ইসলামী আন্দোলন, জন-জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার

ভার্চুয়াল টাইম:

প্রযুক্তি ব্যবহার করে দৈনিক তিরিশ ঘণ্টা কাজ করা যায়। ভার্চুয়াল টাইম ব্যবহার করে এটি করা সম্ভব। আজকের করণীয় বিষয়গুলো এবং সেসবের জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ সময়ের হিসাব করলে যদি আপনার কর্মঘণ্টা চব্বিশের ঘর পেরিয়ে যায় তখন কাজগুলোকে এভাবে গুছিয়ে নিন যাতে কোনো কোনো কাজকে অপর কোনো কোনো কাজের ফাঁকে ফাঁকে করে নেয়া যায়। তখন দেখবেন, এক কর্মদিবসে আপনি যেসব কাজ করেছেন তা আলাদা আলাদা করে সম্পন্ন করলে চব্বিশ ঘণ্টার বেশি লাগতো। টাইম ম্যানেজমেন্টের অন্যতম সাধারণ ও অতি কার্য্কর টিপস হচ্ছে ‘পুটিং দ্য বিগ রকস ফার্স্ট’।

পুটিং দ্য বিগ রকস ফার্স্ট:

মনে করুন, একটি ছোট পাত্রে আপনাকে ছোট-বড় অনেকগুলো পাথর একসাথে রেখে এর মুখ বন্ধ করতে হবে। যদি আপনি বড় পাথরগুলোকে পাত্রের মধ্যে আগে রাখেন তাহলেই কেবল সব ছোট পাথরকেও এই ক্ষুদ্র পাত্রের মধ্যে রাখতে পারবেন। তা না করে প্রথমে ছোট পাথরগুলোকে পাত্রের তলায় একসাথে জমিয়ে রাখলে কোনো একটা বড় পাথর রাখার মতো পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা আপনার পাত্রে নাও থাকতে পারে। প্রাচীনকাল হতে অবসর সময়কে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়। এই লেখার প্রতিপাদ্য হচ্ছে, কাজের সময়কে কর্মরত অবস্থাতেই ‘অবসরে’ পরিণত করে বা অবসর হিসাবে গণ্য করে চলমান কর্মকে ব্যাহত না করেই (অন্য)কাজে লাগানো।

একটা যুৎসই স্মার্টফোন:

এ কাজে প্রযুক্তিই হচ্ছে সমাধান। আপনার হাতে যদি একটা যুৎসই স্মার্টফোন থাকে তাহলে দেখবেন, কেল্লা ফতে! প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রথম দফায় হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হবার সময় ব্লাকবেরি ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনটি সাথে নিতে না পারার জন্য আফসোস করেছিলেন! এই ফোনটির মাধ্যমেই তিনি অবিশ্বাস্য সংখ্যায় সাধারণ মানুষের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতেন। এর মাধ্যমেই তিনি অজস্র মেইল পড়তেন এবং যথাসম্ভব ব্যক্তিগতভাবে জবাব দিতেন। যতজনের সাথে আপনি ফোনে কথা বলেন, ততজনকে যদি উপযুক্ত পোশাক পরে, উপযুক্ত পরিবেশে সাক্ষাৎ দিতেন, তাহলে ভাবুন তো আপনার কত সময়ের প্রয়োজন হতো! যোগাযোগের জন্য মৌখিক কথা একটি মাত্র মাধ্যম, যার আছে অনেক সীমাবদ্ধতা। ইমেইল, চ্যাটিং, স্ট্যটাস/নোট ইত্যাদি অত্যাধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফোনালাপের সীমাবদ্ধতাকে কাটানোর রয়েছে চমৎকার সুবিধা, যা তরুণ প্রজন্ম ইতোমধ্যেই পূর্ণমাত্রায় ‘আমল’ করছে।

ঊর্ধ্বতনদের প্রযুক্তিবিমুখতা:

এই লেখায় আমি একটি কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই। যারা ইসলামের কথা বলে, ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীল হিসাবে প্রোগ্রামাদিতে হেদায়েতী বক্তব্য দেন, ব্যতিক্রম বাদে, তাঁদেরকে দেখেছি প্রযুক্তিবিমুখ হতে। আমার মতো মধ্যবয়সীদের প্রযুক্তিপ্রবণতাকে তাঁরা নিছক ফান ও টেকনোম্যানিয়া হিসাবে দেখে। ভাবখানা এমন, যেন ওসব তো পোলাপানদের কাজ! অথচ, ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীল তো বটেই, প্রতিটি কর্মীই হচ্ছেন একেকজন আপাদমস্তক ও পূর্ণকালীন সমাজকর্মী। সামাজিক গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ ব্যবহার তাদেরই সবচেয়ে বেশি করার কথা!

সালামের উত্তর দিলেও ইমেইলের জবাবদানে অভ্যস্ত নন:

সমাজের হতদরিদ্র ও সুবিধা বঞ্চিতদের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধার সদ্ব্যবহার সম্ভব নয় বিধায় তাদের কথা বাদ দিয়ে আমি অপরাপর মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর দায়িত্বশীলদের কথা বলবো, যাদের বৃহত্তর অংশের হয়তো কোনো ইমেইল আইডি নাই অথবা নিয়মিত চেক করেন না। যাদের ইমেইল একাউন্ট আছে, নিয়মিত/অনিয়মিত মেইল চেক করেন, তাঁদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ প্রায়শ মেইলের উত্তর দেন না। দেখা হওয়ার পরে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, আপনার মেইল পেয়েছি। এ ধরনের ক্ষেত্রে আমি পাল্টা প্রশ্ন করতে ভুলি না– ‘ওকে’ লিখে সেন্ড বাটনে টিপলেই তো পারতেন, উত্তর দেননি কেন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতে যা বুঝায় সেসবের মধ্যে আমি গত কয়েক বছরে কোনো ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলকে পাইনি।

ইসলামী আন্দোলনের ন্যূনতম মানের ভালো দায়িত্বশীল হওয়ার পূর্বশর্ত:

যারা ব্লগ পড়েন, লিখেন, যারা ফেসবুক একাউন্ট নিয়মিত খুলেন, আইছি, গেছি, ওমা, কী জানি, মন খারাপ, মাথা ব্যাথা ইত্যকার ধরনের লঘু মানসিকতার স্ট্যটাস না দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্ট্যাটাস দেন বা নোট লিখেন, তাঁদের প্রায় সবাই হচ্ছেন প্রাক্তন কিম্বা অবসরপ্রাপ্ত কিম্বা ছাত্র দায়িত্বশীল। ইসলামী আন্দোলনের ন্যূনতম মানের ভালো দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য যেসব পূর্বশর্ত রয়েছে তারমধ্যে রয়েছে – (১) গণ যোগাযোগ ও এর মাধ্যমে দাওয়াহ ও ইহতিসাবের দায়িত্ব পালন। (২) জনশক্তির মান ও বণ্টিত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তদারকি। (৩) পাঠাভ্যাস, যার মধ্যে রয়েছে পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে কোরআন-হাদীস-ইসলামী সাহিত্যসহ বিরোধীদের লেখা ও সমালোচনা (৪) যথাসময়ে যথা কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলা, এক কথায়, নিয়মানুবর্তিতা।

টেকনোফোবিয়া নাকি ফাঁকিবাজি?

যারা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, আইফোন বা কোনো ভালো স্মার্টফোন কিম্বা আইপ্যাড ব্যবহার করেন, তারা জানেন, কত সহজ ও সুচারুভাবে একটা ছোট্ট হ্যান্ডসেট উপরোক্ত বিষয়সমূহের জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস দিতে সক্ষম। তাই ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের দৃশ্যমান টেকনোফোবিয়াকে আমি নিছক ফাঁকিবাজি হিসাবেই দেখি। এ ধরনের শব্দ ব্যবহারের জন্য দুঃখিত। কাজ না করার জন্য, ‘আমি পারি না’র চেয়ে উত্তম(?) কোনো অজুহাত হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্পৃক্ততার সাথে জন বা গণজবাদিহিতার সম্পর্ক আবশ্যিক। সম্ভবত উনারা জন-জবাবদিহিতাকে ভীষণ অপছন্দ করেন।

শাহ আবদুল হান্নানের আইকন অফ ইসলামিক পারসোনালিটি:

এ বিষয়ে শ্রদ্ধেয় শাহ আবদুল হান্নান স্যারকে অধিকতর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। তিনি মাস কয়েক পূর্বে এক অনুষ্ঠানের আগে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় যা বলেছেন তা উনার সম্পর্কে যারা জানেন তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। যারা জানেন না, তারা শুনে অবাক হবেন যে, প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়সী জনাব শাহ আবদুল হান্নান প্রতিদিন কয়েক শত ইমেইল পান, যেগুলোর মধ্য হতে প্রায় পঞ্চাশটির মতো মেইলের তিনি জবাব দেন। কবে নাগাদ বা কিভাবে বাংলাদেশে ইসলামের মতো যুগের অগ্রগামী মতাদর্শের পতাকাবাহী নেতৃবৃন্দ (এ ধরনের) গণমুখী হবেন এই প্রশ্নের আদৌ কোনো প্রাসঙ্গিক বা কোনো জবাব কারো কাছে কি আছে?

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *