নারী অধিকারের দৃষ্টিতে সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামো

নারী আর পুরুষের অধিকার সমান। মানুষ হিসেবে। পরিবারের সদস্য হিসেবে। সমাজের একজন হিসেবে। নাগরিক হিসেবে। ক্ষেত্রবিশেষে সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে অসমতা অনুমোদনযোগ্য। তবে এটি হতে হবে উপর্যুক্ত সমতার নীতিকে সমুন্নত রাখা সাপেক্ষে। সে ক্ষেত্রে নারী হওয়ার কারণে কেউ বেশিও পেতে পারে, কমও পেতে পারে।

দেয়ালের আড়াল হতে খেলা দেখতে চাওয়া বিভিন্ন বয়সের তিনজন দর্শকের উদাহরণ হতে এটি আমরা বুঝতে পারি। প্রত্যেকের খেলা দেখার সমঅধিকারকে সমুন্নত রাখার জন্য কিশোর দর্শকটিকে বয়স্ক লোকটার তুলনায় বেশি কিন্তু শিশুটির তুলনায় কম সাপোর্ট দেয়া হয়েছে। এখানে সুবিধা বন্টনে প্রয়োজন অনুযায়ী তারতম্য করাতে প্রত্যেকেই সমভাবে খেলা দেখার সুযোগ পেয়েছে।

মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার সমান। এটি হলো সভ্যতা ও মানবিকতার ভিত্তি এবং লক্ষ্য। এই ভিত্তি বজায় রাখা ও এই লক্ষ্য অর্জন করার জন্য সুবিধা বণ্টনে অসমতা করা অনুমোদনযোগ্য। ক্ষেত্রবিশেষে এটি জরুরি। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অসম বন্টনকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। সবাইকে সমানভাবে দেয়ার পরে দুর্বল বিবেচনায় কাউকে কাউকে পরিমাণ মতো বেশি দিয়ে সুযোগের সমতা সৃষ্টি করতে হবে। কেউ কোনো কারণে অসমভাবে সুবিধা বন্টনকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করলে সেটি হবে ন্যায় নীতির খেলাফ।

তার মানে হলো, ন্যায্যতা কখনো সমতার বিকল্প হতে পারে না। বরং ন্যায্যতা হলো সমতার মৌলিক নীতি এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করার জন্য একটি অপরিহার্য ব্যবহারিক প্রক্রিয়া। সমতা-ন্যায্যতা-সমতা – এভাবে যখন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুযোগ-সুবিধার বন্টনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে তখনই বুঝা যাবে, উক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায় বা জাস্টিস কার্যকর আছে।

সমতা, ন্যায্যতা এবং ন্যায় সম্পর্কে আমার এই কথাগুলো কেউ যদি বুঝতে পারেন, তাহলে তিনি পাশ্চাত্য সমতাবাদী নারীবাদ এবং প্রাচ্য পুরুষতান্ত্রিক ন্যায্যতাবাদের ইনহারেন্ট সমস্যা কী, তা সহজেই বুঝতে পারবেন। অধিকারের সমতার সাথে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে পাশ্চাত্য নারীবাদ একাকার করে ফেলেছে। এর বিপরীতে অ-ইউরোপীয় সমাজ ও রাষ্ট্রগুলো ন্যায্যতাকে সমতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে একটা ফলস বাইনারির অবতারণা করেছে। যার পরিণতিতে তারা মৌলিক মানবীয় সমতার নীতিকে বাস্তবে অকার্যকর ও অসম্ভব করে ফেলেছে।

ন্যায্যতা হলো সমতা নীতির অধীনস্ত নিছকই একটি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। এটি কখনো নীতি হতে পারে। এমনকি একে যদি কেউ নীতি বলতে চায়, তাহলে সেটি হতে পারে সমতার ফান্ডামেন্টাল নীতিকে বাস্তবায়নের জন্য এডপ্টেড ব্যবহারিক নীতি। এই পার্থক্যটুকু খেয়াল না রাখলে কখনো আমরা মানবিক সমতা অর্জন করতে পারবো না।

যে সমাজে মানবিকতা যথাযথভাবে কার্যকর নাই সেটি কখনো মানবিক সমাজ হতে পারে না। কোনো সমাজ যদি মানবিক না হয়, তাহলে সেটার উপরিকাঠামোতে যে মতাদর্শ সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আছে, সেটিও কখনো মানবিক হতে পারে না। আদর্শটা হোক ইসলাম, কমিউনিজম বা অন্য কিছু। যা অমানবিক তা বাতিল, ক্ষতিকর ও ধ্বংসযোগ্য। যা মানবিক তা-ই সুন্দর, তা-ই সত্য এবং বাস্তবায়নযোগ্য।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলোসফি পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম। থাকি চবি ক্যাম্পাসে। নিশিদিন এক অনাবিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। তাই, স্বপ্নের ফেরি করে বেড়াই। বর্তমানে বেঁচে থাকা এক ভবিষ্যতের নাগরিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *