মদীনা সনদকে আপাতদৃষ্টিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ মনে হলেও একে ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান হিসাবে দাবি করা হয় কেন?

“প্রত্যেকের গোত্রীয় ও ধর্মীয় স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়া সত্ত্বেও মদীনা সনদকে ইসলামী রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মডেল হিসাবে বিবেচনা করা হয় কেন?” বছর দু’তিন আগে প্রফেসর আবদুন নুর স্যার আরও অনেকের সামনে আমাকে এই প্রশ্নটি করলেন। “এটি ভীষণ স্কলারলি একটা কোয়েশ্চেন, স্যার”; আমি বললাম।

নূর স্যারের মতো একজন পণ্ডিত ইসলামীস্ট ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের এই প্রশ্ন আমাকে করার উদ্দেশ্য ছিল, আমি আসলে মদীনা সনদের তাৎপর্য বুঝেছি কি না তা যাচাই করা। তখন আমি এক নবীন সহকর্মীর নানাবিধ ‘উস্কানিমূলক’ প্রশ্নের মীমাংসা করতে গিয়ে মদীনা সনদ নিয়ে নতুন করে অধ্যয়ন ও বিশেষজ্ঞদের সাথে মতবিনিময় করছিলাম।

এটি সত্যি যে, মদীনা সনদের কোথাও ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণার মতো কোনো ব্যাপার নাই। বরং প্রত্যেককে স্বীয় গোত্রীয় ও ধর্মীয় বিধিবিধান অনুসারে ফয়সালা করার এখতিয়ার দেয়া আছে। আপাতদৃষ্টিতে তাই একে ধর্মনিরপেক্ষ বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক হলেও বস্তুত এটি ছিল একটি ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্বরূপ। কেননা, আন্তঃগোত্রীয় ও আন্তঃধর্মীয় বিরোধের ক্ষেত্রে মোহাম্মদকে (সা) বিরোধ নিষ্পত্তিকারী বা আরবিটট্রেটর হিসাবে মেনে নেয়ার মাধ্যমে ইসলামী শরীয়াহকে ‘ল অব দ্যা ল্যান্ড’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তৎকালীন ইয়াসরিব নামক জনপদে জাতিরাষ্ট্র ঘোষণার সনদ তথা মদীনা সনদ স্বাক্ষরকালীন সময়ে রাসূল (সা) ছিলেন সেখানকার অধিবাসীদের এক-দশমাংশের মতো মুসলিম ধর্মাবলম্বীর নেতা, যারা আবার প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন গোত্রের অন্তর্ভূক্ত ছিল। গোত্রীয় কাঠামোর বাহিরে গিয়ে মোহাম্মদকে (সা) যোগ্যতার কারণে জনপদের অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে সবাই মেনে নেন। এই অর্থে তিনি ছিলেন সেখানকার জন্য ‘লেভিয়াথান’ বা রাষ্ট্রনায়ক।

অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি ছাড়াও যুদ্ধ ঘোষণা ও পরিচালনা, সন্ধি স্থাপন কিম্বা বাতিলের কর্তৃত্বও অর্পিত ছিল রাসূল মোহাম্মদের (সা) উপর। সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিমরা মোহাম্মদকে (সা) রাসূল হিসাবে মেনে নিলে তারা তো মুসলমান হিসাবেই গণ্য হতেন। মোহাম্মদ (সা) যখন কোনো সিদ্ধান্ত দিবেন তখন তিনি ইসলামী শরীয়াহর ভিত্তিতেই তা করবেন – এটি জানা সত্ত্বেও তারা ‘ব্যক্তি মোহাম্মদ’কে (সা) নিজেদের নেতা হিসাবে মেনে নেয়। এই প্রক্রিয়ায় উক্ত জনপদে ইসলামী আইন-বিধান তথা শরীয়াহ প্রাতিষ্ঠানিক প্রাধান্য লাভ করে। এটিই হলো ইসলামী রাষ্ট্র-কাঠামোর মডেল। কোরআন শরীফে ‘লি ইউজহিরাহু আলাদ্দীনি কুল্লিহি’ [… যাতে অপরাপর দ্বীনসমূহের উপর এটি (ইসলামী শরীয়াহ) প্রাধান্য লাভ করে] বলতে মূলত এই ব্যবস্থাকেই বুঝানো হয়েছে।

বাংলা একাডেমির প্রাক্তন পরিচালক প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন স্যারের প্রমোট করা ‘মদীনা সনদ ধর্মনিরপেক্ষ’ টাইপের অর্ধসত্য গোঁজামিল থিসিস এখন প্রধানমন্ত্রীও প্রপাগেট করে বেড়াচ্ছেন! সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ব্যরিস্টার তানীয়া আমীর মহোদয়া এক ডিগ্রি বাড়িয়ে এমন কথাও বলছেন যে, জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের সাথে মদীনা সনদের মিল নাই!? মদীনা সনদ এখন টক অব দ্যা বাংলাদেশ পলিটিক্স। এ কথা সত্যি যে, ইসলামীস্ট ও সেক্যুলারিস্ট উভয় শিবিরে মদীনা সনদ নিয়ে কমবেশি ভুল ধারণা রয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত বয়ানে মোটা দাগের ভুল বুঝাবুঝিগুলোর নিরসন হবে, আশা করি।

ফেসবুক প্রথম প্রকাশিত এই লেখাটিতে মন্তব্যপ্রতিমন্তব্য:

Shahidul Hoque: প্রথম কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন, তারা অনেকটাই ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাকেই বুঝে থাকেন। একই ধর্মনিরপেক্ষতা দিয়ে রাষ্ট্র থেকে ধর্মের প্রভাব দূর করার কাজও করা যায়, এই বিষয়টা উনারা স্বীকার করতে চান না।

দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর উক্তি যদি সত্যিকার অর্থে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ না হয়ে থাকে, তাহলে উনার প্রস্তাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত। মদিনা সনদ অনুযায়ী, উনারা রাষ্টের শরীয়াহ আইনকরণে অথবা আইনের ইসলামীক রেফারেন্স তৈরিতে বাধা তৈরি করবেন না। অন্যদিকে, বিরোধী দলের কোনো পক্ষই সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা বা ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা ব্যাহত করবেন না। যদিও টেকনিক্যালি এই বিষয়গুলো এখনো আছে, কিন্তু সবপক্ষ একসাথে মদীনা সনদকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা চালাতে পারে।

তবে আসল কথা হলো, রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাবে কোনো এলার্জি না থাকা যে কোনো পক্ষের জন্যই মদিনা সনদ একটা ‘উইন উইন’ আবহ তৈরি করে।

Sarwar Kamal: There is a gulf of difference between ‘secularism in theory’ and ‘secularism in practice’ in bd. In practice secularism is a project to promote Hinduism against liberal Islamism.

In doing so they refer to Bengali culture that has genesis in Indian culture and Indian culture is nothing but a superstructure of Hinduism.

Masud Zakaria কোনো ক্লিয়ারকাট জবানী পাচ্ছি না। আমরা মনে করি ’মদিনা সনদ’ কে আপসা-দৃষ্টি নিয়ে আলোচনা না করে ইবনে খলদুন ইতিহাস পাঠের যে বিশ্লেষণী পদ্ধতি আবিস্কার করেছিলেন সেটা অনুসরণ করা জরুরী। ’ইসলামী রাষ্ট্র’ শব্দটি দুনিয়াতে পয়দা হয়েছে বড়জোর ৭০ বছর এটা দিয়ে ’কিতাবুর রসূল’কে ’ব্যাখ্যা’ করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে? এই বিষয়ে কোনো সাহিত্যতাত্ত্বিক পদ্ধতির চেয়ে সমাজতাত্বিক একাডেমিক পদ্ধতিই গুরুত্বপূর্ণ হবে। আমরা একাডেমিশিয়ানদের দৃষ্টি আকর্ষন করছি আমাদেরকে এ বিষয়ে পথের দিশা দেয়ার জন্য।

Mohammad Mozammel Hoque: Sarwar Kamal, তোমার জওয়াব বরাবরের মতোই দুর্দান্ত হয়েছে। জাস্ট অ-সাম! দেখ, আজকে ভারতীয় বাংলা চ্যানেলগুলোতে তেমন কোনো বিশেষ প্রোগ্রাম নাই। আমাদের এখানে এত সাড়ম্বরে যে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে, এরমধ্যে বাঙালীর উৎসবপ্রিয়তার সাথে সাথে উভয় পক্ষের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়াশীলতাও রয়েছে। সেক্যুলারিজমকে জোর করে চালিয়ে দেয়া বা হজম করানোর একটা তথাকথিত প্রগতিশীলতার পাশাপাশি সেক্যুালারিজমের অন্তর্নিহিত পটেনশিয়ালিটিকে বেমালুম অস্বীকার করার একটা ধর্মীয় প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক ব্যাপারে কোনো চরমপন্থাই শেষ পর্যন্ত কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না।

Sarwar Kamal: আওয়ামীলীগপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও জানে, এভাবে বৈশাখ উদযাপন ঠিক বাঙ্গালীয়ানা নয়। কিন্তু এই সংস্কৃতিটাকে তারা তাদের রুটি-রুজি-ডাল-ভাত উপার্জনের উপায় করে ফেলেছে। তাই তাদের সাংস্কৃতিক অর্থনীতির তাগিদেই তারা এর পক্ষে সাফাই গায়। এখন পণ্যায়ন ও বহুজাতিক সংস্কৃতির আগ্রাসনে হিন্দু ভাবাপন্ন বাঙ্গালীয়ানাও ঠিক আগের জায়গায় নেই। সংস্কৃতি তো প্রবহমান, এতে নতুন কিছু যোগ হবে, পুরাতন কিছু লুপ্ত হবে স্বাভাবিক নিয়মেই। কিন্তু দেশী রাজনীতিতে বাঙ্গালী সংস্কৃতির আওয়ামী দাসত্ব, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতপ্রীতির যে সাংস্কৃতিক রাজনীতি চলছে, তার বিপরীতে বাংলাদেশী মুসলমানেরা কী পরিমাণ লোকজ সংস্কৃতি ইসলামী মূল্যবোধের নিরিখে গ্রহণ করতে পারে, আর কি পারে না; তা স্পষ্ট না হওয়ায় এক ধরনের বিভ্রান্তি আছে। এই কারণে সেকুলার বিতর্কের অবসান হচ্ছে না।

Mohammad Mozammel Hoque: সুপার কমেন্ট…!

Ibrahim Hossain: I think the crux of the Medina charter lies in its clause 23 which says “Whenever you differ about anything it is to be referred to Allah and Muhammad.”

Khandoker Zakaria Ahmed: সীরাতে ইবনে হিশামের (বিআইসি অনূদিত) ‘মদীনাতে ভাষণ দান ও চুক্তি সম্পাদন’ (মদীনা সনদ নামে পরিচিত) অধ্যায়ে বলা হয়েছে “… এই ঘোষণাপত্র গ্রহণকারীদের মধ্যে যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা ঝগড়া-কলহ ঘটুক না কেন, তার ফয়সালার জন্য আল্লাহ ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরণাপন্ন হতে হবে।” অমুসলিমরা মোহাম্মাদকে (সা) নবী না মেনে ব্যক্তি হিসেবে গন্য করলেও এখানে পরিস্কার, আল্লাহর শরণাপন্ন মানে ইসলামের বিধানের (শরিয়তের) আলোকে সমাধান – যা সকল পক্ষ মেনে নিয়েছে। আপনি উল্লেখ করেছেন, মদীনা সনদে প্রত্যেককে স্বীয় গোত্রীয় ও ধর্মীয় বিধিবিধান অনুসারে ফয়সালা করার এখতিয়ার দেয়া আছে। কিন্তু এই ‘এখতিয়ারের’ পরিধি কতটুকু? যদি আন্তঃধর্মীয় বিষয় হয় তাহলে কী হবে ?

Mohammad Mozammel Hoque: আন্তঃধর্মীয় বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ইসলাম ধর্মানুসারীদের বিধিবিধানই প্রযোজ্য হবে। ল অব দ্যা ল্যান্ড ছিলো ইসলামী শরীয়াহ, যা কেবলমাত্র মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। কোনো বিষয়ে কোনো গোত্রের বা ধর্মের বিধান না থাকলে বা যা আছে তার ব্যাখ্যা নিয়ে সংশয় বা বিতর্ক সৃষ্টি হলে ইসলামী শরীয়াহর বিধান অনুসারে সে বিষয়কে নিষ্পত্তি করা হবে। সবার স্বাধীনতা থাকলেও একটা ল অব দ্যা ল্যান্ড থাকতে হবে, না থাকলে তৈরি করতে হবে। ল অব দ্যা ল্যান্ড হতে পারে একমাত্র আইন। ল অব দ্যা ল্যান্ড হতে পারে বিরোধ নিষ্পত্তির আইন। কোরআনের ‘লি ইউজহিরাহু আলাদ্দীনি কুল্লিহি’ বলতে দ্বিতীয় অর্থই বোঝানো হয়েছে, আমার ধারণায়।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *