অন্যতম শীর্ষ জামায়াত নেতার সাথে আলাপের বিবরণ: জামায়াত স্বনামে একাই লড়বে, বিকল্প কিছু করবে না

গত সপ্তাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম শীর্ষ জামায়াত নেতার সাথে কথা বলার পর হতে এক ধরনের বিষন্নতায় ভুগছি! মনে হলো, দায়িত্বশীলদের সাথে কর্মীদের মন-মানসিকতায় ব্যাপক ফারাক। সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনায় উনারা এখনও কয়েক যুগ পিছিয়ে আছেন।

আলোচনার সূত্রপাত

ফেসবুকে টিভিতে অপসংস্কৃতি ও অশ্লীলতার ভয়াবহ বিস্তারের বিরুদ্ধে উনার একটা স্ট্যাটাসে আমার করা মন্তব্য নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হলো। উনি অকপটে বললেন যে, উনার তরফ হতে অন্য একজন এটি দেখে থাকেন। অন্য কাউকে দিয়ে নিজের একাউন্ট চালানোর নৈতিক সমস্যার কথা বলে আলোচনাকে ভারাক্রান্ত না করে বিদ্যমান রাজনৈতিক-সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক বিকল্প গড়ে উঠার সমস্যা নিয়ে কিছু বললাম। এ ব্যাপারে আলোচনা তেমন জমলো না।

সদস্যরা কেন রুকন হয় না

‘বেশি কথা বলা’ প্রাক্তন দায়িত্বশীলদের সামলানোর যে কায়দা জামায়াত দায়িত্বশীলগণ সাধারনত অনুসরণ করেন উনি এবার সেদিকে অর্থাৎ রুকন না হওয়ার কারন উদঘাটনের দিকে অগ্রসর হলেন। আমি অকপটে নিজের দায়িত্ব স্বীকার করে উনার জানা মতো কয়েকজন অতীব যোগ্য প্রাক্তন দায়িত্বশীলের নাম বললাম যারা এখনও রুকন হন নাই। প্রসংগক্রমে অত্যন্ত মেধাবী, ত্যাগী ও যোগ্য ছাত্র দায়িত্বশীলদের বৃহ্ত্তর অংশ পেশাগত জীবনে ইসলামী আন্দোলনে তাঁদের পটেনশিয়ালিটি নিয়ে অগ্রসর হয়ে দায়িত্বপালন না করার বিষয়টির উপর আলোকপাত করার জন্য উনাকে বললেও তিনি পাশ কাটিয়ে অন্য প্রসংগে চলে গেলেন।

পরবর্তী প্রায় একঘন্টা যত বিষয়ে তাঁর সাথে কথা বলেছি তিনি কোন বিষয়েই সুস্পষ্ট কিছু বলেন নাই কেবলমাত্র একটি বিষয়ে ছাড়া। সেটি পরে বলছি।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ কর্তৃক রাজনৈতিক সংগঠনের লেজুড়বৃত্তি করা

যাহোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতপন্থী শিক্ষকগণ ছাড়া কেউ কোন রাজনৈতিক সংগঠনের শাখা হিসাবে প্রকাশ্যে কাজ করে না। বিশেষ করে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। আওয়ামীপন্থীরা বঙ্গবন্ধু পরিষদের ব্যানারে এবং বিএনপির লোকজন জিয়া পরিষদের প্লাটফর্মে কাজ করেন। এমনকি জামায়াত করেন এমন অন্যান্য পেশাজীবীরাও ভিন্ন ভিন্ন প্লাটফর্মে নিজ নিজ এরিয়াতে কাজ করেন। এ বিষয়ে উনাকে বলার পর উনি মোস্ট ট্রাডিশনাল ওয়েতে আদর্শ শিক্ষক পরিষদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পরিষদ ইত্যাদির সাংগঠনিক দূর্বলতার কথা বলতে থাকলেন। ব্যক্তিগতভাবে সবাই অত্যন্ত মেধাবী ও ভালো গবেষক হওয়া সত্বেও সংগঠন হিসাবে বা সাংগঠনিকভাবে বা সামষ্টিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ইসলাম নিয়ে কোন গবেষণা অনুষ্ঠান বা গবেষনা কর্ম না থাকার বিষয়ে উনার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এ নিয়ে উনার মধ্যে কোন বিশেষ আগ্রহ বা ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায় নি।

বিকেন্দ্রীকৃত সংগঠন-কাঠামো

পার্শ্ব/সহযোগী সংগঠনসমূহের বিশেষ করে পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক দূর্বলতার জন্য আমি সেগুলোতে নেতৃত্ব নাযিল করাকে এক নম্বরের সমস্যা হিসাবে উনাকে বললাম। মনে হলো, বিষয়টা তিনি অনুধাবন করেছেন। [যদিও জানি, কাজের কাজ কিছু হবে না।] এ পর্যায়ে এসে উনাকে জামায়াতের এক-কেন্দ্রিক [জায়ান্ট ট্রি মডেলের] সাংগঠনিক কাঠামোর সমস্যা নিয়ে কিছু বললাম। প্রসংগক্রমে বহুত্ববাদী ও বিকেন্দ্রীকৃত সাংগঠনিক কাঠামোর গঠন, কার্যকারিতা ও উপযোগিতা নিয়েও বলার চেষ্টা করলাম।

এই সূত্রে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে জামায়াতের করুন দশার জন্য অতি রাজনীতির (over political growth) বিষয়ে আমি যা বললাম তা উনি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন বলে মনে হলো না। ইসলামী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইকন হিসাবে গড়ে উঠার জন্য বিদ্যমান আমিত্ব-ত্যাগ নীতির (submissive sacrificing tendency) পরিবর্তে আত্ম-উপস্থাপনা নীতির (branding policy) অপরিহার্যতার সম্পর্কে বললাম। এটিও উনি কেবল শুনলেন। যার ফলে ‘থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সিস্টেমে’র প্রসংগ তুলে পরিবেশকে আরো ভারী করতে চাইলাম না।

’৭১ ইস্যু

জামায়াত কর্তৃক ১৯৭১ ইস্যুতে রাখ-ঢাক পলিসি এডপ্ট করার প্রসংগে উনাকে বললাম, প্রফেসর গোলাম আযম গ্রেফতারের আগের দিন পত্রিকার সাংবাদিকদেরকে ঢেকে যে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তা যদি সবাই মিলে প্রথম থেকে করতো তাহলে হয়তোবা ইস্যুটা অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত। এসব উনি কেবলি শুনলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সাংগঠনিক অচলাবস্থা

নানা কথার ফাঁকে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সংগঠনসমূহ তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলগণ কর্তৃক প্রয়োজনীয় সময় দিতে না পারার বিষয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন, এবং এ ক্ষেত্রে মোক্ষম এক্সকিউজ হিসাবে বিদ্যমান নিরাপত্তা সমস্যার কথা বললেন। আমি বললাম, আপনারা কেন এসব ধরে রেখেছেন? উদাহরণ হিসাবে বললাম, আমার কর্মক্ষেত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠন দূরবর্তী চট্টগ্রাম মহানগরীর অনেকগুলো সাংগঠনিক ওয়ার্ডের একটি। ক্যাম্পাস হতে শহরে আসা-যাওয়াতে যেখানে প্রায় তিন ঘন্টা ব্যয় হয়, সেখানে আপনাদের প্রতিটা গড়পরতা প্রোগ্রামে অংশ গ্রহনের জন্য আমাদের দায়িত্বশীলদের ছোটাছুটি করতে হয়! আমি উনাকে আরও বললাম যে, ছাত্রীদের সংগঠন শহরের সংগঠনের একটি শাখা মাত্র। অথচ, সংশ্লিষ্ট এলাকার অপরাপর সবগুলো প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বের চাইতে একটা সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় গুরুত্ব অনেক বেশী। এসব বিষয়ে তিনি তেমন সারবত্তা সম্পন্ন কোন কথা বলেন নি।

বিকল্প প্লাটফরম

শেষে উঠে যাওয়ার সময়ে জেল থেকে কামারুজ্জামান ভাইয়ের লেখা চিঠি নিয়ে জামায়াত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই কেন এ বিষয়ে তিনি যা বললেন তা রীতিমতো থ খেয়ে যাওয়ার মতো (stunning)। তিনি যা বললেন তার সারমর্ম নিম্নরূপ-

জামায়াত অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছে যে, কোন বিকল্প প্লাটফরম জামায়াতের তরফ হতে করা হলে তা আত্মঘাতী হবে। উনার ভাষায়, ‘… তখন আর কেউ জামায়াত করবে না। আপনিও করবেন না, আমিও না।’ আমি বললাম, এভাবেই তাহলে চলবে? উনি বললেন,  দেখা যাক, খেলাটা আগে শেষ হোক

কর্মীদের কথা শুনার জন্য দায়িত্বশীলদের আন্তরিকতা প্রসংগে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ

১৯৮৬ সালের শুরুর দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেছনের মাঠে এক বিকাল বেলায় আমরা তিনজন কর্মীকে নিয়ে [কোন সাথী না থাকায়] একজন সদস্য এসে প্রোগ্রাম নিচ্ছিলেন। কোন বিষয়ে গৃহীত পরিকল্পনা আর একটু বাড়িয়ে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল আমাদের এক সহযোগি কর্মীকে পিড়াপিড়ী করছিলেন। তখন আমি বললাম, নেন না, এসবতো শুধু নেয়ার জন্যই নেয়া। এ কথা শুনে উক্ত সহজ-সরল সদস্যভাইটি খুব আহত হয়ে এমন মন্তব্য করার কারন জানতে চাইলেন। তখন আমি বললাম, দেখেন, সংগঠন নিয়ে আমাদের অনেক কথা আছে। ইত্যাদি। তিনি তৎক্ষণাত প্রোগ্রামটি বাতিল করে উঠে পড়লেন। বললেন, আমি এখনই ‘মৌসুমী’তে যাচ্ছি। আগামীকাল আপনারা মক্কী মসজিদে ফজরের নামাজ পড়বেন। মহানগরী সভাপতি কিম্বা সেক্রেটারির যে কোন একজনকে যেভাবেই হোক না কেন আমি নিয়ে আসবো। আপনাদের সাথে কথা হবে।

সংগঠনের বিষয়ে আমরা খুব সম্ভবত ২১টি প্রশ্ন তৈরী করলাম। ফজরের পরে দেখা গেল তৎকালিন মহানগরী সভাপতিকে নিয়ে তিনি এসেছেন। মহানগরীর উক্ত সভাপতি বললেন যে, আমরা তিনজন কর্মী সংখ্যায় নগণ্য হলেও আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা উনার একান্ত কর্তব্য। তাই তিনি এসেছেন। প্রায় বেলা এগারোটা পর্যন্ত মসজিদের বারান্দায় বসে কথা হলো। শুধুমাত্র মেহমানই আমাদের সাথে কথা বললেন। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে ঢাকা মহানগরীর সভাপতি হিসাবে কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন আয়োজন তদারকী করতে এসে আমাকে সেখানে দেখে তিনি অভিভূত হয়ে পড়লেন। আমাকে জড়িয়ে ধরলেন! আফসোস, কর্মীদের কথা শুনার মতো সময় বর্তমান দায়িত্বশীলদের নাই। উনারা আজ বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে দারুণ ব্যস্ত। প্রোগ্রামে প্রোগ্রামে উনাদের দিন কাটে। সংগঠন চলে যান্ত্রিক নিয়মে।

দায়িত্বশীলদের উপর কর্মীদের আস্থার সংকট

আমার আলাপে, উক্ত অন্যতম শীর্ষ জামায়াত দায়িত্বশীলকে বললাম, দেখুন, ছাত্রজীবনে উর্দ্ধতন দায়িত্বশীলদের প্রতি আমাদের অগাধ আস্থা ছিল। এর কারন এই নয় যে, আমরা বয়সে নবীণ হওয়ায় কিছুটা অবুঝ এবং অনেকটা আবেগী ছিলাম। বরং তাঁরা ছিলেন দুনিয়াবিমুখ, ও অতিরাজনৈতিকতা হতে মুক্ত। কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। দেখেন, আমাদের যে দায়িত্বশীল সদস্য মহানগরীর তৎকালিন সভাপতিকে জরুরীভাবে ডেকে নিয়ে আসলেন, চাইলে, তিনি নিজেই আমাদের সাথে আলোচনা চালিয়ে নিতে পারতেন। তিনি চ.বি.তে সায়েন্স ফ্যাকল্টির একটি সাবজেক্টে পড়তেন। এখন একটি সরকারী কলেজের অধ্যাপক। কিন্তু তিনি মনে করেছেন, চট্টগ্রামের সবচেয়ে অভিজাত এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অত্যন্ত সিনসিয়ার এই তিনজন কর্মীর পটেনশিয়ালিটি আছে। উনাদের সামলানো বোধহয় আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।

করণীয়

এখন দেখি, যে কোন দায়িত্বশীলই যে কোন প্রশ্নের জবাব দিতে উদগ্রীব। নিজের অপারগতার কথা বলে সময় নেয়া বা উর্দ্ধতন কাউকে রেফার করে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেয়ার প্রচলন এখন প্রচলিত ইসলামী আন্দোলনে দেখি না। রেডিমেড উত্তর দিয়ে ইনস্ট্যান্ট নুডুলসের মতো রেডিমেড সাফল্য হয়তো পাওয়া সম্ভব। কিন্তু মানুষের মন জয় করতে হলে আন্তরিক হতে হবে, কৌশল হিসাবে নয় রিয়ালাইজেশানের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে ভুল স্বীকার করতে হবে, খদরদারির মানসিকতা পরিহার করতে হবে। ব্যক্তি বা সংগঠন বা শাখা বিশেষের দূর্বলতার অজুহাতে সেটিকে কব্জা করে না রেখে ছেড়ে দিতে হবে। স্বাধীনভাবে স্বীয় বুঝ-জ্ঞান মোতাবেক চলতে দিতে হবে।

পরিশিষ্ট

জামায়াতের সংস্কার সংক্রান্ত ফোর পয়েন্টস- প্রিয় দায়িত্বশীলের সাথে আমার এই সাক্ষাৎকার আমাকে হতাশ করেছে। ব্লগের বিভিন্ন লেখায় গত তিন-চার বছর হতে আমি যে ফোর পয়েন্টস এর কথা বলেছি তা আবার নতুন করে অনুধাবন করলাম। (১) জামায়াত স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোন মৌলিক পরিবর্তনকে গ্রহন করবে না। অতএব, রিফর্ম ফ্রম উইদিন – অসম্ভব। (২) জামায়াতের বিকল্প কিছু করার মতো নেতৃত্ব বা ব্যক্তিত্ব ময়দানে অনুপস্থিত। (৩) ‘দেখিনা কি হয়, দেখি, অন্যরা কি করে বা কি হয়’ – এই টাইপের নিস্ক্রীয়তার সুযোগ কোরআন-হাদীসে নাই। অতএব, (৪) ইতোমধ্যে কোমর বেধে কনসেপ্ট বিল্ডআপের কাজ করতে হবে। এটি নতুন ধারার উৎপত্তি বা প্রচলিত ধারার সংশোধন বা উভয়টির জন্য ‘স্পনিং গ্রাউন্ড’ বা ideological hub হিসাবে ভূমিকা পালন করবে।

ফেসবুক প্রথম প্রকাশিত

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *