রাষ্ট্রধারণা বিরোধীদের বিচিত্র চিন্তাভাবনা

বহুদিন শুনেছি, গ্রাম্য স্বভাবের উঠতি শহুরে লোকেরা সিডিকে বলতো সিডি ক্যাসেট। যেভাবে শুনি রাষ্ট্রধারণা বিরোধী একটা ইসলামী দল বলে ‘খেলাফত রাষ্ট্র’। পলিটিক্যাল রেটরিকে তারা সবসময় খেলাফত শব্দটা ব্যবহার করে। অথচ বেচারাদেরকে বাধ্য হয়েই বলতে হয় ‘খেলাফত রাষ্ট্র’। ঠিক যেন ‘সিডি ক্যাসেট’। একইভাবে কম্যুনিজম কায়েম হলে রাষ্ট্র উবে যাবে – এই লেনিনীয় বাণী শিরোধার্য করে যারা এতকিছু করলো, তারা অধিকতর শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত কায়েম করেছে। দুনিয়াতে নাকি কমিউনিজম কোথাও আসেই নাই। বদরুদ্দীন উমর স্যার হতে হোসাইন কবির ভাই– সব ‘ঈমানদার কম্যুনিস্টদের’ এমনই মত। এবার বুঝেন…!

তালগোল পাকানো (আমার মতে) তালাল আসাদের সূত্রে রাজ্য আর রাষ্ট্রের মধ্যেও গণ্ডগোল (বিরোধ অর্থে) বিস্তর। এসব এনার্কিস্ট রাষ্ট্রবিরোধী রাষ্ট্রবাদীদের মতে, প্রিমডার্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিলো মূলত কিংডম সিস্টেম। সেগুলো রাষ্ট্রতুল্য নয়। ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির অধীনে পাশ্চাত্যে আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ গঠিত হয়েছে, এমন ন্যারেটিভ শুনলেও আমাদের ফিলোসফির তাবৎ বইতে গ্রিক রাষ্ট্রগুলোকে ‘রাষ্ট্রই’ বলে, রাজ্য নয়। ইসলামিস্টরাও দেখি রাসূলের (সা) সময়কার মদীনার অবস্থাকে রাষ্ট্রই বলে।

রাজ্য বনাম রাষ্ট্রের এই ঠেলাঠেলির একাডেমিক পরিনাম যা-ই হোক, রাষ্ট্রের যেসব অপরিহার্য উপাদানের কথা বলা হয় সেসবের স্পষ্ট উপস্থিতি সত্ত্বেও কেন এহেন একাডেমিক ত্যানাপ্যাচানি, তা আমার বুঝে আসে না। আল ফারাবীর রাষ্ট্রতত্ত্ব পড়েই তো এমএ পাশ করলাম। প্লাটো-এরিস্টটলের কথা নাইবা বললাম।

জাতীয়তাবাদ খারাপ, তাই রাষ্ট্র ধারণাটাই অনৈসলামিক – যারা এমন মনে করেন তারা আবার ‘মদীনা রাষ্ট্র’ নিয়ে খুব গর্ব করেন। এতসব বিচিত্র চিন্তাভাবনা আমার ঠিক বুঝে আসে না। কোরআন শরীফে আল্লাহ তায়ালা বলছেন– তিনি ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও জাতীয়তার পার্থক্য সহকারে মানুষ সৃষ্টি করেছেন যাতে করে তারা পরস্পর পরিচিত হতে পারে। এই পরিচয়ের মাত্রা ও ব্যাপ্তি কতটুকু? কেউ কি বলবেন? সব হুজুরেরা দেখি জাতীয়তাবাদ বলতেই বলে উঠেন, ‘সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ….’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার সরল বুঝজ্ঞানে এটাও বিরাট প্রশ্ন, সাম্প্রদায়িকতার কারণে জাতীয়তাভিত্তিক পরিচয় ও সম্পর্ক তথা জাতীয়তাবাদই খারাপ হবে কেন? দুনিয়ায় বিদ্যামান তাবৎ ভালো কিছুরই কোনো না কোনো খারাপ প্রয়োগ দেখা যায়। সেটা ওই তত্ত্বের সমস্যা নয়। সমস্যা হলো এর প্রয়োগ বা প্রয়োগকারীর। নিফাকের কারণে কি ঈমানকে ত্যাগ করা হবে? অহংকারের মতো ভুল প্রয়োগের জন্য আত্মবিশ্বাসকে জলাঞ্জলি দিতে হবে? স্বার্থপরতার সাথে ভালোবাসাকে গুলিয়ে ফেলা কি ঠিক?

পাশ্চাত্যকে যারা অপর হিসাবে বাতিল করে দিতে চায়, তারাই দেখি আপদমস্তক পশ্চিমা সাঈদ, চমস্কি আর ফালতু সব পোস্ট-মডার্নিস্টদের মুহুর্মুহু উদ্ধৃতি দেয়। বুঝি না এসব উচ্চমার্গীয় হাই একাডেমিয়ার হালচাল। রাষ্ট্রবিহীন সমাজ কায়েমে যারা উদ্বাহু, তারা দৃশ্যত false binary-তে ভুগছেন। সমাজ, নাকি রাষ্ট্র – এমন ধরনের প্রশ্নগুলোই স্বয়ং ক্যাটাগরি মিসটেক বা ফলস বাইনারি ফ্যালাসি।

সমাজ কখনো স্বয়ং রাষ্ট্র নয়। সমাজের মতো রাষ্ট্র কোনো প্রত্যক্ষ প্রাকৃতিক এনটিটিও নয়। সমাজ যতটা স্বতঃস্ফূর্ত, রাষ্ট্র ততটা প্রাকৃতিক বা স্বতঃস্ফূর্ত হয় না। সমাজ হলো ভিত্তি। রাষ্ট্র হলো উপরিকাঠামো। ছাদ ছাড়া ঘরে শুয়ে চাঁদনী রাতের রোমান্স কল্পনা বেশ মজার হলেও বাস্তবতা হচ্ছে ছাদ ছাড়া ঘর বসবাসের অনুপযোগী।

রাষ্টব্যবস্থা হচ্ছে ঘরের ছাদের মতো। হ্যাঁ, খেয়াল রাখতে হবে, ছাদটা যাতে মজবুত হয় এবং কখনো যেন তা মাথার উপরে ভেংগে না পড়ে। ব্যক্তির মালিকানা যেমন স্বীকৃত। তেমন করে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের উপর যৌথ মালিকানা বব্যবস্থার নাম রাষ্ট্রব্যবস্থা।

রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক – কথাটা শুনতে কেমন যেন ঘরছাড়া ভবঘুরের মতোই শোনায়। এমনকি বেদে সম্প্রদায়েরও এক ধরনের ঠিকানা থাকে। তাদের নৌকাগুলো এক একটা বহর হিসাবে থাকে। তাদের সর্দার থাকে, নিয়মকানুন থাকে। তবে ভালোভাবে জীবনযাপনের জন্য সেটা কোনো ভালো পদ্ধতি নয়। সর্বোপরি, স্থলবাসী নাগরিকেরা আছে বলেই বেদেদের বেদেজীবন সম্ভবপর হয় বা হয়েছে।

রাষ্ট্র হচ্ছে মানবীয় নৈতিকতার সর্বোচ্চ পর্যায়। মানবিক নৈতিক ধারণা রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া পূর্ণতা পেতে পারে না। আমার কথা পরিষ্কার– রাষ্ট্রব্যবস্থা আগে যা ছিলো এখনো তাই আছে। যা পরিবর্তন হয়েছে তা যুগের অগ্রগতি মাত্র। সেসব পরিবর্তন ততটা মৌলিক নয়। সেসব নিয়ে এখানে আর বিস্তারিত আলোচনায় গেলাম না। এ বিষয়ে খন্দকার রাক্বীবের আর্টিকেলটা পড়ে বেশ ভালো লেগেছে। এটি শেয়ার করতে গিয়ে এত কথা বলা। যদিও বিষয়ের ওজনে যা বললাম তা অতি সংক্ষিপ্ত কণিকা মন্তব্য মাত্র।

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *