আবেগ হচ্ছে জীবনের বহিঃপ্রকাশ, আত্মার পরিচয়

আবেগ নিয়ে লিখেছিলাম ক’দিন আগে। সেখানকার বিভিন্ন কমেন্টের পাশাপাশি এ বিষয়ে পরিচিত কারো কারো সাথে ব্যক্তিগত আলাপ করতে গিয়ে খেয়াল করলাম, কেউ কেউ আবেগ আর অনুভূতিকে এক মনে করছেন। ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাওয়ার পরে আমাদের তৃপ্তিবোধ হয়। গরমের সময়ে ঠাণ্ডা বাতাসের আমেজ আমাদেরকে সুখের অনুভূতি দেয়। অপছন্দের কাউকে দেখলে আমাদের অস্বস্তি ও ঘৃণাবোধ হয়। এগুলোকে মনোবিদ্যায় প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ বা reflex behavior বলা হয়।উক্ত স্ট্যাটাসে [https://www.facebook.com/MH.philosophy/posts/1885376751479451] আবেগ বলতে আমি নিছক নৈমিত্তিক শারীরিক প্রয়োজনে সাড়া দেয়াকে বুঝাই নাই। শারীরিক প্রতিক্রিয়াজনিত যে আবেগ তা আসলে স্থুল আবেগ, বলতে পারেন, এ ধরনের আবেগ হলো মূলত শরীরি অনুভূতি, প্রতিক্রিয়া মাত্র।

এ বিষয়ে অব্যবহিত পূর্ববর্তী লেখায় [সূত্র উপরে উদ্ধৃত] আমি জ্ঞান ও বিবেক তথা করণীয় বোধের স্পনিং গ্রাউন্ড বলেছি, জ্ঞান ও বিবেকের উৎপত্তিস্থল হিসাবে যে আবেগ তা এক ধরনের অভূতপূর্ব বা অপ্রত্যাশিত অনুভূতি ও আচরণ। ইংরেজীতে বললে, true emotion is a kind of non-deterministic peculiar feeling and sort of deviant behavior. কার্য-কারণ সম্পর্কের অনিবার্যতায় যে ঘটনা ঘটে তাতে আবেগের কিছু নাই। একটা পাথরকে উপর থেকে ছেড়ে দিলে সেটা নীচে পড়ে। এর ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নাই। তাই পাথরের কোনো আবেগও নাই। বাঘ দেখলে হরিণ পালায়। এটিও মূলত: রিফেল্কস বিহেভিয়ার। এমন কি অতি বিরল কিন্তু বাস্তব ঘটনা হিসাবে যখন আমরা কোনো হরিণ ছানাকে শিকারী বাঘিনী কর্তৃক ক্ষুধার্ত হওয়া সত্বেও প্রটেকশান দিতে দেখি তখন সেটাকে আবেগ মনে করাটা ভুল। এটি হলো মাতৃত্বজনিত প্রতিক্রিয়া-আচরণ। হরমোনাল ব্যাপার-স্যাপার।

আদম (আ.) কর্তৃক নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়াটা ছিল মানবীয় আবেগের পরিচয়। আদর্শের জন্য জীবন দেয়ার পিছনে থাকে অদম্য আবেগ। ভুল-শুদ্ধ যা-ই হোক। জ্ঞান যখন পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়, বিবেক যখন নিষক্রিয় হয়ে পড়ে তখন স্বীয় মানবীয় আবেগের একান্ত ভুবনে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে। নিজের অস্তিত্ব আর আবেগ ছাড়া সেখানে আর কিছু থাকে না। প্রত্যেক মানুষের জীবনে এ ধরনের সংকটাবস্থা আসে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যারা বিবেকের ফয়সালাকে শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়, তাদেরকে আমরা বলি ‘ভালো মানুষ’। এ ধরনের আচরণকে আমরা মানবিক আচরণ হিসাবে প্রশংসা করি। এর বিপরীত যা কিছু সেসবকে আমরা খারাপ আচরণ হিসাবে নিন্দা করি। বলি, লোকটা কেমন করে এ’ কাজ করলো? হোক সেটা ভালো কিংবা মন্দ। জিজ্ঞাসা করলে, সে ব্যক্তি বলবে, ভেতর থেকে মনে হলো, প্রচণ্ড ইচ্ছা হলো, এমনটা করি, তাই করেছি।

নিছক জ্ঞান বা বিবেক মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে না। বলতে পারেন, শুদ্ধ আবেগের চাপে মানুষ শেষ পর্যন্ত জ্ঞান ও বিবেকের পথে নিজেকে টেনে আনে। কোনটা শুদ্ধ তা যদি বিবেকই বলে বলে আমরা মানি, সে ক্ষেত্রে বিবেকের রায়কে গ্রহণ করার পিছনে যে ফ্যাক্টর কাজ করে তা হলো আবেগ।

ঈমান তো আত্মসত্তা, জগত ও জীবন সম্পর্কে বিশেষ এক ধরনের আবেগেরই নামান্তর। হিসাবি লোকেরা কখনো ভালো ঈমানদার হতে পারে না। সুরা বাকারার ১৩নং আয়াতে বলা হয়েছে, “এবং যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা ঈমান অান সেভাবে যেভাবে লোকেরা ঈমান এনেছে। তখন তারা বলে, ‘আমরা কি সেভাবে ঈমান আনবো যেভাবে নির্বোধেরা ঈমান এনেছে?’ জেনে রাখ, নিশ্চয় তারাই নির্বোধ। কিন্তু তারা জানে না।” আলেমে দ্বীন ও আমলদার বুজুর্গদের তুলনায় আবেগি শহীদের মর্যাদা বেশি হওয়ার যুক্তি কী? স্পষ্টতঃই, আল্লাহর কাছে শুদ্ধ আবেগের মূল্য, সঠিক জ্ঞান ও সঠিক কর্মের তুলনায় বেশি। একজন আলেম কিংবা/এবং আবেদ যখন যুদ্ধের মাঠে প্রাণের মায়া না করে লড়াই করে, তখন সে প্রধানত: আবেগ দ্বারাই পরিচালিত হয়।

প্রতিকূলতার চাপে যখন আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি তখন জ্ঞান আর বিবেকেরর সান্তনা বা সাবধান বাণী আমাদের শান্ত করতে পারে না। বেঁচে থাকার প্রেরণা আসে আবেগ থেকে। আবেগের উৎপত্তি অস্তিত্ববোধ থেকে। অস্তিত্বের যে বোধ তা আবেগের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যে অন্তর্গত প্রেরণা আমাদের ক্রমাগত এগিয়ে যেতে বলে, ভেতর থেকে যা আমাদের কেন জানি অবিরত চাপ দেয়, তা না জ্ঞান, না বিবেক। বরং তা হলো আমাদের শুদ্ধতম আবেগ।

আমার যখন খুব মন খারাপ হয়, তখন বাবা-মা’র কথা খুব মনে পড়ে। মৃত্যুর আগের দিন আমার মার কাছ হতে জানতে চেয়েছিলাম, কার কথা আপনার মনে পড়ে? ডান হাতের দু’ আংগুল তুলে তিনি মৃদু কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘দুই জনের কথা। আমার বা’জানের কথা। আর তোর বাবার কথা।’ উল্লেখ্য, আমার নানী, আম্মা বেশ ছোট থাকতেই মারা গিয়েছিলেন। বিপন্ন মানুষকে প্রিয়জনের স্মৃতি আর আবেগই আশ্রয় জোগায়।

আবেগ মানুষকে স্বর্গচ্যূত করেছে। আবেগই আবার তাকে মানুষ হিসাবে সভ্যতা গড়ে তোলার প্রেরণা জুগিয়েছে। কিছু আবেগি লোকের ‘অবাস্তব’ চিন্তা ও পাগলামির ফসল হলো আজকের এই মানব সভ্যতা। তাবৎ বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও সৌন্দর্যবোধের সবকিছুই ক্ষ্যপাটে কিছু মানুষের এক ধরনের পাগলামোপূর্ণ আবেগের পরিণতিতে প্রাপ্ত। শুদ্ধ আবেগই মানুষকে স্বর্গের দ্বারে নিয়ে যায়। এক ধরনের মানবিক আবেগের বশবর্তী হয়েই মানুষ তার মতো করে ‘সঠিক মতাদর্শ’ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। এর মাধ্যমে সে এ দুনিয়াকে স্বর্গ বানানোর চেষ্টায় সফল বা পণ্ডশ্রম করে।

তাই কোনো কোনো মন্তব্যকারীর দ্বিমত ও সমালোচনা সত্বেও আমি কনফিডেন্ট, আবেগই হলো মূল মানবিক সত্তা, অস্তিত্বের সারসংক্ষেপ। এই যে কনফিডেন্সের কথা বললাম, এটিও কিন্তু আবেগ সমার্থক শব্দ। আবেগকে বাদ দেন, মুহূর্তেই জীবন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এমন কি মৃত্যুও। আবেগ না থাকলে আত্মহত্যা করাটাও অসম্ভব। যেমন করে ইঞ্জিন-অয়েল বা মবিল ছাড়া গাড়ী অচল তেমন করে আবেগ ছাড়া জীবন অচল। অর্থহীন। জীবন হচ্ছে আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ। সত্যি কথা হলো, আবেগ হচ্ছে আত্মার পরিচয়। কৃত্রিম বুদ্ধির অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে আবেগের অনুকরণ করা সম্ভব, আবেগ তৈরী করা অসম্ভব। আবেগ তৈরী করা যায় না। তাই তো তা আবেগ। আবেগ গড়ে উঠে। কেন, কীভাবে, কখন, কোন আবেগ, তা পূর্বানুমান করা অসম্ভব।

Emotion is something indeterministic and unpredictable in it’s nature. It’s a kind of expression of something which is unique. We call it soul. If you search your soul to the possible bottom, you will neither find knowledge first, nor anything as conscience. Knowledge is the out come of our soul-searching and conscience is the guide of that path.

Emotion is the starting point and end-line. It’s the center of gravity of our personality. It is the outcome of cognitive consciousness of our very existence. If anyone losses emotion, he or she falls down in a vegetative stage.