নবুয়তকেন্দ্রিক সভ্যতার ধারণা প্রসংগে মজহারীয় রাষ্ট্রচিন্তার অসংগতি পর্যালোচনা

গতকাল জনাব ফরহাদ মজহার উনার চিন্তা পাঠচক্রে থমাস হবসের ‘লেভিয়াথান’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ নিয়ে আজ সকালে তিনি একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তাতে উনি হবসের সমাজ চুক্তি মতবাদকে ভুল হিসাবে চিহ্নিত করে, উনার মতে, এরই ওপর ভর করে গড়ে উঠা আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। প্রসংগক্রমে, যারা ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করতে চাচ্ছে তাদেরও তিনি সমালোচনা করেছেন। উনার ভাষায়, “ইসলামপন্থিরা যখন কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সম্পন্ন আধুনিক রাষ্ট্রের গায়ে ইসলামি জোব্বা পরিয়ে ইসলামি রাষ্ট্র দাবি করে, তারা তখন মানুষের চরিত্র ও সমাজ সম্পর্কে হবসের অনুমানকেই মেনে নেন।”

আমি উনার বক্তব্যের বিরোধিতা করা ওয়াজিব মনে করেছি। উচিত ছিলো, এ নিয়ে প্রবন্ধাকারে কিছু লেখা। সময়, পরিবেশ ও আলসেমির জন্য তা না করে আমি ৩৮ মিনিটের এই ভিডিও বক্তব্যটি তৈরী করেছি:

এতে আমি বলেছি, ইউরোপীয় রাষ্ট্রদর্শনে সমাজ চুক্তি মতবাদ প্রধানত ৩টি। হবসের সমাজ চুক্তির প্রস্তাবনার সাথে জন লক ও রুশোর সমাজ চুক্তি মতবাদের প্রস্তাবনা সামঞ্জস্যশীল নয়। যদিও পরিণতির দিক থেকে তারা মোটাদাগে একই। অর্থাৎ তারা সবাই-ই রাষ্ট্র গঠনের পিছনে সমাজ চুক্তির অপরিহার্য ভূমিকার কথা বলেছেন। আধুনিক রাষ্ট্র গঠনটা ভুল ছিলো, এ’ কথা তারা কেউ বলেন নাই।

সমাজ চুক্তির মতবাদগুলোকে একসাথে অধ্যয়ন না করে এর একটাকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন ও ‘পর্যালোচনা’ করা, মতলবি বুদ্ধিজীবীতার পরিচায়ক। মজহার ঠিক এই কাজটিই করেছেন। উনার লক্ষ্য হলো, উনার আরাধ্য ‘শ্রেণিহীন সমাজে’র পক্ষে ওকালতি করা। যে ধরনের ইউটোপিয়ান সমাজে, ওনাদের কষ্টকল্পনা মোতাবেক, রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটাই থাকবে না।

কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বার বার ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের’ কথা বলেছেন। আমরা জানি। শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যতিরেকে ‘সৎ কাজের আদশে ও অসৎ কাজের নিষেধ’ অসম্ভব। আল্লাহ রাসূল (স.) বলেছেন, “তোমরা মন্দ কাজকে হাত দিয়ে বাধা দাও। না পারলে প্রতিবাদ করো। তা না পারলে সেটাকে ঘৃণা করো।” আমরা জানি, যাকাত থাকা মানে শ্রেণীবিভক্ত সমাজ থাকা। শ্রেণিহীন সমাজে যাকাত নামক এবাদত থাকার প্রশ্ন উঠে না। আমরা জানি, জাকাত একটা ত্রিপাক্ষিক ব্যাপার: (১) দাতা, (২) আদায়কারী কর্তৃপক্ষ, ও (৩) গ্রহীতা। তো, এই আদায়কারী কর্তৃপক্ষকে নিয়োগ দিবে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের তরফে ক্ষমতাসীন সরকার। জুমা ও ঈদের নামাজে এবং হজ্বের সময়ে আরাফাতের ময়দানে খুতবা দিবে রাষ্ট্র প্রধান বা তাঁর প্রতিনিধি। জিহাদ ঘোষণা ও পরিচালনা করবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। ইসলামে ধর্ম ও শাসনক্ষমতা অংগাঅংগিভাবে জড়িত। একটি ছাড়া অপরটি অচল ও অকার্যকর।

শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া ইসলাম ‘ধর্ম’ পালন করা অসম্ভব। ইসলাম অবশ্য অগত্যা পরিস্থিতিতে মানুষকে প্রয়োজনীয় ছাড় দিয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকা বা ন্যূনতম মানে না থাকা সত্বেও এই রোখসত বা ছাড়ের কারণে মানুষ দুর্বল মানে হলেও মুসলমান হিসাবে জীবনযাপন করতে পারে।

ইসলামের গোড়া কেটে, ইসলামকে ইসলাম যেভাবে চায় সেভাবে গ্রহণ না করে, একে প্রাকারান্তরে ডিজওৌন করে মজহারের মতো ধান্ধাবাজ আন্তর্জাতিক এজেন্টরা অবুঝ ইসলামপন্থীদের কাছে নিজেকে ইসলামদরদী বিশেষজ্ঞ হিসাবে উপস্থাপন করে। নিজেদের মধ্যে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা না থাকা ও হীনমন্যতার কারণে কিছু অবুঝ ইসলামপন্থী মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের মতো ইসলামপন্থী বুদ্ধিজীবীদেরকে দৃশ্যত: ভালো জানেন, একই সাথে তারা আবার কথায় কথায় ‘ফরহাদ ভাই’ বলে নিজেদের মজহারী হিসাবে পরিচয় দিতেও প্রীতবোধ করেন। কী পিকিউলিয়ার তাদের মেন্টালিটি …!

কম্যুনিজম জানতে চান? ভালো কথা। দুনিয়াজোড়া বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাজিত এই মতবাদ বাংলাদেশে ডমিন্যান্ট ইন্টেলেকচুয়্যাল ট্রেন্ড। অতএব, এ সম্বন্ধে জানা শোনা থাকাটা জরুরী। তো, ইসলামিস্ট ভাইবেরাদরগণ, বাংলাদেশে মজহারের মানের কম্যুনিস্ট তো আরো অনেকেই আছেন। তাদের ঢেরায় আপনাদের আনাগোনা দেখি না কেন? মজহার আপনারদেরকে জায়গা মতো ‘তেল মালিশ’ করতে জানে। তাইতো, উনাকে আপনারা খুব ভালা পান।

আপনাদের পত্রিকা ও প্লাটফরমে উনাকে ‘সহজিয়া-সাম্যবাদী-ইসলাম’ নামক অনৈসলামি মতবাদ ফেরি করার সুযোগ দেন। উনার ‘তবুও কম্যুনিজমের কথাই বলতে হবে’-তে আপনারা আনকমফোর্ট ফিল করেন না। কিন্তু উনি যখন উনার কোনো একজন সেবাদাসীর সাথে যৌন সম্পর্ক করেন, এবং এ নিয়ে উনার ‘স্ত্রী’র সাথে নাটক করতে গিয়ে যখন মিডিয়া সেনসেশনের কবলে পড়েন, সেটি তখন আপনাদের খুব খারাপ লাগে। ‘এসব কিছু’ জানাজানি হওয়ার পরে উনাকে আর আপন মনে করেন না। ‘ব্যভিচারী’ হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এতো অবুঝ আপনারা ….!

নেট কানেকশনের সমস্যার কারণে অনেকে আমার ভিডিওগুলো ডাউনলোড করে দেখতে পারেন না। তাদের জন্য, এবং মজহার সমর্থক ইসলামপন্থী হিসাবে আপনার চিন্তার অসংগতির জায়গাটা চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার জন্য, আপনাদের বোধেদয়ের জন্য এই ছাঁচাছোলা কথাগুলো এভাবে বলা। আমার পক্ষ থেকে যে ধরনের ভাষা আপনারা মোটেও আশা করেন না, সে ধরনের ভাষা কিছুটা এসে পড়েছে। আই এম সরি ফর দেট!

মজহারপন্থী ইসলামিস্টরা চিন্তার সংকটে ভুগছেন। মজহারের চৌদ্দ পৃষ্ঠা পড়তে তারা ক্লান্ত হন না। কিন্তু (কারো কারো কাছে,) ‘নিজেদের লোক’ মোজাম্মেল স্যারের তিন-চার পৃষ্ঠা লেখা পড়তেও কষ্ট লাগে। মজহারের বাগাড়ম্বর-সর্বস্ব, সারবত্তাহীন ও বৈপরীত্যপূর্ণ লেখাগুলোকে তাদের কাছে দীর্ঘ মনে হয় না। শুধু মোজাম্মেল স্যারের লেখাগুলোকে তাদের কাছে কঠিন ও দুর্বোধ্য ঠেকে। আসলে তারা ‘নিজেদের’ কাউকে সেই মানের বুদ্ধিজীবী বলে মনে করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নন। এখনকার ইসলামপন্থীদের একটা বিরাট অংশের ধারনা, বুদ্ধিজীবী হতে হলে যেন অন্তত খানেকটা হলেও বামপন্থী হতে হবে। আমি জানি, বামপন্থীরা কতোটা শ্রুড প্রকৃতির। আপনাদের অনেকের চেয়ে আমি তাঁদের বেশি চিনি। বামপন্থীদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য খানিকটা মন্দের ভালো বা তুলনামূলকভাবে ভালো। বাট আলটিমেইটলি, অল দ্যা বার্ডস আর উইথ দ্যা সেইম ফেদার। এট দ্যা এন্ড অব দ্যা ডে, দে আর ইনহারেন্টলি ইসলামোফোব-রেডিকেল-ফেনাটিক এথিইস্ট। তাদের মধ্যে যারা মজহারের মতো চতুর তারা ইসলামপন্থীদের ব্যবহার করতে চায়। মজহারের ভাষায়, এটি বুর্জোয়াতন্ত্র হতে সাম্যবাদের পথে “গণতান্ত্রিক রূপান্তরের” ফর্মূলা।

সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন’- এই ইউটিউব চ্যানেলে আপকরা আমার এই ভিডিও বক্তব্যটির নিচে ফরহাদ মজহারের পুরো স্ট্যাটাসটি উদ্ধৃত করা আছে।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *