ধর্ম, সংস্কৃতি, মননশীলতা ও ইসলাম

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন উপলক্ষে টিভিতে প্রিয় নজরুল সংগীত শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, আমাদের প্রিয় ইসলামী দায়িত্বশীলদের বৃহাদাংশই এসব ‘গান-বাজনার’ ধার ধারেন না! মননশীলতা নামক বিষয়টি তাঁদের ডিকশনারিতে অনুপস্থিত। কারণ, তাঁরা কখনো বাদ্যবিহীন আবৃত্তি উৎসবে মেতেছেন, এমনটাও দেখিনি। বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস নিয়ে তাঁরা কখনো পড়েছেন, দেখিনি। অধ্যয়ন ও অনুসন্ধানের দৃষ্টিভঙ্গিতে মার্ক্স নিয়ে তাঁরা কখনো পড়াশোনা করেছেন, শুনিনি। অথচ, মার্ক্স প্রস্তাবিত সর্বহারাদের বিপ্লবকে ঠেকানো বা অংকুরে বিনষ্ট করার জন্যই বিংশ শতাব্দীতে এই কল্যাণ রাষ্ট্রের বিষয়টাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জানি না, প্রিয় ইসলামী নেতৃবৃন্দ এই খবরটুকু রাখেন কি না। অন্যদের ভালো যে কোনো কিছুর ব্যাপারে ‘আমাদের ইসলামেও আছে বা ছিলো’ – এটুকুতেই উনাদের আত্মতৃপ্তি!

উনাদের কাছে ইসলাম মূলত রাজনীতি; যার আছে ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, সামরিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিক বা আসপেক্ট। অথচ ইসলাম যতটা রাজনৈতিক ততটাই ধর্মীয়, যতটা ধর্মীয় ততটাই রাজনৈতিক, যতটা রাজনৈতিক, সমান্তরালে ততটাই সামাজিক। ইসলাম যতটা সামরিক তারচেয়ে কম আধ্যাত্মিক – এমন নয়। ইসলামে মানবীয় সকল মৌলিক বিষয়াদিই সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মননশীলতাশূন্য এসব রোবটিক ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ইসলাম চর্চা বিশেষ করে পলিমাটির এই ভাটি অঞ্চলের গণমানসে কখনো এককভাবে স্থান লাভ করতে পারেনি, পারবেও না। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি না পাওয়ায় এখানকার সংস্কৃতিচর্চা ও মননশীলতা বিজাতীয় পৌত্তলিক ও বস্তুবাদী সংস্কৃতিকে ক্ষেত্রবিশেষে গ্রহণ করেছে। এতে জনগণের যতটা ‘দোষ’ তারচেয়েও বেশি ইসলামিস্টদের ব্যর্থতা।

সংস্কৃতি ও মননশীলতার ব্যাপারে ধর্মের চেয়েও মানবিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ধর্ম ও (বিনোদন) সংস্কৃতির এই বিরোধ অনিবার্য। তাই ধর্মের জায়গায় ধর্মকে রাখতে হবে। সংস্কৃতির জায়গায় সংস্কৃতি। অর্থনীতির জায়গায় অর্থনীতি। সামরিকতার বিষয়ে সামরিকতাই বিবেচ্য হওয়া উচিত। আধ্যত্মিকতার জায়গায় আধ্যাত্মিকতা। এসবই ইসলামের বৃহত্তর সীমার আওতাভুক্ত। একটি অপরটির বা সংশ্লিষ্ট অন্যগুলোর পরিপূরক, একাত্ম বা আইডেন্টিক্যাল নয়।

***

ফেসবুকে প্রথম প্রকাশিত এই লেখাটিতে মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য:

Asif Chy: ‘ধর্ম’ এবং ‘দেশ’ এই শব্দ দুটোর মধ্যে কোনো বিরোধ আছে কি? এই ব্যাপারে জানালে কৃতজ্ঞ হতাম স্যার।

Mohammad Mozammel Hoque: যাহা কিছুই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকভাবে মানুষের জন্য ভালো ও কল্যাণকর তাহাই ইসলাম, তাহাই ইসলামসম্মত বা ইসলামিক। দেশ ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? দেশ আর ধর্ম সাংঘর্ষিক কিনা – এই প্রশ্নটা যে উঠছে, সেটি ইসলামী কর্তৃপক্ষের জন্য অতীব লজ্জাজনক। দেশপ্রেম ঈমানের দাবি – এটি হাদীস না হলেও কথাটা সত্যি। হাদীস জাল হলেও কখনো কখনো কথা অতীব সত্য হতে পারে।

Asif Chy: উত্তর পেয়েছি স্যার। কিন্তু আমাদের বাস্তব অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন এরা পরস্পর সাংঘর্ষিক। ধন্যবাদ।

Mohammad Mozammel Hoque: এসব ‘ধর্মীয় ইসলামে’র কনসেপ্টের জন্য, ইসলামের নয়। ইসলাম দেশ ও জাতীয়তাবাদের বিরোধী হবার কোনো প্রমাণ নাই, থাকতে পারে না। যদিও এটি জাত্যাভিমান ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী।

Sazzadur Rahman: বিনোদনের ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আরো স্পষ্টভাবে আলোচনা হওয়া উচিত। আমার কাছে মনে হয় তরুণ প্রজন্ম ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ তাদের ধারণা ইসলাম তাদের বিনোদনের ক্ষেত্র সংকুচিত করবে। এমনকি ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত অনেকেও এই বিষয়ে সঠিক ধারণা রাখেন না।

Shahidul Hoque: আমার ধারণা, মানবীয় সকল মৌলিক বিভাগের মধ্যে একমাত্র সংস্কৃতির ব্যাপারেই ইসলামের অবস্থানকে অনেকটা সেন্সেটিভ ইস্যু হিসেবে দেখা হয়। সাধারণ মানুষ যেমন সংস্কৃতির মানবিক বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করতে পারে না, তেমনি ইসলামের সীমারেখার সংশয়যুক্ত বিষয়গুলোতে হালাল-হারামের সীমারেখা নিয়েও নিশ্চিত হতে পারে না। তাই মাঝামাঝি অবস্থানে থাকতেই পছন্দ করে।

আমাকে যদি কোনো চিত্রকলার সামনে এনে দাঁড় করানো হয়, বেশিরভাগ সম্ভাবনা হচ্ছে, কিছু হিজিবিজি রঙের কারুকাজ দেখবো। এর বেশি কিছু হয়ত বুঝবোও না। আমি যদি চিত্রকলা বিষয়ে আদেশ নিষেধের সীমারেখা টানতে চাই তাহলে তা কতটুকুইবা যৌক্তিক এবং ন্যায় হবে?

Mohammed Mostafa Ripon: I think this is one sided that Islamic authority means Moulana. We are mixing culture & religion that why create that’s type of conflict. We need to divide culture & religion. In religion everything is culture, but in culture everything is not religion.

Sarwar Kamal: Some misleading comments annoyed me not because those hurt me personally, only because those comments were not put on the line of this note. Someone misunderstood the word “Gaan” as well, at least in Bengali cultural context. In our part of the world, Gaan was not originated as a form of entertainment rather a method of epistemic enterprise to understand man-life-real etc. It was the mode of construction of belief systems, knowledge and above all a representation of ideologies that developed in different ages. Now, to what extent Islam permit “Gaan” is a question that should be answered in a comparative cultural discourse than finding the answer in literal meaning of Quranic lexicon. Lastly, the Quran should not be looked upon as a no fly zone for modern science, philosophy and interpretations.

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *