নারীদের ইসলামচর্চা: প্রসঙ্গ নেকাব, হিজাব, পর্দা ও বোরকা

নেকাবপন্থীদের স্ববিরোধ: নেকাব, হিজাব, পর্দা, বোরকা যা-ই হোক না কেন এগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্টরা এক ধরনের জটিলতায় ভোগেন। নিজ পুস্তকের শুরুতে শ্রদ্ধেয়া মরিয়ম জামিলার আপাদমস্তক ঢাকা বোরকা পরা ছবিকে এর উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা যায়। কোনো নেকাব পড়া নারীর মুখায়ববের (পাসপোর্ট সাইজ) ছবিতে সংশ্লিষ্ট নারী-মুখাবয়বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি (চোখ) অন্যদের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। অথচ, এই পাসপোর্ট সাইজ ছবিটি যদি পুরো মুখমণ্ডলের হয়, তখন অন্যদের দৃষ্টি ডিস্ট্রিবিউটেড অর্থে খানিকটা ব্লার হয়ে যায়।

পর্দা সংবেদনশীলতার মাত্রা: ছেলেদের পর্দা, নাকি মেয়েদের পর্দা, অথবা উভয়েরই পর্দা – এ ধরনের যত কথাই আসুক না কেন, লেভেল অফ সেনসিটিভিটি বা সংবেদনশীলতার মাত্রা এক্ষেত্রে একটা বিরাট ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে। একে অস্বীকার করা অসম্ভব এবং এক দৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয়ও বটে।

টিনেজারদের সংবেদনশীলতার মাত্রা মধ্য-তিরিশের চেয়ে অনেক বেশি। যারা পঞ্চাশের কোটায়, তাদের অনেক বেশি সংযত হওয়াটাই স্বাভাবিক। বয়স ও পরিস্থিতির কারণে কোনো কিছু ঘটে যাওয়াটা স্বাভাবিক হওয়ার কারণে হাদীস শরীফে ‘ব্যক্তিগত খারাপ কাজ’ ধরনের গুনাহসমূহকে (তাওবা সাপেক্ষে ও এর চূড়ান্ত মাত্রা ব্যতিরেকে) মাফ করার কথা এ জন্যই বলা হয়েছে।

আমরা জানি, এ ধরনের সেনসিটিভিটির মাত্রা কমানোর জন্য দুটি পদ্ধতি শরীয়াহ নির্ধারণ করে দিয়েছে। অথচ, আমরা কেবল একটাই আমল করার জন্য বলি বা চেষ্টা করি। সেটি হলো এর নেতিবাচক পদ্ধতি: (১) অবদমন। অথচ এর পূর্বশর্ত বা সম্পূরক শর্ত হলো একটি ইতিবাচক পদ্ধতি: (২) প্রয়োজন পূরণ।

একবার রাসূলুল্লাহ (সা) এক খুতবায় বললেন, তিনি এক নারীকে দেখে প্রয়োজন অনুভব করলেন। অতঃপর তিনি তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে গিয়ে প্রয়োজন পূরণ করলেন। কখনো প্রয়োজনবোধ করলে এভাবে সামলে চলার জন্য তিনি উপস্থিতদেরকে উপদেশ/নির্দেশনা দিলেন। এই ইতিবাচক পদ্ধতির একটা দিক হলো যে কোনো অবস্থায় স্বামীদের আহ্বানে সাড়া দেয়ার জন্য স্ত্রীদের প্রতি তাগিদ। বিয়েকে সহজ করা ও যিনাকে কঠিন করার মতো সামাজিক সংস্কৃতি হলো এই ব্যবস্থার ভিত্তি। এই দুই ধরনের ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য না আসা পর্যন্ত সমস্যাটির কাঙ্খিত সমাধান সম্ভব নয়।

ব্যক্তি ব্যক্তিত্ব: নেকাব পরা হোক বা ক্লাসিক্যাল প্যাটার্নে বোরকা পরা হোক, কোনো নারী তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ হতে রেহাই (একজেম্পশন) পেতে পারে না। ইকামতে দ্বীনের দায়িত্ব পালনে নারীদের জন্য কিছু রেহাই বা রেয়াত আছে বটে, কিন্তু মূল দায়িত্ব পুরুষ ও নারীদের জন্য সমভাবে ফরজ। পুরুষ ও মহিলা সবার জন্যই তাই ব্যক্তিত্বের বিকাশ একটি আবশ্যিক পূর্বশর্ত। সমাজকর্মী হিসাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বা ব্যক্তিত্বের বিকাশই ফ্যাক্টর, তার শরীর বা শারীরিক গঠনপ্রকৃতি তেমন গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর নয়। পোশাক বিশেষ তো নয়ই। ব্যক্তিত্বের জন্য পোশাকের প্যাটার্ন হলো নিতান্তই প্রাসঙ্গিক ও পরোক্ষ বিষয়। আসল বিষয় হলো ব্যক্তির বিশ্বাস ও জ্ঞানের গভীরতা, কর্ম ও মূল্যবোধের ব্যাপ্তি।

‘কণ্ঠস্বরের পর্দা’ নামক নব উদ্ভাবিত ফেইক মাসয়ালাটা ব্যক্তিত্বের বিকাশের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। একজন মুসলিম তথা সর্বোত্তম সমাজকর্মী হিসাবে নারী-পুরুষ সবাইকে সর্বোচ্চ মানের কম্যুনিকেটিভ স্কিল অর্জন করতে হবে। নবী করীমের (সা) স্ত্রীদের জন্য পর্দার অন্তরালে অবস্থানকে ফরজ করা সত্ত্বেও তাঁরা পর্দার আড়ালে থেকে বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে নিয়মিত ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন, নেতৃত্ব দিতেন।

‘কণ্ঠস্বরের পর্দা’ (?) করার জন্য নাকি নেকাব পরিহিতা ইসলামী আন্দোলনের ছাত্রীরা ক্লাশে কথা বলে না, টিচারদের কাছে সরাসরি সংগঠনের চাঁদা চায় না। এরা বাসায় আসলে (আমার গৃহকর্ত্রী) ম্যাডামকে বলে– ‘স্যারকে সালাম বলেন, এয়ানতটা নিয়ে দেন!’ এসব নিতান্তই অল্পবয়সী কন্যাতুল্য মেয়েরা যখন আমার সাথে কথা না বলে, এমনকি সরাসরি সালামও না দিয়ে ‘ফেতনা থেকে বাঁচার নীতি’ অবলম্বন করে, তখন বিব্রতবোধ করার পাশাপাশি এদের সমাজবিচ্ছিন্নতা দেখে অবাক হই! পর্দানশীন অনেক ছাত্রী নিরীহ পুরুষ শিক্ষকদের সম্পর্কে অনেক সময় সম্পূর্ণ একতরফাভাবে লাম্পট্যের অভিযোগ করেছে। কারণ, ভাইভাতে তাদেরকে নেকাব খুলতে বলা হয়েছে। প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পরিবর্তে নেকাব রক্ষা করার জন্য তারা জিহাদী কোশেশ শুরু করে। এমনকি উপস্থিত শিক্ষকবৃন্দ তাদের সাক্ষাৎ পিতৃতুল্য হওয়া সত্ত্বেও। অথচ সেটি এমন একটা পরীক্ষা যেখানে উপস্থিতি রেকর্ড করাটা একটা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম।

এসব নেকাব পরিহিতাগণ ক্লাশে কথা না বলুক, ভাইভাতে নেকাব না খুলুক, তাতে সমস্যা নাই যদি তারা লেখাপড়ায় ভালো করে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে! কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, তারা লেখাপড়ায় ততটা ভালো নয়। যখন যে কাজের প্রসংগ তখন সে কাজে সর্বাধিক পারঙ্গম না হলে শুধু আদর্শের প্ল্যাকার্ড কি কাউকে পার করিয়ে দিতে পারবে? নেতৃত্বের বিষয়টা আল্লাহ তায়ালা শুধুমাত্র যোগ্যদের জন্যই নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই না?

সতর হিজাব: মাদ্রাসা পড়ুয়া সহকর্মীরা বলেন, হিজাব আর সতর এক নয়। সতর হিসাবে মুখ খোলা রাখার অবকাশ থাকলেও হিজাব হিসাবে মুখ ঢাকা ওয়াজিব। উম্মুল মুমিনীনদের পর্দাকে তারা সবার জন্যই সমমর্যাদায় প্রয়োগযোগ্য বলে দাবি করেন।

ব্যক্তিসত্তাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে গত্যন্তর ছাড়া গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান বাধ্যতামূলক হলে, এক কথায় উম্মুল মুমিনীনদের মতো পর্দা করা ফরজ হলে অন্তত সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সায়েন্স-আর্টস পড়ার কী মানে হতে পারে? সন্তান পালন ও তাদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বিএ/এমএ পাশ করার কী দরকার? তাই এক কমেন্টে বলেছিলাম, হিজাব শব্দটা পাশ্চাত্যের প্রেক্ষাপটে এক রকম, আবার প্রাচ্যের আলেমদের ব্যাখ্যায় অন্য রকম। পাশ্চাত্য প্রেক্ষাপটে হিজাব মানে মুখ খোলা রেখে স্কার্ফ পরে পর্দা। আর প্রাচ্যের আলেমদের কাছে হিজাব মানে মুখ ঢাকাসহ আপাদমস্তক পর্দা।

যদি বলা হয়, নেকাব ওয়াজিব নয়, সতর্কতাসুলভ অতিরিক্ত আমল – তাহলে তো আপত্তি নাই। সমস্যা হলো, এটিকে বাধ্যতমূলক হিসাবে আরোপ করা, যা কোনো কোনো ছাত্রী ও নারী সংগঠন করে থাকে।

বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো: চট্টগ্রামের বাওয়া স্কুলে প্রফেসর আতহার স্যারের মেয়েকে নেকাব পরতে দিবে না হাসিনা যাকারিয়া নামক এক মহিলা প্রিন্সিপাল। চবির শিক্ষকরা তখন ব্যাপক আন্দোলন শুরু করলেন। চট্টগ্রাম শহরে মিছিল, মানববন্ধন, সাংবাদিক সম্মেলন ইত্যাদি হলো। অবশেষে স্কুল কর্তৃপক্ষ উক্ত মেয়েকে নেকাব সহকারে বোরকা পরে ক্লাশ করার অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। এক যুগ আগের এ ঘটনা বলার প্রসঙ্গটি হলো, এসব ঢামাঢোলের মধ্যে এক তরুণ সাংবাদিক মেয়েটির সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য মেয়েটির সাথে যোগাযোগ করে। দ্রুত তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। বছর কয়েক পরে তারা দাম্পত্য জীবন শুরু করে!

একটি ইসলামী ছাত্রী সংগঠনের যে ক’জন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সভানেত্রী আমার বাসায় এসেছেন, তাঁদেরকে কোনোমতে নেকাব পরতে দেখেছি। আমাদের ক্যাম্পাসে বেশ ক’জন প্রাক্তন সংস্থা নেত্রী আছেন, যারা এখন কোনোমতে কেবল থুতনীটুকু ঢাকেন। তাঁদের পর্দা সম্পর্কিত ঈমানী চেতনায় এই ‘আপাত পরিবর্তনের’ হেতু কী? এ প্রশ্নের উত্তরটি অন্য জায়গায়…।

নেকাবের ফযিলত: নেকাব পরলে স্কিন ভালো থাকে। অল্প বয়সীরা সচেতন বা অবচেতনে এ বিষয়ে অধিকতর সজাগ থাকে। বিয়ের পরে সেনসিটিভিটির মাত্রা কমে আসলে তারা এ বিষয়ে ক্রমান্বয়ে গাফেল হয়ে পড়ে। সাজগোজের ধরন ও অনুভূতির সাথে মুখাবরণের ঐতিহাসিক যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায়। যুগে যুগে ধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতা নির্বিশেষে আভিজাত্য ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসাবে নেকাবের ব্যবহার হয়ে আসছে। অন্যতম বিউটি টিপস হিসাবে নেকাব অতীব কার্যকর। অতএব, নেকাব থাকবে। স্বভাবতই ইসলাম এটিকে নিষিদ্ধ করেনি। নেকাব সহকারে পর্দা করা বোনেরা এসব কথায় আহতবোধ করতে পারেন। আমার মতো পয়তাল্লিশ-উত্তর ব্যক্তির জন্য এগুলো হচ্ছে অতীত ও বর্তমানের অভিজ্ঞতা মাত্র। একেবারেই নির্দোষ ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

সামাজিক অস্থিরতা পর্দার প্রসার: কেউ কেউ দাবি করছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপকহারে বোরকা ও নেকাবের উপস্থিতি সংগঠন বিশেষের অবদান। এটি ভুল। পাশ্চাত্য ধারায় আধুনিকতার সর্বব্যাপী সয়লাব ও সমাজের ব্যাপক ডি-ইসলামাইজেশন, বিশেষ করে অশ্লীল বিনোদন সংস্কৃতির মহাবিস্ফোরণের ফলে সমাজের মধ্যে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সমাজতত্ত্ব ও প্রকৃতির নিয়মে সমাজের মধ্য থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এর একটা প্রতিক্রিয়া গড়ে উঠেছে। পর্দাসহ ইসলামিক বিষয়াদির লক্ষ্যণীয় জনপ্রিয়তা এর উদাহরণ। আদর্শিক দিক থেকে সমাজের মধ্যে বিরোধ যত তীব্র হচ্ছে, সমাজের রক্ষণশীল ও প্রগতিশীল এই দুই প্রান্তশিবিরে লোকসংখ্যাও ততটা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।

৮। কর্মজীবী নারীদের ব্যাপক পর্দাপ্রীতি: যেসব মেয়েরা মিল-ফ্যাক্টরিতে কাজ করে তাদের মাঝে শিক্ষিত ইসলামী নারীদের কোনো কাজ নাই। অথচ এরা ব্যাপকভাবে বোরকা/হিজাব/নেকাব পরেন। এর কারণ কী? উত্তর একটাই– সামাজিক বিরোধ ও এর প্রতিক্রিয়ায় এক ধরনের আপস। যেমন, সমাজের চাওয়া হলো মেয়েরা দিন-রাত কল-কারখানায় কাজ করবে না। কারণ, এতে পর্দা লংঘিত হয়। এর প্রেক্ষিতে একটা নীরব সমঝোতা হলো বোরকা/হিজাব/নেকাব বা শালীনতা মেনে বের হওয়া। এটি কারো দাওয়াতী কাজের ফসল নয়। এটি এক ধরনের সামাজিক প্রতিক্রিয়া, সোজা কথায় (ধর্মীয়) সমাজপতিদের সাথে এক ধরনের অলিখিত সমঝোতা।

৯। নারীদের হির্মুখী প্রবণতা সম্পর্কে ইসলামী কর্মীদের করণীয়: শিক্ষা কিম্বা কর্মসংস্থান যে কারণেই হোক না কেন, নারী সমাজ যেভাবে জোয়ারের মতো ঘরের বাইরে এসেছে বা আসছে, তাতে করে তারা পর্দা তথা ইসলামের আওতায় স্থিত হবে, নাকি এক পর্যায়ে এসব মূল্যবোধকে আরোপিত হিসাবে প্রত্যাখ্যান করবে– এটি নির্ভর করছে ইসলামপন্থীরা মুসলিম নারীদের এই বহির্মুখী প্রবণতাকে কতটা ইতিবাচকভাবে মানিয়ে বা গ্রহণ করে নিতে পারবে, তার উপর।

অতীত ফতোয়া ও ফিকাহর কিতাবাদিকে আক্ষরিকভাবে আঁকড়ে ধরে থাকলে চলবে না। এই কাজে সুন্নাহর আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মান্যবর ইউসুফ কারযাভী যা তাঁর লেখায় প্রায়ই বলে থাকেন। কেন জানি ক্ল্যাসিক্যাল ফিকাহবিদদের প্রবণতাকে আমার কাছে – কম হোক বেশি হোক – নারীবান্ধব মনে হয়নি! নেকাব সহকারে হিজাব প্রসঙ্গে ‘অধিকাংশ ফহীহদের’ কথা না হয় আমাদের মুসলিম নারীরা মানলেন, কিন্তু ‘ফেতনার আশংকায়’ মসজিদে না যাওয়ার ফতোয়াও কি তারা মানবেন? বিশেষত যখন একদিকে আসলেই ফেতনা অকল্পনীয় হারে বেড়েছে, অন্যদিকে মুসলিম নারীদের মসজিদে প্রবেশাধিকারের পক্ষে আল্লাহর রাসূলের (সা) অতি পরিস্কার নির্দেশ বিদ্যমান?

সাড়ে তিন হাত দেহের উপর আগে ইসলাম কায়েমের আবেগী ও ভুল তত্ত্বটি কীভাবে যেন ইসলামী আন্দোলনপন্থীদের মানসকেও আচ্ছন্ন বা প্রভাবিত করে রেখেছে। অন্তত নারীদের ব্যাপারে এটি স্পষ্টতই লক্ষ্যণীয়!

এসবি ব্লগে হিজাবের উপর আলোচনা বেশ জমে উঠেছে দেখে ভালোই লাগছে! সবাই ভালো থাকুন।

এটি আমার পূর্ববর্তী পোস্টের ফলোআপ: আমি এক নেকাবপন্থী ব্লগারের অসহিষ্ণুতার শিকার! প্রতিকারের দুরাশায় মধ্যরাত্তিরে এই অসহায় পোস্টানো

এসবি ব্লগ থেকে নির্বাচিত মন্তব্যপ্রতিমন্তব্য

উম্মে সালমা: স্কুলের নাম ইস্পাহানি স্কুল এন্ড কলেজ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আচ্ছা, আপনি তাহলে চিটাগাং নিবাসী। ঘটনাটা জানেন দেখছি!

পুস্পিতা: “‘কণ্ঠস্বরের পর্দা’ (?) করার জন্য নাকি নেকাব পরিহিতা ইসলামী আন্দোলনের ছাত্রীরা ক্লাশে কথা বলে না, টিচারদের কাছে সরাসরি সংগঠনের চাঁদা চায় না। এরা বাসায় আসলে (আমার গৃহকর্ত্রী) ম্যাডামকে বলে– ‘স্যারকে সালাম বলেন, এয়ানতটা নিয়ে দেন!’ এসব নিতান্তই অল্পবয়সী কন্যাতুল্য মেয়েরা যখন আমার সাথে কথা না বলে, এমনকি সরাসরি সালামও না দিয়ে ‘ফেতনা থেকে বাঁচার নীতি’ অবলম্বন করে, তখন বিব্রতবোধ করার পাশাপাশি এদের সমাজবিচ্ছিন্নতা দেখে অবাক হই!”

এই বিষয়টির আমি চরম বিরোধী। আমাদের মেডিকেলে দুইজনকে এই রকম পেয়েছিলাম। তাদের নিয়ে খুব কড়া সমালোচনা ও হাসাহাসি করেছিলাম। এসব সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। তবে মেডিকেলে যেহেতু নানা ধরনের রোগী দেখতে হয় তাই কণ্ঠের কথিত পর্দা পালনের সুযোগও তেমন নেই। আর প্রয়োজনেও শিক্ষক, সহপাঠী, সিনিয়র, জুনিয়র বা অন্য কোনো পুরুষের সাথে কথা না বলার মতো অসামাজিক আচরণ কেউ করলে তাদের দিয়ে নিজের আদর্শের দিকে মানুষকে ডাকার কাজ কী করে সম্ভব হতে পারে, তা আমি বুঝতে পারি না। তবে এখন অনেক পরিবর্তন হচ্ছে মনে হয়।

“ভাইভাতে তাদেরকে নেকাব খুলতে বলা হয়েছে। প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পরিবর্তে নেকাব রক্ষা করার জন্য তারা জিহাদী কোশেশ শুরু করে। এমনকি উপস্থিত শিক্ষকবৃন্দ তাদের সাক্ষাৎ পিতৃতুল্য হওয়া সত্ত্বেও। অথচ সেটি এমন একটা পরীক্ষা যেখানে উপস্থিতি রেকর্ড করাটা একটা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম।”

এক্ষেত্রেও নিকাব করার জন্য অযথা কঠোর হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমার মতে, এসব করা হচ্ছে পর্দার মূল স্পিরিট তারা ধরতে না পারার কারণে। তবে কিছু শিক্ষকদেরও (পুরুষ-নারী) দেখেছি অযথা নিকাবের বিষয়ে এলার্জিক হতে। নিকাব করা কাউকে দেখলে কয়েকজন শিক্ষককে দেখেছি প্রকাশ্য ক্লাসে সমালোচনা করতে, তাদের নাকি নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হয়। নিকাব করেছে ছাত্রী, আর নিঃশ্বাসে নাকি সমস্যা হতো শিক্ষকের! এসব কারণে ওই ছাত্রীরাও জেদ ধরা শুরু করে।

নারীদের পর্দা বলতেই ‘নিকাব’ এই বিষয়টি আসলে দীর্ঘদিন থেকে এ অঞ্চলে চলে আসছে। এক্ষেত্রে এই মতটি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারতো জামায়াতের মহিলা এবং ছাত্রী উইং। কিন্তু তাদের মতো সংগঠনও দেখা যায় অযথা কঠোর। এসব অনাকাংখিত। তবে সময়ের প্রেক্ষিতে বিষয়গুলোর পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হয়, হতে হবে। আমি সবসময় বলি, পর্দা/হিজাবের মূল বিষয়গুলো (শুধু পোশাকি পর্দা নয়, চোখের-মনের পর্দাসহ সবকিছু) নারী-পুরুষ (শুধু নারী নয় কিন্তু) উভয়কে ভালোভাবে জানিয়ে দেয়ার পর কে জোব্বা পরবে বা নিকাব পরবে, তা সংশ্লিষ্ট নারী-পুরুষের উপর ছেড়ে দিতে হবে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: খুব সুন্দর মন্তব্য! ভালো থাকুন!!

পার্টিশন৪৭: মুস্তাহাব বিষয়কে ফরজ মানাও এক ধরনের বিদআত। কী বলেন?

যারা মুখ ঢাকা আর কণ্ঠস্বরের পর্দাকে অত্যাবশ্যকীয় মনে করে, তাদের ঘরের বাইরে যাওয়া উচিৎ নয়। পড়াশোনা না করে ঘরে বসে মূর্খ জমিদার হয়ে থাকলেই হয়। বর্তমান স্টাইলের নিকাবটা যে কোত্থেকে এলো, তা আমার মতো অমাদ্রাসায়ী শিক্ষিতের পক্ষে বুঝে উঠা মুশকিল। যিলবাব বলতে যা বুঝায় তা হলো এক চোখের অর্ধেক পর্যন্ত খুলে রাখা। দুই চোখ খুলে রাখার পর্দা কীভাবে এল?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

ঈমানের আলো: সকল ভাইয়েরা আজ মেয়েদের হিজাব, নিকাব আর পর্দা নিয়ে হঠাৎ তুমুল ব্যস্ত। অথচ নিজেদের পর্দা রক্ষা হয় কিনা, এ নিয়ে মাথা ব্যথা নাই। কোনো মেয়ে বোরকা পড়ে চোখে মাশকারা লাগিয়েছে তা দেখতে গেলে নিজের পর্দার কথা মনে পড়ে কি? না, তাহলে ইসলামের এ গুরুত্বপূর্ণ টপিকে দাওয়াতী কাজ ও ব্লগ লেখা চলবে কী করে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কারো কথা শোনার জন্য বা কাউকে কিছু বোঝানোর জন্য ফেসিয়্যাল এক্সপ্রেশন সহায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ। আর যারা সৌন্দর্য ঢেকে রাখতে পছন্দ করেন, তাদের উচিত নিজেদের গেটআপেও সেটি মেনটেইন করা।

ঈমানের আলো: আজকাল ইসলামের নির্দেশ লংঘন করে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন কিছু দায়ী। অদ্ভুত, বড়ই অদ্ভুত।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: নিজে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ পারফেক্ট হয়ে যতটুকু সম্ভব সমাজ সংশোধনের জন্য কাজ করা অথবা নিজে ন্যূনতম মানে পারফেক্ট থেকে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ মানে সমাজ সংশোধনের জন্য কাজ করা– ইসলামের জন্য কাজ করার এই দুই তরীকা প্রায়োগিক দিক থেকে বিপরীতমুখী। প্রথমটি হলো ধর্ম হিসাবে ইসলাম আর দ্বিতীয়টি হলো আন্দোলন হিসাবে ইসলাম।

ইসলামের আকীদাগত তথা কনসেপ্ট্চেুয়্যাল বিষয়গুলোকে এজ সাচ্ছ গ্রহণ করতে হবে, যদিও ইসলামের সোশ্যাল ইনজাঙ্কশনগুলোর প্রয়োগযোগ্যতা স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিবেচনাসাপেক্ষ মনে করি। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

ঈমানের আলো: “’নিজে ন্যূনতম মানে পারফেক্ট থেকে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ মানে সমাজ সংশোধনের জন্য কাজ করা।’”

কিন্তু ন্যূনতম পারফেকশন না থাকার পরও সর্বোচ্চ মানে সমাজ সংশোধনের জন্য কাজ করার এ ভীষণ প্রচেষ্টাকে কী মর্যাদা দেয় ইসলাম? জানাবেন অনুগ্রহ করে।

“ইসলামের আকীদাগত তথা কনসেপ্ট্চেুয়্যাল বিষয়গুলোকে এজ সাচ্ছ গ্রহণ করতে হবে” সহমত।

“যদিও ইসলামের সোশ্যাল ইনজাঙ্কশনগুলোর প্রয়োগযোগ্যতা স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিবেচনাসাপেক্ষ মনে করি।” এ বিবেচনা করতে গিয়ে কখন আকীদার বিরুদ্ধেই আচরণ শুরু করছি তা অনেক সময়ই পর্যালোচনায় থাকে না। যা দ্বিমুখীতা।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ১। নিজের ঈমান-আকীদা নিয়ে সব সময় ভীত ও সতর্ক থাকাটা জরুরি হওয়া সত্ত্বেও ঈমান-আকীদা নিয়ে শুচিবায়ুগ্রস্ততার মতো সন্দেহপ্রবণ হওয়াটাকে কাম্য নয় মনে করি।

২। আকীদা ও আমলকে অভিন্ন মনে করি না।

৩। ন্যূনতম মান নাকি উচ্চমান – এসব নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে কাজে নেমে পড়াটাকেই বেশি জরুরি বিবেচনা করি। আগে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত মান অর্জন করে অতঃপর সমাজ সংশোধনের কাজ – এই নীতি অন্তত আমার জন্য আমলযোগ্য মনে করি না।

৪। হতে পারে, আমি একজন মুসলিম হিসাবে যা প্রেফার করি তা আপনার দৃষ্টিতে সঠিক নয়। তাই আসুন যে যার মতো কাজ করি। সবাই মিলে এক তরীকায় চলতে হবে, এমন কোনো কথা নাই। আসুন, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য– এই নীতিতে পথ চলি।

৫। যিনি ঈমানের দাবি করেন, রাসূলূল্লাহর (সা) হাদীস অনুসারে তার ঈমান নিয়ে সন্দেহ পোষণ ও মন্তব্য না করা উচিত। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাকফির করাকে ভীষণ ভয় পাই।

৬। ঈমানের মৌলিক জ্ঞান হলো কালেমা তাইয়েবা। ঈমানের প্রায়োগিক জ্ঞানের জন্য আকীদাগত বিশ্লেষণ জরুরি। কারো ঈমানের প্রায়োগিক জ্ঞানে কোনো অসামঞ্জস্যতা স্বতঃই প্রকাশ পেলে তাকে সংশোধন হয়ে ঈমানের দাবিকে মেনে নিতে হবে। এবিষয়ে ‘স্বতঃই প্রকাশ পাওয়া’ আর এ বিষয়ে ‘ঘাটাঘাটি করার’ পার্থক্য সব সময় স্মরণে রাখতে হবে। আশা করি বুঝতে পেরেছেন। মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

সুমাইয়া জামান: “এসব নেকাব পরিহিতাগণ ক্লাশে কথা না বলুক, ভাইভাতে নেকাব না খুলুক, তাতে সমস্যা নাই যদি তারা লেখাপড়ায় ভালো করে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে! কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, তারা লেখাপড়ায় ততটা ভালো নয়। যখন যে কাজের প্রসংগ তখন সে কাজে সর্বাধিক পারঙ্গম না হলে শুধু আদর্শের প্ল্যাকার্ড কি কাউকে পার করিয়ে দিতে পারবে? নেতৃত্বের বিষয়টা আল্লাহ তায়ালা শুধুমাত্র যোগ্যদের জন্যই নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই না?”

এ বিষয়টা এতটাই কষ্টের যে আফসোস করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

কর্মজীবী নারীদের ব্যাপক পর্দাপ্রীতির বিষয়টা জানা ছিল না। নতুন কিছু জানলাম। আপনার পোস্ট পড়ে নতুনভাবে অনেক কিছু জানা হলো।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কর্মজীবী নারীদের মধ্যে যারা বোরকা পরে না তারাও বড় চাদর পরে, ওড়নাটা ভালো করে গায়ে দেয়। কেউ তাদের বলেনি। সামাজিক সমঝোতার অলিখিত বা নীরব শর্ত হিসাবে তারা যথাসম্ভব পর্দা মেনে চলে। আমাদের বস্তি টাইপের একটা কলোনি আছে যেখানে অনেক কর্মজীবী মেয়েরা থাকে। তাদের সম্বন্ধে আমি খুব কাছ হতে জানি।

রেহনুমা বিনত আনিস: আল্লাহ পর্দার বিধান দিয়েছেন নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বাইরে যাবার ব্যাবস্থা করার জন্য। তিনি যদি চাইতেন নারী বাইরে যাবে না বা পুরুষের সাথে কাজ করবে না তাহলে পর্দার প্রয়োজনই হতো না। অথচ এখন এই পর্দাকেই নারীর বাইরে যাবার বা কাজ করার অন্তরায় করে তোলা হচ্ছে। এই আমাদের আল্লাহর প্রতি আনুগত্য! এই আমাদের ইসলামের বোধ! কণ্ঠস্বরের পর্দা অনুচ্ছেদ পড়ে খুব মজা পেলাম! সুন্দর পোস্টের জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

রু: আপু আপনার সাথে সহমত। পর্দার ব্যাপার নিয়ে ইদানীং আমার কিছু ইসলামিক বোনদের সাথে ঝামেলা হয়েছে। উনারা যেভাবে পর্দাকে ভীতিকর সাবজেক্ট করে তুলছেন, আমি আতঙ্কিত। ইসলাম এমন গতিশীল একটা জীবনব্যবস্থা, অথচ উনাদের পর্দার কাঠিন্য দেখলে মনে হয় জীবন থেমে আছে পর্দার মাঝে। পরিপূর্ণ পর্দা করতে হলে জীবনের আর কোনো কিছুতেই অংশগ্রহণ করা যাবে না।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলাম বুঝার এবং মানার তৌফিক দান করুন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

হাবীব ইউসুফ: এখানে অনেকের ইজতিহাদী মন্তব্য শুনে হাসলাম। ভাবলাম, আগেকার মনীষীদের একটু হলেও লজ্জা পাওয়া উচিত এ যুগের স্বঘোষিত মুজতাহিদদের প্রতিভা দেখে!!!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এই পোস্টে মুজতাহিদ হিসাবে কেউ নিজেকে ঘোষণা করেছি কি? আমি যেসব মন্তব্য করেছি, তা আমার উপলব্ধি মাত্র। মুজতাহিদদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলে সাধারণদের জন্য যে কোনো মতকে প্রাধান্য দেয়া বা গ্রহণ করার অবকাশ থাকে। তাই না? ফতোয়া দেয়ার জন্য মুফতী হওয়ার আবশ্যিকতা থাকলেও কোরআন-হাদীস হতে অধ্যয়ন করে শরীয়াহর জ্ঞান লাভের অধিকার যে কোনো মুসলিমের আছে। এ কথা বিশ্বাস করি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলেও মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।

রাইশা: আগেকার বিষয়ে আপনার ধারণা খুব কম। আমি যতটা শুনেছি, নারীরা (অবশ্যই মুসলিম নারী) বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলামের স্বর্ণযুগে।

বইয়ের পাতায় রোদের আলো: এ ক’দিনের হিজাব বিতর্ক নিয়ে লেখাগুলোর মধ্যে আপনার লেখাটা আমার খুব ভালো লেগেছে। অন্তত আপনি (আক্রমণাত্মক) ভাষা ব্যবহারে সংযত ছিলেন। বিশ্লেষণ করেছেন ও সীমা অতিক্রম করেননি। আলহামদুলিল্লাহ।

তোমরা সহজ নীতি ও আচরণ অবলম্বন করো, কঠোর নীতি অবলম্বন করো না। সুসংবাদ শুনাতে থাকো এবং পরস্পর ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িও না। (বুখারী ও মুসলিম)

আমার মত এতটুকুই যে, যা আল্লাহ ফরজ করেননি তাকে ফরজ বলার সাধ্য মানুষের নাই। ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ ও রাসূল (সা) যা নিষিদ্ধ করেন নাই, তাকে নিষিদ্ধ করার অধিকারও মানুষের নাই। এ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট মহলের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোও অনুচিত বোধকরি। এখন, আল্লাহ দিনে ১৭ রাকাত সালাত ফরজ করেছেন। কেউ এর বেশি আদায় করলে সে ভুল করেছে তা কি বলা যাবে?

ব্যক্তিগতভাবে আমি নিকাব পরি। তাতে আমার কোনো সমস্যা হয়নি। আমি বেশি নিরাপদবোধ করি এভাবে। ক্লাসে প্রশ্ন করা বা স্যারদের সালাম দেয়াকে অপরাধ মনে করি না। অবশ্য কর্তব্য মনে করি। তবে আপনার এ কথাটায় কষ্ট পেয়েছি, “‘কণ্ঠস্বরের পর্দা’ নামক নব উদ্ভাবিত ফেইক মাসয়ালাটা..”

কিন্তু আল্লাহ তো কুরআনেই বলেছেন, “যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে।” (আহযাব: ৩২)

কণ্ঠস্বরের পর্দাও পর্দার একটা অংশ। আবার কেউ এতে কঠোরতা আরোপ করলে তা অনুচিত। আমার মত এই যে, কারোরই উচিত হবে না আল্লাহর বিধানের ওপর বাধ্যতামূলক অন্য কিছু চাপিয়ে দেয়া। ঠিক তেমনি কারো এটাও উচিত হবে না নির্দিষ্ট মহলের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো।

বিদ্বেষ বা বিদ্রুপ নয়, সহানুভূতি ও সহশীলতা নিয়ে সংশোধনের জন্য সমালোচনা কাম্য। আমরা সবাই-ই মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। আমাদের সকল কাজের উদ্দেশ্যই যেনো হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহ সবাইকে সরল পথে অবিচল রাখুন।আমীন। আপনাকে ধন্যবাদ সুন্দর পোস্টের জন্য।

পার্টিশন৪৭: “আল্লাহ দিনে ১৭ রাকাত সালাত ফরজ করেছেন। কেউ এর বেশি আদায় করলে সে ভুল করেছে তা কি বলা যাবে?”

কেউ যদি ১৭-র যায়গায় ১ রাকাতও বেশি ফরজ মনে করে, তা বিদআত এবং তা ভুল।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনার সমর্থন আমাদেরকে শক্তি যোগাবে। আপনার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করছি। নিচে ‘ভিশন-২০৫০’-এর মন্তব্যের উত্তরে আমার প্রতিমন্তব্যের ‘চ’ অংশটি দেখুন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

ভিশন২০৫০: আপনার মূল্যবান লেখাটি এতো জ্ঞানগর্ভ ও বাস্তবভিত্তিক হয়েছে যে, এখানে ভাবনার অনেক কিছু পেলাম। চিন্তা করার কতটুকু যোগ্যতা আমার আছে তা যদিও প্রশ্নবিদ্ধ, তবে কয়েকটি ব্যাপার বিনীতভাবে বলতে চাচ্ছি।

# পর্দা (হিজাব) ফরজ (obligatory), কোনো ডিস্পিউট নেই। তাহলে এর অনুশীলন নিয়ে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্যের’ কতটুকু সুযোগ রয়েছে। হ্যাঁ, নিকাব নিয়ে কিছু কথা থাকতে পারে, তাও এর পক্ষের বক্তব্যগুলোই বেশি জোড়ালো এবং অপেক্ষাকৃত সেইফ, যা এখানে উল্লেখ করা দুঃসাধ্য। তাই শিরোনাম এবং শুরু দেখে প্রথমেই আমার মনে হয়েছে এর প্রতি আপনার এক ধরনের হাল্কা নেগেটিভ অ্যাটিচ্যুডের কথা এবং মন্তব্যগুলো – বিশেষ করে যারা অ্যাফেক্টেড, প্র্যাক্টিসিং তাদেরগুলো পড়ে দেখলাম – এটিকে লাইট (হাল্কা) করার পক্ষে কথা শুনে তারা খুবই বেশ আগ্রহী হয়েছেন! আমি হয়তো ব্যাপারটি ভালো নাও বুঝতে পারি। ইসলামে কি ফ্যানাটিক বা লিবারেল বলে কিছু আছে? ইসলাম তো ইসলামই। অ্যাটলিস্ট, বেসিক ব্যাপারগুলো তো ডিসাইডেড, ফিক্সড। আমি তো মনে করি ইসলামের প্র্যাক্টিস এখন বিশ্বব্যাপী বিভিন্নপন্থী স্কলার থেকে শুরু করে ঘরে ঘরে মুখে মুখে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’, ‘আমি যেভাবে বুঝি’, ‘আমি যা বিশ্বাস করি’ ‘আমি যা করি’ ইত্যাদির কবলে পড়ায় সাধারণ মানুষ অনেক মৌলিক ব্যাপারেও দিশেহারা হয়ে পড়ছে। আমার মনে হয় এই জায়গাটায় আমাদের আরো নজর দেয়া দরকার।

# ছবিতে নিকাব (শুধু চোখ খোলা) না করে পুরো মুখমণ্ডল খোলা রাখলে দৃষ্টি ডিস্ট্রিবিউটেড হয়ে ব্লার হয়ে যাবে– মানে কি? এটিতে কি কখনো বেশি কল্যাণ হতে পারে? (অবশ্য যেখানে বিশেষ দরকার – যেমন পাসপোর্ট, নিরাপত্তা ইত্যাদি সেক্ষেত্রে কিন্তু আমি নিকাবের প্রতি টাফ হতে বলছি না)

# ‘টিন-এজারদের সেন্সিটিভিটি বেশি’ – এটি আপনিই বলেছেন এবং এটি সন্দেহাতীত। তাদের অপরাধ/ক্ষমার প্যাটার্নও ভিন্ন, বুঝলাম। কিন্তু রিমেডিতে অবদমনের চেয়ে প্রাসঙ্গিক মূল্যবান হাদীসসহ প্রয়োজন পূরণের কথা বলেছেন। ফাইন। কিন্তু এটি তো বিয়ের উপযুক্ত এবং বিবাহিতদের ক্ষেত্রে হতে পারে। তাহলে বিপদ এড়াতে টিনএজারদের পরিবেশে পর্দা কি আরো স্ট্রিকলি ফলো করা উচিত না?

# নারীদের অপটিমাম ব্যক্তিত্ব বিকাশে কি নিকাব কোনো বাধা?

# কণ্ঠস্বরের ব্যাপারে কুরআনের স্পষ্ট ডিরেক্টিভস রয়েছে – সেটি এবং নবীর (সা) স্ত্রী ও কন্যাদের ফলো করলেই তো চলে। ওখানেও দুয়েকজন স্ট্যাবর্ন ছাত্রীদের আচরণকে সামনে টেনে এনে আমার মনে হয় ঐ নির্দেশনাটিকে কিছুটা কটাক্ষই করা হয়ে গেছে কি না ভেবে দেখবেন আশা করি। আরো দুয়েকটি বক্তব্য ক্ল্যারিফাই করার ছিল, পরে করবো ইনশাআল্লাহ!

পার্টিশন৪৭: “…পর্দা (হিজাব) ফরজ (obligatory), কোনো ডিস্পিউট নেই… …বেসিক ব্যাপারগুলো তো ডিসাইডেড, ফিক্সড… সেক্ষেত্রে কিন্তু আমি নিকাবের প্রতি টাফ হতে বলছি না…”

আপনার মন্তব্যের উত্তর তো আপনার মন্তব্যেই পাচ্ছি, জনাব। এখানে তো পর্দা নিয়ে লেখক কোনো ডিস্পিউট করেন নাই, ডিস্পিউট হলো নিকাব নিয়ে। নিকাব কি বেসিক বিষয়? হিজাব ও নিকাবের পার্থক্য মনে হয় বুঝানোর প্রয়োজন নাই।

হযরত আয়েশার (রা) বোন হযরত আসমা রাসূলের (সা) সামনে পাতলা কাপড় পরিহিত অবস্থায় আসলে রসূলুল্লাহু (সা) সঙ্গে সঙ্গেই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন– “হে আসমা! কোনো মেয়ে বালেগ হওয়ার পর তার মুখ ও হাত ছাড়া শরীরের কোনো অংশ দেখানো জায়েয নয়।”

এই হাদীসে কীভাবে নিকাবকে বেসিক বিষয় বলা হয়েছে? হুজুর (সা) যা অত্যাবশ্যক বলেন নাই, তাকে অত্যাবশ্যক বলার স্পর্ধা কারও থাকা উচিৎ নয়। মুখমণ্ডল নারীর সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু হলেও এটি আল্লাহ প্রদত্ত এবং সাজসজ্জা না করা হলে এখানে সংশ্লিষ্ট নারীকে সৌন্দর্য প্রকাশের জন্য কতটুকু দায়ী করা যায়? এজন্য তো পুরুষদের প্রতি পর্দার হুকুম রয়েছে। যেমন– “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।” (২৪:৩০)”

এ সম্পর্কে হাদীস হলো– নবী (সা) হযরত আলীকে (রা) বলেন: এক নজরের পর দ্বিতীয় নজর দিয়ো না। প্রথম নজর তো ক্ষমাপ্রাপ্ত, কিন্তু দ্বিতীয় নজরের ক্ষমা নেই। এ হাদীসের অর্থ হলো কোনো নারী কর্মস্থলে বা অন্য কোনো কারণে ঘরের বাইরে এলে তার দিকে কামভাবে তাকিয়ে না থাকা পুরুষের অত্যাবশ্যক দায়িত্ব।

আপনি ১৭ রাকাত ফরজ নামাজের অতিরিক্ত হাজার রাকাত মুস্তাহাব নামাজ পড়তে পারেন। কিন্তু তাকে যদি ফরজ মনে করতে থাকেন বা ফরজের মর্যাদা দেন তবে তা অবশ্যই দোষনীয়, যাকে বিদআত বলা হয়।

ভিশন২০৫০: আমার এক বোন ডাক্তার। ক্লাস নাইন থেকে নিকাব করে অন্তর থেকেই। ওর অত্যন্ত উন্নতমানের একজনের সাথে বিয়ের পর শশুড় বাড়িতে পড়লো কঠিন সমস্যায়। ওখানে বড় ভাসুর এর প্রচণ্ড বিরোধী, শ্বশুর-শাশুড়ি পছন্দ করেন, তবে খুব জরুরি মনে করেন না। বরটা আবার খুব পজিটিভ। ওর অন্য জা’রা সবাই হিজাব করে, মিশুকও(!)। কিন্তু আমার বোনকে ওখানে ঘরে নিকাব ছাড়ার জন্য অনেক চাপে পড়তে হয়। ও আমার খুবই প্রিয়। তাই তখন ঘণ্টায়-ঘণ্টায় ও আমাকে ফোন করতো। ও কিছুতেই নেকাব ছাড়তে রাজি নয়। আমি ওকে সাহস দিয়েছি সবসময়। টেকনিকও বলেছি অনেক। পরে জানলাম ভাসুরটার বেশ সমস্যা রয়েছে। বাইরে এবং এমনকি হিজাব করেন এমন একজনের সাথেও হাল্কাভাবে…!  যাক, ওরা এখন স্বাভাবিকভাবেই আলাদা বাসায় থাকে। আমার বোন এখন এফসিপিএস, এমসিপিএস। ও মেডিকেলেও অনেক সংগ্রাম করেছে, অনেক স্যারদের কথাও শুনেছে এজন্য।

নিকাব ফরজ নাকি নফল জানি না। তবে আজকের এ সমাজে অপরিহার্য মনে করি। ব্যক্তিত্ব, ক্যারিয়ার, সামাজিকতা কিছুই এতে বাধাগ্রস্ত হয় না। যারা এটি মানেন না, তা তাদের ব্যাপার। কাকে দেখতে ভালো লাগে, মার্জিত মনে হয়, পছন্দ হয় (আরেকজনের তা মনে নাও হতে পারে) – এসব দিয়ে তো আর বিধানের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। এখন ছেলেরা স্টাইলিস্ট হিজাবকারীদের সাথেও আপত্তিকর অনেক কিছু করে থাকে। আর সেই সাথে পুরুষের দাঁড়ি রাখা, দৃষ্টি, কথা, সম্পর্ক ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে কঠোর সংযম ও সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনার অত্যন্ত সুলিখিত মন্তব্য ও এর প্রত্যুত্তরে জনাব পার্টিশন’৪৭ কর্তৃক ততোধিক মার্জিত প্রতিমন্তব্য দেখে মন্তব্য করার তো বিশেষ কিছু আর থাকে না!

‘ইসলাম তো ইসলামই।’ – আপনার এ কথাটুকু অসম্ভব ভালো লেগেছে। আসুন ইসলামী এটা, ইসলামী ওটা ইত্যাদি রকমের লেজুড়বৃত্তির ইসলাম চর্চার অবসান ঘটিয়ে ইসলামকে স্বয়ং একটা ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করি।

সেক্ষেত্রে ইসলাম বলতে কী বোঝাবে তা পরিষ্কার করতে হবে। এ বিষয়ে আমার এই লেখাটা পড়তে পারেন: ‘ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নে ক্রমধারার অপরিহার্যতা’(https://mozammelhoque.com/concept-of-graduality-of-islamic-shariah/)।

আমি ইসলামী স্কলার না হওয়ার কারণে বিষয়গুলোকে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হিসাবে বলেছি, যা বাস্তবসম্মতও বটে।

রাস্তার ধারে বিশাল বিলবোর্ড। প্রায় পুরোটা ফাঁকা। মাঝখানে কিছু লেখা। এটি হলো লেখাটাকে ফোকাস করার একটা স্টাইল। তা না হয়ে যদি পুরো বিলবোর্ড জুড়ে হুবহু ওই লেখাটাসহ (মাদ্রাসার বার্ষিক সভার পোস্টারের মতো) লেখায় ভরা থাকতো, তাহলে সে লেখাটা ততটা নজরে পড়তো না। উদাহরণটা কেন দিলাম, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।

নারীদের ব্যক্তিত্বের বিকাশে তাদের ‘মানসিক-নেকাবই’ বড় ধরনের বাধা।

রেডিও জকি হিসাবে উপস্থাপনা করা ছেলে-মেয়েরা যে ধরনের ঢংয়ে কথা বলে, কোরআনে পারস্পরিক কথাবার্তায় নারী-পুরুষকে সে ধরনের কণ্ঠস্বরে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। নারীদের সম্বোধন করে বলা হলেও নারী ও পুরুষ উভয় শ্রেণীর জন্য তা প্রযোজ্য হতে পারে।

ভালো থাকুন। আমার জন্য দোয়া করবেন।

Ahmed Nizami: “আদর্শিক দিক থেকে সমাজের মধ্যে বিরোধ যত তীব্র হচ্ছে, সমাজের রক্ষণশীল ও প্রগতিশীল এই দুই প্রান্তশিবিরে লোকসংখ্যাও ততটা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।”

সহমত। সমাজের এই প্রবণতাগুলো নিয়ে আরো বেশি লেখা আশা করছি আপনার কাছ থেকে। ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: সামাজিক প্রেক্ষাপটে সবকিছুকে দেখতে হবে। ইসলাম বা অন্য কোনো আদর্শ সমাজবিচ্ছিন্ন হতে পারে না। এখানে সমাজ বলতে সমাজের মূলধারা এবং মূলধারার প্রেক্ষিতকে বুঝতে হবে। বস্তুবিজ্ঞানের নিয়মের মতো সুনির্দিষ্ট নিয়মে সামাজিক পরিবর্তনসমূহ সাধিত হয়। কার্ল মার্ক্সের এই বক্তব্য যুগান্তকারী ও অতীব সত্য। মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের চেয়েও এই সামাজিক বস্তুবাদ তথা ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে আমার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।

আবু আফরা: মরহুম মেয়র হানিফ ঢাকার মেয়র হলে মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহলে হাদীস ছেলেরা উৎসব শুরু করে। “আওয়ামী লীগের মেয়র হলো, আর উৎসব করছেন ইসলামপন্থীরা?” আমার এহেন বালখিল্য ঔৎসুক্যে উনাদের আমীর সাহেব বললেন, কারণ উনাকে রাফে য়াদায়ন (নামাজে বারবার কান বা গর্দান পর্যন্ত হাত উঠাতে) দেখেছি। মানে উনিও আহলে হাদীস। বললাম, নামাজ ঠিক মত পড়ে না, অথচ রাফে য়াদায়ন তাকে খাঁটি মুসলিম বানায়ে দিলো? উনি জবাবে বললেন: নামাজ দুই এক ওয়াক্ত না পড়লেও উনি মাফ পাবেন, কিন্তু রাফে য়াদায়ন না করার অর্থ হলো উনি মুশরিক ফির রিসালাহ? আমি ককিয়ে উঠলাম, স্ট্রেইঞ্জ!!! তিনি হেসে বললেন, নবীর হাদীস না মেনে আবু হানিফার মাসলা মানলে মুশরিক তো হতেই হবে।

ঘটনার পর বুঝেছি মুসলমানেরা কেন এত ছোটখাট জিনিস নিয়ে ব্যস্ত? যেখানে সালাতের সঠিক পালন হয় না সেখানে রাফে য়াদায়ন ইসলাম ও শিরকের পার্থক্যসূচক হয়। যেখানে হিজাবের মতো ফারদ্ব বিষয় গৌণ হয়, তখন শুরু হয় মুখ ঢাকা ফারদ্ব না ওয়াজিব না মুস্তাহাব এই নিয়ে। কুপমণ্ডুক এই সমাজে কণ্ঠস্বরও পর্দার আওতায় কথাটা শুনতে হয়। জাযাকাল্লাহু খায়রান, সুন্দর পোস্টের জন্য। পীস টিভিতে আমি তো ক্রমাগতভাবে এই কথাগুলো বলেছি। জানি দেশে এর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলছে কিনা।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনার টিভি প্রোগ্রামগুলোর ভিডিও কীভাবে পেতে পারি?

আবু আফরা: ‘ইসলামে নারী’ নামে একটা প্রোগ্রাম হয় শুক্রবার রাত ৮:৩০ থেকে ৯টা পর্যন্ত। রেকর্ড করে এসেছি দুবাই গিয়ে, নিজেও দেখতে পারি না ইউকেতে। তবে আমার কল্যাণকামীরা অনেকে বিগড়ে গেছেন ঐগুলো দেখে, আমি নাকি নারীদের শেষ করে দিতে চাচ্ছি, এমন মন্তব্যও করেছেন একজন মুরুব্বি। আমার কাছে রেকর্ড নাই। সরি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: শ্রদ্ধেয় আবু আফরা, ব্লগে লেখেন এমন প্রমিন্যান্ট আলেমদের মধ্যে আপনিই প্রথম জোরালো সমর্থন জানালেন। আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। সত্য প্রকাশে দ্বিধাহীন থাকতে পারাটা আল্লাহর অন্যতম খাস নিয়ামত। আল্লাহ আপনার কাজে বরকত দিন!

লোকমান বিন ইউসুপ,চিটাগাং: পড়েছি। তবে নেকাব নিয়ে চরম জিহাদী ভাইবোন দের দেখতে পাইনি। যারা নেকাবের বিপক্ষে বললে কাফির বলতে পারেন তাদেরও দেখিনি। যারা শুধু লেখার কারণে, মতের ভিন্নতার কারণে বিদায়ী সশ্রদ্ধ সালাম দেন সেই প্রিয়জনদের দেখিনি। যারা ৯.৫৩ মিনিটে পোস্ট দেয়ার পর পোস্ট না পড়ে ৯.৫৮ মিনিটে অনেক বড় কমেন্ট পোস্ট করেন সেই প্রিয় ভাইদের দেখিনি।

আমার আম্মু শিক্ষিকা, ফুফু শিক্ষিকা, ২ খালাম্মা শিক্ষিকা, বোন শিক্ষিকা। তাই নারীদের অনেক বিষয় আমার ক্লিয়ার থাকার কথা।

বড় খালাম্মা রোকন, বড় খালাতো বোন চবির নেত্রী ছিলেন, কাজিন নেত্রী, পরিচিত অনেক ফ্রেন্ডের বোনেরা সংস্থায় আছেন। ইসলামী আন্দোলনের সাথে আছেন এমন ভাইয়েরা যখন সন্দেহ করে বলেন ‘সংস্থার কোনো মেয়ে কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কিনা’ তখন আন্দোলনের আউটপুট নিয়ে চিন্তা হয়।

পুরো কুরআনের নারী বিষয়ক সকল আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা পড়ে ও বিভিন্ন তাফসীর থেকে ওই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা পড়ে, ২০টির মতো নারী সংক্রান্ত ইসলামী বই পড়ে, আর মহিলা সাহাবী ও সংগ্রামী নারী পড়ে এবং তাসলিমা, হুমায়ুন আজাদ, নারীবাদ নিয়ে বিস্তর পড়ালেখার পর কলম ধরি। ১২ বছরের শপথের কর্মীজীবনের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে, দল পরিচালনার অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে, ইসলামী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে লেখার ট্রাই করি, তখন যদি কেহ শুধু মতভিন্নতা ও আন্ডারস্টিমেট করার জন্য উপদেশ দেয় ‘আরো পড়ার জন্য’, তখন ভাবি, আমাদের অহমিকাবোধ ও অপরকে আন্ডারস্টেটেড করা নিয়ে। আমরা আগাতে পারিনি আত্মতৃপ্তি, আত্মতুষ্টির কারণে।

যারা পাম্পিং লেখা ভালবাসেন আমি তাদের দলভুক্ত হতে পারিনি। যারা সমাজের একটি মেয়ের ১০০ পাওয়ার জন্য সমাজের সব মেয়েকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত, এমন ধ্যানধারণা লালনকারী ছাত্রী সংগঠন ‘জীবন্ত লাশ ছাড়া কিছু নয়। ইসলামের নামে মানসিক বিকলাংগতা প্রকটভাবে দৃশ্যমান।’

যখন শহরের একটি বাসার বধু নেকাব পড়ে শহরময় লাম্পট্য করে আসে, তখন সমাজ তাকে চিনতে পারে না। যেটি অপরাধের সুযোগ করে দেয় সেটি অন্য কোনো আমলে পর্দার সবোর্চ্চ মান হলেও এই সমাজে এটি অপরাধের সহায়ক ইনস্ট্রুমেন্ট।

ইসলাম বলে “হুয়াল্লাজি আরসালা রাসূলাহু বিল হুদা ওয়া দিনিল হাক্ক, লিওজহিরাহু আলাদ্দিনি কুল্লিহি।” এই যে “লিওজহিরাহু আলাদ্দিনি কুল্লিহি” (সকল মতবাদের উপর বিজয়ী হওয়ার জন্য ইসলামের আগমন) তখন ইসলাম নুডিস্ট, নাস্তিক, নারীবাদী, মুক্তমনা, প্রগতিশীল, সেকুলারিস্ট, অমুসলিম– কারোই যৌক্তিক প্রশ্ন ও কুয়েরীকে এড়াতে পারে না। যেহেতু ইসলাম সবাইকে চ্যালেঞ্জ করে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মাশাআল্লাহ! আমরাও বলতে পারেন শিক্ষক পরিবার। আমার ৯ ভাইবোনের সবাই চাকরি করে। অধিকাংশই শিক্ষকতা করেন।

আমাদেরকে কয়েকটি সাংঘর্ষিক বিষয় একসাথে মেনে চলতে হবে: বোল্ড, কনসিসটেন্ট এন্ড প্যাশেন্ট! ভালো থাকুন।

ridwan kabir sabuj: ধন্যবাদ এই বিশ্লেষণমূলক সুন্দর পোস্টটির জন্য। আমার মনে হয়, আমরা শরিয়তের শাখা-প্রশাখা নিয়ে যেমন বেশি বিতর্ক করছি তেমনি ফিতনার ব্যাপারেও বেশি সাবধানতা অবলম্বন করছি। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যখন পরিবারের কেউ কোনো রুমে নামাজ পড়ছেন তখন বাইরে বা অন্য রুমে খেলারত শিশুদের খেলতে বাধা দেয়া হয় বা ধমক দেয়া হয়। আমি একবার এই নিয়ে রাসূল (সা) নামাজ পড়ার সময় হযরত হাসান ও হুসাইন (রা) সিজদারত অবস্থায় তাঁর পিঠে উঠে পড়লে তাদের পড়ে যাওয়ার আশংকায় তাঁর সিজদা থেকে না উঠার উদাহরণ দিলে আমাকে বললেন, আমাদের ক্ষেত্রে নামাজের সময় অন্য আওয়াজ কানে ঢুকলে নামাজের মনোযোগ নষ্ট হয়।

নিজের নামাজে একাগ্রতার অভাব আমরা অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে ঢাকতে চাই। তেমনি আমরা পর্দা কায়েমের আগে ফিতনা নিয়েই বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ি। যে বোনটি বোরকা পড়ছে না কিন্তু ঢিলেঢালা জামার উপর ওড়না দিয়ে মাথা ও গায়ের ঊর্ধ্বাংশ ঢেকে রাখছে, কী কারণে সে ফিতনা সৃষ্টি করবে? আর প্রয়োজন ছাড়া তার দিকে কেউ কেনই বা তাকাবে?

আমি এটি বুঝি না– মুখ খোলা রাখলেই কী করে ফিতনার আশংকা করা যায়!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনাকেও ধন্যবাদ। সাবধানতা অবলম্বনের এই ভুল পন্থা সাহাবাদের সময় হতে চলে এসেছে। যে তিন গ্রাম্য সাহাবী অব্যাহতভাবে নামাজ পড়া, রোজা না ভাংগা এবং বিয়ে না করার শপথ করেছিলেন, তাঁরা নিতান্ত সৎ নিয়তেই তা করেছিলেন। কিন্তু রাসূল (সা) এ ধরনের চরমপন্থা ও কঠোরতাকে অনুমোদন দেননি। এ প্রসংগে হযরত আয়িশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত সেই বিখ্যাত হাদীসটি সম্বন্ধে আমাদের চিন্তা করতে হবে। তিনি বলেছেন, মেয়েরা এখন (রাসূলের (সা) ইন্তেকালের পর) যেভাবে সাজসজ্জা করে বের হচ্ছে রাসূল (সা) তা দেখলে তাদেরকে দেয়া মসজিদে আসার অনুমতি প্রত্যাহার করতেন। হাদীসটি বুখারী বর্ণনা করেছেন। অতএব, ধরে নেয়া যায়, এর বর্ণনাসূত্র নির্ভরযোগ্য। তৎসত্ত্বেও এই হাদীসের বিষয়বস্তু কি গ্রহণযোগ্য?

রাসূল (সা) যেসব বিধিনিষেধ জারী করেছিলেন, সেগুলোর স্ট্যাটাস সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলছেন, “ওয়ামা ইউনতিক্বু আনিল হাওয়া…।” অর্থাৎ তিনি নিজ বুঝজ্ঞান মোতাবেক কথা বলেন না, বরং এসব কিছু হচ্ছে রাব্বুল আলামীনের তরফ হতে নাযিল করা জিকর। এই আয়াতের বক্তব্য অনুসারে রাসূল (সা) স্বীয় জামানার পরে কী হবে তা না জানলেও মহান আল্লাহ জানতেন। অতএব, এ ব্যাপারে (নারীদের অধিকার) কোন ধরনের স্থায়ী কর্মনীতি অবলম্বন করা সমীচীন হবে, তা আল্লাহর তরফ হতে রাসূলের হাদীসের মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।

আল্লাহর রাসূলের হাদীসের কার্যকারিতাকে স্থায়ীভাবে রদ করার অধিকার কারো আছে কি? বলা হয়, হযরত ওমর (রা) মেয়েদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি রহিত করেছেন। আমার জানা মতে, যেদিন ফজরের নামাজে তিনি আবু লুলু’র হাতে ছুরিকাহত হয়েছেন, সেই সালাতেও তাঁর স্ত্রী হযরত আতীকা (রা) উপস্থিত ছিলেন। হযরত ওমর (রা) চেয়েছিলেন, উম্মুল মুমীনিনরা যেন গৃহাভ্যন্তরেই অবস্থান করেন যা রাসূলের (সা) জীবিতাবস্থায় অহী নাযিলের মাধ্যমে কার্যকরী করা হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, যে কোনো ধরনের ও পরিমাণের ফেতনার আশংকাই আমরা করি না কেন, রাসূল (সা) যা কিছু দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, করেছেন, মহান সাহাবাগণ রাসূলের নির্দেশকে যেভাবে আমল করেছেন তার ব্যতিক্রম সব ফতোয়া বা ব্যবস্থা অগ্রহণযোগ্য হওয়া ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। খাইরুল কুরুনে যা পাওয়া যায় না, ইজতিহাদের অবকাশ হলো শুধুমাত্র সেসব ক্ষেত্রে।

ঈমান তথা চেতনাগত দিক ছাড়া (আমলগত) সকল বিষয়ে আমাদেরকে এক্সট্রিমিজম ও পিউরিটানিজম হতে বাঁচতে হবে। ইসলাম হলো সহজ, সহজাত বিষয়। সুন্নাহর দাবি হলো যথাসম্ভব সহজ করা, যথাসম্ভব রুখসত (অবকাশ বা রেহাই) দেয়া। অতিরিক্ত সতর্কতা বা কাঠিন্য (রিগরিজম) মানে তাকওয়া নয়।  ক্লাসিক্যাল ফিকাহর প্রতি সম্মান রেখে আমাদেরকে পুনরায় সরাসরি রাসূলের (সা) হাদীস তথা সুন্নাহমুখী হতে হবে। ফিকাহ যেহেতু সুন্নাহর ব্যাখ্যা হিসাবে গড়ে উঠেছে, তাই সরাসরি মূল উৎস হতে দ্বীন ও শরীয়াহকে বুঝতে চাওয়ার মধ্যে সমস্যা দেখি না। সামগ্রিকভাবে অধ্যয়ন না করে অনুবাদনির্ভর দুয়েকটি সহীহ হাদীসকে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বর্ণিত অপরাপর হাদীসসমূহকে উপেক্ষা বা অগ্রাহ্য করার সাম্প্রতিক প্রবণতাই হলো সমস্যা। মন্তব্য অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল! ভালো থাকুন।

বুলেন: “আদর্শিক দিক থেকে সমাজের মধ্যে বিরোধ যত তীব্র হচ্ছে, সমাজের রক্ষণশীল ও প্রগতিশীল এই দুই প্রান্তশিবিরে লোকসংখ্যাও ততটা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।”

আপনার এই পর্যবেক্ষণটা বেশ যৌক্তিক মনে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে অনেকদিন ধরে এই পর্দার প্রসার নিয়ে একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজছিলাম। জাযাকাল্লাহ খাইরান।

“আমাদেরকে কয়েকটি সাংঘর্ষিক বিষয় একসাথে মেনে চলতে হবে: বোল্ড, কনসিসটেন্ট এন্ড প্যাশেন্ট!”

এই বিষয়টা মানতে পারলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যেত বলে মনে করি। ইখওয়ান পাশ্চাত্যের অনেক দেশসহ আরবের অনেক দেশেই নিকাব ছাড়া হিজাবকে প্রাতিষ্ঠানিকরণ করেছে। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশে জামায়াত নিকাবসহ হিজাব্কেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। এই নিকাবের অবস্থান নিয়ে কোনো দল কাউকে ইনভ্যালিড করে দেয় নাই।

কণ্ঠস্বরের পর্দাকে মনে করি অনেকে অনেকটাই আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে থাকেন। কয়েকজনকে দেখেছি সানগ্লাস দিয়ে চোখের পর্দা, এমনকি হ্যান্ডগ্লোভস দিয়ে হাতের পর্দা করতে!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মুখ ঢাকাকে যারা জরুরি মনে করেন এমন একজন নারীও কেন (দ্বিস্তর বিশিষ্ট) পাতলা পর্দা দিয়ে সম্পূর্ণ মুখ ঢেকে চলেন না, এটি বুঝতে পারছি না। তবে কি তারা পর্দা করতে গিয়ে অসচেতনভাবে এক ধরনের ফ্যাশন চর্চা করছেন?

নিকাব শব্দটা কোরআনের নয়। কোরআনের সংশ্লিষ্ট টার্মটা হচ্ছে হিজাব। নিকাব হতে পারে জিলবাব তথা হিজাবের অনেকগুলো ধরনের মধ্যে একটা ধরন বা প্রকারবিশেষ। অবশ্য বর্তমানে যেভাবে নেকাব দেয়া হয় তাতে মুখের কিয়দংশ মাত্র আবৃত হয়। এই আংশিক নেকাবের যুক্তি কী, সেটি কেউ বললেন না! মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

তারাচাঁদ: মোজাম্মেল ভাই, সময়ের অভাবে আপনার পোস্ট আগে আমি ভালো করে পড়তে পারিনি। না পড়েই ভিন্ন জায়গায় বলেছি, আপনার পোস্টের সাথে আমার কিছু ভিন্নমত আছে। এখন পুরো পোস্ট মন্তব্যসহ পড়লাম। পয়েন্ট আকারে (একাডেমিক্যালি?) যেভাবে লিখেছেন, তা নিঃসন্দেহে সুপাঠ্য। আপনার মূল পোস্ট বা এর ব্যাখ্যার সাথে আমার কোনো ভিন্নমত নেই। তবে, ৯ নম্বর পোস্টে নেকাবধারী এক মহিলার আচরণের যে ব্যাখ্যা আপনি দিয়েছেন, সে ব্যাখ্যার সাথে আমি একমত নই। আপনার প্রাক্তন ছাত্রী আপনাকে শিক্ষকের মতই সম্মান করেছেন। আমাদের দেশে শেখানো হয় শিক্ষকের সাথে উচ্চস্বরে কথা না বলতে, তাকে সম্ভ্রম করতে এবং এরই সাথে নারীদের শেখানো হয় পুরুষদের লজ্জা করতে। আপনার প্রাক্তন ছাত্রী আপনাকে তিনটিই করেছেন। তার এমন আচরণ আপনার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকেছে। একজন লজ্জাবতী নারীর জন্য যা লজ্জা, আপনার কাছে তা বেয়াদবী মনে হয়েছে। এ বিষয়ে এ-ই আমার ব্যাখ্যা।

২. কণ্ঠস্বরের পর্দা বিষয়টি একেবারে নগন্য নয়। কয়েকদিন আগে আমি এক ডাক্তার সাহেবের বাসায় ফোন করি। ফোন রিসিভ করলেন তার উনবিংশতি বর্ষীয়া কন্যা। তার সুন্দর কণ্ঠস্বর এবং চমৎকার সাবলীল উচ্চারণ শুনে আমার মনে হয়েছিল, হাজারো পুরুষ এই কণ্ঠস্বর শোনার জন্য বার বার ব্যাকুল হতে চাইবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে আমাদের আদেশ দিয়েছেন।

একটি ডেন্টাল কলেজের মেয়েদের হোস্টেলের টেলিফোনে বাইরে থেকে কে যেন ফোন করল। শেষ বর্ষের ছাত্রী ফাতেমা ফোন রিসিভ করলেন। ওপাশের পুরুষটি বলে উঠল, আপনার গলার স্বর তো ভারি মিস্টি! পরবর্তীতে ফাতেমা নিজে আমাকে এ কথা বলেছেন। এমনসব ক্ষেত্রে পরপুরুষের সাথে কথা বলার সময় নারীদের আরো সতর্ক হওয়া উচিত নয় কি? তবে শিক্ষক বা গুরুজনকে সালাম না দেয়া, তাদের কুশল জিজ্ঞাসা না করাটা অনেকটাই অসামাজিকতা। আমাদের সমাজ যখন এ ধরনের অসামাজিকতা শিখায়, তখন এমন আচরণের জন্য শুধু নেকাবধারীদের দোষ দেয়া যায় না। আপনি আপনার পঁয়তাল্লিশে এসে যত স্বচ্ছন্দে সবার সাথে কথা বলতে পারেন, বিংশতিবর্ষীয়া কিঞ্চিত-অধিক লজ্জাবতী নারী ততটাই সংকোচ অনুভব করে সবার সাথে কথা বলতে। এ দোষ নেকাবের নয়; কিছুটা বয়সের, আর কিছুটা সামাজিক শিক্ষার।

নেকাব নারীদের উন্নতির পথে বা মেধাবিকাশের পথে বাধা বলে আমি মনে করি না। আমার নিজের জানাশোনা মানুষদের মধ্য থেকে বাস্তব উদাহরণ দেই। এক গ্রাম্য মেয়ে ছিল খুবই মেধাবী, একই সাথে সুন্দর মুখশ্রীর অধিকারীনি। এসএসসি পরীক্ষায় মেয়েটি খুব ভালো রেজাল্ট করল। দুই-তিন গ্রাম দূরের কামিল পাশ এক ছেলের সুনজর পড়ল তার উপর। ছেলেটি তার পরিবারকে জানাল, এ মেয়েকে বিয়ে করাতেই হবে। জোর চাপাচাপির ফলে মেধা এবং নেকাব উভয়ের অধিকারিনী এই কিশোরী অন্যের স্ত্রী হতে বাধ্য হল। সেই মেয়ের বড় ভাই একটি সরকারী মেডিকেল কলেজে পড়ত। বিয়ের বেশ কিছুদিন পর মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া বড়ভাইটি আমার কাছে এসে তার বোনের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবার খবর শোনাল। একই সমান মেধার অধিকারী হয়েও এক ভাই প্রায় ডাক্তার হলো, আর তারই বোন পড়াশোনা শিকেয় তুলে অন্যের গৃহে বন্দী হলো। আমি শুধু বলেছিলাম, তোমরা তোমার বোনকে মেরে ফেলেছ। এই যে আমার পরিচিত একজনের বোন পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হলো, সে দোষ কি নেকাবের? নাকি গরুর সমান বুদ্ধির অধিকারী শ্বশুর-শাশুড়ির?

উপরে আমি ফাতেমা নামের এক ডেন্টাল কলেজ ছাত্রীর কথা বলেছি। তিনিও নেকাবধারীনি। নেকাব ধারণ করার কারণে এই ছাত্রীকে প্রায়শই তার শিক্ষকদের কটুকথা শুনতে হয়েছে। এই ছাত্রী ডেন্টাল কলেজে পড়া সত্ত্বেও মেডিসিন বিষয়ে ‘’অনার্স’ নম্বর পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পরীক্ষায় সব ডেন্টাল কলেজের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন। কই, তার নেকাব তো তার মেধাবিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি! মেধা আর আগুন, এই দুইকে চাপা দিয়ে রাখা যায় না।

পর্দাকে ভীতিকর সাবজেক্টে রূপান্তর করার দায় শুধু ছাত্রী সংস্থার কেন? এজন্য সবচেয়ে বেশি দোষী ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারকারীরা। তারপর আমাদের আলেম-ওলেমা-ওয়ায়েজিনগণ। ইসমাকে সুন্দরভাবে, সহজভাবে উপস্থানে যোগ্যতাহীন মানুষগুলো ওয়াজ শুরু করলে পর্দাসংক্রান্ত বিষয়ে নারীদের বিরূপ মন্তব্য দিয়ে তাদের ওয়াজের সিংহভাগ সময় ব্যয় করে। অথচ, আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে মানুষের কাছে ইসলামকে সহজভাবে উপস্থাপন করতে। ইসলামের দাওয়াতদানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, প্রায়োরিটিজ মাস্ট বি মেনশনড ফার্স্ট (দুঃখিত! বাক্যটিকে বাংলায় সহজ করে লিখতে পারছি না।) আল্লাহর রাসূল (সা) যখন মুয়ায ইবনে জাবালকে ইয়েমেনের গভর্নর এবং শিক্ষক করে পাঠাচ্ছিলেন, তখন তিনি বললেন– “দেখ! তুমি একটি আসমানী কিতাবধারী জাতির কাছে যাচ্ছ। সবার আগে তাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানাবে। যদি তারা এটা মেনে নেয়, তাহলে তাদের বলবে, আল্লাহ দিনে ও রাতে পাঁচবার নামাজ পড়া ফরয করেছেন। এটাও মেনে নিলে ধনীদের কাছ থেকে যাকাত আদায় করে তাদেরই গরীবদের মাঝে যাকাত বন্টন করে দিবে।”

গুরুত্বপূ্র্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা প্রজ্ঞাসম্মত এবং এটা রাসূলের (সা) সুন্নত। দেখুন, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে মানার পরই তার পরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমল করতে বলা হয়েছে। মানুষকে যখন উত্তমভাবে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করার শিক্ষা দেয়া হবে, তখন পর্দার কথা আর আলাদাভাবে বলে দিতে হবে না। আল্লাহর ভয়ে, অথবা তাঁরই ভালোবাসায় খুশি মনে ইসলামের সব হুকুম-আহকাম তারা পালন করবে। পর্দা করা ফরয। তবে এর গুরুত্ব নামাজ-রোজার চেয়ে বেশি নয়। কেউ যদি ওয়াজ করতে গিয়ে পর্দার উপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, তখন মানুষ ইসলামকে কঠিন মনে করে ভয়ে পালাবে। তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের আদেশ দিয়েছেন হিকমত বা প্রজ্ঞার সাথে দাওয়াত দিতে। দাওয়াত দেবার আগে বুদ্ধিমত্তা এবং প্রজ্ঞা অর্জন করা কর্তব্য।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনার সুলিখিত মন্তব্য পড়ে ভীষণ ভালো লাগলো। আমি আসলে পর্দা সংক্রান্ত পোস্টগুলোতে জড়াতে চাইনি। লোকমানের আগ্রহে তাঁর পোস্টে অতীব সংক্ষেপে কিছু মন্তব্য করেছি। সে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য বলাতে আরও কিছুটা লিখেছি। সেদিন রাতে সিরাজুম রুমী’র পোস্টে হঠাৎ কিছু বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসি। তিনি সাথে সাথে আমাকে অত্যন্ত বাজে কমেন্ট করেন। আমি উত্তর দেয়ার সাথে সাথে তিনি মন্তব্যগুলো মুছে দেয়াতে সাংঘাতিকভাবে আহতবোধ করে একটা পোস্ট দিয়ে দেই। এখন ভাবছি, সেটি না করাই আমার জন্য শোভন ছিল! যাহোক, এর পর পরই পোস্ট দেয়ার পরে ব্লগারদের দেয়া মন্তব্যের উত্তর দেয়ার নৈতিক বাধ্যতাবোধের কারণে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে জড়িয়ে পড়ি। পরে ভাবলাম, এ বিষয়ে আমার মতামত নিয়ে একটা লেখা দেয়া দরকার। ফলশ্রুতিতে এই পোস্ট।

কথার গুরুত্বের কারণে হোক অথবা ব্যক্তি হিসাবে আমার পরিচিতির কারণে হোক আলোচ্য পোস্টের “‘কণ্ঠস্বরের পর্দা’ নামক নব উদ্ভাবিত ফেইক মাসয়ালা…” অংশটুকু নিয়ে ব্লগাররা ইতোমধ্যেই পক্ষে-বিপক্ষে এতটাই কনসার্ড হয়ে গেছে যে, বেশ ক’বার চিন্তা করা সত্ত্বেও মন্তব্যটি মডিফাই করার ব্যাপারে মনস্থির করতে পারিনি। অবশ্য, কণ্ঠস্বরের পর্দার ব্যাপারে কোনো এক মন্তব্যে ব্যাখ্যা দিয়েছি।

আপনি নারী কণ্ঠের আকর্ষণের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা বাস্তবসম্মত। চবিতে সাংবাদিকতা বিভাগে একজন মহিলা শিক্ষক আছেন যার গলার আওয়াজ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। অথচ তিনি এ বিষয়টি ছাড়া অন্য কোনো দিক থেকেই ততটা আকর্ষণীয় নন। উনাকে দেখার পরে তাঁর কণ্ঠস্বর দ্বারা কেউ যতটুকু মুগ্ধ হবেন, (তাঁকে না দেখে) শুধুমাত্র কণ্ঠস্বর শুনলে তারচেয়ে অনেক গুণ বেশি আকর্ষণবোধ করবেন। তাহলে বুঝুন, করণীয় কী হতে পারে, বা হওয়া উচিত!?

আমার এক ইন-ল নিকাব পরেন। একবার তাঁর পেছনে পেছনে সত্যি সত্যি এক লোক বাসায় চলে এসেছিলো। সে ব্যাটার আবদার ছিলো তাঁর মুখ দেখবে। চা-নাস্তা দেয়ার পরও কোনো মতে যায় না। লোকটি সেই নববিবাহিতা আত্মীয়ার স্বামীর বন্ধু ছিল। যাহোক, আমার সে অতীব সুন্দর চোখের অধিকারীনি আত্মীয়ার নাকটা মাঝখানে খানিকটা বাঁকা (ভাংগা?)। নেকাব তাঁকে কতটুকু এবং কী বিষয়ে সহায়তা করছে, বলতে পারেন? (আপনার মন্তব্য বলেই ব্যাপারটা লিখলাম।)

নারী কণ্ঠের মিষ্টতাসহ নারী-পুরুষের যৌনতা সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ই সংবেদনশীলতার মাত্রার উপর নির্ভর করে। পারস্পরিক এই সংবেদনশীলতা নিতান্তই স্বাভাবিক। চরম মাত্রার আগ পর্যন্ত এসবই মানবিক দৃষ্টিকোণ হতে ক্ষমার যোগ্য হিসাবে নির্দোষ বলা যায়। তাই, পর্দা পুরোপুরি রক্ষিত হতেই হবে, এমনটা নয়; যদিও পর্দা পুরোপুরি রক্ষার যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে প্যারাডক্সিক্যাল বা কন্ট্রাডিক্টরি এই কথাটা আপনি বুঝবেন, আশা করি। আপনার মন্তব্যের শেষ দুই প্যারা এতটাই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ যে, শুধুমাত্র এই মন্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে যদি একটা লেখা দিতেন, অনেক ভালো হতো। ভালো থাকুন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: একটি ইমেইল: ক’দিন আগে একটি মেইল পেলাম। বক্তব্য নিম্নরূপ–

“আসসালামু আলাইকুম। আমি আপনার ‘পর্দা ও সংবেদনশীলতার মাত্রা’ নিয়ে লেখাটা পড়েছি। আমি আপনার এ কথার সাথে একমত যে, নারীদের মুখমণ্ডল খোলা রাখলে পুরুষের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত না হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। এই যু্ক্তির ভিত্তিতে আপনার বলা উচিত, মাথার উড়না ও পরনের লম্বা কাপড়গুলো অপসারণ করলে মনযোগ আরও বেশি পরিমাণে বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। পাশ্চাত্য কৃষ্টিতে মেয়েরা শুধুমাত্র হাফ প্যান্ট এবং গেঞ্জি পরে যেগুলো খুবই স্বচ্ছ। আমরা তাদের দিকে তাকানোর আগ্রহবোধ করি না। তাই, আল্লাহ কি নারীদের হিজাব পরিধানের হুকুম দিয়ে ভুল করেছেন? প্লিজ, আমাদের নারীদের বলুন– তারা শুধুমাত্র নিকাব নয়, বরং বোরকা এবং তথাকথিত শালীন পোশাকও যেন বাদ দেয়! তাদেরকে বলুন, পাশ্চাত্যের নারীদের অনুসরণ করতে যাতে আমাদের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। আর সম্পূর্ণ দেহ যদি উন্মুক্ত থাকে তাহলে আরও ভালো। কেননা, তখন আমরা পুরুষরা তাদের দিকে তাকিয়ে কোনো আগ্রহবোধ করবো না। আমার মনে হয় এটি অর্থহীন (ওয়ার্থলেস)। শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয়, আমেরিকাতেও জন্মগত মুসলিমরা আপনাকে অনুসরণ করা শুরু করেছে। মসজিদের ইমামগণ আপনার মতোই উচ্চশিক্ষিত এবং তারা আপনার চেয়েও বেশি স্মার্ট। কারণ, তাদের মুখে দাড়ি নাই, তারা নারীদের সাথে কোলাকুলি করে, চুমু দেয়, তরুণীদের সাথ হাত মিলায়। ভারি সুন্দর! এই হলো আধুনিক ইসলাম।

যাহোক, দুঃখের বিষয় হচ্ছে ধর্মান্তরিত মুসলিমরা আপনাকে কদাচিৎই অনুসরণ করে। এর মানে, এক একটি পানি ভরা গ্লাস ক্রমশ শূন্য হচ্ছে এবং শূন্য গ্লাসগুলো ক্রমাগত ভরে উঠছে। এবং আমি এ কথা জেনে প্রীত হচ্ছি, এই ধরনের ক্ষেত্রে গণিতবিদরা সাহিত্যের বিশেষজ্ঞদের চেয়ে বেশি বাংলা সাহিত্য জানে; ইতিহাসবিদগণ পদার্থবিদ্যাবিদদের চেয়ে পদার্থবিদ্যা বেশি জানে, এবং এরই ধারাবাহিকতায় দার্শনিকরা তাদের চেয়ে বেশি ইসলাম সম্পর্কে জানে যারা সবসময় কোরআন, হাদীস, ফিকহ অধ্যয়ন করে। সমস্যা হলো, আমরা ব্যক্তিগতভাবে বা আমাদের পরিবার-পরিজন ইচ্ছায় কিম্বা অনিচ্ছায় যা করে থাকে, আমরা সেটিকে ইসলামীকরণ করার এবং এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের প্রয়াস পাই। আমরা আমাদের কাজকর্মে যুক্তির অনুসরণের পরিবর্তে আমাদের কাজকর্ম অনুসারে যু্ক্তি দিয়ে থাকি।”

তাৎক্ষণিক উত্তর: এই মেইলের তাৎক্ষণিক উত্তরটি ছিলো নিম্নরূপ–

আপনার সুচিন্তিত মতামতের জন্য ধন্যবাদ। দিন কয়েকের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট উত্তর পাঠানোর আশা রাখি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি (আন্ডারস্ট্যান্ডিং) সুস্পষ্ট করতে চাই। নতুন কোনো যুক্তি খাড়া করার ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নাই। দোয়া করবেন।

সুনির্দিষ্ট উত্তর: ক’দিন নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আজ বসলাম।

১. মূল যুক্তি: পর্দা ও সংবেদনশীলতা সংক্রান্ত আমার যুক্তিটি প্রাসঙ্গিক যুক্তি। মূল যুক্তি নয়। মুখ ঢাকা বা না ঢাকা সংক্রান্ত মতদ্বৈততা প্রসঙ্গে আমার মূল যুক্তিটা হলো– যারা মনে করেন, মুসলিম নারীদের জনসম্মুখে মুখ ঢাকা জরুরী তাহলে তারা তা যথাযথভাবেই করবেন। যারা মুখ ঢাকা জরুরী মনে করেন না তারা মুখমণ্ডল প্রয়োজনে খোলা রেখে বা প্রয়োজনে ঢেকে চলবেন। এমতাবস্থায় যারা পরপুরুষের সম্মুখে মুসলিম নারীর মুখমণ্ডল ঢেকে রাখাকে আবশ্যকীয় মনে করেন অথচ কপালের ঊর্দ্ধাংশ হতে নাকের অগ্রভাগ পর্যন্ত খোলা রেখে চলাফেরা করেন তারা মুখ ঢাকার জরুরতকে পূরণ করছেন না। বরং ভংগ করছেন। চোখ ও চোখের আশেপাশের অনেকটুকু খোলা রেখে তারা এক ধরনের ফ্যাশন করছেন, যা নারীদের সৌন্দর্য চর্চার একটা ধরন বা স্টাইল হিসাবে সব সভ্য সমাজে প্রচলিত ছিল এবং আছে।

২. ব্যক্তি বনাম ব্যক্তিত্ব: ব্যক্তি নিজের শরীরি অবয়বকে কতটুকু প্রকাশ করবে আর কখন কার কার থেকে কতটুকু প্রকাশ বা আড়াল করবে তা সভ্যতা-ভব্যতার নিরিখে অবশ্যেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তারচেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় হচ্ছে – নারী হোক, পুরুষ হোক – মুসলিম হিসাবে প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বের বিকাশ, প্রকাশ ও (সামাজিক ক্ষেত্রে) প্রয়োগ কিম্বা চর্চার বাধ্যবাধকতা। আমার পুরো আলোচনার এটি হচ্ছে মূল বা ফোকাল পয়েন্ট।

৩. পর্দা ও সংবেদনশীলতা:

(ক) প্রকাশের মাত্রা এবং আগ্রহের পরিমাণ: এতদুভয় হচ্ছে বিপরীত অনুপাতে সম্পর্কযুক্ত। এটি একটি ন্যুডিস্ট যুক্তি হলেও বাস্তবানুগ। তাহলে, বলতে পারেন, এই যুক্তির প্রসংগ আমি কেন টানলাম?

(খ) যুক্তির সীমা: আসলে যখন যেখানে যতটুকু পর্যন্ত যুক্তির অবকাশ আছে বা থাকে তখন সেখানে ততটুকু পর্যন্ত যুক্তি প্রয়োগ করার অবকাশ থাকে। যদিও সেই যুক্তিটির মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ আপনাকে বেপথু করতে, অসংগত উপসংহারে টেনে নিয়ে যেতে পারে। যেমন, সব কাজের কর্তা আছে। তাহলে বিশ্ব একটি ক্রিয়া বা ক্রিয়ার ফসল হিসাবে এর কোনো কর্তা থাকবে। তা হলো সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ। এক্ষণে, যদি যুক্তির লাগাম টেনে ধরা না হয়, তাহলে প্রশ্ন আসবে– আল্লাহকে একটি ক্রিয়া হিসাবে দেখলে এর কর্তা কী হবে? এই প্রশ্নটা যে করা যাবে না, এখানে যে যুক্তি চলে না, তা একটি সহায়ক যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করতে হবে। সহায়ক যুক্তিটি হলো– আমাদের প্রশ্ন বা প্রসংগটি হলো জগতকে ব্যাখ্যা করা। যার উত্তর আমরা আল্লাহকে খুঁজে পাওয়ার মাধ্যমে পেয়ে গেছি। তাই, ‘আল্লাহর সৃষ্টিকর্তা কে?’ জাতীয় প্রশ্নগুলো হচ্ছে ক্যাটাগরি মিসটেক। লক্ষ্য করুন, যেখানে যুক্তি চলবে না সেখানে (উন্নততর বা সহায়ক) যুক্তি দিয়েই বোঝানো হচ্ছে কেন সেখানে (আগের ধরনে) যুক্তি চলবে না।

(গ) এবার আসুন, পর্দার ক্ষেত্রে। কোরআন শরীফের আয়াতাংশ ‘ইল্লা মা জাহরা’, ‘জালাবিহিন্না’র ব্যাখ্যা হিসাবে মতদ্বৈততা হচ্ছে মুখ খোলা রাখা যাবে কি না– তা নিয়ে। পরপুরুষের সামনে মাথা এবং শরীর প্রকাশ করা যাবে কি না– তা নিয়ে কোনো মতদ্বৈততার কথা কেউ কি বলেছে? অতএব, বুঝতেই পারছেন, এ বিষয়ে আপনার নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিকভাবে প্রয়োগকৃত বাক্যসমূহ কোন পর্যায়ের হয়েছে!

৪. ইখতিলাফি বিষয়ে মন্তব্যের মাত্রাজ্ঞান: যারা মুখ খোলা রেখে মুসলিম নারীরা বাহিরে যাতায়াত করতে পারবে মনে করেছেন, তারা আল্লাহর রাসূলের (সা) সহীহ হাদীস হতে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এই দলে আছেন সাহাবীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশসহ ইমাম আবু হানীফা (রহ) হতে শুরু করে হাল জামানার আল্লামা নাসির উদ্দীন আলবানী ও ইউসুফ কারযাভীর মতো গ্রহণযোগ্য বিশেষজ্ঞবৃন্দ। তাই, কাউকে ‘আধুনিক’ হিসাবে অশ্রদ্ধামূলক বাক্যবাণ ছোঁড়ার পূর্বে ক্ষেত্র এবং পাত্র জ্ঞানটা বিধেয়।

৫. প্রাতিষ্ঠানিক ইসলাম শিক্ষা: আমার ইসলাম শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক অথরিটি না থাকা নিয়ে ইঙ্গিতমূলকভাবে যা বলেছেন তাতে আমি আহতবোধ করলেও স্বীকার করছি, আমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করিনি। তাই সঙ্গত কারণেই কোনো ফতোয়া দেয়ার যোগ্যতা আমার নাই। একজন মুসলিম হিসাবে, প্রায় তিরিশ বছর ধরে সক্রিয়ভাবে কোরআন-হাদীস অধ্যয়ন ও ইসলামী আন্দোলনে যুক্ত থাকার ফলশ্রুতিতে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা ও মতামত প্রকাশ করার অধিকার আছে, দাবী করছি। Daily Star পত্রিকায় জনাব বদরুল আহসানের Cross Talks সাব-এডিটোরিয়ালের ‘Formal Education is Certified Ignorance’ শিরোনামের একটা লেখার কথা এ মুহূর্তে বেশ মনে পড়ছে! মাদ্রাসায় পড়া হয়নি– এটি মনে করলে অনেক সময় মন খারাপ হয়। কখনো আবার সান্ত্বনাও পাই! মনে হয়, আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। ‘ইসলাম’ বিষয়ে প্রিস্ট-ক্লাসের মতো সম্প্রদায়বিশেষ বা অন্য কারো ‘কপিরাইট’ আছে, এমনটা মনে করি না। মাদ্রাসায় ফিকাহর উপর টাইটেলপ্রাপ্তরাই কেবল ‘ইউফাক্কিহু ফিদদ্বীন’-এ উত্তীর্ণ হবেন, এমনটাও মনে করি না।

৬. আমার পরিবারের নিকাব ও পর্দা: আপনার নিতান্তই ব্যক্তি-আক্রমণমূলক কথাগুলোর অংশবিশেষকে এড়িয়ে গিয়ে একটা ব্যক্তিগত বিষয়ে আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে অন্যান্যদেরকে জানাতে চাচ্ছি। আপনি যেহেতু আমার পরিচিতজন, তাই “সমস্যা হলো, আমরা ব্যক্তিগতভাবে বা আমাদের পরিবার-পরিজন ইচ্ছায় কিম্বা অনিচ্ছায় যা করে থাকে, আমরা সেটিকে ইসলামীকরণ করার এবং এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের প্রয়াস পাই।”– এই অংশটুকু আপনি আমার স্ত্রীর নিকাব পরা ছেড়ে দেয়াকে লক্ষ্য করে বলতে পারেন, ধারণা করছি। আমার স্ত্রী একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা যিনি চাকরির ইন্টারভিউ দেয়ার সময়ও নিকাব খোলেন নাই। কনভোকেশন প্রসেশনেও (১৯৯৪) তিনি নিকাব পরিহিতা ছিলেন। শিক্ষকতা করতে গিয়ে অন্যান্যরা, বিশেষ করে স্টুডেন্টরা তাঁকে আইডেন্টিফাই করতে গিয়ে প্রায়ই ভুল করছেন বিধায় আমার পরামর্শে তিনি নিকাব পরা বন্ধ করেছেন। কারণ, কখনো আমি নিকাব পরা জরুরি মনে করিনি। নিকাব পরাকে খারাপও মনে করিনি। নিকাব পরাকে জরুরি মনে না করলেও তাঁকে বিয়ে করেছি, নিকাব সহকারে চাকরি করার অনুমতি দিয়েছি, সহযোগিতা করেছি। নিকাব পরা কিম্বা চাকরি করা কোনোটার জন্যই বাধা দেই নাই বা বাধ্য করি নাই। নিকাব তাঁর ব্যক্তিত্ব ও মেধার বিকাশ ও প্রকাশে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নাই।

যারা নারীদের বিশেষ জরুরি মানবিক প্রয়োজন ছাড়া বাহিরে যাওয়া, ইসলামী জিন্দেগী পালনের উপযোগী কোরআন-হাদীস ও গার্হস্থ্য বিদ্যা শিক্ষার অতিরিক্ত অত্যাধুনিক বিশেষায়িত সাবজেক্টে পড়া ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের সনদলাভের পর নারীদের চাকুরী করাকে পছন্দ করেন না, জায়েয মনে করেন না, তারা কেন উচ্চশিক্ষিতা মেয়েদেরকে বিয়ে করেন, আমার বুঝে আসে না!

৭. ইমেইলের মতো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ব্লগে লেখা দেয়ার কার হলো, আপনি উপরোক্ত মেইল-মন্তব্যে এক শ্রেণীর মানসিকতাকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন যে ব্যাপারে (আপনার পরিচয় উহ্য রেখে) আমার দৃষ্টিভঙ্গি (আন্ডারস্ট্যান্ডিং) প্রকাশ করা প্রয়োজন মনে করেছি। বিশেষ করে, যখন আপনি নিজেই আমার একটি ব্লগ-পোস্টের রেফারেন্স দিয়েছেন।

৮. আধুনিক ইসলাম বলে আপনি যে শ্লেষ করেছেন, সে ব্যাপারে আমার কোনো বক্তব্য নাই। শুধু এতটুকু বলতে পারি, Islam is as classic as anything could be, at the same time, Islam is as modern as anything could be. Islam is always classic, always modern, most classic, most modern. এ বিষয়ে আমি অধিকতর কোনো বাক্য বিনিময়ে আগ্রহী নই! ক্ষমা করবেন, যদি অতিরিক্ত বলে থাকি! ভালো থাকুন।

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *