ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নে ক্রমধারার অপরিহার্যতা: একজন পাঠকের কিছু প্রশ্নের উত্তর

গতকাল ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্রের (সিএসসিএস) একজন কার্যনির্বাহী আমার পুরনো একটা লেখা কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে আপলোড করেন। কোন লেখার ওপর কেউ প্রশ্ন করলে জওয়াব দেয়ার একটা বাধ্যতাবোধ থেকে একজন পাঠকের প্রশ্নগুলোর জওয়াব দেয়ার জন্য এই নোট। ”মদিনা রাষ্ট্র সম্পর্কিত আমার একটা বহুল প্রচারিত নোট আছে। ওটা পড়ে নেন।” এ জাতীয় (অবাঞ্ছিত) মন্তব্য না করে খানিকটা অসুস্থ অবস্থাতে এই লেখা। কি করবো বলুন, বিশ্বাস তো করি, “কথা বলতে দিতে হবে, চাই প্রশ্ন করার অধিকার….”

১. ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন/প্রতিষ্ঠা বলতে কি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বুঝানো হয়েছে?

যেসব সামষ্টিক তথা সামাজিক বিষয়াদি (notions) বাস্তবায়নের তাকিদ ইসলাম-এ রয়েছে সেসবের ক্ষেত্র (jurisdiction) হলো বর্তমান রাষ্ট্র-ব্যবস্থা। এ অর্থে ইসলামী শরিয়াহর বাস্তবায়ন বলতে যা বোঝায় তার ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা অন্তর্ভূক্ত।

আমার প্রতিপাদ্য হলো, সাধারণভাবে মনে করা হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্র এই ধারণাটি একক। ব্যাপারটা হলো এর প্রতিষ্ঠিত থাকা বা না থাকা। আমি বলতে চেয়েছি যে, ইসলামী রাষ্ট্র বলতে যে সামষ্টিক কর্তৃত্বকে (নেযাম) বুঝানো হচ্ছে তা কিছু বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে অনন্য অর্থে মৌলিক হলেও বাস্তবায়নের দিক থেকে এটি সর্বদাই প্লুরালিষ্টিক এবং হাইয়ারআর্কিক্যাল। একটা বেলুন ফেটে পড়া বা ফুটা না হওয়া পর্যন্ত যে কোন আকৃতিতেই এটি সম্পূর্ণ বেলুন হিসাবে বিবেচিত হওয়ার মতো ন্যূনতম কিছু বৈশিষ্ট্য থাকার শর্তে ইসলামী রাষ্ট্রও নানা অবয়বে ও মাত্রায় হতে বা থাকতে পারে।

ব্যক্তিগতভাবে ঈমানের ঘোষণা ও সুনির্দিষ্ট কিছু ইবাদত (ritual) বাদে যে কোন মুয়ামালাতের বিষয় ইসলাম মোতাবেক হওয়াটাই ইসলামী হওয়ার জন্য যথেষ্ট, এর ইসলাম সিল বা নাম বা ঘোষণা বা স্বীকৃতি জরুরীও নয়, নিষিদ্ধও নয়। তাই, ইসলামী রাষ্ট্র ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ হিসাবে ঘোষিত হওয়াটা আবশ্যকীয় নয়। এছাড়া, uniqueness or unicity is exclusive for the self or being of Allah subhanu taala.

২. ইসলামী শরীয়াহ কি মুসলিম, অমুসলিম, মগ-চাকমা-বম সবার জন্য প্রযোজ্য হতে পারে?

‘ইসলামী শরিয়াহ শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য’ – এই সরল কিন্তু মারাত্মক ভুল ধারণাটি প্রতিষ্ঠার পিছনে ততধিক ভুল অথচ আদ্যপান্ত গেড়ে বসা কিছু ব্যবস্থা ও অবস্থাই দায়ী। অবৈধ যাজকতন্ত্র (priest-class system) ও ইসলামের ধর্ম-পরিচিতিকে উদাহরণ হিসাবে বলা যায়। ইসলামকে ধর্ম হিসাবে প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করলে কোন রকমের প্রলেপ (supplementation) দিয়ে এটিকে যুক্তিসংগত করা যাবে না।

যারা বলছেন যে, ইসলাম একটা ধর্ম মাত্র, তারা লোক-ইসলামকেই অত্যন্ত ভুল ও অনৈতিকভাবে তাদের ইসলাম-বিবেচনার স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে বিবেচনা করছেন। যারা দাবী করছেন যে, ইসলাম এমন একটা ধর্ম যার মধ্যে রাজনীতি ইত্যাদি সব আছে, তাঁরা ভালো করে না বুঝেই ধর্মীয় আবেগে গোঁজামিলের আশ্রয় নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমার অবস্থানটা পরিষ্কার-

ধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সসস্ত্র সংঘাত – এসব কিছু মানুষের জন্যই উদ্ভূত ও প্রয়োজনীয়। পারষ্পরিক স্বাতন্ত্র্য সত্বেও এগুলোর প্রত্যেকটি অপরাপরগুলোকে ফান্ডামেন্টালি প্রভাবিত করে। চেতনাগত দিক হতে মনে হতে পারে ধর্মীয় দিকটাই মূল। আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের মতো ইবাদাতের জন্য মানুষ সৃষ্টি করেন নাই। তাই যে ইবাদাতের জন্য মানুষ সৃষ্টি তা হলো খিলাফত। এই দৃষ্টিতে দেখলে উদ্দেশ্যগত দিক থেকে মনে হবে রাজনৈতিকতার দিকটাই বুঝি ইসলামের মূল। মিউচুয়্যালি এক্সক্লুসিভ বা নেছেসারি মনে করার উভয়বিধ প্রান্তিকতা হতে মুক্তভাবে রাজনীতি ও রাষ্ট্র-ক্ষমতাকে বিবেচনা করতে হবে।

ইসলামকে আমি একটা অনন্য মতাদর্শ হিসাবে মনে করি যাতে মানুষের চাহিদাগুলোকে পূরণ করার ব্যবস্থা বিদ্যমান। এরসাথে ঐক্যমত পোষণ করা বা না করা যার যার ব্যাপার।

৩. ইসলামী রাষ্ট্র বলতে কি ‘মদীনা’র অনুরূপ কিছু বুঝানো হয়েছে?

যে দেশে প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম প্রচলিত সে দেশে প্রধান বুঝাতে লোকেরা ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দটা ব্যবহার করে। যে দেশে পার্লামেন্টারি সিস্টেমের সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত সে দেশে প্রধান কাউকে বুঝাতে প্রধানমন্ত্রী শব্দটাকে ব্যবহার করা হয়। যে দেশে রাজতন্ত্র, সেখানে টপমোষ্ট কাউকে বুঝাতে রাজা-বাদশাহ জাতীয় শব্দকে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে যেহেতু রাজনৈতিকতার বিষয়গুলোকে রাষ্ট্র নামক নোশন দিয়ে বুঝানে হয় তাই বর্তমান সময়কালে প্রচলিত অর্থে মদীনার পলিটিকে মদীনা রাষ্ট্র হিসাবে বলা হয়।

ইসলামী রাষ্ট্র’র মডেল কেবলমাত্র ‘মদীনা রাষ্ট্র’ ই নয়, কোরআনে বিভিন্ন নবী-রাসুলদের যেসব ‘মডেল’ দেয়া আছে এর যে কোনটি প্রযোজ্য হতে পারে বলে আবু আফরা নামের একজন বিদগ্ধ পাঠক সোনার বাংলাদেশ ব্লগের মূল পোস্টে বিস্তারিত কমেন্ট করেছেন। আমি উনার সাথে একমত।

৪. মদীনায় কি ইয়াহুদী, অগ্নিপূজারী, মুসলমান সবার জন্য ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল?

রাসূল (স.) এখানে ধর্ম হিসাবে ইসলাম আর সামাজিক ব্যবস্থা বা নেযাম হিসাবে ইসলামকে আলাদা করেছেন। আধুনিক সময়ে জনপ্রিয় সেক্যুলার শ্লোগান ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ –এর মতো করে তিনি ‘ইসলাম ধর্ম’ কে শুধুমাত্র মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে প্রত্যেক গোত্র ও ধর্মকে নিজ পেরিফেরিতে কনফাইন্ড করেছেন। আবার ল অব দ্যা ল্যান্ড হিসাবে ইসলাম কে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

লক্ষ্য করুন, মুহাম্মদ (স.) মুসলমানদের নেতা আবার একই সাথে তিনি সবার নেতা, বিরোধ মীমাংসাকারী ও সেনাপতি। বৃহত্তর অমুসলিম জনগোষ্ঠী শুধুমাত্র ব্যক্তি মুহাম্মদকেই অবিসংবাদিত নেতা মানেন নাই, তাঁরা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের দিকটা বাদে ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল’ হিসাবেইতো মুহাম্মদ (স.)কে নেতা মেনে নিয়েছিল।

মোল্লাতন্ত্রভিত্তিক লোক-ইসলামের প্রভাবে ‘ইসলামী শরিয়াহ’ সম্পর্কে শত শত বছর ধরে যে আরোপিত মাইন্ড-সেট আমাদের মধ্যে কাজ করছে তা হলো মূল সমস্যা। ইসলামী শরিয়াহ তথা শরিয়াহ-ই বলে দ্যায় যে, অমুসলিমদের নানাবিধ ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিধিবিধান তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে।

সাথে সাথে এটিও একটা বড় সমস্যা যে, ‘রাষ্ট্র ইসলামে’র শ্লোগান তোলা হাল-নাগাদের রাজনৈতিক ইসলামবাদীদের অনেকেই জানেন না, যে ধরনের ইসলামী রাষ্ট্র’র ধারণা তারা পোষণ করেন, প্রচার করেন, দাবী করেন, স্বপ্ন দেখেন, তাদের লালিত মদীনা-রাষ্ট্র মডেল শুরু থেকেই অনেকখানি ভিন্নতর!

৫. ‘মদীনার সমাজ-রাষ্ট্র একটি বাস্তব সমাজ-রাষ্ট্র’ বলতে মদীনাকে রাষ্ট্র হিসাবে নিয়েছেন নাকি সমাজ হিসাবে?

জ্যাঁ বোদিনের পর হতে রাষ্ট্র ধারণাটা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চালু হওয়ায় কেউ যদি দাবী করেন যে, ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বে কোন রাষ্ট্র ছিলনা বা কোন রাষ্ট্র আলোচনা হতে পারে না তাহলে সেটি হবে একটা সিলি মিসটেক। যে কোন বিবেচনায়, রাসূল মুহাম্মদ (স.) প্রতিষ্ঠিত নেযাম ছিল একাধারে একটি মডেল সমাজ ও মডেল রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

৬.  ‘মদীনা’ কি একটা সমাজ নিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল না কি একাধিক সমাজ?

এক কথায় উত্তর দিলে, মদীনার সমাজ ছিল নানাবিধ সমাজের সমন্বয়কারী ঐক্যবদ্ধ সমাজ। কোন পুষ্পমঞ্জরীকে কি একটি ফুল বলবেন, না ফুল-সমষ্টি বলবেন?

৭. বিভিন্ন স্থানে ‘কন্সেপ্টস্যুয়াল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, ইজ ইসলাম কন্সেপ্টস্যুয়াল?

বিধি-বিধানের দিক থেকে ইসলাম নন-কনস্প্ট্চেুয়্যাল যাকে আমার শরিয়াহ বলি। কিছু ফান্ডামেন্টাল বিশ্বাসের দিক থেকে ইসলাম অবিভাজ্য ও নন-নেগোশিয়্যাটেবল, ‘লা কুম দ্বিইনাকুম ওয়াল ইয়া দ্বিইন’ বলতে যা বুঝানো হয়েছে।

আমার ধারণায়, আমার বহু লেখাতে আমি বার বার, অনেকটা একতরফা ও গায়ে পড়ে যে কথাটা বলে থাকি, তা হলো, প্রচলিত ইসলামপন্থীদের কন্স্প্টেচুয়্যাল ইসলাম অর্থাৎ আক্বীদাগত ইসলাম বোঝায় কোন সমস্যা নাই। কিন্তু এর সামাজিক যে প্রয়োগ বিধি ও ধারা তা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান একেবারেই এডোলোসেন্ট। প্রায়োগিক বিষয়গুলোর প্রয়োগযোগ্যতা নিয়েও তত্ত্বীয় জ্ঞান পাকা থাকা চাই।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *