ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ: একটি প্রস্তাবনার খসড়া

বাংলাদেশ নামের এ ভূখণ্ডে ইসলামের বিধানের আলোকে একটি ইনসাফপূর্ণ ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রচেষ্টা দীর্ঘ দিনের। ছোট-বড় অনেক দল ও গোষ্ঠী এ প্রচেষ্টার অংশীদার হলেও ইক্বামতে দ্বীনের এ ধারাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকাই মুখ্য হিসাবে পরিগণিত। শুধু ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাই নয়, এ অঞ্চলের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জামায়াতের ভূমিকাকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

মনে হয় বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী কাংখিত মান বজায় রেখে স্বীয় লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যলেঞ্জের সম্মুখীন। এই ‘চ্যলেঞ্জ’ যত না রাজনৈতিক ও আদর্শিক তারচেয়ে অনেক বেশি অভ্যন্তরীণ। নিতান্তই অভ্যন্তরীণ এসব সমস্যার মধ্যে সঠিক পরিকল্পনা ও গণমুখী কার্যক্রম গ্রহণ, সর্বস্তরের জনশক্তি ও সংগঠন ব্যবস্থাপনার গুণগত মান উন্নয়ন, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানমুখী নেতৃত্ব সৃষ্টি অন্যতম।

আমার মতো অনেকেই ছাত্রজীবন থেকেই এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছে ইসলামের কল্যাণমুখী, ইনসাফপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার ঈমানী দায়িত্বানুভূতি থেকে। উদ্দেশ্য হলো দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা। কোরআন, হাদীস ও সংশ্লিষ্ট বিষয় অধ্যয়ন করে আমার কাছে মনে হয়েছে – আল্লাহর হক আদায়ের পাশাপাশি মুমিন হিসাবে জীবনযাপন করা বা ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একজন বিপ্লবী হিসাবে নিজেকে পরিপূর্ণ রূপে নিয়োজিত করার অর্থ হলো মানুষ, বিশেষ করে অসহায়, বঞ্চিত, নির্যাতিত ও মজলুম নারী, শিশু ও পুরুষের উন্নয়ন ও সহায়তার জন্য কাজ করা। সাধারণ মানুষের তথা সামাজিক উন্নয়নের তাবৎ প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াই করা। মানুষের কল্যাণে কাজ হচ্ছে অথচ তাঁদের আস্থা ও ভালবাসা অর্জন করা যাচ্ছে না – এ রকম হওয়াটা অস্বাভাবিক ঘটনা। যদি তাই হচ্ছে বলে মনে করা হয়, তাহলে ইসলামকে কথা ও কাজের মাধ্যমে যথাযথভাবে উপস্থাপনার অভাব, অযোগ্যতা ও দুর্বলতা কাজ করছে – এ কথা নিশ্চিতভাবে বুঝতে হবে। উপযুক্ত কৌশল নির্ধারণে ব্যর্থতা, যথাযথ পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাবসহ আরো অনেক ধরনের কারণ এর পিছনে থাকতে পারে। সঠিক ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা ও গণমুখী, দক্ষ (জ্ঞানে ও কাজে), দায়িত্ববান, এক কথায় ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত বিপ্লবী কর্মী ও নেতৃত্ব তৈরি করতে পারলে আমি বিশ্বাস করি, এ দেশে একটি সৌহার্দ্য ও ইনসাফপূর্ণ তাকওয়াভিত্তিক সমাজ গঠন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের সুবিবেচনার জন্য কয়েকটি পরামর্শ নিম্নে উল্লেখ করা হলো। প্রতিটি পরামর্শের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে আমার সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আছে। এসব বিষয়ে ঐক্যমত হলে পরবর্তী পর্যায়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।

. উন্নয়ন বা সমাজকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছানো:

সমাজকল্যাণ বা মানুষের উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছানো হবে ইসলামের আহ্বান ও দাওয়াতের পদ্ধতি ও কৌশল। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, এমনকি রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে হবে। তবে সমাজের বঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষের উন্নয়নের বিষয়টিকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিতে হবে। যতটা সম্ভব তাদের কাছে যেতে হবে। গণমানুষের সমস্যাগুলো অনুধাবন করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একজন বিপ্লবী বা সমাজকর্মীর প্রতিদিনের কার্যতালিকায় দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের উন্নয়নে কাজ থাকতে হবে। তাদের সমস্যা নিরসনে শুধু কথা নয়, সামর্থ্যনুসারে সরাসরি কাজ করতে হবে। তাই ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অর্থাৎ কখন কী কাজ করণীয়, পদ্ধতি কী হবে, প্রয়োজনীয় যোগান কীভাবে নিশ্চিত হবে – ইত্যকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। আল্লাহর নির্দেশের কারণেই মানুষের সাহায্য ও সহযোগিতার কাজগুলো করে যেতে হবে। শুধুমাত্র নির্বাচনকেন্দ্রিক তৎপরতা হলে হবে না। সংগঠনের সম্প্রসারণ ও মানুষের আস্থা অর্জনে এটি বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। এ কাজের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ এবং প্রকৃত অর্থেই উন্নত ও বৈষম্যহীন ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের বিধানের অপরিহার্যতা সমাজে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের সমাজে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। এ সম্পদের সুসমন্বয় সাধনের মাধ্যমে সেসবকে কাজে লাগানোর কৌশল জানা থাকতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত, নীতিমালা, কৌশল, ইচ্ছাশক্তি ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ। সমাজ উন্নয়নমূলক বিষয়গুলির উদাহরণ হিসাবে দরিদ্র মানুষের জীবন ও জীবীকার উন্নয়ন, সাধারণ শিক্ষা ও ইসলামী বিষয়ের প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষা, অ-ইসলামী জনগোষ্ঠীর জন্য যার যার ধর্মানুযায়ী শিক্ষার ব্যবস্থা, স্বাস্হ্য, পুষ্টি, কৃষি, সেনিটেশন, নিরাপদ পানি, আবাসন ব্যবস্থা, দুর্যোগ মোকাবেলা, আইনী সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা, নারীর মর্যাদা, শিশুর বিকাশ, বঞ্চিতদের জন্য সরকারী সেবার সহজ প্রাপ্যতা, সেবাদানকারী সংস্থাসমূহের সদস্যদের মধ্যে দায়িত্বানুভূতি বৃদ্ধিকরণ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

. জামায়াতে ইসলামী নয়, ভিন্ন নামে দেশে ইসলামী আন্দোলনের কাজ করতে হবে:

‘জামায়াতে ইসলামী’ নামে বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের কাজ শুরু করা ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যতে ‘জামায়াতে ইসলামী’ নামে ইসলামী আন্দোলন করে কাঙ্খিত অগ্রগতি অর্জন কঠিন হবে। অতএব ভিন্ন কোনো নামে আন্দোলনের জন্য এখনই কাজ শুরু করা প্রয়োজন। তবে এই পরিবর্তনের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে। হঠাৎ করে কাজটি করা যাবে না। কেন ‘জামায়াত’ নামের পরিবর্তন প্রয়োজন – তার অনেক কারণ বলা যাবে। তবে সংক্ষেপে যা বলা যায় তা হলো – জামায়াতসহ সর্বমহল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হোক তা চায়নি। এই না চাওয়ার অনেক কারণ আছে। জামায়াত নেতৃত্ব হয়তো কোনো অন্যায় করেননি। কিন্তু তাদের কার্যক্রম এ দেশের মানুষকে নির্যাতন ও হত্যাকারী পাকিস্তানী আর্মিকে শক্তিশালী করেছে। অতএব, এর দায় জামায়াত এড়াতে পারে না। সর্বোপরি জামায়াত নেতাদের লেখা বই ও বক্তব্যে এটি প্রকাশিত হয়েছে, জামায়াত তখনকার (১৯৭১ সালে) বাস্তবতার আলোকে তথা জনমতের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিরোধী পক্ষ বর্তমানে নানা ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে বা হচ্ছে যে, জামায়াত স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। শুধু তাই নয়, তারা নানা অপকর্মের হোতা। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, গান, কবিতা, নাটক, সিনেমা ইত্যাদিতে জামায়াত সম্পর্কে নানা ধরনের নেতিবাতচক ও জঘন্য কল্পকাহিনী প্রচার করা হচ্ছে। অথচ, এগুলোর বিপক্ষে জামায়াতের নিজের বা তাদের পক্ষে বলার সুযোগ খুবই সীমিত। এটি একটি বড় প্রশ্ন যে, বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে বিতর্কিত হয়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করা কতটুকু সম্ভব? তাছাড়া মানুষ ১৯৭১-এর কথা ভুলে যাবে – এই তত্ত্ব সঠিক প্রমাণিত হয়নি। বরং উল্টো হয়েছে। নাম ও সংগঠন পরিচালনা-পদ্ধতি পরিবর্তনের কাজটি অনেক আগেই করা উচিত ছিল। এখন এটি করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব কিছু নয়। তবে নাম পরিববর্তনের বিষয়টি সাম্প্রতিক জঙ্গী ইস্যুকে বিবেচনায় রেখে করতে হবে। পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন মহলের মতামতের ভিত্তিতে একটি কৌশলপত্র তৈরি করতে হবে।

. আন্দোলনের কর্মীদের জ্ঞান অর্জনের বিষয়, পাঠ্যসূচি প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন:

ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কর্মীদের জ্ঞান অর্জনের বিষয় ও পদ্ধতির ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন। ইসলামের মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি জ্ঞান অর্জনের জন্য সমাজ উন্নয়ন ও গঠন, দারিদ্র বিমোচন ও দারিদ্রের কারণ, জাকাত ও জাকাতভিত্তিক উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, সমাজের বিবর্তন, মানবাধিকার, সুশাসন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ইস্যু যেমন বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব বানিজ্য সংস্থা, জঙ্গীবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্লোবালাইজেশান, এমডিজি, নারী ও শিশু অধিকার, অভিবাসন ইত্যাদি বিষয় সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তথ্যবহুল ও মানসম্মত বই লিখা, সংগ্রহ, অনুবাদ ও গবেষণার জন্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রয়োজন হবে। তাছাড়া ইসলামের মৌলিক বিষয় ও নির্দেশনাগুলোকে মানুষের জীবনের চলমান সমস্যার সাথে সম্পৃক্ত করে বাস্তবতার আলোকে পুস্তক রচনা করতে হবে। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে আরো বেশি তথ্যসমৃদ্ধ ও সুলিখিত বইসহ নতুন করে বাংলায় কোরআনের তাফসীর লেখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে সম্প্রতি প্রকাশিত ইংরেজী, আরবী ও অন্যান্য ভাষায় লিখিত বইয়ের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। সিলেবাসভুক্ত বইসমূহের মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সাংগঠনিক মান বড় হলেই তিনি বই লিখতে পারবেন – এই ধারণা ঠিক নয়। বরং বিশেষজ্ঞ কমিটির অনুমোদনের পরই বই সিলেবাসভুক্ত করতে হবে। বিশেষজ্ঞ কমিটিতে সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকলেও তাঁকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একাডেমিক বিশেষজ্ঞ হতে হবে। একমুখী প্রশিক্ষণ পদ্ধতির পরিবর্তন হতে হবে। প্রশিক্ষণ হবে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে। প্রশিক্ষণে আধুনিক উপায় ও উপাদান ব্যবহার করতে হবে। প্রত্যেকটি বিষয়ে প্রশিক্ষণের মডিউল থাকতে হবে। যারা প্রশিক্ষণ দিবেন প্রশিক্ষক হিসেবে তাঁদের প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা বাস্তব জীবনে কর্মীরা কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। মূল্যায়নের আলোকে প্রশিক্ষণের মডিউল ও পদ্ধতি প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে হবে। প্রশিক্ষণের সার্বিক কাজটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিউট ও তার শাখা প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

. আন্দোলন সংগঠনের মধ্যে ইসলামের সুমহান ইনসাফপূর্ণ প্রশাসন পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার মডেল প্রতিষ্ঠা করা:

সংগঠনে ও সংগঠনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় গড়ে উঠা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের বিধান পরিপূর্ণভাবে থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে আত্মীয়করণ, আঞ্চলিকতা, অস্বচ্ছতা, অযোগ্যতা ইত্যাদি অতি অবশ্যই ও কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে। মোটকথা, সংগঠন বা সংগঠনের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহকে হতে হবে ইসলামী রাষ্ট্রের আদর্শ মডেল। প্রতিষ্ঠানভুক্ত সকল স্টাফের সমনৈতিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। একই প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে কেউ লক্ষাধিক টাকা বেতন পাবে আবার কেউ পাঁচ হাজার টাকা বেতন তুলবে – এ ধরনের জুলুম চলতে পারে না। মানুষের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কারণে বেতনের পার্থক্য হতেই পারে। কিন্তু তার একটি সীমা থাকা উচিত। নেতৃত্ব তৈরির জন্য ‘এক ব্যক্তির একাধিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী দায়িত্ব পালনের’ সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

প্রতিষ্ঠানসমূহের কাজের বাস্তবভিত্তিক সুস্পষ্ট পরিকল্পনা (SMART-Specific, Measurable, Attainable, Realistic, Time bound)  ও মনিটরিং পদ্ধতি থাকতে হবে। প্রতি বছরই কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। পরিকল্পনা অনুসারে ফলাফল কী হলো তা যাচাই করে দেখতে হবে। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ববানদের বছর শেষে কাজের অর্জন ও অগ্রগতি সম্পর্কে জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সংগঠন সমর্থিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান হতে হবে সমাজের অন্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় লক্ষ্যণীয় পরিমাণে উন্নত। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) মান এমন পর্যায়ের হতে হবে যে মানুষ সমাজে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সেবার ব্যাপ্তি ও গুণগতমান বিবেচনায় সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পায়।

. ক্যাডার পদ্ধতির নমনীয়তাসহ মেধাবী, সৃজনশীল দক্ষ দায়িত্বশীল নির্বাচনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন:

বিদ্যমান ক্যাডার পদ্ধতির নমনীয়তা প্রয়োজন। সমাজের অভিজ্ঞ, বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, মেধাবী, সৃজনশীল ও যোগ্যদেরকে নেতৃত্ব পর্যায়ে আনতে হবে। বর্তমান ক্যাডার পদ্ধতি এক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে বলে প্রতীয়মান হয়। মেধা ও নেতৃত্ব বিকাশের জন্য নেতৃত্বের গঠনমূলক সমালোচনা করার সুযোগ থাকতে হবে। মূল সংগঠন এবং সংগঠনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত সংস্থাসমূহে দায়িত্বশীল নির্বাচনে ‘কৃত্রিম শুরায়ী পদ্ধতি’ পরিহার করতে হবে। নির্বাচনে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। নেতৃত্বকে হতে হবে উদার মানসিকতার। তাঁদেরকে সংগঠন ও জনশক্তি ব্যবস্থাপনায় হতে হবে দক্ষ। বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কে দায়িত্বশীল বা কে দায়িত্বশীল নয় – তা দেখার সুযোগ থাকতে পারেনা। সংশ্লিষ্টদের বিশেষজ্ঞসুলভ জ্ঞান ও আন্দোলনের প্রতি ভালবাসা বা ন্যূনতম কমিটমেন্টই হবে মূল বিষয়।

. দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন পেশায় যোগ্য দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অবদান রাখতে হবে:

সম্ভবত বর্তমানে দেশের সকল সরকারী ও বেসরকারী পেশাজীবীদের মধ্যেই ইসলামী আন্দোলন সমর্থক পেশাজীবী সংগঠন রয়েছে। সহযোগী পেশাজীবী সংগঠনের প্রধান কাজ হবে দেশ পরিচালনার সাথে জড়িত পেশাসমূহের মধ্যে যোগ্য ও দক্ষ লোক তৈরিতে অবদান রাখা এবং দায়িত্বশীলতার সাথে পেশাজীবীসুলভ ভূমিকা পালন করা, যাতে জনগণ সহজেই মানসম্মত সেবা পেতে পারে। রাজনীতি করা তাদের কাজ নয়। তাদেরকে রাজনীতির কাজে ব্যবহার করা যাবে না। যিনি যে পেশায় থাকবেন তাকে সেই পেশায় সবচেয়ে দক্ষ ও সৃজনশীল হতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে লোক নিয়োগে মেধাকে গুরুত্ব দিতে হবে। দলীয় পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারী ক্যাডার সার্ভিসসহ সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে নিয়োগে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করা যাবে না। মেধা, ইসলামী জীবনাদর্শ ও দেশের প্রতি কমিটমেন্টই হতে হবে নিয়োগের মাপকাঠি। সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পেশার লোকদের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ নিতে হবে। যোগ্যতা ও দক্ষতা না বাড়িয়ে শুধুমাত্র ‘সাংগঠনিক মানের’ কারণে কোনো সংক্ষিপ্ত পথে কাউকে পদায়ন করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ইসলামী সংগঠনের অনুসারীরা হবে ঐ পেশায় সবচেয়ে দক্ষ ও যোগ্য। যাতে অন্যরা দক্ষতা ও যোগ্যতার কারণে তাকে মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়। এর জন্য কর্মসূচি থাকতে হবে। ইসলাম অনুসারী ব্যক্তিদের কার্যক্রম ন্যায়ের উপর থেকে সবসময় গরীব ও বঞ্চিতদের পক্ষে হতে হবে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাদের সেবা ও অর্থের একটা অংশ সর্বদাই দরিদ্র ও বঞ্চিতদের জন্য ব্যয় করার মনমানসিকতা পোষণ করতে হবে।

. ছাত্র সংগঠন বিষয়ে বিশেষ পরামর্শ:

ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব ও কর্মীদের প্রধান দায়িত্ব হলো পাঠ্যপুস্তক গভীরভাবে অধ্যয়ন করা ও ভালো ফলাফল অর্জনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। পাঠ্যসূচির পাশাপাশি দেশ পরিচালনা, আর্থসামাজিক ও আদর্শিক বিষয়ে তাদেরকে জ্ঞানচর্চা করতে হবে। নেতৃত্বের জন্য ইয়ার ড্রপ দেওয়া বা পরীক্ষা না দেয়ার সংস্কৃতি অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে। এক বা দুই বারের বেশি বড় কোনো শাখা বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকা যাবে না। ছাত্র সংগঠনকে জাতীয় রাজনীতিতে ব্যবহার করা যাবে না। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও গবেষণার অনুকূল পরিবেশ তৈরি ও সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছাত্রদের সমস্যা সমাধানে তারা আন্দোলন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে আলোচনা, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদি শিক্ষামূলক কর্মসূচিকে প্রাধান্য দিবে। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত হওয়া যাবে না। তাদের কর্মসূচিতে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ বা পরিচিত নেতাদের অতিথি হিসাবে রাখা যাবে না। শিক্ষাবিদ, গবেষক ও দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা হবেন ছাত্রদের নানা কর্মসূচির আমন্ত্রিত অতিথি। জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্যে তাদের রাজপথে ভূমিকা রাখার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সে ধরনের প্রয়োজন স্বভাবতই হবে খুবই কদাচিৎ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনে ভূমিকা রাখার জন্য শিক্ষক রাজনীতির সকল প্রভাব হতে তাদের সচেতনভাবে দূরে থাকতে হবে।

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রায় দু’বছর আগে একজন প্রিয় দায়িত্বশীল হঠাৎ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে এসে আমরা ক’জন পুরনো ভাইদের ডেকে এসব পয়েন্টে কথা বললেন। আমি উনাকে পয়েন্টগুলো আমার ডায়েরিতে লিখে দেয়ার অনুরোধ করায় তিনি তা লিখে দেন। পরবর্তীতে উনাকে আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে এসব পয়েন্টকে আরো বিস্তারিতভাবে লেখার জন্য অনুরোধ করতে থাকি। এক পর্যায়ে তিনি সেটি লিখিত আকারে আমার কাছে পাঠিয়ে অনুরোধ করেন, আমি যেন ইচ্ছামতো সংশোধন করে উনার কাছে পাঠাই। আমি বিজয় ইউনিকোডে কিছুটা সংশোধন করে তা পুনঃটাইপ করে উনাকে পাঠাই। লেখাটি ব্লগে দেয়ার জন্য উনার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে জানান, তিনি জামায়াতের একজন শীর্ষতম দায়িত্বশীলসহ বেশ ক’জন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের কাছে এটি হাতে হাতে দিয়েছেন এবং আলোচনা করেছেন। তিনি আশা করেছিলেন, কাজ হবে। অন্তত কিছু না কিছু কাজ হবে! তাছাড়া কোনো গণমাধ্যমে এসব ‘সাংগঠনিক বিষয়াদি’ আলোচনা করার ব্যাপারে উনার প্রচণ্ড অনীহা ও আপত্তি ছিল। আমি জানতাম (?), জামায়াত উনার মতো প্রাক্তন ছাত্র দায়িত্বশীলদের এসব ‘বুদ্ধিজীবীসুলভ পরামর্শের’ কোনো তোয়াক্কা করে না। শোনাটাই সার! বক্তা যেন হয়রান, বিরক্ত ও (এতায়াত ও আখিরাত নষ্ট হওয়ার ভয়ে) সন্ত্রস্ত হয়ে ওসব নিয়ে আর না বলেন! কিছুদিন আগে উনার সাথে আবার দেখা। কথা হলো অনেক। বললাম, ব্লগে এখন তো অনেক লেখা। আমিও লিখেছি। আপনার লেখাটা কি ব্লগে দিবেন? উনি বললেন, চাইলে আপনি দিতে পারেন। এক ধরনের সংকোচের কারণে উনার নাম-পরিচয় উহ্য রাখা হলো। তিনি ঢাকায় থাকেন এবং ব্যাপক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।]

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *