বিয়ে হোক বাহুল্য ব্যয় বর্জিত সহজতর স্বাভাবিক সম্পর্কের ব্যাপার

বিয়েতে বাহুল্য ব্যয়ের অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে যে লেখাটা গত পরশু ফেসবুকে শেয়ার করেছি সেটির ফরোয়ার্ডিং হিসাবে দেয়া সংক্ষিপ্ত মন্তব্যগুলো ছিল বেশ কড়া। সুখের বিষয় হলো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীসহ ইতোমধ্যে ২৬২ জন এটি লাইক করেছেন। তন্মধ্যে ৩২ জন এটি শেয়ারও করেছেন। এই সামাজিক সমস্যার ব্যাপারে চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ উচ্চকণ্ঠ হচ্ছেন। এটি খুব ভালো লক্ষণ। আশা করি এক দশকের মধ্যে বাহুল্য ব্যয় বর্জিত সাদামাটা বিয়ে অনুষ্ঠানের সামাজিক রীতি এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্ততপক্ষে অন্যতম ডমিন্যান্ট সোশ্যাল ট্রেন্ড হিসাবে এটি উঠে আসবে বলে আমার ধারণা।

একটা সুস্থ সমাজব্যবস্থার জন্য ক্ষমতা, অর্থ ও বস্তুগত সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনব্যবস্থার পাশাপাশি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি নিবারণের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। বিশেষ কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিকে জরুরিভিত্তিতে মোকাবিলা করা যায়। সম্ভাব্য কম ক্ষতিকে মেনে নিয়ে বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জন করার চেষ্টাও ঠিক আছে। প্রয়োজনে নানা ধরনের আপতকালীন ব্যবস্থা বা compatibility mood এডপ্ট করাতেও সমস্যা নাই। কিন্তু সমস্যা হলো, অগত্যা পরিস্থিতিতে জরুরিভাবে গৃহীত সাময়িক ব্যবস্থাকে যখন কোনো সমাজ স্থায়ী ও স্বাভাবিক পন্থা হিসাবে গ্রহণ করে।

এ ধরনের নাজুক বিষয়ে উদাহরণ দিয়ে কথা বলাই ভালো। দুপুরে খাওয়ার সময়ে ভাত-তরকারী দিয়ে পেটপুরে নরমাল খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা না হলে কেউ চা-মুড়ি খেয়ে কোনোমতে খিদা মিটাতে ও সময় কাটাতে পারে। তাই বলে কেউ যদি ক্ষুধা পেটে ভাত না খেয়ে হামিশখন চিপস আর চানাচুর খেতে থাকে, তখন সেটা নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সমাজের গুরুতর সমস্যা।

একটা সমাজে অনেক সমস্যা থাকতে পারে। সমস্যা থাকাটা সমস্যা নয়, সমস্যাকে স্বীকার না করাটাই হলো এক নম্বরের গুরুতর সমস্যা। দেরিতে বিয়ে সব দিক থেকে বিরাট সমস্যা। তা অধিকতর ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা না হওয়ার কারণে উপযুক্ত সময়ে ছেলেমেয়েরা বিয়ে করতে পারে না। গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো দেরিতে বিয়ের এই ‘কালা জ্বর’ আরো প্রলম্বিত হয় বিয়েতে বাহুল্য ব্যয়ের কারণে।

যে যাই মনে করেন না কেন, আমার কাছে ব্যাপারটা সিম্পল। প্রাপ্ত বয়স্ক দুজন নরনারী মিলিত হবে। পরস্পর হতে নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করবে। একজন আরেকজনকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা দিবে। একইসাথে এই ‘বিশেষ ব্যক্তিগত সম্পর্কের’ দায়-দায়িত্বও তারা বহন করবে। এরই নাম বিয়ে। সামাজিক স্বীকৃতি নয়, বরং সমাজের সাধারণ অবগতিই হলো বিয়ের শর্ত, অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যা অর্জিত হয়। ইসলাম ধর্ম অনুসারে বিয়ের অনুষ্ঠানে স্রেফ ৭ জন লোক থাকাই যথেষ্ট। একজন কাজী, দুজন অভিভাবক, দুজন সাক্ষী এবং বর ও কনে। কেন বিয়েতে ৫/৭টা অনুষ্ঠান করতে হবে, কেন দফায় দফায় কয়েক শ’-হাজার লোক খাওয়াতে হবে, কেন সামর্থকে ছাড়িয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করতে হবে, তা আমার বুঝে আসে না। অনাবশ্যক এইসব সামাজিকতা কি কাউকে বেহেশতে নিবে? না করলে কি কেউ দোজখে যাবে? যারা এসব ফালতু আনুষ্ঠানিকতা করে নাই, তারা কি সমাজচ্যুত হয়েছে?

আমি কখনো, কোনোদিন, কোনো উপলক্ষ্যেই, এমনকি ৫০ জন লোককেও দাওয়াত করে খাওয়াই নাই। তাতে কী হয়েছে? আমি কি কম সামাজিক? দীর্ঘদিন আমি কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতাম না। সংশ্লিষ্ট সবাই জানতো, বিয়ের বাহুল্য খরচকে অপছন্দ করার কারণে আমি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাই না। ২০০৯ সালে আম্মা মারা যাওয়ার পরে গ্রামে যাওয়া শুরু করি। আত্মীয়স্বজনদেরকে চেনার জন্য এরপর থেকে বিয়েশাদির অনুষ্ঠানেও নিয়মিতভাবে যাই। অবশ্য গিয়ে যা দেখি তাতে করে ফিরে আসার পরে ভিতরে ভিতরে যথেষ্ট অনুশোচনায় ভুগি।

১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে আমার বিয়ের সময়ে যদি আমাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হতো, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্যান্ডেল টানিয়ে দশ হাজার মানুষকে ‘বৈরাত’ খাওয়াতে হবে, তাহলে আমার শ্বশুর তা-ই করতেন। তখনকার সময়ে পাত্র হিসাবে আমার ততটা ‘বাজারমূল্য’ ছিলো। সংশ্লিষ্টরা জানেন, আমার শ্বশুর মাদারীপুর শহরে তখনকার সময়ে ছিলেন যথেষ্ট বিত্তশালী। নিজের অনাড়ম্বর বিয়ের উদাহরণ টানলাম এ জন্য যে, বিয়েতে বাহুল্য খরচ রোধ করার জন্য সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক পজিশনে থাকে স্বয়ং পাত্র ও পাত্রী। বিশেষ করে, এ ক্ষেত্রে পাত্রীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার সংসারে শ্বশুরবাড়ি হতে ‘উপহার’ হিসাবে পাওয়া কিছুই নাই।

কথা আর বেশি না বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করতে চাই, আছে কি এমন কোনো সাহসী নারী যে বলবে– ‘নিজের বিয়েতে আমি এ ধরনের অতি সামাজিকতা ও বাহুল্য ব্যয়কে যথাসাধ্য রোধ করবো?’ আছে কি এমন সৎ পুরুষ যে বলবে– ‘প্রকাশ্য বা গোপন কোনো ধরনের যৌতুক নেয়া ও বাহুল্য ব্যয় ছাড়াই আমি বিয়ে করবো?’ এমন কঠিন ওয়াদা করতে তোমরা যারা অনাগ্রহী তারা সারাজীবন আদর্শ-আদর্শ খেলতে পারো, নীতি-নৈতিকতার কথা বলে মানসিক সান্তনা পেতে পারো, আন্দোলন-আন্দোলন জপতে পারো, বাস্তবতা হচ্ছে you are a worthless defender of stagnant status-co. Actually, you are one of them, against whom you are claiming to fight.

সাহসীদের বলছি, জেনে রাখো, এমন ধরনের আদর্শবাদীদের দিয়েই একটা সুন্দর সমাজ গড়া সম্ভব যারা নিজেরা আদর্শের দাবিকে অন্তত নিজেদের ব্যক্তি জীবনে অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করে অন্যদের জন্য নিজেদেরকে উদাহরণ হিসাবে উপস্থাপন করতে পারে। লম্বা লম্বা কথা বলা বকোয়াজদের সাথে আমি নাই। বিয়ে হোক বাহুল্য ব্যয় বর্জিত সহজতর স্বাভাবিক সম্পর্কের ব্যাপার। গোপন ও দায়দায়িত্বহীন সম্পর্ক যেমন অন্যায় ও প্রান্তিকতা, অনর্থক ঢাকঢোল পিটানো ব্যয়বহুল এসব বিয়ে অনুষ্ঠানও সমপরিমাণের অন্যায় ও প্রান্তিকতা। এই দুষ্টচক্র হতে সমাজটাকে বের করে নিয়ে আসার জন্য সমাজকর্মীদের হতে হবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

মোঃ আমিনুল ইসলাম: প্রকাশ্য বা গোপন কোনো ধরনের যৌতুক নেয়া ও বাহুল্য ব্যয় ছাড়াই আমি বিয়ে করেছি।

Mohammad Hafizur Rahman: আসসালামু আলাইকুম। ধন্যবাদ আপনার জ্ঞানগর্ব লেখার জন্য। বুকে হাত দিয়ে বলতে চাই, বিয়ের আগে শ্বশুরকে গিয়ে বলে এসেছিলাম কোন কিছুই চাই না। যদি কিছু দেন তাহলে এখানে বিয়েই করবো না। সম্পূর্ন যৌতুকবিহীন বিয়ে করেছি। ধন্যবাদ আপনাকে।

Sheikh A Ahmed: লন্ডনের মুসলিম বিয়েগুলো চমৎকারভাবে মসজিদের ভেতর হয়, শুধু খেজুর দিয়ে। যে কোনো নামাজের পর ইমাম সাহেব হঠাৎ ঘোষণা দেন– এখন একটি আকদ অনুষ্ঠান হবে, আপনাদের দাওয়াত রইল।

এরপর তিনি যে খুতবা দেন তা অসাধারণ, অতুলনীয়। দেশে থাকতে কোনোদিন শুনিনি। প্রথমে বরকে উদ্দেশ্য করে, এরপর কনেকে, এরপর বরের মা বাবাকে, বিশেষ করে বরের মাকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেন যা হৃদয় গ্রাহীই কেবল নয়, ক্ষেত্রবিশেষে আপত্তিকরও মনে হয়। যেমন নতুন বউ যদি বাপের বাড়ি যেতে চায়,বা বাইরে কোথাও যেতে চায় তাহলে পারমিশন দেবে তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি নয়। কারণ, শরীয়ত মোতাবেক নতুন বউয়ের ওয়ালী বা অভিভাবক তার স্বামী, স্বামীর মা-বাপ নন।

উপমহাদেশ থেকে আসা পরিবারগুলো অবশ্য এরপরও ধুমধাড়াক্কা কিছু অনুষ্ঠান করে বটে, তবে এর সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে। কারণ এখানকার বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম ইসলামি শিক্ষা ও ভাবধারায় আমাদের চাইতে অনেক বেশি শাণিত।

নিজের কথা বলি (আল্লাহ আত্মপ্রচার থেকে রক্ষা করুন, তরুণরা যাতে উদ্বুদ্ধ হয় সেজন্য শেয়ার করছি)। নিজ ডিপার্টমেন্ট থেকে অনার্স-মাস্টার্সে প্রথম স্থান লাভ করার পর নব্বই দ্শকের মাঝামাঝি দেশের তরুণদের পরম কাংখিত বিসিএসের সবচেয়ে লোভনীয় ক্যাডারের অফিসার হবার পরও বিয়ে করেছি একদম সাদামাটাভাবে, যৌতুক দূরের কথা, একটা সামান্য তেনাও ঘরে ঢুকতে দেইনি। বিশাল সরকারী বাসায় সংসার শুরু করেছি ৪টি প্লাস্টিক চেয়ার আর একটি প্লাস্টিক টেবিল দিয়ে। প্রথম তিন বছর বাসায় ছিল না কোন ফ্রিজ, কোনো টিভি, কোনো আলগা এমিনিটিস! বউ তখন চোখের জল ফেলত আমার একগুঁয়েমির জন্য, আর আজ কাঁদে সেই সুখের দিনগুলোর কথা ভেবে। কত কিছুই তখন ছিল না, কিন্তু বুকভরা সুখ ছিল। মন ভরা বল ছিল।

একমাত্র মেয়ের দোহাই দিয়ে শ্বশুর মহাশয় বিয়েতে প্রাপ্ত স্বাভাবিক ও আনুষঙ্গিক উপহার গ্রহণ করার কথা বললে বিনীত রাগে বলেছিলাম– জিনিসপাতি দেন, তবে মেয়ে নিয়ে যান। আপনার জীবনের সবচে দামী জিনিস, একমাত্র মেয়েটাই তো আমাকে দিয়ে দিলেন, এরপর আপনার এমন কী দামি জিনিস আছে যা আমাকে দিতে পারেন?

শ্বশুর থেমে গিয়েছিলেন, শাশুড়িকে বলেছিলেন, তোমার মেয়ের জামাইটা আস্ত একটা পাগল। শাশুড়ি বলেছিলেন, হ্যাঁ, পাগল, তবে তোমার মতো। পরে জেনেছি শ্বশুরের জীবনেও প্রায় কাছাকাছি একই ঘটনা ঘটেছিল। শাশুড়ির রায় হলো, তুমি যেহেতু যৌতুক নাওনি, সেজন্য তোমাকেও দিতে হয়নি!

তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে আমার চরিত্রে এই ইন্টেগ্রিটি এসেছে ভার্সিটিতে কিছুকাল রুমমেট হিসেবে আপনার নিকট-সাহচর্য পাবার কারণেই হয়ত। সো, আপনার একটা ধন্যবাদ পাওনা রইল মুযযাম্মিল ভাই।

Khondoker Zakaria Ahmed: চমৎকার, আমি আর কিছু বললাম না। তবে আকর্ষণীয় পাত্র না হওয়া সত্ত্বেও প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।

Mohammad Mozammel Hoque: আখলাক ভাই আর যাকারিয়া ভাই, দুজন একান্ত প্রিয় মানুষের জন্য শুভেচ্ছা।

Mohammad Mozammel Hoque:ইসলামের পরিভাষায় এটাকে কি বলে বরযাত্রী না চাঁদবাজী!

Iqbal Hosain: We should maintain middle way. Neither a matrimony to be too much pompous nor too much simple.

Mohammad Mozammel Hoque: the simple the better, I think.

Abdul Quader: যারা শখ করে তাদের মেয়ের সাথে উপহার দেয় বিয়ের সময়, তাদেরও এই উপহার দেওয়া বন্ধ করতে হবে, তাদের কাছে এটা শখ হলেও, এক শ্রেণী এটাকে ওয়াজিব হিসেবে তাদের পাওনা মনে করে। তাই এটা বন্ধ করতে হবে।

Masud Ur Rahman: আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ পাক রহম করেছেন। বিয়ের অনুষ্ঠান সাদাসিধা হয়েছে, যদিও অনেকে অসন্তুষ্ট হয়েছেন।

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *