রোহিঙ্গা শরনার্থী ইস্যুতে বিকেন্দ্রীকৃত সামাজিক উদ্যোগ-নীতির সফল বাস্তবায়ন

সাধারণ মানুষ এখনো যথেষ্ট মানবিক, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এই ইস্যুতে তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। বরাবরই আমি একজন আশাবাদী মানুষ। জীবন সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে, সমাজ সম্পর্কে সব সময়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভংগী পোষণ করেছি। অন্তত অধিকাংশ আদর্শবাদী, সমকালীন মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে যতটা নেতিবাচক দৃষ্টিভংগী পোষণ করে, আমি বরাবরই মনে করেছি, মানুষ ও সমাজ আসলে ততটা খারাপ নয়। মানুষ ও সমাজের মূল গঠনটা প্রকৃতই ভাল। যা আরো ভাল হওয়া সম্ভব, উচিত, বরং জরুরী। মানুষকে আরো ভাল করার জন্য মানুষের অলরেডি ভাল গুণকে অকপটে স্বীকার করতে হবে। আদর্শবাদী হিসাবে যারা নিজেদের দাবি করে তারা মানুষ সম্পর্কে সাধারণত নেতিবাচক দৃষ্টিভংগী পোষণ করে। সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে তারা সচরাচর ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী। আমি এর বিপরীত।

সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের সম্পর্কে আমার এ ধরনের পজিটিভ মেন্টলিটি নিয়ে মাঝে মাঝে অবুঝ লোকদের কাছ হতে অযাচিত কথা শুনতে হয়। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণকারীরা কতোটা ভুলের মধ্যে আছে। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই সময়ে দেখতে পাচ্ছি, সারা দেশে বিশেষ করে চট্টগ্রামে সাধারণ জনগণের মাঝে মানবতার জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে তাদের পাশে আজ সর্বশ্রেণীর মানুষ কোমর বেঁধে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বার্থ চিন্তা এখন গৌণ হয়ে পড়েছে।

সামাজিক আন্দোলনের কাজ হবে বিকেন্দ্রীকৃত – এই কথারই স্বতঃস্ফূর্ত বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। সামাজিক সহায়তার এই ধারা অব্যাহত থাকবে। এবং ক্রমান্বয়ে তা সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিসহ অপরপর সেক্টরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে। শাহবাগ ঠেকানোর জন্য অবিশ্বাস্যভাবে গড়ে উঠা শাপলা চত্বরের মতো করে দেশের সাধারণ ইসলামপ্রিয় জনগণ এই মানবিক উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এটি অভূতপূর্ব। এর আগে ইসলামপন্থীরা কোনো জাতীয় ইস্যুতে এভাবে প্রাকটিকালি এগিয়ে আসে নাই। আমার ধারণায় আগামী এক দশকের মধ্যে বামপন্থার সাথে ইসলামপন্থার একটা সুষম ভারসাম্য এ’ দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে।

শরণার্থী হিসাবে আগত এই জনগোষ্ঠীকে মিল কারখানায় কর্মে নিয়োজিত করলে বোঝা হয়ে উঠার পরিবর্তে এরা প্রোডাক্টিভ ম্যানপাওয়ার-এ পরিণত হবে। বর্তমান সরকারের ইমেজ বিল্ডআপ ও সেইফ একজিটের দিক থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

যারা উৎপাদন সম্পর্ক তথা অর্থনীতিকে মানব সভ্যতার ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও বিবর্তনের মূল ফ্যাক্টর মনে করে তাদের চোখে আংগুল দিয়ে এই ইস্যু দেখিয়ে দিলো, জাতিচেতনা বা বিদ্বেষও হতে পারে ইতিহাসের অন‍্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী বেসিক ফ্যাক্টর। জাতীয়তাবাদের অপপ্রয়োগ বা ম্যালপ্রাকটিস হলো জাতিবিদ্বেষ বা জাত‍্যাভিমান। প্রথমটি ইতিবাচক অর্থে অপরিহার্য। দ্বিতীয়টা পরিত্যাজ্য। আদর্শের নামে যারা জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে তাদের বুঝা উচিত, যথাসম্ভব জাতিবিদ্বেষমুক্ত জাতীয় চেতনা, যুগপৎ জাগতিক ও নৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী জাতি গঠনই হতে পারে এ ধরনের জাতিগত বিদ্বেষ ও হানাহানিকে মোকাবিলার একমাত্র উপায়। জাতীয় পরিচয় ব‍্যতিরেকে মানব সমাজ গড়ে উঠা ও এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

মানুষ কেন যুদ্ধ করে, তা এক বিষ্ময়কর ব্যাপার। যুদ্ধের ভয়াবহতার দিক থেকে দেখলে মনে হয়, যুদ্ধ ও হানাহানিমুক্ত পৃথিবীই আমাদের কাম্য হওয়া উচিত। অথচ, দুনিয়ার কোনো সভ্যতাই যুদ্ধ ছাড়া গড়ে উঠেনি। যুদ্ধ যেন মানবতার জন্য এক ‘প্রয়োজনীয় ক্ষতি’ বা necessary evil। The Iron Triangle নামে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ওপর একটা সিনেমা দেখেছিলাম। তাতে দেখানো হয়েছে, উভয় পক্ষেই মানবিক চরিত্রের সৈনিক ও অফিসার থাকে। অমানবিক চরিত্রের লোকজনও উভয় শিবিরে থাকে। মানবতা আর যুদ্ধ, পরষ্পর বিপরীত সম্পর্কযুক্ত দু’টি বিষয়। এ দুইয়ের মধ্যে আছে এক অদৃশ্য বন্ধন আর ভেদরেখা।

আমি যুদ্ধের পক্ষে। একই সাথে মানবতারও পক্ষে। চাই, সব যুদ্ধ হোক মানবিক যুদ্ধ, মানবিক সহায়তার যুদ্ধ বা মানবতা প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ। সংক্ষেপে যাকে বলে ন্যায় যুদ্ধ। অসহায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও মানুষকে রক্ষার জন্য মানবিক সহায়তা ও প্রতিরোধ, উভয়ই জরুরী। প্রথমটা মূলত জনগণের পক্ষ থেকে করণীয়। দ্বিতীয়টা এক্সক্লুসিভলি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পার্শ্ববর্তী আরাকান রাজ্যের মানবিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশের মানুষ নিজে থেকেই কীভাবে যেন বুঝে নিয়েছে তাদের করণীয়। কোনো ফতোয়া, সাংগঠনিক নির্দেশ বা সামষ্টিক উদ্যোগ-আয়োজনের অপেক্ষা না করে তারা যে যেভাবে সম্ভব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে দেখছি মানবিক সহমর্মিতা ও সহায়তার এক অন্য রকম উৎসব।

দুঃখবোধ হচ্ছে এ দেশের তত্ত্ব কপচানো বামপন্থীদের জন্য । ব্যর্থ শাহবাগ মুভমেন্টের বছর কয়েকের মধ্যেই রোহিঙ্গা শরনার্থী ইস্যুতে তাদের দ্বিতীয় নৈতিক পরাজয় ঘটলো। তারা মানুষের পক্ষে, কিন্তু মুসলমানদের বিপক্ষে। ইসলাম ছাড়া সব কিছুতেই তাদের সম্মতি বা কম এলার্জি। ইসলাম ঠেকাতে পুজিবাদী কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদীদের এ দেশীয় এজেন্ট সাজতে তাদের আপত্তি নাই। সীমান্তবর্তী দক্ষিণ চট্টগ্রামে তারা শুধু ‘কাপড়ের পুটলি’ই দেখছে। অসহায় নারীরা তাদের দৃষ্টির যেন অপর। ‘স্বকিয়া’কামী, সুবিধাবাদী, অভিজাত ও তলে তলে পুজিবাদী সাম্যবাদী নারীবাদ যে এত তাড়াতাড়ি এভাবে এক্সপোজড হয়ে পড়বে, ভাবি নাই।

ফেইসবুকে ‘বাহবা বাহবা বেশ, চালিয়ে যান’ বলে কীবোর্ড চাপড়ানোর শর্টকাট পথ বাদ দিয়ে বনে জঙ্গলে, রাস্তার ধারে, কাদা মাটিতে একাকার হয়ে যারা ত্রাণ কাজে নিয়োজিত, তাদের জন্য দেশের মানুষ দোয়া করছে প্রাণ ভরে। আপমর জনসাধারণের মধ্যে মানবিক অনভূতির এই জাগরণ দেখে খুব ভালো লাগছে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম হতে পারে বাংলাদেশে সহমর্মিতার মডেল। বাংগালীর কোমল হৃদয় আজ জেগে উঠেছে। দল-মত ভেদাভেদের উর্দ্ধে উঠে সর্বস্তরের মানুষ আজ বিপন্ন অসহায় মানুষের মানবিক পরিচয়কেই বড় করে দেখছে, এর চেয়ে সুখের কথা আর কী হতে পারে?

রোহিঙ্গা শরনার্থীদের পুশব্যাক করার চেষ্টা, জংগী দমনে যৌথ অভিযানের প্রস্তাব ইত্যাদি ছিল এই ইস্যুতে সরকারের ভুল পদক্ষেপ। ক্ষমতাপন্থী মধ্যবাম নীতির অনুসারী আওয়ামী লীগ সরকারের কাঁধে সওয়ার হওয়া জনবিচ্ছিন্ন বামপন্থীদের প্ররোচনা এর পিছনে দায়ী। চায়নাকে হাতে না রেখে একতরফা ভারতমুখী বিদেশনীতির কুফল হলো আজকের এই রোহিঙ্গা ইস্যু।

প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্রের দূষণ হতে সুন্দরবন বাঁচাতে বামপন্থীরা লংমার্চ করেছে। আন্দোলন করেছে। বিষয়টা অতীব ভালো। ইসলামপন্থীদের দুর্ভাগ্য ও হীনমন্যতা, তারা সেই আন্দোলনে শরীক হতে পারে নাই। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন যেন ততটা ইসলামিক না…! দেখা যায়, সত্যিকারভাবে আর্তপিড়ীত ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে বামপন্থীরা কেন জানি সব সময়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ার পরে সেখানে এত পাঞ্জাবী-টুপি পড়া উদ্ধারকর্মী কেন, সেটি ছিলো তাদের হর্তাকর্তাদের প্রশ্ন। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও দেখতে পাচ্ছি, তারা ট্রেন মিস করে ফেলছেন। আফসোস …!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

“রোহিঙ্গা শরনার্থী ইস্যুতে বিকেন্দ্রীকৃত সামাজিক উদ্যোগ-নীতির সফল বাস্তবায়ন” শীষক র্পোস্টে একটি মন্তব্য

  1. আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ…….
    “বিকেন্দ্রীকৃত সামাজিক উদ্যোগ-নীতির সফল বাস্তবায়ন” – এ সত্যটি নিয়েই ভাবছিলাম ক’দিন ধরে!
    আমরা প্রবাসে থেকেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিভিন্নভাবে যতটুকু করা হয়েছে বা হচ্ছে তা-ও যেন আপনা থেকেই ঐ নীতির বাস্তবায়নের অংশ হয়ে যাচ্ছে! নতুন ও বাস্তব ময়দানে অনুশীলন করে পূরো জাতি এক বিশাল অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অর্জন করছে!

    এ অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং একে আরো সুসংহত করতে এখন আমি প্রয়োজন বোধ করছি এ বিষয়ে এক বা একাধিক সেমিনার আয়োজন করা! আর সে গুরুদায়িত্ব আপনাদেরই!

    দোয়া করি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *