-ক্লজ হিসাবে ইসলাম নারীদের সম্পদ অর্জনের অধিকার ও কিছু উপায় প্রদান করেছে। মোহরানা বা বিবাহ উপলক্ষ্যে দেয়া উপহার-সামগ্রী ও সম্পদ এর অন্যতম। ব্যক্তিত্ব সংরক্ষণের জন্য যে অর্থনৈতিক সামর্থ্য দরকার, মোহরানা সিস্টেম তার দাবী হিসাবে প্রবর্তিত।

আমাদের সমাজে কী হচ্ছে তা বলে লাভ নাই। সমাজ, আদর্শকে ঠিক মতো ফলো করছে না, তার জন্য আদর্শকে ভুল বলা কি সংগত? সমাজটা আদর্শ মোতাবেক নাই, সে জন্যই তো সমাজ আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে।

৬.

আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেন, বিয়ের ক্ষেত্রে নারীদের চারটি বৈশিষ্ট্য দেখা হয়: ১. সম্পদ, ২. বংশ মর্যাদা, ৩. সৌন্দর্য ও ৪. ধার্মিকতা। তোমরা ধার্মিকতা বা দ্বীনদারী দেখে নারীদের বিয়ে করো।

শ্রেষ্ঠতম মানুষটার এ্ই কথা শুধু পুরুষদের জন্যই প্রযোজ্য বলে মনে করা হয়। কেন, নারীদের জন্য তা প্রযোজ্য হবে না কেন? কই কোনো ‘শিক্ষিতা’ নারীকে তো দেখি না, অশিক্ষিত-অনুপযুক্ত নয়, শুধুমাত্র আপাতত বেকার বা ‘ছোট চাকুরী’ করা কোনো দ্বীনদার পাত্রকে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী হতে। বান্নারা এসব নিয়ে ফিল্ম বানিয়ে লোকদেরকে উৎসাহী করার চেষ্টা করছে বটে। ট্রেণ্ডটা ভালো। এ ধরনের দু-একটা নিতান্ত ব্যতিক্রমী প্রেমময়ীর কথা পাওয়া যাবে, হয়তোবা। সমাজের মূলধারায় এ ধরনের সুস্থ চিন্তার প্রতিফলন চোখে পড়ে না।

আপাত: দৃষ্টিতে মনে হয়, কোনো চলমান নির্যাতন-ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্যাতকই পারে সেটি বন্ধ করতে। মনে হয় যেন নির্যাতিত-পক্ষের কিছু করার নাই। কথাটা ভুল। নির্যাতিতও পারে কোনো চলমান নির্যাতনকে বন্ধ করতে। অল্প সংখ্যক নির্যাতিত যদি ক্রাশড হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মরন-পণ প্রতিরোধ করে তাহলে সেই নির্যাতন-ব্যবস্থার পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে। অপরদিকে সবাই যদি ‘অগত্যা’র দোহাই দিয়ে কম্প্রোমাইজ করে চলে, তাতে করে নির্যাতনকারী-পক্ষ আরও উৎসাহিত হবে। সাইক্লিক অর্ডারে এটা চলতেই থাকবে। ক্রমান্বয়ে এই অপব্যবস্থা বিদ্যমান সমাজে ‘ঐতিহ্য’ হিসাবে গেড়ে বসবে।

ভাইদের বিয়েতে বোনেরা যদি যৌতুক নেয়ার কঠোর বিরোধিতা করে, ছেলের বিয়েতে যদি মা যৌতুকের বিরুদ্ধে পাহড়ের মতো দাঁড়ান, নিজের বিয়েতে কনে হিসাবে নারীরা যদি যৌতুককে না করে দেয়, বাবা-ভাইকে নিষেধ করে, পাত্র পক্ষকে জানিয়ে দেয়, এতটুকু হিম্মত যদি প্রতিবাদী নারীরা ধারণ করে তাহলেই শুধু এই মরণ-ব্যবস্থার আশু অবসান হতে পারে।

এমন সাহসী মেয়ে কি আছে?

৭.

এই প্রতিরোধ আন্দোলনের আলোচনায় পুরুষ পক্ষের কথা বলি নাই। নিজে একজন পুরুষ হলেও ‘বাংগালি-মুসলিম’ – এই ক্যাটাগরির পুরো পুরুষ প্রজাতির ব্যাপারে আমি ভীষণ হতাশ। যতই নামাজ পড়ুক, হজ্ব করুক, ‘ইসলাম ইসলাম’ করুক না কেন, নারী অধিকার হরণের বেলায় এরা বা-কমিউনিটি, এনমাস কম-বেশি ‘অগ্রগামী’। এদেরকে দিয়ে হবে না। এদের কাছ হতে ভালো কিছু আশা করা যায় না।

১৯৯৪ সালের জানুয়ারীতে যখন আমি বিয়ে করি তখন যদি আমার শ্বশুড়-পক্ষকে বলা হতো, ১০ লক্ষ টাকার জিনিসপত্র দিতে হবে, ১০ হাজার মানুষকে ‘বৈরাত’ খাওয়াতে হবে, তারা সানন্দেই তা করতো। পাত্র হিসাবে আমার তখনকার স্ট্যাটাসের জন্য নয়, তাদের নিজেদের স্ট্যাটাসের জন্যই তারা তা করতো। আমার শ্বশুড় (আল্লাহ উনাকে বেহেশতী হিসাবে আলমে বরযখে আশ্রয় দান করুক, আ-মীন!) এলাকাতে নামকরা ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন।

আমি এমন কি আমার আত্মীয়-স্বজনদেরকেও বলতে দেই নাই। নিছক ঘরোয়া পরিবেশে একটা আক্বদ অনুষ্ঠান করা হয়েছিলো। আমরা যখন মাদারীপুরে মিতুলকে আনতে যাই তখন দেখি, দু’দিন ধরে ওখানে খাওয়া-দাওয়া উৎসব-অনুষ্ঠান চলছে। আমার ঘরের একটা চামচও নিজের পয়সায় কেনা। ফ্রিজ-টেলিভিশন-কম্পিউটার-সোফা-ডাইনিং, এক কথায় কাপড়-চোপড় হাড়ি-পাতিল ছাড়া সবকিছু তথাকথিত ইসলামী ব্যাংকের ‘ইসলামী’ পদ্ধতিতে ঋণের ভিত্তিতে কেনা।

আল হামদুলিল্লাহ! ভালোই আছি।

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।