চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য কর্মকৌশল ও জামায়াতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা শুনানীর এই চূড়ান্ত পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও বেসরকারী মাদ্রাসাভিত্তিক বৃহত্তর ইসলামী শক্তির সমন্বিত আন্দোলন, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গসংগঠন ছাত্রশিবিরের দিক থেকে ব্যাপকতর ও সহিংস হয়ে উঠেছে। পুলিশ হত্যার মতো ঘটনা এ দেশে আগে ঘটেনি। যে ‘গণহত্যা’র প্রতিক্রিয়ায় এই অসম্ভব ঘটনাও ঘটেছে, তা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে নজিরবিহীন।

জামায়াত এলাই কারা:

মাঠে জামায়াতের সাথে থাকা দুই প্রধান শক্তিকে মাঠছাড়া করার মাধ্যমে এই চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ একটি কার্যকর কর্মকৌশল গ্রহণ করতে পারে। বলাবাহুল্য, জামায়াতের এই চরম দুর্দিনে তাদের পাশে থাকা শক্তিবলয় দুটি হচ্ছে বাংলাদেশের সম্ভাব্য পরবর্তী সরকার গঠনকারী প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও কওমী ধারার তথা বেসরকারী মাদ্রাসাভিত্তিক জামায়াতবিরোধী অরাজনৈতিক সংগঠন ‘হেফাজতে ইসলাম’।

ঢাকা সমাবেশ: হেফাজতে ইসলাম ঘোষিত আগামী ৬ এপ্রিলের ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচিতে আইন-শৃংখলা বজায় রাখার শর্তে বাধা না দেয়ার ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে তাদেরকে মাঠছাড়া করার কৌশল ইতোমধ্যেই সরকারের তরফ হতে গৃহীত হয়েছে। ডিসি, এসপি ও মন্ত্রীরা হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়ে আন্দোলনকারীদের বুঝানোর চেষ্টা, ইসলামবিরোধী লেখকদের বিচারের জন্য ট্রাইবুন্যাল গঠনের ঘোষণা ইত্যাদি এই কৌশলেরই অংশ। ধারণা করছি, আগামী ৬ এপ্রিল ঢাকায় এ যাবৎকালের বৃহত্তম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

চরমোনাইয়ের শাপলা চত্বর সমাবেশ প্রথম আলোর ‘এমন বাংলাদেশ কেউ দেখেনি’ টাইপের শাহবাগ সমাবেশকে অলরেডি ওভারশ্যাডোড করেছে। হেফাজতে ইসলামীর সমাবেশের কারণে ‘মুক্তমনা’ প্রগতিশীলদের নেতৃত্বে গত দেড়যুগ হতে গড়ে উঠা প্রযুক্তি-তারুণ্য প্রবলভাবে ধাক্কা খাবে। মাদ্রাসাওয়ালাদের প্রতিরোধ না করার পলিসি তাদেরকে ক্রমান্বয়ে ঘরে ফেরানোর কার্যকর প্রক্রিয়া। বিভিন্ন শাহবাগী স্কোয়াডের জন্য নিতান্তই স্বপ্নভঙ্গের কারণ হলেও জামায়াত-বিএনপির বাহিরে অরাজনৈতিক ইসলামী শক্তিকেন্দ্রসমূহের বিরুদ্ধে নতুন কোনো ফ্রন্ট না খোলার সরকারী ‘সিদ্ধান্ত’ আওয়ামী লীগ ও আমজনতার দিক থেকে ফলপ্রসূ ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।

বিএনপির ব্যাপারে ওয়ার্কপ্ল্যান:

আওয়ামী লীগের এটিচ্যুউড: এবার বিএনপিকে নিয়ে সরকার কী করতে পারে – আসুন সেই বিশ্লেষণ করা যাক। বিএনপিকে নিয়ে সরকারের কৌশল ক্রমান্বয়ে আরও সুস্পষ্ট হবে। জামায়াতের মতো বিএনপিকেও সরকার নির্মূল করতে চায় – এটি বলা হবে পরিস্থিতিকে অতিসরলভাবে বিশ্লেষণ করা। আমার ধারণায়, সরকার বিএনপিকে চাপে রাখতে ও ভয় দেখাতে চায়। এর মধ্যে সরকারের কোনো কোনো প্রভাবশালী মন্ত্রীর অরাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিশোধ স্পৃহাও থাকতে পারে। জামায়াতকে আশ্রয় দেয়ার ‘অপরাধে’ বিএনপির উপর সরকারের দমন-নিপীড়ন খালেদা জিয়াকে কারা অন্তরীণ করা পর্যন্তও গড়াতে পারে।

তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে সংলাপ: বিএনপিকে আন্দোলন হতে বিযুক্ত করার জন্য আওয়ামী লীগ কথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বা উদ্যোগের কারণে বেনামীতে হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানার দিকে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে যা-ই হোক না কেন, এই দাবির বিষয়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়ে বিএনপিকে আলোচনার টেবিলে আনা মাত্রই জামায়াত ময়দানে একা হয়ে পড়বে। বিএনপিকে ময়দান হতে উইথড্র করার এই পলিসি এমনকি আংশিকও যদি কার্যকর হয়, বিএনপির পক্ষে প্রয়োজনে পুনরায় ময়দানে ফেরত যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, আন্দোলনমুখী বিএনপি সমর্থক জনগণ ততক্ষণে ‘লড়াকু’ জামায়াতের পাশে ময়দানে সক্রিয় হয়ে উঠবে।

তত্ত্বাবধায়কের দাবি মানার টোপ বিএনপি গিলবে কি না – এই কঠিন প্রশ্নের একটা সহজ উত্তর হতে পারে, খালেদা জিয়া এটি মানবেন না। আওয়ামী লীগ যে তত্ত্বাবধায়কের দাবি মানবে না, সেটি তো অনেক আগেই কোর্টের রায় ও সংবিধান সংশোধন করার ঘটনা হতে পরিষ্কার হয়ে গেছিল। তাহলে, বিএনপি কেন সরকারের শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছে? এর উত্তর একটাই – খালেদা জিয়া ব্যক্তিগতভাবে যত আপসহীন ইমেজের অধিকারী হোন না কেন, আওয়ামী লীগের মতো শক্তিশালী সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তোলার সাংগঠনিক সক্ষমতা এককভাবে বিএনপির ছিল না কিম্বা নাই। জামায়াত-শিবির যত সিরিয়াসলি অস্তিত্বের লড়াই করুক না কেন আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেলে বিএনপি ‘নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন’ ও ‘কঠোর কর্মসূচি’ পালনের পাশাপাশি সংলাপেও অংশগ্রহণ করবে। আমি আপনাদের বাজি ধরে এ কথা বলতে পারি।

ময়দানে এলাইবিহীন জামায়াত কী করতে পারে?

এ ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে জামায়াতের দিক হতে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। হতে পারে, জামায়াত সাংগঠনিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। জামায়াতের লোকজন সমমনা রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক দলসমূহের আশ্রয় গ্রহণ করে সেগুলোর জামায়াতীকরণ ঘটাবে। হতে পারে, জামায়াত একা হলেও টিকে যাবে। অথবা অন্যরা ময়দানে টিকে থাকার জন্য সরকারের পরিবর্তে জামায়াতের সাথে থাকাকেই প্রেফার করবে।

সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় দমনের মুখে জামায়াত যদি নিজের মেজর সেটআপগুলোর অস্তিত্ব-কাঠামো টিকিয়ে রাখতে পারে, তাহলে এ দেশে ১৯৭১ সালে পরাজিত এই শক্তি চল্লিশ বছর পরে আরও অন্তত চল্লিশ বছরের জন্য নবজন্ম লাভ করবে। যদি এমনটিই ঘটে, তখন জামায়াত তাদের বিতর্কিত এই নেতৃত্ব, দল ও পরিচিতিকে হাইলাইট করবে, না যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত অস্ত্র-সরঞ্জাম ত্যাগের মতো সংগঠনের পুরনো ছাঁচকে ইতিহাসের জাদুঘরের রেখে সময়, মাটি ও মানুষের ভয়েসকে বিবেচনায় নিয়ে, অগ্রাধিকার দিয়ে নতুনভাবে কাজ করবে – তা দেখার বিষয়। ইতিহাসের এই রায় জানতে হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কমপক্ষে ছয় মাস।

ফেসবুকে প্রথম প্রকাশিত এই লেখাটিতে পাঠকের মন্তব্য:

Faroque Amin: চমৎকার লিখা। সবশেষে কোনো প্রেডিকশন (যুক্তিসমর্থিত) রাখলে আপনার নিজ অবস্থানের প্রতি সুবিচার করা হতো। আর পুলিশ হত্যার ঘটনা কি আগে ঘটেনি? বামপন্থী সর্বহারা/পুর্ববাংলা ক.পা. এরা তো বিভিন্ন সময় অনেক পুলিশ হত্যা করেছে। এমনকি ফাঁড়ি আক্রমণ করে অস্ত্রও লুট করেছে।

Mohammad Mozammel Hoque: Govt. has already taken decision to retreat with the Qaomees. Today’s Prothom-Alo has published a report on it. I have written and posted this before I saw the report. Secondly, I have friends from a wide range. So in fb, I need to write very carefully, you know. Situation is so sensitive that sometimes I feel shaky to give strait forward predictions! Thirdly, no leading political party has ever did attack the police to death except the underground ones, so far I know. Look, I am not saying for or against it but simply focusing on the graveness of the situation. Thanks.

A M Nuruddin Shohag: ধন্যবাদ স্যার চমৎকার বিশ্লেষণধর্মী পোস্টের জন্য। যদিও কোনো নির্দিষ্ট এঙ্গেল থেকে প্রেডিকশন করেননি, তবু সম্ভাব্য অনেক কিছুই চলে এসেছে। আচ্ছা ধরে নিলাম, জামায়াত সাংগঠনিকভাবে নিষিদ্ধ কিংবা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। তখনকার পরিস্থিতি কী রকম হতে পারে? মিশরে ইখওয়ানের মতো, নাকি রুয়ান্ডা-বুরুন্ডির হুটু-টুটসি জাতিগত দাঙ্গার মতো? জামায়াত নিষিদ্ধ কিংবা নিশ্চিহ্ন হলে জামায়াতি এবং জামায়াতঘেঁষা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিণতিও একই হবে, সন্দেহ নেই। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতের সমূহ বিকল্প কী করণীয় হতে পারে দেশের সামগ্রিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য?

Mohammad Mozammel Hoque: না ভাই, জামায়াত ভাঙবে না। বড়জোর নিষিদ্ধ হতে পারে। যদিও সেটির সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। জামায়াত নিষিদ্ধ বা ভেঙ্গে পড়ার মতো (কাল্পনিক) পরিস্থিতিতে জামায়াতের কিছু প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হবে বটে, কিন্তু জামায়াতের সব লোকজন অক্ষত থেকে যাবে। কারণ, তারা ইতোমধ্যেই সমাজের সর্বস্তরে, শাহরিয়ার কবিরের কথা মোতাবেক, ‘ঢুকে পড়েছে’, জামায়াতের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসবে এর ভেতর থেকে। আমার ধারণায়, ২০১৪ সালের জামায়াত কখনো আর পূর্ববৎ হবে না। জামায়াতের জন্য সবচেয়ে ভাল বিকল্প হলো ‘নিষিদ্ধ হওয়া’! অধুনা নিষিদ্ধ ‘সোনার বাংলা ব্লগে’ আমিই সর্বপ্রথম, প্রায় দু-আড়াই বছর আগে, অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলেছিলাম, একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক ইসলামী আন্দোলন হিসাবে, অন্তত বাংলাদেশে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনা সক্ষমতার নিরিখে জামায়াত হ্যাজ বিন একজস্টেড অলরেডি। এর যা কিছু দেয়ার তা দিয়েছে। এখন এটি শুধুমাত্র একটা সিলসিলা হিসাবে টিকে থাকবে। এর যৌবন পেরিয়ে গেছে। ভায়াবল প্রডাকটিভিটির দিক থেকে ইট ইজ অবসলিটেড অলরেডি। অতএব জামায়াতের লোকজনের উচিত হবে এটি ত্যাগ করা – আমার উপর্যুক্ত কথার যদি এই মানে করা হয় তাহলে প্রচন্ড ভুল বুঝা হবে। সোনার বাংলা ব্লগে এসব নিয়ে আমার বিশ্লেষণধর্মী প্রচুর পোস্ট/মন্তব্য ছিল। ভাগ্য ভাল, আমার লেখাগুলো আমি সংগ্রহ করে রেখেছিলাম। অনেকদিন হতে ভাবছি, একটি বই হিসাবে সেগুলো প্রকাশ করবো। চার শতাধিক পৃষ্ঠার একটা বই হতে পারে। ভাল থাকুন A M Nuruddin Shohag।

Abu Sulaiman: A deep analysis and thinking is essential for the worker of future PRO-ISLAMIC MOVEMENT so that they can find out their policy for future. This was happened in case of Maududi in 1947. When everybody was busy with solving the then present situation, he (Maududi) was thinking about the real solution of the problem and ultimately he got some instruction from that. We, who want to work for the future in a more realistic, holistic and humanitarian way, we must keep deep eye on the situation. There is a great possibility that we may wrong to analyse the situation. There is a very emotional element in the present movement of JIB and ICS that may lead us in a wrong way to think. It’s not the matter whether the JIB or ICS would defeat or be defeated in the struggle. The real high thinking Muslim mind must work in all situations- the worst or best. Showing the present situations, many argue that the JIB & ICS is & was also in the right way. Whatever be the result of the present so-called toughest struggle, it would bear no fruit for the Intellectual group in / outside JIB & ICS. Rather the responsibilities would be increased many times if JIB & ICS be victorious. So, no times to waste for the worker of worldwide- Islamic movement. They must work in a very intelligent, realistic and holistic approach and must follow a system called organizing without organization.

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *