এরদোয়ানের স্বল্পবসনা সমর্থক ও বঙ্গীয় ইসলামপন্থীদের প্রাসঙ্গিক ভাবনা-চিন্তা

নতুন সংবিধানের আওতায় গতকাল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এরদোয়ানের তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনোত্তর হৈ হুল্লোড়ে আক পার্টির নারী কর্মী-সমর্থকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে অশালীন পোশাকে দলীয় পতাকা হাতে উল্লাস করতে দেখা গেছে। এরদোয়ানের দল নিজেকে ইসলামী হিসাবে দাবি না করলেও দুনিয়াজোড়া সেক্যুলার ও ইসলামী মহলে ওদের সম্পর্কে এক প্রকার ইজমা হয়েছে, আক পার্টি ইসলামপন্থী দল। ওরা কিন্তু ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা বলে না। ওসমানী খেলাফতের নামে এক ধরনের সম্প্রসারণবাদের স্বপ্ন দেখায়। জাতীয়তাবাদের প্রতি তাদের কমিটমেন্ট পুনঃ পুনঃ ব্যক্ত করে। জনগণকে, অন্ততপক্ষে নিজ দলীয় অনুসারীদেরকে নামাজের কথা বলে না। তারা যাকাত আদায়ের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা চালু করে নাই। কী এমন ব্যাপার যার কারণে সবাই তাদেরকে ‘ইসলামী’ হিসাবে ট্যাগ লাগাচ্ছে? ওরা কীভাবে ইসলামী দল হলো? এমনকি, ওদের ওখানকার মূলধারার ইসলামী দল ওদের বিরোধিতা করে খেয়ে না খেয়ে কোমর বেঁধে।

বাস্তবে এরদোয়ানেরা যা করছেন একাডেমিক পরিভাষায় বিদ্যজনেরা সেটার নাম দিয়েছেন ‘ইসলামিক মডার্নিজম’। বাংলা কথায়, ইসলামী আধুনিকতাবাদ। তো, এই আধুনিক ইসলাম কতটুকু ইসলাম সমর্থিত? না, এই উত্তর আমি এখানে দিতে চাচ্ছি না। এ নিয়ে এখানে নতুন করে কোনো আলাপ তুলতে চাচ্ছি না। এ বিষয়ে আগ্রহবোধ করলে ইয়াসির ক্বাদী ২০১৪ সালে লন্ডন শহরে “ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি?” শিরোনামে যে লম্বা বক্তৃতা দিয়েছেন সেটার সাবলীল অনুবাদটা পড়ে দেখতে পারেন। সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র তাদের সাইটে প্রশ্ন-উত্তরসহ মোট ৩ পর্বে সেটা ছাপিয়েছে।

বছর কয়েক আগে ইসলামিক মডার্নিজমের ওপর জিয়াউদ্দীন সরদার মহোদয়ের করা একটা ডকুমেন্টারি (Battle for Islam) দেখে কয়েকদিন মাথা ঝিম ঝিম করছিলো। হায় আল্লাহ, এই ধরনের মডার্ন ইসলামের সাথে কীভাবে নিজেকে কো-অপ করবো, ভেবে পাচ্ছিলাম না। সেই ডকুমেন্টারিটাতে দেখবেন ইন্দোনেশিয়ার এক নারী নাপিত সরদার মহোদয়কে সেবা দিচ্ছেন। হেয়ার কাটিং চেয়ারে মাথা হেলান দিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করছেন, আমি একজন পুরুষ। তুমি আমার চুল কাটছো। তুমি কীভাবে ইসলামিস্ট হইলা? ওই তরুণী বলছে– কেন, অসুবিধা কী? আমি তো নামাজ পড়ি। ডকুমেন্টারিটিতে দেখা গেছে, মেয়েটি কাজ শেষ করে একটা স্কুটিতে করে ওর বাচ্চাটাকে নিয়ে বাসায় এসে জিন্সের প্যান্ট আর টি-শার্টের উপর নামাজের হিজাব পড়ে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ছে। এবার বুঝেন…!

জিয়াউদ্দিন সর্দারের ইসলামিক মর্ডানিজম নিয়ে এই মাথা ঘোরানো অনুসন্ধান-প্রদর্শন ক্লাইমেক্সে উঠে যখন তিনি পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ নানান দেশ ঘুরে তুরস্কে পৌঁছান। ডকুমেন্টারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ‘ইসলামপন্থী’ এরদোয়ানের সাক্ষাৎকার আছে। ভিডিও চিত্রটার এক পর্যায়ে দেখা যায়, একেবারে খোলামেলা পোশাক পড়া তুরস্কের একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী নিজেকে একজন ইসলামিস্ট দাবি করে বলছে– দেখো, আমি ঘরে গিয়ে নামাজ পড়ি। গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে সে ওজিফার বই বের করে দেখালো। যেটা সে নিয়মিত পড়ে।

২.

প্রচলিত ইসলামী সংগঠনগুলো মানুষের আমল-আখলাক সংশোধনের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করে। আমি সারাজীবন এ দেশীয় ইসলামী আন্দোলনের মূল ধারাটার সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি। ঘরের গরু কোরবানী করা, পারিবারিক নামাজে ইমামতি করা ইত্যাদির মাধ্যমে ছাত্রজীবন হতেই পারিবারিক ও পরিচিত মহলে একধরনের ‘হুজুর’ টাইপের ইমেজ নিয়ে বড় হয়েছি। প্রচলিত রক্ষণশীল ধারায় সমাজ পরিবর্তন হবে না বুঝতে পেরে এক পর্যায়ে যখন ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’ তথা সিএসসিএস-এর বিকল্প প্লাটফর্মে কাজ করা শুরু করলাম, তখন টের পেলাম, ‘আমরা’ কতটা সমাজবিচ্ছিন্ন! ইসলামী রাষ্ট্রের রঙিন স্বপ্নে বিভোর থেকে আমরা সমাজটাকেও দেখেছি ‘সাংগঠনিক’ অতিশুদ্ধতাবাদের রঙিন কাঁচের ভিতর দিয়ে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ইসলাম নিয়ে, বিশেষ করে হাদীস ও সীরাতের ব্যাপক অধ্যয়নের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে জানলাম– যে শুদ্ধতাবাদী ভার্শনকে আমরা সহী ইসলাম হিসাবে এতদিন পর্যন্ত ‘সাংগঠনিকভাবে’ জেনেছি, তা অতিরঞ্জিত। একজাজেরেইটেড। এবং এই অর্থে রং এন্ড ফেইক। আমাদের অতিশুদ্ধতাবাদী ও অতিরক্ষণশীল ‘উচু’ তাকওয়ার স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে নারী-পুরুষের সম্পর্কের দিক থেকে সাহাবীদের সমাজ ছিল অনেকটাই ‘খোলামেলা’। রাসূলের (সা) যুগে নারী স্বাধীনতা ছিলো এখনকার মুত্তাকী ইসলামিস্টদের কল্পনাতীত। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণে তাদের কাছে মনে হতে পারে, এ যেন খানিকটা ‘ফ্রি-মিক্সিং’এর পরিবেশ! হ্যাঁ, ঠিক তাই। তৎকালীন মদীনার সামাজিক পরিবেশ যৌনতার দিক থেকে ছিলো অনেকটাই ‘অবাধ’। যে যার সাথে যেভাবে পারো থাকো। সম্পর্ক করো। অসুবিধা নাই। তবে, যাই করো, জানিয়ে করো, অনুমোদন নিয়ে করো। সীমারেখা মেনে চলো। সম্পর্ক করলে দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। পারিবারিক ব্যবস্থা বলতে যা বুঝায়। এ ধরনের অবদমনমুক্ত অতি সহজ বৈবাহিক সম্পর্কভিত্তিক ব্যবস্থাকে আমরা এক ধরনের ল’ফুল লিভিং টুগেদার বলতে পারি।

যৌনতা নিয়ে কোনো রকমের অতিসংস্কার বা কুসংস্কার, এক কথায়, কোনো রকমের ট্যাবু সেখানে ছিলো না। এক মহিলা কর্তৃক কাপড়ের কোনা দেখিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে মামলা করেছেন। যাতে করে সে দ্বিতীয় স্বামীর কাছ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রথম স্বামীর ঘরে ফিরে যেতে পারে। এই ইন্টারেস্টিং গল্পটা আজ আর সবিস্তারে বললাম না। এক মহিলা কর্তৃক প্রকাশ্য মজলিশে রাসূলুল্লাহকে (সা) বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার ঘটনা আমরা জানি। পিতার আপন চাচাতো ভাই আলীর (রা) সাথে ফাতেমার (রা) বিয়ে এবং এতে তাদের পারস্পরিক আগ্রহ থাকার কথা আমরা জানি। আয়িশার (রা) বিয়ে হয়েছিল পিতার বন্ধু ও তিন গুণেরও বেশি বয়সী পাত্রের সাথে। তাদের মধ্যে ছিল রোমান্টিক মধুর সম্পর্ক। এখানে আমি সকলের জানা এই কয়েকটা মাত্র উদাহরণের কথা বললাম। এ ধরনের প্রচুর ইন্টারেস্টিং ঘটনা আপনি সীরাত গ্রন্থগুলোতে পাবেন। এগুলো পড়ে বঙ্গীয় তাকওয়াসম্পন্ন মুসলমানেরা আবেগে ভাসে। কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তি সংক্রান্ত সহজতা অবলম্বনের এই নিয়মকে বাস্তব জীবনে মেনে নিতে ও অনুমোদন করতে পারে না।

৩.

ফেইসবুকে ‘মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক’ নামে আমার একটা পেইজ আছে। সেখানে আমি নন-কনসেপ্টচুয়াল তথা পারসোনাল বিষয়গুলো সাধারণত শেয়ার করি। কয়েকদিন আগে আমার এক ভাগ্নির সাথে আমার একটা ছবি সেই পেইজে পোস্ট করার পরে এক বঙ্গীয় ইসলামিস্ট আমাকে মিহি সুরে খুব শাসালেন। আমার ওই ভাগ্নি পর্দা করে না। পেশায় ডাক্তার। ওই সিনসিয়ার ইসলামিস্ট মহোদয়ের সাথে আমার আলাপটা এখানে হুবহু কোট করছি:

প্রশ্নকারী: এই ছবি দিয়ে কি নেকি জমা করতেছেন, নাকি পাপ জমা করতেছেন?

আমার মন্তব্য: যাহা আপনার ধারণা মোতাবেক সঠিক তাহা আপনার জন্য সঠিক। যাহা আমার ধারণা মোতাবেক সঠিক তাহা আমার কাছে সঠিক। লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিন। I am used to keep warm relation with my relatives, no matter they like to follow me in my ideological concerns, or not. I believe in personal liberty, perhaps you not. That’s your business. Not of me.

প্রশ্নকারী: আপনি একজন মুসলিম এবং আপনাকে আমি জ্ঞানী মনে করি। সুতরাং পর্দা সম্পর্কিত জ্ঞান আপনার না থাকার কথা নয়। ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন’ – এই আয়াতটি মুসলিমরা অমুসলিমের সামনে বলবে।

আমার মন্তব্য: আপনি যদি আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কারণে এই কমেন্ট করে থাকেন তাহলে একটু কষ্ট করে আমার “ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নে ক্রমধারার অপরিহার্যতা” শিরোনামের লেখাটা পড়বেন এবং বুঝার চেষ্টা করবেন। আর যদি ফেসবুকীয় হেদায়েত বিতরণের জন্য মন্তব্যটা করে থাকেন তাহলে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নাই।

প্রশ্নকারী: আন্তরিকতার সহিত কমেন্ট করেছি, আপনার কাছে জানতে চাই, আপনি আপনার ভাগ্নিকে নিয়ে যেভাবে ছবি দিয়েছেন এটা কি আপনার দ্বীন সমর্থন করে?

আমার মন্তব্য: হাঁ, করে। খুব সম্ভবত আপনি উপরে রেফারেন্স দেওয়া আর্টিকেলটা পড়েন নাই অথবা ভালো করে পড়েন নাই। কোনো এক প্রযুক্তির কল্যাণে যদি মক্কী যুগের কোনো সাহাবীকে তার কোনো আত্মীয় মহিলার সাথে দেখা করিয়ে দেয়া সম্ভব হতো, তাহলে খুব সম্ভবত এ রকমই দেখা যেত। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করেন। I see Islamic shariah from a bottom-up approach and perhaps you see it from a top-down approach.”

৪.

কথাটা খুব পরিষ্কার। আমাদের এখানকার ইসলামিস্টরা ইসলামকে দেখে টপ-ডাউন এপ্রোচে। তাই তারা এডমিনিস্ট্রেটিভ টপ-ডাউন এপ্রোচের সাথে মতাদর্শগত সোশিও-পলিটিক্যাল বটম-আপ এপ্রোচকে গুলিয়ে ফেলে। বঙ্গীয় ইসলামপন্থীদের সনাতনী ধারার যারা স্টেকহোল্ডার, তাদের যেসব বিগ প্রবলেম, এটি তার অন্যতম।

সনাতনী ইসলামী আন্দোলনপন্থীরাসহ এ দেশের বৃহত্তর ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান রোগ হলো, নারীদের নিয়ে তাদের ওভার সেন্সিটিভিটি। তাদের লাফ-ধাপ-দৌড়-ঝাঁপ-নর্তন-কুর্দন দেখে মনে হয়, ইসলাম বুঝিবা কিছু ডুজ এন্ড ডন্টস-এর জন্য এসেছে। নারীদের পর্দা রক্ষা করার বিষয়টা এই সংক্ষিপ্ত করণীয়-বর্জনীয় তালিকার উপরের দিককার একটা কিছু!

দুঃখজনক হলেও সত্য, এ দেশের ইসলাম, ওভারহোয়েমিংলি পুরুষদের ইসলাম। নারীরা সেখানে অপাংক্তেয়। এমনকি ক্ষণিকের অতিথিও না। পুরুষদের এই মহাদেশীয় ইসলামে নারীরা অবাঞ্ছিত। নারীদের মধ্যে যারা ইসলামিস্ট, প্রকারান্তরে তারা এই পুরুষতন্ত্রের ডিফেন্ডার। পুরুষরা নারীদের যেভাবে দেখতে চায় সেভাবে নিজেদের সাজিয়ে তারা ভালো মুসলিমা। তারেক রমাদানের ভাষায় এরা হলো মূলত ‘হালাল ক্যাপিটালিজমের’ অনুসারী। ‘সালাফী ইসলাম’ হলো এই উঠতি ধারার লোকাল পরিচিতি।

সার্বিকভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সমকালীন বাংলাদেশে আমরা যদি মক্কী যুগে অবস্থান করে থাকি তাহলে আমাদের উচিত হবে, নানা ধরনের বিধিবিধানের চেয়ে ইসলামের বেসিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং ও প্রক্লেমেশান নিয়ে ওভারঅল এন্ড প্রফাউন্ডলি এনগেইজ হওয়া। মনে রাখতে হবে, Islam is not a bundle of rules. Instead, it is life-view. Rules are mere supplementary outcomes. But concepts and understandings are the basics.

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ট্রাডিশনাল ইসলামিক মুভমেন্টের ফরম্যাট হলো, রিক্রুটেড লোকদেরকে যথাসম্ভব রোলমডেল হিসাবে গড়ে তোলা। যাতে তারা সমাজের লোকদের কাছে ‘সত্যের সাক্ষ্য’ হিসাবে দাঁড়াতে পারে। সেজন্য সেইসব লোকদেরকে একটা সিলেবাস, দৈনন্দিন ব্যক্তিগত রিপোর্ট সংরক্ষণ, নিয়মিত সাংগঠনিক জওয়াবদিহিতা ইত্যাদির মধ্যে রাখা হয়। এভাবে ‘ভালো মানুষ’ নির্ণয়ের একটা ‘মান’ বা স্কেল তৈরি করা হয়। এবং সে অনুযায়ী সংগাঠনিক হায়ারআর্কি সেট করা হয়।

সমস্যা হলো, কিছু প্রদর্শনীমূলক ভালো কাজের মাধ্যমে সত্যিকারের ভালো মানুষ তৈরি করা যায় না। ভালো মানুষ তৈরি হতে হয় অন্তর থেকে ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে। নিছক র্ধ্মীয় আবেগ দিয়ে আখেরাতমুখী লোক তৈরি করা যায়, সমাজে ধর্মীয় আবহ তৈরি করা যায়। যেমনটা করছে বিশ্বব্যাপী বৃহত্তম ইসলামী সংগঠনটি। কিন্তু, যে কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালা মানুষকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তা, অর্থাৎ আল্লাহর খলিফা হিসাবে বিশ্বজগতে নেতৃত্ব দেয়া, তাওহীদকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে তোলা, ন্যায় ও সুষম উন্নয়নের ধারায় রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা করা, এক কথায় সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজ হতে বিরত করার কাজটা করতে হলে মানুষকে কনভিন্স করেই তা করতে হবে। সেজন্য তাদেরকে বাস্তবসম্মতভাবে ও কার্যকর-টেকসই উপায়ে কমিটেড হতে হবে।

অবাস্তব কোনো ‘সাংগঠনিক’ আবহের বুদবুদের মধ্যে যত লোকই তৈরি হোক না কেন, মনে মনে ‘মন-কলা’ খাওয়ার মতো তাতে ক্ষিধা মিটবে না, পেট ভরবে না। সময়মতো এসব সিলেবাসের ভিটামিন খাওয়া লোকেরা বাস্তব ময়দানে টিকে থাকতে পারবে না। রাবার টেনে মাপ দিয়ে ছেড়ে দেয়ার পরে যা হয়, এট দ্যা ভেরি ফার্স্ট চান্স, এরা ভেতরকার স্বভাবে ফিরে যাবে।

যে নৈতিকতা বাস্তবজীবন-সংযুক্ত নয়, তা মূলত আইনমান্যতা। আইন মানা আর নৈতিক হওয়া দুটো ভিন্ন বিষয়। তাই তো দেখা যায়, সারাজীবন সাংগঠনিক আইন মানা ‘মানের’ লোকগুলো পেশাগত জীবনে দড়ি ছেঁড়া গরুর মতো গোগ্রাসে দুনিয়াবি নেয়ামত হাতাতে থাকে। যত বড় দায়িত্বশীল, মুয়ামালাতে বিশেষ করে লেনদেনে ততই বেপরোয়া। ব্যতিক্রম বাদে।

৫.

লম্বা লেখা লিখবো না ভাবি। হায় আল্লাহ, ফেইসবুক-পাঠকদের জন্য এটিও বেশ লম্বা হয়ে গেলো! সরি! অবশ্য, আমি লেখালেখি করি আমার একান্ত শুভানুধ্যায়ীদের জন্য। ভবিষ্যতে যারা ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের কাজ করবেন, এসব লেখা মূলত তাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য লেখা। এই ঐতিহাসিক ক্রান্তিকালে যেহেতু ফেইসবুক নামক একটা সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের আছে; এবং কীভাবে যেন Mohammad Mozammel Hoque ফেইসবুক আইডিটার একটা পাঠক মহলও তৈরি হয়ে গেছে, তাই এসব লেখা ফেইসবুকে পোস্ট করা। ফেইসবুক এক্টিভিটি আমার মূল কাজ নয়, অংশমাত্র। তা যারা আমাকে তেমনভাবে জানে না, তারা হয়তো জানেন না। সে যাই হোক।

আমার কাছে ইসলাম সম্পর্কে জানতে, নানা প্রশ্ন নিয়ে লোকজন আসে। এরমধ্যে বোরকা পরে না, মাথায় কাপড় দেয় না, এমন ছাত্রীরাও আছে। কোনো কোনো ছাত্র তাদের ছাত্রী বন্ধুদের নিয়ে আসে। কোনো কোনো ছাত্রী তাদের ছাত্র বন্ধু-সহপাঠীদের নিয়ে আসে। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের সাথে নানা ইসলামিক বিষয় ও ইস্যু নিয়ে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করি। এমনও হয়, আমি নামাজের সময়ে পাশের রুমে নামাজ পড়ে এসে আবার ইসলাম নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা চালাতে থাকি। তাদেরকে নাস্তা-পানি খাওয়াই। বিদায়ের সময় পারলে কদ্দুর আগাইয়াও দিয়ে আসি।

বাহ্যিক আমল-আখলাক ও ভিতরের ভাবনা-চিন্তা, দুটাই যদি উন্নতমানের হয়, তাহলে তো খুবই ভালো। অভিজ্ঞতা বলে, সাধারণত এর একটাকে প্রায়োরিটি দিলে অপরটি আনফোকাসড বা ওভারশ্যাডোড হয়ে পড়ে। এ যেন ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলার মতো ব্যাপার। এই দোটানায় পড়ে আমি মানুষের চিন্তা-চেতনা পরিশুদ্ধির পথ বেছে নিয়েছি। আমার ফর্মূলা বা থিওরি হলো, মানুষের মনে আদর্শের বীজটা বুনে দাও। সময়ে তা আপনাতেই বৃক্ষ হয়ে উঠবে। ফল দিবে। রুলস-রিচুয়ালসের চেয়ে কনসেপ্ট-ক্লারিফিকেশন বোধহয় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

তুরস্কে ইসলামপন্থীদের জয়ে যারা উল্লসিত, তারা সেটা থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়। প্রত্যেকে বসে আছে কখন সবাই মিলে একটা কিছু করবে। অথচ আপনি আপনার দুনিয়াবি অর্জন, আয়, উন্নতি, পদোন্নতি ও প্রসারের জন্য সর্বাত্মকভাবে কাজ করছেন, কারো কাছ থেকে সিদ্ধান্ত আসার অপেক্ষা না করেই। সামাজিক দায়িত্বকে যখন আপনি এতই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, সেটার জন্য কেন আপনি ‘সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের’ অপেক্ষায় বসে আছেন? আল্লাহ তায়ালা কি আপনাকে কোনো সামর্থ্য দেন নাই? আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন– সাবধান, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন– প্রত্যেক নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

নিজেকে একটা ত্রিভুজের মাঝে কল্পনা করুন, যার একটা বাহু আদর্শ বা তত্ত্ব যাকে আপনি প্রেফার করেন, একটা বাহু আপনার ইমিডিয়েট পারিপার্শ্বিকতা তথা যে সমাজ ও দেশে আপনি বসবাস করেন সেটা এবং এই ত্রিভুজের অন্য বাহুটা হলো বৃহত্তর জগত তথা সমকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। এবার নিজের বিবেককে আপনি জিজ্ঞাসা করেন, আপনার করণীয় কী? উত্তর পেয়ে যাবেন। এ নিয়ে আমার এই লেখাটা পড়তে পারেন, “আদর্শবাদীদের চিন্তা ও কাজের মডেল”।

ভালো থাকেন।

এ পর্যন্ত যদি পড়ে থাকেন তাহলে আমি নিশ্চিত আপনাকে দিয়ে কিছু একটা হবে। শুরু করেন…

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Anamul Haque Humaid: ডক্টর তারেক আল সুয়াইদানের কথাটা মনে পড়লো– আল কুরআনে ৯০ শতাংশ হলো তাওহীদ, মানুষের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করা, আখলাক, জীবনাচরণ সুন্দর করা, সুন্দরভাবে বসবাস করা, আদল-ইনসাফ, বিভিন্ন নবী-রাসূলদের গল্প থেকে জীবনাচরণ শেখা ইত্যাদি। বাকী ১০ শতাংশ হুকুম আহকাম। অথচ ৯০ শতাংশে জোর না দিয়ে ১০ শতাংশে জোর দিচ্ছি। ফলে মৌলিক জায়গাটা হারাচ্ছি আমরা।

Mohammad Hafizur Rahman: কী করব মোজাম্মেল ভাই বলেন, জীবনের সেরা সময় ১৯৮১ থেকে ৯৬ আপনাদের সাথে কাটালাম। পুরো পরিবারকে দাওয়াত দিয়ে, দাওয়াতী কাজ করে আপনাদের সাথে মেলালাম । জীবনের এই শেষ বেলায় এখন কী করার আছে! আমাদের দিকনির্দেশনা দেন, আবার কাজে নেমে পড়বো ইনশাআল্লাহ।

Mohammad Mozammel Hoque: আমি তো আপনার সাথে কাজ করতে চাই। আপনারা ‘উন্নত বিশ্বে’ থাকেন, উন্নত জীবনযাপন করেন। আপনারা এনলাইটেন্ড। আমরা দেশে পড়ে আছি। পঁচছি। জীবনে কিছু করলাম না বা করতে পারলাম না। ওই যে কবি নজরুল বলছিলেন, “হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!/… রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা, / তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা, / বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে! /অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!”

Mohammed Abdullah Faruque: এইদিক থেকে চিন্তা করলে শেখ হাসিনার ইসলাম, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ আর শামিম আফজালদের ইসলাম ঠিকই আছে।

Mohammad Mozammel Hoque: আপনি ভুল বুঝেছেন। এ নিয়ে আমি পরে কথা বলবো। এখন একটু ব্যস্ত আছি।

Mohammad Mozammel Hoque: প্রথম কথা হলো, এদেরকে আপানি যালেম বলতে পারেন, কাফের বা তাগুত বলতে পারেন না। দ্বিতীয়ত: কেউ দূরের যাত্রায় কদ্দুর আগাইছে, আর কারো তেমন কোনো জার্নি নাই। শুধুমাত্র কদ্দুর আগায়া খালি জায়গা বদল করেছে। এই দুই গ্রুপ এক নয়। এই কথাটা যদি বুঝতে পারেন ভালো। না হলে অপেক্ষা করেন। আরো পড়েন। চট্টগ্রাম থাকলে একদিন চবিতে আসেন। না হয়, একদিন সময় নিয়ে ফোন করেন। কথা হবে মনখোলা।

Muhammad Noman: লেখায় ইসলামকে নির্দিষ্ট একটি মোড়কের মধ্যে না এনে বৃহৎ আঙ্গিকে দেখার আহবান করা হয়েছে। এটা ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন দুই জায়গায়। যুগের প্রয়োজনে ইসলাম কতটুকু উদার হতে অনুমতি দিয়েছে? যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এতটুকু উদার হতে হয় যে, দিনশেষে আর ইসলামই থাকে না, তাহলে সে-রকম প্রতিষ্ঠা পেতে স্বয়ং ইসলামও নিশ্চয় আগ্রহী নয়। দ্বিতীয়ত: ইসলামের মধ্যে ‘জরুরতের’ জন্য আলাদা বিধান আছে। জরুরতকে সাধারণ নীতি হিসেবে না ধরতে বলা হয়েছে। তাহলে এর উপর কি একটি সার্বজনীন কৌশল নির্ধারণ করা যেতে পারে? এরদোয়ানরা জরুরতের কারণে যা করার করছেন। তাও তাদের নিজস্ব নীতি অনুযায়ী। সেটা যে সবচেয়ে নিখুঁত নীতি হবে এমনটা তো নয়। সব দেশেই যে তা প্রয়োগ করা যাবে তাও নয়। তাছাড়া, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি কতটুকু অপরিহার্য? এর বাইরে গিয়ে, অন্য কোনো পদ্ধতিতে কি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা যায় না?

Mohammad Mozammel Hoque: ইসলামটা কী? এই প্রশ্নটার উত্তরটা বার বার রপ্ত করা উচিত। ইসলাম হলো ঈমান ও আকীদা। আমল বা শরীয়াহ হচ্ছে এর নেসেসারি আউটকাম। শরীয়াহর ক্ষেত্রে গ্র্যাজুয়েলিটি ইজ আ মাস্ট। আর আকীদা তথা ঈমান হলো অখণ্ড। এ নিয়ে হাসান আল বান্না শহীদের একটা বাণী ছাত্রজীবনে আমরা স্টিকার আকারে লাগাতাম: Accept Islam in to to, or, keep it aside. Islam admits no compromise.

মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেছেন, উদখিলু ফিসসিলমি কাআফফা– ইসলামে দাখিল হও পরিপূর্ণভাবে। বলাবাহুল্য, ঈমান হলো ইসলামের প্রথম স্তম্ভ। আমরা পরিপূর্ণ ইসলামকে এককভাবে বিবেচনা করি। এটি ভুল। পরিপূর্ণ ইসলামের মিনিমাম রিকোয়ারমেন্ট হলো ঈমান। আর এর সাফিসিয়েন্ট রিকোয়ারমেন্ট হলো পঞ্চস্তম্ভ বলতে আমরা যা বুঝি, তা।

ঈমান হলো পাস মার্ক। তাকওয়া পার হয়ে এর সর্বোচ্চ চূড়া হলো ইহসান। যা নফসে মুতমাইন্নার স্তরে যারা পৌঁছেছে তারা অর্জন করতে পেরেছে। আমাদের এখানে প্রচলিত ধর্মবাদী কর্মবিমুখ ইসলামে দ্বীন ও শরীয়াহর পারস্পরিক সম্পর্ক ও পার্থক্যটা মোটেও পরিষ্কার নয়।

Muhammad Noman: স্যার, ইসলামের এই ডিভাইডটা সর্বজনবিধিত নয়। মাতুরীদিয়াসহ আরও কিছু মতের অনুসারীদের মত। মুহাদ্দিসীন এবং অন্যান্য মাযহাবের ইমামদের নিকট আমল ঈমানের অংশ। আমলের কারণে ঈমানে তারতম্য হতে পারে। এটা ভিন্ন আলাপ। তবে, মাতুরীদিয়ার কথা ধরে নিলেও তাদের মতেও ‘মা ছাবাতা বিদ্ দরুরাহ’র পর্যায়ের আমলের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় না দেয়ার কথা বলা হয়েছে বিশেষ জরুরত ছাড়া। যেমন– শুকর হারাম, এটা হালাল তখনই হবে যখন জীবন বাঁচানোর আর কোনো বিকল্প না থাকে। তো, রাজনৈতিকভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কতটুকু ছাড় দেয়া যাবে, সে ব্যাপারটা অস্পষ্ট।

MD Emran Hossain: রাজনৈতিকভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কতটুকু ছাড় দেয়া যাবে এটা অস্পষ্ট। এটার নির্দিষ্ট কোন মানদন্ড নেই। সেটা জরুরতের উপর নির্ভর করবে। যেটা আমাদের দেশে অকল্পনীয় মনে হচ্ছে সেটাই অন্য দেশে শুধু গ্রহণযোগ্য নয়, নির্ভরযোগ্য পলিসি। আমাদের উচিত নয় কে কোনটাকে জরুরত হিসেবে এ্যানাউন্স করছে তা দেখা। বরং ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো নিজ নিজ জায়গা থেকে সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্ন রেখে কাজ করা উচিত।

Muhammad Noman: আপনার কথার সাথে আংশিক একমত। ছাড় দেয়ার ব্যাপারটা জেনারাইজেশন করার বিপক্ষে। মানে, কোনো একটি বা একাধিক দেশের মডেলকে সামনে রেখে ছাড় দেয়ার একটা সাধারণ পলিসি গ্রহণ করা।

Mohammad Mozammel Hoque: আপনাদের আলোচনার ধরনটা আমার কাছে কঠিন (inaccessible) বলে মনে হচ্ছে। ভালো থাকেন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। ভুল বুঝবেন না, আশা করি।

Muhammad Noman: দোয়া চাই স্যার।

Mohammad Mozammel Hoque: আমি থিমেটিক বা issue based যুক্তিনির্ভর আলোচনাতে পার্টিসিপেট করি। historical বা referential মেথডের আলোচনাতে আমি সাধারণত এনগেইজড হই না। এইটা আমার একাডেমিক স্টাইল, ব্যক্তিগত রুচি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সে ধরনের extensive ও quantitative পড়াশোনা না থাকার কারণে।

Muhammad Muzahidul Islam: সত্যি, নবী (সা) ও সাহাবাগণের সময়ে নারী-পুরুষের পারস্পরিক আচরণগুলো যখন সীরাতগ্রন্থ ও হাদীস থেকে জানতে পারি, তখন এই সময়ের দৃষ্টিকোণের সাথে সেই সময়গুলো/আচরণ কেমন যেন বাড়াবাড়ি মনে হয়। এতদিন এটা মনে মনে ছিল। এখন কিছুটা সামনে এসেছে। ধন্যবাদ স্যার।

Mohammad Mozammel Hoque: আমার ইচ্ছা হয়, যৌনতা সংক্রান্ত কোরআন-হাদীসের রেফারেন্সগুলোর একটা কালেকশান বের করি। তখন অনেক মুত্তাকী মুসলমানের কী অবস্থা হয়, তা দেখাটা উপভোগ্য হবে। এসব ধর্মবাদিদের অবস্থা হয়েছে এমন যেন তারা পোপের চেয়ে বড় খৃষ্টান, সাহাবা আজমাইনের চেয়ে বড় মুসলমান।

Sabuj Kabir: ধন্যবাদ। ইসলাম অনেক বেশি স্পেস দেয়। কিন্তু আমরা সামান্য কিছু বিষয়কে সামনে এনে সে স্পেসকে ন্যারো করতে পছন্দ করি। ভারতে গুজরাট হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কঠিন অনুসন্ধান চালানো সাংবাদিক রানা আইয়ুবের একটি সভায় উপস্থিত থাকতে পেরেছিলাম। তিনি বক্তৃতায় সুস্পষ্টভাবে বললেন যে নিজেকে তিনি প্র্যাকটিসিং মুসলিম দাবি করেন। সাংবাদিক হিসেবে তিন যে কাজ করেছেন সেটা করার সাহস কোনো ইসলামপ্রেমীর হয় নাই। কিন্তু তার পোশাক নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেন তিনি মুসলিম কি না! এমনকি অনুষ্ঠান শেষে তার সাথে তুলা আমার ছবি নিয়েও অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে।

Mohammad Mozammel Hoque: হাজার-লাখো অন্তসারশূন্য পোশাকি মুসলমানের চেয়ে একজন মানবিক নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ জগতের জন্য বেশি দরকার। একবার কালেমা পড়ে দুনিয়ার সব লোক বেহেশতে যাক, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। আমি মনে করি, দুনিয়া পরিচালনার জন্য যোগ্য মানুষ দরকার। এবং নেতৃত্ব সংক্রান্ত শরিয়তের মাসলাও এটি। অযোগ্য আবেদের চেয়ে যোগ্য ফাসেক অনেক ভালো।

শরীফ উদ্দিন: এ ধরনের বিশ্লেষণের বিপদ হচ্ছে, এরদোগান যদি এই নির্বাচনে হেরে যেতেন (সে সম্ভাবনা ব্যাপক আকারেই ছিলো), তাহলে এই বিশ্লেষণ বাতিল হয়ে যায়। ঠিক যেভাবে মুরসির পতনের পর সামাজিক কাজ বিষয়ক তত্ত্ব খুব একটা শোনা যায় না। টপ টু বটম আর বটম টু টুপ – একেবারেই খেলো আলোচনা মনে হয় আমার কাছে। ইরানে তো (শিয়ারা কতটুকু ইসলাম অনুসারী, সেটা ভিন্ন তর্ক) বটম টু টপ পদ্ধতি চলছে। তাদের বুঝ অনুযায়ী তারা তো বেশ কট্টরপন্থী ইসলাম দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছে। উনারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যে জায়গা পর্যন্ত চলে গিয়েছেন, এরদোগান আজীবন ক্ষমতায় থাকলেও সেটুকু যাবেন বা যাওয়ার ইচ্ছা আছে বলে তো মনে হয় না।

Mohammad Mozammel Hoque: এরদোয়ান বিজয়ী হওয়ার উপরে আমি ততটা গুরুত্ব দিতে চাই না। সেটা আমার লেখা পড়লে বুঝতে পারবেন। আমি গুরুত্ব দিয়েছি একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম নেতার পেছনে সাধারণ জনগণের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। নারীদের বিষয়টা এসেছে প্রতীকীভাবে। এখানকার নারীদের ব্যাপারে যা বলেছি সেটা এখানকার কনটেক্সটের জন্য প্রযোজ্য। এবার হেরে গেলেও তো তিনি অন্তত ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। সেটা তো ঠিক থাকতো, তাই না?

Shariful Islam: স্যার, আপনাকে আপনার পুরোনো দ্বীনী ভাইয়েরা কি চোখে দেখে, একটু বলুন।

Mohammad Mozammel Hoque: উনারা আমাকে এড়িয়ে চলেন। আমিও উনাদেরকে এভয়েড করে চলি। এমনিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক সবার সাথেই ভালো।

Abu Jarir: এক সাহাবী এক মহিলাকে বাজারে বসে চুমু খেয়েছিল এবং নিজেই তা রাসূলের (সা) কাছে বলেছিলেন। রাসূল (সা) নামাযের পরে বললেন, তুমি যেহেতু নামায পড়েছো তাই তোমার গুনাহ মাফ হয়ে গেছে। হাদীসের ভাবার্থ। গতকাল একটা হাদীস পড়লাম। সেখানে রাসূলের (সা) ওফাতের পরে আমিরুল মু’মিনিন আবুবকর (রা) এবং ওমর (রা) এক মহিলার সাথে দেখা করতে গেলেন। মহিলা তাদেরকে দেখে কেঁদে ফেল্লেন। হযরত আবুবকর এবং ওমর (রা) বললেন আল্লাহর কাছে রাসূলের (সা) জন্য উত্তম প্রতিদান রয়েছে। মহিলা তখন বললেন আমি এ জন্য কাদঁছি না যে রাসূলের (সা) ওফাত হয়েছে, বরং এজন্য কাঁদছি যে ওহী আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এ কথা শুনে আবুবকর ও ওমরও (রা) কেঁদে ফেললেন। (হাদীসের ভাবার্থ) এখানে পর্দার কড়াকড়ি কোথায়? এ রকম অনেক হাদীস আছে, যা পড়লে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়। ধন্যবাদ স্যার।

Mohammad Mozammel Hoque: আমাদের এখানে পর্দা নিয়ে যে কড়াকড়ি সেটা উপমহাদেশীয় পুরুষতন্ত্রের প্রভাবের কারণে। লোকাল সংস্কৃতিকে আমরা ইসলামের নামে চালিয়ে দিচ্ছি এবং এই কাজে fueling করছে আমাদের আলেম সমাজ এবং তথাকথিত ধর্মভীরু মুসলমানেরা।

Abu Jarir: শিয়া-সুন্নীদের ইফতারের টাইমিং নিয়ে একটা আলোচনা শুনছিলাম। তাতে দেখলাম, ব্যাপারটা মোটেই ডিফিকাল্ট নয়। কিন্তু দুই পক্ষের আলেমরাই শুধু ত্যানা পেচাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণ পাবলিকরাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর আলেমরা বাস্তব ইসলামের চেয়ে গ্র্যামারটিক্যাল ইসলামের ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছে।

ওছমান গনি ফরহাদ: স্যার, পর্দা ও একে পার্টির বিষয়টা স্পষ্ট হতে পারিনি। এ দুটি বিষয় নিয়ে স্পষ্ট কিছু লিখবেন?

Mohammad Mozammel Hoque: মুসলমানরা হলো জন্মগতভাবে নেতা। আল্লাহর খলিফা হিসেবে। নেতৃত্বের এই দায়িত্ব পালন করতে গেলে তাদেরকে একইসাথে ভালো আমল-আখলাক এবং দুনিয়া পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এর প্রথমটাতে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও দ্বিতীয়টা উচ্চ মানের হতেই হবে। আমাদের এখানে হিসাবটা করা হয় ঠিক এর উল্টোভাবে। সে যাই হোক, এরদোয়ানের নেতৃত্বে একে পার্টি গণমুখীনতার ওপর যতটা জোর দেয় তার অনুসারীদের ব্যক্তিগত আমল-আখলাকের ওপর ততটা জোর দেয় না। এটি তাদের বাস্তবসম্মত নীতি। আমি এটাকে সমর্থন করি।

একবার ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমাদের একজন নেতা ফুজুর সম্পন্ন, কিন্তু যোগ্য নেতৃত্ব প্রার্থী আছে। এছাড়াও আমাদের নেতা হওয়ার মতো আরেকজন তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তি আছে, কিন্তু তিনি ততটা যোগ্য নন। আমরা কার হাতে নেতৃত্ব তুলে দিব? ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছিলেন, ফুজুর সম্পন্ন যোগ্য নেতার ব্যক্তিগত ফাসেকী তার নিজের ওপর। অন্যদিকে অযোগ্য কিন্তু তাকওয়াসম্পন্ন ব্যক্তির অযোগ্যতার দায় পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। তাই, তোমরা খারাপ চরিত্রের কিন্তু নেতৃত্বের যোগ্যতাসম্পন্ন লোকটাকে নেতা বানাও।

যারা ইসলামী আদর্শ মোতাবেক সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ করবে তাদেরকে কাজের মূল ফোকাস বা গুরুত্ব কীসের উপর দেওয়া উচিত তা বুঝতে পেরেছেন আশা করি। তুরস্কের একে পার্টির কার্যক্রম ও সাফল্য আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

ওছমান গনি ফরহাদ: এই পয়েন্ট শরীয়তসম্মত কিনা দেখছি।

Mohammad Mozammel Hoque: আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের রেফারেন্স দিলাম, আর আপনি বলছেন, শরীয়ত সম্মত কিনা তা যাচাই করে দেখবেন! এইটা কেমন কথা? অবাক হলাম!

ওছমান গনি ফরহাদ: আমি জানি যে, ফাজির কখনো মুসলিমদের ইমাম হতে পারেন।

Mohammad Mozammel Hoque: দুনিয়াবী কাজকর্মের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতা হচ্ছে মূল শর্ত। সততা, নৈতিকতা ও তাকওয়া, এগুলো হলো সহায়ক বিষয়।

ওছমান গনি ফরহাদ: আপনি সাধারণ নেতৃত্বের কথা বলেছেন নাকি ইসলামী নেতৃত্বের কথা বলেছেন?

Mohammad Mozammel Hoque: আপনি কি মনে করেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল অ-ইসলামী নেতৃত্বের কথা বলেছেন? এটা পড়লে আপনার ধারণা আরও ক্লিয়ার হবে আশা করি– ‘সফল নেতৃত্ব গঠনে সুন্নাহসম্মত বাস্তব কর্মপন্থা’।

ওছমান গনি ফরহাদ: পড়ে নিবো।

HaMim Imran Hussain: আপনার এই বিশ্লেষণধর্মী লেখার অধিকাংশের সাথেই আমি একমত। তবে আমি মনে করি, আপনার আত্মীয়ার ছবি সংক্রান্ত ঘটনার ক্ষেত্রে আপনি ভূমিকা রাখতে পারতেন। অর্থাৎ, ছবি না দিয়ে উক্ত আত্মীয়াকে ব্যাপারটা আপনার অসাধারণ বিশ্লেষণাত্মক ব্যাখ্যা (যেটা আমি খুব উপভোগ ও পছন্দ করি) দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারতেন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Mohammad Mozammel Hoque: যত অসাধারণ ইত্যাদি ইত্যাদি যাই বলেন না কেন, পারিবারিক পর্যায়ে এসে কখনো কখনো দেখা যায় সবকিছু ফেইল। বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করা ছাড়া নিছক ব্যক্তিগতভাবে অনেক কিছুই করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

HaMim Imran Hussain: আপনার এই সীমাবদ্ধতার অনুভুতির সাথে আমিও একমত। তবে দাওয়াতী মনোভাব নিয়ে যার যার অবস্থান থেকে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেই পারি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আপনাকে আবারো অসংখ্য ধন্যবাদ।

Mohammad Mozammel Hoque: পারিবারিক পর্যায়ে তিক্ততা সৃষ্টি না করে পূর্ণ সহাবস্থান করাটা হেদায়েতের অংশ বা সুন্নতের দাবি।

Mojibur Rahman Monju: ভাই, অনেকদিন পর আপনার লেখা পড়লাম। একটা চিন্তা বা দর্শনের ব্যর্থতার এন্টিথিসিস থেকে নতুন চিন্তা দানা বাঁধার জন্য একটা যৌক্তিক সময় লাগে। আমাদের মধ্যে এখন যা হচ্ছে সেটা হলো রিঅ্যাকশন। তাই যা ভাবছি সবই রি-অ্যাকশনারি হিসেবেই ভাবছি। এই ভাবনা চিন্তার পাল্টা-পাল্টি থেকে সিনথিসিস হিসেবে একটা ফিলসফিক্যাল গ্রাউন্ড নিশ্চয়ই দাঁড়াবে। সময় ঘনিয়ে আসছে। তারপরের কাজটা মনে হয় সহজ হবে। কারণ, সমাজটাও ততদিনে নতুন কিছু গ্রহণ করতে প্রস্তুত হবে।

আরেকটা বিষয় এরদোয়ানকে ‘ইসলামিক মর্ডানিজম’-এর প্রবক্তা বলতে আমি রাজী নই। আমার বিবেচনায় এরদোয়ান স্রেফ একজন ক্যারিশমেটিক ন্যাশনালিস্ট পলিটিক্যাল লিডার।

Mohammad Mozammel Hoque: আমি এত এত লেখা লিখলাম এতদিন ধরে, আর আপনি মাত্র এইটা পড়লেন! খুব আফসোস হলো আমার। সে যাই হোক, এ নিয়ে আপনার গতকালকের লেখাটা খুব ভালো হয়েছে। ইসলামিক মর্ডানিজম সম্পর্কে আমি যা জেনেছি সে অনুসারে এরাও এর একটা ভার্শন। জিয়াউদ্দীন সরদারের করা ডকুমেন্টারিটার লিঙ্ক পাচ্ছি না। সেটা আপনাকে দিতে পারলে দেখে বুঝতে পারতেন ইসলামিক মডার্নিজমের বাস্তব চিত্র।

সে যাই হোক আপনি যে আমার এতদিনের এত লম্বা চওড়া লেখাজোকা পড়েন নাই সেটা জন্য আবারো দুঃখবোধ করছি।

ভালো থাকেন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

Mojibur Rahman Monju: ভাই, আমার গোপন উইকনেস তো আপনি জানেন– ‘পাঠে অনভ্যাস’। লম্বা লিখা আমি লিখতে ভালোবাসি, পড়তে নয়। অতএব, আপনার দুঃখবোধ লং লাস্টিং হবে মনে হয়। তারপরও এহতেসাব গ্রহণ করে নিলাম।

আপনার সাথে অনেকদিন আড্ডা দেয়া হয় না। লম্বা একটা আড্ডার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে অনেকদিন থেকে। ঢাকায় আসলে একটা এপয়ন্টমেন্ট আমার নামে আগাম বুকিং থাকলো।

Mohammad Mozammel Hoque: তাহলে তো বিশেষ বিশেষ লোকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলোর সংক্ষিপ্তসার তৈরি করতে হবে। করতে পারলে ভালো হয়। অবশ্য অনেকে এটাও বলেন, “লেখাগুলো খুব সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। বিষয়ের গুরুত্ব অনুসারে আরো একটু বিস্তারিত লেখা উচিত ছিল।” লেখাতে রেফারেন্স সেট করলে সেগুলো আরো অনেক বড় হয়ে যেত।

সে যাই হোক, ধানমন্ডি লেকের পারে, বিশেষ করে ছাদের উপরে গপসপ মারতে ভালোই লাগার কথা। দেখা যাক। দোয়া করবেন।

Mojibur Rahman Monju: ভাই Sorry, সংক্ষিপ্তসার করার দরকার নেই। যেভাবে আপনার স্বাভাবিক ছন্দ সেভাবেই লিখুন।

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, কিছুটা ব্যাখ্যা করে না বললে, বিশেষ করে স্রোতের বিপরীত কোনো কথা সংক্ষেপে বললে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি হয়।

ইউটিউবে আমার যেসব ভিডিও বক্তব্য নিয়মিত আপ করছি, সেগুলো পারলে যদি দেখেন খুশি হবো। “সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন” ও “যুক্তি ও জীবন” – এই দুইটা চ্যানেল।

Mojibur Rahman Monju: ইনশাআল্লাহ দেখবো।

ইনক্লুসিভ মুহাম্মদ ইকবাল: আচ্ছা, তাইলে যে বলা হইল একবার চোখ পড়লে নামিয়ে নেয়ার জন্য, দ্বিতীয় বার তাকানো গুনাহ। আবার দৃষ্টি সংযত রাখার জন্য!!

Mohammad Mozammel Hoque: স্থান-কাল-পাত্র, পরিবেশ-পরিস্থিতি, বিশেষ করে ব্যক্তির ভিতরকার একান্ত অনুভূতি থেকে প্রত্যেকে যে যার মতো করে বুঝে নিবে কখন কীভাবে কী করতে হবে।

কোরআন হাদিসের কোনো কোন কোন কথা সরাসরি নির্দেশ এবং কোন কোন কথা নির্দেশনামূলক সেটার পার্থক্য বুঝতে হবে। এ প্রসঙ্গে আমার একটি লেখা: ‘ইসলাম অনুসরণের ক্ষেত্রে স্ট্রাকচারাল বনাম এসেনশিয়াল হুকুমের পার্থক্য’। আরো একটি লেখা: ‘নারী অধিকার প্রসঙ্গে শরীয়াহর নির্দেশ বনাম নির্দেশনা’।

আব্দুল্লাহ আন নাহিয়ান: স্যার, আপনার লেখাটিতে আপনি ইসলামিক মডার্নিজমের প্রবক্তা হিসেবে এরদোয়ানকে দাঁড় করিয়েছেন। আসলে আমি এরদোয়ানকে ক্যারিশমাটিক জাতীয়বাদী নেতা বলতে পছন্দ করবো। তাকে আমি ইসলামের পক্ষের শক্তি বলতে চাই। যিনি ইসলামের বিপক্ষে কিছু করছেন না। তেমনি ইসলামকে খুব বেশি উজ্জিবিতও করছেন না। তাই আমি তাকে মডার্নিস্ট ইসলামিক লিডার বলতে পারছি না।

Mohammad Mozammel Hoque: আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা + ইসলামী মূল্যবোধ = ইসলামিক মর্ডানিজম। এবার কোনটা কত পার্সেন্ট নিবেন বা থাকবে সেটা কনটেক্সচুয়েলাইজড। একেক জায়গায় একেক রকম। উপরের সূত্রটা ইসলামিক মডার্নিজমের মূল কাঠামো। গাড়ি বলতে কী বুঝায় সেটা আমরা বুঝি। গাড়ি যে বাড়ি নয়, সেটাও বুঝি। যদিও একেক গাড়ি একেক রকম। একেক বাড়ি একেক রকম।

আব্দুল্লাহ আন নাহিয়ান: স্যার, আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধার জন্য আমরা কি ফরজকে অবমাননা/বাদ দিতে পারবো? প্রযুক্তিগত সুবিধা নিতে গিয়ে অনেক সময় ইসলামী মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলি। তখন সেটাকে কী বলবেন?

Mohammad Mozammel Hoque: “আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধার জন্য আমরা কি ফরজকে অবমাননা/বাদ দিতে পারবো?” না, একজন ঈমানদার মুসলিম তা পারে না। আপনার এই প্রশ্ন এবং আমার এই উত্তর হলো এক লাইনের আলোচনা, কীভাবে কোথায় কী চলছে, সেটা ভিন্ন আলোচনা। ইসলামিক মডার্নিজমের যে ফর্মকে আমি প্রমোট করি সেটার বিবরণ পাবেন ইয়াসির ক্বাদীর আলোচনায়। মূল পোস্টে সেটার রেফারেন্স দেয়া আছে। সেটা পড়েন। এরপর কথা হবে।

Nazrul Islam: দুইটা বিষয়:

১। যেভাবে ধর্মীয় গোঁড়ামির মধ্যে আছি আমরা, এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক যুগের মধ্যে লোকেরা ইসলামকে ব্যাকডেটেড মনে করবে এবং বিশ্বাস করলেও তা পালন করতে অনুৎসাহী হয়ে পড়বে। আপনার আলোচনায় একটা সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।

২। বিবাহের ব্যাপারটা যদি সহজলভ্য হতো এবং অবাধ হতো, তাহলে আমাদের আজকের সমাজের মতো ব্যাভিচার, পরকিয়া ইত্যাদি অনেকাংশে কমে যেত। আপনার আলোচনায় এ ব্যাপারে যে ইঙ্গিত পেলাম সেভাবে না হলে সামনে সমাজ আরও ভয়াবহ রূপ নিবে। আজকাল একাধিক বিয়েকে অপরাধ বা অন্যায়ের দৃষ্টিতে দেখে।

Mohammad Mozammel Hoque: আপনার প্রথম বিষয়ে আমার বক্তব্য হলো, ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে বা ধর্ম হিসেবে সমাজের এক পাশে থাকা নয়, বরং সমাজের মূলধারায় থাকার জন্য যা করা দরকার সেটা করা। এই কাজের জন্য বাস্তবে কী করা যেতে পারে এবং ইসলামের ভিতর থেকে ব্যাপারটা আসলে কী রকম সেটা তুলে ধরা, এই কাজটাই আমি করছি।

আপনার দ্বিতীয় বক্তব্যের ব্যাপারে আমার একটা প্রপোজিশনের কথা বলবো: “ventilation prevents explosion”

Aminul Islam: ”প্রসঙ্গ: তুরস্কে এরদোয়ানের জয় ও মুসলিম বিশ্বে চিন্তায় নাড়া”

আমি মনে করি, রাজনীতি বা সামাজিক আন্দোলন তথা ইসলামের ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের প্রচেষ্টা কোনো সরল গণিত নয়। অঙ্কে ২+২ = ৪, এমন যারা উত্তর দেবেন তারা সবাই ১০০% মার্ক পান। কিন্তু রাজনীতি, পলিসি, সমাজ ও পাবলিক এনগেজমেন্টের ক্ষেত্রে ২+২ = ৪ যারা বলবেন তারাও সঠিক, আবার যারা বলবেন ১+৩ = ৪ তারাও সঠিক। মানে এখানে বিস্তর চিন্তা ও অনেক মতামত গ্রহণ করার সুযোগ আছে।

আর ইসলামে সবই হালাল, তবে যা হারাম করা হয়েছে সে সব ব্যতীত। সুতরাং ”ইসলামের ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের প্রচেষ্টাকেন্দ্রিক রাজনীতি”তে বহু মানুষের মত, চিন্তা, কৌশল গ্রহণ করে পাবলিক এনগেজমেন্টের বিস্তার ঘটানোর সুযোগ অবারিত, খোলা। এটা ধারণ করতেই হবে। অন্যথা সমাজ থেকে ছিটকে পড়বো আমরা।

এরদোয়ান এখন যা করছেন, ১৫ বছর আগে তা করেননি। আবার তাঁর বর্তমানের কর্মকৌশল ১৫ বছর পরে সঠিক নাও হতে পারে। ইসলাম এ রকম কর্মকৌশল সমর্থন করে।

সুতরাং, এরদোয়ান ও তুরস্ক সম্পর্কে আপনি/আপনারা যা বলছেন তা-ই একমাত্র সঠিক আর অন্যেরা বেঠিক – এমন ভাবনা ভুল। এক্ষেত্রে অনেকের কথাই সঠিক বলে আমি মনে করি।

এগুলো আমার কথা, এটা আমার পক্ষ থেকে, তবে আল্লাহই একমাত্র সঠিক জানেন।

Afnan Hasan Imran: বেশ কিছুদিন ধরে চিন্তা করছিলাম শিবির আর ছাত্রীসংস্থা কাছাকাছি সময়ে যাত্রা শুরু করলেও শিবির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এন্টি-ইসলামপন্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে খেলতে পারছে, অথচ ছাত্রীসংস্থা এখনো সাইড বেঞ্চে বসে আসে কেন? যাই হোক, এই প্রশ্নের উত্তর পেলাম আপনার এই লেখায়। উস্তায মওদূদী তার ইজতেহাদী জ্ঞান দিয়ে সেই সময়ের কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে অনেক কিছুই ধার করে তার সিয়াসতে ইসলামীয়া তত্ত্ব সাজিয়ে ছিলেন। ক্যাপিটালিজমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে নিজস্ব তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু অতিরাজনৈতিক কর্মসূচিতে জড়িয়ে নারীনীতি নিয়ে তিনি খুব বেশি কাজ করার সুযোগ পাননি। পরবর্তীতে তার অনুসারীদের মধ্যে ইজতেহাদের সেই ধারা আর চালু থাকেনি। অতি-অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে জড়িয়ে পড়া এই অনুসারীদের নারীনীতি নিয়ে কাজ করার সেই সময়ই বা কোথায়?? কালেকশন, প্রোগ্রামাদি বাস্তবায়নেই তো তাদের সময় চলে যায়। সনাতনী ইসলামিস্টদের এখনকার এই ওভার সেন্সিটিভ নারীনীতির এটাই মনে হয় একমাত্র কারণন। মাওলানা সময় সুযোগের অভাবে সে সময় এই উপমহাদেশে বিদ্যমান অতি রক্ষণশীল নারীনীতিকে ইনকর্পোরেট করেছিলেন, পীরানি সিলসিলায় ইসলামী আন্দোলনপন্থীরা আজো তা অনুসরণ করে চলছে।

Mohammad Mozammel Hoque: কন্ট্রাডিকশনগুলো ছিল মাওলানা মওদূদীর নিজের মধ্যেই। যার প্রতিফলন ঘটেছে সংগঠন ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনাতে। A man cannot be all good and alright.

Afnan Hasan Imran: মাওলানার চিন্তাধারায় কন্ট্রাডিকশন ছিলো হয়তো, কিন্তু তাঁর সবচাইতে বড় ব্যর্থতা (আমার অনুমান, সঠিকভাবে বলতে পারছি না) মনে হয় ইজতেহাদ অব্যাহত রাখার উপযোগী কোনো সিস্টেম চালু না করে যাওয়া। যতদূর জানি, শিয়া ইরানেও মাওলানার সাহিত্যের ব্যাপক প্রভাব। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক চাপের মুখেও ইরান টিকে আছে অব্যাহত ইজতেহাদের কারণে। ইজতেহাদের এই বুঝজ্ঞান তারা মাওলানার সাহিত্য থেকেই পেয়েছেন বলে মনে করি। কিন্তু খোদ তার অনুসারীদের মধ্যে সেই বুঝজ্ঞান কেন জানি গড়ে উঠে নাই।

Mohammad Mozammel Hoque: উনি তো উনার আশেপাশে সমকক্ষ কোনো লোককে রাখেন নাই। যারা ছিল তাদেরকে সরিয়ে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত উনার কাছে ছিল উনার একনিষ্ঠ অনুসারীরা। এরপরে যা হবার তাই হলো।

Afnan Hasan Imran: একমত।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *