সুষম সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নৈতিকতা, স্বার্থ ও প্রবৃত্তির মধ্যে সমন্বয়ের অপরিহার্যতা

১. এথিকস:
মানুষ তার স্বার্থ বা ইন্টারেস্ট দ্বারা চালিত হয়। চাহিদা, স্বার্থ বা ইন্টারেস্টের মধ্যে যখন সংঘাত হয় তখন মানুষ স্বীয় ইন্টারেস্টগুলোর মধ্যে কোনোটাকে কোনোটার ওপর প্রায়োরিটি দেয়। সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্য থেকে গ্রহণযোগ্যতার সিরিয়াল তৈরি করা হলো নৈতিকতা। তৈরিকৃত প্রায়োরিটি লিস্টের এক নম্বর বিষয় বা কাজটা সম্পন্ন করা বা করার চেষ্টা করা হবে স্বভাবতই নৈতিকতার এক নম্বর দাবি।

একটা প্রচলিত ধারণা হলো, ভালো মানুষেরা সর্বদা নৈতিকতা দ্বারা পরিচালিত হয়। কথাটা অর্ধেক সত্য। অর্ধেক ভুল।

স্বার্থচেতনা বা সেন্স অব ইন্টারেস্ট মাত্রই নৈতিকতা নয়। যদিও নৈতিকতা মাত্রই এক ধরনের স্বার্থচেতনা। নৈতিকতার কোনো প্রসংগ বিবেচনায় আসতে পারে না যেখানে বিকল্প কোনো এক বা একাধিক করণীয় নাই বা থাকে না। কোন বিচারে কোন কাজকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হবে তা স্থান, কাল ও পাত্র সাপেক্ষ। এই দৃষ্টিতে, নৈতিকতা হলো অনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একাধিক সুযোগের মধ্য থেকে কোনো একটাকে ‘একমাত্র করণীয়’ হিসাবে নির্ধারণ করা।

২. ইন্টারেস্ট:
ইন্টারেস্ট কিন্তু সে রকম অনির্দিষ্ট নয়। ইন্টারেস্ট মাত্রই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক কোনো না কোনোভাবে ইতোমধ্যেই অবশ্য করণীয় হিসাবে নির্ধারিত। তাই, ইন্টারেস্টের সাথে যখন নৈতিকতার সংঘাত হবে তখন যে কোনো ব্যক্তি অবলীলায় নিজের ইন্টারেস্টের দাবিকে অগ্রাধিকার দিবে। কোনো মানুষই এর ব্যতিক্রম নয়। ভালো মানুষ হচ্ছে তারা যারা সার্বজনীন কোনো ইন্টারেস্টের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইন্টারেস্টগুলোকে ফিক্স করে। যার ফলে, নৈতিক মানসম্পন্ন ব্যক্তির নৈতিকতা ও স্বার্থচেতনার মধ্যে সামঞ্জস্যতা থাকে।

কারো নৈতিকচেতনা ও স্বার্থচেতনার মধ্যে যখন কনফ্লিক্ট হবে তখন সে স্বার্থচেতনাকে অনিবার্যভাবে প্রায়োরিটি দিবে। একে আমরা সাধারণত স্বার্থপরতা হিসাবে বলে থাকি। অন্তর্গতভাবে সব মানুষই স্বার্থপর। তবে, যাকে আমরা সচরাচর স্বার্থপরতা বা সেলফিসনেস হিসাবে বলি তা হলো বৃহত্তর নৈতিক দৃষ্টিভংগী বা প্যারাডাইম অব প্রায়োরিটির বাহ্যত:স্বীকৃত মানদণ্ডের সাথে ব্যক্তির ইন্টারেস্ট বা ব্যক্তিস্বার্থচেতনা কনসিসটেন্ট না হওয়া।

তাহলে, বুঝা গেলো, কোনো ধরনের সোশিও-কালচারাল-পলিটিক্যাল-ফিলোসফিক্যাল এথিকস নয়, মানুষের বাস্তব জীবন ও কর্মের ক্ষেত্রে বেসিক ডিটারমাইনিং ফ্যাক্টর হলো তার সেন্স অব পারসনাল ইন্টারেস্ট। না, কথা এখানে শেষ নয়। এথিকসের উপরে যেমন ইন্টারেস্ট, তেমনি করে ইন্টারেস্টের উপরেও একটা মোর ইমপরটেন্ট বা বেসিক ফ্যাক্টর আছে। তা হলো, ব্যক্তির সহজাত প্রবৃত্তি বা ইন্সটিংক্ট।

৩. ইন্সটিংক্ট:
ব্যক্তি ততক্ষণ নৈতিকতাকে মেনে চলবে যতক্ষণ তা তার ইন্টারেস্টের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি না করবে। একইভাবে, ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত ইন্টারেস্টের বিষয়কে প্রায়োরিটি দিবে যতক্ষণ তা তার কোনো ইন্সটিংক্টিভ মোটিভের সাথে সাংঘর্ষিক না হবে। যখনই ইন্সটিংক্টিভ কিছু সামনে এসে পড়বে তখনই ব্যক্তি অবশ্যম্ভাবীভাবে বা ইনটুইটিভলি সব ভুলে সেই ইন্সটিংক্টকে সেটিসফাই করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। অর্থাৎ ইন্সটিংক্টের দাবি হলো যে কোনো মানুষের কাছে আনএভয়েডেবল এক নম্বরের দাবি। আত্মরক্ষা হলো এক নম্বর ইন্সটিংক্ট।

যে নৈতিক মানদণ্ড বা তত্ত্ব মানুষের এই গঠনগত অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিবে, স্পেইস দিবে, সেটাকে ঠিক রাখতে চাইবে বা প্রায়োরিটির এই সিরিয়ালিটিকে কায়েম করতে চাইবে, একমাত্র সেই নৈতিক মানদণ্ড বা তত্ত্বই হবে গ্রহণযোগ্য। কেননা, তা প্রকৃতিসংগত।

আমার দৃষ্টিতে এই ন্যাচারাল মোরাল স্ট্যান্ডার্ডের অপর নাম ইসলাম। এজন্য একে আমরা ফিতরাতের ধর্ম বলি। অবশ্য এখানে ‘ধর্ম’ বলতে রিলিজিয়ন বলতে আমরা যা বুঝি তা বুঝানো হচ্ছে না। ‘ফিতরাতের ধর্ম’ বলতে এখানে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবনব্যবস্থাকে বুঝানো হচ্ছে।

৪. কাদের জন্য এবং কেন এই লেখা?
আজকের দিনে যারা সমাজকর্মী হিসাবে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য জরুরী হলো, মানুষ সম্পর্কে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা পোষণ করা। প্রকৃতিবিরুদ্ধ ও অপ্রাকৃতিক ধারণার বশবর্তী হয়ে যতই ‘কাজ’ করেন না কেন, সমাজ পরিবর্তন হবে না। বাস্তব পরিবর্তনের জন্য চাই বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবসম্মত কর্মপদ্ধতি।

এজন্য দরকার হলো মানুষের ইন্সটিংক্টগুলোকে সর্বাধিক পরিমাণ সম্মান করা ও গুরুত্ব দেয়া। সেগুলোকে আদর্শের বলয় ও কাঠামোতে যথাযথাবে একোমোডেইট করা ও বাস্তব কর্মপদ্ধতিতে সেগুলোকে প্রায়োরিটি দেয়া।

এর পরবর্তী ধাপে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো মানুষের ইন্টারেস্টগুলোকে যথাসম্ভব সেটিসফাই করা। নৈতিকতার খেলাফ হওয়া বা বস্তুগত সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো ইন্টারেস্টকে সেটিসফাই করার সুযোগ দিতে না পারলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর ইন্টারেস্টের সাথে কনফ্লিক্ট করাটাকে যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়া। একান্ত সম্ভব না হলে, সুনির্দিষ্ট কোনো স্বার্থগত বিষয়ে মানুষকে ছাড় দিয়ে সেই আপাত ক্ষতিকে মেনে নেয়া।

ইন্সটিংক্টের সাথে তো নয়ই, মানুষের সেকেন্ডারি ইন্সটিংক্ট তথা ইন্টারেস্টের সাথে গোল বাঁধিয়ে ফেললে আপনি আদর্শ নিয়ে খুব বেশি আগাতে পারবেন না। জনগোষ্ঠীর একটা ক্ষুদ্র অংশের মাঝে আদর্শের একটা বলয় সৃষ্টি করা গেলেও এ ধরনের অনাকাংখিত ও গোলমেলে পরিস্থিতিতে বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রে, আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা ও তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হাত-পা ঝেড়ে সাঁতরাতে না পারলে যেমন লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না, তেমনভাবে ছোট ছোট পার্টিকুলার-লোকাল বিষয়ে আননেসেসারি কনফ্লিক্টে জড়িয়ে পড়া হতে বেঁচে চলতে না পারলে কোনো জনপদে আদর্শ প্রতিষ্ঠার কাজকে এগিয়ে নেয়া যায় না। অনেকটুকু এগিয়েও শেষ পর্যন্ত সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। উপযুক্ত আদর্শ, জনশক্তি, ময়দানের উর্বরতা, সময়ের উপযোগিতা ও অনুকূল পারিপার্শ্বিকতা থাকা সত্ত্বেও।

উপরেই বলেছি, একবিংশ শতাব্দীর এই সমকালীন প্রেক্ষাপটে যারা কোনো সমাজ ও দেশে আদর্শ প্রতিষ্ঠার কাজ করবেন, তাদের গাইডলাইন হিসাবে এই কথাগুলো বলা। তেমন আদর্শবাদী দলের সবাইকে যে এই কথাগুলো বুঝতে হবে, এমন নয়। কিন্তু, যারা কোনো গতিশীল সংগঠনের কাণ্ডারী হবেন তাদের এগুলো বুঝতে হবে। প্রয়োজনে বার বার পড়তে হবে। ‘অসংগতি’ নজরে পড়লে প্রশ্ন করতে হবে। উত্তর খুঁজতে হবে। সর্বোপরি, যুক্তিসংগত কোনো নির্দেশনাকে গ্রহণ করে নিয়ে কাজে লেগে পড়তে হবে।

এমনকি, কোনো শত্রুও যদি কোনো হক কথা বলে সেটাকে গ্রহণ করার মতো সত্যপ্রবণ মনমানসিকতা থাকতে হবে। সত্যিকথা হলো, মানুষের শারীরিক গঠনের মতোই মানুষের ঝোঁক-প্রবণতা ও মনোজগতের গঠনও সুনির্দিষ্ট প্যাটার্নের। সংগঠন পরিচালনার ধরন ও সামাজিক পরিবর্তনের পর্যায়, কৌশল ও কর্মপদ্ধতিগুলোও তাই আদর্শ-নিরপেক্ষ বা কমন। আদর্শটা যা-ই হোক, আদর্শ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি অভিন্ন। এজন্য সামাজিক আদর্শটা যা-ই হোক, সমাজ বিজ্ঞানের নিয়মগুলো অভিন্ন।

আদর্শবাদের জন্য যারা কাজ করবেন তাদের উচিত বেশি বেশি করে সমাজ অধ্যয়ন করা। কান টানলে মাথা আসার মতো, সমাজ অধ্যয়ন আমাদেরকে মানবিক পাঠে ইনভল্ভ করে। এই লাইনে ভাবলে সহজে বুঝতে পারবেন, কেন এটি লিখেছি।

যারা ইঞ্জিনমার্কা সমাজকর্মী, তাদের জন্য এসব কথা।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *