ধর্মবিদ্বেষ আর ধর্মবাদিতা হলো একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

পর্ব-১: রোজার পবিত্রতা রক্ষার নামে ধর্মবাদী উগ্রতা

১৬ মে, ২০১৯

ধর্মপ্রবণ এই দেশে ধর্মবিদ্বেষ যতটা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়, ধর্মের নামে বাড়বাড়ি তথা ধর্মবাদিতাকে ততটা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না। অথবা, ধর্মের নামে বাড়াবাড়িগুলোর বিরুদ্ধে লোকেরা সাধারণত মুখ খুলতে চা না।

এখন রমজান মাস। চারিদিকে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার বিপুল আয়োজন। এরই অংশ হিসাবে খাবারের দোকানগুলো দিনের বেলায় সব বন্ধ। যারা খোলা রেখেছে তারা যথাসম্ভব রাখ-ঢাক করে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

যেই ধর্মের নামে এটি করা হচ্ছে, সেই ধর্ম এ ব্যাপারে কী বলেছে তা আমরা জানার চেষ্টা করি না। রমজান মাসে যারা রোজা রাখবে না, তারা প্রকাশ্যে খাওয়া-দাওয়া করতে পারবে না– এমন কথা কোরআন-হাদীসের কোথায় আছে? ইসলাম ধর্ম মোতাবেক অমুসলিম, শিশু, বৃদ্ধ, নামাজ না থাকার সময়ে নারী, রোগী ও মুসাফিরের ওপর রোজা ফরজ নয়। শহর এলাকায় সংগত কারণেই লোকেরা মুসাফির অবস্থায় থাকে অধিক হারে। কাউকে প্রকাশ্যে খাওয়া-দাওয়া করতে দেখলে আমরা কীভাবে বুঝবো যে সে ইচ্ছাকৃত বেরোজাদার?

শরিয়তসম্মত কারণে যাদের রোজা নাই, তারা ঘরের বাইরে কোথায় খাবে? যাদের জন্য দিনের বেলা খাওয়া-দাওয়া করা জায়েয, তাদেরকে না খেয়ে থাকতে বাধ্য করা তো রীতিমতো জুলুম, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি। আমাদের দেশের রোজাদারেরা কি এতই নিম্নমানের যে কাউকে খেতে দেখলে তাদের রোজা হালকা হয়ে যাবে? ভেংগে ফেলতে মন চাইবে?

না, আমি এত নিম্নমানের সায়েম নই। আমি মনে করি সিংহভাগ রোজাদারগণও মজবুত ঈমানদার। তাহলে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার নামে এতসব বাড়াবাড়ি কীভাবে চলছে নির্বিঘ্নে? আমার ধারণায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার আশংকায় মানুষ এ ধরনের ধর্মবিরোধী অনাচার নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে।

এই লেখাটার আলোচ্য বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যশীল ভিডিও আলোচনার লিংক:

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Mahfujur Rahaman: সংগত কারণে বেরোজাদার’রা একটু পর্দার আড়ালে রেখে ঢেকে খেলে ক্ষতি কী তাতে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমি তো বুঝতেছি না, বেরোজাদারেরা খাওয়া-দাওয়া করলে রোজাদারদের কী সমস্যা!

Didarul Alam: সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না। যারা একটু চিন্তাশীল, তারা আপনার কথার ভার নিতে পেরেছে বলে আমার বিশ্বাস। ঢাকা-চট্টগ্রামের আসা যাওয়ার ঘটনার আমিও ভুক্তভোগী।

Mahfujur Rahaman: স্যার, এই সিচুয়েশনে প্রত্যেক রোজাদারের ব্যক্তিগত অনুভূতি ভিন্ন ভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু রোজা অবস্থায় কাউকে খেতে দেখলে আমার জিভে জল চলে আসে। বিকজ, আমি একজন দুর্বল ঈমানদার এবং রোজাদার।

Amim Mohammad: আমার‌ও জিভে জল আসে। কিন্তু সংবরণ করাই সিয়াম। যেহেতু বেরোজাদার থাকতেই পারে, সেহেতু তারা খাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন। তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার কথা কুরআন সুন্নাহয় নেই বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা না মানা বাড়াবাড়ি। মুসলিমরা বাড়াবাড়িতে ধর্ম খুঁজতে অভ্যস্ত। এইটা যে অধর্ম, তা বলার ও বুঝার সময় এসেছে আজ।

আরেকটি মজার বিষয়, আমি ফল বেশি পছন্দ করি। আম, লিচু, তরমুজ দেখলেই জিভে জল আসে।

আমরা দিনের বেলায় হোটেল রেস্তোরাঁ খোলা রাখাকে রমজানের অপবিত্রতা দাবি করলেও ফলমূলের দোকান খোলা রাখাকে অপবিত্রতা মনে করি না।

Mahfujur Rahaman: ভাই, আমার কথার মধ্যে আপনি বাড়াবাড়ি পেলেন কই? আমি নিজেও আত্মসংবরণ করার পক্ষে। কারণ, সংবরণ করাটাই সিয়ামের মূল শিক্ষা। আর আমি বলি নাই যে বেরোজাদাররা রোজাদারের সামনে কিছু খেতে পারবে না, কিংবা বেরোজাদাররা রোজাদারের সামনে কিছু খেলে তাকে বা তাদেরকে বাধা দিতে হবে। পুরো ব্যাপারটাই পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহনশীলতার বিষয়।

আর রোজাদারের সামনে খাবার খাওয়া, আর ফলমূলের পসরা সাজিয়ে দোকানে বেচাবিক্রি করা কি সমান কথা হলো?

Amim Mohammad: দিনের বেলায় হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ কর, করতে হবে– এই শ্লোগান তো দেওয়া হতো। হোটেল রেস্তোরাঁ খোলা রাখাকে রমজানের অপবিত্রতা মনে করা হয়। হোটেলের ভিতর খাওয়া-দাওয়া করলে রোজাদারের তো কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।

যাদের জিভে জল আসে তারা দুই প্রকার: কেউ খাবার দেখলে জল আসে, আবার কাউকে খেতে দেখলে জল আসে।

যাহোক, রোজাদারদের সামনে দেখিয়ে দেখিয়ে জিভে জল আসার জন্য কেউ খাচ্ছে, তা আমি দেখিনি। লোকেরা হোটেল রেস্তোরাঁয় খায়। তাদের বাধা দেওয়া ইসলামসম্মত হতে পারে না। তাছাড়া গাড়িতে বা ট্রেনে খেতেই পারে।

ধন্যবাদ আপনাকে।

Mahfujur Rahaman: Exactly! you are right. আমি রোজাদারের সামনে দেখিয়ে খাওয়ার বিপক্ষে বলছি শুধু, বাকি সব ঠিক আছে। আর আমি নিজেই এ ধরনের একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, যাকে অনুরোধ করার পরও শুনেনি।

Misbah Mozumder: তারপরও স্যার, প্রতিদিনকার মতো যদি চা দোকানগুলো খুলে বসে চা বিক্রি করে… জাস্ট এক্সাম্পল। আর বেরোজাদার সবার সামনে বসে চা খাবে, এটা অবশ্যই রমজানের ভাবগাম্ভীর্যের সাথে যায় না। শরীয়তে নিষিদ্ধ না হলেও দৃষ্টিকটু তো বটেই।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: শরীয়তে যা নিষিদ্ধ নয়, তা আপনি কীভাবে নিষিদ্ধ করবেন? বরং শরীয়তে যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে আপনি কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বা করতে পারবেন সেটাই আলোচনার বিষয়। এখানকার লোকাল পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিষিদ্ধ বিষয়গুলোকে আপনি একসাথে নিষিদ্ধ করবেন? নাকি, ধাপে ধাপে সেগুলোকে বন্ধ করার চেষ্টা করবেন? এসব প্রশ্নের সুরাহা করাই বরং ব্যাপক আলোচনার দাবি রাখে।

Misbah Mozumder: যেটা দেখতে অপছন্দনীয়, ওটা এড়িয়ে চলাতে শরীয়ত তো আর আমাদের নিষেধ করেনি। বরং যেটার দ্বারা রমজানের মূল বৈশিষ্ট্য হারানোর আশংকা আছে, তা অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ করতে শরীয়ত কি নিষেধ করে?

আর নিষিদ্ধ কাজ নিষিদ্ধ করতে অবশ্যই আমি তাদাররুজে বিশ্বাসী।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ইসলামী শরীয়তে কি ‘অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ’ জাতীয় কিছু আছে?

Mohammad Mostaeen Billah: শরীয়তসম্মত ওযরে শরীয়ত রোযা না রাখার রোখসত দিয়েছে। তার মানে কি সকল রোখসত গ্রহীতা এক?! যেমন: রোগী এবং ঋতুগ্রস্ত নারী কি একই হুকুমের?

একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। কোনো খানাপিনা না পেয়ে উপোষ মানুষ মারা যাওয়ার সময় হারাম ভক্ষণ (যেমন– শুকর কুকুরের গোস্ত) খাওয়া জায়েয। কিন্তু সেখানেও নির্দিষ্ট পরিমাণ রয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, فمن اضطر غیر باغ ولا عاد فلا إثم علیه۔

“তবে যে খাওয়ার সীমালঙ্ঘন এবং সদাসর্বদা রীতিকে অনুসরণ না করে, তার কোনো গুনাহ হবে না”

এখন বর্তমানে এমন কি প্রয়জন হয়েছে তাদের, যাদেরকে তিনবেলা বা রোযদারের সম্মুখে এসেই খেতে হবে?

Masudul Alam: রোজাদারগণ কি সবাই রোজা রেখে হোটেল-রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে থাকে নাকি আজকাল যে বেরোজাদাররা তাদের সামনে গিয়ে খায়? কী দিনকাল পড়লো!! 🙄

Mostafa Nur: একদম সঠিক বিশ্লেষণ। ১৯৮৭-৮৮ সেশন হতে এই অবস্থার অবসান চেয়ে আমি একটি ছোট হাউজে প্রস্তাব পাশ করিয়ে নিয়েছিলাম এবং বেরোজাদারদেরকে আহাররত অবস্থায় বেইজ্জতি করা বন্ধ করেছিলাম একটি মফস্বল শহরে। তাতে ফল এসেছে সত্যের পক্ষে।

Md Mohsin Bhuiyan: আপনার কথার সাথে একমত। বাট ‘ধর্মবাদী’ শব্দটা কি ধর্মহীনের জন্য উস্কানিমূলক নয়?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, এই কথাটা তো আমি চালু করেছি। শুনতে কিছুটা বেখাপ্পা লাগে, আপনি ঠিকই বলেছেন। ধর্মহীনদের জন্য এটা লোভনীয় টার্ম। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ধর্ম নিয়ে ধার্মিকদের যে বাড়াবাড়ি, সেটার জন্য ‘ধর্মবাদিতা’ ছাড়া আর কোনো উপযুক্ত শব্দ আমার মনে পড়ছে না। আমরা যারা ধর্মের অনুসারী, তারা যদি ধর্মের সুমহান বাণীগুলোকে সঠিকভাবে অনুসরণ করতে চাই, ধর্মের কল্যাণকর দিকগুলোকে যদি সমাজে বাস্তবায়ন করতে চাই; তাহলে ধর্মের নামে যারা বাড়াবাড়ি করছে তাদেরকে থামিয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমাদেরকেই পালন করতে হবে, যাতে করে ধর্মহীন লোকেরা ধর্মবাদী লোকদের বাড়াবাড়িগুলোকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মের গোড়া কেটে দিতে না পারে।

Md Mohsin Bhuiyan: আপনি চমৎকার বলেছেন, তবে ‘ধর্মবাদী’ বলে একটা নতুন সম্প্রদায় সৃষ্টি না করে ‘ধর্মীয় নীতির নামে কুসংস্কার’ বলা যায় কিনা?

Mohammad Ali: আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা দেন, আমি সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার যোগ্যতাও রাখি না। তবে আপনার লেখায় একটা কথা বুঝলাম– রমজানে মুসলিম হয়েও প্রকাশ্যে খাওয়া কোনো গুনাহ (অপরাধ) নয়। জানি না, জন আকাংখার নেতারা আরো যে কত ফতোয়া বের করবে! আবার এও হতে পারে, জন আখাংকার বাংলাদেশ থেকে জন আখাংকার ধর্ম।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: যাদের উপর রোজা ফরজ নয়, তারা রমজানের দিনে প্রকাশ্যে খাওয়া-দাওয়া করলে তাদের গুনাহ হবে, এটি আপনি কোথায় পেয়েছেন?

Mohammad Ali: যারা রমজানে হোটেলে খায়, তাদের কত শতাংশের উপর রোজা ফরজ নয়? আমার চোখে দেখা, যারা রমজানে খাবার খায় তাদের ৯০-৯৫ ভাগই সুস্থ মুসলমান এবং মুসাফিরের সংখ্যাও খুবই কম।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ইসলামী শরীয়ার মূলনীতি হলো মানুষকে যথাসম্ভব ছাড় দেওয়া, সন্দেহজনক ক্ষেত্রে বিষয়টাকে ইতিবাচক হিসেবে মনে করা। কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা, বা চোর ধরা, কিংবা শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি ইসলামী শরীয়াহর উদ্দেশ্য পরিপন্থী। আপনি মাকাসিদে শরীয়াহ বা ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নের মূলনীতি নিয়ে পড়াশোনা করলে এ সম্পর্কে আরো জানতে পারবেন।

Ibrahim Hossain: অনেক ভালো হয়েছে। এ প্রসংগে আমারও কিছু বলার আছে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: বলেন। আপনার লেখা পাই না অনেক দিন। অপেক্ষায় রইলাম। লিখলে আমাকে মেনশান কইরেন।

Ibrahim Hossain: Mozammel Vai, you have hit the bullseye. Thanks for your courageous and analytical writing. After reading your whole post I felt like “often thought but never expressed so eloquently”. However, in addition to the points you have mentioned I would like to add another point regarding the indiscriminate use of mic during Sheri and Iftar time. It is quite difficult to concentrate in personal prayer due to the cacophonous shouting.

Ibrahim Hossain: রমজানের পবিত্রতা রক্ষার নামে বাড়াবাড়ির আরেক উদাহরণ হচ্ছে সেহরী ও ইফতারের সময় মাইকের মাধ্যমে শব্দ সন্ত্রাস। সেহরীর সময় মাইকের ডাক শুনে কয়জন ঘুম থেকে জাগতে পারেন জানি না। তবে মোবাইল ফোনের অ্যালার্মে যারা ইতোমধ্যে জেগে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়েছেন, মাইকে ডাকাডাকির শব্দে তাদের পক্ষে নামাজ পড়াই দায়।

আমার সাততলা বাসা থেকে কমপক্ষে চারটা মসজিদের মাইক শোনা যায়। সেহরীর সময় যখন কোনো মসজিদের মাইকে শুরু হয় কোরআন তেলাওয়াত, একই সময় অন্য মসজিদের মাইকে শুরু হয় হিন্দি গানের সুরে ইসলামী সংগীত। আরেক মসজিদের মাইকে চলতে থাকে পবিত্রতা রক্ষার আহবান।

নামাজ বন্ধ করে সেহেরী খেতে বসলে মাইকে ডাকাডাকিও বন্ধ হয়। আবার হঠাৎ শুরু হয় রীতিমতো ধমকের শুরে “সেহেরী খাওয়া বন্ধ করুন। সেহেরী খাওয়ার সময় শেষ। আপনারা আর সেহরী খাবেন না।”

বেশীরভাগ মসজিদই যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে এ সতর্কবাণী প্রচার করে, তার নিচে ছোট করে লেখা থাকে– সতকর্তামূলক সেহেরীর সময় পাঁচ মিনিট আগে ও ইফতারের সময় পাঁচ মিনিট পরে ধরা হয়েছে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেহরীর সময় এ সকল মসজিদ থেকে পাঁচ মিনিট আগেই সেহেরী বন্ধ করার আহবান করা হলেও ইফতারীর সময় মাইকে বলা হয় না “এখন ইফতারের সময় হয়েছে, আপনারা ইফতার করুন, আমরা পাঁচ মিনিট পর আজান দিব।”

ইফতারের পূর্ব মুহূর্ত দোয়া কবুলের সময়। আপনি হয়ত চোখ বন্ধ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন। এমন সময় মাইকে শুরু হয় কোরআন তেলাওয়াত। আপনি হয়ত ভাববেন আজান হচ্ছে।

রমজানের পবিত্রতার নামে এ সকল আচার আসলে কতটা ইসলামসম্মত?

Sohel Khan: আপনার লেখার শি‌রোনাম আপ‌ত্তিজনক।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, আপনার এই আপত্তির বিরুদ্ধেই তো আমার আপত্তি।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

***

পর্ব-২: রুখে দাঁড়াতে হবে ধর্মবাদী জম্বি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে

১৭ মে, ২০১৯

হ্যাঁ, ইসলামপ্রিয় বা ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর নামে আমাদের দেশে ধর্মবাদী এক জম্বি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। এরা নামাজ পড়ে না। রোজা কখনো রাখে, কখনো রাখে না। তাতে কিছু আসে যায় না। ধর্মের যেসব বিধান তাদের বৈষয়িক স্বার্থের প্রতিকূলে, সেগুলোকে তারা বেমালুম চেপে যায়। কিন্তু ধর্মের যেসব বৈশিষ্ট্যে আছে শো-অফ আর শর্টকাট নাজাত লাভের তরীকা, সেগুলোর ব্যাপারে তারা বেশ সিরিয়াস। কথায় কথায় তারা এ দেশে শতকরা ৮৫ ভাগ মুসলিম মেজরিটি হওয়ার কথা তুলবে। তাদের ভাবেসাবে মনে হয় যেন এটি মুসলমানদেরই দেশ। অন্যরা এখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

কোরআন-হাদীসের দলীলের ভিত্তিতে নবীর সুন্নতের প্রকৃত অনুসরণের কথা কেউ বললে তারা তাকে সর্বপ্রকারে বিরোধিতা করবে। কিন্তু নবীর শান ও মান রক্ষা করার জন্য তারা প্রতি মুহূর্তে শহীদ হতে প্রস্তুত। এদের উদগ্র ধর্মবাদিতার কবল হতে ইসলামকে উদ্ধার করা না গেলে এখানে ইসলামী ধর্ম ও মতাদর্শে ন্যায় ও কল্যাণের যে সত্যিকারের রূপ, তা কায়েম করা অসম্ভব।

লোকদের কৃত্রিম ইসলামপ্রিয়তা যে প্রকৃতপক্ষে একটি এন্টি-ইসলামিক ফেনোমেনা, তা বার বার করে বলতে হবে। অথেনটিক রেফারেন্স ও যুক্তি দিয়ে এই ধর্মবাদিদের ভণ্ডামিকে উন্মোচন করে দিতে হবে। এদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ।

ইসলামী সংগঠনগুলোর জনতুষ্টিমূলক আচরণ ও সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের নীতি এই পথে প্রধান বাধা। এটি একটি সোশ্যাল প্যারাডক্স। তৎসত্ত্বেও আপনি যদি ইসলামের নামে প্রচলিত লোকাচারের পরিবর্তে সত্যিকারের ইসলাম অনুসরণ করতে চান তাহলে যারা রাসূল (সা) ও সাহাবাদের চেয়েও নিজেদেরকে বেশি নিষ্ঠাবান মুসলমান প্রমাণ করতে চায়, তাদেরকে রুখতে হবে।

এ জন্য চাই কোরআন, হাদীস ও সীরাতের ব্যাপক পঠন-পাঠন, প্রচার ও প্রসার।

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Shuvro Neel: জম্বি গোষ্ঠীর বিষয়ে একমত। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় আপনার স্ট্যাটাসে উল্লেখিত বিষয়গুলো উঠে এসেছে প্রায়। আমি বুঝি না এরা যেসব বিষয়ে রিঅ্যাক্ট করে, অথচ এদের চারপাশের অন্যায় নিয়ে কোনো কথা নেই।

Belal Rashid Chowdhury: the time you spending on those ”zombies”, could be better spent in your own way. you will only be questioned on you own work not others. zzk

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: to me, my ‘own way’ is to work for the societal development. My life is meant to contribute in the welfare of the society and the wellbeing of the state and in this way to serve the humanity. then what do you say?

Belal Rashid Chowdhury: may almighty Allah give you success. Ameen

Jibon Rahman: ধর্মবাদীদের ন্যক্কারজনক কাজ: “মসজিদে ৭ শিশুকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করলো কমিটির লোকজন

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ভেরি সেড!

পর্বটির ফেসবুক লিংক

***

পর্ব-৩: তারাবীর নামাজ নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ফোরজি স্পিডে তারাবী পড়ানোর হাকীকত

১৮ মে, ২০১৯

তারাবীর নামাজ নিয়ে আমাদের দেশে যতগুলো মত আছে, তার কোনোটাই একদেশদর্শিতা হতে মুক্ত নয়। এ সংক্রান্ত দলীলগুলো পড়লে তা স্পষ্ট বুঝা যায়। লোকেরা দলীল খোঁজে নিজের মতকে একমাত্র সঠিক পন্থা হিসাবে প্রমাণ করার জন্য। ইদানীং অবশ্য এ বিষয়ে মানুষ ক্রমান্বয়ে সুন্নতে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছাকাছি আসছে। বেশকিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটি সালাফীদের অন্যতম ইতিবাচক অবদান।

তারাবীর নামাজের ওপর যেভাবে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে, যেভাবে এটি পড়া হচ্ছে, তা রীতিমতো এক ধরনের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ‘ধর্মীয় সংস্কৃতি’ কথাটা শুনতে যতটা নির্দোষ মনে হচ্ছে, আপনি যদি শির্ক-বিদয়াতের ব্যাপারে সতর্ক হতে চান, তখন আপনার কাছে এই টার্মটাকে আর ততটা গ্রহণযোগ্য মনে হবে না। যারা ধর্মের নামে অযৌক্তিক লোকাচারকে নির্বিচারে সমর্থন করতে প্রস্তুত, তারা আমার সাথে একমত হতে পারবেন না।

এরমানে এই নয় যে আমি লোকাচার, সংস্কৃতি বা ধর্মীয় সংস্কৃতির বিরোধী। কিছু কিছু ধর্ম তো রীতিমতো লোকাচারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ও টিকে আছে। ইসলামেও লোকাচার বা ধর্মীয় সংস্কৃতি একটা সীমা পর্যন্ত অনুমোদিত। এর বাইরে নয়। ইসলাম যা কিছুর বিরোধিতা করেছে, অর্থাৎ কুফর, শির্ক ও বিদয়াত– এগুলো যুগে যুগে প্রতি জনপদে গড়ে উঠেছে ও টিকে থেকেছে বাপ-দাদার ঐতিহ্য তথা লোকাচারের দোহাই দিয়ে।

আপনি যদি ইসলাম সম্পর্কে জানেন, তাহলে বুঝবেন– ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি এক একটা দিককে সেটির স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই সামগ্রিকভাবে ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসাবে মানতে হয়। এর কোনোটির গুরুত্ব কম নয়। যদিও এর মধ্যে আছে হায়ারার্কি বা ক্রমসোপান। ইসলামের ধর্মীয় দিকটা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি হলো ভিত্তি। একে অক্ষুন্ন রেখেই সংস্কৃতিসহ অন্যান্য দিকগুলোকে চর্চা করতে হবে।

এই দৃষ্টিতে যদি পুরো বিষয়টাকে দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন, আমাদের দেশে ধর্মের নামে যা কিছু চলছে তার অনেকখানিই স্রেফ ধর্মীয় অপসংস্কৃতি, যাকে আমি ধর্মবাদিতা হিসাবে বলেছি। এই যে ফোরজি গতিতে তারাবী পড়া, এটির মানে কী? এটি কি আল্লাহর কালামের সাথে মশকরা করার শামিল নয়?

হযরত উমর (রা.) এক রমজানের রাতে দেখলেন, লোকেরা বিচ্ছিন্নভাবে মসজিদে নববীতে নফল নামাজ পড়ছে। তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে একসাথে নামাজ পড়ানোর জন্য দুজন সাহাবীকে দায়িত্ব দিলেন। পরবর্তীতে তিনি মসজিদে নববীতে লোকজনকে তারাবীর নামাজরত হিসাবে দেখে সাথের সঙ্গীকে বলেছেন, “তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাকো, তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম যে অংশে তোমরা সালাত আদায় করো।” বুঝতেই পারছেন, তিনি নিজে সেই তারাবীর নামাজে শরীক ছিলেন না।

তারাবীর নামাজে যে কোরআন খতম করা হয়, তাও ইসলামী শরীয়াহর ওপর আরোপিত ধর্মীয় সাংস্কৃতিক লোকাচার মাত্র। হাদীসের বর্ণনা হতে আমরা জানতে পারি, রমজান মাসে রাসূল (সা.) ও জীবরীল (আ.) পরস্পর পরস্পরকে কুরআন পড়ে শোনাতেন। কিন্তু রাসূল (সা.) তো বলেন নাই, তোমরাও এভাবে পরস্পর পরস্পরকে কুরআন পাঠ করে শোনাও। আমাদের এখানে প্রচলিত খতমে কোরআন শেষ করা হয় ২৭ শে রমজান। প্রতিদিন এক পারা করে তেলাওয়াত করাকে সামনে রাখলে এটি তো ৩০ শে রমজান শেষ হওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে ২৯ দিনের রমজান মাসের অবস্থা কী হবে, তা তো বুঝা গেল না।

পুরো ব্যাপারটাকে আপনি যদি ভাবাবগমুক্তভাবে, শরীয়াহর আলোকে ও যুক্তি দিয়ে বুঝার চেষ্টা করলে বুঝবেন, ইসলামী শরীয়াহর কিছু বিষয়কে এদিক-ওদিক করে জনগণকে সহীহ পথে রাখার জন্য একটা সিস্টেম দাঁড় করানো হয়েছে। এই আপাত নির্দোষ পথেই কিন্তু সব গলতিগুলো চালু হয়েছে যুগে যুগে। এমনকি মানুষকে নিজের মনগড়া পথে হেদায়েত করার জন্য ‘মুখলেস’ ওয়াজকারীদের একাংশ কর্তৃক সওয়াবের হাদীসও জাল করা হয়েছে।

হেদায়েতের জন্য কেয়ামত পর্যন্ত যা যা লাগবে তা সব কোরআন, হাদীস ও সীরাতে বলা আছে। এই বিশ্বাস রাখতে হবে। অতিরিক্ত আমল করার সতর্কতামূলক বাড়াবাড়ি সাহাবাদের কারো কারো মধ্যেও ছিলো। সারা বছর রোজা রাখা, দিনরাত নামাজ পড়া ও বিয়েশাদি না করার প্রতিজ্ঞা করা তিন সাহাবীর ঘটনা হতে এটি আমরা জানতে পারি। এ ধরনের প্রবণতাগুলোকে আল্লাহর রাসূল (সা) কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন। বা-জামায়াত তারাবী পড়ার ব্যাপারটির ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিলো। আমরা জানি।

রমজানে আপনারা যত নফল ইবাদাত করছেন তার পাশাপাশি, অন্তত এর কিছুটা কমিয়ে হলেও আল্লাহর ওয়াস্তে কোনো সহীহ হাদীসের কিতাব থেকে ‘কিতাবুস সিয়াম’ অধ্যায়টুকু পড়ে নেন। এতে আপনি অধিকতর সওয়াবের ভাগিদার হবেন।

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Mohammad Sohel: আপনার বক্তব্য একেবারেই সঠিক। অধিকন্তু এখানে একটি জটিল বিতর্ক আছে। বিতর্কটি হচ্ছে তারাবীর রাকাতের সংখ্যা কত! ৮ রাকাত, নাকি ২০ রাকাত? আবার অনেক আলেমের মতে, কম বা বেশি করা যাবে, যেহেতু নফল নামাজ! আপনার মাধ্যমে কোরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক সঠিক পন্থাটি জানতে পারি কি?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এইটা পড়েন: পুরনো তর্ক নতুন করে

Mohammad Sohel: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Faisal Takee: স্যাররাই যদি ফতোয়া দেয়, তবে পনের-বিশ বছর কওমি মাদ্রাসায় কুরআন হাদীসের অধ্যয়ন করে আলেম হওয়ার প্রয়োজন নাই!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: স্যাররা ফতোয়া দেন না। দিলেও সেটা কার্যকরী হওয়ার কথা নয়। ফতোয়া দিবেন মুফতিরা। তবে প্রত্যেক মুসলমানের এই অধিকার আছে যে ইসলাম সম্পর্কে তার আন্ডারস্ট্যান্ডিং সম্পর্কে অন্যকে বলা। বিশেষ করে যখন অন্যরা সেগুলো জানতে চায়। ইসলাম তো কারো কপিরাইটের বিষয় নয়। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন– “বাল্লিগু আন্নি ওয়ালাও আ-য়াহ।” আমার একটি কথা হলেও লোকদের কাছে পৌঁছিয়ে দাও।

এনিওয়ে, আগামীকালের পর্বে যা আসবে তা তো খুব সম্ভবত আপনি হজম করতে পারবেন না। অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

মুহাম্মাদ হারুনুর রশিদ: প্রথমত, স্যার কিন্তু ফাতাওয়া দেননি। দ্বিতীয়ত, ১৫/২০ বছর পড়িয়ে আলিম কিন্তু শুধু কওমীরাই বানান না। আহলে হাদীস/সালাফীরাও বানায়। তাদের তো ‘মাদীনা বিশ্ববিদ্যালয়’ ফারেগ আলিমও সবচেয়ে বেশি। তারা (হাফিজাহাল্লাহ) যে যার মতো করে হাদীস ও শরাহ্ শোনায়। এক্ষণে সাধারণ কিন্তু সচেতন (শুদ্ধতার ব্যাপারে) মুসলিমরা যাবে কই? তাই তারা নিরুপায় হয়ে নিরপেক্ষ আলোচনাগুলোয় মনোনিবেশ করে।

Mustafa Mridha: ২০ বৎসর যারা মাদ্রাসায় পড়ে, তাদের দ্বীন শিক্ষার তেমন কোনো সুযোগ নাই। তাদের শুধু দ্বীনের ফরম্যাট শিখানো হয়। এর বাহিরে স্বাধীন চিন্তা করার যোগ্যতা বেশিরভাগেরই নেই। যদি কদাচিৎ দুই একজনের থাকেও, তাহলে তারা জীবন-জীবিকার প্রশ্নে বা গোমরা হয়ে যাওয়ার অপবাদের ভয়ে মুখ খোলেন না।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

***

পর্ব-৪: আলেম সমাজ জ্ঞানী সম্প্রদায় হিসাবে গড়ে না উঠে ধর্মীয় প্রিস্ট-ক্লাস হিসাবে গড়ে উঠার সুবিধা এবং অসুবিধা

১৯ মে, ২০১৯

আমাদের আলেম সমাজ তথা হুজুরগণ সাধারণত আমলের ওপর খুব গুরুত্বারোপ করেন। অথচ, জ্ঞান অর্জন যে সব আমলের বড় আমল বা সব আমলের ভিত্তি, লোকদের কাছে তা উনারা ততটা জোর দিয়ে বলেন না। অবশ্য, লোকেরা যদি সঠিক বিষয়গুলো জেনে যায়, তাহলে তো উনাদের ‘স্বর্গীয় মধ্যস্থতাগিরি’ (পড়েন, হুজুরগিরি) অনেকখানি ফউত (মানে ভণ্ডুল) হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা যেভাবে বিজনেস সিক্রেট প্রকাশ করতে চান না, তেমন করে উনারাও চান না– লোকেরা ধর্মীয় জ্ঞানে শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠুক।

উল্লেখ্য, আপনি যতই শিক্ষত হোন না কেন, ক্ষেত্র বিশেষে আপনাকে অন্যান্যদের ওপর, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এখন আপনিই ঠিক করেন, পরবর্তী অনন্ত জীবনে সফলতা লাভ কিংবা ব্যর্থতার ঝুঁকি আছে এমন জীবন-মরণের বিষয়ে তথা ধর্মীয় জ্ঞানে আপনি অজ্ঞ থেকে প্রিস্ট-ক্লাস সিস্টেমের তাবেদারী করবেন? নাকি, জীবন চলার মতো ন্যূনতম মতাদর্শিক জ্ঞান অর্জন করে আপন আলোয় পথ চলবেন? সিদ্ধান্ত আপনার।

এটি ঠিক, ধর্মীয় পেশাজীবী হিসাবে আলেম সমাজের অবস্থা খুব খারাপ। পেশাজীবীদের অধিকারের দিক থেকে দেখলে তাদের এই শোচনীয় আর্থিক দৈন্যতাকে কোনোভাবেই মানা যায় না। যারা মাজার ব্যবসা করেন, অথবা ওয়াজ করেন, তারা ছাড়া মসজিদ-মাদ্রাসায় নিয়োজিত হুজুরগণ এক ধরনের মানবেতর জীবনযাপন করেন। প্রশ্ন হলো, ইসলামের মধ্যে এ ধরনের একটা ধর্মজীবী সম্প্রদায়কে একটা বৈধ পেশাজীবী সম্প্রদায় হিসাবে স্বীকৃতি দিতে পারবেন কিনা। বিচারপতিদের জায়েযকরণ প্রক্রিয়া বা সবকিছুকে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার মতো ধর্মব্যবসাকেও সামাজিক স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। যা আমাদের সমাজে চলছে।

মাঝে মাঝে খতম পড়িয়ে এবং রমজানে কোরআন পড়ে হুজুররা মজুরী নিচ্ছেন। এভাবে কোরআন পাঠের বিনিময়ে, নামাজ পড়ানোর বিনিময়ে মজুরী গ্রহণকে তারা হালাল করে নিয়েছেন। অথচ আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আমার আয়াতকে সামান্য মূল্যে বিক্রয় করো না। নবী-রাসূলগণ মানুষকে দ্বীনে দাওয়াত দেয়া ও হেদায়েতের কথা বলার সময়ে বলতেন– দেখো, তোমাদেরকে আমি যা বলছি তাতে আমার ব্যক্তিগত কোনো লাভ নাই। আমি তোমাদের ভালোর জন্য দায়িত্ব মনে করেই এসব বলছি। আর আমাদের হুজুররা দ্বীনের দাওয়াত ও হেদায়েত দানের বিনিময়ে টাকা পয়সা গ্রহণ করেন। ধর্ম তাদের পেশা।

ধর্মজীবী শ্রেণী থাকার সুবিধা হলো, তাদের মধ্যস্থতায় মানুষ খোদা তায়ালার কাছে পৌঁছে যাবার আশা করে। ধর্মীয় পুরোহিতদের দান-দক্ষিণা করলে, খাওয়ালে, মানুষ মনে করে, পুরোহিতরা সঠিকভাবে প্রার্থনা করতে পারবে। মানুষের ধারণা, খোদার কাছে কোনো দোয়া কবুল হওয়ার জন্য খোদার প্রতিনিধি তথা প্রিস্ট বা হুজুরদেরকে দিয়ে সহীহভাবে দোয়া-মুনাজাত করাতে হবে। সব ধর্মের ব্যাপারে তা খাটলেও এটি যে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার লংঘন, সেটি হুজুররা মানুষকে কখনো বলেন না। এ ব্যাপারে আমি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই একটা কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করবো। এই আয়াতটির অব্যবহিত পূর্ববর্তী দুইটা এবং পরবর্তী একটা আয়াত হচ্ছে রমজানের রোজা রাখার বিধান সংক্রান্ত।

“আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে, বস্তুত আমি রয়েছি অতি নিকটে। যারা আমাকে ডাকে আমি তাদের ডাকে তখনই সাড়া দেই যখনই তারা আমাকে ডাকে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করো এবং আমার ওপর ঈমান রাখো।” (সূরা বাকারা: ২:১৮৬)

মোল্লা-পুরোহিতগণ, মুসলিম সমাজে যারা হুজুর হিসাবে পরিচিত, তারা নিজেদের জন্য ন্যূনতম মান তথা রুখসতকে নীতি হিসাবে গ্রহণ করেছেন। আর অন্যদের জন্য তারা এডভোকেসি করেন সর্বোচ্চ মান তথা আযিমতকে। হুজুররা যদি প্রিস্ট-ক্লাস না‌ হয়ে সত্যিকারের জ্ঞানী সম্প্রদায় তথা আলেম হতেন তাহলে এটি হতো ঠিক এর উল্টো। যারা সত্যিকারের আলেম তারা নিজেদের জন্য আযিমত, আর অন্যদের জন্য রুখসতের নীতি অনুসরণ করেন।

মাওলানা মওদূদীর এই কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছে। তাঁর কোনো একটা লেখায় পড়েছিলাম। তিনি বলেছেন, মসজিদের বাইরে জুতা সেলাই করে যে লোক জীবিকা নির্বাহ করে তার উপার্জন সেই লোকের চেয়ে উত্তম যে কিনা নামাজ পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। আমরা ধরে নিয়েছি, কিছু লোকেরা নামাজে নেতৃত্ব দিবে। আর কিছু লোকেরা সমাজের বাদবাকি কাজে নেতৃত্ব দিবে। এটি হলো এক ধরনের সেক্যুলার চিন্তা।

আফসোস, গ্রসলি যারা সেক্যুলারিজমের বিরোধিতা করে, তারা এই ফরম্যাটের সেক্যুলারিজমকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। আমার এ ধরনের চাঁচাছোলা কথাবার্তা শুনে তাদের পিত্তি জ্বলে উঠবে, সন্দেহ নাই।

বেতনভুক্ত লোক নিয়োগ না করলে নামাজ পড়াবে কে? এ ধরনের প্রশ্ন ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে ভিত্তিহীন প্রশ্ন। উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে যিনি যোগ্য তিনিই নামাজ পড়াবেন। এমনকি তার সূরা-কেরাত যদি শুদ্ধও না হয়। এটাই ফিকাহর মাসয়ালা।

চোর, বাটপার, অসাধু রাজনৈতিক নেতা, গলাকাটা ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজ সমাজপতিদের অনুদান, অনুগ্রহ ও বেতনে চলা এইসব হুজুররা তাদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সব অনিয়ম, জুলুম, অবৈধ কর্মকাণ্ড ও ইনকামকে বৈধতা দিয়ে থাকে। মুখের মাধ্যমে না হলেও হাতের মাধ্যমে, কাজকর্মের মাধ্যমে। প্রতিবাদ না করার মাধ্যমে। আল্লাহ রাসূল (সা) বলেছেন,

“বনী ইসরাঈল বংশের লোকজন যখন আল্লাহর নাফরমানীর কাজে লিপ্ত হয়, তখন তাহাদের আলিমগণ প্রথম দিক দিয়া তাহাদিগকে নিষেধ করতে থাকেন। কিন্তু লোকেরা তাহাদের কথানুযায়ী পাপকাজ হতে বিরত হলো না। এরপর সেই আলিমগণই বনী ইসরাঈল বংশের পাপী লোকদের সঙ্গে একত্রে উঠাবসা ও পানাহার করতে শুরু করে। ফলে আল্লাহ তাদের পরস্পরের মনকে পরস্পরের দ্বারা প্রভাবান্বিত করে দেন।” (তিরমিযী)

এই হাদীসে তো দেখা যাচ্ছে ইহুদী আলেমরা ছিলো স্বাধীন কিন্তু আপসকামী। আর আমাদের হুজুরেরা তো মসজিদ কমিটি দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত এবং ভিতরে ভিতরে আপাদমস্তক দুনিয়াদার। আপনার এলাকায় দেখবেন, ভালো মানুষরা মসজিদ কমিটিতে নাই অথবা কোনঠাসা।

এ দেশে স্তরে স্তরে সবকিছুতে ভেজাল, ঠকানো, প্রতারণা ও জুলুম। এসব অন্যায় কাজ মানুষের ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কথাটা উল্টো করে বললে, এত ধর্মকর্ম মানুষকে কোনো ধরনের দুর্নীতিচর্চা হতেই বিরত রাখতে পারেনি। ধর্মের নামে এসব অধর্মচর্চা নিয়ে কথা না বলার জন্য রয়েছে প্রচণ্ড সামাজিক চাপ। এ সবকিছুই খাপে খাপ মিলে যায় পুরোহিততন্ত্রের সাথে। যুগে যুগে পুরোহিততন্ত্রের অন্যতম প্রধান কাজ হলো দুর্নীতিবাজ সমাজপতি ও রাষ্ট্রনায়কদের বৈধতা দেয়া।

এ ধরনের পুরোহিততন্ত্রের সাথে ইসলামের নাই দূরতম কোনো সংযোগ। ইসলামে আছে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা। ইসলামে নাই দ্বীন ও দুনিয়ার পার্থক্য। ইসলামের দৃষ্টিতে দ্বীনের বাইরে দুনিয়া নাই। এবং দুনিয়া ছাড়া কোনো দ্বীন নাই। ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন হলো একটা অখণ্ড ধারাবাহিকতার নাম, আদর্শ হলো জীবনবোধ ও বিশ্বাসের সামগ্রিকতা। দুনিয়া পরিচালনার জন্যই আল্লাহ তায়ালা মানুষ বানিয়েছেন। প্রচলিত অর্থে নিছক ইবাদত করার জন্য নয়। দুনিয়া পরিচালনা তথা বিশ্বব্যবস্থায় নেতৃত্ব দেয়া তথা আল্লাহর খেলাফতের দায়িত্ব পালনকে পুরোহিতগণ এভয়েড করেন। এবং তা অনুপযুক্ত দুনিয়াদার নেতৃত্বের কাছে সোপর্দ করে দুনিয়াবী সব বিষয়ে তাদের তাবেদারী করেন।

এখনকার সময়ে যারা ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের কাজ করবেন, আমাদের এখানকার ধর্মীয় সামাজিক কাঠামোর সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে তাদের নির্মোহ ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। তাই, এসব কথা এতটা ঝুঁকি নিয়ে এভাবে খোলামেলাভাবে এড্রেস করছি। এই লেখার মাধ্যমে যারা আহতবোধ করবেন, তাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। আশা করি, সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করা এই তাত্ত্বিক আলোচনাকে কেউ ব্যক্তিগতভাবে নিবেন না।

আমি আলেমদের দোষ দিচ্ছি না। কেউ যেন আমাকে এ নিয়ে ভুল না বুঝেন। আমি এ ধরনের আলেম তৈরি ও তাদের ভরণপোষণের যে অনাকাংক্ষিত ব্যবস্থা, সেটাকেই দায়ী মনে করছি। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করে, অপমান করে, সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

আবার, কোনো সত্য এমন হতে পারে না, যা সমাজের সবাইকেই খুশি করবে। কোনো হক কথা এমন হতে পারে না, যা সবারই পছন্দ হবে। সত্য কথা প্রায়ই হয় তিক্ত। কোনো সমস্যাকে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান না করতে পারলেও উচিত হচ্ছে সমস্যাটা যে আছে, ঠিক কোথায় আছে সেটা নির্ণয় করা ও খোলা মনে তা স্বীকার করা। সমস্যাকে সমস্যা হিসাবে স্বীকার না করে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না।

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য:

Mohammad Tawrat Taniz: আলেম সমাজ না থাকলে আরবী শিক্ষায় শিক্ষিত হবে কেমনে মানুষ?

তাছাড়া প্রত্যেক আলেমেরই ঘর-পরিজন-সংসার রয়েছে। সুতরাং, পরিবারকে দেখাশোনা করাও একটা ইবাদত। একজন আলেমের কাজ ইমামতি, মোয়াজ্জিন, হাফেজ ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব করে টাকা উপার্জন না করলে করবে কী দিয়ে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আলেম সমাজ না থাকলে সমাজ অন্ধকারে ডুবে যাবে। এমনকি সমাজব্যবস্থা ভেংগে পড়বে। অতএব, আলেমদের দরকার। বরং সত্যিকারের জ্ঞানী তথা আলেমগণ হচ্ছেন একটা সমাজের মূল ভরকেন্দ্র। তবে তাদেরকে হতে হবে সত্যিকারের আলেম। পেশাজীবী আলেমরা কখনোই সত্যিকারের আলেম হতে পারেন না। তাই কাজের আলেম না হয়ে নামকাওয়াস্তে আলেম হলে, হিন্দুদের পুরোহিত বা খ্রিষ্টানদের পাদ্রীর মতো হলে যা হওয়ার তা-ই হবে।

পুরোহিততন্ত্র হলো ধর্মের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। পুরোহিততন্ত্র ইসলামে যে নাই সেটার পক্ষে আমি কোরআনের আয়াত উল্লেখ করেছি। এই দিক থেকে দেখলে ইসলামকে ধর্ম না বলে দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা বলাই অধিকতর যুক্তিসংগত।

আমাদের দেশে যে আলেম সমাজ রয়েছে, তারা যতটুকু অংশে জ্ঞানী সম্প্রদায় ততটুকুতে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। যতটুকু অংশে তারা পুরোহিতদের মতো ততটুকু অংশে তারা পরিত্যাজ্য। এটি মূলনীতি। এর আলোকে দেখতে হবে কোন আলেম আসলেই আলেম, আর কোন আলেম তা নন।

এবার আসো, যেসব আলেম সত্যিকারের জ্ঞানী না হয়ে ধর্মজীবী হিসাবে জীবনযাপন করছেন তাদের এই পেশা বন্ধ হয়ে গেলে ‘তারা খাবে কী বা চলবে কীভাবে’ তোমার এই প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তরে।

পেশাটি সন্দেহজনক বা খারাপ হলেও সেটাকে চলতে দেয়া উচিত। নচেৎ এই পেশায় জড়িতদের সংসার চলবে কী করে? একই যুক্তি তো যে কোনো অবৈধ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেই খাটে। কোনো অবৈধ পেশাকে বন্ধ করে দিলে তারা কীভাবে খাবে ও চলবে তা নিয়ে প্রশ্ন আসবে। সেটাকে ক্রমান্বয়ে কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদেরকে ভাবতে হবে। যদি সেই অবৈধ পেশাকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে চান।

[ভাতিজা, তোমার ইন্টেলেকচুয়্যাল হাইট ও কনসার্ন দেখে খুব ভালো লাগছে। তোমার জন্য অন্তর থেকে দোয়া করছি। আশা করি তুমি আমাদের বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে। ঈদের আগে-পরে করে দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।]

Mohammad Tawrat Taniz: জানার নিমিত্তে আংকেল কমেন্ট করে থাকি। আপনার কথাটি ভালো লাগল এবং উপলব্ধি করতে পারলাম। ইনশাআল্লাহ আংকেল দেখা হবে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: সত্যি তোমাকে নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি গর্ববোধ করি। অচলায়তনের গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত একটা এলাকাতে এতো কম বয়সের এতটা চিন্তাশীল কেউ আছে, তা সত্যিই খুব আশাব্যঞ্জক কথা। তুমি নিজের মতো জীবন ও জগতকে জানার জন্য পড়াশোনা করো। নিজের মতো করে চিন্তা করো। যা করো যুক্তি, বুদ্ধি ও বিবেককে খাটিয়েই তবে তা করো। আমরা যে মাটি থেকে উঠে এসেছি তুমিও সেই মাটির সন্তান। মানুষেরা বিভ্রান্ত হতে পাারে। কিন্তু মাটির উর্বরতা থেকে যায়।

Md Nayeem Watto: একজন দাওড়া হাদীস পড়া মাদ্রাসার শিক্ষকের বেতন সর্বসাকুল্যে ৫ হাজার টাকা! অনেকে ৫ হাজারও পায় না।

এই অর্থ দিয়ে মাসের ৩০ দিন বৌ বাচ্চা চালানোর কথা বাংলাদেশের আর কেউ চিন্তা করে বলে আমার মনে হয় না! 😏

দিনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১২ ঘন্টারও বেশি সময় নিজের শ্রম দিয়ে আগামী প্রজন্মকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে যাচ্ছে।

এই যৎসামান্য অর্থের বিনিময়ে দিনযাপনেও যদি কারো আপত্তি থাকে, তাহলে আর কিছুই বলার থাকে না।

এখন তো একজন কলেজ ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রও একটি টিউশনি থেকেই ৫ হাজার করে পায়! 😏

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: “এটি ঠিক, ধর্মীয় পেশাজীবী হিসাবে আলেম সমাজের অবস্থা খুব খারাপ। পেশাজীবীদের অধিকারের দিক থেকে দেখলে তাদের এই শোচনীয় আর্থিক দৈন্যতাকে কোনোভাবেই মানা যায় না। যারা মাজার ব্যবসা করেন, অথবা ওয়াজ করেন, তারা ছাড়া মসজিদ-মাদ্রাসায় নিয়োজিত হুজুরগণ এক ধরনের মানবেতর জীবনযাপন করেন। প্রশ্ন হলো, ইসলামের মধ্যে এ ধরনের একটা ধর্মজীবী সম্প্রদায়কে একটা বৈধ পেশাজীবী সম্প্রদায় হিসাবে স্বীকৃতি দিতে পারবেন কিনা।”

এই অংশটুকু পড়োনি? যদি পড়ে থাকো, তাহলে বলো, ইসলামিক্যালি একটা প্রিস্ট ক্লাস সিস্টেম ইসলামে থাকতে পারে কিনা? উইদাউট কনসিডারিং অ্যাট প্রেজেন্ট কনটেক্সট, হ্যাঁ অথবা না।

Md Nayeem Watto: ধর্মজীবী সম্প্রদায়কে পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া অবশ্যই যাবে। কেননা, তারা তাদের পড়াশোনাকেই সমাজ ও কল্যাণকর রাষ্ট্র বিনির্মাণে কাজে লাগাচ্ছে।।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: দুটো বিষয়কে একসাথে গুলিয়ে ফেললে হবে না। একটা হলো একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে দায়িত্ব পালন করা। আর একটা আল্লাহর দিকে আহবানকারী হিসাবে ভূমিকা পালন করা। প্রথমটাকে আমরা শিক্ষকতা বলতে পারি। দ্বিতীয়টাকে আমরা দাওয়াতে ইলাল্লাহ বা আল্লাহর দিকে আহবান করা বলতে পারি। দুটো দুই জিনিস। আমার দক্ষতা বিক্রি করা আর আমার নৈতিকতা বিক্রি করা তো এক নয়। দক্ষতার বিনিময় করা যায়। নৈতিকতার বৈষয়িক বিনিময়ের বিষয়টা নৈতিকতার সংজ্ঞার সাথেই সাংঘর্ষিক।

হুজুরেরা আর একটা কাজ করে। যা আরো মারাত্মক রকমের আপত্তিকর কাজ। তারা ব্যক্তিগত ইবাদতের বিনিময়ে টাকা নেয়। নামাজ সবার উপরই ফরজ। আমার উপর ফরজ নামাজে কেউ মুসল্লী হিসাবে এক্তেদা করলে আমাকে তার টাকা দিতে হবে কেন?

তারা দোয়া করে টাকা নেয়। নিছক শুভেচ্ছা স্বরূপ কারো জন্য দোয়া না করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ হতে অর্থ প্রাপ্তির আশায় কারো জন্য দোয়া করলে সেই দোয়া ঐকান্তিক না হওয়ার কারণে তা আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। তদুপরি, এ ধরনের অবৈধ লেনদেনের কারণে উভয়পক্ষই গুনাহর ভাগিদার হবে।

তোমার জন্য এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ কথা হলো, কেউ পড়াশোনা করার পরে সেই পড়াশোনার সাথে সামঞ্জস্যশীল একটা পেশায় নিয়োজিত হতে পারে। সেই হিসাবে যারা মাদ্রাসায় পড়েছে হুজুর হওয়ার জন্য, তাদের হুজুর হওয়াটা ঠিকই আছে। অন্যান্য পেশাজীবীর মতো ধর্মজীবীতাও হতে পারে একটা স্বীকৃত পেশা। অন্যান্য সব ধর্মেই সেটা আছে। তাতে কোনো সমস্যা নাই।

সমস্যা হলো, ধর্মকে পেশা হিসাবে নেয়ার এই বিষয়টা ইসলামে অনুমোদিত নয়। ইসলাম যাজক বা পুরোহিততন্ত্র, ইংরেজিতে যাকে priest class system হিসাবে বলা হয়, সেটার মূল স্বীকার্যকেই ইসলাম নাকচ করে বান্দার সাথে খোদার একটা সার্বক্ষণিক, কোয়ালিফাইড, আনইন্টারাপ্টেড ও ডাইরেক্ট সম্পর্কের কথা বলে।

ধর্মীয় জ্ঞানে পণ্ডিতদের উপস্থিতি, সমাজে তাদের সক্রিয় ভূমিকা, তাদের সম্মানজনক নেতৃস্থানীয় মর্যাদা– এগুলো তো মাস্ট থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা যা জান না, তা যারা জানে তাদের কাছ হতে জেনে নাও। তিনি বলেছেন, যারা জানে না আর যারা জানে তারা সমান হতে পারে না।

তুমি জানো কিনা জানি না, ইমাম-ফুকাহাদের কেউই কিন্তু ধর্মজীবী ছিলেন না। তাদের নিজস্ব পেশা ছিলো। ইমামে আযমের ছিলো কাপড়ের ব্যবসা।

আর যারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ছিলেন বা এখনো থাকবেন, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতা হতে পারে। এটি তো দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দানের কাজ নয়। তারা নিয়োজিত ছিলেন প্রশাসনিক কাজে। মসজিদে কেউ যদি ঝাড়ু দেয়, পাহারা দেয়, এ জন্য সে টাকা নিতে পারবে। কিন্তু কেউ নামাজ পড়াবে আর সেজন্য টাকা নিবে, বেতন নিবে– এটি কীভাবে জায়েয হতে পারে, তুমিই বলো।

তুমি এটিও জানো কিনা জানি না, কেউ কারো পিছনে মুসল্লী হিসাবে এক্তেদা করার জন্য তার অনুমতিরও দরকার নাই। কেউ যখন বুঝবে তার পিছনে কোনো মুসল্লী দাঁড়িয়ে গেছে, তখন তার জন্য ওয়াজিব হলো জোরে তকবীর বলে পিছনের লোকদেরকে তাকে অনুসরণে সহায়তা করা।

এই পুরো আলোচনাটাকে তাত্ত্বিক বা নীতিগতভাবে বিবেচনা করতে হবে। এখানকার কনটেক্সটে কী করা উচিত, সেটা ভিন্ন পরিসরের আলোচনা। তোমাকে ভালো জানি। বুঝতে পারছি, তুমি বুঝতে পারছো না। তাই এত বিস্তারিত প্রত্যুত্তর। জানি না তুমি এসব ঠিকমতো পড়ছো কিনা। আমার মূল স্ট্যাটাসটাই তুমি মনোযোগ দিয়ে পড়েছ কিনা, তাও আমি নিশ্চিত নই। সে যাই হোক, ভালো থাকো।

Jibon Rahman: মনের কথাগুলোই যেন আপনার লেখায় পড়লাম! বিশেষ করে অনেক দিন থেকেই ভাবছি, ইমামতি কীভাবে একটা পেশা/চাকরি হয়! এটা অসম্ভব, উচিৎ নয়। ইমাম হওয়ার যোগ্য কে, এই নিয়ে একটা দীর্ঘ হাদীস আছে। বেতনভুক্ত লোক দিয়ে ইমামতি করানোর কোনো সুযোগ দেখা যায় না।

জাজাকাল্লাহ।❤

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: বেতনভুক্ত নেতৃবৃন্দ যে সত্যিকারের নেতা হবেন না, এটাই তো স্বাভাববিক। এই ধরনের সেক্যুলার ভাগাভাগির কারণে আদর্শের নেতা তথা ইমামরা বাস্তব সমাজের নেতা হতে পারছেন না। ফলে তারা সমাজের বাস্তব ইমাম তথা নেতাদের চামচাগিরি করছেন। এবং এতে করে তাদের এত এত ওয়াজ নসীহত কোনোই কাজে আসছে না।

Kamrul Ahsan: দুঃখিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিযুক্ত ধর্মীয় শিক্ষক সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণ নিয়ে এখানে আমি কথা বলবো না। তাতে করে মূল আলোচনাটা গৌণ হয়ে পড়বে। আমি একটা ওভারঅল নীতিগত কথা বললাম। ব্যাপারটা সম্পর্কে আমরা যদি তাত্ত্বিকভাবে একমত হতে না পারি, তাহলে বাস্তব উদাহরণেও একমত হতে পারবো না। কোনো বিষয়কে আগে নীতিগতভাবে ফয়সালা করতে হয়। আমি এখানে নীতির প্রশ্ন তুলেছি এবং এ বিষয়ে আমার মত ব্যক্ত করেছি। অমুক-তমুক কী হচ্ছে বা হবে, তা নিয়ে ভিন্ন সময়ে আলোচনা হতে পারে, আলোচ্য বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছা সাপেক্ষে।

আরিফুর রহমান: আলেম সমাজ যদি মাদ্রাসা, মসজিদে পড়িয়ে টাকা না নেয়, তাহলে তাদের জীবন ধারণের কী অবলম্বন হবে?

এছাড়া ইসলামের প্রথম চার খলিফা বায়তুল মাল থেকে অর্থ গ্রহণ করেছেন। তাদের অর্থগ্রহণটা কীভাবে হালাল হয়েছে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এটি একটা অহেতুক বাহুল্য প্রশ্ন। ভুল প্রশ্ন। ‘বায়তুল মাল’ কথাটাকে আপনি যদি পারিভাষিক অর্থে নেন, তাহলে বলতে হয়, আমাদের এখানে তা নাই। তাই সেটার কোনো হুকুমও এখানে প্রযোজ্য নয়।

আরিফুর রহমান: প্রশ্নটা ছিল মসজিদে ইমামতি করে এবং মাদ্রাসায় কোরআন-হাদীস শিক্ষা দিয়ে বিনিময় গ্রহণ করা যদি হালাল না হয়…। খলিফাগণ মসজিদে নববীতে ইমামতি, কোরআন শিক্ষাদান, কোরআনের দেয়া বিচার ব্যবস্থাসহ যে সকল দ্বীনি খেদমত আঞ্জাম দিয়ে, দ্বীনি কর্মব্যস্ততায় সাংসারিক আয় উপার্জনে সময় দিতে না পেরে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যে অর্থ গ্রহণ করেছেন, তা তো কেবল দ্বীনি খেদমতের জন্যই নিয়েছেন। বতর্মানে দ্বীনি খেদমত করে অর্থগ্রহণ হালাল না হলে খলিফাতুল মুসলিমিনদের দ্বীনি খেদমত করে অর্থগ্রহণ হালাল হবে কীভাবে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনি যদি খেলাফতে রাশেদা কিংবা বৃহত্তর অর্থে তাবে-তাবেঈনদের যুগ তথা সালফে সালেহীনদের যুগের আমল সম্পর্কে খোঁজ নেন, তাহলে দেখবেন দাওয়াতের কাজ ও তাযকিয়া-তারবিয়াতের কাজ, এগুলো সব সময়ই ভলান্টারি ছিলো। রাষ্ট্রীয় কাজকে সেই সময়েও দাওয়াতী ও হেদায়েতী কাজ হতে আলাদা হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিলো। আশা করি, বুঝতে পেরেছেন।

Ahsanol Hoque: বর্তমান ধর্ম ব্যবসায়ীদের (তথাকথিত আলেম সমাজ) দেখলে আমার মনে হয় কুরআন-হাদীসের জ্ঞান অর্জন করলে হাত-পা ভেঙ্গে লুলা হয়ে যায়। না হলে সাধারণ মানুষের পেশা (যেমন: কৃষি, ব্যবসা ইত্যাদি) তারা নিজেদের জন্য হারাম করে নেয় কেন?

একদম আমার মনের কথা লিখেছেন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: সালফে সালেহীন বলতে যাদেরকে আমরা বুঝি তারা কেউই ধর্মজীবী ছিলেন না। ইমাম আবু হানিফা ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী। তিনি বরং তাঁর ছাত্রদেরকে বিনা পয়সায় খাওয়াতেন এবং পড়াতেন।

Ahsanol Hoque: ধর্ম ব্যবসায়ীরা সাধারণত ডাক্তার-উকিলদের উদাহরণ দেয়। তারা বলে, ডাক্তারকে ২০ হাজার টাকা দিতে সমস্যা নেই, কিন্তু কুরআন খতম বাবদ এক হাজার টাকা দিতে সব সমস্যা!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কারণ ডাক্তারদের কাজ হচ্ছে টেকনিক্যাল। হুজুরদের কাজ হচ্ছে আইডিওলজিক্যাল বা এথিক্যাল। আদর্শগত বা নৈতিক যে কোনো কিছুর মূল আবেদনই হচ্ছে এটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়। কথাটা বিপরীতভাবে যদি বলা হয়– স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় নৈতিক বা মতাদর্শিক হবে না।

সে জন্য লক্ষ করলে দেখবেন, যারা নৈতিকতা বা আদর্শের কথা বলে তারা সেটার জন্য কোনো মজুরী গ্রহণ বা বৈষয়িক স্বার্থ হাসিল করে না।

দুনিয়াতে নৈতিকতা ও আদর্শের কথা যারা বলেছে তাদের উদাহরণ থেকে কাণ্ডজ্ঞান ও সাধারণ যুক্তি দিয়েই এটা সহজে বুঝতে পারবেন।

কোনো সমাজে যদি কোনো একটা অনুচিত পেশা গড়ে ওঠে, তখন সেই সমাজের বিবেকবান লোকদের দায়িত্ব হচ্ছে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অন্য এক কমেন্টে বলেছি, অনুচিত পেশাটিকে বন্ধ করে দিলে সেই পেশায় নিয়োজিত লোকেরা কীভাবে খাবে, এই যুক্তি আমাদের সমাজে প্রচলিত অন্যান্য খারাপ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গও দিতে পারে। স্পেসিফিক উদাহরণ দিয়ে আমি কাউকে বিব্রত করতে চাচ্ছি না। সে ক্ষেত্রে আপনি কি বলবেন, এই পেশায় নিয়োজিত এত এত সংখ্যক ব্যক্তিবর্গের জীবিকার দিকে তাকিয়ে এটিকে চলতে দেয়া হোক?

নিশ্চয়ই আপনি সেটা বলবেন না। আমার সাথে যদি আপনি একমত হন তাহলে হয়তো বলবেন– আমাদের উচিত হলো সেই অনুচিত পেশায় নিয়োজিত লোকদেরকে ক্রমান্বয়ে উপযুক্ত পেশায় পুনর্বাসন করা। কিন্তু তার আগে আপনাকে, আমাকে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে একমত হতে হবে, সমাজের এই এই পেশাগুলো অনুচিত পেশা এবং এগুলোকে আমরা ক্রমান্বয়ে এভাবে বন্ধ কিংবা পুনর্বিন্যাস করবো।

মনে রাখতে হবে, কারো খারাপ আচরণ আমাকে খারাপ আচরণ করার বৈধতা দেয় না। তেমনি করে কোনো অনুচিত প্রফেশন আমাদের অপর একটি অনুচিত প্রফেশনের বৈধতা দেয় না।

ফরহাদ হাসান: মসজিদের বেতনের দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারে আপনার মতটুকু না হয় গ্রহণ করলাম। বেতনভুক্ত কেউ থাকবে না, যোগ্যতা অনুযায়ী আমরা ইমাম বানিয়ে নেবো। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা কী করব? সেখানেও কিন্তু পরোক্ষভাবে কোরআন বা কোরআনী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়। তাহলে মাদ্রাসার বেতন গ্রহণ করাও তো কোরআনের বিনিময় হবে।

তাছাড়া আরেকটা বিষয় আমি একটু পরিষ্কার হতে চাই। আমি যেটুকু জানি, কোনো একটা যুগের ফুকাহাগণ নামাজ এবং ইসলামী জ্ঞান শিক্ষার বিনিময় গ্রহণ করাকে বৈধতা দিয়েছিলেন। এই তথ্যের ব্যাপারে আমি আরেকটু স্পষ্ট হতে চাই।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কোরআনকে চিকিৎসার উপায় বানিয়ে আপনি মজুরী গ্রহণ করতে পারবেন। এমন উদাহরণ হাদীসে আছে। এক জনপদে একজনকে সাপে কেটেছিলো। তো, একজন সাহাবী তাদেরকে ওই লোকের চিকিৎসা করার জন্য চুক্তি করে কিছু কোরআনের আয়াত পড়ে ওই লোককে ঝাড়-ফুঁক করেন। এতে লোকটা আরোগ্য লাভ করে। সেই লোকের উপার্জনটা হালাল হবে কিনা, সেটা নিয়ে উক্ত অভিযানে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের মধ্যে মতবিরোধ হলো। তারা মদীনায় ফিরে ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে সোপর্দ করলে তিনি তা বৈধ বলে সিদ্ধান্ত দেন।

সে হিসাবে আমরা কোরআন শিক্ষাদানকে পেশা হিসাবে নেয়াকে গ্রহণ করতে পারি বটে। কিন্তু কোরআনের পথে লোকদেরকে আহবান জানানো, ইসলামের দাওয়াত দেয়া ও লোকদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার বিনিময়ে মজুরী গ্রহণ করলে এতদসংক্রান্ত ভুরি ভুরি কোরআনের আয়াত, রাসূল (সা), সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবেতাবেয়ীগণের আমল, ইসলামের মর্মবাণী ও নীতি-নৈতিকতার সার্জজনীন প্র্যাকটিস এবং আমাদের বিবেক-বুদ্ধির সাথ তা সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।

ফরহাদ হাসান: ধন্যবাদ।

Abidul Islam Chowdhury: দ্বিমত পোষণকারী বেশিরভাগ কমেন্ট পড়ে মনে হয়েছে, তাঁরা এই পোস্টের মূল থিমটা টাচ করতে ব্যর্থ হয়েছেন! এত সহজ বাংলা না বুঝার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, মানুষের বুদ্ধি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার স্বল্পতা দেখে আমি খুব অবাক হচ্ছি! এই ধরনের লেখাগুলোকেও তারা সস্তা রাজনৈতিক বক্তব্য মার্কা লেখা বলে মনে করে। কোনো বিষয়কেই তারা সিরিয়াসলি নিতে পারে না বা নেয় না। একটু দেখেই মনে করে, “ও তাই তো, বুঝেছি।” এরপর পক্ষ বিপক্ষ অবস্থান নিয়ে খিস্তিখেউড় বলতে থাকে।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

***

পর্ব-৫: ইসলামে কি কোনো রিলিজিয়াস হলি ডে আছে?

২০ মে, ২০১৯

আমাদের দেশে জুমার দিন সরকারী ছুটি। সপ্তাহে মানুষ সাধারণত ৫ দিন কাজ করে। ২ দিন ছুটি কাটায়। এই দুই দিন যে কোনো দুই দিনই হতে পারে। খ্রিষ্টান ধর্মমতে রোববার ও ইহুদী ধর্মমতে শনিবার হলো রিলিজিয়াস হলি ডে। তাই এই দিনে তারা ইবাদত করবে। কোনো বৈষয়িক কাজ করতে পারবে না। ইসলামে তেমন কোনো রিলিজিয়াস হলি ডে নাই। জুমুার দিনের বিশেষ মর্যাদা আছে। কিন্তু তা অপরাপর ধর্মের মতো রিলিজিয়াস হলি ডে নয়। কোরআনে বলা হয়েছে,

“হে মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন নামাযের আযান দেয়া হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণ পানে এগিয়ে যাও এবং বেচাকেনা বন্ধ করো। এটা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝো। এরপর নামাজ শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো। আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো। যাতে তোমরা সফল হতে পারো।” (সূরা জুমা: ৯-১০)

এই আয়াতের মর্মানুযায়ী জুমার দিন বরং পেশাগত দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাটাই এক অর্থে ধর্মীয় নির্দেশনা। এতো গেলো জুমার দিন কাজ করা যাবে কি যাবে না সে সম্পর্কে আলোচনা। এবার আসেন যারা জুমা ফরজ না হওয়া সত্ত্বেও জুমা পড়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে তাদের সম্পর্কে আমরা খানিকটা বলি।

দুনিয়ার অন্যতম সেরা দুর্নীতিগ্রস্ত এই মুসলিম মেজরিটি দেশে লোকেরা যখন দূরপাল্লার ভ্রমণে নিয়োজিত থাকে তখনও তারা জুমা পড়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। অথচ, দূরপাল্লার ভ্রমণকারীদের জন্য জুমা ফরজ নয়। এমনকি সাধারণ নামাজও তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। অজু করার ব্যবস্থা না থাকলে তায়াম্মুম করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। দাঁড়ানোর ব্যবস্থা না থাকলে বসে বসে নামাজ আদায় করার অনুমতি আছে। কিবলামুখী হওয়ার সুযোগ না থাকলে যে কোনো দিকে ফিরেই নামাজ আদায়ের অনুমতি আছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আল্লাহ চান তোমাদের জন্য সহজ করতে। তিনি চান না তোমাদের জন্য কঠিন করতে। রোজার বিধান উপলক্ষে বলা হলেও এটি ইসলামী শরীয়াহর অন্যতম মূলনীতি। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, তোমরা সহজ করো। কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও। ঘৃণা সৃষ্টি করো না। মা আয়িশা (রা.) বলেছেন, আল্লাহর রাসূল (সা.) সহজটাকে বাদ দিয়ে কঠিনটাকে গ্রহণ করেছেন, কখনো এমন হয় নাই।

আমাদের দেশের উগ্র ধর্মবাদীরা এসব শুনতে নারাজ। এখানকার ধর্মজীবী হুজুররা মানুষকে সহজতা দিতে নারাজ। ঢাকা-চট্টগ্রাম বাস রুটে কতবার দেখেছি, কমপক্ষে আধ ঘণ্টার জন্য বাস দাঁড় করিয়ে লোকেরা জুমার নামাজ পড়ছে। মসজিদের হুজুররা যাত্রী ভাইদের সু্বিধার জন্য কত কিছু করছেন। কখনো কোনো খতীবকে বলতে শুনলাম না, “যাত্রী ভাইগণ, আপনাদের ওপর জুমা ফরজ নয়। আপনারা দ্রুত দুই রাকাত ফরজ পড়ে বাসে ফিরে যান। সেখানে অনেক জরুরী প্রয়োজনের লোকেরা আটকা পড়ে আছেন।” বরং দেখা যায়, নানা ধরনের ধর্মীয় আবেগ সৃষ্টি করে তারা যাত্রী ভাইদের কাছ হতে চাঁদা তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

আমাদের দেশে রোজার দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হয়। রোজার কষ্ট লাঘবের জন্য। মানুষ তার সাধ্যমতো রোজা রাখবে। রোজার কষ্ট লাঘবের জন্য কাজকর্ম যথাসম্ভব কমিয়ে, সম্ভব হলে বন্ধ করে রাখতে হবে– এটি শরীয়তের কোন জায়াগায় আছে? না, ইসলামী শরীয়ার কোনো জায়গায় এমন ধর্মীয় ছুটির প্রস্তাবনা বা নির্দেশ নাই। অনেকেই জানে না, উগ্র ধর্মবাদী লোকদের রোষানলে পড়ার ভয়ে কেউ কেউ এসব জানলেও বলতে নারাজ। আমি বললাম। কারণ আমি স্বভাবতই স্বাধীনচেতা। কোনো প্রশংসা আমাকে বিভ্রান্ত করে না। অন্যায় কোনো সমালোচনায় আমি মুষড়ে পড়ি না। আমি জানি, অপ্রিয় সত্য কথা বলা হলো অন্যতম শ্রেষ্ঠ জেহাদ।

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

রাইসুল ইসলাম আমান: রোজার দিনে অধীনস্তের কষ্ট লাঘবের কথা বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে কষ্ট লাঘবের সর্বোচ্চ অবস্থা হলো ছুটি প্রদান।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তেমন কাহিল কাউকে নিয়োগকর্তা কর্তৃক রেহাই দেয়া বা কষ্ট লাঘব করে দেয়া তো খুবই ভালো। সেটি বড়জোর শারীরিক পরিশ্রমের জন্য হতে পারে। যেটা ধর্মবাদিতার জ্বরে আক্রান্ত আমাদের এই দেশে কাউকে করতে দেখি না। এ কারণে অধিকাংশ শ্রমিক রোজা রাখে না।

কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ থাকবে? আমাদের আর্লি টিচিং লাইফে দেখতাম, ঈদের সপ্তাহখানেক আগে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হতো। রোজার দিনে ক্লাস নিতে চমৎকার লাগতো। কোনো অসুবিধা হতো না। অথচ, ক্লাস করার তেমন কষ্ট নাই। বরং যিনি ক্লাস নেন অর্থাৎ যিনি শিক্ষক তার কষ্ট হয়।

তো, যেটা বললাম, তখন ডিপার্টমেন্টে গেলে বেশ ঝরঝরে মনে হতো। খাওয়া-দাওয়ার ঝামেলা নাই। একটানা কাজ করা যায়। অথচ, এখন রোজা শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ। এটি কি ঠিক হচ্ছে?

তাছাড়া জুমার দিনে তো আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, নামাজ শেষ। এখন কাজে লেগে যাও। অথচ, আমরা কী করছি? আমি বলছি না, শুক্রবার দিন ছুটি দেয়া যাবে না। বরং আমার বক্তব্য হলো, জুমার নামাজ পড়ার জন্যই শুক্রবার ছুটি দিতে হবে, এই পপুলার ধারণাটির কোনো শরয়ী ভিত্তি নাই।

রাইসুল ইসলাম আমান: সাপ্তাহিক ছুটি তো সব পেশার, সব দেশের মানুষেরই প্রাপ্য। সেই ছুটি শুক্রবার হলে ক্ষতি কি? শুক্রবার বাদে অন্য দিন ছুটি দিলে তা কি ইকোনমিক্যালি বেশি ইফেক্টিভ? এমন কোনো তথ্য উপাত্ত থাকলে জানাবেন প্লিজ।

আর রমজানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কোনো যুক্তি নাই। মানুষের দুই ঈদের ছুটিই ফ্যামিলি (বা আত্মীয়) মিটআপের জন্য যথেষ্ট।

কোনো মুসলিম দেশেই শুক্রবারকে শরয়ী ভিত্তিতে ছুটি দেওয়া হয় না।

আর জুম’আর নামাজের সময় আল্লাহ ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের হুকুম দিয়েছেন এটা সুস্পষ্ট। আর মানুষের প্রাপ্য কমপক্ষে একদিন সাপ্তাহিক ছুটি যদি এই একই দিনে পড়ে, তবে সেটা বেশি ইফেক্টিভ। কারণ, শুক্রবারে জুম’আর নামাজের জন্য ছুটি দিতে সবাই বাধ্য। আর উইকএন্ড যদি অন্য দিন হয়, তবে সেটাও তার প্রাপ্য।

তাই জুম’আর দিনের সাপ্তাহিক ছুটি অন্য দিনের সাপ্তাহিক ছুটি থেকে ইকোনমিক্যালি বেশি উত্তম।

Masudul Alam: শুধু মুসলিম দেশগুলোতেই কেন জুমার দিনে সাপ্তাহিক ছুটি থাকে? এর কারণ কী? হ্যাঁ, ‘শরয়ী ভিত্তিতে ছুটি দেয়া হয় না।’ কারণ, আসলেই এর কোনো শরয়ী ভিত্তি নেই। তবে মুসলমানদের ধর্মবাদী আবেগেরে ভিত্তিতে এই ছুটি দেয়া হয়।

যদিও এই আবেগ কোরআনের আয়াতের স্পিরিটের বিরোধী। “জুম’আর নামাজের সময় আল্লাহ ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের হুকুম দিয়েছেন” বলে আপনি সূরা জুমার ৯ নং আয়াতকে বুঝাতে চেয়েছেন বলে মনে হলো। অথচ এর ঠিক পরের আয়াতেই কিন্তু বলা হয়েছে, “অতঃপর যখন নামায সমাপ্ত হবে, তখন জমিনে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) সন্ধান করবে।”

জুমা সংক্রান্ত ছুটির বিষয়ে এই দুটি আয়াতকেই কিন্তু সামনে রাখতে হবে।

রাইসুল ইসলাম আমান: আমার কথা আপনার মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে মনে হয়। আমি তো জুম্মার দিনের দিনব্যাপী ছুটির শরয়ী ভিত্তি নিয়ে কোনো কথা বলিনি। আমি বলেছি জুম্মার দিনের ছুটি (উইকএন্ড) দেওয়াটা অর্থনৈতিকভাবে বেশি যুক্তিযুক্ত। কারণ, জুম্মার নামাজের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ঘণ্টাদুই বিরতি আপনাকে দিতেই হবে। আর উইকএন্ড যদি অন্য দিন হয়, তবে সেদিনও আপনাকে ছুটি দিতেই হবে। তাই জুম্মার দিনে সাপ্তাহিক ছুটি দিলে আপনার কমপক্ষে দুই ঘণ্টা বেশি কাজ করার সুযোগ থাকবে।

আর ওই আয়াতের পরবর্তী অংশের আমল করতে গেলে অর্থাৎ সাপ্তাহিক ছুটি অন্য দিন করলে এই দুই ঘণ্টা লস হবে।

Amimul Ehsan Zubayer: আপনি অনেক সুন্দর বলেছেন। এর সাথে আমি কিছু যোগ করতে চাই। শরীয়াহসম্মত কারণ থাকলে সপ্তাহের ৩৫ ওয়াক্ত নামাজের ৩৪ ওয়াক্ত মসজিদে না গিয়েও আদায় করা যেতে পারে। কিন্তু জুমার নামাজ মসজিদ ছাড়া আদায় করা সম্ভব নয়। এখন প্রশ্ন হলো, দেশের কত পার্সেন্ট স্কুল-কলেজে জুমার নামাজের ব্যবস্থা আছে? আশেপাশের মসজিদে যেতে বললে কতটা পরিবেশ ও একোমোডেশন পাওয়া যাবে?

ফলাফল: বেশিরভাগ টিচার, স্টুডেন্ট ও কর্মজীবী মানু্ষ জুম্মা আদায়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।

দ্বিতীয়ত, জুমাবার উইকেন্ড হবার কারণে ১০/১১ বছরের একটি শিশু যত সহজে বাবার সাথে মসজিদে যেতে পারে, সেদিন সে স্কুলে থাকলে আর বাবা কর্মস্থলে থাকলে শিশুটি তত সহজে মসজিদমুখী হতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক।

Aman Ullah Raihan: একটা বিষয় আলোচনার দাবি জানাই, অনেক দিন ধরে মাথায় ঘুরছে। সেটা হলো, ইসলামের নির্দিষ্ট কোনো প্রতীক বা চিহ্ন আছে কি না, যা ইসলামকে ম্যানশন করে? এই যেমন ইসলামের প্রতীক হিসেবে চাঁদ বা সবুজ রংয়ের ব্যবহার দেখা যায়। এগুলোর তাত্ত্বিক ভিত্তি কী? আসলেই আছে? নাকি মানুষের বানানো?

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই কমেন্ট লেখার সময় যতবার ইসলাম শব্দ লিখছি, ততবার আমার কীবোর্ডে চাঁদের চিহ্ন ভাসছে!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: চাঁদ-তারা ইসলামের প্রতীক হওয়ার বিষয়টি তাত্ত্বিক নয়, বরং ঐতিহাসিক। মক্কা থেকে ইয়াসরিবে হিজরত করার সময় রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা থেকে বের হয়ে ‘সওর’ নামক গুহায় তিন দিন লুকিয়ে ছিলেন। এরপর সেখান থেকে বের হয়ে তিনি যখন রওনা করেন তখন ছিল সন্ধ্যাবেলা। আকাশে ছিল নতুন চাঁদ। যার দূরবর্তী কোলে ছিল সন্ধ্যা তারা। পরবর্তীতে যখন হিজরী সাল গণনা শুরু হয় তখন সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করার জন্য চাঁদ-তারাকে ইসলামের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

Muhammad Nurullah Tarif: আল্লাহ্‌ বলছেন: “আল্লাহর স্মরণ পানে এগিয়ে যাও,” “বেচাকেনা বন্ধ কর।” আর আপনি বললেন: “এই আয়াতের মর্মানুযায়ী জুমার দিন বরং পেশাগত দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাটাই এক অর্থে ধর্মীয় নির্দেশনা।” এমন তত্ত্ব এ আয়াত থেকে আপনি কীভাবে উদ্ভাবন করতে পারেন। অন্তত “যদি জুমার নামায শেষে” এ শর্ত যুক্ত করে বলতেন, তবে আয়াতের এ অংশ “এরপর নামাজ শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো” থেকে দলিল নিতে পারতেন। আল্লাহুল মুস্তাআন।

Ibrahim Hasan: তিনি তো পরের অংশ থেকেই দলিল নিয়েছেন!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ধর্মীয় ছুটির দিন সংক্রান্ত বিষয়ে কয়েকটা কথা স্বতন্ত্র ও সুস্পষ্টভাবে সবাইকে বুঝে নিতে হবে:

১. সাপ্তাহিক ছুটি সাধারণভাবে থাকতেই পারে। বিশেষ করে চাকুরীজীবী-কর্মজীবীদের।

২. জুমার নামাজের জন্য জুমার দিন সাপ্তাহিক ছুটি দিতে হবে, এমন কোনো শরয়ী বাধ্যবাধকতা নাই। বরং, নামাজের আযান দেয়া হলে কাজকর্ম বন্ধ করা এবং নামাজ শেষে কাজকর্মে ফেরত যাবার কথাই কোরআনের সূরা জুমায় বলা হয়েছে।

৩. জুমার দিন সাপ্তাহিক ছুটি দেয়া যাবে না, এমন কোনো কথা কোরআন ও হাদীসে নাই।

৪. অন্যান্য সব ধর্মে সাপ্তাহিক ছুটি আছে। বিশেষ করে ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্মে। ইহুদী ধর্মমতে শনিবার ও খ্রিষ্টান ধর্মমতে রোববার হলো বিশ্রাম গ্রহণ ও ইবাদতের দিন। এই দিন কোনো বৈষয়িক কাজ করলে গুনাহ হবে। এমনকি শনিবার জলাধারে মাছ আটকিয়ে রেখে রোববার তা ধরার মতো চালবাজি করার কারণে ইহুদীদের একটা জনগোষ্ঠীকে বানরে পরিণত করে দেয়ার কথা বলা আছে। যদ্দুর জানি।

পোস্টে কথাগুলো বলা হয়েছে। এরপরও এখানে আবার ক্লিয়ার করে বললাম। আমার দুর্ভাগ্য, পাঠকদের একটা অংশ আমার লেখাগুলো ভালো করে না পড়েই মন্তব্য করে। আমারা মাস্টার মানুষ। কোনো কথাকে ক্লিয়ারলি একবার বলার পরে মনে করি, কথাটা তো বলা হলো। অতএব, সংশ্লিষ্ট লোকেরা সেটা বুঝবে। পরে দেখি, ব্যাপারটা তা নয়। একটা কথাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার করে বলতে হয়। যাতে করে সবাই সেটা বুঝে নিতে পারে। আমার জন্য বিরক্তিকর এই অভ্যাসটিই এখন রপ্ত করার চেষ্টা করছি।

Muhammad Nurullah Tarif: স্যার, আয়াত থেকে আপনি যে তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছেন সেটা যে আয়াতের মোতাবেক হয়নি সে সম্পর্কে কিছু বললেন না। আপনি আয়াত থেকে আরেকটি বিধান নির্ণয় করে বলেছেন: “পেশাগত দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাটাই এক অর্থে ধর্মীয় নির্দেশনা”। আপত্তির জায়গা হচ্ছে- “নির্দেশনা” শব্দে। কুরআন-হাদীস থেকে বিধান নির্ণয় তত্ত্ব বা উসুলুল ফিকহ সম্পর্কে যদি আপনার কিছু আইডিয়া থাকত তাহলে আপনি জানতেন যে, কুরআন-সুন্নাতে নিষেধের পরে যখন কোন নির্দেশ আসে তখন সে নির্দেশ আর নির্দেশের অর্থ দেয় না। বরং অনুমতি বা বৈধতার অর্থ দেয়। তাই তাফসিরকার ইবনে আশুর এ নির্দেশ সম্পর্কে লিখেছেন: والأمر في فانتشروا في الأرض وابتغوا من فضل الله للإباحة. (فانتشروا في الأرض وابتغوا من فضل الله নির্দেশটি বৈধতা জ্ঞাপক)[আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর (২৮/২২৭)] দুঃখিত স্যার, চুপ থাকতে পারলাম না। আপনার বিশেষায়নের সাবজেক্ট “দর্শন” নিয়ে আপনার সামনে কেউ ভুল তথ্য লিখলে বোধহয় আপনিও চুপ থাকতে পারবেন না।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনি যে নির্দেশ এবং নির্দেশনার পার্থক্যটা বুঝতে পারেন নাই, সেটা ভেবেই আমার অবাক লাগছে। প্রথমটা হলো অর্ডার। দ্বিতীয়টা হলো ডিরেক্টিভ। নির্দেশ শব্দটা ব্যবহার করার পরিবর্তে সচেতনভাবেই আমি নির্দেশনা শব্দটি ব্যবহার করেছি, যা অনুমোদন বা বৈধতা কিংবা প্রেফারেন্স অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।

নির্দেশ ও নির্দেশনার পার্থক্য বলতে আমি কী বুঝি সেটা জানার জন্য এ ধরনের বিষয়ে আমার এই লেখাটা পড়তে পারেন: নারী অধিকার প্রসঙ্গে শরীয়াহর নির্দেশ বনাম নির্দেশনা

Muhammad Nurullah Tarif: আমি অবাক হচ্ছি, একটা বাংলা শব্দের অর্থ যাচাইয়ের তথ্যসূত্র হিসেবে কোনো অভিধানকে উল্লেখ না করে আপনি আপনার অন্য একটি লেখাকে উল্লেখ করলেন কেন! বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে (পৃষ্ঠা- ৬৯৩) “নির্দেশনা” শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে: “নির্দেশকরণ”। যা প্রমাণ করে আপনি শব্দটি ভুল অর্থে ব্যবহার করেছেন, কিংবা নিজের মতো একটি পরিভাষা তৈরি করে নিয়েছেন, যা অন্যেরা মানতে বা বুঝতে বাধ্য নয়। তবে আপনি পূর্বোক্ত মন্তব্যে পরিস্কার করেছেন যে, শব্দটি দিয়ে “অনুমোদন বা বৈধতা কিংবা প্রেফারেন্স” বুঝাতে চেয়েছেন। সুতরাং এটা আশ্যব্যঞ্জক। তার মানে আপনি মনে করেন “জুমার নামাজ শেষ হলে জমিনে ছড়িয়ে পড়া এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করা” বৈধ কর্ম। তাই যদি হয় তাহলে একটি বৈধ কর্ম থেকে বিরতি নেয়া বা ছুটি কাটানোর বিষয়কে সমর্থন করায় আলেমদেরকে উগ্র ধর্মবাদিতা বা ধর্মজীবী ইত্যাদি অভিধা দিয়ে খাটো করা কতটুকু ইনসাফপূর্ণ! তাছাড়া সাধারণ মুসলমানদের অজ্ঞতার দায় (আপনি সফর অবস্থায় জুমার নামায আদায়ের আবেগের উদাহরণ দিয়েছেন) সাধারণভাবে সকল হুজুরদের (আলেমদের) উপর চাপানো কতটুকু ন্যায্যপূর্ণ!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: সাধারণ সাপ্তাহিক কর্মবিরতির অন্যতম একটি দিন হিসেবে শুক্রবার বিরতি নেয়া বা ছুটি কাটানোর বিষয়কে সমর্থন করা হলো এক জিনিস। আর যেহেতু আজকে জুমার দিন সেহেতু আজকে অবশ্যই ছুটি কাটাতে হবে, কাজকর্ম করা যাবে না, এই যে পাবলিকের মনমানসিকতা, সেটা ভিন্ন জিনিস। আমি ধর্মবাদিতা বলতে দ্বিতীয় বিষয়টাকেই বুঝিয়েছি। আমার এই লেখার সবটুকু ধর্মজীবীদের উদ্দেশ্যে লেখা বা বলা নয়। বরং মূল বিষয়টা হলো, উগ্র ধর্মবাদিতার বিরোধিতা করা। লেখার ধারাবাহিকতা থেকে সেটি বুঝে নেয়া সম্ভব। একটি লেখায় পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট টাইটেল দেওয়া তো সম্ভব হয় না।

বাংলা একাডেমি নির্দেশনা শব্দটির যে অর্থ দিয়েছে, সেটি শাব্দিক অর্থ। কেননা সেই ডিকশনারি শাব্দিক অর্থের উপরেই ফোকাস করে লেখা। কিন্তু নির্দেশনা শব্দটির পারিভাষিক অর্থ আমি যেটা বলেছি সেটাই। এ সংক্রান্ত নানাবিধ প্র্যাকটিক্যাল উদাহরণ থেকে আমরা এটা বুঝতে পারি।

Mohammad Ali: এ জাতি এমনিতে নাচনেওয়ালী, তারপর আবার ঢোলে বারি দিচ্ছেন স্যার! যারা আদর্শহীন আন্দোলনের কথা বলে, তাদের কাছ থেকে ধর্মের ফতোয়া আদর্শবাদীদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কারা আদর্শহীন আন্দোলনের কথা বলে? এবং তাদের কথা এখানে আসছে কেন? এখানে তো কোনো ‘ধর্মের ফতোয়া’ উত্থাপন করা হয়নি। যা বলা হয়েছে যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে এবং স্বপক্ষে রেফারেন্স দেয়া হয়েছে।

Shuaib Kazi: জুমার নামায ওয়াজিব হলেও এর এক বিশেষ তাৎপর্য আছে। আর সেটা হল খুতবা। বাসের যাত্রীরা জুমার নামায পড়া জরুরি মনে করলে বাস দাঁড়াতেই পারে।

আর সরকার মানবিক বিবেচনায় রামাদানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধেই তো আমার লেখা। হয়তো আপনি আমার লেখাটা ভালো করে পড়েননি, অথবা আমি কী বলতে চেয়েছি সেটা বুঝতে পারেননি।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

***

পর্ব-৬: মসজিদকে সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত করার অপরিহার্যতা

২১ মে, ২০১৯

সত্যিকারের ইসলামী সমাজ গড়ার জন্য মসজিদ পুনর্গঠনের গত্যন্তর নাই। এখনকার সময়ে বাংলাদেশের মসজিদগুলো হলো পুরুষদের এক্সক্লুসিভ ইবাদতগাহ। এখানে নারীদের প্রবেশাধিকার নাই। শিশুদের মসজিদে আসাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। অথচ, ইসলামী সমাজ হলো মসজিদভিত্তিক সমাজ। কেনাবেচা, হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রচার, পায়খানা-প্রস্রাব করা ও যৌনসম্পর্ক স্থাপন– এই চারটি কাজ ছাড়া ইবাদত তথা নামাজের কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে মসজিদে সব কাজই চলতে পারে বা চলা উচিত। এটাই সুন্নতের দাবি। তৎকালীন মসজিদে নববী এভাবেই পরিচালিত হতো।

মসজিদে নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে সিএসসিএস-এ আমরা বেশ কিছু কাজ করেছি। তাই এ নিয়ে এখানে আর বিস্তারিত আলোচনা করছি না। শুধু এটুক বলছি, মসজিদে নারীদের দেখলে পুরুষ মুসল্লীদের ‘পবিত্রতা নষ্ট’ হওয়ার আশংকায় নারীদের মসজিদে আসতে না দেয়ার ব্যাপারটা একটা ষণ্ডামিমার্কা কুযুক্তি। সরি টু সে দিস। বাট ইটস ট্রু।

হযরত উমর (রা.) নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করে দিয়েছেন মর্মে যে কথা বলা হয়, অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে, এটি সম্পূর্ণরূপে বানোয়াট তথ্য। তাই, তেমন সাহসী নারীদের সমর্থন ও সহযোগিতা পেলে এ নিয়ে একটা ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবো, ইনশাআল্লাহ।

মুসলিম মেজরিটি দেশগুলোর চেয়ে মুসলিম মাইনরিটি দেশগুলোতে মসজিদগুলো অধিকতর সংগঠিত। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে। সেখানে বিতর্ক হয়, মেয়েরা কেন মসজিদের মূল অংশে নামাজ পড়েতে পারবে না, মসজিদ কমিটিতে নারী সদস্য কম কেন ইত্যাদি নিয়ে। আর আমাদের এখানে এমনকি টয়লেটগুলো পর্যন্ত বন্ধ করে রাখা হয়। বিদেশে মন্দির-গীর্জাতে যে সুবিধাগুলো পাবলিককে দেয়া হয় সেগুলো অন্তত আমরা চালু করতে পারি।

এক সময় একটা ইসলামী সংগঠনের সাথে অন্তপ্রাণ হিসাবে সক্রিয় ছিলাম। তাদের এলাকাভিত্তিক সাংগঠনিক রিপোর্টে ‘সংগঠিত মসজিদ’ বলে একটা বিষয় ছিলো। আসলে তারা সংগঠিত মসজিদ বলতে বোঝাতো এমন মসজিদকে, যেখানে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চলতে পারে। আফসোস, বহু বছর সেই ইসলামী সংগঠনের একচেটিয়া প্রাধান্যে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা আদর্শ মসজিদ গড়ে উঠে নাই। তাদের কথায় যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো কিছু উঠতো আর বসতো, তখনও তারা একটা আদর্শমানের মসজিদ গড়ে তোলার কথা ভাবা এবং এ নিয়ে কর্মতৎপর হওয়ার মতো অবসর পায় নাই। তাদের সেই সোনালী দিনের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসাবে এই ব্যর্থতার দায় আমার নিজের ওপরও বর্তায়।

গত ২৬ বছর ধরে যে মসজিদে আমি নামাজ পড়ে আসছি সেই চবি দক্ষিণ ক্যাম্পাস মসজিদ যে কোনো হিসাবেই একটা গতানুগতিক মসজিদ। মসজিদের নিচের তলায় এসি লাগানো ও ফ্লোর টাইলস করা ছাড়া গত তিন দশকে এর কোনো অগ্রগতি নাই। আগে তারাবীর নামাজ পড়ানোর ‘হাদিয়া’ হিসাবে হুজুরদের দেয়ার জন্য চাঁদা তোলা হতো। এখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই একটা নির্দিষ্ট এমাউন্ট দিয়ে দেয়। এই উন্নতিটাকে (?) অবশ্য আপনি হিসাবে ধরতে পারেন।

এক একটা মসজিদকে এক একটা সোশ্যাল কমপ্লেক্স বা কমিউনিটি সেন্টার হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। তাতে থাকবে সমৃদ্ধ গণপাঠাগার, নিডিদেরকে দেয়ার জন্য উদ্বৃত্ত জিনিস রাখার ব্যবস্থা, থাকতে হবে সীমিত আকারের চিকিৎসা সুবিধা, ফ্রিতে খাওয়ার ব্যবস্থা, ব্যায়াম ও খেলাধুলা করার ব্যবস্থা। তেমন একটি আদর্শ মসজিদের থাকবে সুপ্রশস্ত চত্বর ও দৃষ্টিনন্দন বাগান। থাকতে হবে গণশিক্ষা, শিশুশিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সুরক্ষাসহ নানাবিধ সামাজিক সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা। মসজিদ কমপ্লেক্স হবে মুসাফিরদের উপযুক্ত আশ্রয়স্থল। একটি জনপদে মসজিদ কম্পাউন্ডকে হতে হবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পাবলিক প্লেইস।

এমন মসজিদ বাংলাদেশে একটাও আছে কি? এমন মসজিদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা কি সম্ভব? এমন মসজিদ গড়ে তোলার গরজ কি এখানকার ধর্মবাদী জনগোষ্ঠী কখনো ফিল করেছে? এমনকি আমি এই যে কথাগুলো বলছি, এটাকে কি সবাই এপ্রিশিয়েট করবে? জানি, এই প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াশীলতা দ্বারা আমরা এমনভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি যে গঠনমূলক ও ইতিবাচক চিন্তা করার এবং এ ধরনের কথা কেউ বললে তাকে এপ্রিশিয়েট করার মতো মন-মানসিকতা আমাদের নাই।

তাই, সমস্যা আমাদের সামর্থ্যের নয়। সমস্যা আমাদের চিন্তাগত স্বচ্ছতা ও চরিত্রগত ঋজুতার। জীবনবোধশূন্য ধর্মবাদিতা, আচারসর্বস্ব আদর্শবাদিতা, কৃত্রিম বিনয় ও বাঙালীসুলভ অন্তর্গত কপটতা হলো আমাদের প্রধান সমস্যা। হীনমন্য এই জাতিকে কর্মতৎপর ও আত্মবিশ্বাসী হিসাবে জাগিয়ে তুলতে হলে জনতুষ্টির ভুল পন্থাকে পরিহার করতে হবে। হক কথাগুলোকে সোজাসাপ্টাভাবে বার বার বলতে হবে। নিজের পরিমণ্ডলে যতটুকু যা করা সম্ভব তা করে দেখাতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সমস্যা যে ঠিক কোন জায়গায় তা স্বীকার করতে হবে।

সোজা কথা হলো, মসজিদের ইমামতি আর সমাজের নেতৃত্বকে এক পয়েন্টে আনা, অন্ততপক্ষে প্যারালাল পজিশনে আনা সম্ভব না হলে ইসলামের চিরন্তন মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজপতিদের অধিনস্ত বেতনভূক আলেমসমাজের চুক্তিভিত্তিক ওয়াজ-নসীহত দিয়ে সমাজে টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা ও সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো অসম্ভব। কথাগুলো খুবই তিক্ত। কিন্তু নিরেট সত্য। আমরা যদি সমস্যাটি সম্পর্কে একমত হই এবং তা সমাধানের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই, তাহলে নানাবিধ প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে আমরা তা সমাধানও করতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Mohammad Tawrat Taniz: মসজিদে নারীদের প্রবেশ করতে দেয় না– কথাটি ঠিক; কিন্তু অনেক এলাকায় নারীদের জন্য আলাদা স্থান করে দেওয়া হয়।

আজ থেকে কয়েক বছর আগে এক জনের কাছ থেকে জানতে চাইলে তিনি বলেন– “নারীরা অধিকাংশ সময় অপবিত্র থাকেন বলে তাদের মসজিদে এসে নামাজ না পড়ায় শ্রেয়!”

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: নারীদের মধ্যে যার নামাজ নাই, সে এমনিতেই আসবে না। সেটি তো কেউ কাউকে বলে দিতে হবে না। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই আমরা বুঝতে পারি।

Mohammad Tawrat Taniz: হাদীস শরিফে আমি নিজেও পড়েছি– “হযরত উমর (রা.) কঠোর হস্তে নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করেছেন।”

আর তাছাড়া মেয়েদের জামাতে নামাজ পড়ার কোনো বিধান তো নেই। তারা আলাদা নামাজ পড়বে

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হাদীস গ্রন্থের নাম কী? কোন চ্যাপ্টারে? হাদীস নম্বর কত? সেটি কি সিহাহ সিত্তাহর কোনো গ্রন্থ? বা, অনুরূপ মর্যাদার কোনো সহীহ হাদীসের কিতাব? নাকি, এমনিতে কেউ কোনো একটা সংকলন বের করে লিখে দিয়েছে?

Mohammad Tawrat Taniz: অবশ্যই আমি সেটা সংগ্রহ করে জানাবো।

Masudul Alam: হযরত ওমর (রা) নারীদেরকে নিষেধ করেছেন মর্মে কোনো হাদীস নেই। তবে তিনি চেয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী আতিকা (রা) যেন মসজিদে না আসেন। অন্যদের নিকট ওমরের (রা) এ মনোভাবের কথা শুনে আতিকা (রা) বিষয়টিকে পাত্তা দেননি। তিনি মসজিদে যাতায়াত অব্যাহত রাখেন। তারপর ওমরও (রা) আর কিছু বলেছেন বলে জানা যায় না। আপনাকে একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য দেই। যেদিন ফজরের নামাজের সময় ওমর (রা) ছুরিকাঘাতপ্রাপ্ত হন, সেই ওয়াক্তে অন্যান্য মহিলাদের সাথে তাঁর স্ত্রী আতিকাও (রা) মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। ফলে তিনি তাৎক্ষনিকভাবে ওমরের শুশ্রুষায় নিয়োজিত হতে পেরেছিলেন।

‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’ থেকে নারীদের মসজিদে প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত ড. জাসের আওদার লিখিত একটি বইয়ের ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ পাবলিশ করা হচ্ছে। এই লিংকে গেলে এ পর্যন্ত প্রকাশিত সবগুলো পর্ব পেয়ে যাবেন– রিক্লেইমিং দ্যা মস্ক। পড়ে দেখার অনুরোধ করছি।

Al Maruf Mohammad: Where did you get this information? How come these fatwas don’t apply to Masjid-E-Nawawi or Haram or Al-Aksa?

Ali Reza Raju: মনে হচ্ছে, আমার মনের কথাগুলোই যেনো তুলে ধরলেন। ঠিক এই বিষয়টা নিয়ে আমিও ভাবি। নারীদের ক্ষেত্রে এই সমাজে জড়তা বা হীনমন্যতার কোনো শেষ নেই। এর পরিবর্তনের প্রথম উপায়ই হলো নারীদের মসজিদের দিকে ভিড়ানো।

Umme Salma: আমি সেই নারীদের (সাহসী কিনা তা আপেক্ষিক ব্যাপার) একজন যে মসজিদে নারীদের ডিগনিফাইড স্পেস চাই। অস্ট্রেলিয়া আমি পছন্দ করি। কারণ, এখানে এসে আমার স্বপ্নপূরণ হয়েছে। আমি এখানে মসজিদকেন্দ্রিক মুসলিম কমিউনিটি পেয়েছি, যেখানে জুমা হতে তারাবী এবং ঈদের নামাজ যখন সুযোগ পাই তখনই পড়তে পারি। এই ব্যবস্থা বাংলাদেশের নারীদের চিরাচরিত স্থান (কী ঈদে, আর কী রমজানে) স্টেরিওটাইপিক্যাল জীবন হতে একটু নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ দিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।

Kamrul Hasan Maruf: ভাই, আপনি বিষয়টিকে যতটা অভিযোগ ও সমালোচক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন তা পরবর্তী লিখাগুলোতে না করার জন্য অনুরোধ করছি। যথাযথ হলে কে কী বললো, এটা নিয়ে এত চিন্তিত হওয়ার কিছু নাই। মহিলাদের মসজিদে জায়গা করে দেয়ার জন্য এখুনি আন্দোলনের প্রয়োজন নাই। আগে অন্য কাজগুলো করতে হবে। ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মহিলাদের মসজিদে জায়গা করে দেয়ার জন্য এখনই আন্দোলন করার মতো সুযোগ ও সামর্থ্য আমার নাই। প্রথমত, বিষয়টা নিয়ে আরো কনসেপ্ট ক্লারিফিকেশনের দরকার আছে। দ্বিতীয়ত, যাদের জন্য সবকিছু, সেই নারীদের একাংশ যদি আমার সাথে না থাকে তাহলে তো পুরোটাই গুড়ে বালি। যদি সামর্থ্য থাকতো তাহলে লেখালেখি না করে সেটি বাস্তবায়ন করার জন্যই অগ্রসর হতাম।

কেননা, আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, তোমরা কোনো অন্যায় কাজ দেখলে সেটাকে হাতে বাঁধা দাও। না পারলে মুখে প্রতিবাদ করো। সেটাও না পারলে অন্তরে সেটাকে ঘৃণা করো। বলতে পারেন, এ বিষয়ে এখন আমি দ্বিতীয় পর্যায়ে আছি।

Sheikh Abdullah AL Nokee: মসজিদে হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা যাবে না কেন?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমি জানি না। কিন্তু আমি এই মর্মে হাদীস পড়েছি। যেখানে বলা হয়েছে, মসজিদে যদি কেউ কোনো কিছু হারানোর কথা বলে তাহলে সে যেন কিয়ামত পর্যন্ত সেটা আর খুঁজে না পায়। যদ্দুর মনে পড়ে এটি ছিল সেই হাদীসের মর্ম। আমরা শরীয়তের বিষয়গুলোকে এই ভিত্তিতে মেনে চলি যে এটি আমাদের বলা হয়েছে। যুক্তি হচ্ছে সূত্র বা রেফারেন্সের অনুগামী।

এটাতে কোনো সমস্যা নাই। এ ধরনের হারানো বিজ্ঞপ্তি মসজিদের দরজার বাহিরে বা প্যাসেজে দেওয়া যেতে পারে।

Al Maruf: In the West we bring our children to the Mosque so that they can play and socialise and get attached to the Mosque from the beginning. Women usually have a separate section always as long as the Mosque committee is not full of old Bangladeshi generation – they are very sad.

Ashique Rahman: ফ্লোরিডার যে মসজিদটাতে আমি অধিকাংশ সময় নামাজ পড়ি, সেটি অত্র এলাকার সবচেয়ে বড় মসজিদ। অন্য অনেক কিছুর সাথে এই মসজিদটাতে আছে একটা ফ্রি ক্লিনিক; যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকলকে চিকিৎসা দেয়া হয়। একটা ফুড প্যান্ট্রি আছে, যেখান থেকে ফ্রি খাবার বিতরণ করা হয় (No question asked)। বাচ্চাদের জন্য একটা পার্ক আছে, আছে বাস্কেটবল, ফুটবল, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন রকম খেলাধুলার ব্যবস্থা। আমার ৬ বছর বয়সী ছেলেটা মসজিদে যাওয়ার জন্য প্রায় সময়ই জেদ ধরে মূলত পার্কে খেলার জন্য। বাড়তি পাওনা হলো– নামাজের সময় নামাজ পড়ে। মোজাম্মেল ভাই, আপনি সম্ভবত এই রকম মসজিদের কথাই বলতে চাচ্ছেন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমার ছাত্রজীবনের এক রুমমেট এখন স্থায়ীভাবে সিঙ্গাপুরে থাকে। তিনি আমাকে বলেছেন, ফুটবল বিশ্বকাপ চলার সময় মসজিদ চত্বরে প্রজেক্টর লাগিয়ে খেলা দেখানো হয়। আমি এটা নিয়ে প্রশ্ন করায় উনি বললেন, আমরা যদি বাচ্চাদের এখানে খেলা দেখার ব্যবস্থা না করি তাহলে তারা অন্যদের সাথে বসে বিয়ার খেতে খেতে খেলা দেখবে। এখানে খেলা দেখার ব্যবস্থা করার কারণে তারা বরং নামাজের সময় এসে নামাজ পড়ছে।

বাংলাদেশে আমরা যারা ইসলাম চর্চা করি, ইসলামী সমাজভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা করছি, তারা বড় বড় অনেক বিষয় নিয়ে দৌঁড়ঝাপ করছি বটে, কিন্তু সমাজের ভিত্তি হতে পারে যে বিষয়গুলো সেগুলোর মধ্যকার সমস্যা বা ফাটল নিয়ে আমরা ততটা কনসার্ন ফিল করি না। আমাদের সেই কনসার্ন ফিল করার জায়গাগুলো দেখিয়ে দেওয়ার জন্য এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে এতটা খোলামেলা কথাবার্তা বলে পাবলিক পোস্ট দেয়া।

Ashique Rahman: মোজাম্মেল ভাই, যে মসজিদটার কথা বলছি সেখানে আমাদের একটা ইয়ুথ গ্রুপ আছে, প্রায় ১০০ জনের মতো। আমরা তাদের জন্য বড় প্রজেক্টরে খেলা দেখার ব্যবস্থা করি মসজিদের অডিটোরিয়ামে। সাথে ব্যাপক খাওয়া-দাওয়া। শুধু বিজ্ঞাপন বিরতির সময় আমরা আমাদের পছন্দমতো জিনিস দেখাই। যাতে বাজে এবং আপত্তিকর বিজ্ঞাপন এবং লেডি গাগার মতো শিল্পীদের অর্ধ-নগ্ন নৃত্য দেখতে না হয়। কিছুদিন আগে তাদেরকে সমুদ্র সৈকতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল– প্রথম দৃষ্টির পরের সবকিছুই যে শয়তানের কার্যক্রম তা শেখানো। আমরা নিয়ে যাই আর না নিয়ে যাই, তারা কিন্তু সমুদ্র সৈকতে যাবেই। তাহলে এ ব্যাপারে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা বুঝানোই শ্রেয়। এই ছেলেরা অধিকাংশই তারাবীর নামাজ পড়ে না বা ৮ রাকাত পড়ে হুক্কা লাউঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দেয়। তাই এশার নামাজের পর থেকেই মসজিদের মাঠে ফুটবল, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলার ব্যবস্থা আছে। খেলার মাঝখানে মাঠের মধ্যেই ১০ মিনিটের ইসলামিক আলোচনা, খেলার বিরতিতে। তারা সংগঠিতভাবে সামাজিক কার্যক্রম করে। যেমন, একদিন অনেক ইফতারি উদ্বৃত্ত হলো, তারা দল বেঁধে এগুলো হোমলেসদের মধ্যে বিতরণ করে দিলো। পুরোদমে না হলেও বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে এ জাতীয় কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।

Shafiul Alam: নিউ ইয়র্কের প্রায় সব মসজিদেই মহিলাদের নামাজের ব্যবস্থা আছে। বিয়েশাদিসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানও মসজিদ এলাকায় সম্পন্ন হয়।

Kamrulhasan Rashed: এ তো অতি সফিস্টিকেটেড বাস্তবতা। তবে নির্মম সত্য হলো, পবিত্রতা যেখানে ঈমানের অঙ্গ, সেখানে মসজিদের টয়লেট ব্যবস্থাপনা কতটুকু পরিচ্ছন্ন আর আমজনতার জন্য ব্যবহার্য? মসজিদকে মানুষের প্রশান্তির স্থল বানানোর এ সুযোগটাও বকধার্মিকদের খপ্পরে।

Morshedul Hoque: ঢাকার অভিজাত এলাকার কিছু মসজিদে মেয়েদের নামাজের ব্যবস্থা আছে। আমি মিরপুর ডিওএইচএসে থাকি, সেখানে মেয়েদের নামাজের আলাদা জায়গা আছে।

Sabuj Kabir: হজরত উমর (রা) নারীদের মসজিদে যাওয়া নিষেধ করেছিলেন– কথাটি এ দেশে এত জনপ্রিয় যে এটার সত্যতা যাচাই করার চেষ্টাকেও অপরাধ গণ্য করা হয়! মসজিদ পরের কথা, নারীদের ঈদের নামাজে যাওয়ার কথা লিখে ফেসবুকে যে অশালীন মন্তব্যর মুখোমুখি হয়েছি, তাতেই বোঝা যায় ধর্মের নামে আমাদের পুরুষবাদী চিন্তাধারা।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

***

শেষ কথা

২২ মে, ২০১৯

কোনো ভালো কাজের কথা যখনই বলা হয়, তখন লোকেরা এমন ভাব ধরে, যেন সে এটি করার জন্য জানপ্রাণ। কিছু কুচক্রী খারাপ লোকের জন্য কিংবা নিজের সীমাহীন অসুবিধার জন্য সে এটি করতে পারছে না। অথবা, আপনার এত এত যুক্তি ও দলীলকে বেমালুম হজম করে তিনি বলে উঠবেন, ‘হ্যাঁ,আমরা তো তা-ই করছি।’ আপনাকে লম্বাচওড়া অনেক কাগুজে পরিকল্পনার কথা বলবে। বলবে, ‘আমাদের নলেজে আছে। আমরা চিন্তা করছি। সময় হলে দায়িত্বশীলদের কাছ হতে জানতে পারবেন।’

সেজন্য আমি ধর্মবাদী নির্লজ্জ হিপোক্রেটদের চেয়ে ধর্মকর্ম না করা বা কিছুটা কম করা; কিন্তু নিষ্ঠাবান, সাহসী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির লোকদেরকে প্রেফার করি। এই লেখাটাও সে ধরনের লোকদেরকে খুঁজে পাওয়া ও তাদের কাছাকাছি যাওয়ার প্রয়াস। দুনিয়া পরিবর্তন করার জন্য কিছু নিষ্ঠাবান, সৎ, সত্যবাদী, অকপট, সাহসী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন লোক দরকার। তারা দ্বীনদার হলে ভালো। না হলেও চলে। কিন্তু উগ্র ও মেকি ধর্মবাদী লোকদের বিপুল সমষ্টি নিয়ে আপনি অর্থবহ কিছু করতে পারবেন না। এরা ফলস আবেগ নিয়ে চলে। তারা যুক্তির পরোয়া করে না।

তাদের ব্যাপারে তা-ই করতে হবে, যে কোনো অন্যায়কে মোকাবিলা করার জন্য আল্লাহর রাসূল (সা) যা বলেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখলে তোমরা হাত দ্বারা সেটাকে বাধা দাও। না পারলে মুখে প্রতিবাদ করো। তাও না পারলে অন্তরে সেটাকে ঘৃণা করো। এই হাদীসের বক্তব্যকে আমরা এভাবে বুঝতে পারি, কোনো কাজ অন্যায় ও অনুচিত হলে সর্বাগ্রে তা অনুধাবন করতে হবে। এরপর সে ব্যাপারে বলাবলি করে জনমত গড়ে তুলতে হবে। অবশেষে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সেটা বন্ধ করে দিতে হবে।

আপনার আমার আশেপাশে ধর্মবিদ্বেষীদের সব অপকর্ম ও ধর্মবাদীদের সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে আসুন আমরা সমাজ পরিবর্তনের এই সুসংগত নিয়মানুসারে প্রতিবাদী হয়ে উঠি। আসুন, বিপ্লবী হই। তাতে বিপ্লব না হোক, অন্তত নৈতিক দায় থেকে বাঁচতে পারবো, আশা করি। ভালো থাকুন। আপনার ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগলে ক্ষমা করুন। কাউকে আঘাত না করে হক প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তালোগোলে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না।

ন্যায় প্রতিষ্ঠার সুসংগত পদ্ধতিতে আসুন আমরা যার যার জায়গা হতে কর্মতৎপর হই। অন্তত নিজের আওতাধীন ক্ষেত্রে সত্য ও ন্যায়কে সমুন্নত করি। মানবিক হই। আলোকিত করি নিজের আশপাশের সমাজকে। এভাবে একদিন পুরো সমাজ আলোকিত হবে। নিজের জন্য যথাসম্ভব সর্বোচ্চ মান, কিন্তু অন্যের জন্য অনুমোদন করি ন্যূনতম মানকে। এভাবেই গড়ে উঠতে পারে একটা ইনক্লসিভ উদার মানবিক সমাজ।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

Leave a Reply