মেডিটেশন ও ইসলাম

মেডিটেশন কি ইসলামবিরোধী?’ আমার সাম্প্রতিক এই লেখাটির প্রতিক্রিয়ায় একজন বিজ্ঞ পাঠক একটা স্ট্যাটাস দিয়ে সেখানে আমাকে ট্যাগ করেছেন। আমার লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং বিষয়টাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নিজের স্বাধীন মতামত প্রকাশ করার জন্য, বিশেষ করে এ বিষয়ে আমার আরো এক্সক্লুসিভ মন্তব্য জানতে চাওয়ার জন্য উনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তিনি বলেছেন “আমার মতে নামাজকে মেডিটেশন মনে করাই অধিক যুক্তিযুক্ত। মেডিটেশনের মাধ্যমে শুধু সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যই অর্জন হয় না, মানসিক প্রশান্তিও আসে।”

আমি উনার কথার দ্বিতীয় অংশের সাথে পুরোপুরি একমত। ইবাদত বলতে আমরা যা বুঝি সেগুলি ছাড়াও পূজা-অর্চনা, আরাধনা ও একাগ্রতা, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস ইত্যাদি চর্চা ও গবেষণার নানা রকম পথ ও পদ্ধতিতে মানুষ সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসের কাছাকাছি যাওয়া অর্থে সান্নিধ্য অর্জন করতে পারে।

সমস্যা হলো, এর কোনোটাই কিন্তু মানুষকে ঈমানদার বানাতে পারে না। অতীব দুঃখজনক হলেও সত্য– ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চা করে দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ স্রষ্টার অস্তিত্ব যে আছে, থাকাটাই যে যুক্তিযুক্ত, তা বুঝতে পারে, স্রষ্টা প্রদত্ত নিয়ামতের গুরুত্ব অনুধাবনের কারণে তাঁর প্রতি অনুগত হওয়ার নিকটবর্তী হতে পারে, স্রষ্টা স্বয়ং পরম দয়াময় হওয়ার কারণে তাঁর অপরিসীম রহম দ্বারা নিজেদেরকে সিক্ত ও ধন্য করতে পারে, কিন্তু তাঁকে যেভাবে মানা দরকার, যেভাবে তাঁর উপরে ঈমান আনা দরকার, সে পর্যায়ে তারা পৌঁছাতে পারে না।

এ পর্যায়ে আমাদেরকে এই কথাটা স্মরণ রাখতে হবে, ইসলাম নিছক আধ্যাত্মিকতার কোনো ব্যাপার না। যদিও ইসলামে আধ্যাত্মিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে, কারো আত্মিক উন্নতি হওয়া মানে এই নয় যে সে আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ হলো। কারো উচ্চতর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা অর্জন করার মানে এই নয় যে, যেমন ধরনের মানুষকে ইসলাম একজন ভালো মানুষ বলে, সে তা হলো। ইসলামের দৃষ্টিতে সত্যিকারের ভালো মানুষ হওয়ার প্রাথমিক পূর্বশর্ত হলো ইসলাম গ্রহণ করা।

ড. মো. মুজিবুর রহমান রচিত ‘কোরআনের চিরন্তন মু’জিযা’ বইটির শুরুর দিকে ভণ্ড নবীদের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। একজন ভণ্ড নবী ছিল আল আসাওয়াদুল আনসি। সে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের বিভিন্ন খবর তাদেরকে না দেখেই বা সংশ্লিষ্ট জায়গায় উপস্থিত না থেকেও বলে দিতে পারতো।

আরেকজন ভণ্ড নবী ইবনে সাইয়াদের সাথে মুহাম্মদের (সা) একটি সাক্ষাতের বর্ণনা সেখানে আছে। ইবনে সাইয়াদ তার অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ দেয়ার জন্য মহানবীকে (সা) বললো, তুমি তোমার মনের মধ্যে একটা কিছু স্মরণ কর। আমি বলে দিচ্ছি, তুমি আসলে কী স্মরণ করেছ। এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (সা) সূরা দুখানের ১০ নম্বর আয়াতটি যেটার মধ্যে ‘দুখান’ শব্দটা আছে সেইটা স্মরণ করে তাকে বলতে বললেন। তখন সে বলল, তুমি যা স্মরণ করছ সেখানে ‘দুখ’ শব্দটি আছে। নবী হিসেবে রাসূলুল্লাহর (সা) অন্তর আল্লাহ তায়ালার বিশেষ সুরক্ষার মধ্যে থাকার কারণে সে পুরো আয়াতটি বলতে সক্ষম হয় নাই।

এই ধরনের আরো অনেক ঘটনা আমরা বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন কালে, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন সুফি-ঋষি-দরবেশ-পুরোহিত-পণ্ডিত বা সাধারণ মানুষদের মধ্যেও মাঝে মাঝে দেখতে পাই। ছাত্রজীবনে আমার কাছে একটা বই ছিল। এখন সেটা হারিয়ে ফেলেছি। যেটার বাংলা অনুবাদের শিরোনাম ছিল খুব সম্ভবত ‘জিন ডিকসন ও তার ভবিষ্যদ্বাণী’। জিন ডিকসন যখন কারো সাথে হাত মিলাতেন তখন মাঝে মধ্যে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভবিষ্যৎ তাৎক্ষণিকভাবে বলে দিতে পারতেন।

তিনি কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তৎকালীন সময়ের বড় বড় রাজনীতিবিদ এবং জাতীয় ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে তিনি যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সেগুলোর সবই ফলে গিয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি কীভাবে এটি পারেন সেটা তিনি জানেন না। সব সময়ে যে তিনি সেটা পারতেন এমনও নয়। কারো সাথে হ্যান্ডশেক করার পর হঠাৎ করে তার কাছে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে কিছু একটা মনে হতো। এটাকে আমরা এক ধরনের ইনটুইটিভ নলেজ বা স্বজ্ঞাত জ্ঞান বলতে পারি।

আমি উক্ত সম্মানিত পাঠকের এই কথার সাথে একমত যে মেডিটেশন, ধ্যান ও পূজা-অর্চনা তথা কোনো বিষয়ে গভীর মনোনিবেশের মাধ্যমে আমাদের মানসিক প্রশান্তি আসে এবং সেটা অনেক গভীরও হতে পারে। তাতে কী? তাতে করে কি সেটি নামাজের সমতুল্য হলো?

Multiple realizability বলে একটা কথা আছে। আমি এটি পেয়েছি মনোদর্শনের বইয়ে। এর মানে হলো, কখনো কখনো বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা একই বিষয় বা ফলাফলকে নানাভাবে পেতে পারি। এর মানে এই নয় যে সেই বিভিন্ন পথ বা পদ্ধতিগুলি আদতে এক ও অভিন্ন। যেমন নামাজের মাধ্যমে আমরা এক ধরনের প্রশান্তি লাভ করি। এটি অন্যান্য আরো বিভিন্ন ভাবেও আমরা লাভ করতে পারি। যারা নামাজ পড়ে তারা আল্লাহর ইবাদত হিসেবে সেটি করে। মানসিক প্রশান্তি হলো সাপ্লিমেন্টারি অ্যাচিভমেন্ট।

সমস্যা হলো, আমরা নামাজ কেন পড়ি, সেই বিষয়টা সম্ভবত লেখকের কাছে পরিষ্কার নয়। এ পর্যায়ে কেউ বলতে পারেন, আপনি অত্যন্ত সিলি একটা কথা বললেন। আমরা তো জানি মুসলমানরা নামাজ পড়ে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য, যেটা আপনি নিজেই একটু আগে বললেন। আমি উনাকে আবারো বলতে পারি, আল্লাহর ইবাদত আমরা কেন করি? প্রত্যুত্তরে যে কোনো পাঠক বলতে পারেন, এটাও একটা সিলি কোয়েশ্চন। কেননা, আল্লাহর ইবাদত মানুষ করে এ জন্য যে আল্লাহ সেটা করতে বলেছেন। কারণ তিনি বলেছেন, তাতে করে তিনি সন্তুষ্ট হন। এসব বর্ণনা কোরআন-হাদীসের মধ্যে আছে।

লেখক যে বিষয়টা সম্ভবত খেয়াল করেন নাই সেটি হচ্ছে, আল্লাহ মানুষকে ইবাদত করতে বলেছেন এবং করলে তিনি সন্তুষ্ট হন, না করলে অসন্তুষ্ট হন, এই সবকিছু মানুষেরই ভালোর জন্য। আল্লাহ কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, এইসব ইবাদত, আমাদের যা কিছু করা, এগুলোতে তাঁর কিছু আসে যায় না। আমরা যখন তাঁর নামে পশু জবেহ করি, কোরবানী করি, তিনি বলেছেন, এগুলোর কোনো কিছুই তাঁর কাছে পৌঁছে না। তিনি শুধু মানুষের নিয়তটাই দেখেন।

আমরা নামাজ পড়ি মূলত আল্লাহর কাছে নিজেকে সারেন্ডার করার নিদর্শন হিসেবে। এর মাধ্যমে আমরা আধ্যাত্মিক উন্নতি ও মানসিক প্রশান্তিসহ আরো যা কিছু পেয়ে থাকি সেগুলো হচ্ছে উপরি পাওনা। কেউ যদি আল্লাহর কাছে নিজেকে সারেন্ডার করার ঐকান্তিক মনোভাব ছাড়া নামাজ পড়ে তার এইসব উপরি পাওনার সবগুলোই কমবেশি অর্জিত হবে। শুধুমাত্র এতটুকু ছাড়া যে, এটি আসলে নামাজই হবে না।

***

এরপরে লেখক প্রশ্ন করেছেন, “ইবাদত দিয়ে সৃষ্টিকর্তা কী করবে? আমারই বা কী উপকার হয়?”

হ্যাঁ ভাই, আপনার কথা ঠিকই। ইবাদত দিয়ে সৃষ্টিকর্তার কিছুই করার নাই। কারণ তাঁর তো কোনো অভাব নাই যে তিনি আমাদের ইবাদত বা এ ধরনের কোনো কিছু দিয়ে সেটি পূরণ করবেন। মহান সৃষ্টিকর্তা সদা স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কারণে এবং তিনি ছাড়া বাদবাকি সবকিছু তাঁর মুখাপেক্ষী হওয়ার কারণে এমন কোনো কিছু তাঁর দরকার নাই যেটা তিনি নিজের অভাব পূরণ করার জন্য কাজে লাগাবেন। যিনি কারো কাছ থেকে কোনো কিছু পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল, তিনি তো আদতে সৃষ্টিকর্তাই হতে পারেন না। তাই তো? সৃষ্টিকর্তা at the very first place সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, জাগতিক যে কোনো প্রয়োজনের ঊর্ধ্বতন ‘একটা কিছু’ হওয়া।

এবার আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে আসেন। সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করার মাধ্যমে যিনি সৃষ্ট তিনি কৃতার্থতা লাভ করেন। সৃষ্টিকর্তা-সৃষ্টজীব বা পরমসত্তা-ব্যক্তি/বস্তুসত্তা – এই ফরম্যাটের সম্পর্কই আমাদেরকে বলে দেয়, ইবাদত করলে আমাদের কী লাভ। আমরা ইবাদত করি আমাদের লাভের জন্য, আমাদের সুবিধার জন্য। আমাদের করণীয় কর্তব্য ও দায়িত্ব এবং আমাদেরকে ‘আমরা বা আমি’ হিসেবে সৃষ্টি করার জন্য কৃতজ্ঞতা কিংবা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমরা স্রষ্টার আরাধনা করি। আমাদের কাণ্ডজ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেক মোতাবেক আমাদের দিক থেকে এটা কি যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত নয়?

হ্যাঁ, স্রষ্টা কেন এটা করেছেন? কেন এভাবে না করে অন্য কিছু করলেন না? কিছু না করলেই বা কী সমস্যা ছিল? এই ধরনের প্রশ্ন যে কেউ তুলতে পারেন। এ নিয়ে আপনি যতই বুঝার চেষ্টা করেন না কেন, শেষ পর্যন্ত আপনি বা যে কেউ এই উপসংহারে আসতে বাধ্য, এগুলো হচ্ছে নিতান্তই বাহুল্য প্রশ্ন। কেননা স্রষ্টা কী করতে পারতেন তা নিয়ে আমরা ভাবিত হয়ে স্রষ্টার কর্মকাণ্ডকে যাচাই বা বিচার করতে যাওয়া এক ধরনের ক্যাটেগরিক্যাল মিসটেক বা শ্রেণীগত অনুপপত্তির উদ্ভব ঘটায়।

এ পর্যায়ে আমি সংশ্লিষ্ট লেখককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলতে চাই, যেটি অনেকে না বুঝলেও অন্ততপক্ষে একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে তিনি বুঝবেন। কথাটি হলো গডকে আমরা যেভাবে মানি, যেই গডের ওপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি, তিনি হচ্ছেন এক অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয় সত্তা। আর যেই সৃষ্টিকর্তাকে আমাদের দিক থেকে নানা পরিচয় ও বিশেষণে আমরা জানি তিনি হচ্ছেন একজন জ্ঞেয় এবং জ্ঞাত সত্তা। কথাটা ইংরেজিতে বললে এভাবে বলা যায় the God that we just believe, from His nowhere point of view, is an unknown and unknowable entity. But the very God whom we deal with, from our worldly perspective, is knowable and known entity.

এই কথাটিকে আমি আমার অন্যত্র বক্তব্য বা লেখায় বলেছি সৃষ্টিকর্তাকে জানা ও মানার জন্য দুইটা কনটেক্সট আছে:

(১) from world to God এবং

(২) from God to world

এর মানে এই নয় যে পরমসত্তা বা খোদা তায়ালা দুজন বা তাঁর দুইটি বহিঃপ্রকাশ। বরং খোদা তায়ালা হলো এক ও অদ্বিতীয় এক পরমসত্তা, যাকে আমরা আমাদের দিক থেকে আমাদের মতো করে জানি। যেটি আমাদের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক। পার্টিকুলার হিসেবে আমাদের আওতার বাইরে আউটদেয়ার যে রিয়ালিটি আছে সেই noumenal বা unknown and unknowable পরমসত্তার দিক থেকে ব্যাপারটা কী, সেটা আমরা ধারণা বা ধারণ করতে পারি না। না পারারই কথা।

এমতাবস্থায় আমরা আমাদের সীমিত জ্ঞানে যা বুঝি সেটাকেই যদি ফাইনাল বলে মনে করি তাহলে তা হবে আমাদের বুঝজ্ঞান বা কাণ্ডজ্ঞানের খেলাফ। যেটা আমরা যতটুকু বুঝি সেটা তো আমাদের দিক থেকে ঠিকই আছে। বরং যেটা বুঝি না, যেটা আমাদের আওতার বাইরে সেটা নিয়ে ভাবিত না হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হায়ার অর অ্যাবসলিউট অথরিটি আমাদেরকে যা কিছু করতে বলে, নির্দ্বিধায় সেটা মেনে নেওয়াই হচ্ছে যুক্তি, বুদ্ধি ও বিবেকের দাবি। হরহামেশাই এটি আমরা করে থাকি। এই জন্য জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে ইনটুইশন এবং অথরিটিই হচ্ছে আল্টিমেইট সোর্স অফ নলেজ এন্ড জাস্টিফিকেশন।

***

সংশ্লিষ্ট লেখক এরপরে বলেছেন, “ইসলামে কোনো কিছুর কারণ না খুঁজে পালন করতে হবে। প্রশ্ন করা যাবে না। আপনার কি মনে হয় সেটা যুক্তিযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি?”

আপনার এই প্রশ্নের উত্তর একই সাথে হ্যাঁ এবং না দুটোই সঠিক। যে বিষয়টি আমাদের আওতাধীন সেটি নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলতেই পারি। ভুল মনে করলে বরং প্রশ্ন তোলাই যুক্তিসঙ্গত বা উচিত। কিন্তু যে বিষয়গুলো আমাদের আওতার বাইরে সেগুলো নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলি না। না তোলাটাই যুক্তিসঙ্গত বা উচিত। যেমন করে ডাক্তারের কাছে গিয়ে আমরা আমাদের রোগের কথা বলি এবং তার পরামর্শ চাই। এরপর তিনি যা পরামর্শ দেন সেটা নির্দেশের মতো করে মেনে নিয়ে আমরা ফার্মেসী থেকে on blind and good faith ওষুধগুলো কিনে নিয়ম মোতাবেক খেতে থাকি।

রোগীরা যদি ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন যাচাই করা শুরু করে তাহলে তো আমাদের প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থাপনা ও রোগ নিরাময় পদ্ধতি ভেঙে পড়বে। এতে নগদ ক্ষতি হবে রোগীর। ডাক্তার না হয় অন্য কোনো পেশা বেছে নিবে। কিন্তু রোগীদের কী হবে? তাই, ডাক্তারের কথা দৃশ্যত অন্ধভাবে চোখ বুঁজে মেনে চলা ছাড়া রোগীর কোনো গত্যন্তর নাই। এভাবে আমাদের জীবন চলার পথে আমরা প্রতিনিয়ত যাচাই বাছাই করা ছাড়া, যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে পরখ করা ছাড়া নিছক আস্থা কিংবা অপারগতার কারণে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করি। বিশ্বাস করি। আপনি যখন গাড়িতে উঠে বসেন তখন আপনি ড্রাইভার এবং গাড়ি ইত্যাদি সবকিছুর ওপর বিশ্বাস করে নিশ্চিন্তে ভ্রমণ করেন। এ রকম কত উদাহরণ আমি দিবো! এ বিষয়ে শুধুমাত্র এ কথাটাই বলতে চাইছি সাধারণত যে কথাটা এ প্রসঙ্গে আমি বলে থাকি। সেটি হলো, we have to believe to live, no matter what we believe।

এ বিষয়ে আজকের আলাপ শেষ করার আগে যারা এটি পড়ছেন তাদের সবার উদ্দেশ্যে আমি এ কথাটাও বলতে চাই, একজন মুসলিম জীবনে কোনো কিছুই ইসলামের আওতার বাইরে করতে পারে না। ব্যক্তিগত জীবন থেকে সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক, জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক তথা এমন কোনো বিষয় একজন মুমিনের জীবনে হতে পারে না যেখানে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ইসলামের আওতার বাইরে গিয়ে জীবন যাপন করেন।

অপরদিকে, বাস্তব অবস্থা হচ্ছে আমরা এক মুহূর্ত কেন, বহু কিছুই ইসলামের আওতার বাইরে গিয়ে আমাদের মর্জি মোতাবেক করি। ইসলামের দৃষ্টিতে সেটি অননুমোদিত, অন্যায় তথা পাপ বা গুনাহ। এই জন্য আমরা প্রতিনিয়তই তওবা করি।

একজন মুসলিম তথা স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পিত একজন ব্যক্তি হিসেবে জীবনের সবকিছু আমরা ইসলাম মোতাবেকই করতে বাধ্য। এর মানে এই নয় যে আমরা বাদবাকি বৃহত্তর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবো বা থাকতে বাধ্য। এখানে যে আলোচনা আমি এতক্ষণ করলাম এবং এ বিষয়ে আপনাদের মধ্যে যত প্রশ্ন এবং কথাবার্তা হতে পারে এই সব কিছুর গোড়ায় রয়েছে একটা গোড়ায় গলদ। সেটি হচ্ছে ইসলাম সম্পর্কে অমুলক ভুল ধারণা।

এক ধরনের সেক্যুলার সেটআপের মধ্যে বড় হওয়ার কারণে আমরা মনে করি ইসলাম একটি ধর্ম। তাই, কিছু ধর্মীয় বিষয়াদি ছাড়া বাদবাকি সমাজ ও রাষ্ট্র জীবন তথা বৃহত্তর কর্মকাণ্ডসমূহ ভিন্নতর কোনো কিছু। এমন মনে করা হয় যে এই বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র জীবন বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যদি আমরা ইসলাম নামক এই ধর্মকে নিয়ে আসি তাহলে ধর্ম ও রাজনীতির সংমিশ্রণের যেসব সমস্যা, সেগুলোতে আমরা আক্রান্ত হবো।

আপাতদৃষ্টিতে কথাটা ঠিকই আছে। কারণ ধর্মকে সব বিষয়ে নিয়ে আসা বা সবকিছুকে ধর্মভিত্তিক করতে চাওয়া, এই জিনিসটা আদতেই ভুল। ধর্ম থাকা উচিত ধর্মের জায়গায়, রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়, অর্থনীতি অর্থনীতির জায়গায়, সংস্কৃতি সংস্কৃতির জায়গায়, বুদ্ধিবৃত্তি বুদ্ধিবৃত্তির জায়গায়।

এখন ইসলামকে যে ঐতিহাসিকভাবে অন্যতম একটি ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, এর ভিত্তি কী? সবাই বলে, আমিও বলি বা এতদিন পর্যন্ত বলা হয়েছে সে জন্য এটা ঠিক – এগুলো তো যুক্তিবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত কোনো ব্যক্তির কথা হতে পারে না। এ নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নাই। কথা এমনি লম্বা হয়ে গেছে। এখানে শুধু এতটুকু বলতে চাই, ইসলাম একটি জীবনাদর্শ, যার মধ্যে রয়েছে মানুষের জীবনে যা যা কিছু প্রয়োজনীয় তার সবকিছু। ধর্ম যার একটি অপরিহার্য বা কেন্দ্রীয় গুরুত্বসম্পন্ন অংশ।

ইসলামকে বিশেষ করে তাওহীদকে যথাযথভাবে বুঝার ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কারণে, ইসলামের নানা ধরনের বিষয়গুলো, বিশেষ করে ইসলামী শরীয়াহ সম্পর্কিত বিষয়গুলো বুঝার ক্ষেত্রে আমাদের নানা ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। মুসলমানেরাই হলো ইসলাম সম্পর্কে মানুষের এহেন ব্যাপক মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের প্রধান কারণ। একজন ইসলাম অনুসারী হিসেবে আপনার-আমার দায়িত্ব হলো ইসলামের ট্রু রিপ্রেজেন্টেটিভ হওয়া।

আর যারা ইসলাম সম্পর্কে জানতে চান, নৈতিকভাবে সৎ একজন গবেষক হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো, এযাবৎকাল লোকেরা কী বলেছে সেটাকে ফর গ্রান্টেড হিসেবে মেনে না নিয়ে ব্যাপারটা আসলেই কী, সেটি নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করা। ইসলামকে এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডিল করলে এ ধরনের অনেক অযৌক্তিক ও হাস্যকর অভিযোগের সারবত্তাহীনতা সম্পর্কে আপনি সহজে জানতে পারবেন।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: “আপনি কি একমত যে নামাজ একটি মেডিটেশনকেন্দ্রিক রিচুয়্যাল?” জনাব আক্কাস আলীর প্রশ্ন।

না। এ বিষয়ে আমি একমত নই যে নামাজ একটি মেডিটেশনকেন্দ্রিক রিচুয়্যাল। বরং আমার মতে নামাজ হচ্ছে একটি ইবাদতকেন্দ্রিক রিচুয়্যাল। মেডিটেশন হচ্ছে এর অন্যতম আউটকাম বা প্রাপ্তি।

নামাজ এবং মেডিটেশনের মধ্যে সম্পর্ক অভিন্নতার (identical relation) নয়, বরং আবশ্যিকতার সম্পর্ক (necessary relation)। অর্থাৎ নামাজ এবং মেডিটেশনের মধ্যে কিছু কমন বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও এগুলো এনটিটি হিসেবে পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র । যেমন, নামাজ ছাড়াও মেডিটেশনের আরো অনেক পদ্ধতি হতে পারে। আবার মেডিটেশন ছাড়াও নামাজের রয়েছে আরো কিছু অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হচ্ছে, আল্লাহর বান্দা হিসেবে নিজেকে স্বীকার করা এবং তাঁর হুকুম-আহকাম ও মহান সত্তার সমীপে কোরআন ও হাদীস নির্ধারিত পন্থায় সর্বপ্রকার কায়মনোবাক্যে আত্মসমর্পণ করা।

নামাজকে মেডিটেশন দিয়ে গ্লোরিফাই করার ব্যাপারটা হচ্ছে একটি ভুল পদ্ধতি। আমরা সহীহ বোখারীসহ বিভিন্ন হাদীসের গ্রন্থে বর্ণিত কিছু হাদীস থেকে জানতে পারি, রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন জোহরের নামাজ দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে ফেলেছেন। তখন যুল ইয়াদাইন নামক একজন সাহাবী উনাকে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর অন্যান্যদের সাথে আলোচনা করে উনি যখন নিজের ভুল সম্পর্কে কনফার্ম হলেন তখন তিনি আবার সবাইকে নিয়ে অতিরিক্ত দুই রাকাত পড়ে সাহু সিজদা করলেন।

এর পাশাপাশি আরেকটি কথা এখানে না বললেই নয়। সেটি হচ্ছে হযরত আলী (রা) সম্পর্কে একটা প্রচলিত বানোয়াট কাহিনী। যার মূল কথা হচ্ছে, কোনো এক যুদ্ধে তাঁর পায়ের মধ্যে একটা তীর বিদ্ধ হলে কোনোমতেই সেটা বের করা যাচ্ছিল না। এমন সময় লোকেরা ভাবলো, আলী যখন নামাযে দাঁড়াবে তখন সেটি খুলতে হবে। সে মোতাবেক আলী (রা) যখন পরবর্তী ওয়াক্তের নামাজ পড়ার জন্য তাকবীরে তাহরীমা বলে নামাজ শুরু করলেন তখন লোকেরা তাঁর পা থেকে তীরটি টেনে বের করতে পারলেন। নামাজে তিনি এতটাই মশগুল হয়ে পড়েছিলেন যে তীর বের হওয়ার কষ্ট মোটেও টের পাননি।

এটি আমি ছোটবেলা থেকে বহুবার শুনেছি। আলীর (রা) আধ্যাত্মিক উচ্চতর পজিশন বর্ণনা করার জন্য এই কাহিনীটি বলা হয়। এটি একটি সম্পূর্ণ বানোয়াট কাহিনী। নামাজে ভুল হওয়া একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। এটি তখনও ছিল, এখনো আছে।

মেডিটেশন বা আধ্যাত্মিকতা বা মনোনিবেশ এগুলো যদি হতো নামাজের মূল বিষয়, তাহলে মসজিদে গিয়ে জনসমক্ষে নামাজ পড়ার প্রচলন থাকত না। প্রদর্শনী আর মেডিটেশন দুটি বিপরীতমুখী ব্যাপার

দেখা যাচ্ছে, আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি উন্নত ব্যক্তিরও কখনো অসম্পূর্ণ অর্থে ভুল ধরনের মেডিটেশন হয়েছিল। নামাজকে যদি আমরা ইবাদত অর্থে গ্রহণ করি তাহলে দেখা যায় রাসূলুল্লাহ (সা) যখন দুই রাকাত নামাজ পড়ে নামাজ শেষ করলেন তখনও তো তাঁর মধ্যে বন্দেগীর অনুভূতি বজায় ছিল। আবার নিছক বন্দেগীর অনুভূতি বা সাবমিসিভনেসই সালাতের সব কিছু নয়।

তাই যদি হতো তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা) জোহরের নামাজের, অন্তত সেই দিন, আরো দুই রাকাত পড়ে চার রাকাতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেন না। তার মানে হচ্ছে, ইবাদত বলতে আমরা যা কিছু বুঝি, নামাজ, রোজা, হজ্ব, বিয়ে ইত্যাদির মধ্যে এসেন্স এবং স্ট্রাকচার, এ দুটো জিনিসই থাকা জরুরি। আর মুয়ামালাত বা সামাজিক সম্পর্ক সম্পর্কিত যেসব বিষয়, সেগুলোতে ইসলামের মূলনীতি বা এসেন্স থাকাটাই যথেষ্ট। বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে যে কোনো ধরনের রিলেশনাল স্ট্রাকচারই উক্ত কাজ সম্পন্ন হওয়ার জন্য অনুমোদিত বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

আসল সমস্যা হলো, নিজেদের প্রচলিত পূর্বধারণার আলোকে কোনো কিছুকে যাচাই করতে যাওয়া নিতান্তই ভুল পদ্ধতি। যাচাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নৈর্ব্যক্তিক বা অবজেক্টিভ হওয়ার দাবি হলো, বিষয়টি আসলেই যা সেটাকে সেভাবেই বিবেচনা করা। মানা, না মানা ভিন্ন বিষয়। যারা জ্ঞানীগুণী এবং বিজ্ঞানপন্থী, তাদের উচিত ইসলামকে ইসলামের মতো করে প্রথমত জানা এবং সেভাবে একে প্রতিপাদন করা। সমর্থন করার বিষয়টি ভিন্ন প্রসঙ্গ।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

Leave a Reply