পাশ্চাত্যের মুসলিমদের হালাল-হারামের সমস্যা

হালাল হারামের ব্যাপারে প্রচলিত বিধি হচ্ছে:

. সবকিছু হালাল, তবে যা কিছু নিষেধ করা হয়েছে তা ছাড়া।

. শুকর এবং সব হিংস্র প্রাণী (কার্নিভোরাস) নিষিদ্ধ। অবশ্য গুইসাপ খাওয়া জায়েয।

. যেসব খাদ্য (বা প্রাণী) কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত, তা নাজায়েয।

. যেসব হালাল পশুর রক্তপাতহীন মৃত্যু হয়েছে, তা নাজায়েয।

. যেসব হালাল পশু জবেহ করার সময়ে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়নি বা স্মরণ করা হয়নি, তা নাজায়েয।

. কোনো খাদ্যে হারামের মাত্রা যা-ই হোক না কেন, তা সম্পূর্ণ নাজায়েয।

উক্ত ৫নং বিষয়ে আমার মত:

আল্লাহর নামের শর্তের তাৎপর্য হলো আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কোনো নামে জবেহ করলে হবে না– এটি বোঝানো। সুতরাং অন্য কোনো নাম নেয়া না হলে আল্লাহর নাম নেয়া হোক বা না হোক, রক্তপাত হলে তা খাওয়া জায়েয হবে। এমনকি গুলি করে মারলেও। কারণ, গুলিতে রক্তপাত হয়, পরিমাণ যা-ই হোক না কেন।

আর নগণ্য মাত্রায় হারাম বা এ ধরনের কোনো কিছুর উপস্থিতিকে নগণ্য হিসাবেই বিবেচনা করা উচিত। একেবারে পিওর বা নিখাদ হতে হবে শুধুমাত্র ইসলামী আকীদা। অন্য সবকিছুতে অল্পস্বল্প বেশকম হতে পারে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, কোনো কাপড়ে নাপাকী থাকা সত্ত্বেও কাপড়টি যদি যথেষ্ট প্রশস্ত হয়, তাহলে সেই কাপড় পরে নামাজ পড়া যাবে। অবশ্য সুযোগ থাকলে চেঞ্জ করে নেয়া ভালো।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব হালাল-হারামের বিধিবিধান নাযিল হয়েছে মাদানী যুগের শেষ পর্যায়ে। ইসলামী সমাজের উচ্চতর মান হিসাবে আমরা এগুলোকে মেনে নেবো এবং যেখানে যতটুকু সম্ভব ফলো করবো। যেখানে বিরুদ্ধ পরিবেশ সেখানে এসব নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা করার দরকার নাই। এসব বিধিবিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে যেসব সাহাবী মৃত্যুবরণ করেছেন বা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের ঈমান ও ইসলাম অপূর্ণ ছিলো কি? সবকিছুতে জায়েয-নাজায়েয খোঁজা এক ধরনের দ্বীনি শুচিবায়ুগ্রস্ততা! যতক্ষণ না স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ও সুস্পষ্টভাবে কোনো কিছু নাজায়েয প্রমাণিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা জায়েয। এটিই হলো শরীয়তের মূলনীতি।

এ বিষয়ে আল্লামা ইউসুফ কারযাভীর ‘ইসলামে হালাল ও হারামের বিধান’ পড়া যেতে পারে।

এসবি ব্লগ থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

আহমাদ আব্দুল্লাহ: আপনি যে লেখাটি লিখেছেন, তা কি ইউসুফ আল কারদাভির ঐ বই থেকে রেফারেন্স হিসেবেই লিখেছেন?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: সকালে ডিপার্টমেন্টে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছি, এমন সময় একজন কানাডা থেকে ফোন করেছেন, এ বিষয়ে জানার জন্য। উনাকে যে মেইল করেছি, সেটি এখানে শেয়ার করলাম। লেখাটি কারযাভীর বই থেকে নেয়া নয়। লেখার স্টাইলে ‍বুঝেছেন, লেখাটি আমার।

অনুরণন: “সুতরাং অন্য কোনো নাম নেয়া না হলে, আল্লাহর নাম নেয়া হোক বা না হোক, রক্তপাত হলে তা খাওয়া জায়েয হবে।”

নিচের আয়াতটি কী বলে দেখা যাক:

“আর যে পশুকে আল্লাহর নামে যবেহ করা হয়নি তার গোশ্‌ত খেয়ো না। এটা অবশ্যি মহাপাপ। শয়তানরা তাদের সাথীদের অন্তরে সন্দেহ ও আপত্তির উদ্ভব ঘটায়, যাতে তারা তোমাদের সাথে ঝগড়া করতে পারে। কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হবে।

“এ বিষয়ে আল্লামা ইউসুফ কারযাভীর ‘ইসলামে হালাল ও হারামের বিধান’ পড়া যেতে পারে।”

ইউসুফ আল ক্বারাদাওয়ির ফাতওয়া আপনার মহান বাণীর বিপরীত। না পড়েই উপদেশ দিলে পড়ে দেখতে পারেন। ফাতওয়া বিতরণ রেখে ফিলোসফি নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন, অন্তত একাডেমিক উন্নতি হবে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনি মাওলানা মওদূদীর ‘ইসলামের চারটি মৌলিক পরিভাষা’ ধরনের বইগুলোতে দেখতে পাবেন, কীভাবে ইসলামিক স্কলাররা বিভিন্ন কোরআনিক পরিভাষার ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন জিহাদ শব্দটি কোরআনে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে বলা হয়েছে। কোথাও চেষ্টা-সাধনা অর্থে, আবার কোথাও যুদ্ধ অর্থে। পরিভাষা হিসাবে জিহাদ ক্বিতাল তথা যুদ্ধ অর্থে বিবেচনা করা হবে।

আল্লাহর নামে যবেহ করাকে যদি আক্ষরিক অর্থে নেয়া হয়, তাহলে আপনার বক্তব্য ভিন্ন আর কোনো কথা হতে পারে না।

আমি বলতে চাচ্ছি, এই আক্ষরিক অর্থ গ্রহণের পাশাপাশি যদি এই আয়াত নাযিলের পটভূমি বা প্রেক্ষিত বিবেচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে– তৎকালীন জাহেলেরা বিভিন্ন দেবদেবীর নামে জবাই করতো, যা ভক্ষণ করা এই আয়াতের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আমার মূল পোস্টেই আপনার বক্তব্যের পক্ষে আলেম সমাজের প্রচলিত অবস্থান সম্পর্কে আমার স্বীকৃতি দিয়েছি। আমার দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে উপরের দুটোর কোনোটাই প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, না সেখানে আল্লাহর নাম নেয়া হয়, না তদস্থলে অন্য কোনো নাম নেয়া হয়। এ বিষয়ে কেউ ইজতিহাদ করতে চাইলে, আমি যা বলতে চেয়েছি সে ধারায় ভাবার সুযোগ আছে। অন্তত অপছন্দনীয় অনুমোদন হিসাবে।

কানাডা হতে আমার পরিচিত যে ভদ্রলোক ফোন করায় উনাকে উক্ত বক্তব্য সম্বলিত মেইল করেছি, তিনি ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী, তবে ইসলামী আন্দোলনের লোক নন। ইউসুফ কারযাভী উনার পড়া নাই। তাই, এসব বিষয়ে জানার জন্য ইউসুফ কারযাভীর সংশ্লিষ্ট বইটি পড়তে বলেছি। আমি তো বলি নাই যে, ইউসুফ কারযাভী এমনটি বলেছেন!

নেটে কেউ কাউকে দেখে না। তাই বলে যে কোনো ল্যাঙ্থে মন্তব্য লিখে পোস্ট করে দেয়া অনুচিত নয় কি?

অনুরণন: আয়াতের নাম্বার দিতে ভুলে গেছি। সূরা আনআম: ১২১।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: উক্ত আয়াতের হুবহু শাব্দিক অর্থ করলে আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু সেখানে তো ‘পশু’ শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে। তাহলে, পাখি শ্রেণী কি এক্সজেম্পটেড? পাখি (যেমন– মুরগী) জবেহ করার সময় কি আল্লাহর নামের শর্ত প্রযোজ্য হবে না? যদি তখনো এই শর্ত প্রযোজ্য হয় এবং অবশ্যই সেটি হওয়ার কথা, তাহলে তা হবে আয়াতটির হুবহু শাব্দিক অর্থের পরিবর্তে এর তাৎপর্যকে বিবেচনা করার ফলশ্রুতি। এই আয়াতের তাৎপর্য (আল্লাহ তায়ালা যা বলতে চেয়েছেন) পরিষ্কার। তা হলো, গায়রুল্লাহর নামে উৎসর্গীকৃত– এমন সবকিছুকে হারাম হিসাবে সাব্যস্ত করা। এবং প্রাণী হলে, তাতে রক্তপাতের শর্ত আরোপ করা। পাশ্চাত্যের বিরূপ পরিবেশে জায়েজ-নাজায়েজ প্রসঙ্গে আমি এটি বলেছি। বাস্তবে, সব সময় এমনটা করার জন্য নয়। যেমন, ভেজা হাতে একটিমাত্র চুল ছুঁয়ে দিলে ওজু হয়ে যাবে। তাই বলে সব সময় এটি করা দোষণীয়। একটা হলো বৈধতার সীমা। অন্যটা হলো বাস্তবে, ব্যক্তিগতভাবে ও সব সময় তা করা। এ দুই অবস্থার পার্থক্যকে স্মরণে রাখলে আমার বক্তব্য বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

এসবি ব্লগ লিংক | সামহোয়্যারইন ব্লগ লিংক

Leave a Reply