বাংলাদেশে রাজনীতির হাল-চাল: সংঘাত নিরসনের উপায়

বাংলাদেশে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দিক থেকে শক্তিশালী পক্ষ হলো চারটি। ১. মধ্য-ডানপন্থী (centre-rightist) যেমন BNP, ২. মধ্য-বামপন্থী (centre-leftist) যেমন আওয়ামী লীগ, ৩. চরম ডানপন্থী (far-rightist) যেমন জামাত ও তদনুরূপ মৌলবাদি দল ও গ্রুপগুলো এবং ৪. চরম বামপন্থী (far-leftist) যেমন কম্যুনিষ্ট ঘরানার দল ও গ্রুপগুলো। ফার-লেফটিস্টদের তুলনায় আওয়ামী লীগ হলো একটা ডানপন্থী দল। জামাতের তুলনায় বিএনপি একটা বামপন্থী তথা ‘প্রগতিশীল’ দল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই পেটি-বুর্জোয়া দল। এই দল দুটি মূলত Power politics ই করে।

ইন্টারেষ্টিং বিষয় হলো ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতি ও উন্নয়নের দিক থেকে দেখলে এ কথা নি:সন্দেহে বলা যায় যে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা অদল-বদল হয়ে থাকাটাই দেশের জন্য জন্য ভালো! ফার-লেফটিষ্টদেরকে বা ফার-রাইটিষ্টদেরকে সারভাইব করতে দিতে হবে। চরম-ডানরা অস্তিত্বের সংকটে ভুগলে কাছাকাছি থাকা মধ্য-ডান শক্তি extremised হবে। তেমনি করে ‘নাস্তিক'(?) বামদেরকে উৎখাত করার ফলশ্রুতি হবে মডারেট বাম যেমন আওয়ামী লীগকে চরম-বামপন্থীদের infiltration- শিকারে পরিণত করা। যেমনটি এখন হচ্ছে।

খেয়াল করুন, যেসব বাম নেতা বর্তমান সরকারের সাথে ক্ষমতায় আছে তাদেরক যতই আপনি বা তাদের পার্টির তরফ হতে deviant বলা হোক না কেন, এটি অনিবার্য ছিলো। চরম ডানেরা বামদেরকে ‘নাস্তিক’ হিসাবে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় রেখেছে। এখন আওয়ামী লীগাররা যদি জামাতকে ‘নির্মূল’ করতে চায় তাহলে তার পরিণতি হলো moderate বিএনপি’র অবধারিত radicalization. আমার কথাগুলো আপনাদের কাছে উল্টাপাল্টা শোনালেও এসব ‘দুয়ে দুয়ে চার’-এর মতো নির্ঘাত সত্য!

মতাদর্শিক দিক থেকে ক্ষমতাবিন্যাসের এই ছকের আলোকে বর্তমান ও অতীতের ঘটনাপ্রবাহকে বিবেচনা করুন। দেখবেন, কেনো বাম সুশীল প্রথম আলো গোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে ও করছে, বা জামাত ও বিএনপির ‘অরিজিনাল লোকেরা’ কেন পরষ্পরকে সুযোগ পেলেই একহাত নিয়ে ছাড়ে তা আপনার কাছে পরিষ্কার হবে। এই বিবেচনায় জামায়াত ও বিএনপি পরষ্পরের মূল শত্রু। বাম ও আওয়ামী লীগ শক্তি পরষ্পরের বেশি শত্রু, যতটা নয় বিএনপি বা জামাত! ক্ষমতার রাজনীতি করা কাছাকাছি বড় দলের পক্ষপুটে আশ্রয় নেয়ার কারণে বামধারাগুলো কিংবা জামাত এককভাবে ক্ষমতায় আসতে অতীতেও পারে নাই, ভবিষ্যতেও পারবে না। দৈববাণী জানার কোনো ক্ষমতা ছাড়াই এটি নিশ্চিত করে বলা যায়।

মডারেটরাই দেশ চালাবে। যারা এক্সট্রিম পজিশন নেবে তারা স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতায় যেতে পারবে না। সেক্ষেত্রে তাদেরকে দেশ-বিক্রীর মতো নতজানু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তির ক্রীড়নক হয়ে থাকতে হবে। যেমনটা বর্তমানে হচ্ছে। এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ এই অবস্থা হতে বের হয়ে আসতে চাচ্ছে। যদিও তাদের অবস্থা ‘বাঘের পিঠের সওয়ারী’র মতো হয়ে দাড়িয়েছে। অতএব, ক্ষমতায় আসার গঠনমূলক পন্থাই স্বীয় দল ও দেশের জন্য সত্যিকারের কল্যাণকর। এক্সট্রিমদেরকে সারভাইব করতে দেয়া কিংবা সামাজিক ও জাতীয় নীতিতে এক্সট্রিম আইডিওলজিষ্টরা স্বত:প্রণোদিত হয়েই যদি মডারেট ভূমিকা নেয়, সেটি ভালো।

এতদপ্রেক্ষিতে বলা যায়, জামাত নির্মূলের বর্তমান দৌড়ঝাপ মোটেও ঠিক হচ্ছে না। কথায় বলে, বেধে পিটালে বিড়ালও বাঘ হয়ে যায়। আদর্শিকভাবে মোকাবিলাই উত্তমপন্থা। ফিজিক্যালি এলিমিনেট করতে চাইলে বা জোর করে একপ্রকারে করলেও ছাইভষ্ম থেকে জেগে ওঠা ফিনিক্সের মতো ফাঁকা হয়ে যাওয়া গ্যাপকে পূরণ করার জন্য নতুন ফিজিক্যাল ফোর্স গড়ে ওঠবে। যে কারনে দেখা যায় ‘পুঁচকে’ জামাত নেতারাই ‘ফাইট’ দিচ্ছে। এতবড় পশ্চিম তীরের রাস্তায় রাস্তায় ইজরাইলি বাহিনী টহল দিলেও ‘পুঁচকে’ গাজায় তারা ঢুকতেও পারছে না। ব্যাপার হলো, বাহিরে বিশেষকরে রাজনৈতিক ময়দানে আমরা যেসব নানামুখী শক্তির খেলা দেখছি তা সবই সমাজের গভীর থেকে ওঠে আসা। এক এক শক্তির এক একটা বিশেষ দূর্বলতাই অপর শক্তির পুঁজি। যেমন, জামাত তথা ইসলামী শক্তির যুক্তিবাদ বিরাধিতা ও সাংস্কৃতিক দীনতাই চরম-বামদের তাত্ত্বিক পুঁজি। এই দৃষ্টিতে দেখলে আপনি বুঝবেন কেন বড় বড় আলেম পরিবার হতে নামকরা ‘নাস্তিক’রা ওঠ এসেছে।

অতএব, ‘অপর’কে কারা জায়গা দিতে পেরেছে সেটির ওপরই নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ইতিবাচকভাবে (sustainably) ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতাশালী হওয়ার মৌলসূত্র (basic formula)। এটি হলো inclusive হওয়ার সঠিক তাৎপর্য। দেখা যায়, কিছু শক্তি বিরোধিতা করার ব্যাপারে যতটা পারঙ্গম গড়ে তোলার ব্যাপারে ততটাই দূর্বল। কম্যুনিষ্ট অথবা ইসলামিস্ট উভয় প্রান্তিক শক্তি এই দিক থেকে দৃশ্যত: একই মনে হয়। দেশের শতকরা ৪৫ ভাগ, ৩৫ ভাগ, ২৫ ভাগ, ১৫ ভাগ জনগণতো বটেই, এমনকি শতকরা ২, ৪ বা ৫ ভাগ ভিন্নমতাবলম্বী জনগোষ্ঠীকেও স্বীয় পরিমণ্ডলে বাঁচতে, থাকতে দিতে হবে। ছোট-বড় সবাইকে জাতীয় জীবনে অবদান রাখার সুযোগ দিতে হতে। Pluralismএর এটি সারকথা। Pluralism যে কোনো ধরনের extrimismকে নিগেইট করে। ‘অপর-পক্ষ’কে মন থেকে গ্রহন করতে হবে। যেমন করে বড় ভাই-বোনদেরকে ছোট ভাই-বোনদের সাথে সমভাবে সম্পত্তির বন্টনে যেতে হয়। জোর করে ‘অপরপক্ষ’কে নিজের মত মানানো বা নির্মূলের চেষ্টা করাটা বোকামী।

ফেসবুকে প্রথম প্রকাশিত

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *