মেডিটেশন কি ইসলামবিরোধী?

 

মেডিটেশন রিলেটেড কিছু টেক্সট-ছবি পাঠিয়ে এক ঋদ্ধ পাঠক প্রশ্ন করেছেন:

“একটা বিষয় আপনার নিকট জানতে চাচ্ছি। তা হলো বর্তমানে স্পিরিচুয়াল হিলিংয়ের নামে বিভিন্ন কনসেপ্ট চালু হয়েছে। যেমন, কোয়ান্টাম মেথড, রেইকি, সিলভা মেথড ইত্যাদি। এর মধ্যে আমার প্রশ্ন রেইকি সম্পর্কে।

আমি আপনাকে তাদের হিলিংয়ের ক্ষেত্রে যে সাউন্ড ব্যবহার করা হয় তার একটা ছবি পাঠাচ্ছি। হিলিংয়ের ক্ষেত্রে এই শব্দগুলো ব্যবহার এবং টোটাল এই সিস্টেম নিয়ে কাজ করা অথবা এদের থেকে সেবা নেয়া, ঈমান এবং ইসলামের সাথে সাংঘার্ষিক হবে কি না? দয়া করে আপনার গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে জানালে ভীষণ উপকৃত হবো।”

***

আমার উত্তর:

ওম-এর যে চারটা অর্থের কথা আপনার পাঠানো চিত্রে বর্ণিত হয়েছে তার মধ্য থেকে একটি উত্তর আমার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। বাদবাকি তিনটাই অ-ইসলামিক। এই ‘অ-ইসলামিক’ কথাটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ।

যেখানে ‘অ-ইসলামিক’ মানে এমন কোনো প্রায়োগিক বা তাত্ত্বিক কিছু, যা বেসিক ইসলামিক সোর্সগুলোতে নাই, সেখানে এ ধরনের অ-ইসলামিক বিষয়গুলো আদতে ইসলামবিরোধী কিছু নয়। এ অর্থে ইসলামসম্মত। যেমন, ইন্টারনেটের ব্যবহার কিংবা অংক বা পদার্থবিজ্ঞানের নানা তত্ত্ব।

আবার কিছু কিছু অ-ইসলামিক বিষয় আছে যা ইসলামের মৌলিক প্রস্তাবনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাংঘর্ষিক। এমন ধরনের অ-ইসলামিক বিষয় প্রায়োগিক বা ব্যবহারিকও হতে পারে, আবার তাত্ত্বিক বা মতাদর্শগতও হতে পারে। যে ধরনের মেডিটেশনের কথা আপনি বললেন, তা আমার বিবেচনায় প্রায়োগিক ও তাত্ত্বিক, উভয় দিক হতেই ইসলামবিরোধী হতে পারে।

জীবন ও জগত সম্পর্কে ইসলাম যে কথাগুলো বলে, যে ধরনের যুক্তি দেয়, যেসব পদ্ধতির কথা বলে, সেগুলোকে বাদ দিয়ে নতুন ধরনে কথা বলা, ভিন্ন ধরনের যুক্তিকে যথার্থ প্রতিপাদন করা ও ভিন্নতর জীবনপদ্ধতির পক্ষে কথা বলা হলো ইসলামের বিরোধিতা করা। কথাটা বুঝানোর জন্য রিপিট করে বললে বলতে হয়, ইসলাম যা যা বলে তা সম্পর্কে নীরব থাকাটা বা ইসলামে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না করাও হতে পারে প্রকারান্তরে ইসলামবিরোধিতা করা।

একটা উদারহরণ দিয়ে যদি বলি। যেমন– কেউ যদি নামাজকে মেডিটেশন হিসাবে নেয়, তাহলে মেডিটেশন ইসলামসম্মত। কিন্তু কেউ যদি মেডিটেশনকে খুব সিরিয়াসলি নেয়, তাহলে মেডিটেশনকে অবশ্যই ইসলামবিরোধী কিছু হিসাবে স্বীকার করতে হবে। কেননা, এ ধরনের মেডিটেশনবাদীদের কাছে মেডিটেশনটাই মূল জিনিস। নামাজটা হলো মেডিটেশনের একটা ফর্ম মাত্র।। বলা যায়, মুসলিমদের মেডিটেশন।

এ ধরনের মেডিটেশনবাদীরা নামাজকে একদিকে ইবাদত হিসাবে নেয়, অন্যদিকে নামাজকে ধ্যানের বা হিন্দুদের পূজার সমতুল্য হিসাবেও স্বীকার করে। অধর্ম, ধর্ম ও আন্তঃধর্মের মধ্যকার এ ধরনের সমতা, ধর্মনিরপেক্ষতার দৃষ্টিতে সঠিক ও আদরনীয় হলেও ইসলামের মতো ‘চরম অসহিষ্ণু’ ধর্মের ক্ষেত্রে তা ক্লিয়ারলি ধর্মবিরোধী।

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনছেন। ইসলাম স্বীয় মৌলিক প্রস্তাবনা ও অনুসারীদের জীবনযাপন পদ্ধতির দিক থেকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে অসহিষ্ণু বা ইনটলারেন্ট। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইসলাম ভীষণভাবে উদার বা ইনক্লুসিভ হলেও আকীদা ও মৌলিক ইবাদতের ক্ষেত্রে ইউনিপোলার ও ইউনিসেন্ট্রিক।

তাই, ইসলাম বা এই ধরনের সর্বাত্মকবাদী মতাদর্শের আওতার মধ্যে থেকে কোন কোন ক্ষেত্রে আপনি প্লুরালিস্টিক হতে পারবেন, তা ঠিক মতো বুঝতে হবে। কোনো আদর্শ যদি জীবনের সবক্ষেত্রকে সুনির্দিষ্টভাবে কভার করে তাহলে তা নিজের ব্যাপারে এ রকম বাইনারি সিস্টেমকেই গ্রহণ করবে, এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে?

হাসান আল বান্না শহীদের একটা কথা খুব মনে পড়ে। ১৯৮৯-এর চবি মাস্টার্স ব্যাচের স্মারক গ্রন্থে আমার ছবি ও ঠিকানার পাশে কথাটা দিয়েছিলাম। কথাটা ছিল এরকম, “accept Islam in to to, or keep it aside. Islam admits no compromise.” আলাম নাশরাহ সূরা যারা পড়েছেন, যারা প্র্যাকটিসিং মুসলিম, তাদের কেন এ ধরনের প্রবলেমেটিক মেডিটেশন করতে হয় বা হবে, তা আমার কোনোমতেই বুঝে আসে না।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

Leave a Reply