বেগম রোকেয়াকে কেন মহিয়সী মনে করা হবে? আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করার দরকার কী? – একজন ইসলামপন্থী হিসাবে প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর

মুসলিম নারীদের নিয়ে বেগম রোকেয়ার জীবনপণ নারী শিক্ষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল হচ্ছে বর্তমানের বিশাল ‘শিক্ষিত’ নারী সমাজ, যাদের মধ্যকার ইসলামী আন্দোলনের কাজ নিয়ে আমরা কথা বলছি। বেগম রোকেয়া এ জন্যই মহিয়সী যে, তিনি নারী জাগরণের সূচনা-নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে কী বলেছেন তা আমি জানি না। যদিও তিনি নিতান্তই প্রাসঙ্গিক কারণে লোক-ইসলামের অনেক কিছুরই বিরোধিতা করেছেন। লোক-ইসলাম তথা ‘ইসলাম ধর্মকে’ ডিফেন্ড করতে আমি আগ্রহী নই।

আমি সমঝদার একজনের সাথে বসে সুফিয়া কামালের একটা দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ভালো করে শুনেছিলাম ইটিভিতে। তখন ইটিভির টেরিস্ট্রিয়াল সুবিধা ছিল। পরদিন বিকেলে আবার যখন প্রোগ্রামটা পুনঃপ্রচার করা হয় তখনও উক্ত বিদগ্ধজনকে সাথে নিয়ে পুরো সাক্ষাৎকারটা শুনেছি। সেখানে আমরা ইসলামের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য পাই নাই।

যারা আমাদের কথায় তালি বাজায় না তাঁদেরকে খরচের খাতায় ফেলে দেয়াটাকে আমি সমর্থন করি না। কোনো জনপদে কাজ করতে হলে সেখানকার সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা ও জননেতৃত্বকে যথাসম্ভব আপন ভাবতে হবে। ইংরেজিতে যাকে own করা বলে। আমার যে টার্গেট পিপল, তাঁদের নেতৃত্বকে ইসলাম সম্পর্কে বুঝাতে না পারলে তাঁদেরকে (গণ্যমান্য বা নেতৃস্থানীয়দেরকে) যথাসম্ভব না ঘাটিয়ে চলাই দাওয়াতী কাজের সুন্নাহভিত্তিক তরিকা। যেমন, রাসূল (সা) মুনাফিক সর্দারকে চেনা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন নাই। বরং সম্মান দেখিয়েছেন।

বেগম রোকেয়া বা সুফিয়া কামালরা এমন কোনো ইসলামবিরোধী কাজ করেন নাই যে, তাঁদেরকে খারিজ করে দেয়া বা ধরে নেয়াটা ইসলাম রক্ষার জন্য জরুরি। সুফিয়া কামাল হিন্দুর কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন – এই অভিযোগকে আমলে নিলে কাজী নজরুল ইসলামকেও খরচের খাতায় ফেলতে হবে। এই ধারায় যাচাইবাছাই শুরু করলে ফররুখ আর মল্লিক ছাড়া কাউকে পাবেন না। বাদ দেয়াটা ইসলামের নিয়ম নয়। গ্রহণ করার মানসিকতাই সুন্নাহর দাবি।

সাহিত্যকে সাহিত্য হিসাবেই দেখতে হবে। কাব্য-উপন্যাসের পাতায় পাতায় শিরক-বেদআত খোঁজাটা এক ধরনের বাতিক। কোনো সাহিত্যিক যদি সাহিত্য দিয়ে বাতিল-দ্বীনের প্রচার করে সেটি ভিন্ন কথা। যারা লেখেন তাঁরা জানেন, লেখাটা একটা অন্তর্গত প্রেরণার ব্যাপার। সত্যিকারের সাহিত্য আর লিফলেট ভিন্ন জিনিষ। সাহিত্যিক উপমা, উৎপ্রেক্ষা বা রূপকল্পকে আক্ষরিক অর্থে বিবেচনা করা সাহিত্য ও সাহিত্যিকের প্রতি জুলুমমাত্র। আকীদাগত বিষয়ে সিরিয়াস থাকারও একটা সীমা বা প্রেক্ষাপট থাকা জরুরি। মনে রাখতে হবে, আকীদাগত অতি সতর্কতাই খারেজীদেরকে ‘খারেজী’ বানিয়েছিল!

আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেন ইসলামপন্থী নারীরা পালন করবে? রাসূলের (সা) যুগে জাতিসংঘ ছিল না, কোনো নারী দিবস ছিল না। তাই বলে তা ইসলামবিরোধী হলো কী করে? দুনিয়াতে এমন কোন্ আদর্শ বা তত্ত্ব আছে যার সব ভালো? হ্যাঁ, একটা আছে। তা হলো – ইসলাম। দুনিয়াতে এমন কোন্ আদর্শ ও মতবাদ আছে, যার সব খারাপ? না, সর্ব খারাপ হিসাবে কোনো কিছু নাই। অতএব, যে খারাপ নিয়ে আপনি আমি কাজ করছি বা করবো তারও কিছু না কিছু ভালো দিক আছে বা থেকে থাকবে। তাই না? যতটুকু ভালো আছে তার আন্তরিক স্বীকৃতি দিতে আমাদের কার্পন্য কেন? গ্লাসের অর্ধেক পানি থাকলে অর্ধেক খালি বলবো, না অর্ধেক ভর্তি বলবো – এটি নির্ভর করছে আমরা প্রো-অ্যাক্টিভ হবো, না রি-অ্যাক্টিভ হবো তার উপর।

আমি নিজেকে ইতিবাচক অবস্থানে দেখতে চাই। নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে সমাজকর্মী হওয়া যায় না।

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *