ইসলামী সভ্যতার উন্নয়ন গতিধারা সম্পর্কে ড. ইব্রাহিম কালিনের বক্তৃতা

তিনি তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিশেষ উপদেষ্টা। দর্শন শাস্ত্রে পিএইচডিধারী এই চিন্তাবিদ পাশ্চাত্য ও তুরস্কের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। Oxford Encyclopedia of Philosophy, Science and Technology-র তিনি প্রধান সম্পাদক। বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক। হ্যাঁ, আমি ড. ইব্রাহিম কালিনের কথা বলছি।

এই মাসের ৫ থেকে ৭ তারিখে ইস্তাম্বুলের ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম ফিউচার থিংকার্স ফোরামের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে তিনি কী-নোট স্পিকার হিসাবে “The Future of Islamic Civilization” বিষয়ে একটা বক্তব্য দেন।

আমার সহকারী মাসউদুল আলম সেটি আমার ট্যাবে আপ করে দিয়ে দেখতে বলেন। আমি একটানা লেকচারটি মোট ৩ বার শুনেছি। এরপর সেটির ওপর মাসুদের সাথে গতকাল একটা আলোচনা করেছি। দুই পর্বে মোট ১ ঘণ্টা ১৯মিনিট।

আমার মূল আলোচনার লিংক:

যেসব বিষয়ে আমি উনার সাথে দৃঢ়ভাবে একমত হয়েছি তা হলো:

১. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অধিক সংখ্যক ছাত্র ভর্তি না করে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির চেষ্টা করা।

২. নিছক তথ্যের সমাবেশ জ্ঞান নয়, লেখাপড়ার নামে যা এখন হচ্ছে।

৩. তথ্য > জ্ঞান > প্রজ্ঞা > স্বজ্ঞা – এভাবে জ্ঞানকাঠামো গড়ে তোলা।

৪. ভবিষ্যতকে গড়ে তোলার জন্য বর্তমান ও অতীতকে জানা।

৫. সভ্যতাগত উন্নয়নে দর্শন, বিশেষ করে অধিবিদ্যাগত তথা জীবন ও জগত সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নগুলোর ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা।

৬. ইউরোপীয় সভ্যতার নানা অসংগতি।

৭. জ্ঞান হলো অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, ধীশক্তি ইত্যাদির সমন্বয়। এগুলো একটা আরেকটাকে কম্প্লিমেন্ট করে। তিনি কম্প্রিহেনসিভ ও ইন্টিগ্রেটেড নলেজের কথা বলেছেন।

৮. হুকুম-আহকাম প্রয়োগের পূর্বশর্ত হিসাবে (সামাজিক) প্রজ্ঞা বা হিকমাহর শর্তপূরণ হওয়া।

যেসব বিষয়ে আমি উনার সাথে জোরালোভাবে দ্বিমত পোষণ করেছি, তা হলো:

১. কানেক্টিং দ্যা কনসেপ্টকে তিনি জ্ঞান হিসাবে বিবেচনা করেন নাই। অথচ, জ্ঞান হলো বিদ্যমান তথ্যের মধ্যকার সমন্বয়মাত্র। আমার KIV ফর্মূলা অনুসারে information added value, yields knowledge। সংক্ষেপে K=I+V

২. উনার বক্তৃতা শুনে কারো মনে হতে পারে, রেনে ডেকার্টের subjective idealism-এর পরিণতি হলো solipsism বা চরম আত্মকেন্দ্রিকতাবাদ। ফিলোসফির যে কোনো স্টুডেন্ট জানে, ডেকার্ট সলিপসিস্ট ছিলেন না।

৩. উনি আগাগোড়া অবজেক্টিভিটি ও রিয়েলিজমের পক্ষে বলে গেছেন। তা বলতেই পারেন। কিন্তু পাশ্চাত্য দর্শন বা ইসলামী দর্শন, কোনো দিক থেকেই এটি চূড়ান্ত কিছু নয়। তারমানে, কনটেক্সটচুয়েলিস্ট দৃষ্টিকোণ হতে সাবজেক্টিভিটি ও অবজেক্টিভিটি এবং আইডিয়েলিজম ও রিয়েলিজম, সবই সঠিক ও সম-ওজনদার তত্ত্ব।

৪. অতীতমুখিনতা: অতীতকে জানতে হবে, এগিয়ে যাওয়ার জন্য। উনার বক্তব্যকে যে কেউ সহজে ভুল বুঝে এমন একটা ধারণা পেতে পারে, যেন আমাদের সোনালী অতীতই এখনো শ্রেয়তর ও শ্রেষ্ঠ। প্রগতিশীলতা ও অতীতমুখিনতা, এতদুভয় হলো mutually exclusive সম্পর্কের বিষয়।

৫. অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, গাজ্জালি যাদেরকে রিফিউট করেছেন, ইসলামী একটা জাগরণের জন্য তিনি সেসব গ্রীকপন্থী দার্শনিকদেরকে রেফার করেছেন, হাইলাইট করেছেন, গ্লোরিফাই করেছেন।

৬. জ্ঞানের ক্ষেত্রে মনুষ্যকেন্দ্রিকতা বনাম দৈবকেন্দ্রিকতার যে ফলস বাইনারি প্রচলিত, তিনি সেটাতে এনগেইজ হয়েছেন।

৭. পাশ্চাত্য দর্শনের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি পাশ্চাত্য দর্শনের সবচেয়ে দুর্বোধ্য ও সুবিধাবাদী উত্তরাধুনিক ধারার অন্যতম প্রধান তত্ত্ব phenomenology’র প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। অথচ, এটি মূলত একটি নাস্তিক্যবাদী তত্ত্ব। যার মূলকথা হলো, দৃশ্যমানতাই চূড়ান্ত। অতিবর্তী ও অন্তরালের কোনো বৃহত্তর বাস্তবতা ও সত্য আছে কি-না, তা আমরা জানি না। নাস্তিকতার এগনস্টিক ফর্ম এটি।

৮. অতীতের জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। এটি তখনকার জন্য ঠিকই ছিলো। এখন জ্ঞানবিজ্ঞান এতো বিকাশ লাভ করেছে, একজনের পক্ষে মাল্টিডিসিপ্লিনারি হওয়াটা একেবারেই অসম্ভব। কেউ এরকম হতে চাইলে আদতে তিনি হবেন jack of all trades, but master of none। ‘হুজুরদের’ প্রচলিত ওয়াজের মতো ড. কালিনের কথারও ট্রেন্ড ছিলো, অনেক বেশি জানতে হবে, মিনিং অমুক-তমুক ইমাম বা শায়েখের মতো মাল্টিডিসিপ্লিনারি হতে হবে।

লেখাপড়ার বিষয়ে হোক কিংবা বাস্তব কর্মকাণ্ডে হোক আমার পরিষ্কার কথা হলো– প্রত্যেকের উচিত সুনির্দিষ্ট একটা বিষয়ের গভীরে যাওয়া এবং অন্যান্য বিষয়গুলোতে সাধারণ জ্ঞান অর্জন করা। সেই হিসেবে নিতান্ত ব্যতিক্রম বাদে এখন কারো পক্ষে ট্রুলি মাল্টিডিসিপ্লিনারি হওয়া সম্ভবপর নয় বলে মনে করি।

*****

আলোচনার দ্বিতীয় পর্বের লিংক:

এই পর্বে আমি মুসলিম ফিলোসফারদের মারাত্মক বিভ্রান্তিমূলক দর্শনের উদাহরণ হিসাবে ইবনুল আরাবীর দর্শন সম্পর্কে কিছু আলোচনা করেছি। ইবনুল আরাবীর দর্শন হলো, ওয়াহদাতুল অজুদ বা সত্তার একত্ব। মুজাদ্দিদে আলফে সানী শেখ আহমদ সরহিন্দ এটাকে সর্বেশ্বরবাদী শিরক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আমার মতে, এটি যথার্থ। এর মোকাবিলায় তিনি ওয়াহদাতুশ শুহু-দ বা সত্তার নৈকট্য তত্ত্ব তুলে ধরেন। ইব্রাহিম কালিন ইবনুল আরাবীকে যথেষ্ট পজেটিভলি ফোকাস করেছেন। যেন, তাদের মতো হতে পারাটাই আমাদের লক্ষ্য। আশ্চর্য!

ওয়াহদাতুল অজুদ তত্ত্ব অনুসারে পানির সাথে পানি যেভাবে মিশে যায়, পরকালে শেষ পর্যন্ত পুণ্যাত্মাগুলো তেমনভাবে পরমসত্তায় স্থিত বা বিলীন হয়ে যাবে। যেটাকে সুফী পরিভাষায় বাকাবিল্লাহ বলা হয়। এটি সুফী সাধনার ১৩টি ধাপের সর্বশেষ স্তর। ফানাফিল্লাহ হচ্ছে ঐশী সত্তায় সম্পৃক্ততার পরে পুনরায় মানবাত্মায় ফিরে আসা। আরো সাধনা করলে, সুফীদের মতে, মানুষ বাকাবিল্লাহর স্তরে উপনীত হতে পারে। স্পষ্টত এটি সর্বেশ্বরবাদী ব্যাখ্যা। এবং ক্লিয়ারলি, বৌদ্ধ ধর্মে একে নির্বাণ বলা হয়।

[বিশেষ অনুরোধ: বক্তব্যগুলো ভালো করে না শুনে, শুধু এই ফরোয়ার্ডিং পড়েই কোনো পক্ষকে ‘প্রমাণ’ বা ‘খারিজ’ করার জন্য লেগে যাবেন না। আশা করি।]

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Sourav Abdullah: Intuition তথা স্বজ্ঞার ব্যাপারটা আমাকে বরাবরই অবাক করে। মনে হয় যেন, প্রয়োজনের নিরিখে খোদা তায়ালা নাজিল করে দিচ্ছেন!

এখন, স্বজ্ঞা কি চর্চার মাধ্যমে আস্তে আস্তে গড়ে উঠে নাকি অটোমেটিক একটা ব্যাপার তা বুঝে উঠতে পারছি না। চর্চা করলেই বা কীভাবে, আর অটোমেটিক হলেই বা কেন?

Engr Hassan Saki: প্রজ্ঞা আর স্বজ্ঞার একটু বাস্তবমুখী ব্যাখা দিবেন কি?

Mohammad Mozammel Hoque: যে জ্ঞানের বিষয়ে কোনো বিরোধ-বিতর্ক নাই। প্রশ্নাতীতভাবে যা প্রতিষ্ঠিত। তা তথ্য বা তথ্যমূলক জ্ঞান। তথ্যের সাথে যখন সাবজেক্ট অব নলেজ তথা ব্যক্তি কর্তৃক আরোপিত মূল্য সংযোজিত হয় তখন তা জ্ঞানে উন্নীত হয়। জ্ঞানের উৎস হতে পারে অভিজ্ঞতা বা বুদ্ধি বা সাক্ষ্য বা কোনো অথরিটি। জ্ঞানের বিষয়েকে গভীরভাবে উপলব্ধি করলে তা প্রজ্ঞার মানে উন্নীত হয়। যে জ্ঞান কোনো অন্তর্বতী প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে সরাসরি অজ্ঞাত সোর্স হতে কোনো মাধ্যম ছাড়াই নিঃসংশয় হিসাবে অর্জিত হয়ে থাকে তা হলো স্বজ্ঞা বা ইলহাম। নবীদের উপরে হওয়া ইলহামকে বলা হয় ওহী বা প্রত্যাদেশ।

মানুষ চেষ্টা করে প্রজ্ঞা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। স্বজ্ঞাটা মানুষের হাতে নাই। সেকুলার সেন্সে এটা প্রকৃতি হতে আসে। তাওহীদী সেন্সে এটা খোদার কাছ হতে আসে। স্বপ্নের মতো। এক অর্থে, স্বপ্নও এক ধরনের স্বজ্ঞা।

Engr Hassan Saki: তারমানে স্বজ্ঞা হচ্ছে হঠাৎ করে পাওয়া উপলব্ধি? প্রজ্ঞা অর্জন করেনি এমন লোক কি স্বজ্ঞার সন্ধান পেতে পারে?

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, পারে। কেউ পরীক্ষা না দিলেও তাকে ডিগ্রি দেয়া যেতে পারে। যদি হাইয়ার অথরিটি উপযুক্ত মনে করে। অটো প্রমোশনের মতো।

Mokarrom Hossain: সর্বেশ্বরবাদ ও ইবনুল আরাবীর ওয়াহদাতুল অজুদের একটা সূক্ষ্ম ভেদ দেখিয়েছেন সৈয়দ হুসাইন নসর তার Three Muslim Sages গ্রন্থে। তিনি লিখেন সর্বেশ্বরবাদে জগত ঈশ্বরকে ধারণ করে। অর্থাৎ জগত হলো ঈশ্বরের ধারক যেখানে জগত হলো কর্তাসত্ত্বা। কিন্তু ওয়াহদাতুল ওজুদের মর্মার্থ হলো ঈশ্বর জগতকে ধারণ করেন। অর্থাৎ ঈশ্বর হলেন জগতের ধারক যেখানে ঈশ্বর হলেন কর্তাসত্ত্বা।

Mohammad Mozammel Hoque: মধ্যযুগের এইসব মুসলিম চিন্তাবিদদের সম্পর্কে একাডেমিক সোর্সগুলো হতে লেখাপড়া করলে, আমি নিশ্চিত, যে কোনো ইসলামপন্থীর ‘চান্দি’ গরম হয়ে যাবে। মানে মাথা ঘোরাতে থাকবে। উদাহরণ হিসাবে গতকাল আমি রশীদুল আলমের ‘মুসলিম দর্শনের ভূমিকা’র ৫১০ থেকে ৫১১ পৃষ্ঠার অংশবিশেষ পড়ে শুনিয়েছি। তার খানিকটা এখানে উদ্ধৃত করছি:

“আদিপ্রজ্ঞা বা logus: ইবনুল আরাবীর মতে এই আদিপ্রজ্ঞা হলো পূর্ণমানব হযরত মুহম্মদ (দঃ)-এর সত্তা সব ঐশী ও গুহ্য জ্ঞানের সক্রিয় নীতি। … ইহা প্রথম দ্রব্য, যাহা হইতে সবকিছু উদ্ভূত হইয়াছে। … ইহা পরমসত্তা এবং পরিবর্তনশীল বস্তুর মধ্যবর্তী। … ইহা খোদার চৈতন্য। … সব প্রেরিত পুরুষই প্রজ্ঞা, কিন্তু সেই আদিপ্রজ্ঞা নয়, যাহা হযরত মুহম্মদ (সা)-এর জন্য রক্ষিত। …

সৃষ্টির মধ্যে হযরত মুহম্মদ (দঃ)-এর স্থান সকলের ঊর্ধ্ব; তিনি অনন্য মহিমায় দীপ্ত। তাঁহার উপরে রহিয়াছে কেবল পরমসত্তা; তিনি আদি প্রজ্ঞা, ঐশী জগৎ ও বস্তুজগতের মধ্যবর্তী, নিশ্চয়াত্মক ও পরিবর্তনশীল সত্তার মধ্যবর্তী, চিরন্তন ও পরিদশ্যমান জগতের মধ্যবর্তী।

হযরত মুহম্মদ (দঃ)-এর নূর বা আদি প্রজ্ঞার তিনটি বৈশিষ্ট্যঃ

(১) ইহা খোদার অন্তব্যাপী প্রকাশ।

(২) ইহা জাগতিক নীতির সৃষ্টির কারণ। ইহা পবিত্র আত্মার সহিত অভিন্ন এবং খোদার সৃজনধর্মী ক্রিয়া।

(৩) ইহার তৃতীয় বৈশিষ্ট্য পূর্ণ মানব। যে বস্তু যত ঐশী গুণ ব্যক্ত করিবে বা ব্যক্ত করিতে পারিবে সে ব্স্তু তত পূর্ণতার অধিকারী। পরম সত্তা হইলো খোদা এবং খোদার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ হইলো পূর্ণ মানব (ইনসানে কামিল)।

ইবনুল আরাবী আদি প্রজ্ঞার তিনটি দিক উল্লেখ করিয়াছেনঃ (১) পরাবৈজ্ঞানিক দিক দিয়া আদি প্রজ্ঞার সত্তা (Reality of realities); (২) আধ্যাত্মিক দিক দিয়া মুহম্মদ (দঃ)-এর সত্তা এবং (৩) মানবিক দিক দিয়া আদি প্রজ্ঞা হইলো পূর্ণ মানব।”

এবার বুঝেন …!

সাইয়েদ হুসাইন নসরের কিছু কিছু চিন্তাভাবনা খুবই সংকীর্ণ, অগভীর। বিশেষ করে, ইচ্ছার স্বাধীনতা নিয়ে উনার একটা বক্তব্য শুনে আমার তা-ই মনে হলো। ইব্রাহিম কালিন উনার ছাত্র।

জগত ঈশ্বরকে ধারণ করে, এটি মনে করা হলো প্রত্যক্ষ সর্বেশ্বরবাদ। ঈশ্বর জগতকে ধারণ করে, কেউ যদি এমনটা ভাবেন, সেটাও সর্বেশ্বরবাদের একটা ধরন বা ইন্টারপ্রিটেশন। সেটি হতে পরোক্ষ সর্বেশ্বরবাদ। এর বিপরীতে, তাওহীদের সঠিক ধারণা হলো, ঈশ্বর জগতের অতিবর্তী। যদিও জগতের সর্বত্র তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতা পরিব্যপ্ত।

ভালো করে এইসব ফিলোসফারদের সবগুলো দার্শনিক মত পড়ে, সেগুলোকে সমর্থন করে কেউ যদি নিজেকে ইসলামপন্থী দাবী করেন তাহলে তাকে “ইসলাম দু’প্রকার: (১) সাধারণ আলেম ও জনগণের জন্য শরিয়তি ইসলাম, আর (২) বিশেষ বিশেষ লোকদের জন্য মারফতি ইসলাম বা দার্শনিক ইসলাম” – এ রকম একটা ভাগাভাগি করতে হবে। আমি ইসলামকে কোনো প্রকার ভাগাভাগি করাটাকে ইসলামের খেলাফ মনে করি।

এ বিষয়ে আমার বক্তব্য বিস্তারিতভাবে জানার জন্য এই লেখাটা পড়তে পারেন: ‘ইসলামের দার্শনিক ব্যাখ্যার সমস্যা ও ইসলামে দর্শনের পরিসর’।

আনারুল ইসলাম: ইবনুল আরাবী নাকি এভাবে বলেননি যেভাবে বলা হয়ে থাকে। এক ভাই আরাবীর মক্কীয় প্রত্যাদেশ অনুবাদ করতেছেন। তিনি বললেন এ রকম কিছু কোথাও পেলেন না। ওহায়দাতুল ওজুদ বা সবকিছুই স্রষ্টা তত্ত। যেটার বিপরীতে সেরহিন্দি সবকিছুই স্রষ্টার মতবাদ সৃষ্টি করেছেন। কোথাও ভুল হচ্ছে। আরাবীর ব্যাপারে।

Mohammad Mozammel Hoque: মুসলিম ফিলোসফির যে কোনো বই পড়ে দেখেন। প্রয়োজনে অমুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দিয়ে পড়েন। আমি তো রশীদুল আলমের বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি। জাস্ট এজ হেড অব দ্যা আইসবার্গ হিসাবে। ড. রশীদুল আলম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার ছিলেন। নামকরা ইসলামিস্ট। আমাদের সেকেন্ড ইয়ারের ভাইভাতে এসেছিলেন। এছাড়াও যত টেক্সট পান, দেখেন।

আনারুল ইসলাম: এ তত্ত্বের মূল পাঠের হুবহু ও সম্পূর্ণ অনুবাদ এখনো দেখিনি। রশিদুল আলম ও আমিনুল ইসলামসহ ওরিয়েন্টালিস্টদের অনেক বিশ্লেষণই দেখেছি।

Mohammad Mozammel Hoque: আপনি কোন অর্থে ড রশীদুল আলম ও ড. আমিনুল ইসলাম স্যারকে ওরিয়েন্টালিস্ট বললেন তা আমার বুঝে আসছে না। বক্তৃতাটা যদি শোনেন বিশেষ করে দ্বিতীয় পর্ব তাতে দেখবেন সেখানে আমি আমার প্রফেসর ড. ওয়াহিদুর রহমান স্যারকে রেফার করে কথা বলেছি। ডক্টর ওয়াহিদুর রহমান স্যার মাদ্রাসা বোর্ডে কামেল পরীক্ষায় সমগ্র পূর্বপাকিস্তানে প্রথম হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পড়াশোনা করেন। অল থ্রু ফাস্ট ক্লাস। ওয়াহদাতুল ওজুদ ও ওয়াহদাতুশ শুহুদ সম্পর্কে আমি প্রথম ওনার কাছ থেকেই শুনেছি। সৈয়দ আব্দুল হাই স্যারের দর্শন ও মনোবিদ্যা পরিভাষা কোষ থেকে আমি আজকেও সংশ্লিষ্ট অংশটুকু পড়েছি। হাই স্যারও ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষিত এবং একজন অতীব জ্ঞানী পণ্ডিত, ইসলামপন্থী শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আনারুল ইসলাম: স্যার, আপনি মনে হয় আমার কমেন্টা ভালভাবে পড়েননি, আমি বলেছি “রশিদুল আলম ও আমিনুল ইসলামসহ” ওরিয়েন্টালিস্টদের অনেক বিশ্লেষণই দেখেছি। “

Mohammad Mozammel Hoque: বাস্তবতা হলো, ইংরেজি বা বাংলা ভাষায় মুসলিম দর্শন সংক্রান্ত কোনো বই বা কোনো লেখা আমি পাই নাই, যেখানে ইবনুল আরাবীর দর্শনকে সর্বেশ্বরবাদ বা সর্বেশ্বরবাদের একটা ধরন হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

আনারুল ইসলাম: আমিও সেভাবেই পেয়েছি। কিন্তু উনি নিজে একজন তফসীরকারক ও শরিয়ার পূর্ণাঙ্গ পাবন্দ হিসেবে এসব বলতে পারেন কি না, তা নিয়ে আমি সন্দিহান। তাই যারা সরাসরি আরবি টেক্সটা বুঝতে পারে এরকম দু’জনকে জিজ্ঞেস করেছি যার মধ্যে একজন নিজে এটাই অনুবাদে হাত দিছেন। তারা উভয়ই বলেছেন যে ‘সবকিছুই ঈশ্বর’ এ টাইপের কিছু পাননি। হয়তো টেক্সটের ভিন্ন বা উল্টো ব্যাখ্যা থাকতে পারে। পরিস্কার বুঝার জন্য এত কিছু বলা।

Mahmudul Hasan: প্রজ্ঞার বাস্তবায়ন করা, কিংবা নিজের সিদ্ধান্তকে প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিশ্বাস করা, কিংবা সেই বিশ্বাস বাস্তবায়ন করতে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার জন্য নিজের আসলে কী প্রয়োজন?

Mohammad Mozammel Hoque: অনুসন্ধিৎসু মন এবং আত্মবিশ্বাস। এটি আমার ধারণা।

মাহমুদ তাওসীফ: এখানে খুব সুন্দর একটা আলোচনা আছে। দেখতে পারেন– ইবনে আরাবী: আলোচনা-পর্যালোচনা ও ইবনে তাইয়েমিয়ার বিচ্যুতি

Mohammad Mozammel Hoque: লিঙ্কটাতে গিয়ে পোস্টটা পড়লাম। সাথে মন্তব্যগুলোও পড়লাম।

আমি সাধারণভাবে জানতাম, আলেম-ওলামারা ইবনুল আরাবীর দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু ডিটেইলস জানতাম না। সেটা এই পোস্ট ও এর মন্তব্যগুলো পড়ে কিছুটা জানলাম। সে যাই হোক, আমাদের ফিলোসফিতে মুসলিম ফিলোসফির যতগুলো বই আছে, বাংলা ও ইংরেজি, যা আমি পড়েছি, এবং আমাদের কম্পিটেন্ট শিক্ষকদের কাছ থেকে যা শিখেছি, সে মোতাবেক ইবনুল আরাবীর দর্শন হলো সর্বেশ্বরবাদ বা pantheism-এর একটা রূপ।

আসলে তাওহীদ বোঝার জন্য শিরক বুঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন করে সুন্নত বুঝার জন্য বেদাত সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুতকে অস্বীকার কর। তাহলে দেখা যাচ্ছে আল্লাহর এবাদত করার জন্য আল্লাহকে চিনতে হবে, আর আল্লাহকে চেনার জন্য তাগুত বলতে কী বুঝায়? কে হতে পারে তাগুত? এসব সম্পর্কের ভালোভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে।

মাজার তথা শিরক-বেদাত অধ্যুষিত উত্তর চট্টগ্রাম এলাকায় আমার বাড়ি। সেখানেই আমি বড় হয়েছি এবং এখনও থাকি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বেদাত সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে লোকেরা সুন্নতের পথে চলতে পারে না। শিরক সম্বন্ধে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে তাওহীদের ছদ্মাবরণে শির্কে লিপ্ত হয়। তাগুত সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে আল্লাহর এবাদত সঠিকভাবে মানুষ করতে পারে না।

কোনো কিছুকে যা নয় তা দিয়ে যাচাই করা, চিহ্নিত করা বা লোকেইট করার ফিলোসফিক্যাল পদ্ধতির নাম হচ্ছে disjunctive process or method। ইসলাম সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা এবং যথাযথভাবে একে অনুসরণ করার ব্যাপারেও আমাদেরকে একই সাথে কনজাংটিভ বা ইতিবাচক এবং ডিসজাংটিভ বা নেতিবাচক যাচাইকরণ পদ্ধতি, এই উভয় পদ্ধতিকেই অনুসরণ করতে হবে।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

Leave a Reply