সাংগঠনিক সংস্কার নিয়ে আমার কনস্টিটিউয়েনসি থিওরি ও প্রাসঙ্গিক কিছু পুরনো কথা

ইসলামী আন্দোলন হিসাবে জামায়াতের সংস্কার দরকার, এই কথাটাকে যারা খুব সিরিয়াস বিষয় বলে মনে করে খুব সম্ভবত তারা জামায়াতকে ইসলামী আন্দোলনের সোল অথরিটি বা একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি বলে মনে করে। উনাদের ধারণায়, জামায়াত ছাড়া অপরাপর সংগঠনগুলো এই কাজের জন্য অনুপযুক্ত। এহেন ধ্যান-ধারণা একদিক থেকে সঠিক। অন্যদিক থেকে এটি ভুল চিন্তা। জামায়াত ছাড়া বর্তমান সময়ে ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব পালনের মতো যোগ্য কোনো উদ্যোগ বা সংগঠিত শক্তি নাই। ইসলাম যে ধর্মের অতিরিক্ত একটা কিছু, সেটা জামায়াতই অবিরতভাবে বলে আসছে। এখন তো ‘Islam is a complete code of life’ কথাটা এমনকি ইসলামবিরোধীরাও ফ্রিকোয়েন্টলি বলে। অভিয়াসলি এটি জামায়াতের ক্রেডিট। এভাবে দেখলে আপনি দেখবেন, এমন বহু রেটরিক জামায়াতের লোকেরা ইসলামী জনপরিমণ্ডলে পপুলার কনসেপ্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই, এখনকার সময়ে ইসলাম নিয়ে টেকসই ও উপযোগী কিছু করতে হলে জামায়াত ছাড়া গত্যন্তর নাই। এমনকি যারা জামায়াতের সমালোচনা করছে এমন ইসলামী সংগঠন ও দলগুলোও জামায়াতকে কথা, কাজ ও স্টাইলের দিক থেকে ফলো করছে স্টেপ বাই স্টেপ। এ হলো আলোচনার একটা দিক।

আলোচনার অন্যদিক বা মুদ্রার অপর পিঠ হলো, জামায়াত চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অকার্যকর পদ্ধতিতে। ময়দানে এর কার্যক্রম অনেক দিক থেকে প্রত্যাশার বেশ নিচে। এর নেতৃবৃন্দের দূরদর্শিতার অভাব নির্মমভাবে প্রমাণিত। অতএব, জামায়াতের সংস্কার দরকার। এবং জামায়াতের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে পারলে গুণগত দিক থেকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এই দলটাকে দিয়ে শেষ পর্যন্ত কিছু একটা করা যাবে, এ কথাটা সঠিক। সংক্ষেপে এই হচ্ছে, জামায়াত-সংস্কার যাদের প্রধান এজেন্ডা তাদের মানসিক অবস্থা বা আইডিয়া। যদ্দুর আমি বুঝেছি। ব্যাপারটা যদি এমন সাদামাটা হতো তাহলে আমিও জামায়াতের মধ্যে একজন সংস্কারবাদী হিসাবে থেকে যেতাম।

যে কারণে আমি জামায়াত ত্যাগ করেছি, যে কারণে জামায়াত সংস্কারের দাবির পিছনে যারা পড়ে আছেন তাদের অবস্থানটা ভুল বলে মনে করি তা নিয়ে অতি সংক্ষেপে এখানে কিছু কথা বলবো।

জামায়াতে ইসলামী একটা সংগঠন। এর লিটারেচার অনুসারে, যা পড়ে আমার বয়সের লোকেরা তাদের তরুণ বয়সে সেই সংগঠনে যোগ দিয়ে জীবনবাজি রেখে কাজ করেছে, সেটার দাবি ছিলো, এটি একটা পরিপূর্ণ ইসলামী আন্দোলন। রাজনীতি এর একটা অপরিহার্য পরিণতি। এবং এই অর্থে এটি একটা দূরবর্তী কর্মসূচি বা অনেকগুলো কাজের একটা দিক। বিশেষ করে দাওয়াতী কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক কর্মসূচির তুলনায় এটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, এমন নয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হল এটি সত্য, সময়ের ব্যবধানে এই সংগঠনটি এখন আপদমস্তক একটা রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। যদিও তাদের লিটারেচার আগের মতোই আছে। অতএব, যারা রাজনীতিকে সামগ্রিক কর্মসূচির অংশমাত্র জেনে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলো, তারা যদি আন্দোলনের সামগ্রিকতাকেই এখনো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তাহলে কেন তারা ইসলামের নামে পরিচালিত একটা রাজনৈতিক দলের সাথে থাকবেন? বিশেষ করে সেটা যখন পাওয়ার পলিটিক্স করে এমন একটা সেন্টার-রাইট সেক‍্যুলার দলের বি-টিম বা লেজুড় সংগঠনে পরিণত হয়েছে?

এবার দ্বিতীয় পয়েন্টে আসেন। জামায়াতে ইসলামীর রেফারেন্স অব অথরিটি হলো ইসলাম তথা ইসলামী শরীয়াহ। কোরআন, হাদীস, সীরাত ও ফেকাহ। এইগুলো কোনো দল করা না করা নিয়ে কী বলে? যখন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সা) এবং সাহাবা আজমাইন কর্তৃক ইসলামী নেজাম পরিচালিত হতো, অর্থাৎ যখন খেলাফত ব্যবস্থা কায়েম ছিলো, তখন সেই বিশেষ রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সংগঠনের বাইরে কারো মুসলমান থাকার সুযোগ ছিলো না। কারণ, হক্বপন্থী সংগঠনব্যবস্থা হিসাবে খেলাফত সিস্টেম তখন ছিলো স্বাভাবিকভাবেই এককেন্দ্রিক বা ইনক্লুসিভ। এ ধরনের আল-জামায়াত বা একমাত্র হক্বপন্থী সংগঠন এখন আর নাই। বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা যে যার মতো করে আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। সহীহ নিয়ত থাকা সাপেক্ষে প্রত্যেক ধরনের কর্মপ্রচেষ্টাই ভালো। অথচ, জামায়াতের নেতারা নিজেদের কর্মীদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেন যাতে করে তারা মনে করে, অন্তত বাংলাদেশে জামায়াত করা হলো ঈমানের দাবি। তারা মনে করে, নিরঙ্কুশ আনুগত্য লাভের উপযুক্ত শরয়ী মর্যাদার যে আল-জামায়াত, এ দেশে জামায়াতই হচ্ছে এর একমাত্র প্রতিনিধি। এভাবে তারা ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠির একাংশকে ইনডক্ট্রিনেট করে জোম্বি হিসাবে গড়ে তুলেছে।

উলিল আমর তথা আনুগত্য সম্পর্কে তাদের কনসেপ্ট বা ধারণাটা ভুল। কোরআন-হাদীস এটি সমর্থন করে না। তাবলীগের মুরুব্বীরা যেমন জিহাদের আয়াতগুলোর ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ করে, জামায়াতের লোকেরাও তেমন করে সংগঠন ও জিহাদ সম্পর্কিত নস বা রেফারেন্সগুলোর ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ করে।

এ বিষয়ে তৃতীয় পয়েন্ট হলো, বর্তমান সময়ে ইসলামী আন্দোলনের কাজ হবে ভিন্নতর প্যাটার্নে। একেক ব্যক্তি একেক সেক্টরে কাজ করবে। ইসলামের সামগ্রিকতা থাকবে প্রত্যেকের আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে। ঐক্য হবে চেতনা ও ময়দানভিত্তিক ইস্যুতে। জামায়াতের লোকেরা মনে করে, জামায়াত যা করে তা-ই হলো একামতে দ্বীন বা দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার সহী কাজ। আর বাদবাকি মাদ্রাসা, খানকা, ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যা যা করে তা নিছক খেদমতে দ্বীন বা দ্বীন ইসলাম চর্চার সহায়তামূলক কাজ। এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর একটা আইডিয়া। টোটালি ফলস। ইসলামের সামগ্রিকতার একটা ভুল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের কারণে তারা এই ফলস ডাইকোটমি বা অনুচিত ভাগাভাগিটা করে। সম্ভবত সামগ্রিকতার কথা মাথায় রেখে তারা তাদের দলীয় কর্মসূচিতে দাওয়াত, সংগঠন, প্রশিক্ষণ, সমাজসেবা ও রাজনীতিকে যথাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সমস্যা হলো, মতাদর্শগত সামগ্রিকতার কথা যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে তাদের দলীয় কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক ও সামরিক কার্যক্রম নাই কেন? ইসলামের দিক থেকে দেখলে, এগুলো অপরিহার্য। এগুলোকে বাদ দিয়ে তো ইসলাম বা সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনা অসম্ভব।

আমরা জানি, মানবিকতা হলো একক বা অখণ্ড ধারণা। কিন্তু বাস্তব মানবসমাজ হলো বৈচিত্র্যপূর্ণ বা প্লুরালিস্টিক। তাই, তাত্ত্বিকভাবে ইসলাম এক হলেও, ইসলামী আন্দোলনের কাজ হতে হবে কনসেপ্টচুয়ালি ইনক্লুসিভ বাট প্র্যাকটিকেলি প্লুরালিস্টিক। ইসলামের ভাবাবেগমুক্ত অধ্যয়নে আমি এমনটাই পেয়েছি। সামাজিক কোনো কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বা সে ধরনের কোনো কাজের উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে সবার অধিকার সমান। কিন্তু আইন প্রয়োগের অধিকার শুধুমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষের। বলাবাহুল্য, কর্তৃত্ব ও কর্তৃপক্ষ মানেই ক্রমসোপানমূলক এককেন্দ্রিকতার (centralized hierarchy) ব‍্যাপার। এই অতি সাধারণ তাত্ত্বিক কথাগুলো জামায়াতের সংগঠনবাদী লোকেরা মানতে চায় না বা বুঝতে পারে না।

তাদের এই ধরনের ভুল বুঝার কারণ হলো, কোরআন-হাদীসের রেফারেন্সগুলোকে ক্ষেত্রবিশেষে তারা খণ্ডিতভাবে ও প্রেক্ষাপটবিযুক্ত করে বুঝার চেষ্টা করে। আপনারা জানেন, ইসলামী আন্দোলন হিসাবে ইসলাম আর ধর্ম হিসাবে ইসলাম, ইসলামের এই দুই ধরনের বুঝ-জ্ঞানের পার্থক্য হলো– প্রথম ধরনের আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে ইসলামকে দেখা হয় মহানবী মোহাম্মদের (সা) জীবনের ধারাবাহিকতার আলোকে। তাই সেখানে মক্কী যুগ, মাদানী যুগ, কোরআনের ক্ষেত্রে শানে নুযুল, হাদীসের ক্ষেত্রে শানুল ওয়ারুদ, এগুলোর বিবেচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক কথায়, ইসলামকে সীরাতে রাসূলুল্লাহর (সা) ধারাবাহিকতা অনুসারে বুঝা ও মানার আইডিয়াটা হলো ইসলামকে ইসলামী আন্দোলন হিসাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। এর বিপরীতে, পুরো ইসলামকে একসাথে মানার চেষ্টা হলো ধর্ম হিসাবে ইসলামের আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ইসলামের সবকিছুকে যেহেতু একসাথে আমল করা সম্ভব হয় না, সেহেতু ধর্মপ্রাণ লোকেরা ইসলামী শরীয়তের যতটুকু সম্ভব মেনে চলে; বাদবাকি যা কিছু অনাচরিত রয়ে যায় সেগুলোর জন্য তারা আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে খালাসবোধ করে। অথবা, বিদ‍্যমান পারিপার্শ্বিকতা তথা সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত নয়, ইসলামের এমন আমলগুলোকে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অগ্রাহ্য করে ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসাবে আত্মতুষ্ট ও সুখী জীবনযাপন করে।

জামায়াত যদি ইসলামী আন্দোলনের ধারণাকে প্রায়োরিটি দিতো তাহলে তারা সব ধরনের কাজকে একসাথে করে একটা একক সংগঠন কায়েম রাখার এই অবাস্তব কর্মপদ্ধতিকে বহু আগেই বাদ দিতো। ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে একটি মাত্র সংগঠনে একীভূত করে কাজ করার চেষ্টা করতে গিয়ে রাজনীতির মতো সদাজরুরী বিষয়টি তাদের কাছে ক্রমাগতভাবে প্রায়োরিটি পেয়ে এসেছে। এভাবে এক পর্যায়ে জামায়াত ধর্মীয় ও সামাজিক কিছু দিকসম্পন্ন মূলত একটা রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়েছে।

২.

সার্বিক বাস্তবতার আলোকে জামায়াতের এখন যা করা দরকার তা হলো তিউনিশিয়ার আন-নাহদা মুভমেন্টের মতো নিছক রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হওয়া। অথবা, অরাজনৈতিক ধর্মীয় বা সামাজিক সংগঠনে পরিণত হওয়া। কিন্তু জামায়াত এর কোনোটাই করতে পারবে না। কেন পারবে না, তা বলার জন্য এই লেখা। এতক্ষণ যা বললাম তা মূল কথার ভূমিকা বা প্রেক্ষাপট।

প্রত্যেকটা সংগঠন গড়ে উঠে ও পরিচালিত হয় তার প্রতিষ্ঠাকালীন ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে। চাইলেই কোনো সংগঠন এর বাইরে যেতে পারে না। সময়ের ব্যবধানে জগতের সবকিছুর মতো সংগঠন মাত্রেরই কিছু পরিবর্তন ঘটে। উপরে যেমন বললাম, ইসলামী আন্দোলন হিসাবে শুরু করে জামায়াত এখন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। বাহ্যত এই পরিবর্তনটা যত বড়ই হোক, যে ধ্যানধারণা ও মনমানসিকতা তথা প্যারাডাইমের ভিত্তিতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এখনো মোটাদাগে এটি এর মধ্যেই আছে। উপরে বলেছি, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী রাজনীতি তো এক কথা নয়। কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে, “আপনিই বলেছেন, জামায়াত ইসলামী আন্দোলন হতে ইসলামী রাজনৈতিক দলে বিবর্তিত হয়েছে। এবার বলেন, আপনার কথার কনসিসটেন্সি কোথায়?”

এর উত্তর নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আসলে ইসলামী আন্দোলনের যে রেটরিক নিয়ে জামায়াত শুরু করেছিলো তা-ই ছিলো ত্রুটিপূর্ণ বা ফল্টি। ইতোমধ্যে তা নিয়ে আমি কথা বলেছি। ক্লারিফিকেশনের জন্য দ্বিরুক্তি করছি: (১) আধ্যাত্মিকতা, অর্থনীতি ও জিহাদকে কথিত ‘দ্বীনের সামগ্রিকতা’ বা অখণ্ডতা হতে শুরুতেই বাদ দেয়া। (২) দাওয়াতী কার্যক্রমের মতো দীর্ঘমেয়াদী ও সামাজিক কার্যক্রমের মতো মধ্যমেয়াদী কাজের সাথে রাজনীতির মতো জরুরী বিষয়কে মিশিয়ে ফেলা। যেসব ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক সংগঠন জিহাদের মতো জরুরী বিষয়কে অন্যতম কর্মসূচি হিসাবে গ্রহণ করেছে, অবশেষে তারা সবকিছুর ওপর সশস্ত্র কার্যক্রমকেই প্রায়োরিটি দিতে বাধ্য হয়েছে। ‘জিহাদী’ হিসাবে তারা পরিচিতি পেয়েছে। যেভাবে করে, জামায়াতে ইসলামী এখন মূলত একটা পলিটিকাল পার্টি হিসেবে পরিচিত হয়েছে।

আপনি যদি ছোট গাছের বিচি, ঝোপ জাতীয় গাছের বিচি, মাঝারি উচ্চতার যেসব গাছ সেগুলোর বিচি আর বড় গাছের বিচি একসাথে পাশাপাশি বপন করেন, সময়ের ব্যবধানে দেখবেন পরিমাণগত দিক থেকে বড় ও উঁচু গাছটাই ঠিক মতো গড়ে উঠেছে। বাকিগুলো একপর্যায়ে মরে গেছে বা কোনোমতে বেঁচে আছে। পার্শ্ববর্তী বড় গাছের ছায়ার কারণে সেগুলোতে তেমন কোনো ডালপালা-ফুল-ফল বের হচ্ছে না। এই উদাহরণের মাধ্যমে কী বুঝাতে চাইছি তা আশা করি এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন।

মেওয়াত অঞ্চলের অজ্ঞ লোকদের জন্য মাওলানা ইলিয়াস (রহ) যে ছয় উসূলভিত্তিক দ্বীনের কাজ শুরু করেছিলেন তা আজ বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় ইসলামী সংগঠন হিসাবে প্রসার লাভ করেছে। অথচ, এখনো পর্যন্ত তা সেই ছয় উসূলেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থায় নির্বাচনী এলাকা বা কনস্টিটিউয়েনসি যেমন অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; সংগঠনের ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, এর প্রসার, বিকাশ, বিবর্তন, পরিবর্তন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন যে বেসিক ধ্যানধারণা বা কাইন্ড অব কনস্টিটিউয়েনসি, তা অতি গুরুত্বপূর্ণ ডিটারমাইনিং ফ্যাক্টর। সেচ ব্যবস্থা যতই ভালো হোক, মাটি যতই উর্বর হোক, সূর্যের আলো যতই অবারিত হোক, ঘাস ঘাসই হবে। ঝোপ ঝোপই হবে। বৃক্ষ বৃক্ষই হবে। আপনি পথের ডান দিক থেকে সরে বামদিকে বা মাঝখানে আসতে পারেন। অথবা, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে বিকল্প পথও ধরতে পারেন। কিন্তু গিভেন অপশনের বাইরে, পূর্ব নির্ধারিত বাউন্ডারির বাইরে আপনি যেতে পারবেন না। যেমন করে আমরা কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেমকে ডেভলপ করতে পারি যতদূর পর্যন্ত তা হার্ডওয়্যার কর্তৃক সাপোর্টেড থাকে। যা পটেনশিয়ালিটির মধ্যে আছে, ইতিবাচক-নেতিবাচক নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে আপনি বাস্তবে রূপায়ন বা একচুয়েলাইজ করতে পারবেন। কিন্তু যা সুপ্ত-সম্ভাবনা হিসাবেও নাই, তাকে আপনি কখনো জাগ্রত বা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না।

৩.

তাই, জামায়াতের সংস্কারের জন্য যারা কাজ করছেন, তারা ভুলের মধ্যে আছেন। জামায়াত কখনো তাবলীগ হবে না। তাবলীগ কখনো জামায়াত হবে না। আবার তাবলীগ মার্কা জামায়াত বা জামায়াতের মতো তাবলীগ কিংবা এতদুভয়ের সব ভালো গুণগুলোকে নিয়ে যারা একটা নতুন কিছুর স্বপ্ন দেখছেন, তারা ভুল করছেন। এ ধরনের চিন্তা স্পষ্টত সিনসিয়ার মিসটেক। অবাস্তব আশাবাদ।

না, একটামাত্র সংগঠন দিয়ে এখন আর চলবে না। বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করার মতো একেক দোকান থেকে যাচাই বাছাই করে আপনার সামর্থ্য ও প্রাপ্যতা অনুসারে সওদা করবেন। চেইন স্টোরের কথা যদি ভাবেন তবে আপনাকে পাশাপাশি অনেকগুলো big bazaar বা চেইন স্টোরের কথা ভাবতে হবে। বিজ্ঞজনের জন্য এই ইংগিতই যথেষ্ট।

জামায়াতের মধ্যে বরাবরই দুইটা ধারা ছিলো। এখনো আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। মাওলানা মওদূদী বনাম মাওলানা ইসলাহী। মাওলানা আবদুর রহীম বনাম অধ্যাপক গোলাম আযম। একটা ধারা বুদ্ধিবৃত্তিক ও ময়দানমুখী। আরেকটা ধারা ধর্মবাদী ও গোঁড়াপন্থী। রক্ষণশীল এই ধারার নেতৃবৃন্দ খুব একটা গণমুখী নন। মীর কাশেম আলী, কামারুজ্জামান, মাওলানা সাঈদী ও ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক সাহেবরা প্রগতিশীল ধারার লোক। বর্তমানে অনলাইনে সক্রিয় শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান মন্জু এই সংস্কারবাদী ধারার অনুসারী। কারা কারা রক্ষণশীল ও সংগঠনবাদী ধারার লোক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল লোকেরা জামায়াত-শিবিরের সংগঠনে খুব কমই নেতৃত্বে উঠে আসতে বা টিকে থাকতে পেরেছে। আরেকটা গুরুতর বিষয় এখানে আছে। তা হলো নানা ধরনের বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা। জায়েজকরনের ফর্মুলাকে কাজে লাগিয়ে কায়দা-কানুন করে জামায়াত নিজেদের নেতৃবৃন্দকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার জোগান দেয়। সুবিধাভোগী হওয়ার কারণে সংস্কারবাদী নেতারা হকের পতাকা নিয়ে স্বীয় কমফোর্ট জোন হতে আল্টিমেটলি বের হতে পারে না। এরসাথে রয়েছে ‘আল-জামায়াতের’ ধারণাপ্রসূত নিরঙ্কুশ আনুগত্যের অব্যর্থ মাসয়ালা ও পরকালে নিশ্চিত নাজাত লাভের লোভ। এই নাজাতের ব্যবসাকে জামায়াতে ইসলামী রীতিমতো ইনস্টিটিউশনালাইড করে ফেলেছে। যে কোনো সংস্কারবাদী বিরূপ আলোচনাকে টুঁটি চেপে ধরে হত্যা করার তথা গিলোটিন করার অব্যর্থ উপায় হলো আখেরাতে নাজাত লাভের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাটুকু নষ্ট হওয়ার ভয় দেখানো।

কেন্দ্রীয় বা জেলা পর্যায়ের নেতা না হলেও জামায়াতের পরিচিত লোকদের মধ্যে আমিই প্রথম প্রকাশ্যে বলাবলি শুরু করেছিলাম, জামায়াতের মধ্যে প্রত্যাশিত মানের সংস্কার, তারেক রমাদানের ভাষায় ‘ট্রান্সফরমেটিভ রিফর্ম’ বলতে যা বুঝায়, তা আদৌ হয়ে উঠবে না। ২০১০ সালে সোনার বাংলাদেশ ব্লগে এ নিয়ে আমি অনেক লেখালেখি করেছি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের দিকে আমি সর্বতোভাবে জামায়াত ত্যাগ করি। একসময় যা ছিল দুঃস্বপ্নেরও অতীত তা এখন আমার জীবনের নিরেট বাস্তবতা।

জামায়াতকে দিয়ে যে এ যুগে ইসলামী আন্দোলনের হক আদায় করে কাজ করা সম্ভব নয় তা আমি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট ও ব্যক্তিগত রিয়েলাইজেশনের কারণে ২০০১ সালে আমি ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’ [Centre for Social & Cultural Studies (CSCS)] গঠন করেছি। পরবর্তী এক যুগ আমি সক্রিয়ভাবে জামায়াতের কাজের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ধারায় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। বর্তমানে যা আমার মূল মতাদর্শগত পরিচয়। একমাত্র আইডেন্টিটি।

জামায়াত ত্যাগ করার পর থেকে আমার জীবনটা সবদিক অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ, সুন্দর ও কর্মমুখর হয়েছে। তারমানে এই নয়, জামায়াত করে এতদিন আমি ভুল করেছি। যারা এখন এই সংগঠনটি করছেন, তারা ভুল করছেন, এটিও আমার বক্তব্য নয়। বরং, যারা জামায়াতকে দিয়ে সমাজ পরিবর্তন, রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনা এবং সভ্যতা নির্মাণ সম্ভব বলে মনে করেন তাদেরকে আমি ভ্রান্ত মনে করি। জামায়াতের সাথে আমার ছন্দপতন ও মতদ্বৈততার কারণ খানিকটা পথ ও পদ্ধতির। অনেকখানি গতি ও ব্যাপকতার।

একটা কথা না বললেই নয়, আমার শিবিরের জীবনটা ছিলো খুব সুন্দর। আমি সব সময় এই নিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি। ১৯৮৬ সালে কর্মী হিসেবে শুরু করে ১৯৯২ সালে সদস্য হিসাবে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবির হতে বিদায় গ্রহণ করি। এই সময়টি ছিলো শিবিরের ইতিহাসে খুব সম্ভবত গোল্ডেন পিরিয়ড। এরমধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো সবচেয়ে উর্বর ময়দান। এখানে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার কারণে আমি সব ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করার বিরল সৌভাগ্য লাভ করেছি। ১৯৯৩ সালের পর থেকে পরবর্তী ২০ বছর সংগঠন পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার কারণে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতে ইসলামীর যে ইতিহাস, তার অনস্বীকার্য অংশে পরিণত হয়েছি। এরপরেও কেন এই বিচ্ছেদ, তা নিয়ে আমার লেখাগুলোর একটা সংকলন বের করেছি “জামায়াতে ইসলামী: অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন” শিরোনামে। বইটার শুরুতে লিখেছি,

“অগাধ আস্থার মেঘ কেটে গেলে / দেখি, শিক্ষক আর শিক্ষা মুখোমুখি / অপারগ আমি / শিক্ষাকেই নিয়েছি বেছে / দুঃখিত, পারলে ক্ষমা করো / ভালো থাকো / আমার পুরনো সুহৃদ, সাথী ও বন্ধুরা…!”

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমরা অন্যায়কে হাত দিয়ে বাধা দাও। না পারলে মুখে প্রতিবাদ করো। তাও না পারলে মনে মনে সক্রিয় থাকো। আমাদের আজকের আলোচনার প্রসঙ্গ নিরিখে, নৈতিকতার এই সুন্নাহসম্মত সিরিয়ালিটিকে সামনে রাখলে অনায়াসে বুঝতে পারবেন, যারা সংগঠন ত্যাগ করে, সব অপবাদ ও ঝুঁকিকে অগ্রাহ্য করে সুন্দর একটা আগামীর পথ রচনা করার জন্য, সফল হোক বা না হোক – দায়িত্ব মনে করে একটা কিছু করার জন্য আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টারত তারা প্রথম শ্রেণীভুক্ত। সংগঠনের সাথে থেকে যারা হক কথা বলছেন, প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি তুলছেন, জনমত গঠন করছেন তারা ন্যায় ও সত্যের পক্ষে থাকার দিক থেকে দ্বিতীয় ক্যাটাগরি বিলং করছেন। যারা কোথাও যাওয়ার, মুখ খোলার কিংবা তেমন কিছু একটা করার মতো মনোবল, সাহস ও ক্ষমতা রাখেন না, কিন্তু দায়িত্বশীলদের স্বার্থপরতা, অদূরদর্শিতা ও হঠকারিতা নিয়ে অসন্তুষ্ট; যারা সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কর্মসূচি এবং বাস্তব কার্যক্রম এর মধ্যে যে বিরাট অসঙ্গতি তা অনুধাবন করেন এবং সংগঠনের যুগোপযোগী সংস্কার হোক, মনেপ্রাণে এটা চান, তারা তৃতীয় ক‍্যটাগরির অন্তর্ভুক্ত। এর বাইরে যারা আছে তারা ফর নাথিং। তাদের নিয়ে বলার মতো পজিটিভ কিছু খুঁজে পাচ্ছি না।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *