সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলো (No conflict with any authority)

একবিংশ শতাব্দীর নজীরবিহীন ও অভিনব বাস্তবতার আলোকে যারা নতুন ধারায় ইসলামী আন্দোলনের কাজ করতে চান তাদের অন্যতম কর্মপদ্ধতি হওয়া উচিত ‘no conflict with any authority’। সোজা কথায়, যে কোনো ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যাওয়া। নবুয়তের প্রথম দশ বছরে যেমনটা করেছিলেন মহানবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার যে পদ্ধতি তিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই নীতি– avoid unnecessary conflict। সংঘাত-সংঘর্ষকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা হলো রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নত। কিন্তু যখন তা অনিবার্য হিসেবে গায়ের উপর এসে পড়ে তখন শক্তি-সামর্থের সবটুকু নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে মোকাবেলায় এগিয়ে যাওয়া।

এই সূত্রানুসারে বিবেচনা করলে রাসূলে খোদার পুরো নবুয়তী জিন্দেগীর কর্মধারা আপনার কাছে সুসামঞ্জস্য হিসাবে প্রতিভাত হবে। তৎকালীন মক্কাতে মোহাম্মদ (সা) ও তাঁর অনুসারীদের এমন কোনো ক্ষমতা ছিলো না যাতে করে তারা সেখানকার অথরিটিকে মোকাবেলা করে টিকে থাকতে পারেন। তাছাড়া তাওহীদ, রেসালাত ও আখিরাতের মতো অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে জনমানসে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করার জন্য তুলনামূলকভাবে একটা শান্ত পরিস্থিতির আবশ্যিকতাও ছিলো।

২.

হাঁ, রাসূলুল্লাহ (সা) তৎকালীন মক্কায় রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন নাই। এটি সঠিক। কিন্তু আসলেই কি তিনি একেবারে গোবেচারা নির্বিবাদী ধর্মপ্রচারকমাত্র ছিলেন? তিনি কি সব ধরনের সংঘাত এড়িয়ে চলেছেন? অথবা, তিনি সংঘাতমূলক পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র আত্মরক্ষামূলক নীতি মেনে চলেছেন? আমরা জানি, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নেতিবাচক।

সংঘাত বলতে সাধারণত আমরা রাজনৈতিক কিংবা সামরিক সংঘাতকে বুঝে থাকি। বৈষয়িক স্বার্থের দ্বন্দ্বকেও আমরা এক ধরনের অর্থনৈতিক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করি। অথচ, সব ধরনের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব বা সংঘাত হলো আদর্শের দ্বন্দ্ব। চিন্তার সংকট সবচেয়ে বড় সংকট। তাই, conflict of Ideas is the most fundamental conflict।

এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, প্রফেট মোহাম্মদ (সা) তৎকালীন মক্কায় কোন ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। মক্কার লোকদের, বিশেষ করে কুরাইশ বংশের ছিলো তৎকালীন আরব অঞ্চলে প্রথম শ্রেণীর ধর্মীয় পুরোহিতের (priest class) মর্যাদা। এজন্য তারা পর্যাপ্ত জাগতিক ও নৈতিক সুযোগ সুবিধা পেয়ে আসছিলো। কৃষিজ উৎপাদনে একটি অনুর্বর এলাকা হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় কেন্দ্র হওয়ার সুবাদে এটি গড়ে ওঠে তৎকালীন আরবের বৃহত্তম বাণিজ্যিক শহর হিসাবে। তুলনামূলকভাবে সেখানকার পরিস্থিতি ছিলো অনেক বেশি স্থিতিশীল। কিন্তু ইসলাম প্রচার শুরু করার মাধ্যমে মোহাম্মদ (সা) সেখানকার এস্টাবলিশড অথরিটি, প্রিভেইলিং স্ট্যাটাস ও স্ট্যাটাসকো’র লেজিটেমেসির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন। শুরু হলো ‘অস্থিতিশীল’ পরিস্থিতি’। এস্টাবলিশড অথরিটির বৈধতার সংকট। চ্যালেঞ্জটা আসে বুদ্ধিবৃত্তিক (কনসেপ্চুয়াল অর্থে) দিক থেকে।

মহানবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আচরিত কর্মপদ্ধতিকে যদি বোঝার চেষ্টা করি তাহলে আমরা বুঝবো– সমাজে, জনমানসে, মানুষের চিন্তা-চেতনায় জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত মৌলিক বিষয়গুলোকে প্রতিষ্ঠা করার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজটাকে ন্যূনতম মানে সম্পন্ন করার জন্য নানা ধরনের বাহ্যিক (super-structural) সংঘাত-সংঘর্ষকে এড়িয়ে চলতে হবে। এর মানে এই নয় যে লোকেরা যতটুকু চায় আমি ঠিক ততটুকু দিয়ে একটা শর্টকাট মতাদর্শিক রেসিপি তৈরি করে তাদেরকে সার্ভ করবো। এটি যদি করা হয় তাহলে তা হবে একটা populist approach। এই ধরনের জনতুষ্টিমূলক মিঠা ইসলাম দিয়ে আর যাই হোক, আল্লাহর খলীফা হিসেবে দায়িত্ব পালন তথা ইকামতে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে না। বরং এর মাধ্যমে এক ধরনের ধর্মবাদিতার চর্চা হতে পারে।

৩.

তাই এখনকার দিনে যারা ইসলামী আন্দোলনের কাজ করবেন তাদের উচিত হবে ইসলামবিরোধী ও বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনায় প্রভাবিত যে জনমানস বা public intellectual sphere আমাদের মন-মগজ, সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শেকড় গেড়ে আছে সেটাকে সমূলে উৎপাটন করে একটা র‍্যাডিকেল রিফর্মের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই প্যারাডাইমকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা, ইসলামকে ফার মোর বেটার অলটারনেটিভ হিসাবে logically consistent formএ হাজির করা এবং ডমিনেন্ট আইডিওলজি হিসাবে একে প্রতিষ্ঠিত করা।

অতএব, conflict is a must। no conflictory বা wholly peaceful কোনো আইডিওলজি হতে পারে না। সেটি ইসলাম বা যে কোনো মতাদর্শের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। কেননা, সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব হলো অবশ্যম্ভাবী বা kind of ontological necessity। সত‍্যতা হল আলোর মতো। এর বিপরীতে, মিথ্যাত্বকে আমরা অন্ধকারের সাথে তুলনা করতে পারি। আলো এবং অন্ধকার যেমন একসাথে পাশাপাশি থাকতে পারে না, তেমনি করে সত্য এবং মিথ্যার নির্বিবাদী সহাবস্থান অসম্ভব। অতএব, conflict is a must। অবশ্য, কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, কোন পর্যায়ের সত্যের সাথে কোন পর্যায়ের মিথ্যা কখন, কীভাবে আপস করবে, কখন ও কতটুকু লেঙ্কথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে; সেটা স্পেসিফিক ইস্যু ও ক্ষেত্র হিসেবে আলাদা আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। তাই সেটি একটা স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে।

৪.

সাইয়্যেদ কুতুবের সর্বশেষ গ্রন্থ “ফাঁসির মঞ্চ থেকে বলছি” পড়ে দেখলাম, তৎকালীন মিশর সম্পর্কে তাঁর সর্বশেষ আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিলো নিম্নরূপ। তাঁর মতে, সেখানে ঠিক মক্কী যুগের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে মক্কার লোকদের মধ্যে নিছক তাওহীদ, রেসালাত ও আখিরাত নিয়ে কাজ করেছেন, মিশরের লোকদের মধ্যেও সেভাবে এইসব বুনিয়াদী বিষয় নিয়ে ব্যাপকভাবে conceptual work করতে হবে। তাওহীদকেন্দ্রিক মূল কাজগুলো systematically and minimally সম্পন্ন হওয়ার আগে সেখানে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়গুলোর মতো উচ্চতর বিষয় নিয়ে কাজ করাটা উনার মতে ভুল হচ্ছে।

উনার এই অবজারভেশন ও আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা ছিলো সঠিক ও বাস্তবসম্মত। যেটি এখনকার বাংলাদেশের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি। ট্র্যাজেডিটা হলো, উনার আরেকটি সাপ্লেমেন্টারি ভুল কনসেপ্টের কারণে ওনার এই বেসিক আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা অকার্যকর হয়ে পড়ে। উল্লেখিত বইটা পড়লে দেখবেন সেখানে তিনি বলছেন, ‘তবে যেসব জায়গায় আমাদের লোকেরা সরকারি বাহিনী কর্তৃক অন্যায়ভাবে আক্রান্ত হবে তারা সেখানে যথাসাধ্যভাবে আত্মরক্ষা করার করবে।’ এই ধরনের আত্মঘাতী ও হঠকারিতামূলক সশস্ত্র আত্মরক্ষামূলক নীতির কারণে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের ভিতরে থাকা উনার অনুসারীরা চোরাই পথে অস্ত্র-শস্ত্র সংগ্রহ করার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে তারা সরকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং ব্যাপক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়ে সমূলে উৎখাত হয়ে যায়।

আমি বুঝি না, উনি কেন এধরনের স্ববিরোধী নীতি ও কার্যক্রম অনুসরণ করতে গেলেন? অব্যাহত নির্যাতনের মুখে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার শক্তি, হতে পারে, তিনি কিছুটা হারিয়ে ফেলেছিলেন। বাস্তবতা হচ্ছে, উনার মতো লোকও, কোনো কিছু হক্ব হওয়া, আর সেই হক্বকে আমল করা বা কায়েম করার জন্য সুনির্দিষ্ট একটা হক্ব-পদ্ধতি থাকার স্বাতন্ত্র্যকে ঠিকমতো বুঝতে পারেননি! ইতিহাস এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির সাক্ষী। সে যাই হোক।

৫.

দ্বন্দ্বের তাত্ত্বিক ভিত্তি থাকা আর বাস্তবে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া, দুটো এক কথা নয়; যদিও হক বাতিলের দন্দ্ব অনিবার্য বটে। যে কোনো জায়গায় যে কেউ অযথা একটা গন্ডগোল বাধিয়ে নিজেকে হকপন্থী দাবি করবে আর চিৎকার করে বলবে, “দেখো, আমি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই, বাতিল শক্তি আমার উপর আক্রমণ করছে, নির্যাতন করছে” – এ ধরনের অপরিপক্ক ও ভারসাম্যহীন সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হলো হঠকারিতা। যেটাকে ফিতনা হিসেবে বলা হয়েছে। তাই, মোকাবিলা মানেই জিহাদ নয়। এ ধরনের আবেগনির্ভর ভারসাম্যহীন মোকাবেলা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফেতনায় পর্যবসিত হতে পারে। আমরা জানি, ইসলামের দৃষ্টিতে কিতাল অর্থে জিহাদ সবসময় ফরজ নয়। অথচ, ফেতনা সৃষ্টি করা হলো সর্বাবস্থায় হারাম।

দাওয়াতের ময়দানে কাজ করা লোকেরা রাজনৈতিক সংঘাতে জড়ানো, রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজ করা লোকেরা ফিজিক্যাল সংঘাতে জড়ানো – এগুলো সুস্পষ্টভাবে ফিতনামূলক কর্মকাণ্ড। এ ধরনের ফেতনা থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। নতুন ধারায় যারা ইসলামী আন্দোলনের কাজ করতে আগ্রহী, তাদের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে সর্বোচ্চ মানের স্বচ্ছতা, জওয়াবদিহিতা ও গণমুখীনতা (pro-people attitude) বজায় রেখে কাজ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো গোপন লক্ষ্য-উদ্দেশ‍্য অথবা কোনো হিডেন এজেন্ডা ছিলো না। তাই, কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম নয়, কিংবা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বিশ্বাস করে ময়দানবিমুখ ও প্রতিক্রিয়াশীল সমালোচনাবাদী হওয়া নয়; বরং উন্মুক্ত খেলার মাঠে আত্মবিশ্বাসী খেলোয়ারদের মতো আমাদেরকে হতে হবে প্র্যাক্টিকাল প্র্যাক্টিকাল, প্র্যাগমেটিক ও স্ট্র্যাটেজিক।

যারা দাওয়াতের ময়দানে কাজ করবেন, বিভিন্ন ধরনের দাওয়াত-অনুকূল সেক্টরকে যারা নিজেদের জন্য অধিকতর উপযোগী মনে করবেন তারা চলমান রাজনৈতিক ইস্যু ও সংঘাত-সংঘর্ষে কোনোভাবেই জড়াবেন না। আর যারা রাজনীতি করবেন তারা মনোযোগ দিয়ে সেটাতেই মনোনিবেশ করেন। একটাকে আরেকটার সাথে messed-up করবেন না।

প্রত্যেকে নিজ নিজ যোগ্যতা ও সুযোগ অনুসারে স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে নিজেকে ফোকাসড রাখুন। Jack of all trades হওয়ার চেষ্টা না করে নিজেকে master of one হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। ভালো থাকুন।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *