চরমপন্থার বিরুদ্ধে আমার তাত্ত্বিক লড়াই ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে জবাবদিহিতা

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলনের রূপরেখা - শীর্ষক প্রেজেন্টেশানের অংশবিশেষ
‘ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলনের রূপরেখা’ শীর্ষক প্রেজেন্টেশানের অংশবিশেষ

আধুনিক ইসলামপন্থীদের ক্ষুদ্র একটা গ্রুপ top-down এপ্রোচে দ্বীন-ইসলাম কায়েম করতে চান। টপ-ডাউন এপ্রোচ হলো জোর করে, চাপিয়ে দিয়ে, সশস্ত্র পন্থায় লোকদেরকে ইসলামী শরীয়াহর বিভিন্ন হুকুম-আহকামকে বাস্তবায়নের চেষ্টা বা চিন্তা। সমকালীন প্রেক্ষাপটে এটি নিতান্তই অকার্যকর একটা পন্থা। ইসলাম বরং মধ্যপন্থার (আল-ওয়াসতিয়্যা) কথা বলে। চরমপন্থীরা দেখাতে চান, কোরআন ও হাদীসে জিহাদের কথা আছে। তবে, সেই জিহাদ পরিচালনার জন্য শরীয়াহ সম্মত যে কর্তৃপক্ষ (অথরিটি অর্থে), তা কোথায়? চোরাগোপ্তা হামলা তো জিহাদ নয়। তাছাড়া মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যকার বিবাদ-বিসম্বাদজনিত সশস্ত্র সংঘর্ষও হতে পারে। যেমন, হযরত আলীর (রা) সাথে হযরত আয়িশার (রা) ও মুয়াবিয়ার (রা) যুদ্ধ হয়েছিলো। এগুলোতে কি গনীমত সংগ্রহ করা হয়েছিলো? কাউকে যুদ্ধবন্দী হিসাবে আটক করা হয়েছিলো? না। এমনকি খারেজীদের সাথে যুদ্ধকেও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বলতে যা বোঝায় সে অর্থে গ্রহণ করা হয় নাই। বরং, ফিতনা মোকাবিলায় গৃহীত আইন-শৃংখলা রক্ষার পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিলো।

এখানে আমি ক্বিতাল ফি সাবিলিল্লাহ অর্থে জিহাদের কথা বলছি। এ ছাড়া বৃহত্তর অর্থে সব সংঘর্ষ, এমনকি আমাদের সব সৎকাজই জিহাদ হিসাবে গণ্য। যেমন করে, ইবাদত বলতে আমরা নামাজ-রোজা ইত্যাদিকে বুঝি। যদিও বৃহত্তর অর্থে একজন মুমিনের স্পষ্টত গুনাহর কাজ ছাড়া সব কাজই ইবাদত হিসাবে গণ্য।

আগামী দিনের work for Islam কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে সিএসসিএসের সাইটে আমরা বেশ কয়েক বছর আগে “ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দেলন” শিরোনামে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখা আপলোড করি। সেটিতে এ বিষয়ে ছেচল্লিশটা স্লাইডের সমন্বয়ে একটা পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশানও আপ করা হয়েছিলো। দেখছি, অনেকেই সেটি এক্সপ্লোর করেন নাই। সেখানে আমরা ইসলামী আন্দোলনের উক্ত বটম-আপ এপ্রোচের কিছুটা বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেছি। আজকের দিনে দুনিয়াজোড়া তথাকথিত পলিটিক্যাল ইসলামের যে সর্বশেষ অবস্থা ও ভবিষ্যত পরিণতি বা সম্ভাবনা তার ব্রিফ বাট ক্লিয়ার থিওরেটিক্যাল ডেসক্রিপশান সেখানে আছে। যাহোক, ইসলামের নামে যে চরমপন্থার চর্চার হচ্ছে তার বিরুদ্ধে আমার তত্ত্বাবধানে এই কাজগুলো সম্পন্ন বা প্রমোট করা হয়েছে।

আগ্রহী পাঠকের জন্য রিমাইন্ডার:

১. ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন। বিশেষ করে ‘সমাজ ও রাষ্ট্র’ পয়েন্টটি। সিরিজটির পাওয়ারপয়েন্ট ভার্শন। পিডিএফ ভার্শন।

২. ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ বৃটেনের ইস্ট লন্ডন মসজিদে জুমার খুতবায় ড. জামাল বাদাবী এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। সিএসসিএসের সাইটে সেটি “অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক” শিরোনামে আপ করা হয়েছে।

৩. অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তারিক রমাদান ২০০৯ সালে প্রদত্ত The Scope and Limits of Reforming Islam শীর্ষক একটি বক্তৃতা অনুষ্ঠানে একজনের প্রশ্নের উত্তরে এ বিষয়ে অভিমত তুলে ধরেন। প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে সিএসসিএস-এর পাঠকদের জন্য এটি অনুবাদ করে “মৃত্যুদণ্ডই কি মুরতাদের একমাত্র শাস্তি” শিরোনামে ছাপানো হয়েছে। এ বিষয়ে ফেইসবুকে আমি “ধর্মত্যাগীর শাস্তি, আক্বল-নকল, মক্কীযুগ-মাদানী যুগের পার্থক্য ও সমকালীন বাংলাদেশে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির দায়” শিরোনামে একটা নোট দিয়েছিলাম।

৪. ব্রাসেলসভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ নানা বিষয়ে নিয়মিত গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। ২০০৫ সালের ২ মার্চ তারা ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলামিজম’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। “ইসলামপন্থার সাথে বোঝাপড়া” শিরোনামে এটি আমরা প্রকাশ করেছি। এই প্রতিবেদনে ইসলামী চরমপন্থার মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে তারা তাদের মতো করে পরামর্শ দিয়েছে।

৫. তুরস্ক ও তিউনিশিয়ার সমকালীন অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার উপর আমাদের ধারাবাহিক কাজ রয়েছে। “নয়া তুরস্কের ধর্ম ও রাজনীতি” শিরোনামে একটা বই আমরা বেশ কয়েক মাস আগেই কমপ্লিট করে রেখেছি। আন নাহদার সাম্প্রতিক দশম কংগ্রেসের উপর আমরা যেসব লেখা ছাপাচ্ছি তা মোটামুটি সম্পন্ন হলে আর্টিকেলগুলোরও একটা সংকলন বই আকারে প্রকাশ করা হবে। বলাবাহুল্য, তুরস্ক ও তিউনিশিয়ায় এ পর্যন্ত ‘ইসলামী চরমপন্থা’ পরাজিত এবং সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যাত শক্তি।

৬. র‍্যডিকেলিজমের বিরুদ্ধে কাজ করার পাশাপাশি আমি সর্বপ্রকারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা হতে দূরে থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সূরা তাওবার ১২২ নং আয়াতের আলোকে একজন বুদ্ধিজীবী হতে যা প্রত্যাশিত সে ধারাতেই চলছি। শিক্ষকতা ও সিএসসিএস ভিন্ন আমার আর কোনো আইডেন্টিটি নাই। politics is all bad or politics is all good টাইপের প্রান্তিক মনোভাব হতে আমি মুক্ত থেকেছি। রাজনীতি করার জন্য যারা উপযুক্ত তারা রাজনীতি করবেন বা করা উচিত। সমাজসেবা করার জন্য যারা উপযুক্ত তারা সেটাতেই মনোনিবেশ করবেন। ধর্মপ্রচারের জন্য যারা উপযুক্ত তারা ধর্ম প্রচারের কাজে ফুলটাইম এনগেজড হবে। সাংস্কৃতিক কাজের জন্য যারা যোগ্য তারা এর মাধ্যমেই এক্বামতে দ্বীনের কাজ করবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের জন্য যারা উপযুক্ত তারা তাতেই পূর্ণ মনোনিবেশ করবেন। তলে তলে একটা কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের নামে সবাই কোনো না কোনোভাবে রাজনীতি করবেন বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সাথে এটাচড থাকবেন – তা আমি সঠিক মনে করি না। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও রাজনৈতিক সচেতনতা এক জিনিস নয়। দ্বিতীয়টি যে কোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরই থাকা উচিত। এর ক্ষেত্র-মাত্রা যাই হোক না কেন।

৭. অতীত জীবনে ইসলামী সংগঠনের একটা ধারার সাথে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। যার মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের অভিজ্ঞতাই আছে। ইতিবাচক লেখাগুলোকে নিয়ে “ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন: আগামীর রূপরেখা” শিরোনামে এবং সমালোচনামূলক লেখাগুলো নিয়ে “ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন: সংস্কার প্রস্তাবনা” শিরোনামে প্রতিটা তিন-চারশো পৃষ্ঠার দু’টি বই প্রকাশের জন্য তৈরী করে রেখেছি অন্তত তিন বছর আগেই। শীঘ্রই এগুলো প্রকাশের ইচ্ছা আছে। এসব বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত অবস্থান সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেয়ার জন্য এসব পদক্ষেপ।

৮. বিভাগের শিক্ষা-প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রসস এন্ড কনস, দেশের চলমান পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক রাজনীতি – এগুলো নিয়ে আমি কখনোই শংকিত-আশান্বিত-সম্পৃক্ত হই না। ব্যক্তিগতভাবে যারা আমাকে জানেন, তারা এটি জানেন। কারণ, ওই যে বলেছি, আমি আদা বেপারী। জাহাজের খবর নিয়ে আমার কী লাভ? হ্যাঁ, নিজেকে আমি আদা বেপারীর মতো তুচ্ছ জ্ঞান করি। যে বিষয়ে আমার ক্ষমতা নাই, কিছু করার নাই তা নিয়ে আঁতলামি করা আমি পছন্দ করি না। বরং সীমিত সামর্থ্য-শক্তি নিয়ে আমি আমার পরিমণ্ডলে যা করতে পারি তার সবটুকন করার ব্যাপারে আমি সচেষ্ট। শুভানুধ্যায়ীদের কেউ কেউ আমার নিরাপত্তা নিয়ে শংকা প্রকাশ করেন। আমি নিজের অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করি না। তারমানে আমি কোনো ধরনের নিরাপত্তা নিয়ে আছি, তাও না। আসলে আমি, খুব সম্ভবত আমার মতো আপনিও একজন গোবেচারা মাত্র। বলতে পারেন soft target। অর্থাৎ যে কেউ চাইলে যে কোনো ধরনের আঘাত করতে পারেন। কেউ আক্রান্ত হতে চায় না। ক্ষতিগ্রস্ত হতে চায় না। আমিও না। কিন্তু, এই যে বললাম, আমি একজন নিরীহ নাগরিক। যে কারণেই হোক না কেন, কেউ যদি মাইরা দিতে চায়, প্রতিরোধ করার শক্তি তো আমার নাই। কারো সাথে আমি কোনোভাবে এনগেজড হতে চাই না। no conflict with any authority এবং hundred percent openness এই দুই নীতির আলোকে যতদিন যতটুকু কাজ করতে পারি, চালিয়ে যাবো, ইনশাআল্লাহ।

এ বিষয়ে “চরমপন্থা ও আমাদের করণীয়” শিরোনামে নোমান আলী খানের একটা লেকচার আমার কাছে ভালো লেগেছে।

ফেসবুক প্রদত্ত মন্তব্যপ্রতিমন্তব্য

Abm Mohiuddin: ধন্যবাদ স্যার । সমৃদ্ধ হলাম আপনার দেওয়া চমৎকার সব লিঙ্ক ও আপনার বক্তব্যে মুগ্ধ হয়েছি । দোয়া করবেন।।

Saimum Iftekhar: “চোরাগোপ্তা হামলা তো জিহাদ নয়”। স্যার, অনেকে চোরাগোপ্তা হামলার সমর্থনে সারিয়্যা নাখলার ঘটনা উল্লেখ করে। এইক্ষেত্রে আপনার মতামত কী?

Mohammad Mozammel Hoque: সুন্নাহ হতে শিক্ষা নেয়ার যে কাণ্ডজ্ঞানসুলভ পদ্ধতি আছে তা না মানলে, নাউযুবিল্লাহ, সব ধরনের কাজের জন্য ‘সুন্নাহ হতে উদাহরণ’ পাওয়া ও সেট করা সম্ভব। দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোন ধরনের কাজ তিনি কখন কোন পরিস্থিতিতে কতো ফ্রিকোয়েন্টলি করেছেন।

রাসূল (সা) ছিলেন একাধারে ধর্মীয় নেতা, রাষ্ট্রনায়ক ও সেনাপতি। তাঁর সংগঠন তথা মুসলিম উম্মাহও ছিলো মাল্টি-ফেসেট হিসাবে সর্বাত্মক বৈশিষ্ট্যের। এখন তো সে ধরনের একক নেতা ও সংগঠন নাই।

তাই, চোরাগোপ্তা হামলা বা এ ধরনের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার অজুহাতে অনুরূপ ধরনের ঘটনার অনুমোদন বা সমর্থন দেয়ার মধ্যে সমস্যা হলো, এ ধরনের সব ব্যতিক্রমী ঘটনার মধ্যে একটা মিল হলো, ঈমান ও ইসলাম তথা দ্বীনি দিক থেকে এসব ঘটনার পক্ষ ও বিপক্ষের অবস্থান ছিলো ক্লিয়ার।

এখনকার অত্যাচারী ও সীমালংঘনকারী মুসলিম শাসকদেরকে অমুসলিম গণ্য করার ব্যাপারে আমি কেন, জমহুর উলামায়ে কেরামের কেউই রাজী হবেন না।

এ বিষয়ে আমি সাইয়েদ কুতুবের অবস্থানকে ভুল মনে করি। এবং ইউসুফ কারযাভীর অবস্থানকে সঠিক মনে করি।

ধন্যবাদ।

Abu Zafar: আল ইগতিয়াল নাম দিয়া এনার্কিস্টগুলা যেসব করতেসে এইগুলা স্রেফ অর্গানাইজড খুন ।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *