ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন হিসাবে জামায়াত: কতিপয় পর্যবেক্ষণ

. কোনো এস্টাবলিশমেন্ট নিজেকে এতোটা পরিবর্তন করতে চায় না যেটি ব্যাপকতার দিক থেকে অত্যন্ত গভীর। যেটিকে আমরা বিপ্লব বলে থাকি।

. ইসলামী আন্দোলন হিসাবে জামায়াতে ইসলামীতে ব্যাপক সংস্কার দরকার। এ সংস্কারগুলো জামায়াতের কর্মসূচি ও ধারার মধ্যে নাই – এমন নয়। জামায়াতকে জামায়াতের লালিত ও প্রচারিত ইসলামী আন্দোলনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যে পুনর্প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

. অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে আদর্শ প্রতিষ্ঠার স্ববিরোধী নীতি, বৃহত্তর জোট গঠনের জন্য ইসলামী আদর্শপন্থীদের চেয়েও শক্তিমান সেক্যুলার শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সেটির রাজনৈতিক ছাতার নিচে নিজেকে অস্তিত্বহীন করার প্রক্রিয়ায় ফেলে অন্ধ পথ চলা, আন্তর্জাতিক নীতিতে ঘৃণিত মার্কিনপন্থায় সমর্পিত হয়ে থাকা, পপুলার ইসলামের বিপজ্জনক তাবলীগীয় পন্থাকে অঘোষিত নীতি হিসাবে মেনে চলা, প্রচলিত ইসলামপন্থীদের নারীবিরোধী কার্যক্রমকে সাংগঠনিক নীতি হিসাবে গ্রহণ করা, সমাজ সংস্কারমূলক ও হতদরিদ্রদের জন্য উল্লেখ করার মতো কার্যক্রম দৃশ্যমান না থাকা – এসব কারণে এই সংগঠন এখন আর সমাজ বিপ্লবের আন্দোলন নয়; একটা গণতান্ত্রিক ইসলামপন্থী সংগঠন মাত্র।

. বিরাটত্বের অহংকার, জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীলেরা যা সবসময় করে থাকেন, শুধুমাত্র সাইনবোর্ডধারী বোকাদেরই শোভা পায়। একজন ব্যক্তি-মুমিনের বৈশিষ্ট্য ইসলামী সমাজ বিপ্লবে অঙ্গীকারাবদ্ধ একটা সংগঠনে থাকতে হবে। স্পষ্ট দৃশ্যমানভাবে থাকতে হবে। বাজারে প্রাপ্ত ছাগলের মালিকের সন্ধানে দেয়া এলানের মতো উঁচু-নিচু স্বরে বলার মতো হলে হবে না!

. আমার ধারণায় এবং অভিজ্ঞতায় জামায়াত টিকে থাকবে। ভালোভাবে টিকে থাকবে। একটা সহযোগী ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে; যেমন টিকে থাকবে ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি লাভ করবে তাবলীগ জামায়াত, মাদ্রাসাসহ অপরাপর ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহ। পীরবাদীদের মুরিদের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো জামায়াতের রিক্রুটও বাড়বে। পুকুরে মাছ এতো বেশি যে ফাটা জাল ফেললেও অনেক মাছ উঠে! অর্থাৎ বাংলাদেশে মানুষ এতো বেশি ও বিভ্রান্ত যে, সব ছাতার নিচেই বিগ শটরা আছেন, থাকেন।

. আমার ধারণায় জামায়াত সমাজের মেইনস্ট্রীম হতে অলরেডি পিছিয়ে এসেছে। ভিক্ষা করার কাজে খাটানোর জন্য কারা যেন সুস্থ বাচ্চাদের পঙ্গু করে দেয়! তেমনি জামায়াতে ইসলামী এ দেশে বিপ্লবের সম্ভাবনার যে বীজ, ইসলামী ছাত্রশিবির, তার পিঠে জামায়াতের সিল লাগিয়ে স্বীয় কায়েমী স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছে। কথাটা কঠোর কিন্তু সত্যি। সত্য কথা বিপরীত স্রোতে বলার লোক হিসাবে আমার জন্ম। যারা চিনেন, তারা জানেন। সত্যকে পাবার জন্যই এ আন্দোলনে এসেছি। ছাত্র ছিলাম বলে জামায়াতে সরাসরি যোগ দিতে পারি নাই।

. ছাত্রশিবিরের সাথে জামায়াতের কনফ্লিক্ট পর্যালোচনা করলেই জামায়াতকে বোঝা সম্ভব। ছাত্রশিবিরের সাথে জামায়াতের বার বার যেসব মতবিরোধ হয়েছে তার কোনোটাই ছাত্রশিবিরের আদর্শগত ত্রুটির কারণে ছিল না। সহযোগী সংগঠন সংক্রান্ত জামায়াতের থিসিসটাই ভুল। বড় গাছের নিচে ঝোপ-জঙ্গল পর্যন্ত হয় না। আমার ধারণায় ইসলামী সংগঠনের কলামগুলো থাকবে সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা। আন্ডারগ্রাউন্ড কলামে সেগুলো পরস্পর যুক্ত থাকবে। এ বিষয়ে আমার পোস্ট আছে।

. জামায়াতের সংস্কার আমার বিবেচনায় এজন্যই সম্ভব নয় যে, পরিবর্তন যা দরকার, আদর্শের নিরিখে তা সম্ভব, বরং সম্ভব হওয়ার কথা হলেও জামায়াতের সাংগঠনিক বর্তমান এস্টাবলিশমেন্টের প্রেক্ষিতে এটি অসম্ভব-প্রায়। এক্সট্রা-অর্ডিনারি ঈমানদার না হলে নিজেকে তো আর কেউ রিফিউট করে না, হদের জন্য নিজেকে পেশ করে না…! এখন সবার দৃষ্টি টাকা বানানো, পজিশন বাগানো, ইলেকশন করা (এটি নাকি জিহাদ!?)। ‘আমি বলেছি’, ‘আমরাও ভাবছি’ টাইপের কথা বলে গা বাঁচানো ও পেছনে সমালোচনা করায় নিয়োজিত দায়িত্বশীলদের একটাই জিগির – রুকন হন না কেন? মানুষ হিসাবে কেমন, পেশাগত দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করেন কিনা – এসব কথা কদাচিৎ বলা হয়। জিজ্ঞাসার মূল বিষয় হলো রিপোর্ট রাখেন কি না ইত্যাদি। আচ্ছা, এতগুলো রুকন কী করেন? সব কিছুতে সিস্টেমের দোহাই। সিস্টেম গড়ে উঠার পরে যা করণীয় তা দিয়ে সিস্টেম কায়েম হয় না। যেখানে সিস্টেম আছে সেখানে যথাযথ স্থানে পরামর্শ পৌঁছানোই যথেষ্ট হয়। সিস্টেম কায়েম করতে গিয়ে প্রচলিত সিস্টেমকে আন-সিস্টেমেটিক্যলি ভাংগতে হয়! জিহাদ আর ফিৎনার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক গ্যাপ আছে।

. টিকে থাকার এক অদম্য নেশা, নামের এক অর্থহীন আবেগ, ব্যক্তির অপরিহার্য্তার এক অলীক ধারণা জামায়াতকে পেয়ে বসেছে। ফলে পরামর্শ গ্রহণ করার স্বাভাবিক অবস্থা এটি হারিয়ে ফেলেছে। পরামর্শের ক্ষেত্রে দেখতে হয়, পরামর্শটা কতটা ওজনদার। আর উনারা দেখেন, পরামর্শটা কে দিয়েছে। তবুও যদি উপযুক্তদের কথা শোনা হতো…!? অমুক তমুক কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলরা শুনি, বলেন, ব্রেইন স্টর্ম দরকার, রিথিংক করা দরকার, নারীনীতি ভুল হচ্ছে, শিবিরকে আলাদা রাখাই ভালো। কই, তাঁরা কেন অন্যদের বোঝাতে পারছেন না!? উনারা হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠতার যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন! ইসলামী সংগঠন কি মেজরিটি অপিনিয়ন দিয়ে চলা উচিত, নাকি যুক্তির সামঞ্জস্যতায় চলা উচিত? আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে নবী আপনি যদি অধিকাংশ লোকের কথায় চলেন, তাহলে আপনি বিভ্রান্ত হবেন…। আর জামায়াত নাকি গণতন্ত্র দিয়ে ইসলামী সমাজ কায়েম করবে!?

১০. পীরানী সিলসিলায় যেমন আপনি সবই করতে পারবেন পীর ও সিলসিলার সমালোচনা করা ছাড়া, তেমনি জামায়াতে আপনি সবই করতে পারবেন দায়িত্বশীল ও কেন্দ্রীয় পলিসির সমালোচনা করা ছাড়া। আমাদের এক দায়িত্বশীল চবি দক্ষিণ ক্যাম্পাস মসজিদের সামনের স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিংয়ে অপর একজনকে এই বলে ধমকালেন, ‘আপনি রুকন হয়ে ফোরামের বাহিরে সংগঠনের কার্যক্রম ও স্ট্যান্ডিং পলিসির সাথে দ্বিমত পোষণ করে কথা বলতে পারেন না!’ জামায়াত থিঙ্কট্যাঙ্ক সিস্টেমে কার্যত বিশ্বাস করে না, যদিও তাদের ইউনিভার্সিটি ডেস্ক, বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ, আদর্শ শিক্ষক পরিষদ নামীয় কিছু বুদ্ধিজীবী-দায়িত্বশীল পুনর্বাসন কেন্দ্র আছে!? জামায়াত ইউনিভার্সিটির টিচারদেরকে দুই পয়সার পাত্তা দেয় না। যতই তাঁরা ডেডিকেটেড হোন, যতই তাঁরা বিশেষজ্ঞ হোন। সংগঠন করলে আপনাকে ফোঁস-ফাঁস করে চুপ-চাপ বসে থাকতে হবে। কারন হলো, জামায়াত নিজেকে বাংলাদেশে অঘোষিতভাবে আল-জামায়াত মনে করে। জামায়াত সকল দিক থেকে অনেক বেটার, নো ডাউট। বাট ইট ইজ নট দ্য অনলি অপশন, আল জামায়াত বলতে যা বোঝায়। যে কারো চেয়ে ভালো হওয়া আর একমাত্র হওয়া এক নয়। এখানে আমার কনসেপ্ট গ্রুপের আইডিয়া যাদের কাছে পরিষ্কার নয়, তাঁরা কিছুটা ভুল বুঝবেন। আমাকে ফোন করতে পারেন । যে কেউ। ব্যস্ততার ফাঁকে অবশ্যই রেসপন্স করবো। আসুন না, ঢাকা চিটাগাংয়ে যারা আছেন, আমরা একত্রিত হই? সামনাসামনি যা-ই বলুন না কেন, কিছু মনে করবো না। এসব বিষয়ে আলোচনা করার জন্য আমাকে ইনভাইট করলে, ইনশাআল্লাহ, যাবো।

mozammel.philosophy@gmail.com

অফিস: কক্ষ নং-১০২, কলা ভবন, চবি।

বাসা: এসই-২৮, দক্ষিণ ক্যাম্পাস, চবি।

ফোন নং- +৮৮০১৯২৮৬৭২৪০৫

বি: দ্র: জামায়াত স্বীয় গঠনতান্ত্রিক তথা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় নিজেকে সংস্কার করবে না, করতে পারবে না – কেন আমি এমনটা মনে করছি তা জানতে চেয়ে একজন জানতে চাইলে উনাকে হুবহু উক্ত বক্তব্য সম্বলিত একটা মেইল এইমাত্র করলাম। ভাবলাম, ব্লগে দেই। মন্তব্যের উত্তর দেব না ভাবছি। অনেক সময় ব্যয় হয়। রুকন হতে হলে তো এসব সময়কে সাংগঠনিক সময় হিসাবে দেখানো যাবে না, তাই না!? অবশ্য আমার এমনিতেই নিয়মিত কিছু সাংগঠনিক সময় ব্যয় হয়ে যায়, সহযোগী দায়িত্বশীল ও জনশক্তির কারণে!?

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *