ধর্মবিদ্বেষ আর ধর্মবাদিতা হল একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

রোজার পবিত্রতা রক্ষার নামে ধর্মবাদী উগ্রতা (পর্ব ১)

ধর্মপ্রবণ এই দেশে ধর্মবিদ্বেষের বিষয়টা যতোটা স্পষ্ট বুঝা যায়, ধর্মের নামে বাড়বাড়ি তথা ধর্মবাদিতাকে ততটা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না। অথবা, ধর্মের নামে বাড়াবাড়িগুলোর বিরুদ্ধে লোকেরা সাধারণত মুখ খুলতে চান না।

এখন রমজান মাস। চারিদিকে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার বিপুল আয়োজন। এরই অংশ হিসাবে খাবারের দোকানগুলো দিনের বেলায় সব বন্ধ। যারা খোলা রেখেছে তারা যথাসম্ভব রাখ-ঢাক করে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

যেই ধর্মের নামে এটি করা হচ্ছে, সেই ধর্ম এ ব্যাপারে কী বলেছে তা আমরা জানার চেষ্টা করি না। রমজান মাসে যারা রোজা রাখবেনা তারা প্রকাশ্যে খাওয়া-দাওয়া করতে পারবে না, এমন কথা কোরান-হাদিসের কোথায় আছে? ইসলাম ধর্ম মোতাবেক অমুসলিম, শিশু, বৃদ্ধ, নামাজ না থাকার সময়ে নারী, রোগী ও মুসাফিরের ওপর রোজা ফরজ নয়। শহর এলাকায় সংগত কারণেই লোকেরা মুসাফির অবস্থায় থাকে অধিক হারে। কাউকে প্রকাশ্যে খাওয়া-দাওয়া করতে দেখলে আমরা কীভাবে বুঝবো, সে ইচ্ছাকৃত বেরোজদার?

শরিয়তসম্মত কারণে যাদের রোজা নাই, ঘরের বাইরে তারা কোথায় খাবে? যাদের জন্য দিনের বেলা খাওয়া-দাওয়া করা জায়েয তাদেরকে না খেয়ে থাকতে বাধ্য করা তো রীতিমতো জুলুম, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি। আমাদের দেশের রোজাদারেরা কি এতই নিম্নমানের যে কাউকে খেতে দেখলে তাদের রোজা হাল্কা হয়ে যাবে? ভেংগে ফেলতে মন চাইবে?

না, আমি এত নিম্নমানের সায়েম নই। আমি মনে করি সিংহভাগ রোজাদারেরাও মজবুত ঈমানদার। তাহলে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার নামে এতসব বাড়াবাড়ি কীভাবে চলছে নির্বিঘ্নে? আমার ধারণায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার আশংকায় মানুষ এ ধরনের ধর্মবিরোধী অনাচার নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে।

রুখে দাঁড়াতে হবে ধর্মবাদী জমবি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে (পর্ব ২)

হ্যাঁ, ইসলামপ্রিয় বা ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর নামে আমাদের দেশে ধর্মবাদী এক জমবি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। এরা নামাজ পড়ে না। রোজা কখনো রাখে কখনো রাখে না। তাতে কিছু আসে যায় না। ধর্মের যেসব বিধান তাদের বৈষয়িক স্বার্থের প্রতিকূলে সেগুলোকে তারা বেমালুম চেপে যায়। কিন্তু ধর্মের যেসব বৈশিষ্ট্যে আছে শো-অফ আর শর্টকাট নাজাত লাভের তরীকা, সেগুলোর ব্যাপারে তারা বেশ সিরিয়াস। কথায় কথায় তারা এ দেশে শতকরা ৮৫ভাগ মুসলিম মেজরিটি হওয়ার কথা তুলবে। তাদের ভাবেসাবে মনে হয় যেন এটি মুসলমানদেরই দেশ। অন্যরা এখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

কোরআন-হাদিসের দলীলের ভিত্তিতে নবীর সুন্নাতের প্রকৃত অনুসরণের কথা কেউ বললে তারা তাকে সর্বপ্রকারে বিরোধিতা করবে। কিন্তু নবীর শান ও মান রক্ষা করার জন্য তারা প্রতি মুহুর্তে শহীদ হতে প্রস্তুত। এদের উদগ্র ধর্মবাদিতার কবল হতে ইসলামকে উদ্ধার করা না গেলে এখানে ইসলামী ধর্ম ও মতাদর্শে ন্যায় ও কল্যাণের যে সত্যিকারের রূপ, তা কায়েম করা অসম্ভব।

লোকদের কৃত্রিম ইসলামপ্রিয়তা যে প্রকৃতপক্ষে একটি এন্টি-ইসলামিক ফেনোমেনা, তা বার বার করে বলতে হবে। অথেনটিক রেফারেন্স ও যুক্তি দিয়ে এই ধর্মবাদিদের ভণ্ডামিকে উন্মোচন করে দিতে হবে। এদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ।

ইসলামী সংগঠনগুলোর জনতুষ্টিমূলক আচরণ ও সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের নীতি এই পথে প্রধান বাধা। এটি একটি সোশ্যাল প্যারাডক্স। তৎসত্বেও আপনি যদি ইসলামের নামে লোকাচারের পরিবর্তে সত্যিকারের ইসলামের অনুসরণ করতে চান তাহলে যারা রাসূল (স.) ও সাহাবাদের চেয়েও নিজেদেরকে বেশি নিষ্ঠাবান মুসলমান প্রমাণ করতে চায়, তাদেরকে রুখতে হবে।

এজন্য চাই কোরআন, হাদীস ও সীরাতের ব্যাপক পঠন-পাঠন, প্রচার ও প্রসার।

তারাবির নামাজ নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ফোর-জি স্পিডে তারাবি পড়ানোর হাকীকত (পর্ব ৩)

তারাবির নামাজ নিয়ে আমাদের দেশে যতগুলো মতে আছে তার কোনোটাই একদেশদর্শীতা হতে মুক্ত নয়। এ সংক্রান্ত দলীলগুলো পড়লে তা স্পষ্ট বুঝা যায়। লোকেরা দলীল খোঁজে নিজের মতকে একমাত্র সঠিক পন্থা হিসাবে প্রমাণ করার জন্য। ইদানীং অবশ্য এ বিষয়ে মানুষ ক্রমান্বয়ে সুন্নাতে রাসূলুল্লাহ (স.)এর কাছাকাছি আসছে। বেশকিছু সীমাবদ্ধতা সত্বেও এটি সালাফিদের অন্যতম ইতিবাচক অবদান।

তারাবির নামাজের ওপর যেভাবে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে, যেভাবে এটি পড়া হচ্ছে, তা রীতিমতো এক ধরনের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ‘ধর্মীয় সংস্কৃতি’ কথাটা শুনতে যতটা নির্দোষ মনে হচ্ছে, আপনি যদি শির্ক-বিদআতের ব্যাপারে সতর্ক হতে চান, তখন আপনার কাছে এই টার্মটাকে আর ততটা গ্রহণযোগ্য মনে হবে না। যারা ধর্মের নামে অযৌক্তিক লোকাচারকে নির্বিচারে সমর্থন করতে প্রস্তুত, তারা আমার সাথে একমত হতে পারবেন না।

এরমানে এই নয় যে আমি লোকাচার, সংস্কৃতি বা ধর্মীয় সংস্কৃতির বিরোধী। কিছু কিছু ধর্ম তো রীতিমতো লোকাচারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ও টিকে আছে। ইসলামেও লোকাচার বা ধর্মীয় সংস্কৃতি একটা সীমা পর্যন্ত অনুমোদিত। এর বাইরে নয়। ইসলাম যা কিছুর বিরোধিতা করেছে, কুফর, শির্ক ও বিদআত, এগুলো যুগে যুগে প্রতি জনপদে গড়ে উঠেছে ও টিকে থেকেছে বাপ-দাদার ঐতিহ্য তথা লোকাচারের দোহাই দিয়ে।

আপনি যদি ইসলাম সম্পর্কে জানেন, তাহলে আপনি বুঝবেন, ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি এক একটা দিককে সেটির স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই সামগ্রিকভাবে এটিকে জীবন ব্যবস্থা হিসাবে মানতে হয়। এর কোনোটির গুরুত্ব কম নয়। যদিও এর মধ্যে আছে হাইয়ারআর্কি বা ক্রমসোপান। ইসলামের ধর্মীয় দিকটা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি হলো ভিত্তি। একে অক্ষুন্ন রেখেই সংস্কৃতিসহ অন্যান্য দিকগুলোকে চর্চা করতে হবে।

এই দৃষ্টিতে যদি পুরো বিষয়টাকে দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন, আমাদের দেশে ধর্মের নামে যা কিছু চলছে তার অনেকখানিই স্রেফ ধর্মীয় অপসংস্কৃতি, যাকে আমি ধর্মবাদিতা হিসাবে বলেছি। এই যে ফোর-জি গতিতে তারাবি পড়া, এটির মানে কী? এটি কি আল্লাহর কালামের সাথে মস্করা করার শামিল নয়? হযরত উমর (রা.) এক রমজানের রাতে দেখলেন, লোকেরা বিচ্ছিন্নভাবে মসজিদে নববীতে নফল নামাজ পড়ছে। তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে একসাথে নামাজ পড়ানোর জন্য দুজন সাহাবীকে দায়িত্ব দিলেন। পরবর্তীতে তিনি মসজিদে নববীতে তারাবির নামাজেরত হিসাবে দেখে উনার সাথে যিনি ছিলেন তাকে বলেছেন, লোকেরা যে সময়ে (অর্থাৎ শেষ রাতে) ঘুমিয়ে থাকে তা তাদের এই সময়ে নামাজ পড়া হতে উত্তম। বুঝতেই পারছেন, তিনি নিজে সেই তারবির নামাজে শরীক ছিলেন না।

তারাবির নামাজে যে কোরআন খতম করা হয়, তাও ইসলামী শরীয়াহ’র ওপর আরোপিত ধর্মীয় সাংস্কৃতিক লোকাচার মাত্র। হাদীসের বর্ণনা হতে আমরা জানতে পারি, রমজান মাসে রাসূল (স.) ও জীবরীল (আ.) পরষ্পর পরষ্পরকে কুরআন পড়ে শোনাতেন। কিন্তু রাসূল (স.) তো বলেন নাই, তোমরাও এভাবে পরষ্পর পরষ্পরকে কুরআন পাঠ করে শোনাও। আমাদের এখানে প্রচলিত খতমে কোরআন শেষ করা হয় ২৭শে রমজান। প্রতিদিন এক পারা করে তেলাওয়াত করাকে সামনে রাখলে এটি তো ৩০শে রমজান শেষ হওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে ২৯ দিনের রমজান মাসের অবস্থা কী হবে, তা তো বুঝা গেল না।

পুরো ব্যাপারটাকে আপনি যদি ভাবাবগমুক্তভাবে, শরীয়াহ’র আলোকে ও যুক্তি দিয়ে বুঝার চেষ্টা করেন, তাহলে বুঝবেন, ইসলামী শরীয়াহ’র কিছু বিষয়কে এদিক-ওদিক করে জনগণকে সহীহ পথে রাখার জন্য একটা সিস্টেম দাঁড় করানো হয়েছে। এই আপাত: নির্দোষ পথেই কিন্তু সব গলতিগুলো চালু হয়েছে যুগে যুগে। এমনকি মানুষকে নিজের মনগড়া পথে হেদায়েত করার জন্য ‘মুখলেছ’ ওয়াজকারীদের একাংশ কর্তৃক সওয়াবের হাদীসও জাল করা হয়েছে।

হেদায়েতের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত যা যা লাগবে তা সব কোরআন, হাদিস ও সীরাতে বলা আছে। এই বিশ্বাস রাখতে হবে। অতিরিক্ত আমল করার সতর্কতামূলক বাড়াবাড়ি সাহাবাদের কারো কারো মধ্যেও ছিলো। সারা বছর রোজা রাখা, দিনরাত নামাজ পড়া ও বিয়েশাদি না করার প্রতিজ্ঞা করা তিন সাহাবীর ঘটনা হতে এটি আমরা জানতে পারি। এ ধরনের টেনডেনসিগুলোকে আল্লাহর রাসূল (স.) কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন। বা-জামায়াত তারাবি পড়ার ব্যাপারটির ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিলো। আমরা জানি।

রমজানে আপনারা যত নফল ইবাদাত করছেন তার পাশাপাশি, অন্তত এর কিছুটা কমিয়ে হলেও আল্লাহর ওয়াস্তে কোনো সহীহ হাদীসের কিতাব থেকে ‘কিতাবুস সিয়াম’ অধ্যায়টুকু পড়ে নেন। এতে আপনি অধিকতর সওয়াবের ভাগিদার হবেন।

আমাদের আলেম সমাজ জ্ঞানী সম্প্রদায় হিসাবে গড়ে না উঠে ধর্মীয় প্রিস্ট-ক্লাস হিসাবে গড়ে উঠার সুবিধা এবং অসুবিধা (পর্ব ৪)

আমাদের আলেম সমাজ তথা হুজুরেরা সাধারণত আমলের ওপর খুব গুরুত্বারোপ করেন। অথচ, জ্ঞান অর্জন যে সব আমলের বড় আমল বা সব আমলের ভিত্তি, লোকদের কাছে তা উনারা ততটা জোর দিয়ে বলেন না। অবশ্য, লোকেরা যদি সঠিক বিষয়গুলো জেনে যায়, তাহলে তো উনাদের ‘স্বর্গীয় মধ্যস্থতাগিরি’ (পড়েন, হুজুরগিরি) অনেকখানি ফউত (মানে ভণ্ডুল) হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা যেভাবে বিজনেস সিক্রেট প্রকাশ করতে চান না, তেমন করে উনারাও চান না, লোকেরা ধর্মীয় জ্ঞানে শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠুক। উল্লেখ্য, আপনি যতই শিক্ষত হোন না কেন, ক্ষেত্র বিশেষে আপনাকে অন্যান্যদের ওপর বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এখন আপনিই ঠিক করেন, পরবর্তী অনন্ত জীবনে সফলতা লাভ কিংবা ব্যর্থতার ঝুঁকি আছে এমন জীবন-মরণের বিষয়ে তথা ধর্মীয় জ্ঞানে আপনি অজ্ঞ থেকে প্রিস্ট-ক্লাস সিস্টেমের তাবেদারী করবেন? নাকি, জীবন চলার মতো ন্যূনতম মতাদর্শিক জ্ঞান অর্জন করে আপন আলোয় পথ চলবেন? সিদ্ধান্ত আপনার।

এটি ঠিক, ধর্মীয় পেশাজীবী হিসাবে আলেম সমাজের অবস্থা খুব খারাপ। পেশাজীবীদের অধিকারের দিক থেকে দেখলে তাদের এই শোচনীয় আর্থিক দৈন্যকে কোনোভাবেই মানা যায় না। যারা মাজার ব্যবসা করেন অথবা ওয়াজ করেন তারা ছাড়া মসজিদ মাদ্রাসায় নিয়োজিত হুজুরেরা এক ধরনের মানবেতর জীবনযাপন করেন। সমস্যা হলো, ইসলামের মধ্যে এ’ধরনের একটা ধর্মজীবী সম্প্রদায়কে একটা বৈধ পেশাজীবী সম্প্রদায় হিসাবে স্বীকৃতি দিতে পারবেন কিনা। বিচারপতিদের জায়েযকরণ প্রক্রিয়া বা সবকিছুকে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার মতো ধর্মব্যবসাকেও সামাজিক স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। যা আমাদের সমাজে চলছে।

মাঝে মাঝে খতম পড়িয়ে এবং রমজানে কোরআন পড়ে হুজুরেরা মজুরী নিচ্ছেন। এভাবে কোরআন পাঠের বিনিময়ে, নামাজ পড়ানোর বিনিময়ে মজুরী গ্রহণকে তারা হালাল করে নিয়েছেন। অথচ, আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আমার আয়াতকে সামান্য মূল্যে বিক্রয় করো না। নবী-রাসূলগণ মানুষকে দ্বীনে দাওয়াত দেয়া ও হেদায়েতের কথা বলার সময়ে বলতেন, দেখো, তোমাদেরকে আমি যা বলছি তাতে আমার ব্যক্তিগত কোনো লাভ নাই। আমি তোমাদের ভালোর জন্য দায়িত্ব মনে করেই এসব বলছি। আর আমাদের হুজুরেরা দ্বীনের দাওয়াত ও হেদায়েত দানের বিনিময়ে টাকা পয়সা গ্রহণ করেন। ধর্ম তাদের পেশা।

ধর্মজীবী শ্রেণী থাকার সুবিধা হলো, তাদের মধ্যস্থতায় মানুষ খোদাতায়ালার কাছে পৌঁছে যাবার আশা করে। ধর্মীয় পুরোহিতদের দান-দক্ষিণা করলে, খাওয়ালে, মানুষ মনে করে, পুরোহিতরা সঠিকভাবে প্রার্থনা করতে পারবে। মানুষের ধারণা, খোদার কাছে কোনো দোয়া কবুল হওয়ার জন্য খোদার প্রতিনিধি তথা প্রিস্ট বা হুজুরদেরকে দিয়ে সহিহভাবে দোয়া-মুনাজাত করাতে হবে। সব ধর্মের ব্যাপারে এটি খাটলেও এটি যে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার লংঘন তা হুজুরেরা মানুষকে কখনো বলে না। এ ব্যাপারে আমি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই একটা কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করবো। এই আয়াতটির অব্যবহিত পূর্ববর্তী দুইটা এবং পরবর্তী একটা আয়াত হচ্ছে রমজানের রোজা রাখার বিধান সংক্রান্ত।

“আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুত আমি রয়েছি অতিনিকটে। যারা আমাকে ডাকে আমি তাদের ডাকে তখনই সাড়া দেই যখনই তারা আমাকে ডাকে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করো এবং আমার ওপর ঈমান রাখো” (সুরা বাকারা ১৮৬ নং আয়াত)

মোল্লা-পুরোহিতগণ, মুসলিম সমাজে যারা হুজুর হিসাবে পরিচিত, তারা নিজেদের জন্য ন্যূনতম মান তথা রুখসতকে নীতি হিসাবে গ্রহণ করেছেন। আর অন্যদের জন্য তারা এডভোকেসি করেন সর্বোচ্চ মান তথা আযিমতকে। হুজুরেরা যদি প্রিস্ট-ক্লাস না হয়ে সত্যিকারের জ্ঞানী সম্প্রদায় তথা আলেম হতেন তাহলে এটি হতো ঠিক এর উল্টোটা। যারা সত্যিকারের আলেম তারা নিজেদের জন্য আযিমত আর লোকদের জন্য রুখসতের নীতিকে অনুসরণ করেন।

মাওলানা মওদূদীর এই কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছে। উনার কোনো একটা লেখায় পড়েছিলাম। উনি বলেছেন, মসজিদের বাইরে জুতা সেলাই করে যে লোক জীবিকা নির্বাহ করে তার উপার্জন সেই লোকের চেয়ে উত্তম যে কিনা নামাজ পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। আমরা ধরে নিয়েছি, কিছু লোকেরা নামাজে নেতৃত্ব দিবে। আর কিছু লোকেরা সমাজের বাদবাকী কাজে নেতৃত্ব দিবে। এটি হলো এক ধরনের সেকুলার চিন্তা। আফসোস গ্রসলি যারা সেকুলারিজমের বিরোধিতা করে তারা এই ফরমেটে সেকুলারিজমকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। আমার এ ধরনের ছাঁচাছোলা কথাবার্তা শুনে তাদের পিত্তি জ্বলে উঠবে, সন্দেহ নাই।

বেতনভুক্ত লোক নিয়োগ না করলে নামাজ পড়াবে কে? এ ধরনের প্রশ্ন ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে ভিত্তিহীন প্রশ্ন। উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে যিনি যোগ্য তিনিই নামাজ পড়াবেন। এমনকি তার সুরা কেরাত যদি শুদ্ধও না হয়। এটাই ফেকাহর মাসআলা।

চোর, বাটপার, অসাধু রাজনৈতিক নেতা, গলাকাটা ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ সমাজপতিদের অনুদান, অনুগ্রহ ও বেতনে চলা এইসব হুজুরেরা তাদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সব অনিয়ম, জুলুম, অবৈধ কর্মকাণ্ড ও ইনকামকে বৈধতা দিয়ে থাকে। মুখের মাধ্যমে না হলেও হাতের মাধ্যমে, কাজ-কর্মের মাধ্যমে। প্রতিবাদ না করার মাধ্যমে। আল্লাহ রাসূল (স.) বলেছেন,

“বনী ইসরাঈল বংশের লোকজন যখন আল্লাহর না-ফরমানীর কাজে লিপ্ত হয়, তখন তাহাদের আলিমগণ প্রথম দিক দিয়া তাহাদিগকে নিষেধ করতে থাকেন। কিন্তু লোকেরা তাহাদের কথানুযায়ী পাপকাজ হতে বিরত হলো না। এরপর সেই আলিমগণই বনী ইসরাঈল বংশের পাপী লোকদের সঙ্গে একত্রে উঠাবসা ও পানাহার করতে শুরু করে। ফলে আল্লাহ তাদের পরস্পরের মনকে পরস্পরের দ্বারা প্রভাবান্বিত করে দেন।” (তিরমিযী)

এই হাদীসে তো দেখা যাচ্ছে ইহুদী আলেমরা ছিলো স্বাধীন কিন্তু আপসকামী। আর আমাদের হুজুরেরা তো মসজিদ কমিটি দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত এবং ভিতরে ভিতরে আপদমস্তক দুনিয়াদার। আপনার এলাকাতে দেখবেন ভালো মানুষেরা মসজিদ কমিটিতে নাই অথবা কোনঠাসা।

এ দেশে স্তরে স্তরে সবকিছুতে ভেজাল, ঠকানো, প্রতারণা ও জুলুম। স্বাভাবিকভাবেই এ দেশে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ির ছড়াছড়ি। এসব অধর্ম নিয়ে কথা বলতে না পারার জন্য রয়েছে প্রচণ্ড সামাজিক চাপ। এ সবকিছুই মিলে যায় পুরোহিততন্ত্রের সাথে। পুরোহিততন্ত্রের সাথে ইসলামের নাই দূরতম কোনো সংযোগ। ইসলামে আছে জ্ঞানী সম্প্রদায়। তাতে নাই দ্বীনি ও দুনিয়াবি পার্থক্য। ইসলামের দৃষ্টিতে দ্বীনের বাইরে দুনিয়া নাই। এবং দুনিয়া ছাড়া কোনো দ্বীন নাই। ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন হলো একটা ধারাবাহিক, আদর্শ হলো সামগ্রিক। দুনিয়া পরিচালনার জন্যই আল্লাহ তায়ালা মানুষ বানিয়েছেন। প্রচলিত অর্থে নিছক এবাদত করার জন্য নয়।

এখনকার সময়ে যারা ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের কাজ করবেন, আমাদের এখানকার ধর্মীয় সামাজিক কাঠামোর সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে তাদের নির্মোহ ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরী।

ইসলামে কি কোনো রিলিজিয়াস হলি ডে আছে? (পর্ব ৫)

আমাদের দেশে জুমার দিন সরকারী ছুটি। সপ্তাহে মানুষ সাধারণত ৫দিন কাজ করে। ২দিন ছুটি কাটায়। এই দুইদিন যে কোনো দুইদিনই হতে পারে। খৃষ্টান ধর্মমতে রোববার ও ইহুদী ধর্মমতে শণিবার হলো রিলিজিয়াস হলি ডে। তাই এই দিনে তারা এবাদত করবে। কোনো বৈষয়িক কাজ করতে পারবে না। ইসলামে তেমন কোনো রিলিজিয়াস হলি ডে নাই। জুমুার দিনের বিশেষ মর্যাদা আছে। কিন্তু তা অপরাপর ধর্মের মতো রিলিজিয়াস হলি ডে নয়। কোরআনে বলা হয়েছে,

“হে মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন নামাযের আযান দেয়া হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণ পানে এগিয়ে যাও এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝ। এরপর নামাজ শেষ হলে তোমরা যমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর। আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর। যাতে তোমরা সফল হতে পারো।” (সুরা জুমা আয়াত ৯-১০)

এই আয়াতের মর্মানুযায়ী জুমার দিন বরং পেশাগত দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাটাই এক অর্থে ধর্মীয় নির্দেশনা। এতো গেলো জুমার দিন কাজ করা যাবে কি যাবে না সে সম্পর্কে আলোচনা। এবার আসেন যারা জুমা ফরজ না হওয়া সত্বেও জুমা পড়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে তাদের সম্পর্কে আমরা খানিকটা বলি।

দুনিয়ার অন্যতম সেরা দুর্নীতিগ্রস্ত এই মুসলিম মেজরিটি দেশে লোকেরা যখন দূরপাল্লার ভ্রমনে নিয়োজিত থাকে তখনও তারা জুমা পড়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। অথচ, দূরপাল্লার ভ্রমনকারীদের জন্য জুমা ফরজ নয়। এমনকি সাধারণ নামাজও তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। অজু করার ব্যবস্থা না থাকলে তায়াম্মুম করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। দাঁড়ানোর ব্যবস্থা না থাকলে বসে বসে নামাজ আদায় করার অনুমতি আছে। কিবলামুখী হওয়ার সুযোগ না থাকলে যে কোনো দিকে ফিরেই নামাজ আদায়ের অনুমতি আছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আল্লাহ চান তোমাদের জন্য সহজ করতে। তিনি চান না তোমাদের জন্য কঠিন করতে। এটি রোজার বিধান উপলক্ষে বলা হলেও এটি ইসলামী শরীয়াহ’র অন্যতম মূলনীতি। আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেন, তোমরা সহজ করো। কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও। ঘৃণা সৃষ্টি করো না। মা আয়িশা (রা.) বলেছেন, আল্লাহর রাসূল (স.) সহজটাকে বাদ দিয়ে কঠিনটাকে গ্রহণ করেছেন, কখনো এমন হয় নাই।

আমাদের দেশের উগ্রধর্মবাদীরা এসব শুনতে নারাজ। এখানকার ধর্মজীবী হুজুরেরা মানুষকে সহজতা দিতে নারাজ। ঢাকা চট্টগ্রাম বাস রুটে কতোবার দেখেছি, কমসেকম আধ ঘণ্টার জন্য বাস দাঁড় করিয়ে লোকেরা জুমার নামাজ পড়ছে। মসজিদের হুজুরেরা যাত্রী ভাইদের সু্বিধার জন্য কতো কিছু করছেন। কখনো কোনো খতীবকে বলতে শুনলাম না, “যাত্রী ভাইগণ, আপনাদের ওপর জুমা ফরজ নয়। আপনারা দ্রুত দুই রাকাত ফরজ পড়ে বাসে ফিরে যান। সেখানে অনেক জরুরী প্রয়োজনের লোকেরা আটকা পড়ে আছেন।” বরং নানা ধরনের ধর্মীয় আবেগ সৃষ্টি করে তারা যাত্রী ভাইদের কাছ হতে চাঁদা তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

আমাদের দেশে রোজার দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হয়। রোজার কষ্ট লাঘবের জন্য। মানুষ তার সাধ্যমতো রোজা রাখবে। রোজার কষ্ট লাঘবের জন্য কাজকর্ম যথাসম্ভব কমিয়ে, সম্ভব হলে বন্ধ করে রাখতে হবে, এটি শরিয়তের কোন জায়াগায় আছে? না, ইসলামী শরীয়ার কোনো জায়গায় এমন ধর্মীয় ছুটির প্রস্তাবনা বা নির্দেশ নাই। অনেকেই জানে না, উগ্র ধর্মবাদী লোকদের রোষানলে পড়ার ভয়ে কেউ কেউ এসব জানলেও বলতে নারাজ। আমি বললাম। কারণ আমি স্বভাবতই স্বাধীনচেতা। কোনো প্রশংসা আমাকে বিভ্রান্ত করে না। অন্যায় কোনো সমালোচনাতে আমি মুষড়ে পড়ি না। আমি জানি, অপ্রিয় সত্য কথা বলা হলো অন্যতম শ্রেষ্ঠ জেহাদ।

মসজিদকে সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত করার অপরিহার্যতা (পর্ব ৬)

সত্যিকারের ইসলামী সমাজ গড়ার জন্য মসজিদ পূনর্গঠনের গত্যন্তর নাই। এখনকার সময়ে বাংলাদেশের মসজিদগুলো হলো পুরুষদের এবাদতগাহ। এখানে নারীদের প্রবেশাধিকার নাই। শিশুদের প্রবেশাধিকারকে নিরুৎসাহিত করা হয়। অথচ, ইসলামী সমাজ হলো মসজিদভিত্তিক সমাজ। কেনাবেচা, হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রচার, পায়খানা-প্রস্রাব করা ও যৌনসম্পর্ক স্থাপন, এই ৪টি কাজ ছাড়া এবাদত তথা নামাজের কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে মসজিদে সব কাজ চলতে পারে বা চলা উচিত। এটাই সুন্নাতের দাবী। তৎকালীন মসজিদে নববী এভাবে পরিচালিত হতো। মসজিদে নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে সিএসসিএস-এ আমরা বেশ কিছু কাজ করেছি। এ নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নাই।

শুধু এটুক বলছি, মসজিদে নারীদের দেখলে পুরুষ মুসল্লীদের ‘পবিত্রতা নষ্ট’ হওয়ার আশংকায় নারীদের মসজিদে আসতে না দেয়ার ব্যাপারটা একটা ষণ্ডামিমার্কা কুযুক্তি। হযরত উমর (রা.) নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করে দিয়েছেন মর্মে যে কথা বলা হয়, অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে, এটি সম্পূর্ণরূপে বানোয়াট তথ্য। তাই, তেমন সাহসী নারীদের সমর্থন ও সহযোগিতা পেলে এ নিয়ে একটা ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবো, ইনশাআল্লাহ।

মুসলিম মেজরিটি দেশগুলোর চেয়ে মুসলিম মাইনরিটি দেশগুলোতে মসজিদগুলো অধিকতর সংগঠিত। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে। সেখানে বিতর্ক হয়, মেয়েরা কেন মসজিদের মূল অংশে নামাজ পড়েতে পারবে না, মসজিদ কমিটিতে নারী সদস্য কম কেন, তা নিয়ে। আর আমাদের এখানে এমনকি টয়লেটগুলো পর্যন্ত বন্ধ করে রাখা হয়। বিদেশে মন্দির গীর্জাতে যে সুবিধাগুলো পাবলিককে দেয়া হয় সেগুলো অন্তত আমরা চালু করতে পারি।

এক সময়ে একটা ইসলামী সংগঠনের সাথে অন্তপ্রাণ হিসাবে ছিলাম। তাদের এলাকাভিত্তিক সাংগঠনিক রিপোর্টে ‘সংগঠিত মসজিদ’ বলে একটা বিষয় ছিলো। আসলে তারা সংগঠিত মসজিদ বলতে বোঝাতো এমন মসজিদের যেখানে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চলতে পারে এমন মসজিদকে। আফসোস, বহু বছর সেই ইসলামী সংগঠনের একচেটিয়া প্রাধান্যে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা আদর্শ মসজিদ গড়ে উঠে নাই। তাদের কথায় যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো কিছু উঠতো আর বসতো তখনও তারা একটা আদর্শস্থানীয় মসজিদ গড়ে তোলার কথা ভাবার মতো অবসর পায় নাই। তাদের সেই সোনালী দিনের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসাবে এই ব্যর্থতার দায় আমার নিজের ওপরও বর্তায়।

গত ২৬ বছর ধরে যে মসজিদে আমি নামাজ পড়ে আসছি সেই চবি দক্ষিণ ক্যাম্পাস মসজিদ যে কোনো হিসাবেই একটা গতানুগতিক মসজিদ। মসজিদের নীচের তলাতে এসি বসার বাইরে গত তিন দশকে এর কোনো অগ্রগতি নাই। আগে তারাবীর নামাজ পড়ানোর ‘হাদিয়া’ হিসাবে হুজুরদের দেয়ার জন্য চাঁদা তোলা হতো। এখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই একটা নির্দিষ্ট এমাউন্ট দিয়ে দেয়। এই ‘উন্নতি’টাও আপনি হিসাবে ধরতে পারেন।

এক একটা মসজিদকে এক একটা কমপ্লেক্স হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। তাতে থাকবে সমৃদ্ধ গণ পাঠাগার, নিডিদেরকে দেয়ার জন্য উদ্বৃত্ত জিনিস রাখার ব্যবস্থা, থাকতে হবে সীমিত আকারের চিকিৎসা সুবিধা, ফ্রিতে খাওয়ার ব্যবস্থা, ব্যায়াম ও খেলাধূলা করার ব্যবস্থা। একটি আদর্শ মসজিদের থাকবে সুপ্রশস্ত চত্বর ও দৃষ্টিনন্দন বাগান। থাকতে হবে গণশিক্ষা, শিশুশিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতাসহ নানাবিধ সামাজিক সহায়তামূলক ব্যবস্থা। কোনো জনপদে মসজিদকে হতে হবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সহজগম্য স্থান।

এমন মসজিদ বাংলাদেশে একটাও আছে কি? এমন মসজিদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া ইসলামী সমাজ কি সম্ভব? এমন মসজিদ গড়ে তোলার গরজ কি এখানকার ধর্মবাদী জনগোষ্ঠী কখনো ফিল করেছে? এমনকি আমি এই যে কথাগুলো বলছি, এটাকে কি সবাই এপ্রিশিয়েট করবে? জানি, এই প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। কারণ, সমস্যা আমাদের সামর্থের নয়। সমস্যা আমাদের চিন্তাগত স্বচ্ছতার। আমাদের নাই চরিত্রগত ঋজুতা। কপটতা হলো বাঙালীর আসল ধর্ম।

মসজিদের নেতৃত্ব আর সমাজের নেতৃত্বকে এক পয়েন্টে আনতে না পারলে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।   দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজপতিদের হাতে নিয়োগকৃত বেতনভূক্ত হুজুরদের ওয়াজ-নসীহত দিয়ে সমাজ পরিবর্তন হবে না। কথাটা খুবই তিক্ত। কিন্তু নিরেট সত্য।

শেষ কথা (পর্ব ৭)

কোনো ভালো কাজের কথা যখনই বলা হয়, তখন লোকেরা এমন ভাব ধরে, যেন সে এটি করার জন্য জানপ্রাণ। কিছু কুচক্রী খারাপ লোকের জন্য কিংবা নিজের সীমাহীন অসুবিধার জন্য সে এটি করতে পারছে না। অথবা, আপনার এত এত যুক্তি ও দলীলকে বেমালুম হজম করে তিনি বলে উঠবেন, ‘হ্যাঁ,আমরা তো তা-ই করছি।’ আপনাকে লম্বাচওড়া অনেক কাগুজে পরিকল্পনার কথা বলবে। বলবে, ‘আমাদের নলেজে আছে। আমরা চিন্তা করছি। সময় হলে দায়িত্বশীলদের কাছ হতে জানতে পারবেন।’

সেজন্য আমি ধর্মবাদী নির্লজ্জ হিপোক্রেটদের চেয়ে ধর্মকর্ম না করা বা কিছুটা কম করা কিন্তু নিষ্ঠাবান, সাহসী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীর লোকদেরকে প্রেফার করি। এই লেখাটাও সে ধরনের লোকদেরকে খুঁজে পাওয়া ও তাদের কাছাকাছি যাওয়ার প্রয়াস। দুনিয়া পরিবর্তন করার জন্য কিছু নিষ্ঠাবান, সৎ, সত্যবাদী, অকপট, সাহসী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন লোক দরকার। তারা দ্বীনদার হলে ভালো। না হলেও চলে। কিন্তু উগ্র ও মেকী ধর্মবাদী লোকদের বিপুল সমষ্টি নিয়ে আপনি অর্থবহ কিছু করতে পারবেন না। এরা ফলস আবেগ নিয়ে চলে। তারা যুক্তির পরোয়া করে না।

তাদের ব্যাপারে তা-ই করতে হবে যে কোনো অন্যায়কে মোকাবিলা করার জন্য আল্লাহর রাসূল (স.) যা বলেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখলে তোমরা হাত দ্বারা সেটাকে বাধা দাও। না পারলে মুখে প্রতিবাদ করো। তাও না পারলে অন্তরে সেটাকে ঘৃণা করো। এই হাদিসের বক্তব্যকে আমরা এভাবে বুঝতে পারি, কোনো কাজ অন্যায় ও অনুচিত হলে সর্বাগ্রে তা অনুধাবন করতে হবে। এরপর সে ব্যাপারে বলাবলি করে জনমত গড়ে তুলতে হবে। অবশেষে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সেটা বন্ধ করে দিতে হবে।

আপনার আমার আশেপাশে ধর্মবিদ্বেষীদের সব অপকর্ম ও ধর্মবাদীদের সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে আসুন আমরা সমাজ পরিবর্তনের এই সুসংগত নিয়মানুসারে প্রতিবাদী হয়ে উঠি। আসুন, বিপ্লবী হই। তাতে বিপ্লব না হোক, অন্তত নৈতিক দায় থেকে বাঁচতে পারবো, আশা করি। ভালো থাকুন। আপনার ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগলে ক্ষমা করুন। কাউকে আঘাত না করে হক প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তালোগোলে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না। ন্যায় প্রতিষ্ঠার সুসংগত পদ্ধতিতে আসুন আমরা যার যার জায়গা হতে কর্মতৎপর হই। অন্তত নিজের আওতাধীন ক্ষেত্রে সত্য ও ন্যায়কে সমুন্নত করি। মানবিক হই। আলোকিত করি নিজের আশপাশের সমাজকে। এভাবে একদিন পুরো সমাজ আলোকিত হবে। নিজের জন্য যথাসম্ভব সর্বোচ্চ মান, কিন্তু অন্যের জন্য অনুমোদন করি ন্যূনতম মানকে। এভাবেই গড়ে উঠতে পারে একটা ইনক্লসিভ উদার মানবিক সমাজ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলোসফি পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম। থাকি চবি ক্যাম্পাসে। নিশিদিন এক অনাবিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। তাই, স্বপ্নের ফেরি করে বেড়াই। বর্তমানে বেঁচে থাকা এক ভবিষ্যতের নাগরিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *