আরবি না জানার কারণে ধর্মীয় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাজনিত সমস্যা প্রসংগে

“আমার একটা প্রশ্ন: শয়তানের প্ররোচনা থেকে কীভাবে বেঁচে থাকা যায়? আর ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে কিছু প্রশ্ন এসে মনে সন্দেহ তৈরি করে, যা নাস্তিকতার দিকে নিয়ে যায়। তখন কী করবো?”

জনৈক পাঠকের এই প্রশ্নের উত্তরে আমি যা বলেছি:

“শয়তান হয়তোবা মানুষের কুপ্রবৃত্তির অন্য নাম। অথবা, মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে অবলম্বন করে শয়তান কাজ করে। ব্যাপারটা যাই হোক না কেন, কুপ্রবৃত্তি নামক শয়তানকে দমন কিংবা কুপ্রবৃত্তি দমনের মাধ্যমে শয়তানকে দমন করার উত্তম উপায় হচ্ছে, নিজের মধ্যে যে জন্মগত সুপ্রবৃত্তি তথা বিবেক ও জীবনবোধ রয়েছে, সেটাকে জাগ্রত করা এবং সক্রিয় করা।

কুপ্রবৃত্তি আদতে না-ই থাকা, ভালো মানুষ বলতে যদি এমনটা কেউ বুঝে থাকেন, তিনি ভুল করছেন। ফেরেশতা না হওয়ার কারণে মানুষ কুপ্রবৃত্তিহীন হতে পারে না। বরং কোনো ব্যক্তির মধ্যে যখন কুপ্রবৃত্তির তুলনায় সুপ্রবৃত্তি প্রাধান্য বিস্তার করে তখন সেই ব্যক্তি সত্যিকারের ভালো মানুষ হয়ে ওঠে।

আর ধর্মীয় বা যে কোনো ধরনের জ্ঞানের অভাব তো শুধুমাত্র জ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই পূর্ণ হতে পারে। সোজা কথায়, জ্ঞানের বিকল্প হচ্ছে জ্ঞান। সত্যিকারের জ্ঞান। যা ব্যক্তির ভিতর থেকে গড়ে উঠে। গর্ভধারণ বা নিষিক্তকরণের মতো।

জ্ঞান হচ্ছে প্রেমের মতো। উর্দূ কবি মীর তকী মীর বলেছিলেন, ‘প্রেমের ব্যথায়, প্রেমই নিবারক।’ তেমন করে, জ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো কিছু জ্ঞানের তৃষ্ণা বা প্রয়োজন মেটাতে পারে না। প্রেমের মতো, জ্ঞানের কোনো বিকল্প হয় না।

অবশ্য, জ্ঞান মানে শুধুমাত্র কিছু তথ্য ও সূত্র আয়ত্ত করার ব্যাপার নয়। বরং জ্ঞান হলো হাতের নাগালে থাকা তথ্য এবং সূত্রগুলোকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা। বিদ্যমান তথ্য ও সূত্রগুলোর কোনটি কোনটির সাথে কীভাবে সংযুক্ত হতে পারে, কোন ধরনের তথ্য-সংযোগের মাধ্যমে কী পাওয়া যাবে, সেটা কতটুকু দরকারি, তা বুঝতে পারাকেই জ্ঞান অর্জন করা বলা হয়।

তাই, লেখাপড়া করতে হবে। তবে পড়তে হবে যথাসম্ভব সঠিক উৎস থেকে। পড়াশোনা যা-ই হোক, চিন্তাভাবনা করতে হবে তারচেয়েও বেশি করে। যে জ্ঞানচর্চার একান্ত নিজস্ব কোনো উপসংহার বা প্রাপ্তি নাই, যে জ্ঞান কর্মে রূপায়িত নয়, তা আদৌ জ্ঞান নয়। এ ধরনের ‘জ্ঞান’ শেষ পর্যন্ত তথ্যই থেকে যায়।”

প্রশ্নকারী উক্ত পাঠকের প্রতিমন্তব্য:

“ধন্যবাদ স্যার। তবে কোনো জেনারেল লাইনে পড়ুয়া ছাত্রের পক্ষে কি আরবী না জেনে গভীর জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব? কেননা, গভীরভাবে … অর্জন করতে না পারলে প্রশ্ন এসে সন্দেহ তৈরি করে।”

আমার উত্তর:

“আমি নিজেই তো আরবী পড়ি নাই। এবং এখনো বুঝি না। মূল ভাষা জানা থাকলে সুবিধা। তবে, এর মানে এই নয়, অনুবাদ পড়ে কেউ সঠিকভাবে জানতে পারবে না। আবার, মূল ভাষা হতে পড়লেই কেউ সঠিক অর্থ যথার্থভাবে বুঝে যাবেন, এটিও ঠিক নয়। বুঝ-জ্ঞানের জন্য দরকার অনুসন্ধিৎসু মন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যে জানতে চাইবে তাকে আল্লাহ অবশ্য জানাবেন। আসলে সবজ্ঞান তো তিনি দিয়েই দিয়েছেন।

জ্ঞান অর্জন করা বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো, আসলে আমার-আপনার মধ্যে সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে প্রাকৃতিকভাবে আল্লাহ প্রদত্ত স্বগত জ্ঞান (given knowledge in potential form) সম্পর্কে সচেতন ও দায়িত্ববান হয়ে উঠা এবং সেটাকে কাজে লাগানো বা ব্যবহার করার সক্ষমতা (actualization of knowledge) অর্জন করা।

যেমন, কারো ব্যাংকে অনেক টাকা আছে। কিন্তু সে তা জানে না বা ভুলে গেছে। হতে পারে, সে অ্যাকাউন্ট নম্বর জানে না, অথবা তার কাছে চেক বই নাই। এরপর যখন সে চেকবই খুঁজে পেলো, তখন সে টাকাটা পেলো এবং কাজে লাগাতে পারলো।

মানুষের বিবেকের মধ্যেই খোদাতায়ালা জীবন চলার উপযোগী সব জ্ঞান দিয়ে দিয়েছেন। জীবন ও জগত সম্পর্কিত কোনো মৌলিক বিষয়ে আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করলেই সঠিক উত্তরটা কেমনে যেন আমরা টের পেয়ে যাই। কীভাবে যেন অত্যন্ত জোরালোভাবে সঠিক বিষয়টা অনুমান করতে পারি। কোরআন-হাদীসে যা বলা আছে তা আমাদের বিবেক-বুদ্ধির মধ্যে যা আছে তারই স্মারক মাত্র। ভিন্ন বা বিপরীত কিছু নয়। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো করণীয় বিষয়ে স্পেসিফিক কর্মধারা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশ বা নির্দেশনা দেয়া আছে। ব্যস্, এতটুকুই।

আর হ্যাঁ, টেকনিক্যাল নলেজ বলতে আমরা যা বুঝি তা অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অর্জন করতে হয়। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই এটি প্রযোজ্য। জ্ঞানতত্ত্বের বইপত্রে এই ধরনের প্রায়োগিক জ্ঞানকে জ্ঞান না বলে দক্ষতা (skill) বা কর্মক্ষমতা (efficiency) বলা হয়।

জ্ঞান হলো আন্ডারস্ট্যান্ডিং, এনালাইসিস এবং ক্রিয়েটিভিটির ব্যাপার। তথ্য উপস্থাপন করার দক্ষতার চেয়েও জ্ঞান বেশি কিছু। কেউ কেউ তত্ত্বকে তথ্য হিসাবে রিটট্রাইব করে, আর মনে করে, তারা বড় জ্ঞানী। বস্তায় বস্তায় তথ্য থাকা ও মুহুর্মুহু সেগুলো উদগীরণ করতে পারা জ্ঞানী হওয়ার লক্ষণ নয়, খেজুর গাছ কেটে রস বের করার মতো যদি তা হতে জ্ঞান-রস আহরণ করা না হয়।”

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Abdullah Mamun: আমি আপনার দুইটা লেকচার শুনেছি, কিন্তু আপনার কথা ও ব্যাবহৃত টার্মগুলো বুঝতে একটু কষ্ট হয়েছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য যদি আরো একটু সহজ করে বলতেন তবে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। ধন্যবাদ।

Mohammad Mozammel Hoque: জানেনই তো ‘সহজ করে বলা কঠিন। কঠিন করে বলা সহজ।’ সবচেয়ে বড় কারণ হলো অধিকাংশ ভিডিও বক্তব্যে আমি একতরফাভাবে বলেছি। এ বক্তব্যের অডিয়েন্স কারা হবে সেটা নির্ধারিত ছিল না বা থাকে না।

খুব হাই লেভেলের লোকদের জন্য বলতে গেলে সেটা পুরোপুরি ইংরেজিতে ফুল একাডেমিক ফরম্যাটে বলার কথা। আবার একেবারে সাধারণ লোকদের জন্য বললে পুরোপুরি বাংলায় সহজবোধ্যভাবে বলার কথা। তো অডিয়েন্সের সামনে বলতে না পারার কারণে আমি মাঝামাঝি করে বলি।

আশা আছে ভবিষ্যতে পরিবেশ পরিস্থিতি এবং নানা বিষয় অনুকূল থাকলে, যদি সম্ভব হয়, নির্ধারিত অডিয়েন্সের সাথে তাদের মতো করে কথা বলবো, ইনশাআল্লাহ।

Abdullah Mamun: ধন্যবাদ স্যার। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। আমিন।

Mohammad Mozammel Hoque: এই ভিডিওটা দেখতে পারেন– বাচ্চাদের মৌলিক প্রশ্ন। যেটাতে আমি দুটো বাচ্চার সাথে কথা বলেছি। আমার এরকম আরো ভিডিও আছে যেগুলোতে আমি ৩০-৪০ মিনিট করে তাদের সাথে কথা বলেছি। তাদের মতো করেই বলেছি এবং খুব সম্ভবত আমি কী বলতে চেয়েছি সেটা তারা বুঝেছে। যদিও সেটি অত্যন্ত উপরের পর্যায়ের কোনো তাত্ত্বিক বিষয়।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলোসফি পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম। থাকি চবি ক্যাম্পাসে। নিশিদিন এক অনাবিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। তাই, স্বপ্নের ফেরি করে বেড়াই। বর্তমানে বেঁচে থাকা এক ভবিষ্যতের নাগরিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *