ক্বিতাল অর্থে জিহাদ: অথরিটি বনাম অটনমি

জনাব আবদুল্লাহ আল মুনীরের ‘দ্বীন কায়েম ও এর সঠিক পদ্ধতি’ শীর্ষক অগ্রন্থিত (inconsistent) তথ্যবহুল পোস্টটির বিষয়ে কিছু কথা–

যেসব পয়েন্টে আমি উনার সাথে একমত:

১। সুন্নাহ মানেই করণীয় তথা ফরজ/ওয়াজিব নয়।
২। হিজরত জিহাদের পূর্বশর্ত নয়। এটি সহীহ।
৩। হিজরত ফরজ হয় অক্ষম হলে, আর জিহাদ ফরজ হয় সক্ষম হলে।
৪। হদ্দ কায়েম বা রাষ্ট্র পরিচালনাতেই খলিফার কাজ সীমাবদ্ধ নয়।
৫। জিহাদ বৈধ বা ফরজ হওয়ার জন্য নবুয়তী আদর্শের খিলাফত বিদ্যমান থাকাটা শর্ত নয়।
৬। বিশ্বব্যাপী একক খিলাফত অত্যাবশ্যক নয়।

যেসব পয়েন্টে আমার দ্বিমত:

১। তিনি আমীর ও খলিফার মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি। এবং সেটিকে যথার্থ প্রতিপন্ন করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ভূমির উপর কথিত খলিফার কর্তৃত্বকে অপরিহার্য নয় বলেছেন। উনার মূল বিভ্রান্তি এ জায়গাতেই।

২। তিনি খলিফাকে মূলত মোরাল গাইড হিসাবে দেখেছেন। যেন অথরিটি না থাকলেও স্পিরিচুয়্যালিটিই খলিফার বৈধতা প্রতিপন্ন করতে পারে।

৩। হদ্দ কায়েমসহ বিবিধ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম না হলেও তিনি খলিফা হতে পারেন।

৪। হযরত আবু জান্দালের, উনার বর্ণনায়, আবু বছিরের ঘটনাকে খলিফাবিহীন জিহাদের বৈধতা বা অনুমতি হিসাবে দেখানোর চেষ্টা।

৫। মতবিরোধের সীমা ও বিদ্রোহের বৈধতা প্রসঙ্গে উবাদা ইবনে সামিত (রা) বর্ণিত হাদীসের রেফারেন্স প্রদান।

৬। রাসূলুল্লাহর (সা) নিন্দাকারিনী দাসীকে তাৎক্ষণিকভাবে হ্ত্যার ঘটনাকে বিনা অনুমতিতে হদ্দ কায়েমের বৈধতা হিসাবে পেশ করা।

মন্তব্য:

ইসলামের মূলতত্ত্ব বা এর মর্মবাণী (concept) না বুঝে রেফারেন্সনির্ভর জ্ঞান অর্জন ও বিতরণের চেষ্টা যে কতটা বেপথু হতে পারে জনাব মুনীরের এই প্রবন্ধ তার উদাহরণ। ইদানীং একটা প্রবণতা দেখা যায়– হাদীসের রেফারেন্স আছে কিনা, যেন সহীহ হাদীস পেলেই হলো, এমন ভাব। হাদীস তো হতে হবেই। তবে এরসাথে সংশ্লিষ্ট অপরাপর সহীহ হাদীসগুলোকে সমন্বিত করে তবেই কোনো উপসংহারে পৌঁছতে হবে। I mean, total understanding is a must. So, mere authenticity is not enough, even could be misleading.

সমাজ রাষ্ট্র এক নয়। সমাজ হলো রাষ্ট্রের ভিত্তি। রাষ্ট্র সমাজের উচ্চ স্তর। খিলাফত নির্ভেজাল রাষ্ট্রীয় বিষয়। আর এমারত হলো সমাজের বিষয়। রাষ্ট্র না থাকলেও সমাজ থাকবে বা ছিলো। তাই, খিলাফত না থাকলেও আমরা মুসলমান আছি। আমাদের স্থানীয় ইমামও আছে, থাকতে পারে।

দারুল ইসলাম আর দারুল কুফরের মাঝামাঝি দারুল আমানের কনসেপ্ট আছে বলেই আমরা (যেমন– বাংলাদেশের মুসলমানরা) ঈদ পালন করি, যাকাত দেই, জুমা পড়ি। কিন্তু আমাদের জুমার ইমাম জিহাদ (ক্বিতাল অর্থে) করার বৈধতা রাখেন না।

জিহাদ হতে হলে তা কোনো এলাকার উপর দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন প্রয়োগের কর্তৃত্বশীল প্রধানের (তাকে আমীর বা খলিফা যে উপাধীতেই ডাকা হোক না কেন) নিকট হতে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসতে হবে। নতুবা তা ফিতনা হিসাবে পরিগণিত হবে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এসব বিষয়ে বিভ্রান্তি হতে বাঁচার জন্য হযরত আলী বনাম খারেজীদের ঘটনাবলী সবসময় আমাদের স্মরণে ও বিবেচনায় রাখতে হবে। যাতে আমরা জিহাদ ও ফিতনার পার্থক্য সঠিকভাবে বুঝতে পারি।

এসবি ব্লগ থেকে নির্বাচিত মন্তব্যপ্রতিমন্তব্য

লাল বৃত্ত: চমৎকার ভাইয়া। সবচেয়ে আসল বিষয় হচ্ছে ইসলামের মূলতত্ত্ব বা এর মর্মবাণী (concept) না বুঝে কেবল মাত্র অথেন্টিসিটি বা বিশুদ্ধতার উপর নির্ভর করে কিছু আয়াত এবং হাদীসের বিভ্রান্তিমুলক ও আবেগী অপব্যবহারে সমাজে চরম বিশৃংখলা সৃষ্টি করা কিংবা ইসলামের চেহারাই বদলে ফেলা সম্ভব। সুতরাং, বিষয়টি সত্যিই চিন্তিত হওয়ার মতো।

আবু সাইফ: অসাধারণ সমালোচনা। ধন্যবাদ দেবার ভাষা জানা নেই। জাযাকাল্লাহু খাইরান কাছীরান মুবারাকান।

এরপরও যদি ‘কিতাল’-এর স্বপ্নচারীদের মোহভংগ না হয়, তবে উপায় কী!

নোমান সাইফুল্লাহ: “যাতে আমরা জিহাদ ও ফিতনার পার্থক্য সঠিকভাবে বুঝতে পারি।”

এই পার্থক্য না বুঝেই তো উল্টাপাল্টা ফতোয়া দেয়া শুরু হয়। ধন্যবাদ এই বিষয়ে লেখার জন্য।

ঈগল: ধন্যবাদ। আমি ঐ প্রবন্ধটি পড়েছি। তিনি এই ক্বিতালকে বৈধতা দেওয়ার জন্য বর্তমান শাসকগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি শাসক গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়েছেন এবং তার পিছনে যথেষ্ট দলিল এবং যুক্তিপ্রমাণও পেশ করেছেন। সেই অর্থে তিনি এই জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে ক্বিতালের কথা বলেছেন। সেই সাথে শক্তি অর্জনের প্রতিও গুরুত্ত্ব দিয়েছেন।

আপনি বলেছেন, “জিহাদ হতে হলে তা কোনো এলাকার উপর দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন প্রয়োগের কর্তৃত্বশীল প্রধানের (তাকে আমীর বা খলিফা যে উপাধীতেই ডাকা হোক না কেন) নিকট হতে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসতে হবে।”

বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট নয়। লক্ষ্য করুন, আমার দল যদি এখন মানুষকে নিরেট তাওহীদের দাওয়াহ দিতে শুরু করে, তখন কিন্তু সরকার গণতান্ত্রিক সিম্টেম মানবে না। সরকার আমার দলকে নিষিদ্ধ করবে, অনেককে হত্যা করবে, বন্দী করবে, তখন তো ক্বিতাল অপরিহার্য। তাই নয় কি? আমার অনুমান, সেই অবস্থার সৃষ্টি হলে ক্বিতাল ঘোষণা দেওয়ার অথরিটি আমার প্রাপ্য। তাছাড়া আমরা যদি ইতিহাসের দিকে একটু নিরপেক্ষ দৃষ্টি দেই তাহলে দেখতে পাব, কোনো ফৌজদারী ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও অনেকে শাসক শ্রেণীর সাথে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং সেই কারণে তারা ইতিহাসে নায়কও হয়েছেন।

কিছু লোক যেমন কুরআন ও সহীহ হাদীসের রেফারেন্সকে যথেচ্ছ ব্যবহার করছে, ঠিক তেমনি কেউ কেউ কুরআন ও সহীহ হাদীসকে খেলার পুতুল মনে করছে! এদের একটাই ভাষা, বর্তমান প্রেক্ষাপট!! কুরআন একটি পুতুল, যা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাদের যুগে স্থির হয়ে আছে! (আল্লাহ রক্ষা করুন)

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: A successful coup is a legal government– এ কথাটা ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সমর্থিত। অর্থাৎ জালিম শাসকের বিরুদ্ধে ইস্যুভিত্তিক প্রতিবাদ, সীমিত পর্যায়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করা যাবে। যদিও পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক বিচারব্যবস্থায় তা অনুমোদিত হতে হবে। আনুগত্য প্রত্যাহার তথা বিদ্রোহের জন্য প্রকাশ্য ঘোষণা ও সক্রিয় জনসমর্থন হলো পূর্বশর্ত। মূলকথা হলো জালিম শাসক গোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করার ন্যূনতম শক্তি ও সম্ভাবনা ব্যতিরেকে তাদের কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধিতা করা ফিতনার নামান্তর। এবং ফিতনা সৃষ্টিকারীর বিরুদ্ধে যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার শাসকের রয়েছে।

এখন থাকলো, স্পষ্টত অন্যায়কারী শাসক নামাজ-রোজা করলে সে কাফির হবে কিনা? যদিও সে কুফরতুল্য কাজ করে? যেহেতু আল্লাহ বলেছেন, ‘ফাউলায়িকা হুমুল কা-ফিরুন? কোরআন শরীফে কাফির শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি বুঝবেন যদি সালাত শব্দটির নানা ধরনের ব্যবহার আপনি খেয়াল করেন। সব সালাতই নামাজ অর্থ বহন করে না।

জিহাদের অর্থ বুঝতে হলে ফিতনাকে বুঝতে হবে। যেমন করে উলুহিয়াতকে বুঝতে হলে তাগুতকে বুঝতে হবে।

প্রথমে অন্তরে, তারপরে মুখে, না হলে শক্তি দিয়ে প্রতিরোধের বিষয়টি পারস্পরিক ও ব্যক্তিগত বিষয়াদিতে মূলত প্রযোজ্য। রাষ্ট্রীয় বিষয়ে শক্তি দিয়ে বিরোধিতার বিভিন্ন ধরন হতে পারে। ক্বিতাল ফি সাবিলিল্লাহকে অন্যতম শরয়ী পারিভাষিক অর্থ হিসাবে বিবেচনা করলে আপনি বুঝতে পারবেন, একা একা বা কেউ কেউ মিলে, তালেগোলে ক্বিতাল হয় না।

তবে কেউ যদি আক্রান্ত হয়, তখন স্বীয় অধিকার রক্ষায় তিনি প্রতিরোধ করতে পারবেন যা জিহাদতুল্য, তবে জিহাদ নয়। যেমন– কেউ যদি দূরারোগ্য ব্যাধি, মহামারী, সন্তান প্রসবকালে মারা যায় তাহলে সে শহীদের মর্যাদা পাবে।

ধন্যবাদ।

এসবি ব্লগের আর্কাইভ লিংক

Leave a Reply