বিবাহ-প্রার্থীদের জন্য ‘হেদায়েত’

বিয়ে হলো সমাজ গঠনের ভিত্তি। বিশেষ করে আফ্রো-এশীয় মহাদেশসমূহের ধর্ম-নির্বিশেষে সব ধরনের সমাজ ব্যবস্থার জন্যই এটি সত্য। নারী-পুরুষের সম্পর্কভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থাই এই উভয় অ-ইউরোপীয় সভ্যতার অভিন্ন বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা নির্বিশেষে আমাদের জীবনে পরিবারই আশ্রয়কেন্দ্র ও সুখ-শান্তি-প্রেরণার উৎস। আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও পরিচয়ে পরিবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

দুজন সক্ষম নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ের মাধ্যমে পরিবার নামক এই সামাজিক সংস্থা গড়ে উঠে। একক বিবাহের তুলনায় বহুবিবাহ একটি ব্যতিক্রমী প্রথা হলেও তা নারী-পুরুষেরই মধ্যকার সম্পর্ক বিশেষ। লাগামহীন ভোগবাদিতার উন্মাদনায় হাল নাগাদের ইউরোপ-আমেরিকায় পৃথিবীর এই প্রাচীনতম সামাজিক প্রতিষ্ঠান ভেংগে পড়েছে। যদিও এর অস্তিত্ব সেখানে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। সেখানে সমলিঙ্গে বিয়েকে আইনসম্মত করা হয়েছে। বিবাহ বহির্ভূত ‘বৈধ’ সম্পর্ক তো আছেই। এই সর্বনাশা প্লাবনের সমাপ্তি কখন কীভাবে হবে তা জানি না। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে, এটি মানব সভ্যতাবিরোধী একটা ব্যতিক্রমী নেতিবাচক সভ্যতা। আমাদের সমাজ এর কুপ্রভাব থেকে এখনো মুক্ত। তাই সংগত কারণেই লেখক এ বিষয়ে এই বইয়ে কোনো প্রবন্ধ লিখেন নাই।

এই বইয়ে তিনি আন্তঃধর্ম বিয়ের সমস্যা নিয়ে লিখেছেন। একই দেশের মধ্যকার হলেও ভিন্ন অঞ্চলের ছেলে-মেয়ের বিয়েতে উদ্ভূত সাংস্কৃতিক সংকটের কথা তিনি হয়তোবা লক্ষ করেন নাই। হয়তোবা পরবর্তী সংস্করণে তিনি এ বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করবেন।

“বিয়েকে সহজ করো। ব্যভিচারকে কঠিন করো”– নবী মোহাম্মদের (সা) এই অমূল্য হেদায়েতকে যদি আমরা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে একটা সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে অনেক কষ্ট করতে হবে, অনেক দূর যেতে হবে। বাহুল্য খরচের ব্যাপারটা বিলম্ব বিয়ের মূল কারণ। খরচের এই অপসংস্কৃতি ভাংগার কাজে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে সংশ্লিষ্ট বর ও কনে। এই দায়িত্ব কনে পক্ষেরও নয়, বর পক্ষেরও নয়। পুরো ব্যাপারটির স্বয়ং প্রথমপক্ষ হওয়ার সুবাদে এক একজন সচেতন ও সৎ বর-কনেই এই দুষ্টচক্র ভাংগার কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

পাত্র-পাত্রীর কোনো সম্মতি না নিয়ে একতরফাভাবে অভিভাবকদের মাধ্যমে আয়োজিত বিয়ের যে প্রাচীন প্রান্তিকতা, তার বিপরীতে আজকাল শুধুমাত্র দুজনার পছন্দের ভিত্তিতে ‘ভালবাসার বিয়ে’র ঘটনাও দেখা যায়। বিয়ে পরবর্তী জীবন হলো কঠোর বাস্তবজীবন। আবেগ সেখানে ততটা মূখ্য নয়। সংসারের নানা রূঢ় বাস্তবতার মোকাবিলাই সেখানে দৈনন্দিন ব্যাপার। বিয়ে মানে দুজন নর-নারীর দায়-দায়িত্বহীন শারীরিক সম্পর্কমাত্র নয়। বিয়ে মানে নতুন একটা পরিবার গঠনের মাধ্যমে বিদ্যমান দুটো পরিবারের সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক আন্তঃসম্পর্ক।

বর ও কনের ভাষা থেকে খাদ্যাভ্যাস– এক কথায় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বহু বিষয়ের ফরমেশনে তাদের গড়ে উঠা পরিবারের মৌলিক প্রভাব থাকে। তাই তাদের মধ্যকার মিলমিশের জন্য সংশ্লিষ্ট দুই পরিবারের সামাজিক সমতা তথা কুফুর গুরুত্বও অনেক বেশি। ভালবাসার বিয়েতে কুফুর এই দিকটাতে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়ে উঠে না। তরুণ-তরুণীর আবেগই সেখানে প্রাধান্য পায়। সেজন্য বিয়ের ব্যাপারে আমি সামাজিক বিয়ের (arranged marriage) পক্ষপাতী। যে অভিভাবকরা জন্ম হতে আপনার বেড়ে উঠা ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সব পর্যায়ে আপনার জন্য সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালোটাই করতে পারলেন, তারা আপনার জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের কাজে শুধু মোনাজাত-আশীর্বাদেই থাকার যোগ্য, কীভাবে এটি আপনারা ভাবতে পারলেন?

[ফাতেমা মাহফুজের ‘বিয়ে: আবেগ বনাম বাস্তবতা’ গ্রন্থে প্রকাশকের ভূমিকা হিসাবে লিখিত।]

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *