ইসলামী সভ্যতার উন্নয়ন গতিধারা সম্পর্কে ড. ইব্রাহিম কালিনের বক্তৃতা

তিনি তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিশেষ উপদেষ্টা। দর্শন শাস্ত্রে পিএইচডিধারী এই চিন্তাবিদ পাশ্চাত্য ও তুরস্কের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। Oxford Encyclopedia of Philosophy, Science and Technology-র তিনি প্রধান সম্পাদক। বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক। হ্যাঁ, আমি ড. ইব্রাহিম কালিনের কথা বলছি।

এই মাসের ৫ থেকে ৭ তারিখে ইস্তানবুলের ইবনে হালদুন বিশ্বিবদ্যালয়ে মুসলিম ফিউচার থিংকার্স ফোরামের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে তিনি কী-নোট স্পিকার হিসাবে “The Future of Islamic Civilization” বিষয়ে একটা বক্তব্য দেন।

আমার সহকারী মাসউদুল আলম সেটি আমার ট্যাবে আপ করে দিয়ে দেখতে বলেন। আমি একটানা লেকচারটি মোট ৩ বার শুনেছি। এরপর সেটির ওপর মাসুদের সাথে গতকাল একটা আলোচনা করেছি। দুই পর্বে মোট ১ ঘণ্টা ১৯মিনিট।

 

আমার মূল আলোচনার লিংক:

 

যেসব বিষয়ে আমি উনার সাথে দৃঢ়ভাবে একমত হয়েছি তা হলো:

১. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অধিক সংখ্যক ছাত্র ভর্তি না করে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির চেষ্টা করা।

২. নিছক তথ্যের সমাবেশ জ্ঞান নয়, লেখাপড়ার নামে যা এখন হচ্ছে।

৩. তথ্য-থেকে-জ্ঞান-থেকে-প্রজ্ঞা-থেকে-স্বজ্ঞা, এভাবে জ্ঞান-কাঠামো গড়ে তোলা।

৪. ভবিষ্যতকে গড়ে তোলার জন্য বর্তমান ও অতীতকে জানা।

৫. সভ্যতাগত উন্নয়নে দর্শনের, বিশেষ করে অধিবিদ্যাগত তথা জীবন ও জগত সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নগুলোর ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা।

৬. ইউরোপীয় সভ্যতার নানা অসংগতি।

৭. জ্ঞান হলো অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, ধীশক্তি, ইত্যাদির সমন্বয়। এগুলো একটা আরেকটাকে কম্প্লিমেন্ট করে। তিনি কম্প্রিহেনসিভ ও ইন্টিগ্রেটেড নলেজের কথা বলেছেন।

৮. হুকুম-আহকাম প্রয়োগের পূর্বশর্ত হিসাবে (সামাজিক) প্রজ্ঞা বা হিকমাহ’র শর্তপূরণ হওয়া।

যেসব বিষয়ে আমি উনার সাথে জোরালোভাবে দ্বিমত পোষণ করেছি, তা হলো:

১. কানেক্টিং দ্যা কনসেপ্টকে তিনি জ্ঞান হিসাবে বিবেচনা করেন নাই। অথচ, জ্ঞান হলো বিদ্যমান তথ্যের মধ্যকার সমন্বয়মাত্র। আমার KIV ফর্মূলা অনুসারে information added value, yields knowledge। সংক্ষেপে K=I+V

২. উনার বক্তৃতা শুনে কারো মনে হতে পারে, রেনে ডেকার্টের subjective idealism-এর পরিণতি হলো solipsism বা চরম আত্মকেন্দ্রিকতাবাদ। ফিলোসফির যে কোনো স্টুডেন্ট জানে, ডেকার্ট সলিপসিস্ট ছিলেন না।

৩. উনি আগাগোড়া অবজেক্টিভিটি ও রিয়েলিজমের পক্ষে বলে গেছেন। তা বলতেই পারেন। কিন্তু পাশ্চাত্য দর্শন বা ইসলামী দর্শন, কোনো দিক থেকেই এটি চূড়ান্ত কিছু নয়। তারমানে, কনটেক্সটচুয়েলিস্ট দৃষ্টিকোণ হতে সাবজেক্টিভিটি ও অবজেক্টিভিটি এবং আইডিয়েলিজম ও রিয়েলিজম, সবই সঠিক ও সমওজনদার তত্ত্ব।

৪. অতীতমুখিনতা: অতীতকে জানতে হবে, এগিয়ে যাওয়ার জন্য। উনার বক্তব্যকে যে কেউ সহজে ভুল বুঝে এমন একটা ধারণা পেতে পারে, যেন আমাদের সোনালী অতীতই এখনো শ্রেয়তর ও শ্রেষ্ঠ। প্রগতিশীলতা ও অতীতমুখিনতা, এতদুভয় হলো mutually exclusive সম্পর্কের বিষয়।

৫. অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, গাজ্জালি যাদেরকে রিফিউট করেছেন, ইসলামী একটা জাগরণের জন্য তিনি সেসব গ্রীকপন্থী দার্শনিকদেরকে রেফার করেছেন, হাইলাইট করেছেন, গ্লোরিফাই করেছেন।

৬. জ্ঞানের ক্ষেত্রে মনুষ্যকেন্দ্রিকতা বনাম দৈবকেন্দ্রিকতার যে ফলস বাইনারি প্রচলিত তিনি সেটাতে এনগেইজ হয়েছেন।

৭. পাশ্চাত্য দর্শনের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি পাশ্চাত্য দর্শনের সবচেয়ে দূর্বোধ্য ও সুবিধাবাদি উত্তরাধুনিক ধারার অন্যতম প্রধান তত্ত্ব phenomenology’র প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। অথচ, এটি মূলত: একটি নাস্তিক্যবাদি তত্ত্ব। যার মূলকথা হলো, দৃশ্যমানতাই চূড়ান্ত। অতিবর্তী ও অন্তরারালের কোনো বৃহত্তর বাস্তবতা ও সত্য আছে কি-না, তা আমরা জানি না। নাস্তিকতার agnostic ফর্ম এটি।

৮. অতীতের জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। এটি তখনকার জন্য ঠিকই ছিলো। এখন জ্ঞানবিজ্ঞান এতো বিকাশ লাভ করেছে, একজনের পক্ষে মাল্টিডিসিপ্লিনারি হওয়াটা একেবারেই অসম্ভব। কেউ এরকম হতে চাইলে আদতে তিনি হবেন jack of all trades, but master of none। ‘হুজুরদের’ প্রচলিত ওয়াজের মতো ড. কালিনের কথারও ট্রেন্ড ছিলো, অনেক বেশি জানতে হবে, মিনিং অমুক-তমুক ইমাম বা শায়েখের মতো মাল্টিডিসিপ্লিনারি হতে হবে।

লেখাপড়ার বিষয়ে হোক কিংবা বাস্তব কর্মকাণ্ডে হোক আমার পরিষ্কার কথা হলো প্রত্যেকের উচিত সুনির্দিষ্ট একটা বিষয়ে গভীরে যাওয়া এবং অন্যান্য বিষয় গুলোতে সাধারণ জ্ঞান অর্জন করা। সেই হিসেবে নিতান্ত ব্যতিক্রম বাদে এখন কারো পক্ষে ট্রুলি মাল্টিডিসিপ্লিনারি হওয়া সম্ভবপর নয় বলে মনে করি।

 

আলোচনার দ্বিতীয় পর্বের লিংক:

এই পর্বে আমি মুসলিম ফিলোসফারদের মারাত্মক বিভ্রান্তিমূলক দর্শনের উদাহরণ হিসাবে ইবনুল আরাবির দর্শন সম্পর্কে কিছু আলোচনা করেছি। ইবনুল আরাবির দর্শন হলো, ওয়াহদাতুল অজুদ বা সত্তার একত্ব। মুজাদ্দিদ-ই-আলফ-ই-সানি শেখ আহমদ সরহিন্দ এটাকে সর্বেশ্বরবাদী শিরক্ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আমার মতে, এটি যথার্থ। এর মোকাবিলায় তিনি ওয়াহদাতুশ শুহু-দ বা সত্তার নৈকট্য তত্ত্ব তুলে ধরেন। ইব্রাহিম কালিন ইবনুল আরাবিকে যথেষ্ট পজেটিভলি ফোকাস করেছেন। যেন, তাদের মতো হতে পারাটাই আমাদের লক্ষ্য …। আশ্চর্য …!

ওয়াহদাতুল অজুদ তত্ত্ব অনুসারে পানির সাথে পানি যেভাবে মিশে যায়, পরকালে শেষ পর্যন্ত পূণ্যাত্মাগুলো তেমনভাবে পরমসত্তায় স্থিত বা বিলীন হয়ে যাবে। যেটাকে সুফী পরিভাষায় বাকাবিল্লাহ বলা হয়। এটি সূফী সাধানার ১৩টি ধাপের সর্বশেষ স্তর। ফানাফিল্লাহ হচ্ছে ঐশী সত্তায় সম্পৃক্ততার পরে পূণরায় মানবাত্মায় ফিরে আসা। আরো সাধনা করলে, সূফীদের মতে, মানুষ বাকাবিল্লাহ’র স্তরে উপনীত হতে পারে। স্পষ্টত: এটি সর্বেশ্বরবাদী ব্যাখ্যা। এবং ক্লিয়ারলি, বৌদ্ধ ধর্মে একে নির্বাণ বলা হয়।

[বিশেষ অনুরোধ: বক্তব্যগুলো ভালো করে না শুনে, শুধু এই ফরোয়ার্ডিং পড়েই কোনো পক্ষকে ‘প্রমাণ’ বা ‘খারিজ’ করার জন্য লেগে যাবেন না। আশা করি।]

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *