পরাজয়ের প্রথম কয়েক রাউন্ডেই জীবনের খেলা শেষ হয়ে যায় না

[পদ্য বা সংলাপের মত করে বাক্য সাজিয়েছি শুধু।
এটি কবিতা নয়। বলতে পারেন, থার্ড এংগেলে বলা
এ আমার জীবনেরই কথা
আমার কিছু দুঃখবোধ, অনুভূতি, একান্ত ব্যথা …।]

প্রতিদিন কতো কিছু নিয়ে কতো কী ভাবি …।
এক একটা ধারণা গড়ে উঠে
যেন এক একটা ভ্রুণ।
সেসব যখন আশপাশের লোকজনকে বলতে যাই
তখন দেখি, তারা এসবের ধারে কাছেও নাই।
তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে স্ট্যটাসকো-তে।
বলে, “থাক না, যা আছে তা …।
আমাদের কী দরকার পড়ছে, এতো রেডিকেল হওয়ার …।
অন্যরা করুক। অথবা,
সবাই যখন আগাবে, তুমিও তখন সাথে থেকো।”

আফসোস, এ জগতে মানুষ প্রজাতির আবির্ভাব ঘটেছে
সভ্যতা গড়ার জন্য,
নেতৃত্ব দেয়ার জন্য। অথচ,
আমরা আছি কোনোমতে যতটা সম্ভব
ভালোভাবে খেয়ে পড়ে
বেঁচে থাকার কাজে রাত দিন মশগুল।
যেন, লড়াই মানে পরাজয় আর ক্ষতি।
অথচ, লড়াই মানেই জয়ী হওয়া,
হোক সেটা আংশিক জয়ে কিংবা সাময়িক পরাজয়ে।

যিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন,
ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবী করেন,
সত্যকে যিনি অকপটে বলে ফেলেন,
তিনি তো অলরেডি জয়ী।
এ খেলায় তার হারের সম্ভাবনা শূন্য।
দুনিয়াটা টিকে আছে
এমন কিছু সাহসী মানুষের জন্য।
বাকীরা সব জনসংখ্যা
ভেড়ার পালের মতো, শুধু জনগণ।
অমোঘ মৃত্যুর বিস্মৃত অতলে হারিয়ে যাওয়াই
এসব গোবেচারা দুনিয়াদারদের পরিণতি।

নেতারা হতে চায় অনুগামী
যেন তারা নির্বিবাদী নাগরিক। আফসোস …!
আমি, আপনি, সকলে আমরা এক একজন নেতা। বিশ্বাস করেন,
এ আমার অহংকার নয়,
এ হলো বাস্তবতা।
নেতৃত্ব হলো একইসাথে মানবিক মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্ব।
আমাদের প্রজাতিগত নিশ্চয়তা।
জগতে আমরা সেরা।
আমরা নির্বাচিত ও শ্রেষ্ঠ।
ঈশ্বরের কিংবা ‘প্রকৃতির’
সেরা সৃষ্টি হিসাবে,
সমাজ, দেশ ও জাতির
কল্যাণের উৎস ও কাণ্ডারী হিসাবে
আমাদের দায়িত্ব অনেক অনেক বেশি।

অথচ নেতাদেরকে দেখি
নিষ্ঠাবান কর্মীর মতো সন্তুষ্টচিত্ত, মালিকেরা হতে চায়
কর্মচারীর মত কর্তব্যনিষ্ঠ। আফসোস!
উদ্যোক্তারা যখন নিজেদেরকে
চাকুরীজীবীর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারে না,
তখন, অধোগতির আর কিছু বাকী থাকে না।
এখন যা হচ্ছে, সর্বত্র।

এসব স্ববিরোধ
আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। যখন
কাছের লোকদেরকে দেখি
নিজ স্বার্থচিন্তার বাইরে
নীতি, আদর্শ, দেশ, দুনিয়া, বৃহত্তর কল্যাণ, ভালো, মন্দ,
এককথায়, কোনো কিছু নিয়ে
তাদের বিশেষ কোনো মাথা ব্যথা নাই,
তখন আমি রীতিমতো বিহ্বল ভীত হয়ে পড়ি।

নীতি-আদর্শ নিয়ে যারা আগ্রহ দেখায়
ক্ষেত্রবিশেষে নেতৃত্ব কিংবা প্রতিনিধিত্ব দাবী করে
তারাও দেখি ওসব বিষয়ে সিরিয়াসলি এনগেজড হয় না,
আদর্শ যেন জীবনের সমগ্র নয়, অংশ মাত্র।
ফাঁকতালে তারা বিপ্লবের কোশেশ করেন,
সব সময়ে কেমন যেন গা বাঁচিয়ে চলেন।
অনির্ধারিত কোনো এক সময়ে
সিরিয়াসলি নামবেন,
এমন ফলস কমিটমেন্ট দেখিয়ে আপসে কেটে পড়েন।
এরপর রাতদিন আত্মপ্রতিষ্ঠার অন্তহীন দৌড়ে
নিজেকে নিঃশেষ করেন।
তাদের সব প্রতিজ্ঞা-প্রতিশ্রুতি যেন
শুধু বলার জন্যই বলা।
আত্মরতির মতো, ট্রেডমিলের উপর দৌড়ানোর মতো
তাদের সব নিষ্ফল কাজ কারবার।
এ যেন চোরের দলে পরস্পরকে ‘বুজুর্গ’ বানানোর মতো,
ফাঁপা আত্মপ্রবঞ্চনা …!

এস্টাবলিশমেন্ট আর পজিশনের ক্ষতির আশংকায় তারা
সবসময়ে ‘দেখে শুনে’ চলেন,
সতর্ক থাকেন যেন
টার্গেটেড হয়ে না পড়েন।
বৈঠক-মজলিশে তারা
নীতিকথার ফুলঝুড়ি ছড়িয়ে
যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব দেখান।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়
তাদের আদর্শবাদিতার দৃষ্টিনন্দন পোষাকের আড়ালে
ভোগবাদিতার দগগগে ঘা।
আসলে তারা ভীষণ ভীতু, আত্মবিস্মৃত ও জীবন্মৃত।

যারা সব সময়ে বিজয়ী থাকতে চায়
শেষ পর্যন্ত তারা হয় পরাজিত।
সাময়িক প্রাপ্তির চাকচিক্য দেখে তারা বিভ্রান্ত।
তারা ভুলে যান,
সত্যিকারের জয় প্রথমেই আসে না, সাফল‍্য সব সময়ে দৃষ্টিগোচর হয় না।
অথবা,
পরাজয়ের প্রথম কয়েক রাউন্ডেই
জীবনের খেলা শেষ হয়ে যায় না।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *