দল করা কিংবা না করা প্রসংগে সামাজিক আন্দোলনে কাজের ধরন

যারা দল করেন সচরাচর তারা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়েন। এমনকি মেধাবী লোকজনও দলীয় আনুগত্যের পরিণতিতে এক পর্যায়ে দলকানা রোগের শিকার হয়ে স্থায়ীভাবে বুদ্ধি-বিকল হয়ে পড়ে। এটি সত্য। এসব আমরা জানি এবং আশেপাশে অহরহ দেখে থাকি।

সমাজকে পরিবর্তন করার বাস্তবতাকে যদি আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখবো সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নাই। আগেকার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, সাহিত্য চর্চা ও তত্ত্ব বিশ্লেষণের কাজ হলো ব্যতিক্রম। এসব ক্ষেত্রেও ব্যক্তি যতক্ষণ না সমষ্টিকে প্রভাবিত না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তিবিশেষের কোনো তত্ত্ব-বিশ্লেষণ শূন্যগর্ভ ও অর্থহীন। ব্যক্তির চিন্তা যখন সমষ্টির কণ্ঠে ধ্বনিত হয় তখনই তা স্বার্থক হয়ে উঠে। এই দৃষ্টিতে ইমপেক্ট ফেলতে হলে দল ব্যবস্থা অপরিহার্য। সমস্যা হলো, জগতে ভালো কিছু যা আছে তার প্রত্যেকটিরই নানা মাত্রায় অপব্যবহার হয়েছে।

এক কথায়, সব কিছুরই খারাপ বা বিকৃত প্রয়োগ সম্ভব। এ নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ থাকলে স্পেসিফিক উদাহরণ দিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। আমি দেখিয়ে দিবো, হয়তো বিষয়টি এমন যা মূল্য-নিরপেক্ষ। ব্যবহারের উপরে নির্ভর করে বিষয়টা কেমন হবে। অথবা, বিষয়টা প্রকৃতপক্ষে ভালো। যদিও ফলোয়ারেরা সেটিকে নানা মাত্রায় কলুষিত করেছে। অন্ধ দলীয় আনুগত্য হলো দল সংশ্লিষ্টতার অপপ্রয়োগ বা খারাপ দিক।

দলান্ধতার প্রতিক্রিয়ায় সুধী মহলের কেউ কেউ দল নিরপেক্ষতার কথা বলেন। এ নিয়ে তারা গর্ববোধ করেন। দল করাকে খারাপ মনে করেন। নিজেদের নিরপেক্ষতাকে তারা কৃতিত্ব হিসাবে দাবী করেন। যেন, দল যারা করে তারা আদতে খারাপ। এটি তাদের ভুল ধারণা। কেউ তাদেরকে এ ব্যাপারে তেমন কিছু বলে না। কোনো বিরুদ্ধ কথা না শুনে তারা মনে করেন, তারা ঠিক পথেই আছেন। তাদের ধারণা, যারা দল করেন, তারা দেশ ও জাতির সমস্যার মূল। তথাকথিত দল নিরপেক্ষদের এই অবস্থানটাকে ব্যক্তিগতভাবে আমি অগ্রহণযোগ্য মনে করি।

দল নিরপেক্ষ কোনো কিছু কি আছে? আদৌ সম্ভব? জোট নিরপেক্ষ জোটও যেমন একটা জোটই, নিরপেক্ষ পক্ষও তেমনি একটা পক্ষ। দিনশেষে আমরা কোনো না কোনো পক্ষে বিভাজিত। কেউ যদি বুঝে শুনে কোনো পক্ষ না নেয় তাহলে সে ‘বিবিধ খাতে’ পক্ষভুক্ত হয়।

আমি বিবিধ খাতে থাকার লোক নই। চাই না, কেউ বিবিধ খাতে পড়ে থাকুক। দুনিয়াটা চলে গেইম থিওরির ফর্মূলা অনুসারে। এখানে প্রত্যেকেই খেলোয়াড়। যোগ্য খেলোয়াড় জয়ের জন্য ভূমিকা রাখে, অযোগ্য খেলোয়াড় পরাজয়ে ‘অবদান’ রাখে। একটা বিশেষ ভূমিকা আমাদের পালন করতেই হয়। সবাই করছেও বটে, সচেতনভাবে বা অবচেতনভাবে, ইতিবাচকভাবে বা নেতিবাচকভাবে, সক্রিয়তার মাধ্যমে কিংবা নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে।

বুঝতেই পারছেন, নিরপেক্ষতা যদি হয় ন্যায়-নীতি ও সত্যের ব্যাপারে নিষ্ক্রিয়তার নামান্তর, তবে এমন নিরপেক্ষতার মতো ঘৃণ্য আর কিছু হতে পারে না। যেদিকে যা-ই করুন না কেন, সঠিক বিবেচনাবোধ থাকা চাই। সূক্ষ্মভাবে হোক বা মোটাদাগে হোক, পরিমিতিবোধ বা মাত্রা-জ্ঞান থাকা চাই। কে, কোন দিকে, কীভাবে, কতটুকু সক্রিয় হবে তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

সবদিকে যিনি সক্রিয় হতে চান তিনি কোনো কাজের নন। সবার কাছেই যিনি ভালো হতে চান, তিনি আসলে কপট, ভণ্ড। সব পক্ষকেই যিনি সঠিক মনে করেন, তিনি মূর্খ কিংবা পণ্ডিত-মূর্খ।

অতএব, কোনো না কোনো পক্ষে থাকতে হবে। কোনো না কোনো দলের সাথে থাকতে হবে। সমাজ মানেই দলবদ্ধতা। তাই সমাজের মধ্যে থেকে যারা নিরপেক্ষতার দাবী করে তারা আদতে সমাজচেতনাবিরোধী। অসামাজিক। স্বার্থপর।

এ পর্যায়ে, দল বলতে কী বুঝায়, তা নিয়ে কিছু না বললে এই লেখা হতে ভুল অর্থ গ্রহণ করার আশংকা থেকে যাবে।

দল মানে কেন্দ্র থেকে শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো সম্পন্ন দলই আমরা বুঝে থাকি। সমকালীন বাংলাদেশে লোকজন ভাবতে পারে না, এর বাইরেও দল হতে পারে। অথচ, এক একটা চিন্তাগোষ্ঠীও আসলে এক একটা দল বটে। সমমনা লোকেরা দূর আবাসে থাকলেও তারা একটা দলেরই সদস্য। জ্ঞানতত্ত্বের সংগতিবাদ অনুসারে তারা তারা epistemic neighborhood-এর সূত্রে একটা গ্রুপ বা দল। দল হতে পারে বিদ্যমান বৈশিষ্ট্য বা পরিমাণগত বিচারে তুলনামূলকভাবে ভালো। আবার, দল হতে পারে সম্ভাবনা, প্রতিশ্রুতি ও যোগ্যতার দিকে থেকে তথা potentially অধিকতর ভালো বা সেরা।

যারা একা ও বিচ্ছিন্ন, জগতে তাদের অস্তিত্ব অর্থহীন। অন্যদের সাথে যারা যুথবদ্ধ হতে পারে না তাদের দিয়ে কিছু হবে না। যারা সমন্বয় ও সহযোগিতামূলকভাবে মোকাবিলা করতে পারে না তারা টিকে থাকতে পারে না। সংঘবদ্ধতার এই অপরিহার্যতা আদিম। প্রাণ বাঁচানোর জন্য দলের প্রয়োজন। মান বাঁচানোর জন্য দলের প্রয়োজন। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য দলের প্রয়োজন। অন্যায়ের প্রতিরোধের জন্য দলের প্রয়োজন। এর বিকল্প নাই। নিছক যুক্তি, সমালোচনা কিংবা প্রস্তাবনা দিয়ে সত্য, ন্যায় ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে না। চাই সম্মিলিত প্রণোদনা, পারষ্পরিক প্রেরণা ও সহমর্মিতার প্রতিশ্রুতি।

এ পর্যন্ত আমরা আশেপাশে যত ধরনের দল দেখি তা সবই টপ-ডাউন কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত। এ ধরনের দল-ব্যবস্থার অধীন ইউনিটগুলো এলাকাকেন্দ্রিকভাবে গঠিত ও কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত। এই ধরনের প্রচলিত দল ব্যবস্থার পাশাপাশি সমমনাদের মধ্যে ইতোমধ্যে শুরু হওয়া সামাজিক আন্দোলনের দল-ব্যবস্থা হলো বহুমুখী, বিকেন্দ্রীকৃত, স্বনিয়ন্ত্রিত ও ব্যক্তি-উদ্যোগনির্ভর। এ যেন এক একটা পুষ্পমঞ্জরী কিংবা এ যেন অনেকগুলো ফুলের গাঁথা মালা। পুষ্পমঞ্জরীর ডাঁটা কিংবা মালার যে সূতা, সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে তার সমতুল্য বন্ধন হলো প্রত্যেকের ব্যক্তিগত কিন্তু সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও জীবনবোধ।

সামাজিক আন্দোলনের স্বতন্ত্র উদ্যোগগুলো সমধর্মী জীবনবোধ বা একই আদর্শবোধের বৃহত্তর বন্ধনে যুক্ত। প্রশাসনিক কাঠামোর মতো কোনো প্রকারের ঊর্ধ্বতন জওয়াবদিহিতার শিকলে তারা পরস্পরের সাথে যুক্ত নন। সামাজিক আন্দোলনের অধীনে গড়ে উঠা উদ্যোগগুলোকে প্রচলিত ফরমেটে দল বলা যাবে না। সেগুলো বরং ক্রিয়েটিভ ইনিশিয়েটিভ। সেগুলো অনেক বেশি স্বাধীন। নিয়মনীতির উঠবসের চেয়ে এখানে বুদ্ধি, বিবেচনা, বিবেক ও নৈতিকতার গুরুত্ব অনেক বেশি।

এই ধরনের একটা দলে আমি আছি। আপনিও একটা কিছুতে লেগে যান। আমার দলের কোনো নাম নাই। কাঠামো নাই। নির্দিষ্ট সদস্য নাই। আসলে, এ ধরনের দলের নাম থাকার অপরিহার্যতাও নাই। থাকলেও ক্ষতি নাই। শুধু নিঃস্বার্থ কর্মতৎপরতা থাকলেই হলো। নাম-ঠিকানা হিসাবে কিছু একটা এক সময়ে চালু হয়ে যাবে। শুরুতেই দেশব্যাপী কিছু করার চেষ্টা করবেন না। আপাতত নিজের আশপাশেই কিছু একটা শুরু করে দেন। হতে পারে, তা এক সময়ে দেশব্যাপী বিস্তৃত হবে। হতে পারে তা দেশের সীমানার বাইরে বিস্তৃত হবে। মনে রাখবেন, সব উদ্যোগই সফল হয় না। দেয়ালের সবটুকু সুদৃশ্য দালান হিসাবে দেখা যায় না। অন্তরালে থাকা ভিতের উপরেই কোনো কাঠামো টিকে থাকে। সাফল্যের জোয়ারে পরবর্তী লোকেরা শুরুর কাজগুলোর কথা স্মরণে রাখে না। এর উল্টোটাও ঘটে। তাতে ক্ষতি কী?

প্রথমেই অত লম্বাচওড়া চিন্তা না করে সাধ্যমতো কিছু একটা করেন। এবং ক্রমাগত করতেই থাকেন। নিজের মতো করে আগাতে থাকেন। দেখবেন, একই পথের যাত্রীরা ক্রমেই কাছে আসছে। ধীরে ধীরে যেন একটা দলের মতো হয়ে যাচ্ছে। হোক।

সময়ের আগে লম্বাচওড়া আগাম পরিকল্পনাতে এনগেইজ হওয়ার দরকার নাই। আকশকুসুম কল্পনাতে সময় নষ্ট না করে যা পারেন, কিছু একটা করার কাজ আজই শুরু করে দেন। দেখবেন, সমমনারা কোত্থেকে যেন জুটে গেছে। বিন্দু বিন্দু পারদের মতো দেখবেন সব যেন মিলে যাচ্ছে। ক্রমে যেন বাড়ছে। না বাড়লেও সমস্যা নাই। আপনি আপনার দায়িত্ব তো পালন করলেন। কোনো উদ্যোগ, যে কারণেই হোক, ভেংগে পড়লেও তেমন কোনো ক্ষতি নাই। অন্য কোথাও আবার ঠিকই তা গড়ে উঠবে। হয়তো আরো শুদ্ধভাবে। আরো শক্তিশালী হয়ে। ব্যাপার হলো শুধু একই সমতলে থাকা। সঠিক জীবনবোধ ও সমআদর্শের চেতনাই হলো এই বৃহত্তর সমতল যা আমাদেরকে এক উজ্জ্বলতর সম্ভাবনার দিকে অনিবার্যভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়।

সংগঠন বিশেষের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়। সর্বাবস্থাতেই নিজের সরল বুদ্ধি ও বিবেকের স্বচ্ছতাকে অনুসরণ করুন। আত্মমর্যাদাকে নেতা বানিয়ে নিন। যদি তা করতে পারেন, নিশ্চিত থাকুন, আপনি সঠিক পথেই আছেন। হীনমন্য হবেন না। নিজেকে অকিঞ্চিতকর মনে করবেন না। তরুণদেরকে বলছি, ক্যরিয়ার সেক্রিফাইস করে এখনি ‘কিছু একটা’ করে ফেলার ‘জেহাদে’ ঝাপিয়ে পড়ার মতো ভুল করবেন না। জীবন একশ’ মিটারের দৌড় প্রতিযোগিতার মতো শর্টকাট কোনো ব্যাপার নয়। মনে রাখবেন, দশ হাজার মিটারের দৌড় প্রতিযোগিতার মতো এ জীবন সংগ্রাম দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর। তাই,

So, be slow but steady. Don’t be so impatient but be consistent. Keep faith on your potentiality. Allah has never created anyone without any specialty. I believe that. Don’t you?

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *