পাঠক প্রতিক্রিয়া: বিয়ে হোক বাহুল্য ব্যয় বর্জিত সহজতর স্বাভাবিক সম্পর্কের ব্যাপার

পাঠক প্রতিক্রিয়া-১

Masud Parvez: আমি খুব সাধারণ মনের মানুষ। কিন্তু আপনাদের মতো অসাধারণ মানুষের লেখা, সমাজ পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে সব সময়। আমিও একজন সাধারণ মেয়েকে বিয়ে করেছি। শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়ার আশা করিনি কোনো কিছু, শুধু ভালোবাসা ছাড়া।

আমি আমার বউকে অনার্স ১ম বর্ষে থাকা অবস্থায় বিয়ে করেছি। নারীর মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক আসনে যাতে সে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তার জন্য আমার সহযোগিতা ছিল শতভাগ। আমি তাকে অনেক দিন নিজ হাতে রান্না করে খাইয়ে দিয়েছি তার পরীক্ষার সময়। সে যখন লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতো তখন ঘরের কাজে তাকে সাহায্য করেছি। আমার বিয়েতে এতিম মিসকিনদেরকে সাধ্য অনুযায়ী খাওয়ানোর তৌফিক দান করছিলেন আল্লাহ। আমার বউ আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত একজন নারী। আমি কি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে কোনো ছোট্ট ভূমিকা রাখতে পেরেছি?

আমার উত্তর: আলহামদুলিল্লাহ, আপনাদের মতো লোকদেরকে দিয়ে সমাজের কিছু একটা টেকসই পরিবর্তন হবেই হবে ইনশাআল্লাহ।

Masud Parvez: আপনার দোয়া, আরো লেখা আশা করবো, যা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা সমাজ ও সংসারে আরো সুন্দরভাবে নিজেদেরকে মেলে ধরতে পারবো। যা থেকে সৃষ্টি হতে পারে সুন্দর, সুখী ও সমৃদ্ধশালী পারিবারিক ও সামাজিক জীবন। আপনার সুস্থ ও সুন্দর জীবন কামনা করছি। ধন্যবাদ আপনাকে।

আমার উত্তর: আপনার স্ত্রীকে আমার পক্ষ থেকে সালাম শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানাবেন।

***

পাঠক প্রতিক্রিয়া-২

একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর সাথে গতকাল আমার ইনবক্সে নিচে উদ্ধৃত এই আলাপ হয়েছে। সংগতকারণে এই পাঠকের ব্যক্তিগত পরিচয়কে বাদ দিয়ে পুরো আলাপটা এখানে দেয়া হলো। খুব সম্ভবত এ ধরনের সমস্যা অনেক মেয়েকেই মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই মেয়েটিকে আমি যা বলেছি তা সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলতে চাই। আল্লাহ সাক্ষী, এসব বুদ্ধিজীবীসুলভ কথা নয়। বরং আমার গভীর উপলদ্ধি-জাত মনের কথা। আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সব সংগ্রামী নারীর সাথে আমি আছি, আমৃত্যু প্রতিক্ষণে আমার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে।

“আমি আপনার প্রত্যক্ষ ছাত্রী না হতে পারি কিন্তু জীবনমুখী ব্যবহারিক শিক্ষা নিতে আপনার অনবদ্য পোস্টগুলো আমার চিন্তার জগতকে আরো প্রসারিত করতে অনেক সাহায্য করেছে! আলহামদুলিল্লাহ, মানসিক বিপর্যয় ও বেশ সংশয়মূলক কিছু অবস্থা থেকে উঠে আসতে আপনার পোস্টকৃত লিখা পড়ে আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে আমি এখন অনেক বেশি ভালো আছি।

সম্প্রতি আপনার একটা লেখা পড়ে আপনার সাথে আরো বিস্তারিত আলাপের ইচ্ছে পোষণ করেই আপনাকে নক দিলাম, স্যার। জানি না আমার বার্তা আপনার নিকট পৌঁছাবে কিনা? তাও আমি আশাবাদী একজন মানুষ হিসেবে আপনার কাছে সরাসরি আমার কথাগুলো ব্যক্ত করতে চাই।

বিয়েতে বাড়তি যে ব্যয় করা হয়ে থাকে, এ প্রসঙ্গে সেই লেখাটিতে আপনি উল্লেখ করেছিলেন যে সেখানে পাত্রীর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি থাকে! আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেটা কীভাবে? আমি আমার কথাই বলি। আমি …. বর্ষে পড়াশোনা করছি … বিশ্ববিদ্যলয়ে। আমার মা বাবা আমাকে বিয়ে দেয়ার জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছেন। আমি তাদের সাথে এসব বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলাপ করে দেখেছি। কিন্তু সামাজিক অবস্থা, সামাজিকতা রক্ষা করা এসবের দোহাই দিয়ে বারবার আমার মুখ বন্ধ করা হচ্ছে। আমি এই বিষয়ে চাইলেও প্রতিবাদ করতে পারছি না! এক্ষেত্রে আমার কী করণীয় থাকতে পারে? জানালে বেশ উপকৃত হবো!

আমার পরবর্তী প্রশ্ন– বিয়ের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেষে একটা মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার স্বামীর। তবে কেন সে পড়াশোনা কন্টিনিউ করতে চাইলে তার খরচ মেয়ের পরিবারকেই বহন করতে হবে? মেয়ের বাবার আর্থিক অবস্থা অনুকূলে না থাকা সত্ত্বেও? আমি স্পষ্ট জানিয়েছি বাসায়, যদি ছেলে খরচ না দেয় পড়াশোনার, আমি এ পড়া কন্টিনিউ করবো না। এখনো কিছু ফাইনাল হয়নি কথাবার্তা! তবে এর পূর্বেও একরকম যার সাথে কথা চলছিলো সেখানে আমার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আমার আব্বু এমনটাই চেয়েছিলেন!! আপনার পরামর্শ আশা করছি স্যার! ধন্যবাদ।”

আমার উত্তর:

‘সামাজিকতা রক্ষা’ নামক এই দুষ্টচক্র থেকে রেহাই পাওয়া একটি কঠিন ব্যাপার। তাই বলে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। বরং, বিয়েতে বাহুল্য খরচ রোধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সমস্যাটি আমরা সমাধান করতে না পারি, কিন্তু সমস্যাটা যে একটা সমস্যা, যা চলছে তা যে ঠিক হচ্ছে না সেই কথাটা আমাদের সর্বাগ্রে স্বীকার করা উচিত। এবং যারা নিজেদের হিপোক্রেসিকে বুঝতেছে না তাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত।

আর প্রতিবাদ করতে পারা বা না পারার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নৈতিক মনোবল এবং সার্বিক সক্ষমতার উপর নির্ভর করে। চোখের সামনে হওয়া অন্যায়কে প্রতিরোধ না করে যিনি শুধু প্রতিবাদ করে দায়িত্ব পালন করেন তিনিও অপারগতার কারণে সেটা করেন। আবার নিজের সামনে হওয়া অন্যায়কে প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ কিছুই না করে মনে মনে সেটাকে অপছন্দ করে যিনি আত্মতুষ্ট থাকেন, তিনিও নিজেকে দুর্বল এবং অপারগ বলেই সেটা করেন। সুতরাং এসব বিষয়ে কাউকে খুব সুনির্দিষ্ট করে কোনো পরামর্শ দেওয়াটা কঠিন। কারণ পরামর্শদাতা তো জানে না, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার নৈতিক অবস্থান কী বা কার মনোভাব কতটুকু।

যে মেয়ে লেখাপড়া করতে চায় তার এমন ছেলের সাথে বিয়ে হওয়া উচিত নয় যে মেয়েদের লেখাপড়া পছন্দ করে না। বিয়ের পরে স্ত্রীর লেখাপড়ার খরচ বহন না করার মানে হলো স্ত্রীর লেখাপড়াকে স্বামী হিসেবে তিনি সুদৃষ্টিতে দেখেন না। প্রত্যেক আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মেয়ের উচিত এমন ছেলেকে বিয়ে করা যে ছেলে তার লেখাপড়ার কাজে সহযোগিতা করবে এবং লেখাপড়া শেষ করার পরে কর্মজীবনে সেই লেখাপড়াটাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। সোজা কথায়, প্রয়োজনে চাকরি করতে দিবে এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সোশ্যাল ওয়ার্ক করার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করবে না।

পাশ্চাত্যের মতো মেয়েদের অবশ্যই আয় উপার্জন করতে হবে, ছেলেদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানে সমানে চাকরি করতে হবে– আমি এমনটা মনে করি না। অপরদিকে কেউ লেখাপড়া করবে, কিন্তু সেই লেখাপড়াকে কাজে লাগাবে না, শুধুমাত্র বিয়ে নামক চাকরি পাওয়ার জন্য সে লেখাপড়াটা করবে, অথবা জামাই মরে গেলে একটা চাকরি করতে হবে, অথবা ডিভোর্স হয়ে গেলে কিছু একটা করার সুযোগ থাকতে হবে, শুধুমাত্র সেজন্য সে লেখাপড়া করবে, এগুলাকে আমি মোটেও সঠিক মনে করি না।

উপরের প্যারায় আমি যা বললাম সেগুলাকে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রত্যেকটা মেয়েকে পার্সোনালিটিসম্পন্ন হতে হবে। বিয়ের আগে যারা পার্সোনালিটিসম্পন্ন হতে পারে না, বিয়ের পরও তাদের কোনো পার্সোনালিটি গড়ে উঠবে না বা বজায় থাকবে না, এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। চাকরি তথা আয় উপার্জন, আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে আর্থিক সামর্থ্য থাকা হচ্ছে কারো ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মান বজায় থাকার অপরিহার্য পূর্বশর্ত। লেখাপড়ায় আছে এবং একই সাথে বিবাহপ্রার্থী এমনসব মেয়েদের উচিত এই বাক্যটি খুব ভালো করে পড়া এবং হৃদয়াঙ্গম করা। এটি আমার জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অন্যতম নির্যাস।

“অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার, আপনার মূল্যবান পরামর্শের জন্য!”

এক বছর আগে লিখেছিলাম– বিয়ে হোক বাহুল্য ব্যয় বর্জিত সহজতর স্বাভাবিক সম্পর্কের ব্যাপার

লেখাটির ফেসবুক লিংক

Leave a Reply