প্রসঙ্গ: যে কারণে নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীরা হেরে যায়

একটা কথা আমি প্রায়ই বলি– জামায়াতে ইসলামী একটা ইসলামী সিলসিলা, একটা জীবন্ত ঐতিহ্য। এই অতীব সত্য কথাটার সাথে একেবারে ভুল একটা কথা বলা হয়– জামায়াত করা ছাড়া তো আমাদের আর কিছু করার নাই। কারণ, এটিই তো একমাত্র…!

আমি এটাও বুঝি না, ইসলামের কর্মী হওয়ার জন্য, ইসলামের পক্ষে কাজ করার জন্য জামায়াত ত্যাগ বা জামায়াতের বিরোধিতা কেন জরুরী হবে? কারণ, এরা তো অনেক ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে, যা এতটা পরিমাণে অন্যরা করছে না। গাড়িটা কাংখিত গতিতে চলছে না, তাই বলে কি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবো?

অতএব, ‘জামায়াতে ইসলামী = ইসলাম বা আল-ইসলাম’– এটি হলো প্রান্তিকতা (১) এবং ‘ইসলামের জন্য কাজ করতে চাও তো জামায়াতকে বাদ দাও’– এটি হলো প্রান্তিকতা (২)

এতদুভয় প্রান্তিকতা তথা চরমপন্থাকে পরিহার করে, আসুন যে যেখানে আছি সেখানে থেকেই আমরা প্রত্যেকে একেকটি সংগঠন, একেকটি আন্দোলন, একেকটি বিপ্লব হিসাবে নিজেদের গড়ে তুলি। জামায়াতে ইসলামী সফল বা ব্যর্থ যাই হোক না কেন, আমাদের কাছে তো কোরআন ও সমগ্র হাদীস ভাণ্ডার আছে। আমরা তো বুঝি, সমাজটা কীভাবে চলে, আন্দোলন কীভাবে করতে হয়, রাষ্ট্র কীভাবে চালাতে হয়। ইসলামী রাষ্ট্র তথা খেলাফত আমাদের জীবদ্দশায় (যার কোনো মেয়াদ নাই!) কায়েম হোক বা না হোক, আমরা নিজেদের উপযুক্ত হিসাবে গড়ে তুলতে পারলে ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক সমাজ পরিবর্তন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

যারা বলে, আমরা কাজ করে যাব, ফলাফল আল্লাহর হাতে (অনিশ্চিত অর্থে) তারা সংশ্লিষ্ট কোরআন-হাদীসের ভুল ব্যাখা করছেন। এ সংক্রান্ত কতক সাধারণ বর্ণনা আছে বটে। তবে, কাজের (দুনিয়াবী) ফলাফলের ব্যাপারে স্পষ্ট আয়াত আছে (সূরা নূর: ৫৫)।

ইসলামী আন্দোলন হতে হবে বাস্তব পরিকল্পনা ও উপযুক্ত কর্মকৌশলভিত্তিক। এতে ভিশনের সাথে সাথে থাকতে হবে প্রপার প্ল্যান। বাদ দিতে হবে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে গড়ে উঠা সর্বাত্মকবাদী ক্যাডার সিস্টেম, ফুল টাইমার সিস্টেম ও অতি গোপনীয়তার নীতি। অবাস্তব ও অতি ধার্মিক (অতি ইসলামিক!) নারীনীতিকে বাদ দিতে হবে। অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে সামাজিক ইসলামীকরণের ভুল পন্থা পরিহার করতে হবে। তদস্থলে ব্যক্তির স্বকীয়তা, সৃজনশীলতা, স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে। টাকা ও ক্ষমতা বাগানোর মানসিকতা নিয়ে গতিশীল ও গণমুখী ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলন হয় না। বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ বটে।

সংগঠনকে গণমানুষ ও বাস্তব সমাজ হতে গড়ে উঠতে দিতে হবে। কোনো নেতৃত্ব চাপিয়ে দেয়া যায় না। যদিও আল্লাহর সন্তুষ্টিই লাভই মূল লক্ষ্য। মনে রাখবেন, আল্লাহর ওয়াস্তে রাজনীতি হয় না, ধর্মচর্চা তথা ধর্মীয় রাজনীতি হতে পারে। দরকার, ইসলামী মতাদর্শের পতাকাবাহী নির্মোহ রাজনীতি। সরকারী প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি নিয়ে, সরকার আমাকে দিয়েছে বলে ইসলামের নামে সংগঠনবিশেষের নেতা হওয়া যায়, সত্যিকারের ইসলামী ব্যক্তিত্ব হিসাবে পাবলিক সাপোর্ট পাওয়া যায় না।

প্রেমে পড়ে মানুষ এক পর্যায়ে যেভাবে ভালোবাসা অনুভব করে, মাতৃজঠরে ভ্রুন যেভাবে বেড়ে উঠে, মাটি হতে গাছ যেভাবে গড়ে উঠে, সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বকেও সেভাবে গড়ে উঠতে দিতে হবে। নেতৃত্ব নাযিল করা যায় না, করলেও তা প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম না হওয়াই স্বাভাবিক। উল্টো এসব গণবিচ্ছিন্ন নেতৃত্ব নিজেদের অযোগ্যতা ও অবশ্যম্ভাবী ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্য আদর্শের দোহাই দিয়ে প্রকৃত আদর্শবাদীদেরকেই যথাসম্ভব কোনঠাসা ও নির্মূলের অপ্রকাশ্য নীতি ও কর্মপন্থা গ্রহণ করবে।

আপনারা যা-ই ভাবুন, জামায়াতে ইসলামী স্বীয় নামের পরের অংশকে সামনে আনার মতো ক্রমান্বয়ে যেন হাফ বিএনপি ও হাফ তাবলীগ টাইপের কিছু একটা হয়ে যাচ্ছে। এটি আমার আশংকা!!!

এসবি ব্লগ থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

মিডিয়া ওয়াচ: আপনি সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। জাতি আপনার কাছে নানা বিষয়ে লেখা আশা করে। শুধু কোনো বিশেষ দলের উপর না লিখে ওভারঅল বিষয়ে লিখবেন– এই আশাই করি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ওভারঅল বিষয়ের সাথে সাথে মাঝে মাঝে স্পেসিফিকও হতে হয়। আম এহতেসাব দিয়ে তো আর ব্যক্তি সংশোধন হয় না। আমাদের সমালোচনাগুলো ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ হলো, আমরা কথা সোজা না বলে পরোক্ষভাবে, ঘুরিয়ে বলি। এতে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি মনে করে, এটি আসলে অন্যদের সমস্যা।

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

নোমান সাইফুল্লাহ: “সরকারী প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি নিয়ে, ‘সরকার আমাকে দিয়েছে’ বলে ইসলামের নামে সংগঠনবিশেষের নেতা হওয়া যায়, সত্যিকারের ইসলামী ব্যক্তিত্ব হিসাবে পাবলিক সাপোর্ট পাওয়া যায় না।”

আপনি সত্য বলেছেন। একটা ঘটনা বলি। একবার আওয়ামীবিরোধী আন্দোলনে লংমার্চ কর্মসূচি চলছে। তো জামায়াতের কর্মসূচি ছিল রাজশাহী অভিমুখে। এই ঘটনা যিনি বর্ণনা করছেন, তিনি একজন সাথী ছিলেন তখন। তিনি বলেন, ঘটনাক্রমে আমরা আমীরে জামায়াতের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে চলে এসেছি। দেখলাম দুপুর বেলা সকল সাধারণ নেতাকর্মী খেলেন গুড়-চিড়া, আর আমীরে জামায়াতসহ আমরা খেলাম চাইনিজ হোটেলের স্যুপ। সারারাত কর্মীরা কষ্ট করে রাস্তায় ঘুমালেন। আর আমরা আমীরে জামায়াতসহ ঘুমালাম রেস্ট হাউজে এসি হাওয়ার নিচে। এখন আপনি বলুন এই নেতৃত্বের সাথে সাধারণ জনগন তো পরে থাক, সাধারণ কর্মীদেরই জীবনাচারে কত পার্থক্য! বুঝতে পারছেন– কোথায় ইসলাম, কোথায় আমরা!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: স্ল্যাঙ ল্যাঙ্গুয়েজে বলা যায়– খাই-দাই সেক্রিফাইস!

মুহাম্মদ ওমর ফারুক: “জামায়াতে ইসলামী স্বীয় নামের পরের অংশকে সামনে আনার মতো ক্রমান্বয়ে যেন হাফ বিএনপি ও হাফ তাবলীগ টাইপের কিছু একটা হয়ে যাচ্ছে। এটি আমার আশংকা!!!” সহমত।

আপনাদেরকে ভাবতে হবে– আসন্ন এই পরিস্থিতি পুরাপুরি গ্রাস করার আগেই কী করতে হবে, তা নিয়ে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: জামায়াতের সবচেয়ে বড় সফলতা এই যে, আমরাসহ অনেককে তারা ইসলামী আন্দোলন শিখিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো এর সর্বপর্যায়ের নেতৃত্ব এখন ইসলামী আন্দোলনের কাঙ্খিত সর্বনিম্ন মানের নিচে নেমে গেছে।

বলা হয়, রুকন হন। তারপরে ফোরামে বলেন। যেমন আওয়ামী লীগ বিএনপিকে বলছে, সংসদে আসুন, বলুন, যুক্তিসংগত হলে অবশ্যই গ্রহণ করবো। যদিও ইনুর প্রস্তাবগুলোকে তারা কণ্ঠভোটেও দেয় নাই। ফোরামে বললে যদি হতো তাহলে কামারুজ্জামান সাহেব, মীর কাশেম আলী সাহেব, রাজ্জাক সাহেব ও সাঈদী সাহেবেরা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হতেন না।

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

মির্জা: স্যার, আপনার বোল্ড করা অংশগুলো দারুণ হয়েছে। তবে আমার কিছু প্রশ্ন আছে:

১। যদি রিপোর্টিং সিস্টেম এবং ক্যাডার সিস্টেম না থাকে, তবে কীসের ভিত্তিতে একজনকে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বশীল করা হবে? এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

২। আর অতি ধার্মিক নারীনীতি বলতে কি আপনি নিকাবের উপর জোর দেয়াকে বুঝাচ্ছেন? আমি কিন্তু নিকাবকে মোটেও ইসলামী আন্দোলনের প্রতি বাঁধা মনে করি না। বরং নিকাব পরে ইসলামী আন্দোলনের নারীকর্মীরা অনেক ফিতনা থেকে বেঁচে সংগঠনের কাজ আরো গতিশীলভাবে করতে পারে। তবে এটা হচ্ছে না, এটাই সঠিক। আর ইসলামী আন্দোলনের নারী কর্মীদের প্রচলিত সাংগঠনিক কাজ ছাড়াও বিভিন্ন সমাজ উন্নয়নমূলক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে জড়ানো উচিত এবং সেটা সংগঠনের সমর্থনেই হওয়া উচিত।

লাল বৃত্ত: 👍

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনার লেখার কিছু অংশ পড়তে পারিনি। হ্যাঁ, আমাদের এক সহকর্মী নেকাব পড়তেন। এমনকি চাকরির ইন্টারভিউর সময়ও নেকাব খুলেননি। যেহেতু কোয়ালিটি ডাজ ম্যাটার, তাই গণমানুষের কাছে যাওয়াই বড় কথা।

আমাদের একটা বাড়ি আছে শহরের কাছে। এর পাশে অনেক মিল-ফ্যাক্টরি। শত শত মেয়েরা দিনরাত কাজ করে। অনেকেই পর্দা করে। ইসলামী আন্দোলনের কোনো মহিলা কর্মী কি তাদের কাছে যায়? না, যায় না। আমি জানি। কারণ, আমাদের একটা কলোনিও আছে। তাদেরকে আমি খুব কাছ হতে দেখি। তারা অন্ততপক্ষে ছাত্রীদের চেয়ে উন্নত নৈতিকবোধ ধারণ করে।

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

রাতের তাঁরা: আমার একটা প্রশ্ন– আপনি যদি জামায়াত সম্পর্কে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেন, তবে সেটা কেন সংগঠনকে বলছেন না? অন্য একটি লেখাতে লিখেছিলেন– আপনি রিপোর্ট রাখেন। কিন্তু আমার মনে হয়, আপনি রিপোর্ট ও নেতৃত্বের প্রতি এখনো আস্থাশীল হতে পারেননি। আপনার প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এটা প্রশ্ন উত্থাপন করার সঠিক জায়গা নয়। তাই বলবো সঠিক জয়গায় সঠিক কাজটি করুন। আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন। আমীন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: দুঃখিত, আপনার শংকার জন্য। বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতি ও সাংগঠনিতার ইতিহাসে (ও বর্তমানে এজওয়েল) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় একটি অতি পরিচিতি ব্যাপার। তাই, চবি সংশ্লিষ্ট যে কেউ এই পোস্টদাতাকে (মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক) ভালো করে চেনা ও জানার কথা। আপনার আশেপাশে কি চবির কেউ আছে? একটু কষ্ট করুন না, জানার জন্য!

আচ্ছা, ইসলামী সমালোচনা পদ্ধতি কী? শুধুমাত্র দায়িত্বশীলকে (কোন পর্যায়ের দায়িত্বশীল?) বলা একটি ধাপ মাত্র। এতে যদি কাজ না হয়? আপনি কীভাবে বুঝলেন যে আমি এ দায়িত্ব পালন করিনি?

জামায়াতের সাথে আমার সম্পর্ক মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার মতো। অনলি এ মোরাল এন্ড পারসোনাল রিকোয়াম্যান্ট।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন।

রাতের তাঁরা: আর আপনার শিরোনামের সাথে লেখার মিল খুজে পাইনি, তাই দুঃখিত।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ‘যে কারণে নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীরা হেরে যায়’– এই পোস্টের জন্য মন্তব্য হিসাবে মূলত লেখাটি লেখা। এই পোস্টে ধুমকেতু১০এর কমেন্ট:

আপনার তত্ত্বমূলক বিশ্লেষণ আমাকে চমত্কৃত করেছে। এ পর্যন্ত আমি যত মন্তব্য পেয়েছি, এর মধ্যে আপনার মন্তব্যটি অধিকতর সুচিন্তিত ও বিশ্লেষণমূলক। আসলে সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে কাটাছেড়া করা আলোচনা করার দুঃসাহস কম লোকেরই হয়।

একদিকে দেশীয় ইসলামবিরোধী শক্তির সীমাহীন তত্পরতা, অন্যদিকে আলোচিত সংগঠনের দৃশ্যত ইতঃস্তত, সিদ্ধান্তহীন পথচলা ইসলামপ্রিয় মানুষকে গভীর হতাশা ও উত্কণ্ঠায় নিমজ্জিত করেছে। আর তারই প্রতিক্রিয়ায় এত আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক।

আপনি যে তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক নির্দেশনা দিয়েছেন তা যদি এ সংগঠনে গৃহীত হবার পথ সুগম হয়, তাহলে আমরা নিশ্চয় প্রত্যাশিত পরিবর্তনের সূচনা দেখতে পাবো। কিন্তু এ বিষয়ে পোড়খাওয়া পাঠকদের মন্তব্যে আশান্বিত হওয়া যাচ্ছে না। আসলে ছাঁচে ঢেলে তৈরি করা আর ছাঁচের মতো করে গড়ে ওঠা এক কথা নয়।

‘বাদ দিতে হবে ক্যাডার সিস্টেম, ফুল টাইমার সিস্টেম, গোপনীয়তার নীতি।’– এটি হলো আপনার বক্তব্যের মূল কথা। কমিউনিজমের ফ্রেমে ইসলামী আদর্শ ঢেলে সাজানো যায় না। আর এতে করে দূরদর্শী ইসলামী নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় না। বর্তমান বাস্তবতা অন্তত তাই বলছে।

অনেক ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান মন্তব্যে আমার লেখাটি সমৃদ্ধ করার জন্য। আমার অন্য লেখাতেও আশা করি আপনার সান্নিধ্য পাবো। মহান আল্লাহ আমাদের ইসলামী সংগঠনের যথার্থ জ্ঞান দান করুন।

sotter pothik: “অতি ধার্মিক নারীনীতি” প্রসঙ্গে: কোরআনে পর্দার জন্য যেভাবে আল্লাহ বলেছেন সেভাবেই মানতে হবে। ভুল বুঝলে, আর এটাকে ‘অতি ধার্মিক’ বললে ভুল হবে। আমরা আগে নিজেকে যাচাই করি না, প্রথমে নিজেকে জানতে হবে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, জানতে হবে। তাই, আপনি আবদুল হালীম আবু শুক্কাহ লিখিত ও ট্রিপল আইটি প্রকাশিত ‘রসূলের স. যুগে নারী স্বাধীনতা’ বইটির বাংলা অনুবাদের ৪টি খণ্ড, অন্তত ৩য় খণ্ডটি পড়ে দেখতে পারেন।

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

বুলেন: “টাকা ও ক্ষমতা বাগানোর মানসিকতা নিয়ে গতিশীল ও গণমুখী ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলন হয় না। বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ বটে।”

দুঃখিত, কথাটা মানতে পারলাম না। আপনি বড়জোর জামায়াতের কয়েকজন নেতৃত্ব পর্যায়ের লোকজনকে এই ভাগে ফেলতে পারেন। এর বেশি নয়। কিন্তু আপনার বক্তব্যটি পড়ে মনে হচ্ছে, জামায়াত সংগঠনটি টাকা আর ক্ষমতা ভাগানোর দল। এই লাইনটিতে একটু সংশোধনী দিলে খুশি হব।

আপনার কয়েকটি বিষয়ে আমি একমত। যেমন– ক্যাডারভিত্তিক প্রথা এবং নারী নেতৃত্বের ব্যাপারে অতি রক্ষণশীল পন্থা জামায়াতের গণমুখী ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে একেকটা বড় বাধা। শুধু ক্যাডারভিত্তিক প্রথার কারণেই সবাই আশা করেন এই সংগঠনের ভালো-মন্দ বলার সর্বোচ্চ অধিকারী পরিষদ শুধুমাত্র ‘রুকন’। কিন্তু আমার বাস্তব দেখায় বলি, রুকনরা সাংগঠনিক কাজের কারণে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে তাদের নিজেদের সংগঠনের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন ঐতিহ্যের বাহিরে কিছু চিন্তা করার মানসিকতা তৈরি হওয়ার সময় থাকে না। আপনি মাঠ পর্যায়ের হাজার হাজার কর্মী সমর্থকের কাছে প্রায় একই রকম অভিযোগ শুনলেও দেখবেন এর সমাধান খুব কমই বের হয়। তাছাড়া সংগঠনের বিশাল একটা অংশ তো রয়েছেই যারা মনে করে থাকে, আমাদের সব ভালো-মন্দ বুঝার জন্য রুকনরাই আছেন। বাকিদের কথা শোনার কোনো প্রয়োজন আছে কি? আর নারী নেতৃত্বের ব্যাপারে রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাজনীতিতে সফল কীভাবে সম্ভব আমি বুঝি না, যেখানে দেশের প্রায় অর্ধেকই নারী?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনি যে বিষয়ে প্রথমে বলেছেন তা জামায়াতের অত্যল্প সংখ্যক ব্যক্তির বেলায় প্রযোজ্য। এ কথা আমি মানি, জানি। কিন্তু সংশোধনী বোধ হয় প্রয়োজন হবে না। কেননা এই ক্ষুদ্র অংশই সংগঠনের কাণ্ডারী, টপ-মোস্ট লিডারস। টাকা দিয়ে ইনফ্রাস্ট্রাকচার গড়ে তোল, আর ক্ষমতা হাতে নিয়ে সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করো। এই পলিসি আপাতদৃষ্টিতে ভালো। আমিও বলি ভালো। এ ব্যাপারে আমি একটা সূত্র দিচ্ছি। এটি যদি আপনাকে বোঝাতে পারি তাহলে আমি কী বলতে চেয়েছি বুঝবেন, আশা করি।

Two I’s are sometimes inverse ratio, sometimes reverse ratio. Another I is the determinant. First two I’s are: Infrastructure and Ideology. The determinant I is for Inspiration.

When the inspiration is lower than the Infrastructure, Ideology will be damaged. On the contrary, no matter how large is the Infrastructure, if Inspiration (true commitment or jajbah) is more than that, then Ideology will prevail and strengthen.

Jamaat looked for infrastructural development while losing its true Inspiration. This is the problem, or you can say, the tragedy of the play!

বুলেন: যাইহোক, আপনার সাথে আমার মতপার্থক্যটা থেকেই গেল! আমি আগেই বলেছি, জামায়াতের দীর্ঘদিনের গড়ে উঠা কাঠামো এখন অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। আর তাই আশু মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন, দরকার। ইসলামী আন্দোলনের জন্য এটা কোনো মেজর ইস্যু হওয়া উচিত নয়। কারণ ইসলামী আন্দোলনের বৈশিষ্টই হলো, সময়ের চাহিদাকে সামনে রেখে সংস্কার কাজ এগিয়ে নেয়া। কিন্তু আমরা (ইসলামী আন্দোলনের অধিকাংশ কর্মী-সমর্থকরাই) একদিকে যেমন এতটা বড় মনের অধিকারী হতে পারিনি, অন্যদিকে এখন এসে সেই সংস্কার অনেকের ব্যক্তিগত স্বার্থের সাথে সরাসরি জড়িত হয়ে পড়েছে। তাই পুরো বিষয়টা এখন আগের চেয়ে অনেকটাই জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি না– আশা একদম শেষ। এখনো যদি সীমিত আকারেও শুরু করা যায়, আজকের মুক্ত-মিডিয়ার কল্যাণে খুব তাড়াতাড়িই সবকিছুই ইন্টিগ্রেট করা সম্ভব। শুধু একটা বড় ধরনের নাড়া দেয়া আর অনেকের স্বার্থ অবেহেলা করা ছাড়া বেশি কিছু লাগবে বলে মনে হয় না।

আপনার সাথে মিলিয়ে বললে, ‘ট্র্যাজেডি অফ দ্যা প্লে’ হলেও ‘ফিনিশ অফ দ্যা প্লে’ নয়!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: সবাই মনে করছে, (সংস্কারের কাজগুলো) কেউ শুরু করুক, আমি সাথে আছি। রাজার পুকুরে একবাটি দুধ ঢালার মতো!

হাসান: জানলাম অনেক কিছু

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনার প্রোফাইল ছবিটা বেশ সুন্দর। কিন্তু এই বিলগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। সবাই মনে করছে, এটা তো রাষ্ট্রীয় ব্যাপার। আমার বা আমাদের কী করার আছে? এই বিলীয়মান বিল দখল করে জমির ব্যবসা করা এখন এক ধরনের সাংগঠনিক ট্রেন্ড। ছাত্রনেতারাও বিনা পুঁজিতে(?) একেকটি ইয়েস/নো নামধারী রিয়েল এস্টেটের মালিক/পরিচালক। তারা সংগঠনের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করেও পিএইচডি থিসিস লিখতে পারেন!!! মাশাআল্লাহ। আসলে ফাঁকি দেয়ার প্রচলনই এখন মূলস্রোত। গোবেচারা মুখলেছুর রহমানরা উপরে নিচে কোনোমতে সওয়াবের নিয়তে ঝুলে আছেন। সাংগঠনিকতাবাদেরই এখন জিন্দাবাদ!!!

‘ইস! চুপ, চুপ! বেশি কথা বলা যাবে না! গোনাহ হবে!’ – এই অবস্থার নিরসন না হওয়া পর্যন্ত ইসলামী সংগঠন বাস্তব জমিনে বিজয়ী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে বা থাকতে পারবে না।

আপনার কাছ হতেও কিছু জানার আশা রাখি।

নিঃসঙ্গ শেরপা: ভাই, যে কথাগুলো আপনার লেখা ও কমেন্টসগুলোতে বলেছেন, সংগঠনের জন্য সেগুলো এখন খুবই জরুরী। আফসোসের বিষয় হলো, এসব কথা শোনার সময় দায়িত্বশীলদের নেই।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হাশরের ময়দানে আমাদের জবাবদিহিতার সময় তো আর দায়িত্বশীলের রেফারেন্স দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। সংগঠন, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদি হচ্ছে দুনিয়াবী ব্যাপার। এসব সিস্টেমের সাপেক্ষে আমরা কে কী ধরনের কাজ বা ভূমিকা পালন করি, সেটাই আখেরাতে বিবেচ্য হবে। এক কথায়, আখেরাতের হিসাব নিতান্ত ব্যক্তিগত। কেউ কারো জন্য দায়ী হবে না। সুতরাং দায়িত্বশীলরা শুনলো কি শুনলো না, সেটা বড় কথা নয়। তাছাড়া, আমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল নই কি? আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেককেই স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

শংখচিল: “যে যেখানে আছি সেখানে থেকেই আমরা প্রত্যেকে একেকটি সংগঠন, একেকটি আন্দোলন, একেকটি বিপ্লব হিসাবে নিজেদের গড়ে তুলি।”

একেবারে মনের কথা বলেছেন।

যদি পারেন ইসলাম ও গণতন্ত্র নিয়ে একটি পোস্ট দেন। জামায়াতের গণতন্ত্রে যোগদান, অতঃপর বিএনপির অংগ সংগঠনে পরিণত হওয়ার কারণে আমার মনে হয়, সঠিক ইসলাম থেকেই তারা অনেক দূরে সরে গিয়েছে। আর ঐ কথাটি ঠিক যে, জামায়াতের ছোট লেভেল অর্থাৎ কর্মী লেভেল অনেক ভালো, কিন্তু সত্যিকার অর্থে নেতৃত্ব দিয়েই বিচার হয় ভালো-মন্দের।

পড়ে খুব ভালো লাগলো। ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান বিপরীতমুখী। চেতনা তথা পদ্ধতি হিসাবে গণতন্ত্র খুবই দরকারী। যতক্ষণ পর্যন্ত এটি একটি পদ্ধতি ততক্ষণ এটি ঠিক আছে। সমস্যা হলো পাশ্চাত্য গণতন্ত্র শুধুমাত্র পদ্ধতিই নয়, এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আদর্শ। একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরম আদর্শ বা মানদণ্ড। জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণাটি এর প্রমাণ বা মূল কথা, যা স্পষ্টতই ইসলামবিরোধী। জনকল্যাণের জন্য গণতন্ত্র ইসলামে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়। শাসক ন্যায়বান কিনা– এটিই মুখ্য বিষয়। ইসলামে গণতন্ত্র অন্যতম পদ্ধতি হিসাবে অনুমোদিত বটে, তবে বেনিভোলেন্ট ডিক্টেটরশীপ ইজ মোর ইসলামিক দ্যান ডেমোক্রেসি ইন দ্যা ওয়েস্টার্ন সেন্স।

জামায়াত গণতান্ত্রিক পন্থায় বিপ্লব করতে চায়– এটি একটি সোনার পাথর বাটির মতো অবাস্তব বিষয়। যতটুকু আমি বুঝি।

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

মূল পোস্টের আর্কাইভ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *