সাংগঠনিক সংস্কার নিয়ে আমার কনস্টিটিউয়েনসি থিওরি ও প্রাসঙ্গিক কিছু পুরনো কথা

ইসলামী আন্দোলন হিসাবে জামায়াতের সংস্কার দরকার, এই কথাটাকে যারা খুব সিরিয়াস বিষয় বলে মনে করে খুব সম্ভবত তারা জামায়াতকে ইসলামী আন্দোলনের সোল অথরিটি বা একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি বলে মনে করে। উনাদের ধারণায়, জামায়াত ছাড়া অপরাপর সংগঠনগুলো এই কাজের জন্য অনুপযুক্ত। এহেন ধ্যান-ধারণা একদিক থেকে সঠিক। অন্যদিক থেকে এটি ভুল চিন্তা। জামায়াত ছাড়া বর্তমান সময়ে ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব পালনের মতো যোগ্য কোনো উদ্যোগ বা সংগঠিত শক্তি নাই। ইসলাম যে ধর্মের অতিরিক্ত একটা কিছু, সেটা জামায়াতই অবিরতভাবে বলে আসছে। এখন তো ‘Islam is a complete code of life’ কথাটা এমনকি ইসলামবিরোধীরাও ফ্রিকোয়েন্টলি বলে। অভিয়াসলি এটি জামায়াতের ক্রেডিট। এভাবে দেখলে আপনি দেখবেন, এমন বহু রেটরিক জামায়াতের লোকেরা ইসলামী জনপরিমণ্ডলে পপুলার কনসেপ্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই, এখনকার সময়ে ইসলাম নিয়ে টেকসই ও উপযোগী কিছু করতে হলে জামায়াত ছাড়া গত্যন্তর নাই। এমনকি যারা জামায়াতের সমালোচনা করছে এমন ইসলামী সংগঠন ও দলগুলোও জামায়াতকে কথা, কাজ ও স্টাইলের দিক থেকে ফলো করছে স্টেপ বাই স্টেপ। এ হলো আলোচনার একটা দিক।

আলোচনার অন্যদিক বা মুদ্রার অপর পিঠ হলো, জামায়াত চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অকার্যকর পদ্ধতিতে। ময়দানে এর কার্যক্রম অনেক দিক থেকে প্রত্যাশার বেশ নিচে। এর নেতৃবৃন্দের দূরদর্শিতার অভাব নির্মমভাবে প্রমাণিত। অতএব, জামায়াতের সংস্কার দরকার। এবং জামায়াতের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে পারলে গুণগত দিক থেকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এই দলটাকে দিয়ে শেষ পর্যন্ত কিছু একটা করা যাবে, এ কথাটা সঠিক। সংক্ষেপে এই হচ্ছে, জামায়াত-সংস্কার যাদের প্রধান এজেন্ডা তাদের মানসিক অবস্থা বা আইডিয়া। যদ্দুর আমি বুঝেছি। ব্যাপারটা যদি এমন সাদামাটা হতো তাহলে আমিও জামায়াতের মধ্যে একজন সংস্কারবাদী হিসাবে থেকে যেতাম।

যে কারণে আমি জামায়াত ত্যাগ করেছি, যে কারণে জামায়াত সংস্কারের দাবির পিছনে যারা পড়ে আছেন তাদের অবস্থানটা ভুল বলে মনে করি তা নিয়ে অতি সংক্ষেপে এখানে কিছু কথা বলবো।

জামায়াতে ইসলামী একটা সংগঠন। এর লিটারেচার অনুসারে, যা পড়ে আমার বয়সের লোকেরা তাদের তরুণ বয়সে সেই সংগঠনে যোগ দিয়ে জীবনবাজি রেখে কাজ করেছে, সেটার দাবি ছিলো, এটি একটা পরিপূর্ণ ইসলামী আন্দোলন। রাজনীতি এর একটা অপরিহার্য পরিণতি। এবং এই অর্থে এটি একটা দূরবর্তী কর্মসূচি বা অনেকগুলো কাজের একটা দিক। বিশেষ করে দাওয়াতী কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক কর্মসূচির তুলনায় এটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, এমন নয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এটি সত্য, সময়ের ব্যবধানে এই সংগঠনটি এখন আপাদমস্তক একটা রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। যদিও তাদের লিটারেচার আগের মতোই আছে। অতএব, যারা রাজনীতিকে সামগ্রিক কর্মসূচির অংশমাত্র জেনে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলো, তারা যদি আন্দোলনের সামগ্রিকতাকেই এখনো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তাহলে কেন তারা ইসলামের নামে পরিচালিত একটা রাজনৈতিক দলের সাথে থাকবেন? বিশেষ করে সেটা যখন পাওয়ার পলিটিক্স করে এমন একটা সেন্টার-রাইট সেক‍্যুলার দলের বি-টিম বা লেজুড় সংগঠনে পরিণত হয়েছে?

এবার দ্বিতীয় পয়েন্টে আসেন। জামায়াতে ইসলামীর রেফারেন্স অব অথরিটি হলো ইসলাম তথা ইসলামী শরীয়াহ। কোরআন, হাদীস, সীরাত ও ফিকাহ। এইগুলো কোনো দল করা না করা নিয়ে কী বলে? যখন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সা) এবং সাহাবা আজমাইন কর্তৃক ইসলামী নেজাম পরিচালিত হতো, অর্থাৎ যখন খেলাফত ব্যবস্থা কায়েম ছিলো, তখন সেই বিশেষ রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সংগঠনের বাইরে কারো মুসলমান থাকার সুযোগ ছিলো না। কারণ, হকপন্থী সংগঠনব্যবস্থা হিসাবে খেলাফত সিস্টেম তখন ছিলো স্বাভাবিকভাবেই এককেন্দ্রিক বা ইনক্লুসিভ। এ ধরনের আল-জামায়াত বা একমাত্র হকপন্থী সংগঠন এখন আর নাই। বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা যে যার মতো করে আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। সহীহ নিয়ত থাকা সাপেক্ষে প্রত্যেক ধরনের কর্মপ্রচেষ্টাই ভালো। অথচ, জামায়াতের নেতারা নিজেদের কর্মীদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেন যাতে করে তারা মনে করে, অন্তত বাংলাদেশে জামায়াত করা হলো ঈমানের দাবি। তারা মনে করে, নিরঙ্কুশ আনুগত্য লাভের উপযুক্ত শরয়ী মর্যাদার যে আল-জামায়াত, এ দেশে জামায়াতই হচ্ছে এর একমাত্র প্রতিনিধি। এভাবে তারা ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠির একাংশকে ইনডক্ট্রিনেট করে জোম্বি হিসাবে গড়ে তুলেছে।

উলিল আমর তথা আনুগত্য সম্পর্কে তাদের কনসেপ্ট বা ধারণাটা ভুল। কোরআন-হাদীস এটি সমর্থন করে না। তাবলীগের মুরুব্বীরা যেমন জিহাদের আয়াতগুলোর ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ করে, জামায়াতের লোকেরাও তেমন করে সংগঠন ও জিহাদ সম্পর্কিত নস বা রেফারেন্সগুলোর ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ করে।

এ বিষয়ে তৃতীয় পয়েন্ট হলো, বর্তমান সময়ে ইসলামী আন্দোলনের কাজ হবে ভিন্নতর প্যাটার্নে। একেক ব্যক্তি একেক সেক্টরে কাজ করবে। ইসলামের সামগ্রিকতা থাকবে প্রত্যেকের আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে। ঐক্য হবে চেতনা ও ময়দানভিত্তিক ইস্যুতে। জামায়াতের লোকেরা মনে করে, জামায়াত যা করে তা-ই হলো একামতে দ্বীন বা দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার সহী কাজ। আর বাদবাকি মাদ্রাসা, খানকা, ইসলামী মতাদর্শভিত্তিক সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যা যা করে তা নিছক খেদমতে দ্বীন বা দ্বীন ইসলাম চর্চার সহায়তামূলক কাজ। এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর একটা আইডিয়া। টোটালি ফলস। ইসলামের সামগ্রিকতার একটা ভুল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের কারণে তারা এই ফলস ডাইকোটমি বা অনুচিত ভাগাভাগিটা করে। সম্ভবত সামগ্রিকতার কথা মাথায় রেখে তারা তাদের দলীয় কর্মসূচিতে দাওয়াত, সংগঠন, প্রশিক্ষণ, সমাজসেবা ও রাজনীতিকে যথাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সমস্যা হলো, মতাদর্শগত সামগ্রিকতার কথা যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে তাদের দলীয় কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক ও সামরিক কার্যক্রম নাই কেন? ইসলামের দিক থেকে দেখলে, এগুলো অপরিহার্য। এগুলোকে বাদ দিয়ে তো ইসলাম বা সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনা অসম্ভব।

আমরা জানি, মানবিকতা হলো একক বা অখণ্ড ধারণা। কিন্তু বাস্তব মানবসমাজ হলো বৈচিত্র্যপূর্ণ বা প্লুরালিস্টিক। তাই, তাত্ত্বিকভাবে ইসলাম এক হলেও, ইসলামী আন্দোলনের কাজ হতে হবে কনসেপ্টচুয়ালি ইনক্লুসিভ বাট প্র্যাকটিকেলি প্লুরালিস্টিক। ইসলামের ভাবাবেগমুক্ত অধ্যয়নে আমি এমনটাই পেয়েছি। সামাজিক কোনো কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বা সে ধরনের কোনো কাজের উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে সবার অধিকার সমান। কিন্তু আইন প্রয়োগের অধিকার শুধুমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষের। বলাবাহুল্য, কর্তৃত্ব ও কর্তৃপক্ষ মানেই ক্রমসোপানমূলক এককেন্দ্রিকতার (centralized hierarchy) ব‍্যাপার। এই অতি সাধারণ তাত্ত্বিক কথাগুলো জামায়াতের সংগঠনবাদী লোকেরা মানতে চায় না বা বুঝতে পারে না।

তাদের এই ধরনের ভুল বুঝার কারণ হলো, কোরআন-হাদীসের রেফারেন্সগুলোকে ক্ষেত্রবিশেষে তারা খণ্ডিতভাবে ও প্রেক্ষাপটবিযুক্ত করে বুঝার চেষ্টা করে। আপনারা জানেন, ইসলামী আন্দোলন হিসাবে ইসলাম আর ধর্ম হিসাবে ইসলাম, ইসলামের এই দুই ধরনের বুঝ-জ্ঞানের পার্থক্য হলো– প্রথম ধরনের আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে ইসলামকে দেখা হয় মহানবী মোহাম্মদের (সা) জীবনের ধারাবাহিকতার আলোকে। তাই সেখানে মক্কী যুগ, মাদানী যুগ, কোরআনের ক্ষেত্রে শানে নুযুল, হাদীসের ক্ষেত্রে শানুল ওয়ারুদ, এগুলোর বিবেচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক কথায়, ইসলামকে সীরাতে রাসূলুল্লাহর (সা) ধারাবাহিকতা অনুসারে বুঝা ও মানার আইডিয়াটা হলো ইসলামকে ইসলামী আন্দোলন হিসাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। এর বিপরীতে, পুরো ইসলামকে একসাথে মানার চেষ্টা হলো ধর্ম হিসাবে ইসলামের আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ইসলামের সবকিছুকে যেহেতু একসাথে আমল করা সম্ভব হয় না, সেহেতু ধর্মপ্রাণ লোকেরা ইসলামী শরীয়তের যতটুকু সম্ভব মেনে চলে; বাদবাকি যা কিছু অনাচরিত রয়ে যায় সেগুলোর জন্য তারা আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে খালাসবোধ করে। অথবা, বিদ‍্যমান পারিপার্শ্বিকতা তথা সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত নয়, ইসলামের এমন আমলগুলোকে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অগ্রাহ্য করে ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসাবে আত্মতুষ্ট ও সুখী জীবনযাপন করে।

জামায়াত যদি ইসলামী আন্দোলনের ধারণাকে প্রায়োরিটি দিতো তাহলে তারা সব ধরনের কাজকে একসাথে করে একটা একক সংগঠন কায়েম রাখার এই অবাস্তব কর্মপদ্ধতিকে বহু আগেই বাদ দিতো। ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে একটি মাত্র সংগঠনে একীভূত করে কাজ করার চেষ্টা করতে গিয়ে রাজনীতির মতো সদাজরুরী বিষয়টি তাদের কাছে ক্রমাগতভাবে প্রায়োরিটি পেয়ে এসেছে। এভাবে এক পর্যায়ে জামায়াত ধর্মীয় ও সামাজিক কিছু দিকসম্পন্ন মূলত একটা রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়েছে।

২.

সার্বিক বাস্তবতার আলোকে জামায়াতের এখন যা করা দরকার তা হলো তিউনিশিয়ার আন-নাহদা মুভমেন্টের মতো নিছক রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হওয়া। অথবা, অরাজনৈতিক ধর্মীয় বা সামাজিক সংগঠনে পরিণত হওয়া। কিন্তু জামায়াত এর কোনোটাই করতে পারবে না। কেন পারবে না, তা বলার জন্য এই লেখা। এতক্ষণ যা বললাম তা মূল কথার ভূমিকা বা প্রেক্ষাপট।

প্রত্যেকটা সংগঠন গড়ে উঠে ও পরিচালিত হয় তার প্রতিষ্ঠাকালীন ধ্যানধারণার ভিত্তিতে। চাইলেই কোনো সংগঠন এর বাইরে যেতে পারে না। সময়ের ব্যবধানে জগতের সবকিছুর মতো সংগঠন মাত্রেরই কিছু পরিবর্তন ঘটে। উপরে যেমন বললাম, ইসলামী আন্দোলন হিসাবে শুরু করে জামায়াত এখন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। বাহ্যত এই পরিবর্তনটা যত বড়ই হোক, যে ধ্যানধারণা ও মনমানসিকতা তথা প্যারাডাইমের ভিত্তিতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এখনো মোটাদাগে এটি এর মধ্যেই আছে। উপরে বলেছি, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী রাজনীতি তো এক কথা নয়। কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে, “আপনিই বলেছেন, জামায়াত ইসলামী আন্দোলন হতে ইসলামী রাজনৈতিক দলে বিবর্তিত হয়েছে। এবার বলেন, আপনার কথার কনসিসটেন্সি কোথায়?”

এর উত্তর নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আসলে ইসলামী আন্দোলনের যে রেটরিক নিয়ে জামায়াত শুরু করেছিলো তা-ই ছিলো ত্রুটিপূর্ণ বা ফল্টি। ইতোমধ্যে তা নিয়ে আমি কথা বলেছি। ক্লারিফিকেশনের জন্য দ্বিরুক্তি করছি: (১) আধ্যাত্মিকতা, অর্থনীতি ও জিহাদকে কথিত ‘দ্বীনের সামগ্রিকতা’ বা অখণ্ডতা হতে শুরুতেই বাদ দেয়া। (২) দাওয়াতী কার্যক্রমের মতো দীর্ঘমেয়াদী ও সামাজিক কার্যক্রমের মতো মধ্যমেয়াদী কাজের সাথে রাজনীতির মতো জরুরী বিষয়কে মিশিয়ে ফেলা। যেসব ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক সংগঠন জিহাদের মতো জরুরী বিষয়কে অন্যতম কর্মসূচি হিসাবে গ্রহণ করেছে, অবশেষে তারা সবকিছুর ওপর সশস্ত্র কার্যক্রমকেই প্রায়োরিটি দিতে বাধ্য হয়েছে। ‘জিহাদী’ হিসাবে তারা পরিচিতি পেয়েছে। যেভাবে করে, জামায়াতে ইসলামী এখন মূলত একটা পলিটিকাল পার্টি হিসেবে পরিচিত হয়েছে।

আপনি যদি ছোট গাছের বিচি, ঝোপ জাতীয় গাছের বিচি, মাঝারি উচ্চতার যেসব গাছ সেগুলোর বিচি আর বড় গাছের বিচি একসাথে পাশাপাশি বপন করেন, সময়ের ব্যবধানে দেখবেন পরিমাণগত দিক থেকে বড় ও উঁচু গাছটাই ঠিক মতো গড়ে উঠেছে। বাকিগুলো একপর্যায়ে মরে গেছে বা কোনোমতে বেঁচে আছে। পার্শ্ববর্তী বড় গাছের ছায়ার কারণে সেগুলোতে তেমন কোনো ডালপালা-ফুল-ফল বের হচ্ছে না। এই উদাহরণের মাধ্যমে কী বুঝাতে চাইছি তা আশা করি এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন।

মেওয়াত অঞ্চলের অজ্ঞ লোকদের জন্য মাওলানা ইলিয়াস (রহ) যে ছয় উসূলভিত্তিক দ্বীনের কাজ শুরু করেছিলেন তা আজ বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় ইসলামী সংগঠন হিসাবে প্রসার লাভ করেছে। অথচ, এখনো পর্যন্ত তা সেই ছয় উসূলেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থায় নির্বাচনী এলাকা বা কনস্টিটিউয়েনসি যেমন অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; সংগঠনের ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, এর প্রসার, বিকাশ, বিবর্তন, পরিবর্তন ও সংস্কারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন যে বেসিক ধ্যানধারণা বা কাইন্ড অব কনস্টিটিউয়েনসি, তা অতি গুরুত্বপূর্ণ ডিটারমাইনিং ফ্যাক্টর। সেচ ব্যবস্থা যতই ভালো হোক, মাটি যতই উর্বর হোক, সূর্যের আলো যতই অবারিত হোক, ঘাস ঘাসই হবে। ঝোপ ঝোপই হবে। বৃক্ষ বৃক্ষই হবে। আপনি পথের ডান দিক থেকে সরে বামদিকে বা মাঝখানে আসতে পারেন। অথবা, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে বিকল্প পথও ধরতে পারেন। কিন্তু গিভেন অপশনের বাইরে, পূর্ব নির্ধারিত বাউন্ডারির বাইরে আপনি যেতে পারবেন না। যেমন করে আমরা কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেমকে ডেভেলপ করতে পারি যতদূর পর্যন্ত তা হার্ডওয়্যার কর্তৃক সাপোর্টেড থাকে। যা পটেনশিয়ালিটির মধ্যে আছে, ইতিবাচক-নেতিবাচক নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে আপনি বাস্তবে রূপায়ন বা একচুয়েলাইজ করতে পারবেন। কিন্তু যা সুপ্ত-সম্ভাবনা হিসাবেও নাই, তাকে আপনি কখনো জাগ্রত বা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না।

৩.

তাই, জামায়াতের সংস্কারের জন্য যারা কাজ করছেন, তারা ভুলের মধ্যে আছেন। জামায়াত কখনো তাবলীগ হবে না। তাবলীগ কখনো জামায়াত হবে না। আবার তাবলীগ মার্কা জামায়াত বা জামায়াতের মতো তাবলীগ কিংবা এতদুভয়ের সব ভালো গুণগুলোকে নিয়ে যারা একটা নতুন কিছুর স্বপ্ন দেখছেন, তারা ভুল করছেন। এ ধরনের চিন্তা স্পষ্টত সিনসিয়ার মিসটেক। অবাস্তব আশাবাদ।

না, একটামাত্র সংগঠন দিয়ে এখন আর চলবে না। বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করার মতো একেক দোকান থেকে যাচাই বাছাই করে আপনার সামর্থ্য ও প্রাপ্যতা অনুসারে সওদা করবেন। চেইন স্টোরের কথা যদি ভাবেন তবে আপনাকে পাশাপাশি অনেকগুলো big bazaar বা চেইন স্টোরের কথা ভাবতে হবে। বিজ্ঞজনের জন্য এই ইংগিতই যথেষ্ট।

জামায়াতের মধ্যে বরাবরই দুইটা ধারা ছিলো। এখনো আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। মাওলানা মওদূদী বনাম মাওলানা ইসলাহী। মাওলানা আবদুর রহীম বনাম অধ্যাপক গোলাম আযম। একটা ধারা বুদ্ধিবৃত্তিক ও ময়দানমুখী। আরেকটা ধারা ধর্মবাদী ও গোঁড়াপন্থী। রক্ষণশীল এই ধারার নেতৃবৃন্দ খুব একটা গণমুখী নন। মীর কাশেম আলী, কামারুজ্জামান, মাওলানা সাঈদী ও ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক সাহেবরা প্রগতিশীল ধারার লোক। বর্তমানে অনলাইনে সক্রিয় শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু এই সংস্কারবাদী ধারার অনুসারী। কারা কারা রক্ষণশীল ও সংগঠনবাদী ধারার লোক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল লোকেরা জামায়াত-শিবিরের সংগঠনে খুব কমই নেতৃত্বে উঠে আসতে বা টিকে থাকতে পেরেছে। আরেকটা গুরুতর বিষয় এখানে আছে। তা হলো নানা ধরনের বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা। জায়েজকরনের ফর্মুলাকে কাজে লাগিয়ে কায়দা-কানুন করে জামায়াত নিজেদের নেতৃবৃন্দকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার জোগান দেয়। সুবিধাভোগী হওয়ার কারণে সংস্কারবাদী নেতারা হকের পতাকা নিয়ে স্বীয় কমফোর্ট জোন হতে আল্টিমেটলি বের হতে পারে না। এরসাথে রয়েছে ‘আল-জামায়াতের’ ধারণাপ্রসূত নিরঙ্কুশ আনুগত্যের অব্যর্থ মাসয়ালা ও পরকালে নিশ্চিত নাজাত লাভের লোভ। এই নাজাতের ব্যবসাকে জামায়াতে ইসলামী রীতিমতো ইনস্টিটিউশনালাইড করে ফেলেছে। যে কোনো সংস্কারবাদী বিরূপ আলোচনাকে টুঁটি চেপে ধরে হত্যা করার তথা গিলোটিন করার অব্যর্থ উপায় হলো আখেরাতে নাজাত লাভের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাটুকু নষ্ট হওয়ার ভয় দেখানো।

কেন্দ্রীয় বা জেলা পর্যায়ের নেতা না হলেও জামায়াতের পরিচিত লোকদের মধ্যে আমিই প্রথম প্রকাশ্যে বলাবলি শুরু করেছিলাম, জামায়াতের মধ্যে প্রত্যাশিত মানের সংস্কার, তারেক রমাদানের ভাষায় ‘ট্রান্সফরমেটিভ রিফর্ম’ বলতে যা বুঝায়, তা আদৌ হয়ে উঠবে না। ২০১০ সালে সোনার বাংলাদেশ ব্লগে এ নিয়ে আমি অনেক লেখালেখি করেছি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের দিকে আমি সর্বোতভাবে জামায়াত ত্যাগ করি। একসময় যা ছিল দুঃস্বপ্নেরও অতীত তা এখন আমার জীবনের নিরেট বাস্তবতা।

জামায়াতকে দিয়ে যে এ যুগে ইসলামী আন্দোলনের হক আদায় করে কাজ করা সম্ভব নয় তা আমি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট ও ব্যক্তিগত রিয়েলাইজেশনের কারণে ২০০১ সালে আমি ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’ [Centre for Social & Cultural Studies (CSCS)] গঠন করেছি। পরবর্তী এক যুগ আমি সক্রিয়ভাবে জামায়াতের কাজের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ধারায় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। বর্তমানে যা আমার মূল মতাদর্শগত পরিচয়। একমাত্র আইডেন্টিটি।

জামায়াত ত্যাগ করার পর থেকে আমার জীবনটা সবদিক অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ, সুন্দর ও কর্মমুখর হয়েছে। তারমানে এই নয়, জামায়াত করে এতদিন আমি ভুল করেছি। যারা এখন এই সংগঠনটি করছেন, তারা ভুল করছেন, এটিও আমার বক্তব্য নয়। বরং, যারা জামায়াতকে দিয়ে সমাজ পরিবর্তন, রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনা এবং সভ্যতা নির্মাণ সম্ভব বলে মনে করেন তাদেরকে আমি ভ্রান্ত মনে করি। জামায়াতের সাথে আমার ছন্দপতন ও মতদ্বৈততার কারণ খানিকটা পথ ও পদ্ধতির। অনেকখানি গতি ও ব্যাপকতার।

একটা কথা না বললেই নয়, আমার শিবিরের জীবনটা ছিলো খুব সুন্দর। আমি সব সময় এই নিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি। ১৯৮৬ সালে কর্মী হিসেবে শুরু করে ১৯৯২ সালে সদস্য হিসাবে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবির হতে বিদায় গ্রহণ করি। এই সময়টি ছিলো শিবিরের ইতিহাসে খুব সম্ভবত গোল্ডেন পিরিয়ড। এরমধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো সবচেয়ে উর্বর ময়দান। এখানে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার কারণে আমি সব ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করার বিরল সৌভাগ্য লাভ করেছি। ১৯৯৩ সালের পর থেকে পরবর্তী ২০ বছর সংগঠন পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার কারণে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতে ইসলামীর যে ইতিহাস, তার অনস্বীকার্য অংশে পরিণত হয়েছি। এরপরেও কেন এই বিচ্ছেদ, তা নিয়ে আমার লেখাগুলোর একটা সংকলন বের করেছি “জামায়াতে ইসলামী: অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন” শিরোনামে। বইটার শুরুতে লিখেছি,

“অগাধ আস্থার মেঘ কেটে গেলে / দেখি, শিক্ষক আর শিক্ষা মুখোমুখি / অপারগ আমি / শিক্ষাকেই নিয়েছি বেছে / দুঃখিত, পারলে ক্ষমা করো / ভালো থাকো / আমার পুরনো সুহৃদ, সাথী ও বন্ধুরা…!”

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমরা অন্যায়কে হাত দিয়ে বাধা দাও। না পারলে মুখে প্রতিবাদ করো। তাও না পারলে মনে মনে সক্রিয় থাকো। আমাদের আজকের আলোচনার প্রসঙ্গ নিরিখে, নৈতিকতার এই সুন্নাহসম্মত সিরিয়ালিটিকে সামনে রাখলে অনায়াসে বুঝতে পারবেন, যারা সংগঠন ত্যাগ করে, সব অপবাদ ও ঝুঁকিকে অগ্রাহ্য করে সুন্দর একটা আগামীর পথ রচনা করার জন্য, সফল হোক বা না হোক – দায়িত্ব মনে করে একটা কিছু করার জন্য আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টারত তারা প্রথম শ্রেণীভুক্ত। সংগঠনের সাথে থেকে যারা হক কথা বলছেন, প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি তুলছেন, জনমত গঠন করছেন তারা ন্যায় ও সত্যের পক্ষে থাকার দিক থেকে দ্বিতীয় ক্যাটাগরি বিলং করছেন। যারা কোথাও যাওয়ার, মুখ খোলার কিংবা তেমন কিছু একটা করার মতো মনোবল, সাহস ও ক্ষমতা রাখেন না, কিন্তু দায়িত্বশীলদের স্বার্থপরতা, অদূরদর্শিতা ও হঠকারিতা নিয়ে অসন্তুষ্ট; যারা সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কর্মসূচি এবং বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে যে বিরাট অসঙ্গতি তা অনুধাবন করেন এবং সংগঠনের যুগোপযোগী সংস্কার হোক, মনেপ্রাণে এটা চান, তারা তৃতীয় ক‍্যটাগরির অন্তর্ভুক্ত। এর বাইরে যারা আছে তারা ফর নাথিং। তাদের নিয়ে বলার মতো পজিটিভ কিছু খুঁজে পাচ্ছি না।

ফেসবুকে প্রদ্ত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Mohammad Mozammel Hoque: Monju ভাই, কালকে আমাকে ট্যাগ করে আপনার দেয়া স্ট্যাটাসে আমার দেয়া প্রথম মন্তব্যে বলেছিলাম, “আমার ধারণায় জামাতের বা কোনো সংগঠনের কোনো ধরনের সংস্কার সম্ভব না। এ নিয়ে আমার তত্ত্ব আছে। বাসায় গিয়ে বিস্তারিত বলব।” এ জন্যই এই লেখা।

Mojibur Rahman Monju: এটা কি নতুন করে লিখলেন?

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ। এই যে কিছুক্ষণ আগে লেখলাম।

Mojibur Rahman Monju: আলহামদুলিল্লাহ। অসাধারণ! অনেক বেটার এবং বোধগম্য।
আপনার লেখার একটা কমন সমলোচনা করে আপনার পাঠকরা। কী সেটা বলেন তো?

Mohammad Mozammel Hoque: দুর্বোদ্ধতা বা বুঝতে না পারা এবং লেখা দীর্ঘ হওয়া। লেখার মধ্যে ইংরেজি শব্দ থাকা।

Mojibur Rahman Monju: মাশা’আল্লাহ। 100%

Mozahidul Islam Jahid: আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি জামাত সামাজিক কাজে অনেক পিছিয়ে। অন্য কোন সংগঠনের নাম দিয়ে এদেশে সামাজিক কাজ করা দরকার।

Mohammad Mozammel Hoque: দ্বীনি বা ধর্মীয় সেক্টরে কাজ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হলো social services বা সামাজিক কাজকর্ম। তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা জগতের কাজ হলো মিডিয়া ও সংস্কৃতির কাজ। এগুলো থেকে ভিন্ন ধরনের কাজ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। তার চেয়ে ভিন্ন ধরনের কাজ হলো রাজনীতির কাজ। এসবগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের কাজ হলো নিরাপত্তা ও সামরিক কার্যক্রম। এর সাথে আছে অর্থনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার যেটার হিসাবটা উপরের এই সবগুলো থেকে আলাদা।

এটি হলো বাস্তবতার অবিকল চিত্র। এবার বুঝেন একটি মাত্র সংগঠনের পক্ষে এই সবগুলো কাজ আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব কিনা। যারা সমাজ পরিবর্তন করতে চান তাদেরকে এই বাস্তবতা মেনে চলতে হবে। এবার করণীয় কি তা নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারছেন।

Mozahidul Islam Jahid: বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নাম দিয়ে সামাজিক কাজ করতে হবে। যার যে সেক্টর পছন্দ মাফিক কাজ করতে দিতে হবে। তাহলে অগ্রগতি হবে। সবাইকে নেতা বানাতে গেলে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। নেতারা আছে জেলে আর দৌড়ের উপর তাহলে সামাজিক কাজগুলো করবে কারা। ব্যাপকভিত্তিক কাজ করতে হবে। যারা সামাজিক কাজ করবে তাদের রাজনীতি করলে হবে না।

Mohammad Mozammel Hoque: যারা রাজনীতি করবে তারা শুধু রাজনীতি করবে, সেটার মধ্যে ফুলটাইম অ্যাক্টিভ থাকবে। বাদবাকি কাজগুলোতে তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকতে পারে বড়জোর। সব সেক্টরে কাজ সম্পর্কে আমার এই দৃষ্টিভঙ্গি। Jack of all trades but master of none হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা থেকে আত্মরক্ষা করতে হবে।

Kamrulhasan Rashed: ১৯৮৮ সাল। শিবির চবি শাখা কর্তৃক আয়োজিত শিক্ষা সংস্কৃতি সপ্তাহের একটি স্টলে আপনার বর্ননা শুনেই আপনাকে জেনেছিলাম। তারপর দীর্ঘ প্রায় আট বৎসর ইতিহাস হয়ে থাকবে। জীবনের এ প্রান্তিকে কোনো অনুযোগ নেই, আপন মহিমায় বিকশিত হবো, কিংবা সবার অগোচরে একটি নক্ষত্রের বিচ্যুতি ঘটবে, কেউ জানবে না– এমন একটি তত্ত্ব বানিয়ে ছিলাম ছাত্রজীবনের শেষলগ্নে। তাই মফস্বলে পড়ে আছি। তবুও চেতনার সেই বীজ বপনের কাল যে আমাদেব পরম সম্পদ। কোনো মন্তব্য নয়, দুর্যোগে ক্লান্ত মানুষগুলোকে আল্লাহ হিফাজত করুন, আল্লাহ আপনার হায়াতে তাইয়েবা দান করুন, মেধাকে বাড়িয়ে দিন।

Mohammad Mozammel Hoque: ১৯৮৮ সালের শিক্ষা ও সংস্কৃতি সপ্তাহ নিয়ে আলাদা করে একটা কিছু লেখা উচিত। যে কাজ তখন হয়েছিল সেটা অভাবনীয়, সৃজনশীল এবং ব্যতিক্রমী। এমন কাজ এর পূর্বে বা পরে কেউই করতে পারেনি। আমরা সৌভাগ্যবান, আমরা তেমন ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলাম। সেই সংগঠন এখন কোথায়?

Kamrulhasan Rashed: আসসালামু আলাইকুম। তারপর অপেক্ষায় থাকতাম। আবার বুঝি আয়োজন হবে। পেলাম না। তবুও ভালোবাসা নিরন্তর।

Mohammad Mozammel Hoque: সেটাই ছিল আসলে মূল তরীকা। যেটা আমরা ৯০ সালের সংসদ নির্বাচনে একগুঁয়েমির কারণে হারিয়েছি। তখন যদি অন্ততপক্ষে ছাত্রদলের সাথে আমরা ঐক‍্য করতাম তাহলে এভাবে গোহারা হারতাম না। এবং তখন যদি আমরা এভাবে গণহারে ফেইল না করতাম তাহলে আমাদের উপরে যে ক্র্যাকডাউন হয়েছিলো সেটা আর হতো না। এবং তা যদি না হতো তাহলে পরবর্তীতে আমরা যে আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়েছি সেটারও আর প্রয়োজন হতো না। chaos theory-র butterfly effect-এর মতো ঘটনাগুলো একটা আরেকটাকে অনিবার্য করে তুলেছিল। জড়িয়ে পড়ার পরের বিবেচনা একরকম। জড়ানো ঠিক হয়েছিল কিনা, সেই বিবেচনা ভিন্নরকম। আমি মনে করি প্রথমটা সঠিক। অর্থাৎ জড়িয়ে পড়ার পরে মোকাবেলাটা সঠিক ছিলো। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী হলের প্রভোস্ট রুমে তালা মেরে আন্দোলনের জড়িয়ে পড়া ভুল ছিলো। সেই সম্পর্কে প্রপার রিয়েলাইজেশন থাকা জরুরি বলে মনে করি।

Mostafa Nur: সেই আয়োজনে আমিও হই আপ্লুত। এরপর আর হয়নি কোথাও।

Rashedul Islam: আসসালামু আলাইকুম। ভারসাম্যপূর্ণ লেখা, কিন্তু ডিটেইলস নয়। নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর কি অন্য কোনো লেখাতে আছে?

জামায়াত কি কি কারণে রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন তার বিস্তারিত আসা দরকার।

ইসলাম কায়েমের কোন বিকল্প পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে বলে আপনি মনে করেন সেটির বিস্তারিত আসা দরকার।

জামায়াতের যে গ্যাপগুলো, সেগুলো আপনার নতুন সংগঠনের মাধ্যমে কি ফিলআপ করতে পারছেন? নাকি শুধু আপনি ব্যক্তিই লাভবান হচ্ছেন? আপনার সংগঠনের কার্যক্রম কি? কোন কোন পয়েন্টে আপনি মনে করেন জামায়াত না করে সেটির সাথে জড়িত হলে হক আদায় হবে?

হাসান রিয়াদ: স্যার তো নতুন সংগঠন কায়েম করেন নাই

Rashedul Islam: তাহলে জামায়াতের গ্যাপ কিভাবে ফিলআপ হবে বা যে ফর্মুলা দিচ্ছেন সেটি কিভাবে বাস্তবায়ন হবে। নাকি আমরা যে যার মতো করে একটা দিক নিয়ে থাকবো?

Mohammad Mozammel Hoque: ২০১৮ সালের ২৮ জুন থেকে আমাকে বুঝা শুরু করলে ভুল করবেন। এই লেখা আমার প্রথম লেখা নয়। এ ধরনের আমার কয়েক শত লেখা আছে এবং সেগুলো ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। একটু কষ্ট করে আপনাকে সেগুলো ঘেঁটে দেখতে হবে। আপনার সাথে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারলে ভালো হতো। সেটা এক সময় না হয় হবে। এখন ভালো থাকেন। আমাদের জন্য দোয়া করতে ভুলবেন না যেন।

Rashedul Islam: ভাই, আমি নতুন দল করা বা যারা করেছে তাদেরকে মোটেও খারাপ দৃষ্টিতে দেখি না। আপনি যদি বিশ্বাস করেন আপনি যেটি করছেন সেটি ঠিক করছেন না, তাহলে আমি মনে করি সেটা করা মোটেও জায়েজ নাই। এজন্য আমি এই ফর্মুলার লোক। যদি কোনো কারণ যথেষ্ট হয় কোনো দল ত্যাগ করার জাস্ট ত্যাগ করুন। অবশ্যই চেষ্টার একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হবে তার আগে। নিয়ত ঠিক থাকলে অন্য কোনো হীন উদ্দেশ্য না থাকলে অবশ্যই আল্লাহ সেভ করবেন। মাওলানা আব্দুর রহীম কিংবা মাওলানা আব্দুল জব্বাররা নিয়তের দিক থেকে ঠিক ছিলেন বলেই মনে করি। যদিও তাদের চিন্তার বাস্তবায়নে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু এটি আল্লাহর কাছে ব্যর্থতা হবে না ইনশাআল্লাহ। যেদিন মনে হবে জামায়াত সমর্থন ঠিক নয় এক সেকেন্ডও দেরি করবো না। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমি যেসব কারণ বলা হয় কনভিন্স না।

Mohammad Mozammel Hoque: জামাতের কাউকে আমার নতুন উদ্যোগে নেয়ার ব্যাপারে আমি মোটেও ইন্টারেস্টেড নই। তাদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ, যা সব সময় আমি তাদেরকে দিয়ে থাকি, সেটা হলো, আপনারা/তোমরা সংগঠনের সাথে থাকেন বা থাকো। মন দিয়ে কাজ করো। ভালো কাজে সহযোগিতা করো। মন্দ কাজে সহযোগিতা করা থেকে দূরে থাকো। নিজেদেরকে প্রস্তুত করো।

আমার নতুন উদ্যোগে তথা সামাজিক আন্দোলনে যারা আসবে তাদেরকে জামাত আইডেন্টিটি ত্যাগ করে আসতে হবে। আমার টার্গেট গ্রুপ হলো, অর্থাৎ যাদেরকে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই বা যাদেরকে আমি এক নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি, তারা হলো যারা কোনো কিছুর সাথে নাই। যারা নিরীহ, নির্বিবাদী ও নিরপেক্ষ। এরা সমাজের ১০ থেকে ১৫ ভাগ লোক। তাদের মধ্যে বিশেষ করে যারা তরুণ ও শিক্ষিত, যাদের বয়স বিশের কম নয় আবার পঁয়ত্রিশের বেশি নয়।

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন হবে একটি অরাজনৈতিক প্লাটফরম। সুতরাং এখানে জামাত চর্চা বা বিরোধিতার কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়। তাছাড়া, এটি এখনো নিছক পরামর্শ, আলাপ-আলোচনা ও চিন্তা-ভাবনার মধ্যে সীমিত। দেখা যাক, আল্লাহ কী করেন। এ নিয়ে ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’র (সিএসসিএস) সাইটে সামাজিক আন্দোলন ক্যাটাগরিতে আমাদের লেখা নিবন্ধ আছে। একটু কষ্ট করে পড়ে দেখলে আপনার ভুল ধারণা ভেঙে যাবে।

Abu Fahmi: আপনার চিন্তা ও গবেষণা ভালো এবং নেক নিয়তে করছেন বলেই সুধারণা রাখি। তবে একটি প্রশ্ন মাথায় আসছে, এই চিন্তা গবেষণা জামায়াতের দুঃসময়ে কেন? কেন সুসময়ে নয়?

Mohammad Mozammel Hoque: I am always consistent in my writing and in my thoughts and consistent in my rhetorics and activities. If you try to know it, you will see what I said is true.

Abdul Wahab: কারণ, সুসময়ে সবাই মনে করে– “We are right, we are in correct path. Victory knocking at the door. Most of the central leaders had the same perception. For which in 1996 BJI contested in 300 Seats. Just a big mistake, blunder they did.
অই সময় এ কথা বললে পাগল বলতো, মার খেতেও হতে পারতো!!

Abdullah Shahin: খারাপ সময়ে ভুল নিয়েই বেশি নাড়াচাড়া হয়। তবুও কিছু পরিবর্তন জরুরি।

Mohammad Mozammel Hoque: বিপদে না পড়লে মানুষের আত্ম-অনুসন্ধান ও আত্মপর্যালোচনা হয়ে ওঠে না। এটা ব্যক্তি থেকে শুরু করে সংগঠন, সবার জন্য প্রযোজ্য। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানার জন্য শাদি হামিদের Islamic exceptionalism বইটা পড়ে দেখতে পারেন। এই ঘটনা বা অবস্থা দুনিয়াব্যাপী সব সংগঠনের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। সেজন্য কিছুটা বিরূপ পরিস্থিতি মানুষকে তওবা ইস্তেগফার করা ও ইসলাহ করার সুযোগ এনে দেয়।

হাসান রিয়াদ: ওহুদের পরে কিন্তু প্রচুর পর্যালোচনা হয়েছে ☺☺

Abu Jarir: সংস্কার ধারণা এখন সেকেলে হয়ে গেছে, তাই সংস্কার করে কোন লাভ হবে না। আসল খেলাটা খেলতে হবে নতুন করে। বর্তমানে জামায়াতকে মোকাবেলা করার জন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে এগিয়ে আনা হচ্ছে। জামায়াতসহ দেশের তাবৎ ইসলামী সংগঠনগুলোকে তাদের নিজেদের কর্মসূচি চালু রাখতে হবে, শুধু বাদ দিতে হবে রাজনীতি। যারা রাজনীতিকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিবে, তাদেরকে নিয়ে একটা রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। যা হবে একেবারেই স্বতন্ত্র এবং যেখানে ধর্ম-বর্ণ-ইসলামী দল-ইসলামী মত নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে, শুধুমাত্র দেশের রাজনৈতিক গতিপথকে নিয়ন্ত্রণের জন্য। ইসলামী দল এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজ সংস্কারসহ সব কাজ করবে এবং রাজনৈতিক দলে যোগ্য দক্ষ কর্মী সাপ্লাই দিবে। ব্যাস।

Mostafa Nur: আপনার পর্যালোচনা অনেকাংশে সঠিক হলেও সামগ্রিকভাবে উত্তরণের উপায় বেরিয়ে আসেনি। তবে আমি মনে করি, অদূরদর্শী, গোঁড়া, সমাজ ও সংস্কৃতিবিমুখ সরকারী চাকুরীজীবীর মতো নেতৃত্ব হতে বেরিয়ে আসতে পারলেই জামায়াত কাঙ্খিত সাফল্য পাবে।

Mohammad Lokman: আল্লামা আ’বুল আলা (রহ.) ১৯৪১ সালের পরবর্তী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে থিওরিগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলোর বয়স কিন্তু একটা শতাব্দী ইতিমধ্যে পার করে ফেলেছে।

যদিও উনার চিন্তা-দর্শন ছিল অতি সূক্ষ, তারপরেও সেটা বর্তমানে সময়ে অনেকাংশে সংস্কারের দাবি রাখে। কারণ, একটা থিওরি তো আর শতবছর ধরে চলতে পারে না।

যেমন ধরুন, আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি, সেটা আমি মনে করে ধুয়াশাচ্ছন্ন একটা প্রক্রিয়া মাত্র, না পুরোপুরি ইসলামিক, না পুরোপুরি বস্তুবাদী।

তাছাড়া নির্বাচন যে বাংলাদেশে স্বচ্ছ হবে না সেটা হাসিনার সফরের মাধ্যমে পরিস্কার হয়ে গেল। ইন্ডিয়া থেকে উনি আরো ৫ বছরের ছাড়পত্র নিয়েই আসছেন। এজন্য জামাতের উচিৎ জিও-পলিটিক্স এবং বিশ্বরাজনীতির বর্তমান পেক্ষাপট বিবেচনা করে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করা, নির্বাচন একটা এলেই প্রার্থী আর আসন ভাগাভাগির মত আহম্মকি কাজ বাদ দিয়ে ভিন্ন মডেলের রাজনৈতিক এবং আদর্শিক সংগ্রামের জন্য জনশক্তিকে প্রস্তুত করা।

তাছাড়া গতানুগতিক ধাচের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং টিসি/টিএস-এ দায়িত্বশীলদের বক্তব্য অন্ধের মত গলধকরণ করে সাময়িক তৃপ্তির ঢেকুর গিলা গেলেও অস্তিত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকা আরো কঠিন হবে।

জামাত ৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে হাজির হয়েছে তা হলো: ধর্মীয় আহকাম পালনের ক্ষেত্রে উদারতার নামে উদাসীনতা, রাজনৈতিক তথা আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে জাহেলি নীতি গ্রহণ। আমি নিজে জাতীয় নির্বাচনসহ বহু স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে দেখেছি, নির্বাচনের আগে আমরা নিজেরা জনসাধারণকে টাকাসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ করেছি, সে সময় দায়িত্বশীলকে এগুলোর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করলে উনারা কোনো সঠিক উত্তরই দিতে পারেননি। হয়ত আপনাদের ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে আমাদের আর্দশিক স্তম্ভের জায়গাটা আরো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

Fahim Ahmed: স্যার, আপনার কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। জামায়াতের বাইয়াতের যে সিস্টেম চালু আছে সেটা কি কোরআন-হাদিস এবং ইসলামের ইতিহাসে যে বাইয়াতের সিস্টেম আমরা দেখি তার সাথে প্রাসঙ্গিক?? যদি হয় তাহলে কিভাবে?? কারণ বাইয়াত বিষয়টা ইবাদতের সাথে সংশ্লিষ্ট।

Mohammad Mozammel Hoque: বাইয়াত গুরুত্বপূর্ণ বটে। শর্ত হলো বাইয়াত গ্রহণের জন্য সেরকম কর্তৃপক্ষের উপস্থিতি থাকা। এটি জিহাদের মতো। জিহাদ ফরজ। শর্ত হলো জিহাদ ঘোষণা ও পরিচালনার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ থাকা। যে ধরনের পরিস্থিতিতে বাইয়াতের বাহিরে থাকলে জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তা কি এখন আছে?

তাছাড়া আমরা তো প্রতিনিয়ত formal এবং informal বাইয়াতের মধ্যে আছি। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র, এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে। যদি আমরা বায়াতকে সংকীর্ণ অর্থে গ্রহণ না করি আরকি।

এটি কিতাল অর্থে জিহাদ এবং জিহাদের বৃহত্তর অর্থ গ্রহণের মতো। এগুলোর কোনটি দরকার, কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ? – এ ধরনের প্রশ্ন ভুল প্রশ্ন। ক্রমসোমূলক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘আইদার অর’ রিলেশন খাটে না। প্রত্যেকটি যার যার জায়গায় প্রেক্ষাপট অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখাটির ফেসবুক লিংক:

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলোসফি পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম। থাকি চবি ক্যাম্পাসে। নিশিদিন এক অনাবিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। তাই, স্বপ্নের ফেরি করে বেড়াই। বর্তমানে বেঁচে থাকা এক ভবিষ্যতের নাগরিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *