প্রসঙ্গ বহুবিবাহ

[বলতে গেলে সবাই-ই সুস্থ যৌন সম্পর্ক তথা স্বভাবসম্মত যৌন নৈতিকতার পক্ষে। বিশেষ করে ইসলামপন্থীরা চায়, বিয়ে হোক সহজতর। অথচ এই সামাজিক মূলনীতির অপরিহার্য যেসব ফেনোমেনা, তা মানতে তারা একেবারেই নারাজ। ব্যভিচার, আত্মরতি ও অস্বাভাবিক যৌনতার অনুষঙ্গগুলোকে যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে চাইলে বিবাহবিচ্ছেদের ব্যাপকতাকে মানতে হবে। স্বাভাবিক হিসাবে গ্রহণ করতে হবে বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত বিবাহের বাস্তবতাকে। প্রচলন করতে হবে ছাত্রজীবনে বিয়ে করার সামাজিক রীতি। সর্বোপরি, খোলা মনে মানতে হবে পুরুষের বহুবিবাহের প্রয়োজনীয়তাকে।

সেন্সেটিভ হওয়া সত্ত্বেও বিষয়টার গুরুত্ব বিবেচনায় শেয়ার করলাম। কারো লেখা সরাসরি শেয়ার করার বিপদ হলো, লেখক কোনো কারণে স্ট্যাটাস বা নোটটা ডিলিট করে দিলে আপনার শেয়ারটাও হাওয়া হয়ে যাবে। তাই কপি করে দিলাম। লেখক জনাব Humayun Kabir Nayan কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।]

*****

“তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারীকে বিয়ে করা যেমন একটা সুন্নাহ। তেমনি বহুবিবাহ করা এটাও আরেকটা সুন্নাহ। কিন্তু আমাদের সমাজে এই দুটো সুন্নাহকেই আজ অবহেলিত ও দৃষ্টিকটু হিসেবে দেখা হয়।

কারণটা কী?

এটা খুবই সহজ সমীকরণ যে, প্রথমটা যেমন দ্বিতীয়টা দ্বারা প্রভাবিত, দ্বিতীয়টাও প্রথমটা দ্বারা প্রভাবিত। ভাইস ভার্সা ফ্যাক্ট আর কি। আর এটাও খুব সহজ সমীকরণ যে, যে সমাজে বহুবিবাহকে কঠিন করা হয়, সেই সমাজের পুরুষদের মাঝে তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারীদেরকে বিয়ে না করার মানসিকতা এমনিতেই তৈরি হয়ে যায়। এর কারণ বুঝার বা বুঝানোর জন্য কোনো যুক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। এই মানসিকতা সমাজই তৈরি করছে।

এখন এই সমস্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী কে? নারী? নাকি পুরুষ? আমার জানামতে, ডিভোর্সি বা বিপত্নীক পুরুষদের পরবর্তী বিয়ের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা ফেইস করতে হয় না। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখানে আসল ভুক্তভোগী হন তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারীরা। কারণ, পুরুষদের মাঝে তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারীদেরকে বিয়ে না করার যে মানসিকতা তা আলরেডি তৈরি হয়ে আছে।

আর বহুবিবাহের ক্ষেত্রে নারীদেরকে দেখা যায় একেবারে আপসহীন। এই নারীদেরই কেউ যদি আবার অল্প বয়সে বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত হন, তখন অবিবাহিত পুরুষেরা তো এগিয়ে আসেই না, আর বিবাহিত পুরুষেরা এগিয়ে আসতে চাইলে তারা আবার তাদের স্ত্রী কর্তৃক বাধার সম্মুখীন হয়। ফলাফল কী? এক শ্রেণীর নারী সুবিধাভোগী, আর আরেক শ্রেণীর নারী ভুক্তভোগী। বলতে গেলে এক শ্রেণীর নারীদের কারণে আরেক শ্রেণীর নারীরা ভোগান্তির শিকার।

যদিও এটা স্বাভাবিক যে, কোনো নারীর জন্য তার স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহ মেনে নেয়াটা কঠিন, কিন্তু সমাজের সার্বিক দিক বিবেচনা করলে মেনে না নেয়ার ক্ষতির প্রভাবটা মেনে নেয়ার কষ্টের চাইতে বেশি।তাই সমাজ ও সেই ভুক্তভোগী নারীদের কথা বিবেচনা করে মেনে নেয়াটা উচিত। এই ক্ষেত্রে একজনের কিছুটা আত্মত্যাগই হয় আরেকজনের জন্য করুণা। আবার কোন অবিবাহিত পুরুষও যদি এই ক্ষেত্রে এগিয়ে আসে, তার ক্ষেত্রে প্রথমোক্ত বাধা না থাকলেও সে আবার তার পরিবারের নারী বিশেষ করে মা-বোন-ভাবীদের বাধার সম্মুখীন হয়।

আমার পরিচিত একজনের ঘটনা জানি। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে যাওয়া এক মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে সে এগিয়েছিলো। কিন্তু তার পরিবারের কাছে সে এই প্রস্তাব তুলতেই তার মা, বোন ‘রে, রে’ করে উঠলো। আর ভাবীরা তো সাথে সাথেই টিটকারী– ‘ছিঃ! এই তোর রুচিবোধ! এত মেয়ে থাকতে তুই একটা বিধবা মেয়েকে বিয়ে করবি!’ ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ বলে কী যেন একটা টিটকারী আছে, সেটা দিতেও বাদ রাখলো না তার পরিবারের ঠাট্টা সম্পর্কের মহিলারা। বেচারা শেষ পর্যন্ত আর পারলো না। কিন্তু অপর ভুক্তভোগী মেয়েকে আরও কষ্টের স্বীকার হতে হলো আরেক শ্রেণীর নারীদের কারণে। যারা আজ টিটকারী দিলো, তারাই যদি আবার এই সমস্যায় পড়ে তখন তারা আবার অপর আরেক শ্রেণীর হাতে ভোগান্তির শিকার হয়। এভাবেই চলতে থাকে ভোগান্তির দুষ্টচক্র।

তাহলে সমাধান কী? সমাধান আল্লাহ তায়ালা অনেক আগেই দিয়ে রেখেছেন। আমরা এটাকে কঠিন বানিয়ে ফেলেছি। অথচ প্রত্যেকের অবস্থান থেকে একটু ছাড় আর একটু ত্যাগ স্বীকার করলেই এত বড় সমস্যা মিটে যায়। একজন মেয়ে হয়তো ভাবতে পারে, আমি কেন আমার স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে দেবো? একজন অবিবাহিত ছেলে হয়তো ভাবতে পারে, আমি অবিবাহিত ছেলে হয়ে এত এত অবিবাহিত মেয়ে থাকতে কেন একটা ডিভোর্সি বা বিধবা মেয়েকে বিয়ে করতে যাবো? একজন মা হয়তো ভাবতে পারেন, আমার অবিবাহিত ছেলেকে কেন একটা ডিভোর্সি বা বিধবা মেয়ের সাথে বিয়ে করাবো? একজন বোন ভাবতে পারে, আমার অবিবাহিত ভাইটিকে কেন এক ডিভোর্সি বা বিধবা মেয়ের সাথে বিয়ে করাবো? সবাই আজ এভাবে ভেবেই যাচ্ছে। কিন্তু সমাধান আসছে না। বরং বিষয়টা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে, আর ভুক্তভোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে।

আমাদের ভাবা দরকার ছিলো, এই দুনিয়া সবার জন্য পরীক্ষা। কেউ পরীক্ষা থেকে মুক্ত নয়। একজন নারীর জন্য স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহ মেনে নেওয়াটা যেমন পরীক্ষা, তেমনি একজন পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ, আদল করাটাও পরীক্ষা। সাধারণত পুরুষের চাইতে নারীদের সংখ্যা বেশি থাকে। মুসলিম সমাজে মেয়েশিশু ভ্রূণ হত্যা (Abortion) এখনো অনেক কম পর্যায়ে আছে, যেমনটা ভারতে বা অন্যান্য দেশে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝে দেখা যায়। আর তাছাড়া এটা সুস্পষ্ট হারাম কাজ। এই জঘন্য কাজ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝে না থাকলে সেখানেও নারীদের সংখ্যাই বেশি হত। বর্ধিত নারীদের দায়িত্ব নেওয়া পুরুষদেরই কর্তব্য, আর নারীদের তা বুঝা উচিত।

সমাজের সবারই যে বহুবিবাহ করতে হবে বিষয়টা এমন নয়। নারী পুরুষের অনুপাত যেখানে যেমন সেটার উপর ভিত্তি করে কয়েকজন সামর্থ্যবান পুরুষ এই ব্যাপারে এগিয়ে আসলেই সমাধান হয়ে যায়। আর অতিরিক্ত এই নারীদের দায়িত্ব নেওয়াটাও পুরুষদের কর্তব্য এবং নারীদেরও সেটা বুঝা উচিত। কারণ এখানে ভুক্তভোগী পুরুষেরা নয়, বরং আসল ভুক্তভোগী হল এই পরিস্থিতির শিকার নারীরাই। অথচ আজ আমরা এটাকে কঠিন বানিয়ে ফেলেছি। আজ যেই নারী তার স্বামীকে বিয়েতে বাধা দিচ্ছে, আল্লাহ না করুন, তার স্বামী মারা গেলে কাল সে ভুক্তভোগী। কাল তার বিয়ে নির্ভর করছে অন্য কোনো পুরুষের স্ত্রীর ইচ্ছার উপর বা তার মা-বোনের সম্মতির উপর। আজ যে বোন সে তার ভাইকে বিয়েতে বাধা দিচ্ছে, আল্লাহ না করুন, সে বিধবা বা ডিভোর্সড হলে কাল সে ভুক্তভোগী। কাল তার বিয়ে নির্ভর করছে অন্য কোনো পুরুষের স্ত্রীর ইচ্ছার উপর বা তার মা-বোনের সম্মতির উপর। আজ যেই মা তার ছেলেকে এই বিয়েতে বাধা দিচ্ছে, আল্লাহ না করুন, কাল তার মেয়ের স্বামী মারা গেলে বা ডিভোর্সড হলে তখন সেও ভুক্তভোগী। কাল তার মেয়ের বিয়ে নির্ভর করছে অন্য কোনো পুরুষের স্ত্রীর ইচ্ছার উপর বা তার মা-বোনের সম্মতির উপর। তারমানে বুঝা যাচ্ছে, আজ যে সুবিধাবাদী, কাল সে ভুক্তভোগী।

তাই আসুন। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের অবস্থান থেকে সেক্রিফাইস করি। বিধবা বিবাহ, তালাকপ্রাপ্তা মেয়েদের বিবাহ, বহুবিবাহ সবগুলোকেই সমান্তরালভাবে সহজ করি। সবগুলোতেই সমানভাবে জোর দিতে হবে। একটাকে কঠিন করলে বাকীগুলো কঠিন হয়ে যাবে। আর একটাকে সহজ করলে বাকিগুলোও সহজ হয়ে যাবে। “

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *