ইসলামী আন্দোলন ও অবকাঠামো: প্রসঙ্গ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

১. সম্পত্তি তথা অবকাঠামো আন্দোলন:

অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। কিন্তু এর আগে দরকার সেই এস্টাবলিশমেন্টকে হজম করার মতো যোগ্যতা। পরিশ্রম করে, গায়ের জোরে, মুখস্ত করে, প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভালো রেজাল্ট বাগিয়ে, চ্যানেল মোতবেক লেগে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার হয়েছেন। একই পন্থায় নামের আগে ড বিসর্গ (ডঃ) ও একাধিক পোস্ট-ডক লাগিয়ে দেশে-বিদেশে পেপার-সিনোপসিস দিয়ে বেড়াচ্ছেন – এমন লোকজনকে দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা ধান্ধাবাজ হিসাবে পরিচিত। আবার এমন বেশ কিছু শিক্ষক আছেন যাদের অনেকেরই তেমন কোনো দ্বিতীয় ডিগ্রি ও প্রকাশনা নাই, অথচ তারা একাডেমিশিয়ান হিসাবে সুপরিচিত ও দল-মত নির্বিশেষে সবার শ্রদ্ধেয়।

কথাটা এজন্য বললাম যে, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থাও হয়েছে প্রথমোক্ত ধরনের শিক্ষকের মতো। কষ্ট করে তিনি অনেক অর্জন করেছেন কিন্তু কারো প্রত্যাশা ও স্বপ্নের সওদাগর হতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ভালো শিক্ষকের মতাদর্শকে সমর্থন না করলেও তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব হওয়ার স্বপ্ন দেখে। নন-একাডেমিশিয়ান (তার যতই উচ্চতর ডিগ্রি থাকুক না কেন) শিক্ষকদেরকে রাজনীতি, ছাত্রদের সহযোগিতা ইত্যাদি কারণে সবাই যতই সমাদর করুক না কেন তাদেরকে আদর্শ মনে করে না। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনে কাজে লাগায় মাত্র।

তেমনি জামায়াতও বুদ্ধিবৃত্তি (যা হলো অনলি এক্সকিউজ ফর ইসলাম) ও সামাজিক নৈতিকতার মারাত্মক সংকটে (যেমন, দলবাজী ইত্যাদি) পড়ে জাতির আশা-আকাঙ্খার কেন্দ্রস্থল থেকে ছিটকে পড়েছে। মানুষ জামায়াতকে এর (বাহ্যত) কঠোর সাংগঠনিক শৃংখলার জন্য কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে তুলনা করে। যা নিয়ে অবুঝ জামায়াত কর্মী ও নেতারা আহ্লাদিত হয়ে থাকেন। কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে জামায়াতকে তুলনা করাটা যে জামায়াতের জন্য ডিসক্রেডিট তা বোঝার যোগ্যতাও উনারা অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছেন। এটি জামায়াতের নিম্ন-মধ্যবিত্তসুলভ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।

বিগত প্রায় তিরিশ বছর হতে আমি মাসিক পৃথিবী নিয়মিত রাখি। অধ্যাপক নাজির আহমদ যেমন সংগঠনবাদিতার পারফেক্ট এমবডিমেন্ট, তেমনি এই সম্মানিতের মাসিক পৃথিবীও জামায়াতের শ্যালোনেসের আদর্শ উদাহরণ। এতে কোরআনের আয়াত থেকে শুরু করে কৃষি – সব বিষয়ে কিছু না কিছু পাবেন। থট প্রোভোকিং ম্যাটেরিয়্যাল হিসাবে সেগুলো ভালো জিনিস। সমস্যা হলো এসব ছোট ছোট বই ও লেখা পড়ে কেউ তো কাঙ্খিত মানের জ্ঞানী হতে পারবেন না। অথচ এ ধরনের মোটিভেটিং ট্রেন্ডের সংক্ষিপ্ত লেখা পড়েই জামায়াতের অনেক লোকজন নিজেদেরকে যথেষ্ট জ্ঞানী মনে করেন। বড় বড় আলেম ও বিশেষজ্ঞদেরকে তারা হেদায়েতী জ্ঞান দিতে পরম উৎসাহবোধ করেন!?

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশে শিক্ষিত ইসলামপন্থীদের ব্যাপকভাবে কার্যত আহলে হাদীস বনে যাওয়ার এটাই কারণ। তারা হয়তো ‘রাসুলুল্লাহর (সা) নামাজ’ জাতীয় শিরোনামের কোনো বইয়ে কিছু সহীহ হাদীস সম্পর্কে পড়েছেন। ভাবছেন, এই হাদীস যেহেতু সহীহ তাহলে আমল করতে অসুবিধা কী? অর্থাৎ কোনো অসুবিধা নাই। অথচ, যদি তারা সরাসরি হাদীসের কিতাবগুলো থেকে অধ্যায়ভিত্তিক পড়াশুনা করেন, জাল হাদীস সম্পর্কে মূল সূত্রগুলো থেকে জানার চেষ্টা করে মাওজুগুলো বাদে বাকি হাদীসগুলোকে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন, তাহলে বুঝবেন, কোনো বিষয়ে একটা বা কতিপয় হাদীস বিশেষকে পেয়েই আমলের জন্য দৌড় দেয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সব নস তথা রেফারেন্সগুলোকে বিবেচনা করে সমন্বিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। একটা মতকে প্রাধান্য দিলেও সনাতনী ফিকাহর মতো বাকিগুলোর যে কোনোটার উপর আমলের পথ রুদ্ধ না করে একটা প্লুরালিস্টিক অবস্থানে আসতে হবে। ব্যাপার হলো, জামায়াত কোনো বিষয়েই প্লুরালিজমে বিশ্বাসী নয়। সবাইকে এক করতে চায়। অথচ সবাই শুধুমাত্র আকীদাগতভাবে এক এবং বাদবাকি ব্যবহারিক বিষয়ে যার যার মতো হওয়ার কথা ছিলো। (প্রকাশ্য) বিরোধিতা করলে খারিজ হয়ে যাবে – এ ধরনের সংবেদনশীল পরিবেশ মোটেও কাম্য নয়।

. জামায়াতের কিছু প্রতিষ্ঠান:

বিআইএ: চট্টগ্রামের লোক হিসাবে আমি দুইটা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বলবো। বিআইএ। চট্টগ্রামের জামায়াত-শিবিরের লোকজনের নিকট অতি পরিচিত একটা নাম। বাংলাদেশ ইসলামী একাডেমী নামে দুই যুগ পূর্বে চালু হওয়া এ প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে একটা চারতলা বিল্ডিং। এর নিচতলায় একটা খোলা স্পেস, গ্যারাজ, ওজুখানা ও একপাশে উত্তর ও দক্ষিণ জেলার অফিস। দোতলায় মূল মসজিদ। একপাশে কিছু গেস্ট রুম। তিন তলায় মসজিদের এক্সটেনশন। একপাশে মহানগরী জামায়াতের আমীরসহ কর্মকর্তাদের রুম। চার তলায় বায়তুলমালসহ বিভিন্ন বিভাগের অফিস। বিআইএ কার্যালয়ের প্রবেশ মুখে দুটি বইয়ের দোকানসহ কিছু দোকান রয়েছে। এই পুরো স্থাপনায় সাধারণ মানুষের বসার, কিছু পড়ার, কিছু দেখার কোনো ব্যবস্থা নাই। পুরো বিল্ডিংটি মহিলা, জুতা ও ধূমপান নিষিদ্ধ এলাকা। মাঝে মাঝে ইন্টেলিজেন্সের লোকজন ছাড়া এই মসজিদে কোনো স্থানীয় লোককে কখনো নামাজ পড়তে আসতে দেখিনি। বহু দিন-রাত সেখানে কাটিয়েছি। এখানে রিসেপশনের কোনো ব্যবস্থা নাই। এক কথায়, জামায়াতের জনবিচ্ছিন্নতার জ্বলন্ত নমুনা!

মামুন স্মৃতি পাঠাগার, চবি: ১২/১৪ বছর আগে শিবিরের ছেলেরা আমাকে ধরলো ইনডেক্সের টাকা দিয়ে তাঁরা চবিতে একটা জায়গা নিতে চায়। আমি যেন বৈঠকে সেটা পাশ করিয়ে দেই। বৈঠকে আমি ছাড়া আর কোনো জামায়াত দায়িত্বশীল এটির অনুমতি দেয়ার পক্ষে ছিল না। আমি যুক্তি দিলাম – ছাত্ররা হলের বাহিরে একটা স্থাপনা পেলে সেখানে তারা আবৃত্তি ও গান চর্চা করতে পারবে। একটা কম্পিউটার ল্যাব করতে পারবে, ক্যারিয়ার এইডের কাজ কাজ করতে পারবে ইত্যাদি। এক পর্যায়ে তাদেরকে সেটি কেনার অনুমতি দেয়া হলো। এখন সেটি ছাত্রদের একটা মেস, নাথিং এলস!

. সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে উন্নয়ন:

এটি একটা গোলক ধাঁধাঁ। যে কোনো পথের একটা শুরু ও শেষ থাকে। এরপর আবার নতুন কোনো দিগন্তে অভিযাত্রা। আর গোলক ধাঁধাঁ হলো একই বৃত্তে দিনরাত ছুটে চলা। ট্রেডমিলে দৌড়ানোর মতে। যেখান থেকে শুরু, শেষ পর্যন্তও সেখানে। ব্যায়ামের জন্য ট্রেডমিলে দৌঁড়ানো যেতে পারে। কিন্তু কোথাও পৌঁছতে হলে সত্যিকারের পথেঘাটে হাঁটতে হবে, পারলে দৌঁড়াতে হবে। ‘ওয়া সা রিয়ু ইলা মাগফিরাতিম মির রাব্বিকুম’ বলতে কোরআন শরীফে তাই বলা হয়েছে।

সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে উন্নয়নকে অধ্যাপক গোলাম আযমের পরিভাষায় ‘খেদমতে দ্বীন’ বলা হয়েছে। মুখে অহরহ ইসলামী আন্দোলন দাবি করা হলেও বাস্তবে জামায়াতে ইসলামী খেদমতে দ্বীনের একটা পারফেক্ট উদাহরণে পরিণত হয়েছে। বিপ্লবের পরিবর্তে এটি এখন বিবর্তনে বিশ্বাসী। শাহাদাতের চেয়েও টিকে থাকার নীতিতে নির্ভরশীল। মাওলানা মওদূদী কিছু বিপ্লবী চেয়েছিলেন, সমাজের লোকেরা যাদের পাগল বলবে। কোরআনের সূরা বাকারার দ্বিতীয় রুকুর শুরুতেও তা বলা হয়েছে। জামায়াতের লোকজন দুনিয়াদারীর দিক থেকে এখন ‘হুশ ঠিক মাথা খারাপ’ হিসাবে নিজেদের প্রমাণ করছেন।

ভালো ভালো দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে দুনিয়াদারী, আর্থিক আমানতের খেয়ানত ইত্যাদি কারণে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। সবকিছু ‘আমাদেরকরণ’ করতে করতে যথার্থই প্রতিক্রিয়াশীল হিসাবে এখন রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিতকতা, চাঁদাবাজি ইত্যাদি যত নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যাবলী এখন জামায়াত দায়িত্বশীলদেরও সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে!

কামারুজ্জামান ভাইয়ের সাথে জরুরি সরকারের শুরুর দিকে উনার বাসায় একবার দেখা। উনার দুটা কথা বেশ মনে আছে। তিনি বললেন, সবকিছু আমাদেরকরণ করতে করতে পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসেছে যে, কারো লাশ দাফনের জন্য কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠান হতে সাহায্য চাইলেও উনারা বলেছেন, লোকটা কি আমাদের ছিল!?

কামারুজ্জামান ভাই সাপ্তাহিক সোনার বাংলা সম্পর্কে বললেন, জামায়াত যদি সাপ্তাহিক সোনার বাংলাকে স্বাধীন নীতিতে চলার অনুমতি দেয়, এমনকি জামায়াতের কোনো সমালোচনা হলেও, তাহলে এই পত্রিকাটিকে জনপ্রিয় করে তোলা কোনো ব্যাপার নয়। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জামায়াত পরিচালিত দৈনিক কর্ণফুলীর কথা নাইবা বললাম।

. সাংগঠনিকভাবে মিথ্যা বলা:

যুদ্ধের ময়দান, নিরপরাধীর প্রাণ রক্ষা, দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা – এই তিনটা ক্ষেত্র ছাড়া কোথাও মিথ্যা বলা জায়েয নাই। রাজনীতির ময়দানে দ্ব্যর্থবোধক কথা বলার অনুমতি আছে। এছাড়া মুসলমানদের সাধারণভাবে সত্যবাদী হতে হবে। এটি ব্যক্তির জন্য যেমন প্রযোজ্য তেমনি দলের জন্যও প্রযোজ্য।

শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতিদের মধ্যে রেজাউল করিমই সর্বপ্রথম জামায়াত নেতৃত্বের সাথে একসাথে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন এবং ক্যান্টনমেন্টে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। উনাকে আমি এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। শিবির যদি জামায়াতের অঙ্গসংঠন হয়ে থাকে, সে কথা প্রাকাশ্যে বলা হয়নি কেন? শিবিরের সংবিধানের ৫২ নং ধারা কার্যকর করা হচ্ছে না কেন? জামায়াতের অঙ্গসংগঠন হিসাবে নিজেকে উপস্থাপনের মাধ্যমে শিবিরের সংবিধান কি লংঘিত হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে এম এন হাসানের লেখায় (http://sonarbangladesh.com/blog/nazmul86/99239)। যেখানে তিনি জামায়াতের উপর একটা পিএইচডি গবেষণার সূত্রে দেখিয়েছেন, জামায়াতের রিক্রুটমেন্টের মূল অংশ শিবির হতে আসে। শিবির না থাকলে জামায়াত বহু আগেই মুসলিম লীগের মতো ইতিহাস হয়ে যেত। তাই শিবিরকে আলাদা হতে দেয়া যাবে না।

তাহলে ইসলামী ছাত্রশিবির নামে একটা আলাদা সংগঠন কায়েম করা হলো কেন? কারণ, মানুষ বৈচিত্র্য খোঁজে, অকলুষতাকে পছন্দ করে। শিবির নিয়ে জামায়াতের ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো আচরণ মিথ্যা না বলার সাধারণ নৈতিকতাকে লংঘন করছে। হ্যাঁ, এর পরও তো রিক্রুটমেন্ট হচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশের সবখানেই লোক বাড়ছে। বলুন, কোথাও কি কমেছে? নিজেদের কতজন আছে, সেটি ভেবে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর না তুলে সর্বদাই তুলনামূলক পরিসংখ্যান উপস্থাপন করার উচিত।

. সাংগঠনিক অবকাঠামো ব্যক্তিউদ্যোগ:

সিঙ্গাপুরের জামায়াত দায়িত্বশীল আমার প্রাক্তন রুমমেট। প্রায়ই কথা হয়। তিনি খুবই সাধারণভাবে চলেন। দেখলে জামায়াত করেন বলে মনে হবে না। ছাত্রজীবনের সেন্টিমেন্ট এখনও ধরে রেখেছেন। তাঁর কাছ হতে শুনেছি। সেখানে এক নির্যাতিত ছাত্রনেতা গিয়ে সংগঠনের ভাইদের নিয়ে একটা দোকান দেন। শেষ পর্যন্ত সেখানকার সংগঠন ব্যবসায়িক গন্ডগোলে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। সব ধরনের সাংগঠনিক ব্যবসা বন্ধ করার ফলে এখন সংগঠন সেখানে অনেক মজবুত। বাংলাদেশে থেকে কেউ গেলে যদি উনার সাথে যোগাযোগ করে তাহলে প্রথমেই তিনি জানতে চান, এই ভাই কী নিয়তে সিঙ্গাপুরে এসেছেন। যদি জায়গা অথবা ফ্ল্যাট বেচার জন্য আসেন তাহলে তিনি তাকে কোনো প্রকার সাংগঠনিক সুবিধা দেন না। দেখাও করেন না। রথ দেখা ও কলা বেচার এই ফর্মূলা মাওলানা মওদূদীর মতো মুজতাহিদ বুঝতে পারেন নাই। জামায়াতে কার্যবিবরণীর প্রথম খণ্ডেই এই সাংগঠনিক ব্যবসার প্রস্তাবকে তিনি ফ্ল্যাডলি নাকচ করে দিয়েছিলেন।

অবকাঠামো যা হয়েছে, যেগুলোর উন্নতি হয়েছে সেগুলোতে নাসের সাহেবের, মীর কাশেম আলী সাহেবের স্বৈরাচারেরও ব্যাপক অভিযোগ আছে। কেন? একবার আমি মীর কাশেম আলী সাহেবের এক ঘনিষ্টকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এতসব অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন? তিনি বললেন, মীর কাশেম আলী সাহেবরা তো এসব গড়ে তুলেছেন, এই সত্য তো মানেন? হ্যাঁ, এটি না মেনে উপায় নাই। আসলে নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান কেউ ছাড়ে না। ছাড়তে পারে না। ড. ইউনুস বলেন, আর অমুক তমুক যা-ই বলেন না কেন, একই চিত্র। সবাই এটাকে নেতিবাচক ভাবলেও আমি একে পজিটিভ হিসাবে দেখি। আমরা এই অন্তর্নিহিত সত্যকে ভুলে যাই যে, ব্যক্তির কর্তৃত্ব, স্বাধীনতা, সোজা কথায় মালিকানা ছাড়া কোনো কিছুর প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন সম্ভবপর নয়। নিজের স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও সত্তাকে বিলিয়ে দিয়ে কোনো কিছু সফলভাবে পরিচালনা করাটা মানব চরিত্রবিরোধী ও অসম্ভব। ইসলামও তাই বলে। স্বতন্ত্র মালিকানা কিন্তু পারস্পরিক সহযোগিতা – এমনটাই হওয়া উচিত।

. শেষ কথা:

জামায়াত নিজেকে এ দেশের ইসলামের সোল এজেন্ট দাবি করে। অন্যদেরকে ফর নাথিং মনে করে। এ জন্য তাদের ফর্মূলা হচ্ছে, নো অল্টারনেটিভ থিওরি। এর মানে হচ্ছে, যেহেতু আমরা সেরা, সুতরাং আমরাই একমাত্র। ইসলামে রাজনীতি আছে এটি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তারা ইসলামকে মূলত রাজনীতিতে নামিয়ে এনেছে। এটি পলিটিক্যাল রিলিজিওনের একটা ভার্সন মাত্র।

রাজনীতিতেও যদি জামায়াত ভালো করতো বা করার কোনো পথ খোলা রাখতো, তাহলেও কথা ছিল। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দ্বি-দলীয় রাজনীতির যে পাঁকে জামায়াত নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেছে, আমার ধারণায়, জামায়াত কখনো এই গোলকধাঁধাঁ হতে বেরিয়ে আসতে পারবে না। ইসলামী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে বা প্রয়োজনে পিছনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে একটা তৃতীয় ধারা সৃষ্টি, সেটিকে বেগবান ও সফল করার জন্য যে ধরনের সাংগঠনিক নমনীয়তা (ফ্লেক্সিবিলিটি) এবং ত্যাগ ও সহনশীলতার যে মাত্রা থাকা দরকার; জামায়াতের তা আদৌ নাই, কখনো ছিলও না। এটির একমাত্র সম্ভাব্যতা ছিল জামায়াতের একমাত্র পাবলিক ফিগার, স্পোকসম্যান ও পলিটিক্যাল ফিউচার মাওলানা সাঈদী। সাঈদী ব্র্যান্ডের সম্মুখে শীর্ষ জামায়াত নেতৃত্ব নিজেদেরকে বিপন্ন ভেবেছেন। তাই তাঁকে গিলোটিন করা হয়েছে। ১৯৭৩ সাল হতে তিনি যদি রুকন হয়ে থাকেন, তাহলে এখন কেন তাঁকে জামায়াত সিল দেয়া জরুরি হলো? কারণ, তাঁকে কন্ট্রোল করা। তিনি যদি কিছু করে ফেলেন! জামায়াত যদি আওয়ামী লীগের ফাঁদে পড়ে প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম পরিবর্তনে বিএনপিকে বাধ্য না করতো, তাহলে ‘সাঈদী কার্ড’ খেলে জামায়াত বিজেপির মতো সফলতা অর্জন করতে পারতো, হয়তোবা। ইসলামী সংগঠন হিসাবে নিজেদের জয় না চেয়ে জামায়াতের চাওয়া উচিত ছিল বা চাইতে হবে ইসলামের বিজয়। জামায়াতের নাম থাকুক বা না থাকুক।

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *