মাটির ঘ্রাণ

সামু ব্লগে লিখেছিলাম। গ্রামে যাবো। অধিবাসী হিসাবে। বড় বোন প্রফেসর ড. ফাতেমা খানমের ভয়ে এই বর্ষার মধ্যেও ঘর মেরামতের কাজ শুরু করে মাসখানেকের মধ্যে শেষ হলো। তিন রুমের ঘর। টিনের ছাউনি। বিশেষ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আধুনিক সুবিধাদি সহকারে একটি এটাচড বাথরুম তৈরি করা হয়েছে। নাজিরহাটে ‘লাইনের গ্যাসের’ সুবিধা নাই। তাই সিলিন্ডিার গ্যাসের চুলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রবলেম হয়েছে কারেন্টের। সন্ধ্যার পর কারেন্ট আছে – গত পাঁচ মাসে পাঁচবারও এমন দেখি নাই! আমাদের এখানে, চবি ক্যাম্পাসে, দিনেরাতে মিলে যে কয় ঘন্টা কারেন্ট থাকে না; বলা যায়, নাজিরহাটে সে কয় ঘন্টা সর্বমোট কারেন্ট থাকে। যাহোক, বলা যায় অনিয়মিত হলেও আমি এখন গ্রামের অধিবাসী।

গ্রামে নারী শিক্ষার বেশ প্রসার হয়েছে। বনায়ন হয়েছে যথেষ্ট। তবে বিলগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ক্রমসম্প্রসারণশীল বসতির গ্রাসে সেই প্রশস্ত বিল আর নাই। তবুও ভালো লাগে ছোটবেলার সেই মাটির সোঁদা ঘ্রাণ।

আমাদের বড় চাচা, দুবাই মালেক হিসাবে খ্যাত, এক সময়ের অতি ধনী, দানশীল ও সুপ্রশস্ত মনের অধিকারী ছিলেন। বয়সের ভারে এখন খর্বতর, শুধু প্রাণের সজীবতাই এখন বর্তমান। সামনের রুমে বসে একজন চাচী, একজন ভাবী ও একজন ফুফাতো ভাইয়ের সাথে গল্প করছিলাম। দেখি বড় চাচা সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। আমি এক দৌড়ে উনাকে গিয়ে ধরলাম। উনি আমাকে নিয়ে পাকা রাস্তা ধরে আজম ক্লাব ফেলে ডাইনজুরি বিলের মাঝখানে নিয়ে আমাদের দুটি জমি চিনিয়ে দিলেন। কী যে ভালো লাগল! জানতাম, এই লোকেশনে আমাদের জমি আছে। কিন্তু স্পেসিফিক্যালি চিনতাম না। উনাকে তখনই বলেছিলাম, আমি গিয়ে ইন্টারনেটে এটি লিখব। আমার ধারণা, উনার আপন ছেলেদের চেয়েও আমাদেরকে বিশেষ করে আমাকে তিনি বেশি পছন্দ করেন। হয়তোবা আমার বাবার সাথে আমার চেহারা ও স্বভাবের মিল অপেক্ষাকৃত সবচেয়ে বেশি বলে। পুরনো দিনের স্মৃতিচারণের এক পর্যায়ে ‘বদ্দা, আমি আর তোর ফুফু – আমরা তিনজনে আমার দাদীর পিছে পিছে সারাক্ষণ ঘুরতাম’ – এ কথা বলে ডুকরে কেঁদে উঠেন। তখন যথারীতি কারেন্ট ছিলো না। একটা মোমবাতি ঘরের মধ্যে জ্বলছিলো।

আজ বাবা নাই, ফুফুও নাই, বড় চাচাও একদিন এই মোমবাতির মতো নিঃশেষ হয়ে যাবেন। বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, নানী, বড় মামাসহ পরিবারের অনেককে যেভাবে আমি কবরে শুইয়ে দিয়েছি, সেভাবে না জানি কখন এই পিতৃতুল্যকেও নিজ হাতে মাটির বিছানায় রেখে আসতে হয়!

প্রতি শুক্রবার যখন বাবার কবরের পাড়ে দাঁড়াই, তখন ভাবি, পুরান পুকুরের এই মাটিতে শুয়ে আছে আমার পূর্ব-বংশধরেরা, এ মাটিতেই আমার অন্তিম নিবাস!

এতো বছর পর কেন আমার এমন গ্রামমুখীনতা – এ নিয়ে আমার সহকর্মী, আমার স্ত্রী-সন্তানাদি, এমনকি গ্রামের লোকদের মধ্যেও এক ধরনের কৌতূহল। আমার এক চাচাতো ভাই বলল, সে আজম ক্লাবের ওখানে কোনো চায়ের দোকানে কখনো বসে না। এঁরা আসলে নিজেদের সম্মান ও মর্যাদাকে অটুট রাখতে ও বাড়াতে চায়। আর আমি চাই শুধুমাত্র একজন নিবাসী হিসাবে, তাঁদের একজন হয়ে থাকতে। প্রসেফর হিসাবে নয়। এর আগে সামু ব্লগে দেয়া এক পোস্টে লিখেছিলাম – শহুরে জীবনের ফরমাল তথা কৃত্রিম সম্মানের ভারে আমি অতীষ্ট। বাঁচতে চাই অনাবিল আনন্দে, শেকড় সংলগ্ন হয়ে। তাই গ্রামের সবকিছু আমার ভীষণ ভালো লাগে।

মানুষ প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য শহরে যায়। আমরা গিয়েছি। ১৯৭৫ সালে। আজ জীবনের শেষ-মধ্যাহ্নে গ্রামের পরিবর্তিত অবয়বে আমি নিয়ত খুঁজে ফিরি আমার হারানো শৈশবকে, বাবা-মার সেই সংসার, প্রিয় দাদীর ততোধিক প্রিয় সংসারের সেই চৌহদ্দিকে…!

ব্লগে বিশেষ করে সামাজিক ব্লগসমূহে আজকাল যেসব বিষয় হিট হয়, সে নিরিখে আমার এ লেখার বিষয়বস্তু ও লেখনী উভয়দিক হতে নিতান্ত অপাঙ্কতেয় মনে হবে। হয়তো কোনো পাঠক শেষ পর্যন্ত পড়বেনও না। কেউ জানবে না এলোমোলো এ লেখা শেষ করতে আমার কত…!

পোস্টটির সামহোয়্যারইন লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

“মাটির ঘ্রাণ” শীষক র্পোস্টে একটি মন্তব্য

  1. আমি পুরোটা পড়েছি।…. হয়তো নাজিরহাট রেল স্টেশনের আশেপাশের খোলা জায়গাগুলোতে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাবার ইচ্ছার সাথে মিলে গেছে বলে……!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *