মসজিদকে সোশ্যাল কানেকটিভিটির হাব হিসাবে গড়ে তোলা প্রসঙ্গে

জুমার খুতবা কি বাংলাতে দেয়া যাবে?

আমাদের এখানে জুমার নামাজের আগে ৩টা খুতবা দেয়া হয়। প্রথমে মূল খুতবার সারাংশ আলোচনা, দ্বিতীয়টায় মূল খুতবা পাঠ এবং তৃতীয়টায় মোনাজাত। অরিজিনালি খুতবা হলো দুই ভাগে: মূল খুতবা ও মুনাজাত। খুতবা আরবীতেই দিতে হবে এই ধারনার বশবর্তী হয়ে খুতবার শুরুর দিকে আলোচনার নামে অঘোষিতভাবে আলোচনার নামে খুতবার একটা অংশ বাড়ানো হয়েছে। মূল খুতবা আরবীতেই দিতে হবে এই ধারণার কারণ হলো সলফে সালেহীন তথা সাহাবী, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনদের সময়ে অনারবদের মধ্যে খুতবা দেয়ার সময়ে প্রয়োজন থাকা সত্বেও ঈদ-জুমার খুতবা আরবীতেই দেয়া হয়েছিলো।

মাতৃভাষায় খুতবা দেয়ার বিরোধীগণ যে বিষয়টিকে আমলে নেন না তা হলো পূর্ববর্তীদের সময়ে শুধুমাত্র ‘ইসলামী রাষ্ট্রে’ই খুতবা দেয়া হতো। উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণের কথা বিবেচনা করে বর্তমানে প্রায় সব মসজিদেই ঈদ-জুমা পড়া হচ্ছে, খুতবা দেয়া হচ্ছে। ব্যাপারটি একটা অঘোষিত ইজমা হিসাবে চালু হয়ে গেছে। তখনকার সময়ে ঈদ ও জুমার নামাজ ছিলো যুগপৎ ধর্মীয় ও প্রশাসনিক অনুষ্ঠান। মূল শাসকবৃন্দ আরবী ভাষাভাষী হওয়ার কারণে সংগত কারণেই খুতবাসহ সব সরকারী নির্দেশ-নির্দেশনা আরবী ভাষাতে দেয়া হতো। এক কথায় আরবী ছিলো তখনকার একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। খুতবা দেয়াটা ঈদ ও জুমার নামাজের পূর্বশর্ত হলেও তা স্বয়ং নামাজের অংশ নয়। যেমন– গোসল-অজু নামাজের শর্ত হলেও তা নামাজের অংশ নয়। আরবী ভাষার এক্সক্লুসিভনেস কেবলমাত্র কোরআনের মূলপাঠ ও নামাজের জন্য সংরক্ষিত। তা না হলে পৃথিবীর যে কোনো অংশে প্রতিষ্ঠিত বা সম্ভাব্য যে কোনো ‘ইসলামী রাষ্ট্রে’রই রাষ্ট্রভাষা আরবী হওয়াটা বাধ্যতামূলক হিসাবে বিবেচিত হবে যা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের পরিপন্থী।

ধর্মীয় বিষয়াদিতে কোনো দ্বিতীয় ভাষা যাকে আমরা লোকাল ল্যংগুয়েজ বলি তার ব্যবহার সংক্রান্ত এই বিতর্ক-আলোচনাতে যিনি আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করবেন তাকেও একটি অনারবী ভাষা যেমন বাংলা ভাষায় এই পোস্টে এনগেজ হতে হবে। এ ছাড়া গত্যন্তর নাই। ‘ধর্মীয় বিষয়ে আরবী ভিন্ন কোনো দ্বিতীয় ভাষা চলবে না’ – এমন ধরনের মন্তব্য যদি কেউ করেন, তাহলেও তাকে অন্তত এই পোস্টে বাংলাতেই তা করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি একটা লোকাল লংগুয়েজ যেমন বাংলাকে ধর্মীয় বিষয়ের আলোচনার মাধ্যম মেনে নিয়ে স্ববিরোধিতায় লিপ্ত হবেন …! বলাবাহুল্য, জুমার খুতবা একটা পিউর রিলিজিয়াস বা প্রত্যক্ষ এবাদতের বিষয়। তাই না?

ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও চবি দক্ষিণ ক্যাম্পাস মসজিদ:

এত কথা এ বিষয়ে বলার প্রসংগ হলো দুনিয়ার বহু দেশেই মাতৃভাষায় খুতবা দেয়া হচ্ছে। ইস্ট লন্ডন মসজিদে ড. জামাল বাদাবীর ধর্মীয় সহনশীলতা সংক্রান্ত একটা লেকচার এতটা ভালো লেগেছে যে, আমি প্রজেক্টর লাগিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাস মসজিদে সেটি দেখানোর কোনো আয়োজন করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবছিলাম। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে শিক্ষিতদের এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এখানকার লোকজনের ভাবসাবে মনে হলো তারা এসব বিষয়ে নিতান্তই অনাগ্রহী। তাদের কাছে ইসলাম হলো মূলত আধ্যাত্মিকতার ব্যাপার। এই দৃষ্টিতে তারা মসজিদকে সংকীর্ণ অর্থে এবাদতের জায়গা মনে করেন। আর আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে ধর্মভীরু মানুষেরা সাধারণত সন্দেহ ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীতেই দেখে।

আফসোস হলো, নামাজ পড়া এবং মাঝে মাঝে তাবলীগ জামায়াতের ফাযায়েল শোনা ছাড়া আমাদের মসজিদসমূহে সাধারণ মুসল্লীদের আর কিছু করার সুযোগ নাই। এখানকার মসজিদে মহিলাদের প্রবেশাধিকার নাই। এলাকার নামাজী নারীরাও এ অচলায়তন ভাংগার জন্য কখনো আগ্রহী হয়েছেন এমনটা দেখি নাই। বাচ্চাদের খেলাধূলার কোনো সুযোগ থাকা তো দূরের কথা, মুরুব্বী-মুসল্লীদের ধমকের চোটে এদের মধ্যে যারা বড়দের সাথে মসজিদে আসেন তারাও সব সময়ে কোনঠাসা হয়ে থাকে। এখানে কোনো লাইব্রেরি নাই। এসব নিয়ে কারো কোনো চিন্তা বা উদ্যোগও নাই। মসজিদে পত্রিকা পড়া হবে, নেট ব্রাউজ করা হবে – এসব যেন কল্পনার বাইরে, নিষিদ্ধ ব্যাপার।

আধুনিক স্মার্ট ইসলামিস্টদের সাংগঠনিক রিপোর্টে এটি একটি ‘সংগঠিত মসজিদ’ হিসাবে গণ্য, যদ্দুর জানি। তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামের পতাকাবাহী হিসাবে উনারা বাংলাদেশকে একটা আধুনিক ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতে চান। অথচ বাংলাদেশের অন্তত একটি মসজিদকে হলেও সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র (hub of the society) হিসাবে গড়ে তোলার বিষয়ে উনাদের কোনো তৎপরতা আমার চোখে পড়েনি। এখন না হয় উনাদের দুঃসময় যাচ্ছে। সুসময়ে যখন উনাদের কথায় সবাই উঠবস করেছেন, তখন তারা এ ব্যাপারে কী করেছেন? ব্যক্তিগতভাবে ভালো মানুষ হওয়া আর কল্যাণজনক কোনো সামাজিক ব্যবস্থা কায়েমে উদ্যোগ নেয়া, সচেষ্ট হওয়া – দুটো ভিন্ন জিনিস।

কথাবার্তায় চালু হওয়া বনাম বাস্তবে কর্মতৎপর হওয়া:

কাজের কাজ কিছু নাই একশ্রেণীর নামকাওয়াস্ত social entrepreneurদেরকে দেখা যায় সদাসর্বদা স্বপক্ষের বাদবাদী দল ও শক্তিসমূহ এবং বিরোধী পক্ষের ওপর দোষারোপ চর্চায় (blame game) ব্যস্ত। ড. বাদাবীর আলোচ্য খুতবায় ‘ইসলামী চরমপন্থা’কে খণ্ডন করে কোরআন-হাদীসের রেফারেন্স সহকারে শক্তিশালী যুক্তি দেয়া হয়েছে। ধারণা করছি, এতে ‘ইসলামী গণতন্ত্রের’ অনুসারীরা উল্লসিত বোধ করবেন। ভাবখানা এমন: ‘দেখো, ওরা কত খারাপ!’। চরমপন্থার কোনো সুযোগ ইসলামে নাই। এটি সত্য। কিন্তু আশেপাশের চলমান, সত্যি কথা হলো অতি-দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে চরম উদাসীন থেকে দিনরাত ষড়যন্ত্র তত্ত্বে (conspiracy theory) বুঁদ হয়ে থাকাটা কতটুকু বাস্তব বা ইসলাম সম্মত? top down অর্থাৎ উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া অর্থে কায়েম করা ছাড়া bottom up এপ্রোচে অংকুরোদগমের মতো করে সমাজ হতে রাষ্ট্র – এভাবেও যে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা তারা বাস্তবে মানতে নারাজ। বকোয়াজগিরি ভিন্ন কথা। করা দরকার, করা দরকার, করতে হবে, এসো সবে মিলি করি – এ ধরনের কথামালা (rhetoric) দিয়ে বাস্তবে কিছু হয় না। এক পর্যায়ে কিছু না কিছু করে দেখাতে হয়। অন্তত পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে ও দৃশ্যমানভাবে চেষ্টা করতে হয়।

কে উদ্যোগ নিবে (who will ring the bell)?

দেখা যায়, শিক্ষকরা বিদেশ হতে ডিগ্রী করে ফেরত আসার পর কিছুদিন পর্যন্ত মসজিদকে কমিউনিটি সেন্টার হিসাবে গড়ে তোলার কথাবার্তা খুব বলেন। এরপর তথৈবচ। ভাবখানা এমন– “অন্যরা করছে না, আমি একা কী করবো?” আচ্ছা, অন্যরা যদি ইসলাম ঠিকমতো না মানে আমি কি বসে থাকবো? আমি কি আমার মতো করে ইসলাম মানবো না? ইসলাম, আমরা জানি, একই সাথে ব্যক্তিক ও সামষ্টিক। ইসলাম কি ব্যক্তিকেন্দ্রিক, না সমষ্টিকেন্দ্রিক? – এই প্রশ্নটি স্বয়ং একটা ভুল প্রশ্ন (category mistake)। ব্যক্তি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমষ্টিকে গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। এটিই বাস্তবতা, এটিই ইসলামের শিক্ষা।

মসজিদ নিয়ে আমার চিন্তা-স্বপ্ন:

ইরানের কোম শহরে অবস্থিত ফইজিয়া মাদ্রাসার কোনো আয়াতুল্লাহ উজমা কিংবা রাহবার কর্তৃক রচিত খুতবা সারা ইরানে সব জুমা মসজিদে খুতবা হিসাবে পাঠ করা হয়। এটি শিয়া ইরানে যেভাবে সম্ভব আমাদের এখানে ধর্মীয় গঠনগত ভিন্নতাসহ নানা কারণে তা সম্ভব নয়। কিন্তু এটুকু তো আশা করতে পারি, দেশের সব জুমা মসজিদে মাতৃভাষায় সমকালীন নানা বিষয়ে খুতবা দেয়া হচ্ছে। এক্সপার্ট বা রিসোর্স পারসনগণ খুতবা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হচ্ছেন। সেসব খুতবা এইচডি ফরম্যাটে ইউটিউবে আপলোড হচ্ছে। সর্বস্তরের নারী-পুরুষ-শিশু মসজিদে একই ফ্লোরে মসজিদে নববীর আদলে নামাজ আদায় করছে। প্রতিটা এলাকায় রয়েছে সমৃদ্ধ রেফারেন্স লাইব্রেরী (আমি বিশেষায়িত ‘ইসলামী পাঠাগারের’ কথা বোঝাচ্ছি না) এবং এলাকার মসজিদ কমেপ্লেক্সে অবস্থিত পাঠাগারটাই হলো সবচেয়ে সমৃদ্ধ। এলাকায় বসবাসকারী অন্যান্য কমিউনিটির লোকজনের কাছেও আকর্ষণীয়। এমনটা কবে হবে? যারা ‘ইসলামী সমাজ’ কায়েম করতে চান, শুধুমাত্র ধর্মীয় চেতনা দিয়ে এমন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এ জন্য ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে সমাজের মূলধারা কিংবা অন্ততপক্ষে শক্তিশালী বিকল্পধারা হিসাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।

আমরা জানি ক্রয়-বিক্রয়, হারানো বিজ্ঞপ্তি, যৌনকর্ম ও পায়খানা-প্রস্রাব এই চারটি কাজ ছাড়া পারষ্পরিক ও গঠনমূলক সব কাজই প্রয়োজন মোতাবেক নিয়মিতভাবে মসজিদ ও মসজিদ প্রাঙ্গনে হতে পারে। এক কথায় বললে, এমন মসজিদের স্বপ্ন দেখি যা সংশ্লিষ্ট এলাকার সব সামাজিক কর্মকাণ্ড ও যোগাযোগের কেন্দ্র। কবে কোথায় কীভাবে এই আশা বাস্তবায়িত হবে জানি না। তবু আশায় বুক বাঁধি। কোনো কিছু করতে না পারলে বলতে তো অসুবিধা নাই। অন্তত তা নিয়ে ভাবতে হবে। পরিকল্পনা করতে হবে।

ধর্ম, ধার্মিকতা ও ধর্মবাদিতা:

ইসলাম নিয়ে আমাদের সমাজে দুই ধরনের ধারণা প্রচলিত। প্রথম ও প্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো অপরাপর ধর্মের মতো ইসলাম মূলত একটা ধর্ম যদিও এটি এর অনুসারীদের দৃষ্টিতে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট ধর্ম। ইসলাম সম্পর্কে অপর ধারণাটি হলো, ইসলাম এমন ধর্ম যার মধ্যে রয়েছে সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি তথা সবকিছু। আমার বুঝজ্ঞান মোতাবেক ইসলাম সম্পর্কে এই দুই ধরনের ধারণা ভুল। বরং ইসলাম হলো জীবনের সব দিককে ইনক্লুড করে এমন এক জীবন ব্যবস্থা বা মতাদর্শ যার মধ্যে রয়েছে ধর্ম, সংস্কৃতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি তথা সবকিছুর মৌলিক দিক-নির্দেশনা।

আমাদের সমাজে তাবলীগ জামাত হলো ইসলামের প্রথম ধরনের ইন্টারপ্রিটেশান নির্ভর। জামায়াতে ইসলামীসহ সব ‘পলিটিক্যাল ইসলামিস্ট’ ইসলামের দ্বিতীয় ধরনের ইন্টারপ্রিটেশানকে বাস্তবে ফলো করে। উভয় পক্ষই ইসলামকে মূলত ধর্ম মনে করে। দ্বিতীয়টির তুলনায় বরং প্রথম ধারণাটি অধিকতর সামঞ্জস্যতাপূর্ণ (consistent)। কেননা ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমরতন্ত্র – এগুলো অপরিহার্যভাবে পরষ্পর সম্পর্কিত ও নির্ভরশীল হলেও এর কোনোটাই অপর কোনোটির সাথে অভিন্ন নয়। তাই, ইসলামকে রাজনৈতিক ধর্ম হিসাবে দাবী করাটা স্পষ্ট স্ববিরোধিতা। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ইসলাম নিয়ে কমবেশি উভয় পক্ষই ধর্মবাদিতায় লিপ্ত হয়। বলাবাহুল্য, ধর্ম আর ধর্মবাদিতা এক নয়।

আমার দৃষ্টিতে ইসলাম সম্পর্কে তৃতীয় ধারণাই ঠিক। আমাদের শরীরের মস্তিষ্ককে যদি বিশ্বাস হিসাবে বিবেচনা করি তাহলে হৃৎপিণ্ড হচ্ছে বুদ্ধি। উল্টাভাবে মস্তিষ্ককে যদি বৌদ্ধিক আকর (intellectual faculty) হিসাবে মনে করি তাহলে হৃৎপিণ্ডকে মনে করতে হবে বিশ্বাসের আকর (doxastic or belief-concerned faculty)। এই দৃষ্টিতে ইসলাম একটি বৃত্ত। ধর্ম, সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমরতন্ত্র হচ্ছে এর অন্তর্গত এক একটি উপবৃত্ত। ইসলামকে যদি আমরা বেসিক্যলি রিলিজিয়ন বা ‘পলিটিক্যাল রিলিজিয়ন’ মনে করি তাহলে আমাদের সমাজে মসজিদসমূহ কমবেশি সঠিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত আছে ও যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ইসলামকে যদি আমরা দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা হিসাবে বিবেচনা করি তাহলে আমাদের সমাজে মসজিদসমূহ wrong concept-এর উপর প্রতিষ্ঠিত ও ভুলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। জুমার খুতবা মাতৃভাষাতে দেয়া যাবে কিনা, আপাতদৃষ্টিতে এই বিষয়টিকে ততটা সিরিয়াস মনে না হলেও প্রকৃতপক্ষে তা মসজিদ তথা ইসলাম সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

মসজিদ কি নিছক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান? নাকি, নিছক সামাজিক প্রতিষ্ঠান? অথবা উভয়েই?

আমাদের সমাজে মসজিদ হচ্ছে অন্যতম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। আমার দৃষ্টিতে মসজিদ হওয়া উচিত আধাত্মিকতা, সামাজিকতা ও নির্দোষ বিনোদনসহ সব ইতিবাচক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এভাবে একটা মসজিদভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে মসজিদ সম্পর্কে বিদ্যমান ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণতার (sense of religiosity) ধারণাকে কমিউনিটিবেইজড সোশ্যাল নর্মস-ফিলিংস দিয়ে রিপ্লেস করতে হবে। এক একটা স্পেসিফিক সামাজিক বাস্তবতায় এটি যত কঠিন ই হোক না কেন, তা করতে হবে। মসজিদের সংস্কার ব্যতিত সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কার সম্ভব নয়, এটি ভালো করে বুঝতে হবে।

নারী ও শিশুরা জনসংখ্যার দিক থেকে সমাজের দুই-তৃতীয়াংশ। এদেরকে বাদ দিয়ে সমাজের এক তৃতীয়াংশ পুরুষ সদস্যদের দিয়েই কীভাবে মসজিদগুলো এক একটা মেইনস্ট্রীম কমিউনিটি হাব হিসাবে গড়ে উঠবে? কীভাবে সম্ভব? তাই, লন্ডন-আমেরিকার মসজিদগুলো কীভাবে পরিচালিত হয়, তারা কীভাবে কী করেন তা জানা দরকার। একই সাথে সালফে সালেহীনদের সময়কালে তৎকালীন মসজিদসমূহে কী হতো, সেগুলো কীভাবে পরিচালিত হতো সে সম্পর্কেও স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার ইতিবাচক মানসিকতা ও গঠনমূলক চিন্তা ভাবনার। আমাদের এখানে মসজিদ তথা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে যে ধরনের রক্ষণশীলতার আবহ বিদ্যমান কীভাবে তার অবসান ঘটানো যায় তা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে। এর বাস্তব কর্মপন্থা নির্ধারণ ও উদ্যোগ গ্রহনেই আমাদের বেশি কনসার্নড হওয়া জরুরী।

অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক বিষয়ে আলোকপাত করা এই জুমার খুতবা অনুবাদের কাজ করে ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালন করেছে। যদি মূল লেকচারে বাংলা সাবটাইটেল জুড়ে তা আপলোড ও বিতরণ করা যায় তাহলে তা অধিকতর ফলপ্রশ্রু হবে।

লিংক: অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক

*****

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য:

Mohammed Kamal Uddin Mashud: বাইতুল মোকারারমের সাবেক খতীব মরহুম মাওলানা ওবাইদুল হক (রাহ) বাংলা ভাষাতেই খুতবা দেয়াকে উৎসাহিত করতেন। আমি নিজেও শুনেছিলাম কোন এক ওয়াজ মাহফিলে তিনি বলেছিলেন, যদি ফিৎনার আশংকা না থাকে, যদি মসজিদের অধিকাংশ মুসল্লী সংশ্লিষ্ট জন বসতির মানুষের প্রত্যেহিক কথিত ভাষাতে জুম’আর খুতবা দেয়ার গুরুত্ব অনুধান করে মতবিরোধে লিপ্ত না হয়, তখন সে সব মসজিদে জুমআর নামাজের পূর্বে মানুষের কথিত ভাষায় খুতবা দেয়া যাবে। বিখ্যাত সম্পাদক ও সাহিত্যিক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সাহেবও বাংলায় খুতবা দেয়াকে সমর্থন করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন। ভারতের বেশ কয়েকটি মসজিদেও সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মুখের ভাষাতেই খুতবা প্রচলিত আছে। বিখ্যাত ইন্ডিয়ান স্কলার, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রাজুয়েট আল্লামা সাইয়্যেদ আব্দুল্লাহ তারিক তার মসজিদে নিজস্ব মাতৃভাষাতেই খুতবা দিতে দেখা যায়। ইউটিউবে প্রচুর লেকচার পাওয়া যায় এই গবেষকের।

Osman Gani: দুবাইতে বিভিন্ন মসজিদে বিভিন্ন ভাষা ভাষীর জন্য তাদের মায়ের ভাষাতেই জুম্মার খুতবা প্রচলন আছে যুগযুগ থেকেই। ঢাকার কাঁটাবন মসজিদে জুম্মার খুতবা মাতৃভাষাতে চালু আছে।

Mobashwer Ahmed Noman: মসজিদে ৫০ পার্সেন্ট মানুষকে (নারীদের) কেন এক্সক্লুড করা হচ্ছে? যদি তাদের সাথে বাজার করা যায় তবে নামাজ কেন নয়? তারা যদি দুনিয়ার সব যায়গায় যেতে পারে মসজিদে কেন নয়? মসজিদে নববী কে যদি আল্লাহর রাসুল সা বিচারলয় থেকে শুরু করে আসিহাবে সুফফাদের অস্থায়ী বাসস্থান তৈরী করতে পারেন তবে আমরা কেন মসজিদে দুনিয়াবি কথা নিষেধ টাইপের ব্যানার ঝুলিয়ে দেই?

Louis Pasteur: স্যারের এই লেখাটাও ধর্মীয়, সমাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তীয় বিষয়ের তাত্ত্বিক ও তান্ত্রিক চিন্তা।এ পর্যন্ত সোসিওল্যজিকাল কালচারে একটি বিষয়ে কঠিন জীর্ণতা, এখতেলাফ দেখেছি, সেটি কি? দ্বীন ইসলামকে না বোঝা। আসলে ইসলামের ম্যোরাল ও এবস্ট্রিউজ ফিলসফি কি তা আমরা চিন্তাই করিনা। খুব উপকৃত হয়েছি স্যার। লট অফ জাযাকাল্লাহ।

Tahsin Diya: সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু আমার ভীষণ অবাক লাগে যখন দেখি মানুষ ‘পরিবর্তন’ শব্দটাকে মন থেকে অ্যাকসেপ্ট করতে ভয় পায়। সেটা পজেটিভ হোক না কেন। এবং সেটা পজেটিভ  রেজাল্ট দেয় কিনা সেটা যাচাই করে দেখার প্রয়োজনও বোধ করে না। সময়ের ডিমান্ড হলো সময় উপযোগী হয়ে ওঠা। লেখাটা চমৎকার এবং ইনফরমেটিভ। শুধু এতুটুকুর উপরেই চাইলে অনেক কিছু করা যায়। আক্ষেপ হলো ‘মানুষগুলো কোথায়?’ কিংবা এ ধরনের মেন্টালিটি কবে দেখতে পাবো আমরা এবং কবে তার ইফেক্টিভ ইম্পিমেন্ট থেকে উপকৃত হবো? চট্টগ্রামের মসজিদগুলোতে না থাকলেও ঢাকা ক্যান্টমেন্ট মসজিদে মহিলাদের জন্য নামাজ পড়ার সিস্টেমটা আছে।

Mosheeoor Ranga: একই ফ্লোর না হয় মানা যায়, কিন্তু নারী-পুরুষ যখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাড়াবে তখন আমাদের শাটল-ট্রেনে যা ঘটে তাই ঘটবে। তবে আমি বাকী বিষয়গুলোর সাথে একমত

Mohammad Mozammel Hoque: পুরুষদের কাতার শেষ হওয়ার পরে নারীদের কাতার। মাঝখানে বাচ্চারা। এমনকি ভাই-বোন বা স্বামী-স্ত্রী দুজন একত্রে নামাজ পড়লে তারা সামনে পেছনে দাঁড়াবে, পাশাপাশি নয়। এটিই মাসআলা।

Mosheeoor Ranga: একই সঙ্গে তাদের প্রবেশ-প্রস্হানের পথও ভিন্ন হতে হবে, তবুও ফিৎনার আশঙ্কা থেকেই যায়।

Mohammad Mozammel Hoque: Mosheeoor Ranga সবকিছূ ভিন্ন অর্থাৎ আলাদা করায় মানা নাই যদিও সেটি সুন্নাহ’র খেলাফ। কারণ, শরিয়ত প্রণেতার অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সব কিছু জানা আছে। তৎসত্বেও তিনি যেটার অনুমতি দিয়েছেন, তাঁর রাসূল (স.) যেটি করেছেন, সেই প্র্যাকটিসকে যথেষ্ট মনে না করা স্পষ্টতই ভুল। রাস্তায় চলার সময়ে নারী পুরুষেরা ঘেষাঘেষি করে চলবে না, সেটি হাদীসে বলা আছে। চাইলে আল্লাহর রাসূল (স.) মেয়েদের জন্য মসজিদে প্রবেশ ও প্রস্থানের আলাদা পথ নির্ধারিত করে দিতে পারতেন। এমনকি মসজিদে নববীতে তখন একাধিক প্রবেশ ও প্রস্থান পথ ছিলো।

Mosheeoor Ranga: সলফে সালেহিনদের ঈমানের ঘনত্ব আর আমাদের ঈমানের ঘনত্ব কি সমান…..? আর আয়েশা রা: কর্তৃক বর্ণিত হাদিসটা কি উপর্যুক্ত যুক্তিকে দূর্বল করে না…??

Mohammad Mozammel Hoque: আয়িশা (রা)’র হাদীসটা আমার দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য । কেননা তা মেয়েদেরকে মসজিদে যেতে বাঁধা না দয়া সংক্রান্ত স্বয়ং আল্লাহর রাসূলের (সা) হাদীসকেই নাকচ করে। আল্লাহর রাসূল (সা) যদি তৎকালীন নারীদের নির্লজ্জতা দেখতেন তাহলে তিনি তাদের মসজিদে যাওয়া নিষেধ করতেন – আয়িশা (রা) বর্ণিত হাদীসটির এটি মূল কথা। তাই না? এর মানে হলো রাসূল হিসাবে তিনি করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে যা বলতেন তা তাঁর প্লেইন অভজার্বেশানের ভিত্তিতে বলতেন। অন্ততপক্ষে এ ব্যাপারটিতে, যেমনটা আয়িশা (রা) বলেছেন, তিনি তাঁর সময়কালে মেয়েদেরকে অতটা খারাপভাবে চলাফেরা করতে দেখেন নাই তাই তাদের মসজিদে যাওয়াটাকে অনুমোদন করেছেন। রাসূল(সা)-এর নির্দেশ ও নির্দেশনাসমূহ সম্পর্কে এ ধরনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং হাইলি ডেমেইজিং !!! কেননা আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলছেন, “ওমা ইউনতিক্বু ‘আনিল হাওয়া। ইন হুয়া ইল্লা ওয়াহইউ ইউ হা।” অর্থাৎ “তিনি মোটেও নিজের থেকে কিছু বলেন না। এসব কিছু বরং তিনি যা তাঁর ওপর অহী করা হয় তা ভিত্তিতেই বলেন।”

Mosheeoor Ranga: হ্যা, অনেক মোহাদ্দেস এই হাদিসটিকে সহিহ কিংবা হাসান হিসাবে মানতে নারাজ কিন্ত আবার অনেক হানাফি পন্থী মোহাদ্দেস হাদিসটির সনদ মাউযু হিসাবে গ্রহনবিমুখ। আসলে শরীয়াহর আইনগুলো জ্যোস্না রাতে চাঁদকে সাথে নিয়ে হাঁটার মত, যে যেদিকে টানে সেদিকেই যায়।

Mohammad Mozammel Hoque: না, ঠিক না। শরীয়াহ সুস্পষ্ট। কোনো বিষয় স্পষ্ট হওয়া সত্বেও এর একাধিক বিকল্প ও ক্রমসোপান থাকা সম্ভব। colorless হওয়া আর spectrum থাকা তো এক কথা নয়। শরীয়াহ কোনো একক বিষয় নয়। এর রয়েছ নানা মাত্রা। applicability and understanding of shariah is the most important thing. মান্যতার ক্রমধারা মেনে চললে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কোরআন, হাদীস, ইজমা, ক্বিয়াস – এই ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখা জরুরী। আর হাদীসের ব্যাপারে কথা হলো, আপনি জানেন, সাহাবীদের কথাকেও মুহাদ্দীসিনগণ সংকলন করেছেন। এগুলোকে আছার বলে। কোনো আছার সম্পর্কে দেখতে হবে সেটি আল্লাহর রাসূল (সা) এর হাদীসের সাথে কমপ্লাই করে কিনা। মুহাদ্দীসিনেরা অথেনটিসিটিকে যতটা দেখেছেন, কন্টেন্টকে ততটা দেখেন নাই। কেনানা কন্টেন্ট দেখে করণীয় ঠিক করা ফকীহদের কাজ। সব মুহাদ্দীসিন একই সাথে এবং একই মানের ফকীহও ছিলেন, এমন নয়। তাই না?

Mosheeoor Ranga: লা জবাব…….. ইয়্যু আর দ্য গ্রেট।

Shamim Hossain: এ সময়ের আমরা ইসলামকে ধরতে না পারার অন্যতম কারণ সম্ভবত প্রকাশনার অভাব তথা গভীর আলোচনার প্রসারতার অভাব! আমি হাতে গোনা কয়েকটা মসজিদ ছাড়া প্রায় সব মসজিদে খুব ছোটবেলায় যে জাতীয় সল্প কথার তুলনামূলক ভাবে বর্তমান সময়ের চেয়ে কম গভীর বক্তব্য শুনেছিলাম আজো তাই শুনতেছি অথচ এক একটা মসজিদ ইসলাম তথা সকল বিষয় বিশ্লেষনের কেন্দ্র হতে পারতো! তারচেয়েও যেটা ভয়াবহ ব্যাপার সেটা হল , ইসলামীক আলোচনার প্রতিনিধিত্ব করা মসজিদের নাজুক অবস্থা ইসলামকেও কিছুটা নাজুক করছে …

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *