এক বর্গ কিলোমিটার বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার মাঝে বসবাস

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাস। একজন নিবাসী হিসেবে এখানকার ভালো-মন্দ দেখার সুযোগ পেয়েছি গত দুই যুগ। বাংলাদেশের মধ্যে যে গুটিকতেক জায়গায় সর্বোচ্চ সংখ্যক জ্ঞানী-গুণী লোকেরা থাকে এটি তার অন্যতম। এখানকার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সাথে, কথার কথা পার্শ্ববর্তী হাটহাজারী এলাকার পার্থক্য হলো, এখানে নানা মত, পথ ও ডিসিপ্লিনের লোকজন একসাথে থাকে। হাটহাজারী সদরে হাটহাজারী মাদ্রাসা অবস্থিত। এখানে রয়েছে শেরে বাংলার মাজারসহ সুন্নীদের ওয়াদুদিয়া মাদ্রাসা। আলটিমেইটলি এগুলো সব ইসলামী প্রতিষ্ঠান। তাই, কিছুটা দ্বিমত থাকলেও ওভারঅল এক লাইনেই, অর্থাৎ ইসলামি লাইনেই তাদের ভাবনা-চিন্তা।

এর বিপরীতে চবি হলো একটা সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান। উদাহরণ হিসাবে বলছি, কলা ভবনের ১২০ নং কক্ষ সংগীত বিভাগের। এর পাশের ১২১ নং কক্ষটি আরবী বিভাগের। এক রুমের বাইরে সব স্যান্ডেল। ভেতর থেকে হারমোনিয়ামের আওয়াজ। পাশের রুমে তখন ছোট-বড় সব মাওলানা সাহেব গুরুগম্ভির আলোচনাতে ব্যস্ত। চবি দক্ষিণ ক্যাম্পাসটাও এ রকম বৈচিত্রপূর্ণ সহাবস্থানের জায়গা। পার্শ্ববর্তী পাহাড়িকা আবাসিক এলাকাসহ এই এক বর্গকিলোমিটার পরিসরে প্রায় শ’ দেড়েক শিক্ষক বসবাস করেন।

এখানকার শিক্ষকগণ জ্ঞান-গবেষণার কাজ করেন ফ্যাকাল্টি এলাকায়, অফিসে। আমরা ধারণা করতে পারি, গোলাপ গাছের নীচের মাটিও গোলাপের সুরভি কিছুটা পায়। হাফেজ সাহেবের বিড়ালও নাকি কয়েক সিপারা কোরআন মুখস্ত পারে। একইভাবে, কথা ছিলো, এখানকার বুদ্ধিজীবীগণ কিছুটা হালকা মুডে হলেও এখানে কিছুটা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করবেন। বিশেষ করে, কলা ও মানববিদ্যা এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্ভূক্ত বিভাগগুলোর লেখাপড়া প্রত্যক্ষভাবে মানুষ ও সমাজকে নিয়ে। বিজ্ঞান অনুষদের মতো তাদের ল্যাব সুবিধা পাওয়ার অপরিহার্যতা নাই।

ক্লাব, মসজিদ, বাজার ও দোকানে কেনাকাটা, বৈকালিক হাঁটাচলাসহ নানা ধরনের সামাজিক সম্পর্কের সুযোগে মাঝে মাঝে প্রসঙ্গক্রমে তাদের মধ্যে পারষ্পরিক জ্ঞানতাত্ত্বিক মতবিনিময় (inter disciplinary exchange of views) হওয়ার কথা। বুদ্ধিজীবী হলে যত্রতত্র বুদ্ধিজীবীতা ফলাতে হবে, তা নয়। কিন্তু জ্ঞানীদের সব কাজেই তো জ্ঞানের কিছুটা সুবাস বা ফ্লেভার থাকার কথা।

বিজ্ঞান ও বানিজ্য অনুষদের শিক্ষকবৃন্দেরও নানা ধরনে উভয় পাক্ষিক জ্ঞানগত সামাজিক ও মতাদর্শগত দায়বদ্ধতা থাকে। অতীব দুঃখের বিষয় হলো, যে এক বর্গ কিলোমিটার জায়গা হতে পারতো জ্ঞান-চর্চা এবং যুক্তিনির্ভর মত ও পথ অনুসরণের কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যে আবাসিক এলাকা হতে পারতো দেশ ও জাতির জন্য সহনশীলতা, উদারতা, উৎকর্ষতা ও মননশীলতার মডেল, সেই এলাকা নিছকই নিম্নমানের একটা অভিজাত এলাকা। এর একপাশ হতে ওপাশে হেটে গেলে কেউ দেখবে না, দু’জন বা এক দল শিক্ষক একাডেমিক বা কোয়াজি-একাডেমিক কথোপকথনে লিপ্ত।

যদ্দুর মনে পড়ে, এই এত বছরের মধ্যে সম্প্রতি মালয়েশিয়া ফেরত আরবী বিভাগের একজন শিক্ষক একবার আমাকে মুসলিম দর্শন ও পাশ্চাত্য দর্শনের বস্তুবাদী ধারা নিয়ে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। আমার একজন ক্যম্পাস নিবাসী বিভাগীয় সহকর্মীর সাথে আমার আগ্রহে একাডেমিক বিষয়ে মাঝেমাঝে কথা হয়। বুঝতেই পারছেন, বুদ্ধিবৃত্তির সামাজিক দায়বোধের নিরিখে এগুলো নিতান্তই অনুল্লেখযোগ্য। অবশ্য শিক্ষকগণ সুযোগ পেলেই নানা ধরনের বিভাগীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুপস্থিত পক্ষের সমালোচনায় মেতে উঠেন। পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবীদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়ন আর বুদ্ধিবৃত্তি বা বুদ্ধিজীবীতা তো এক না।

অন্যান্য উঠতি অভিজাত এলাকার মতোই এখানকার এলিটরা নিতান্তই ছাপোষা টাইপের। ফ্রি টাইমে নিজেদের নানা রকমের অর্জন আর অপ্রাপ্তি নিয়ে আলোচনায় তারা আগ্রহী। তাদের দেশভাবনা অনেকটাই ইন্টেলেকচুয়াল ফ‍্যাশন। এবং এর মূল এজেন্ডা হলো বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষকে নিয়ে নিম্নরূচির লোকদের মতো খিস্তি-খেউড় করা। বিশ্বাস্য না হলেও এটি সত্য, এখানে কোনো বইয়ের দোকান নাই। অথচ, এখানকার যে কোনো মুদি দোকানে দামী ও ‘ভালো’ জিনিসগুলো কিনতে পাওয়া যায়।

এখানকার এটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এখানে বসবাসকারী শিক্ষকদের প্রায় অর্ধেকই হচ্ছে নিয়মিত বা প্রায়-নিয়মিত মুসল্লী। এ’দিক থেকে, বাংলাদেশের কোনো সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক‍্যাম্পাসে এমন কনসলিডেইটেড ও কোয়ালিটেটিভ কমপোজিশন বোধ হয় নাই। তারা যার যার ডিসিপ্লিনের ব্যাকগ্রাউন্ড হতে ইসলামকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শক্তিশালী করবেন, এমনটাই তো ছিলো প্রত্যাশা। না, বাস্তবচিত্র এর উল্টা। অনিচ্ছুক ঘোড়াকে জোর করে পানি খাওয়ানোর ব্যর্থতার মতো উনাদেরকে দলীয় মনোবৃত্তির বাইরে স্বাধীন চিন্তা ও ক্রিটিক্যাল ডিসকাসশনের সিস্টেমে আনা যায় নাই। মসজিদের সামনে সিসি ক্যামরার নীচে দাঁড়িয়ে পেপার ও ফেইসবুক পর্যালোচনার বাইরে কোনো বিষয়ে একাডেমিক দৃষ্টিভংগী হতে সিরিয়াসলি এনগেইজ হতে উনাদেরকে দেখা যায় না।

এখানকার মসজিদটিতে এসি লাগানো হয়েছে। দুই ফুট বাই দুই ফুট টাইলস তো আছেই। তাবলীগের লোকেরা এখানে নিয়মিত বয়ান করে। এটুকুর বাইরে এই ‘সংগঠিত মসজিদটিতে’ ইসলামের খেদমত হিসাবে কোনো সার্ভিস চালু নাই। তেমন কিছু করার সুযোগও এখানে নাই। বাংলাদেশের যে কোনো মসজিদের মতোই এটি শুধুমাত্র নামাজের জায়গা। তাও শুধু পুরুষ মুসল্লীদের। অন্য কোথাও না হোক, নারীদের প্রবেশাধিকার, পাঠাগার, কোরআন ক্লাস, সেমিনার, প্রদর্শনী, বাচ্চাদের খেলার জায়গা (kids’ corner) ইত্যাদি ইত্যাদি ইস্যুতে অন্তত এখানে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষিতদের এই এলাকার মসজিদটাকে সোশ্যাল কানেকটিভিটির হাব তথা মডেল হিসাবে গড়ে তোলার কথা এখানকার প্রফেসর স্যারেরা কখনো ভাবেন না।

জানি, কেউ কেউ বলবেন, এখন পরিস্থিতি প্রতিকূল। ইত্যাদি। এই প্রতিকূলতা তথা নিরাপত্তা-ঝুঁকির অজুহাত খুবই ঠুনকো। বাস্তবতা হচ্ছে, বিদ্যমান এই ‘প্রতিকূলতা’ যতটা ইসলামের জন্য প্রযোজ্য, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি বিশেষ একটা ইসলামী রাজনৈতিক দলের জন্য প্রযোজ্য। এটি আসলে রাজনীতির খেলা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ইসলাম এখনো আমাদের মূলধারার সামাজিক শক্তি। দলীয় চশমা খুলে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে তা তারা অনায়াসেই বুঝতে পারবেন। অতীতে যখন অপরিমেয় অনুকূলতা ছিলো তখনও দলীয় স্বার্থের বাইরে সমাজের সাধারণ স্বার্থে তেমন কিছু করার তওফিক তাদের হয় নাই, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিশ্চিত বলতে পারি, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য কোনো অনকূল পরিবেশেও তারা দলীয় স্বার্থ বিবেচনার উর্দ্ধে উঠে নিছক ইসলামের স্বার্থে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু করতে সক্ষম হবেন না।

অবদান রাখতে পারা, দায়িত্বপালন করা, এক কথায় কিছু করা বা করতে পারা, এটি যতটা সামর্থ্যের তারচেয়ে বেশি মানসিকতা ও চর্চার ব্যাপার। সব ক্ষেত্রেই দেখবেন, যারা করে তারা সব সময়েই কিছু না কিছু করে। কিছু করার উদ্যোগ ও ঝুঁকি নেয়ার বিষয়ে যারা পিছটান, অলওয়েজ লিপ সার্ভিস বা বকোয়াজগিরি যাদের স্বভাব, দেখবেন সবচেয়ে সম্ভাবনাপূর্ণ সময়েও তারা উদ্যোগ নেয়ার মতো কোনো কিছু খুঁজে পায় না। অলস, অনিচ্ছুক ও স্বার্থবাদীদের দেখবেন, তাদের অজুহাতের অভাব নাই, অভিযোগের তাদের শেষ হয় না।

এখানকার নাস্তিক, সেমিনাস্তিক, কেমন যেন প্রমিত ভাষায় সব সময়ে ‘কাব্য করে কথা বলা’ প্রগতিশীল ও সেক্যুলারদের বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা শুন্যের কাঁটা পেরিয়ে এখন অনেকখানি নেগেটিভ। নেগেটিভ এ কারণে বললাম, তারা যে মুক্ত জ্ঞানচর্চার কথা বলে তাতে ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ নাই। ভিন্নমত শোনার সময় তাদের নাই। ভিন্নমত প্রকাশের ন‍্যূনতম স্বাধীনতা কাউকে দিতে তারা নারাজ। পূর্বেকার খ‍্যাতিমান শিক্ষকেরা চলে যাওয়ার পর ক‍্যাম্পাসে বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার পুরো ব্যাপারটা এখন চরম দলীয়করণের রাহুগ্রাসে বিলুপ্ত। বামপন্থী আঁতেলেরা সুযোগ পেলেই ‘ধর্ম-ব‍্যবসায়ী’ হুজুরদের নির্দয় সমালোচনা করেন। অথচ তারা নিজেরাই যে দিনশেষে এক একজন ধান্দাবাজ বুদ্ধি-ব‍্যবসায়ী আপদমস্তক বুর্জোয়াতে পরিণত হয়েছেন তা তারা নিজেরা কতটুকু বুঝতে পারেন, জানি না।

একটা অভিজাত আবাসিক এলাকায় যেসব ন্যূনতম সুবিধা থাকা জরুরী সেগুলো এখানে উল্লেখযোগ্য হারে অনুপস্থিত। এ নিয়ে কথা বলারও কেউ নাই। সবাই বড় বড় পদ, পদবি, অবস্থান ও স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত। এখানে অভিজাত লোকেরা থাকে, শুধু এই অর্থে একে অন্যতম অভিজাত এলাকা বলা যেতে পারে।

এটি হতে পারতো দেশের জন্য মুক্ত জ্ঞানচর্চার একটা মডেল। তা না হয়ে এটি হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক শুন্যতার একটা বিরান ভূমি। সংশ্লিষ্ট কোনো প্রশ্নের জওয়াব পাওয়ার জন্য কারো সাথে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা মাঝে মাঝে খুব অনুভব করি। সাহস হয় না, তেমন কাউকে জিজ্ঞাসা করি। অতীত সম্পর্কের কারণে কেউ কিছুটা রেসপন্স করলেও যেমনটা আশা করি, তেমনভাবে এনগেইজ হন না। গবেষণা ও শিক্ষাদান উনাদের পেশা। লক্ষ্য হলো পদোন্নতি। আখেরে বেতনবৃদ্ধি। অর্জিত জ্ঞানকে যদি তারা আপন করে নিতেন তাহলে এতটা নির্লিপ্ত হওয়া তাদের পক্ষে কখনো সম্ভব হতো না।

সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে বৈষয়িক সুবিধার বাইরে প্রচণ্ড ভাললাগা বা passion’এর পর্যায়ে নিয়ে যায়। বলাবাহুল্য, passion আর profession – দু’টা আলাদা বিষয়। এর একটি অন্যটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একটির ওপর ফোকাস করলে অন্যটা ঝাপসা হয়ে পড়বে। এমন কি এর একটা অন্যটাকে হত্যাও করতে পারে।

উর্বর নারী যেমন সন্তান ধারণ করতে চাইবেই, সন্তান ধারণ করলে যেমন করে সে মাতৃত্বকে প্রকাশ করবে বা করতে বাধ্য হবে, সন্তানকে যেমন করে সে নিজের হিসাবে ক্লেইম করবে, রক্ষা করবে, লালন-পালন করবে, তেমন ধরনের ব্যাপার হলো জ্ঞানপিপাসুর হৃদয়, অর্জিত জ্ঞান ও এর কর্মগত বহিঃপ্রকাশ বা বাস্তবায়নের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। নিছক দক্ষতা নয়, মুখস্তবিদ্যা নয়, যে জ্ঞান সত্যিকারের জ্ঞান, তা সক্রিয় হয়ে পড়া পারমাণবিক শক্তির মতো অদম্য। যে দেশের বুদ্ধিজীবীরা নির্লোভ জ্ঞানপিপাসু নয়। যারা জ্ঞান আহরণ ও বিতরণকে আর দশটা ব‍্যবসার মতো ব্যবসা তথা নিছক বৈষয়িক লাভ-ক্ষতির দৃষ্টিতে দেখে, সে দেশের অবস্থা কেন এর চেয়ে উন্নততর হবে, তা আমার বুঝে আসে না। কথায় বলে, মাছের পঁচন মাথা থেকে …।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *