মাল্টিমিডিয়া স্ট্রিট শো হতে পারে একটি সফল সাংস্কৃতিক-বৃদ্ধিবৃত্তিক ধারা

মাল্টিমিডিয়া স্ট্রিট শো হতে পারে আমাদের নতুন ধরনের একটা সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা। আমি নিশ্চিত যে, এটি বেশ কার্যকরি হবে। বর্তমানের সর্বাত্মক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এই যুগে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা সহায়ক ও নির্দোষ বিনোদনমূলক মাল্টিমিডিয়া শো-এর মাধ্যমে আমরা অত্যন্ত দ্রুত জনগণের কাছে আমাদের ম্যাসেজ পৌঁছে দিতে পারবো।

যা লাগবে

সারাদেশকে এক একটা অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটা অঞ্চলের জন্য কমপক্ষে দুটি করে সেট তৈরী করতে হবে। প্রতিটি সেটে যা থাকবে-

১. একটা মাঝারি সাইজের ট্রাক ও একটা মাইক্রোবাস বা কার। ২. বড় আউটডোর স্ক্রিনসহ একটা ৪৫০০ হতে ৫২০০ লুমেনের প্রজেক্টর। ৩. মাইক্রোফোন সহকারে একটা কমপক্ষে এসপি-৩ মানের সাউন্ড সিস্টেম। ৪. একটা ল্যপটপ বা ডিভিডি প্লেয়ার। ৫. বিদ্যুত সরবরাহের জন্য আইপিএস বা ব্যাটারী। ৬. প্রয়োজনীয় সংখ্যক বই-পত্র। ৭. কমপক্ষে একটা ভিডিও ক্যামেরা।

কাজটা যেভাবে হবে

কাজটা এভাবে হবে যে, আমাদের স্থানীয় লোকদেরকে আগেভাগে অবহিত করে, স্থান বিশেষে ঘোষণা দিয়ে বা না দিয়ে একটা অত্যন্ত ভালমানের ফিল্ম বা ডক্যুমেন্টারি বা টিভি প্রোগ্রাম বা অন্ততঃপক্ষে সাঈদী সাহেবের ওয়াজের মতো কোন কিছু মিনি ট্রাকের সামনের দিকে স্থাপিত বড় পর্দায় দেখানো হবে। সাউন্ড বক্সগুলো ট্রাকের উপরে থাকবে। ট্রাকের পেছন অংশে পাটাতনের উপর প্রজেক্টর বসানো থাকবে। ব্যাটারী সহ সবকিছু ট্রাকের উপরে থাকবে। ট্রাকের দুপাশের ও পেছনের দিকের ডালা নামানো থাকবে। ডালাগুলোতে ও এগুলোর অব্যবহিত উপরে তাক সাজানো থাকবে যাতে বিভিন্ন বইপত্র ও ডিভিডি প্রদর্শনী, বিক্রয় ও বিতরণের জন্য রাখা হবে। প্রদর্শনী ১৫-২০ মিনিট হতে সর্বোচ্চ এক ঘন্টা চলবে। প্রদর্শনীর শুরু বা শেষ বা উভয়ভাগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি ভিডিও করা হবে। এতে সর্বমোট ৪/৫ জন লোকের দরকার হবে। এসব অনুষ্ঠান কনভেনিয়েন্টলি যে কোন সময়ে হতে পারে।

নিরাপত্তা সমস্যা

ইসলামী আন্দোলন বললেও বর্তমান সংগঠন-কাঠামোতে সব কিছুকে রাজনৈতিকীকরণের  কারণে ও কেন্দ্র-নির্ভর সংগঠন ব্যবস্থার ফলে এ মুহুর্তে এ ধরনের কোন আয়োজনে এলাকা ভেদে বিভিন্ন মাত্রার নিরাপত্তা সংকট দেখা দিতে পারে। আমার প্রস্তাব হচ্ছে যেখানে যেখানে সম্ভব সেখানে আমরা এটি সীমিত আকারে করতে পারি। নাট্য দল গঠন, আবৃত্তি ও সাহিত্য সংগঠন গড়ে তোলা, টিভি স্টেশন ও মিডিয়া হাউজ প্রতিষ্ঠা ইত্যকার প্রচলিত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করার পাশাপাশি ব্যাপকভাবে মাল্টিমিডিয়া স্ট্রিট শো’র মতো ব্যতিক্রমি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনকে ঘিরে একটা সাংস্কৃতিক আবহ তৈরী করা সম্ভব হবে। রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতা হাতে নিয়ে সংস্কৃতি সহ সব কিছু করার যে ঐতিহাসিক ভুল থিসিস তা পরিত্যাগ করে এমন ধারায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যেন তা একাধারে রাজনৈতিক, সমাজ-সহায়তামূলক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় গড়নের হয়। যারা রাজনীতি করবে তাঁরা বাহ্যতঃ স্বতন্ত্রভাবেই কাজ করবে। যারা ধর্মীয় তথা দ্বীনি দিকে আঞ্জাম দিবে তাঁদেরকে সেদিকেই মনোবিবেশ বা ফোকাস করতে হবে। আর যারা সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করবে তাঁরা এর পাশাপাশি সমাজসেবা ও ইন্টেলেকচুয়াল ক্ষেত্রেও প্যাকেজ বা ককটেল হিসাবে কাজ করবে বা করতে পারবে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক এই প্যাকেজ-প্রোগ্রামে কোন প্রকারে রাজনীতি ঢুকানো যাবে। বলা বাহুল্য, এ সবই হবে ইসলামকে একটা সামাজিক মতাদর্শ হিসাবে বিবেচনা করে। এলাকাভেদে ইসলামকে প্রকাশ্যে আনা হবে অথবা হবেনা।

উদ্দীষ্ট লক্ষ্য বা টার্গেট গ্রুপ

এই ধারার লক্ষ্য হলো চলমান রাজনৈতিক বিরোধকে এড়িয়ে দেশের মধ্যে ইসলামের পক্ষে একটা সাংস্কৃতিক গণজাগরণ সৃষ্টি করা। আমার ধারনায় কিছু কট্টর বিরোধিতাকারী ছাড়া দেশের অধিকাংশ মানুষ এটিকে সমর্থন করবে। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে আমরা সারা দেশে স্বতন্ত্র টিভি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারি। যাতে খুব খারাপ চ্যানেলগুলোকে বাদ দিয়ে চ্যানেল ডিস্ট্রিবিউট করা হবে।

চ্যানেল ডিস্ট্রিবিউশান নেটওয়ার্ক ও সিনেমা হল বানানো

আমি স্বপ্ন দেখি, দেশের প্রথম থ্রি-ডি সিনেমা হলটি ইসলামী আন্দোলনের কোন লোক স্থাপন করবে। ক্রমান্বয়ে দেশের সব ভালো ভালো প্রেক্ষাগৃহগুলো পরিচিত ইসলামি লোকদের মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত হবে। এটি অসম্ভব মনে হলেও এ ছাড়া কোন গত্যন্তর নাই। সাইয়েদ হাসানুল বান্না ও ফতেউল্লা গুলেন – উভয়েই একটা কফি হাউজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাজ শুরু করেছিলেন। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী শুরু করেছিলেন পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে। এসবই আমরা জানি। তাহলে কেন করি না? কারন, সব বিষয়ে কালেক্টিভ র‍্যাশনালিটি ও কালেকটিভ রেসপনসিবিলিটিতে বিশ্বাস করি। আমরা সব সময়ে এমনকি স্বীয় ব্যক্তিগত দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্র ও বিষয়গুলোকেও ‘আমরা’ ও ‘আমাদের’ হিসাবে বিবেচনা করি। ফরযে কেফায়াটা দ্বিতীয় ক্যাটাগরীর ফরজ হলেও রাজনীতিকে এড়িয়ে গিয়ে সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তি ও সামাজিক-সহায়তামূলক কাজে সর্বাত্মকভাবে আত্মনিয়োগ করাটা এখন আমাদের উপর ফরযে আইন হয়ে গেছে।

সময় নাই, সময় নাই, বসে থাকার সময় নাই

ক্ষুদিত পাষাণ-এর পাগলটি চিৎকার করছিলো, সব ঝুট হ্যায়, সব ঝুট হ্যায়। দেখুন, সমকালীন বিশ্বে ইসলামের মতো আদর্শকে প্রতিষ্ঠার দাবী করাটা রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত এই গল্পের পাগলটার পাগলামির মতো নয় কি? আমাদের সকল কর্মতৎপরতার মাধ্যমে এই পাগলামি-ভাবটা পরিলক্ষিত হতে হবে। বসে থাকার সময় নাই। আপনি যে সাংগঠনিক দায়িত্বেই নিয়োজিত থাকুন না কেন, কোন না কোন ক্ষেত্রে আপনার একান্ত কিছু কর্মক্ষেত্র, অবদান বা প্রচেষ্টা থাকা দরকার। আসুন, সবাই মিলে করি – এমনটা নয়; আপনি নিজেই কিছু একটা অবিলম্বে যতটুকু পারেন, শুরু করেন, এগিয়ে যান। অন্যান্যদের সহযোগিতা সময়ে এসে যাবে। অন্যদের সমযোগিতা ও সমর্থন না পেলেও কি বসে থাকার সুযোগ আছে?

ইক্বামতে দ্বীন কি খেদমতে দ্বীনে পর্যবসিত হয়েছে?

সঠিক ট্রেনে উঠে বসে থাকার মতো ইক্বামতে দ্বীনের ট্যাগ লাগানো সংগঠনে অন্তর্ভূক্ত থাকার অর্ধ-সঠিক, অন্য অর্থে ভুল থিসিস নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। প্রত্যেকেই আমরা এক একটা ফাইটার প্লেন – এটি হতে পারে আপনার মতো যোগ্য লোকের কাজের সঠিক উদাহরণ। ইক্বামতে দ্বীন ও খেদমতে দ্বীনের পার্থক্য সংক্রান্ত প্রপজিশন বা থিসিসটাতে মৌলিক গলদ আছে। সেটি ভিন্ন নোটে আলোচনা করা যাবে। এখানে কমপক্ষে এতটুকুতো বলা যায় যে, আমাদের দেশের ইক্বামতে দ্বীনের স্বঘোষিত আন্দোলন এখন সিয়াসতে খেদমতে দ্বীনের পার্টিতে পর্যবসিত হয়েছে! ঐতিহ্য, আশ্রয় ও গাইড হিসাবে একধরনের parental statusএ এটি থাকুক, এর সাথে আমাদের সম্পর্ক থাকুক ‘তায়া ওয়ানু আলাল বিররি ওয়াত তাক্বওয়া’র ভিত্তিতে। দৈনিক দুঘন্টা কাজে দ্বীন কায়েম হবে না। তাই বলে কোন কাজ না করে বসে থাকাও যাবে না। অনেক সংস্কারবাদী দেখি, যারা কাজ করছেন তাঁদের সমালোচনা করার বাইরে উনাদের আর কোন কাজ নাই। নিজের যোগ্যতাকে ভুলে গিয়ে সংগঠনবাদীতায় আত্মনিয়োগ করা কিম্বা সমালোচনাটাকেই একমাত্র কাজ বানিয়ে নেয়া – দুটাই প্রান্তিকতা, বাড়াবাড়ি ও ভুল।

শেষ কথা

রাজনৈতিক আন্দোলন যা করেছে, সেটার অবদান অমূল্য। যারা সংশ্লিষ্ট তাঁরা এটিতে পরিপূর্ণ কৌশল ও দক্ষতা নিয়োজিত থাকুন। সবাই মিলে রাজনীতি কিম্বা রাজনীতির ফাঁকে ফাঁকে সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সমাজসেবা করার দরকার নাই। এতে শেষ পর্যন্ত রাজনীতিই হয়, অন্যগুলো নিছক রাজনৈতিক প্রয়োজনে প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসাবে ঝুলে থাকে। রাজনীতি মুক্ত নয়, চাই স্বতন্ত্র ধারায় মানব কল্যাণ ও সমাজ-সংশ্লিষ্ট সব ধারায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে ও সমগতিতে (homogeneous pace) কাজ চলুক।বিঃদ্রঃ এক সময়ে সিএসসিএস এর অধীনে ‘ফেয়ার ফিল্ম সোসাইটি’ নামে ইরানি এবং সব রকমেরই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ইত্যাদি খুব করলেও কখনো কখনো এমনও ভেবেছি যে, আমিও আবার অশ্লীলতার প্রসার ঘটানোর জন্য ভূমিকা রাখছি না তো! এসব সাত-পাঁচ ভাবনা ও সহযোগিতাকারী ছাত্ররা চলে যাওয়ার কারনে মাঝখানে ক’বছর বেশ চুপ-চাপ ছিলাম। বর্তমানে দেশে অশ্লীলতার এতটাই প্রসার ঘটেছে যে, এই রোগের জীবাণুর পরিকল্পিত ও স্বল্প মাত্রার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এর প্রাণঘাতি সংক্রমণকে ঠেকানোর কোন বিকল্প এখন দেখছি না। ventilation prevents explosion  এই আপ্ত বাক্যটির সাথে দুটি ঘটনাকে এ ক্ষেত্রে এক্সকিউজ হিসাবে উল্লেখ করতে চাই। একটি শোনা কথা অপরটি কোরআন শরীফের কথা, ব্যাখ্যাটা আমার নিজের (ভুল হলে আল্লাহ মাফ করুন!)শুনেছি, দোযখ হতে কাউকে বের করে দুনিয়ার আগুনে ফেললে সে নাকি ‘আরামে’ ঘুমাবে!? আর, হযরত লূত (আ.) উনার বাড়ি ঘেরাওকারীদেরকে বলেছিলেন, তোমরা এমন কাজ করো না। বরং আমার কন্যারা আছে…..!!!!!????

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *